#ভালোবাসা_একটা_বাজি(২২) (অন্তিম পাতা)
আকাশে সিঁদুরের মতো আভা ক্রমেই বাড়ছে। থালার মতো সূর্যটা তার মিষ্টি মোলায়েম রোদ ছড়িয়ে জানান দিচ্ছে কোন এক নতুন সকালের। সিনহা এসে দেখে আরাফা নিশ্চিন্তে শিশুর মতো ঘুমাচ্ছে। সিনহা হেসে জানালার পর্দাটা সরিয়ে দেয়। একফালি মিষ্টি রোদ কাঁচের জানালা ভেদ করে এসে পড়ে আরাফার উপর। মুখের উপর রোদ পড়তেই কপাল কুঁচকে ফেলে সে। দুই হাত দিয়ে রোদ আড়াল করে চেঁচিয়ে বলে-
-” সিনহার বাচ্চা জানালা খুললি কেন? তোরে এই মহৎ কর্ম কে দিয়েছে?
সিনহা হেসে আরাফার সামনে বসে বলে-
-” দুলাভাই দিয়েছে। মানে আরিয়ান ভাইয়া দিয়েছে এই মহৎ কাজ।
-” কেন ঐ আরিয়াইন্নার আবার কি হয়েছে? আমার ঘুমের মধ্যে বা হাত দেয় কেন।
সিনহা হো হো করে হেঁসে উঠল। আরাফার গা জ্বলে যাচ্ছে। সকালে ঘুম ভাঙিয়ে তামাশা শুরু করেছে। সিনহা হাসি থামিয়ে বলে-
-” “তুম ক্যায়া খুশিকে মা’রে পাগাল হো গ্যায়ে হো”?
আরাফা সিনহার দিকে বালিশ ছুঁড়ে মে:রে বলে –
-” আমি পা’গল হতে যাবো কোন দুঃখ তে তুই পা’গল আর তোর ঐ সো কল্ড জিজু আরিয়ান আরেকটা পা’গল। উপস্ সরি সে হচ্ছে তোদের লিডার।
-“ আপুই তুই থামবি। আজ তোর বিয়ে আ তুই পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস! সিরিয়াসলি?
সিনহার কথায় আরাফার টনক নড়ে। বিছানা থেকে এক লাফে নামে সে। সিনহাকে বলে-
-” আরে তুই আমাকে আগে বলবি না? হায়হায় লেইট হয়ে গেল তো। সবসময় আমি এমনভাবে কেন যে ভুলে যাই।
-” আর কয়দিন পরে ভুলে যাবা জামাইকেও।
পেছনে থেকে উচ্চস্বরে হাসির আওয়াজ আসে। আরাফা ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখে আনিকা আর মিহি দাঁড়িয়ে আছে। আরাফা মাথা নিচু করে বলে-
-” আসলে তা নয়, মানে।
আনিকা আর মিহি আরাফা কে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলে-
-” কোন মানে নয় বুঝলে। আর সিনহা তুমিও এসে তাড়াতাড়ি নাহালে তোমাকে কোলে করে নেয়ার ব্যবস্থা করছি!
সিনহাও ওদের পিছু পিছু আসে। ঐদিন সবাই সবাইকে মাফ করে দিয়েছিলো। পুরোনো প্রতি’শোধের নে’শা, ভুল বোঝাবুঝি সবকিছুর অবশান ঘটেছে। অনিক আর রাইয়ান তো আরিয়ানের জানের দোস্ত হয়ে গেছে আগের মতো। এতে শিহাব আর সুহাস খোঁচা মে’রে কথা বললেও দিনশেষে ওরা একসাথে সবাই থাকে। তবে সিনহা কে সৈকত সাহেব মেনে নিতে পারে নি আজও। সিনহার এতে আর মন খারাপ লাগে না অভ্যাস হয়ে গেছে। এই ভেবে আশায় থাকে, হয়তো কোন একদিন তার বাবা তাকে মেনে নেবে।
___________________
লাল লেহেঙ্গা পড়ে টুকটুকে বউ সেজে বসে আছে আরাফা। ব্রাইডেল লুকে একদম অসাধারণ লাগছে আরাফাকে। অন্যরাও সাজতে ব্যস্ত। তখন শায়লা রহমান আসেন। আরিয়ান যেই বাড়িতে একলা থাকতো, সেখানেই বিয়ে হচ্ছে। শায়লা রহমান দরজায় নক করেন। দরজা খুলে মিহি। শায়লা রহমান ভেতরে ঢুকে আরাফা কে দেখে বলে-
-” মাশাআল্লাহ। তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে আরাফা।
আরাফা শ্বাশুড়ির কথায় লজ্জা পায়। শায়লা রহমান কতগুলো গহনা বের করে হেসে বলে –
-” হয়েছে লজ্জায় লাল হতে হবেনা। তোমার জন্য এই গহনাগুলো।
আরাফা অবাক হয়ে বলে-
-” এত গহনা দিয়ে আমি কি করবো?
