#ভালোবাসার_ভিন্ন_রুপ
#সাইয়্যারা_খান
#পর্বঃ১৩
কবরস্থানে একটি গাড়ি এসে থামলো। তার থেকে নেমে এলো একজন লোক। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল একটি কবরের দিকে। কিছুক্ষন দোয়া পরে আল্লাহ তায়ালার নিকট দোয়া করলো শায়িত ব্যাক্তির জন্য। এরপর কিছুক্ষন অভিমানি চোখে তাকিয়ে রইল। কবরটির চারপাশে বেলিফুলের গাছ যা নিঃস্বার্থ ভাবে ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। লোকটি হাটু গেরে বসে পরলো। অশ্রু চোখে তাকিয়ে হাত বুলালো কবরটির উপর। বললো,
— আমি আমার ওয়াদা রেখেছি জান। তোমার আমার কাছে শেষ চাওয়া কাল পূরন করেছি। জানি আমি স্বার্থপর হয়ে এই কাজ করেছি কিন্তু কি করবো বলো, ঔ মেয়ে ছাড়া কেউ নিঃসার্থ ভাবে আমাদের মেয়েকে ভালোবাসা দিবে না। তুমি যেভাবে চেয়েছিলে ঠিক সেভাবে আমি ওর খেয়াল রাখার চেষ্টা করছি।অবহেলা করছি না। তবুও আমি অপরাধী। রোদ ঘৃণা করে আমাকে। ওতো আরো বেটার লাইফ ডিজার্ভ করে। যে ওকে নিঃসার্থভাবে ভালোবাসবে। কিন্তু আমি তো তোমার জায়গা কাউকে দিতে পারব না। কেন এমন হলো জান? কেন? ভালোবাসি জান। অনেক ভালোবাসি। রোদকে ভালোরাখার চেষ্টা করবো। লাভ ইউ।।।।
হ্যাঁ। এতোক্ষণ আদ্রিয়ান ওর প্রেরসির কবরের সামনে বসে ছিল। মৃত্যুর পূর্ব মূহুর্তে ওকে বাধ্য হয়ে ওয়াদা করতে হয়েছিল যাতে আদ্রিয়ান বিয়ে করে আর তাকে ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখে। কিন্তু আদ্রিয়ান তা পালন করতে পারেনি। কিন্তু রোদকে পাওয়ার পর থেকে ওর মনে ওকে হারিয়ে যাওয়ার ভয় পায় তাই তো ইয়াজকে সন্দেহ হওয়ার পর ওই দিন ই বাসায় রোদকে বিয়ের কথা বলে আর একদিনের মধ্যে রোদকে জোড় করে বিয়ে করে। যদিও রোদের মা বাবা কে মানাতে অনেক কষ্ট হয়েছে। তবুও নিজের ওয়াদা রেখেছে।
_______________________
এতক্ষন রোদ মিষ্টি আর জারবার সাথে ছিল। হঠাৎ করে ফোনের আওয়াজে ধ্যান ভাঙলো। দেখলো ওর বড় ভাই ফোন করেছে। জারবাকে বলে নিজের রুমে গেল। রিসিভ করতেই বিচলিত কন্ঠে ভাইয়া বললো,
— রোদ, কেমন আছিস? কই তুই? কেউ কিছু বলেছে ঐ খানে? আর তুই কেন বিয়ে করলি? আমাকে কল দিস নি কেন?
— আরে আরে এতো উত্তর একসাথে কিভাবে দিব?
— আচ্ছা আগে বল, আমার বনুটা ঠিক আছে তো?
