#ভালোবাসার স্নিগ্ধতায় তুমি
#পর্বঃ১৩
#লেখকঃআয়ান_আহম্মেদ_শুভ
* হঠাৎ মেয়েটি অধরাকে অবাক করে দিয়ে চিৎকার করে অধরাকে জড়িয়ে ধরে। অধরা একটু অবাক হয়ে যায় মেয়েটির এমন অদ্ভূত আচরণে। তবে এই মেয়েটির গলার কন্ঠটা অধরার বেশ চেনা। মেয়েটি অধরার গলা জড়িয়ে ধরে বলল
— অধরা কেমন আছিস তুই? উফফফফফ! কত বছর পরে দেখা আমাদের। তুই কেমন শুকিয়ে গেছিস। তোর সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি ব্যস্ততার জন্য। সরি। আর তোর বিয়েতেও আসতে পারিনি। প্লিজ রাগ করিস না। একটু আগেই ফ্লাইট থেকে নেমেছি। বল তোর কি অবস্থা?
অধরা এই বার খুব বুঝতে পারছে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি হলো রোজ। রোজ হলো তার খুব কাছের বন্ধু। যদিও রোজ অনেক বছর আগেই চলে যায় লন্ডনে পড়াশোনার জন্য। তাই তাদের তেমন একটা যোগাযোগ ছিলো না। অধরা রোজকে অনেক বছর পরে নিজের সামনে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়। ছলছল চোখে অধরা রোজকে জড়িয়ে ধরে বলে
— এতো বছর পরে আমার কথা মনে পরলো তোর? সব গুলো স্বার্থপর হয়েছিস। একদম আমায় ভূলে গেছিস তোরা।
— আহা অভিমান করেছিস বুঝি? আচ্ছা চলে এসেছি তো একেবারে। এখন তো খুশি? আর যাবো না কোথাও। নিজের দেশে ভাবছি বিজনেস শুরু করবো।
— ওয়াও গ্রেট আইডিয়া। এটাই ভালো হবে।
— হুম। আচ্ছা এসব ছাড় আমাদের জামাইবাবু কোথায়? দেখছি না তো তাকে? কোথায় গেলো? ভয় পেয়ে পালিয়ে গেলো নাকি?
— আরে বাদ দে এই সব তার সাথে এখন আর আমি থাকি না।
— মানে? কি বলছিস? কি হয়েছে?
— হুম সময় হোক অন্যদিন বলবো।
— আরে না। আজকেই শুনবো।
— নারে আমার কিছু কাজ আছে।
— নো কাজ। আমার সাথে আমার বাড়ি চলে তারপর কথা বলবো সারা দিন সারা রাত। তারপর যেখানে খুশি চলে যাস।
রোজা অধরাকে বেশ ফোর্স করে নিয়ে যায় নিজের সাথে। অধরা যেতে না চাইলেও রোজার জেদের কাছে হার মেনে চলে যেতে বাধ্য হয়। অধরা যেতে যেতে রোজাকে সবটা খুলে বলল। অধরা রোজার সাথে অয়নের সব কিছু শেয়ার করে। রোজা সব কিছু শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এর থেকে বেশি বা কি করার আছে তার? অধরা রোজার সাথে রোজার বাড়িতে চলে যায়।
* অয়ন নিজের রুমে বসে আছে নিশ্চুপ হয়ে। বার বার অধরার কথা মনে পরছে তার। অধরার বলা কথা গুলো খুব আঘাত করেছে তার বুকের বাম পাশে। অয়ন অধরার কথা ভাবছে এমন সময় তার রুমে আসে অয়নের বোন। অয়নের রুমে তার বোন এসে অয়নকে চিহ্নিত দেখে মৃদু কন্ঠে বলল
— কিরে ভাইয়া এভাবে বসে আছি যে! কি হয়েছে?
অনুর কথায় অয়নের ঘোর কাটে। অয়ন মুখের উপর থেকে হাতটা সরিয়ে অনুর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে জবাব দেয়
— নারে কিছু হয়নি। হঠাৎ আমার রুমে আসলি! কি হয়েছে? কোনো কিছুর দরকার?