-” এগুলো তোমারই। এই গহনাগুলো আরিয়ানের দাদি আমাকে দিয়েছিল আর আজ আমি তোমাকে দিলাম।
আরাফা মিষ্টি হেসে বলে –
-” মা এগুলো এখন আপনার কাছেই রাখুন। অন্য একদিন না হয় নেবো। আপনি যতদিন আছেন আপনার কাছেই থাক সবকিছু।
শায়লা রহমান খুশি হয় আরাফার কথায়। মেয়েটার এসবের প্রতি কোন লোভ নেই। তিনি আরাফার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে-
-” সুখী হও মা।
কিছুক্ষণ পরেই আরাফাকে নিচে নামানো হয়। আরিয়ানের চোখদুটো আরাফা কেই খুঁজছিলো। আরাফা কে নামতে দেখেই কলিজায় পানি আসে। তৃষ্ণার্তের মতো তাকিয়ে আছে আরিয়ান আরাফার দিকে। সবাই যে দেখছে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। সে এখন আরাফার মুখ দেখার জন্য উতলা হয়ে পড়ে। কিন্তু ঘোমটার জন্য কিছুই দেখাচ্ছে না। পাশ থেকে অনিক আরিয়ানের পেটে খোঁচা মে’রে বলে-
-” পরান জ্ব’লিয়া যায় রে, পরান জ্ব’লিয়া যায় রে।
অনিকের সাথে তাল মিলিয়ে সুহাস বলে-
-” কি রে মামা জ্বরে নাকি কিছু।
তখন শিহাব এসে বলে-
-” কি করো তোমরা?
রাইয়ান খোঁচা মে’রে বলে-
-” এই তো তোমাকে দেখার অপেক্ষাতেই ছিলাম। জানো কতটা তৃষ্ণার্ত হয়ে ছিলাম। একটা দিন তোমাকে না দেখে থাকতে থাকতে আমি ক্লান্ত। আজ এত সুন্দর করে সেজেছো কেন দুষ্ট।
রাইয়ানের কথা শুনে শিহাব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। সুহাস আর অনিক মুখ টিপে হাসছে। শিহাব একবার আরিয়ানের দিকে তাকায় আরেকবার ওদের দিকে তাকায়। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। সাথে সাথে বাকি তিনজন ও হেসে দেয়। আরিয়ান রেগে বলে-
-” থামবি তোরা। তোদের ও একদিন দিন আসবে। দেখিস কি করি। একটাকেও শান্তিতে থাকতে দেবো না। হুহ!
সবাই হাসতে হাসতে চলে যায়। বিয়ে পড়ানো শুরু হয় একটু পরেই। আরাফা কে কাজী কবুল বলতে বলে। আরাফা অনেকক্ষন সময় নিয়ে থেমে থেমে বলে-
-“ককবুল, কবুল, কবুল।
এরপর আরিয়ান কে কবুল বলতে বলে। আরিয়ান একশ্বাসে বলে-
-” কবুল, কবুল, কবুল, কবুল, কবু..
সাথে সাথে চারদিকের সবাই হেসে দেয়। আরাফাও মুচকি মুচকি হাসছে। আরিয়ান বুঝতে পারেনা কেন হাসছে। রাইয়ান হাসতে হাসতে বলে-
-” ভাই থাম। চারবার কবুল বলে ফেলেছিস, আর কতবার বলবি?