— হু।
কান্না চেপে বললো রোদ। কারন ভাইটা তার বড্ড রাগী যদি শুনে রোদ ভালো নেই যেভাবেই হোক নিয়ে যাবে। কিন্তু এতে মিষ্টির সমস্যা হতে পারে তাই রোদ ভাইকে মিথ্যা বললো।
— আমি আজই বাসায় ব্যাক করছি। ঐ শালারে মাইরা তকতা বানাবো আমি।
— এই না না। ওনার দোষ নেই। আম্মু আব্বুর দোষ। ওনারা জোর করে এমন করেছে।
— কার দোষ বাসায় এসে দেখছি আমি।
— হু। বাই।
— খেয়াল রাখিস নিজের।
— হু।
বলে কল কেটে দিল রোদ। রোদের বড় ভাই রাদ। খুবই রাগচটা টাইপের। কাউকে মানে না কিন্তু বোন তার কলিজা। কাজের জন্য ঢাকার বাইরে ছিল এক সপ্তাহ। এর মধ্যে ই এসব হয়ে গেল। দীর্ঘ শাস ছাড়লো রোদ। ছোট ভাই রুদ্রর কথাও মনে পরছে খুব তাই কল দিল তার নাম্বারে। ও ছিল খালামনির বাসায়। রোদের খুব আদরের এই ভাই। কল দেওয়ার সাথে সাথেই রিসিভ করে বললো,
— হালো আপি। কই তুমি? তোমাকে নাকি বিয়ে দিয়ে দিয়েছে? বাসায় কেন নেই তুমি? ( কাঁদো কাঁদো গলায়)
এইবার রোদও কেদে দিল। ভাইটা ক্লাস ৮ এ পরে। খুবই দুষ্ট কন্তু আমাকে ছাড়া ওর চলে না। আবার প্রচুর জ্বালায়ও।
— হুম। আমি এসে যাব তাড়াতাড়ি। তুই কাদবি না কিন্তু। আমি ঠিক আছি।
— আমি কিছু জানি না। আসো তুমি।
— খেয়েছে আমার ভাইয়ুটা??
— উহু।
— হা।। এটা কোন কথা। না খেলে তো তর সিক্স পেক হবে না।
ফিক করে হেসে দিল রুদ্র।বললো,
— তুমি খেয়েছো??
— হু। প্লিজ সোনা খেয়ে নে না।
— আগে বলো আসবা।
— ঐ বাসায় আসবো না তো কি হয়েছে। তোর স্কুলে আসব কালকে দেখতে।
— প্রমিস!!!
— পাক্কা ওয়ালা প্রমিস। খেয়ে নে।
— আচ্ছা। লাভ ইউ।
— লাভ ইউ টু ভাইয়ু।
কল কেটে কান্নায় ভেঙে পরলো রোদ। ভাইটা তো ওকে ছাড়া কিছু বুঝে না। কেন মা বাবা এমন করলো।
এতক্ষণ দরজার দাড়িয়ে সব শুনেছে আদ্রিয়ান। ওর চোখে ও পানি চলে এলো। অপরাধবোধ যেন কয়েক হাজারগুন বেরে গেল।তবুও দরজা ঠেলে ভেতরে এলো। রোদের মুখমুখি দারালো।
মাথায় কারো স্পর্শ পেয়ে মাথা তুলে তাকালো রোদ। আদ্রিয়ানকে দেখে কেন যেন সব ভুলে আদ্রিয়ানের কোমর জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পরলো। আদ্রিয়ানের ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠলো। সারা শরীরে তড়িৎ প্রবাহের মতো হলো। রোদ আদ্রিয়ানের পেটে মুখ গুজে আছে আর কান্না করছে। আদ্রিয়ান ও মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে। ৫ মিনিটপর শান্ত হলো রোদ তবুও ফুপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। রোদ যেন আদ্রিয়ানকে দেখে ভুলেই গেছে যে ওর কান্নার কারন, এই অসহ্য যন্ত্রনা, আজকের এই দিনের জন্য আদ্রিয়ান ই তো দায়ী। হঠাৎ আদ্রিয়ানের গলা শুনে হুস ফিরলো রোদের।
— কেদো না রোদুপাখি। সব ঠিক হয়ে যাবে।
ব্যাস এতটুকু কথা শুনে ঝাটকা মেরে সোরে গেল রোদ। কী করেছে ভাবতেই যেন মেজাজ আরও বেশি খারাপ হয়ে গেল। ও কীভাবে এই লোককে জড়িয়ে ধরে ছিল।
আকস্মিক ঘটনায় আহত চোখে তাকালো আদ্রিয়ান।
এই চাহনি যেন রোদের ভিতরও জ্বালিয়ে দিচ্ছে। দৌড়ে ওয়াসরুমে ডুকে গেল।
আদ্রিয়ান ও ধপ করে বসে পরলো বিছানায়। একটা হাসিখুশি মেয়ের জীবন নিজের স্বার্থে দুঃখ ভরপুর করে দিল। রোদ কী কখনো ওকে মাফ করবে।
ঐ মুহূর্তে ফোন এলো রোদের বাবার। নিজেকে সামলে রিসিভ করলো ফোন।
— আসসালামু আলাইকুম বাবা। কেমন আছেন?