অনু অয়নের পাশে এসে বসে পরলো। অয়নকে উদ্দেশ্য করে অনু বেশ শক্ত গলায় বলল
— আমার কি তোর রুমে আসতে কোনো কারন লাগবে? কারন ছাড়া কি নিজের ভাই এর রুমে আসা যায় না?
— নারে পাগলি তা কখন বললাম? আচ্ছা তুই বস আমি একটু আসছি।
কথাটা শেষ করতেই অয়ন অনুর পাশ থেকে উঠে দাঁড়ালো। অনু অয়নকে উদ্দেশ্য করে বাঁকা হেঁসে বলল
— চোখের জল আড়াল করতে বুঝি আমার থেকে পালিয়ে যাচ্ছিস? কি লাভ হবে ভাইয়া? একটিবার অধরা ভাবীকে সবটা খুলে বললে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেতো?
অনুর কথা শুনে অয়ন একটু চমকে যায়। “অনু কি তবে সব সত্যিটা জেনে ফেলেছে? যদি নাই অনু সবটা না জানে তবে সবটা খুলে বলার কথা বলল কেনো”? অয়ন অবাক দৃষ্টিতে অনুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন সূচক কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলো
— মানে? কি খুলে বলবো?
— ভাইয়া আর কত নাটক করবি? আমি ইরা আপুর থেকে সবকিছু জেনে নিয়েছি।
— ওয়াট? কি জেনে এসেছিস?
— হুম, আমি জেনে এসেছি ইরা আপুর অবৈধ সম্পর্কের ব্যাপারে। আর জেনে এসেছি তা সবার থেকে লুকিয়ে সমাধান করা লোকটার ব্যপারে। ভাইয়া একজনের সাহায্য করতে, কাউকে দেয়া কথা রাখার জন্য নিজের সংসারটা ধ্বংস হতে দিলি কি করে? একটিবার অধরা ভাবীকে সব সত্যি বললে এমনটা হতো না। অধরা ভাবী সব কিছু বুঝতো।
অনুর কথা শেষ হতেই অয়ন শব্দ করে হেসে উঠলো। অয়নের হাসি তার মনের মধ্যে আনন্দের জানান দিচ্ছে না। অয়নের হাসির জানান দিচ্ছে তার মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ক্ষোভের। হ্যাঁ এক রাস ক্ষোভ। অনু অয়নের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
— হাহাহাহাহা। তুই বড্ড ছোট রে বোন। অতসব বুঝবি না তুই।
— ভাইয়া এমন করে হাসছিস কেনো? তুই সবটা বললে এটা হতো না। আর আমার চোখে সব দোষ তোর। এখনও আমার মনে হচ্ছে তুই অধরা ভাবীকে…….
— শার্ট আপ অনু। যাস্ট শাট আপ। আমি অধরাকে ভালোবাসি না! এটাই তো বলবি? ভালোবাসলে সব কিছু বলতাম। ভালোবাসি না বলে কিছু বলি নাই! এটাই বলবি? আরে শোন অধরাকে সবটা বললে ইরার জন্য ওর মনের মধ্যে ঘৃণা তৈরি হতো। ইরার সত্যিটা শুধু মাত্র আমি জানতাম। আর ইরা চাইতো না এটা অন্য কেউ জানতে পারুক। তাই আমি কাউকে কিছু বলিনি। আর বাকি রইলো ভালোবাসার! সব কিছু জানার পরেও আমি অধরাকে ভালোবেসে গেছি। একটিবারের জন্যও অধরাকে বুঝতে দেইনি যে আমি অনেক কিছু জানি। যেটা আমার জানার কথা নয়। সব কিছু জানার পরেও তো আমি ওকে ছেড়ে দেই নাই। তবে ও কেনো আমায় বিশ্বাস করে আমার সাথে থাকলো না? কেনো ছেড়ে দিলো? ভালোবাসা! কতটা ভালোবাসা তোর ভাবী আমায় দিয়েছে আর আমায় বাসে তা আমার খুব ভালো করে জানা আছে। এসব নিয়ে কাঁদা ছোড়াছুড়ি করার কোনো মানে হয় না। এখন তুই আমার রুম থেকে যেতে পারিস। আর শোন আমার কোনো ব্যাপার নিয়ে তোর কিউরেসেটি থাকা আবশ্যক না।