— ওয়ালাইকুম আসসালামু। ভালো।তুমি কেমন আছ?
— আলহামদুলিল্লাহ বাবা ভালো।
— আমার পাগলিটা কেমন আছে বাবা?? ওর মা আর ফোন দিচ্ছি ধরছে না। রাগ করে আছে। ওর মা তো রাত থেকেই কান্না করে যাচ্ছে।
— ও ভালো আছে বাবা। কিন্তু কান্না কাটি করছে বারবার। আমি সব ঠিক করে দিব। চিন্তা করবেন না।
— তোমার ভরসায় মেয়ে দিয়ছি বাবা। দেখে রেখ বাবা। জানইতো কতটা অবুঝ।
— জী বাবা।
এরপর রোদের মায়ের সাথেও টুকটাক কথা বলে শান্তনা দেয় আদ্রিয়ান। কল রাখতেই বেরিয়ে আসে রোদ। চোখমুখ লাল হয়ে ফুলে আছে।
আদ্রিয়ান ধরে এনে বিছানার বসায়। টাওয়ার এনে মুখ মুছিয়ে দেয়। রোদের ও অনেক দূর্বল লাগছে। কান্নার কারনে মাথা ব্যাথা করছে তাই আর কিছু বললো না। আদ্রিয়ান তাওয়াল রেখে জিজ্ঞেস করলো,
— মা কল দিচ্ছিলো। রিসিভ করোনি কেন? কষ্ট পাচ্ছেন তারা।
— আমি ও কষ্ট পাচ্ছি। তারা কি তা ভেবেছে।
বলতেই চোখ দিয়ে টুপ করে কয়েক ফোটা পানি পরলো যা আদ্রিয়ান যত্ন করে মুছে দিল।বললো,
— খুব তাড়াতাড়ি জানতে পারবে। কাল থেকে তো মেডিকেল অন সো কালকে যেতে হবে।
— আপনি না বললেও যাব। ( ভেংচি কেটে)
মুচকি হাসি দিল আদ্রিয়ান। ড্রেসিং টেবিল থেকে চিরুনি এনে বিছানার রোদের পছনে বসলো। খোপার কাটা টা টান দিয়ে খুলে দিল। ঝরঝর করে সব চুল কোমরে ছরিয়ে গেল। চমকে যেয়ে রোদ বললো,
— আরে কী করছেন?
— কাল থেকে ভালোমতো আচরাও নি।
বলতে বলতে জট ছাড়াতে লাগলো। রোদ মন খারাপ করে বললো,
— আম্মুই আমার চুলের যত্ন নেয়। আমি এতো বড় চুল সামলাতে পারি না ঠিকমতো।
আদ্রিয়ান সুন্দর করে বেধে দিয়ে বললো,
— এখন থেকে দায়িত্ব নাহয় আমি নিলাম।
বলে নেমে টিশার্ট আর টাউজার নিয়ে ওয়াসরুমে গেল।আদ্রিয়ানের হাটুর দিকে মাটি ছিল। রোদের জানতে মন চাইল কীভাবে মাটি লাগলো? ব্যাথা পেয়েছি কি? কিন্তু জরতার কারনে আর জানা হলো না।
#চলবে……..
#ভালোবাসার_ভিন্ন_রুপ
#সাইয়্যারা_খান
#পর্বঃ১৪
আদ্রিয়ান রুমে বসে লেপটপে কিছু কাজ করছে। আজ আর বের হয় নি। রোদকে একা রেখে যেতে মন সায় নি। মিষ্টি কে গোসল করাতে রোদ ওকে রুমে নিয়ে এলো। মিষ্টি রুমে ডুকে আদ্রিয়ানের গলা জরিয়ে ধরে বসে রইল। রোদ রুমে ডুকে আদ্রিয়ানকে এক পলক দেখে মিষ্টি কে বললো,
— আম্মু আসো গোসল করবা।
— হু।
বলে মিষ্ট আদ্রিয়ানের গলা ছেরে রোদের কাছে আসল। রোদ ওকে কোলে তুলে ওয়াসরুমে নিয়ে গোসল করিয়ে দিতে লাগল। টাওয়াল পেচিয়ে কোলে তুলে নিয়ে রুমে এলো। মিষ্টিকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে রাখা টুলে দাড় করিয়ে আন্য টাওয়ার দিয়ে চুল মুছিয়ে দিল। সুন্দর করে ড্রেস পরিয়ে লোশন লাগিয়ে দিল। টাওয়ার বারান্দায় মেলে দিয়ে রুমে ডুকে দেখে বাবা পাগলী মেয়ে আবার ও আদ্রিয়ানের কোলে। আর আদ্রিয়ান লেপটপে কাজ করছে এবং মিষ্টি কে ও আদর করছে। রোদ ওর ফোন টা নিয়ে বেলকনিতে গেল। আড় চোখে তা আদ্রিয়ান দেখলো।
একটা নাম্বারে বার বার রোদ কল করছে কিন্তু ফোন অফ। মনটা খারাপ হয়ে গেল। হঠাৎ ঐ নাম্বার থেকে কল ব্যাক করায় হাসি ফুটল রোদের মুখে। রিসিভ করে বললো,
— হালো। কই তুই? কাল থেকে কল দিচ্ছি। অফ কেন? কবে আসবি? জানস কী হয়েছে? ( কান্না জরিত কন্ঠে বললো)
— কি হয়েছে?
স্বাভাবিক ভাবেই বললো অপর পাশে থাকা ইয়াজ।
— আমাকে জোর করে করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে।
— যাক ভালো তো। তুই জামাই রেখে আমাকে কেন কল দিলি??
— শয়তান, বান্দর, ইন্দুর, তেলাপোকা, বিলাই। তুই এতো ইজিলি কিভাবে বললি। জানস কার সাথে বিয়ে দিসে?
— কার?
— আদ্রিয়ান ভাইয়া। মিষ্টির বাবাই।
— যা বাবা নিজের মেয়ের বাবাকে বিয়ে করলি। তো কান্দস কেন বুঝলাম না।
— মানে??? আমি কাদব না কেন??
— দেখ বইন, মানুষের আগে বিয়ে পরে বাচ্চা। আর তোর আগে বাচ্চা পরে বিয়ে। এর মধ্যে বাচ্চা পাইলি একদম ফ্রী। আর কি চাই?
— তুই এগুলা কি বলছিস? (কন্না করে)
— আচ্ছা তুই তোর মেয়ের বাবাকে বিয়ে করবি এটাই তো স্বাভাবিক নাকি???
— তুই কথা বলবি না আমার সাথে। তুই ও আম্মু আব্বুর দলে বুঝেছি আমি।
বলে ফোন কেটে দিল রোদ। এখন আবার ও কান্না পাচ্ছে। এক ঘন্টা কাদতে পারলে হয়তো ভালো লাগল। ইয়াজ কে পেলে আজকে রোদ জুঠাপানি খাওয়াতো। ভাবতে ভাবতে পেছনে ফিরে দেখে আদ্রিয়ান দাড়ানো। সাইড কেটে ভিতরে যেতে নিলে আদ্রিয়ান আটকালো। দেখল আবার ও কেদে চোখ লাল করে গাল ফুলে রেখেছে।
মেয়েটা ছোট একটা কওউটের ডিব্বা। একটু কাদলেই নাক মুখ লাল হয়ে যায়। এইযে ফোলা ফোলা গাল লাল হয়ে আছে আদ্রিয়ান তো মন চাচ্ছে গাল ধরে টেনে দিতে। কিন্তু পারছে না। আদ্রিয়ান বললো,
— কে ফোন দিয়েছিল?
…………
— কি হলো বলো????
— আপনাকে কেন বলবো?