* অয়নের কথা শুনে অনু আকাশ থেকে পরলো মনে হচ্ছে। “অধরার ব্যাপারে সব কিছু জানার পরে মানে? অধরা ভাবীর কি এমন সত্য আছে? যা ভাইয়ার জানার কথা নয়? তবে কি অধরা ভাবীর ভালোবাসায় পাপ আছে? অধরা ভাবী কি ভাইয়াকে ঠকিয়েছে? অয়ন ভাইয়ার কথার মানে কি? না না আমি কিছু ভাবতে পারছি না আর”। অনু আপন মনে কথা গুলো ভাবছে। অয়ন দ্বিতীয় বারের মতো চিৎকার করে অনুকে তার রুম ত্যাগ করতে বলতেই অনু চুপটি করে অয়নের রুম থেকে বেরিয়ে চলে যায়। অনু চলে যেতেই অয়ন নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়। অয়ন দরজা বন্ধ করে ফ্রিজ থেকে ড্রিংক্সটা ফেরত করে রেডি করে খাওয়া শুরু করে। অয়ন ড্রিংক করছে আর ভাবছে “মুখ ফসকে একি বলে ফেললাম? অনু চুপ করে থাকার মেয়ে না। আমার বোন আমি খুব ভালো করে জানি ও এই বিষয়টা নিয়ে এখন খবর নিবে। উফফফফ গড! একি করলাম আমি? কেনো বললাম কথাটা! মাথাটা ফেটে যাবে আমার” কথা গুলো ভাবতেই হঠাৎ অয়নের ফোনে একটা কল চলে আসে। অয়ন ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে ইরা কল করেছে। অয়ন ফোনটা পিক করতেই ইরা বলতে লাগলো
— হ্যালো অয়ন একটা গুড নিউজ আছে।
— হুম বলো কি খবর?
— আমার আমেরিকা যাবার ভিসা কম্পিলিট হয়ে গেছে। আমি আর দুদিন পরে চলে যাবো আমেরিকায়।
— ওহ, ইরফান কোনো কল করেছে?
— না।
— আচ্ছা ঠিক আছে। সাবধানে যেও আর শোনো কোনো প্রকার সাহায্য লাগলে বলো আমায়।
— তুমি না থাকলে আমার এতো দূর এগোনো সম্ভব হতো না। তুমি না থাকলে ইরা সেই কবেই হারিয়ে যেতো। ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না তোমায়। শুধু এতোটুকুই বলবো কৃতজ্ঞ থাকবো সারা জীবন।
— আরে ধূর পাগলি। আমার জায়গায় তুমি থাকলে হয়তো এটাই করতে।
— হুম। অধরা আপুর সাথে আর কোনো কথা বা দেখা হয়েছে?
— হুম হয়েছে।
* অয়ন ইরার কাছে আজকের ঘটনাটা খুলে বলল। ইরা অয়নকে কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলো না। কারন ইরা জানে অধরার চলে যাবার পিছনে আর অয়নের সংসার নষ্ট করার পিছনে তার অবদান সব চেয়ে বেশি। সে দিন যদি অয়ন তাকে না বাঁচাতো আর সে অয়নকে সব কিছু না বলতো তবে এমন কিছু হতো না। আরো কিছু সময় কথা বলার পরে অয়ন ফোনটা রেখে দিলো।
— অধরা চুপ করে বসে আছিস কেনো? খাবার মুখে দে। নিজের জন্য না হলেও তোর অনাগত সন্তানের কথা ভেবে কিছু মুখে তুল না প্লিজ!
রোজার কথা শেষ হতেই অধরা চোখের জল মুছে হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে খাবার মুখে তুললো। অয়নের কথা বেশ মনে পরছে তার। মন চাইছে একটিবার অয়নের কথা বিশ্বাস করতে। কিন্তু তার উপায় নেই। অয়নের আচরণ গুলো তার দিকে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করছে তাকে। অধরা খাবার শেষ করে খাবার টেবিল থেকে উঠে যায়। আচমকা বাড়ির কনিং বেলটা বেশ শব্দ করে বেজে উঠলো। অধরা দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলতেই দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে দেখে বেশ অবাক হয়ে যায়। অধরা দরজার ওপারে দেখতে পেলো…………………………….
#চলবে…………………………