— কজ আই এম ইওর হাসবেন্ড।
— মানি না আমি।
— মেজাজ খারাপ করবা না একদম। ছোট ছোটর মতো থাকবা। যার তার সাথে কথা বলবা না।
— ও যার তার না। আর আমি একশোবার কথা বলবো।
আর কিছু বলার আগেই খেল এক ধমক। কেপে উঠে চুপ হয়ে গেল রোদ। আবার কেদে দিল। আদ্রিয়ান নিজের রাগ দমন করে নরম সুরে বললো,
— কান্না করে না। মাথা ব্যাথা করবে।
রোদ কান্না করেই যাচ্ছে। আদ্রিয়ান বাহু ধরে টেনে নিজের বুকে টেনে নিল। রোদ ও বুকে মুখ গুজে কাদল ৫ মিনিট। এরপর শান্ত হলো। শান্ত হওয়ায় আদ্রিয়ান মাথা তুলে বললো,
— বিশ্বাস রাখ। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার কিছু কথা শুনো। এতো কান্না করো না।
বলে রোদের রোদের হাত ধরে রুমে আনল। রোদ নিকের ড্রেস নিয়ে সাওয়ার নিতে গেল।আদ্রিয়ান মুচকি হাসি দিল। মেয়েটা একদম বাচ্চা। আদ্রিয়ান কিছু বললেই কেদে দিবে। আবার আদ্রিয়ানের বুকে অথবা পেটে মুখ গুজে কাদবে।
রোদ একটুপর বেরিয়ে এলো। পরনে হাটু সমান গোল কুরতি আর প্লাজু। সদ্য গোসল করায় কেমন সিগ্ধ লাগছে। গলায় বিন্দু বিন্দু পানির ছিটা। চুলে টাওয়ার পেচানো। একদম পবিত্র লাগছে। আদ্রিয়ান একধ্যানে দেখে যাচ্ছে পবিত্র পরীটাকে। আদ্রিয়ান খেয়াল করেছে রোদ কখনো থ্রিপিছ পরে না। সবসময় কুরতি, ফ্রক, গাউন আর রাতে টিশার্ট পরবে। কিন্তু বাইরে বেশির ভাগ সময়ই বোরকা পরে যায় যা আদ্রিয়ানের অনেক ভালো লাগে। রোদ বারান্দায় গেল চুল মুছতে, আদ্রিয়ানও সাওয়ার নিতে গেল। বের হয়ে দেখলো রোদ নামাজ পরছে। নিজেও মসজিদে রওনা দিল।
নামাজ পরে বেস শান্তি লাগছে রোদের মনে। হিজাব খুলে ভালোমতো চুল শুকিয়ে বেধে নিল। ওরনা মাথায় জরিয়ে নিল। একটুপর জারবা এসে নিচে যেতে বললো।রোদ ও ওর সাথে গেল। ডাইনিং টেবিলে বসা রোদ, মিষ্টি, আদ্রিয়ান, জারবা আর ওর মা। রোদ মিষ্টিকে খাওয়াতে ব্যাস্ত। আদ্রিয়ানের মা বললো,
— জানিস রোদ তোর মেয়ে কারো কাছেই ঠিক মতো খেতে খেতে চায় না। কিন্তু মায়ের হাতে ঠিক খাচ্ছে।
রোদ উত্তরে মুচকি হাসছে। জারবা আর ওর মা খাচ্ছে কিন্তু আদ্রিয়ান খাচ্ছে না। রোদের জন্য বসে আছে। জারবা বললো,
— ভাবী জানো কালকে বড় ভাইয়া আর ভাবী আসবে।
— কার বড় ভাইয়া? ( জিজ্ঞাসু চোখে)
— ওমা তুমি জানো জান না?? আমাদের আম্মাজান আর আব্বাজান দুই পুত্র সন্তানের অধিকারী।
ওর কথা শুনে রোদ হেসে দিল ফিক করে। আদ্রিয়ান আজ পুরো ২ দিন পর মেয়েটাকে হাসতে দেখলো। জারবার মাথায় গাট্টি মেরে বললো,
— ওর কথা বাদ দাও। আমার বড় ভাই আরিয়ান আর ভাবী সাবা আর ওনাদের ছেলে আলিফ কাল আমেরিকা থেকে আসছে। কাজের জন্য গিয়েছিল।
কথার মধ্যে জারবা সুন্দর করে বা হাত ডুকিয়ে বললো,
— জান ভাবী আমি এতো বললাম যে বড় ভাইয়া এলে বিয়ে করো কিন্তু না ছোট ভাইয়া বলে তোমাকে ছাড়া একদিন ও থাকতে পারবে না।
কথাটা শুনে রোদ লজ্জায় লাল, নীল, হলুদ সব হয়ে গেল। এই মেয়ের মুখে কিছু আটকায় না। আদ্রিয়ান এবার জারবাকে দিল এক ধমক। ধমক খেয়ে বেচারি চুপচাপ খেয়ে নিজের রুমে গেল। আদ্রিয়ানের মাও ওর ফুপির ফোন আসায় কথা বলতে লাগলো সোফায় বসে। মিষ্টির খাওয়া শেষ হওয়ায় রোদ হাত ধুয়ে ফললো। উঠে যেতে নিতে আদ্রিয়ান হাত ধরে আটকিয়ে বললো,
— কোথায় যাচ্ছ?? ( ভ্রু কুচকে)
— রুমে। কেন?
— মানে কি। খাবে কে শুনি?
— ক্ষুধা নেই। খাব না।
— মার খেলেই ক্ষুধা লাগবে। দিব?
— সত্যি ভালো লাগছে না।
আদ্রিয়ান দেখলো সত্যি চোখমুখ শুকিয়ে আছে। হাত ধরে পাশে বসিয়ে দিল। প্লেটে খাবার নিয়ে মাখিয়ে রোদের মুখের সামনে ধরলো।রোদ অসহায় মুখে তাকালে আদ্রিয়ান ইশারায় খেতে বললো।অগত্যা রোদ মুখে নিয়ে খেতে লাগল। রোদকে খায়িয়ে নিজেও খেয়ে নিল।
__________________________
রাতে আজ মিষ্টি কে নিজের রুমে নিয়ে এসেছে রোদ। যদিও ওর শাশুড়ী না করেছিল পরে রাজি হয়েছে। ঘরে ড্রিম লাইট জ্বলছে। আদ্রিয়ান কাউচে বসে কিছু কাজ করছে। মিষ্টি এটা ওটা বলছে আর রোদ হেসে হেসে জবাব দিচ্ছে। একসময় ঘুমিয়ে গেল মিষ্টি। রোদ কতক্ষণ এদিক ওদিক করলো না ঘুম আসছে না। আবার ফোন টিপলো তাও ছাই ভালো লাগছে না। আদ্রিয়ান অনেকক্ষন যাবত খেয়াল করলেও কিছু বললো না। এবার রোদের কান্না আসছে। মাকে ছাড়া কখনো একদিন না থাকা মেয়ে কীভাবে থাকছে ওই জানে। সব কাজিনরা নানা বাসায় ঘুরতে গেলেও রোদ মাকে ছাড়া যেত না। মা ওর চাই চাই। ছোট ভাইএর কথা মনে পরছে। বুক চিরে কান্না আসছে। আটতে পারছে না। না পেরে কেদে দিল রোদ।
আচমকা কান্নার আওয়াজে ভয় পেয়ে যায় আদ্রিয়ান। তাড়াতাড়ি লাইট জ্বালিয়ে দেখে রোদ বালিসে মুখ গুজে কাদছে। তারাতাড়ি রোদকে ডাক দেয়।
— রোদ, এই রোদ । কি হয়েছে সোনা?
কান্না করেই যাচ্ছে। ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি উঠিয়ে বসায় ওকে। নাক মুখ ফুলে গেছে। বারবার বলছে কি হয়েছে। রোদ কান্নার কারনে কথা বলতে পারছে না। আদ্রিয়ান ওকে বুকে চেপে ধরে কান্না থামানোর চেষ্টা করছে কিন্তু ন থামছে না।
অনেক কষ্টে বললো,
— আম্মু যাব।
রোদের এই বাচ্চামো কথায় হাসবে না কাদবে বুঝতে পারলো না আদ্রিয়ান। তবুও রোদের মায়ের বলা কথা মনে পরলো। ওর মা বলেছিল রোদ নাকি মাকে ছাড়া থাকতে পারে না।
কালকে রাগ করে থাকলেও আজকে মাকে ছাড়া চলবে না রোদের।
আদ্রিয়ান বললো,
— আচ্ছা এখন তো রাত কালকে নিয়ে যাব।
— না না আম্মু যাব। এখন ই যাব। আম্মুউউউ…
বলে জোড়ে কেদে দিল রোদ। আদ্রিয়ান পরলো মহা ঝামেলায়। এতো পুরাই বাচ্চা মেয়ে। বুকে চেপে ধরলো রোদকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। না কাজ হচ্ছে না। অনেক বুঝালো তাও কাজ হচ্ছে না৷ রোদের এবার হিচকি উঠে যাচ্ছে। বারবার বলছে,
— আম্মু যাব, আম্মু যাব। আম্মু এনে দিন।
রোদের কান্নার আওয়াজে মিষ্টি নোরেচোরে উঠল। রোদের ও অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আদ্রিয়ান থামাতে পারছে না। এবার যেন রোদের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বড় বড় দম ফেলছে। আদ্রিয়ান জলছি ওকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
— রোদ রোদ। এই এই দেখ এই যে…. আমার দিকে তাকাও। এমন করে না দেখি…. প্লিজ সোনা শুনো আমি নিয়ে যাব তো… আল্লাহ রোদ দেখি দেখি তাকাও।
অস্থির হয়ে বারবার বলছে আদ্রিয়ান।
রোদের কান্নার আওয়াজে মিষ্টি এবার উঠে গেল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে রোদকে কান্না করতে দেখে মিষ্টি ভয় পেয়ে নিজেও কেদে দিল। রোদের ও হুস নেই। আদ্রিয়ান পরলো মহা ঝামেলায়। তারাতাড়ি জারবাকে ফোন দিয়ে রুমে আসতে বললো।
এতো রাতে ভাইয়ের ফোন পেয়ে তাড়াতাড়ি দৌড়ে রুমে এ অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে যায় জারবা।
— ক.. কি হয়েছে ভাইয়া? ভাবীর কি হয়েছে আর মিষ্টির কি হয়েছে??
— কিছু না ভয় পেয়েছে মিষ্টি। ওকে তর রুমে নিয়ে ঘুম পারিয়ে দে।
— কিন্তু ভাবী??
— যা বলছি কর।
আদ্রিয়ান এক বাহু থেকে মিষ্টিকে ছাড়িয়ে কোলে তুলে নিল জারবা। আরেক বাহুতে রোদকে আটকানো। জারবা নিজের রুমে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করায় ঘুমিয়ে গেল মিষ্টি।
এদিকে রোদের অবস্থা বেগতিক। হঠাৎ কেমন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। আদ্রিয়ান এবার প্রচন্ড ভয় পেয়ে যায়। রোদ আদ্রিয়ান বাহুতে আটকা পরে আছে। আদ্রিয়ান অস্থির গলায় ডাকছে,
— রো.. রোদ,,,নো নো নো রোদ ডোন্ট ডোন্ট… শুনো…… এই,,,,,এই তাকাও।।।। এখনই নিয়ে যাব তোমার আম্মুর আছে।।।। প্লিজ সোনা তাকাও। আমি কিছু বলবোনা আর….
রোদের কোন সারাশব্দ নেই। অচেতন রোদ পরে আছে আদ্রিয়ান বুকে। কোন কান্নার আওয়াজ আসছে না। আদ্রিয়ান এবার জান যায় যায় অবস্থা। নিজের কাছেই নিজেকে ঘৃনা লাগছে। কীভাবে এতোটুকু একটা মেয়েকে ও এভাবে কষ্ট দিতে পারলো।।।।
রোদকে বিছানায় শুয়িয়ে মুখে পানির ঝাপটা দিচ্ছে বারবার। চোখ খুলছে না রোদ। আদ্রিয়ান এবার কেদেই দিবে এমন অবস্থা। অনেকক্ষণ পর চোখ খুলে পিটপিট করে তাকালো রোদ তা দেখে তারাতাড়ি ওকে বুকে চেপে ধরলো আদ্রিয়ান। জানটা এবার শান্তি পাচ্ছে এতক্ষণ গলায় আটকে ছিল। রোদকে ওভাবেই কোলে তুলে নিল…….
#চলবে……