আরিয়ান নিজের মাথায় নিজেই গাট্টি মা’রে। এক্সাইটমেন্ট এ পা’গল প্রায় সে। কত সং’গ্রাম করে আরাফা কে বিয়ের জন্য রাজি করিয়েছে সে। আরিয়ান আরাফার কানে কানে বলে-
-” সারপ্রাইজ আছে একটা বেলকনিতে, দেখে নিও।
___________
আরাফা কে মিহি আর আনিকা মিলে ফুলে সাজানো ঘরে বসিয়ে রেখে গেছে। ঘরটার চারদিকে অসংখ্যা রঙের মোমবাতি জ্বলছে। আনিকা আর মিহি যেতেই, আরাফা উঠে দাঁড়ায়। আস্তে আস্তে টা ফেলে বেলকনিতে যায়। একটা চিরকুট তাতে লিখা “ওয়াড্রবের উপরের ড্রয়ারে কিছু আছে”! আরাফার বিরক্ত লাগছে। এত ঢং করার কি আছে? আরাফা ওয়াড্রবের প্রথম ড্রয়ার খুলতেই একটা নীল শাড়ি দেখতে পায়। তার পাশে আরেকটা চিরকুটে লেখা “আমি তোমাকে আমার নীলপরি রূপে দেখতে চাই। ওখানে সব রাখা আছে, সুন্দর করে পড়বে শাড়ি। তবে ভুলেও মেকআপ আর লিপস্টিক ব্যবহার করবে না। লিপস্টিকের টেষ্ট নিশ্চয়ই খুব বাজে”। শেষের লাইনটা পড়ে আরাফা হেসে দেয়। যত্ন করে শাড়িটা পড়ে নেয় সে। নীল শাড়ি, স্লিভলেস ব্লাউজ, চুলগুলো এলোমেলো করে পিঠে ছড়িয়ে দেয় সে। বেলকনিতে রাখা দোলনায় গিয়ে বসে। আরিয়ান নিজের দরজার সামনে আসতেই সুহাস, মিহি, আনিকা, শিহাব, রাইয়ান, অনিক এসে দরজার সামনে দাঁড়ায়। আরিয়ান এদের দেখেই মানিব্যাগ এদের হাতে দেয়। রাইয়ান খুশি হয়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। আরিয়ান দরজা লাগাতে লাগাতে বলে-
-” টাকা গুনতে সমস্যা হলে কাউকে ভাড়া এনে নিস। গুনতে সাহায্য করবে তোকে।
ওপাশ থেকে সুহাস চেঁচিয়ে বলে-
-” শা’লা দরজা খোল একবার। দুই টাকার বান্ডিল তরে আমি দেখাইতাছি। হা:রা’মি কোথাকার।
এপাশে আর কথা শোনা যায়না। ওরা জ্বালাবে তাই আরিয়ান আগে থেকেই এই সাউন্ডপ্রুফ রুমটা সাজাতে বলেছে। এখন না বাহিরের শব্দ আসবে আর না ভেতরের শব্দ বাহিরে যাবে। আরিয়ান আস্তে আস্তে বেলকনিতে এগোয়। যতোই এগোচ্ছে দুটো মানুষের বুকে তুমুল ঝড় চলছে। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছে। আরিয়ান বেলকনিতে পা রাখতেই থমকে যায়। চাঁদের আলোয় নীল শাড়িতে আরাফা কে বড্ড মোহময় লাগছে। আরিয়ান আরাফার দিকে তাকিয়ে বলে-
নীলে মোড়ানো কোন এক পরি,
নাকি আমার স্বপ্নরাজ্যের রানি?
আরাফার কানে আরিয়ানের কথা যেতেই লজ্জায় মিইয়ে যায় সে। আজ কেন এত লজ্জা করছে। আরিয়ান ধীর পায়ে গিয়ে আরাফার সামনে বসে। শান্ত কন্ঠে বলে-
-” তাকাও আমার দিকে।
কন্ঠে যেন একগ্লাস মাদকতা মেশানো ছিলো। আরাফা ঢোক গিলে চোখ তুলে তাকায়। চারচোখ এক হয়ে যায়। হারিয়ে যায় একে অপরের চোখে। আরিয়ান আরাফার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে-
তোমার চোখের গভীরতা মাপতে গিয়ে
আজ তুমি নামের অথৈ সাগরে ডুবে যাচ্ছি।
_____________________
সকালবেলা আরাফার ঘুম ভেঙে যায়। উঠতে গিয়ে মনে করে তাকে দুটৈ হাত আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরে আছে। আরিয়ানের ঘুমন্ত মুখটা চোখে পড়ে আরাফার। চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে। কি নিষ্পাপ লাগছে ঘুমের মধ্যে। আরাফা আরিয়ানের কপালে আলতো চুমু একে দেয়। আরিয়ান চোখ খুলে বলে-
-” ছিল তুমি ঘুমের মধ্যে আমার সুযোগ নিলে? তুমি তো খুবই বাজে মেয়ে।
আরিয়ানের কথা শুনে আরাফা হেসে দেয়। উত্তর না দিয়েই আরিয়ানের বুকে মুখ লুকিয়ে রাখে।
_____
সকালবেলা সাওয়ার নিয়ে কালো রঙের সালোয়ার কামিজ পড়ে আরাফা নিচে যায়। তাকে দেখে মিহি চোখ টিপে দেয়। আরাফা লজ্জা পায় খুব। এই মেয়েটা খুবই দুষ্ট। আরাফা মিহি কে জিজ্ঞেস করে-
-” মাহি কোথায়? কাল থেকে দেখছিনা?
মিহি হেসে বলে-
-” তার দাদু তাকে নিয়ে বেড়তে গিয়েছে। চলে আসবে। আর কাল ভীড়ের মধ্যে ওকে রাহেলার কাছে রেখেছি। তুমি খেতে বসো।
আরাফা একটা চেয়ার টেনে খেতে বসে। আরিয়ান সিঁড়ি দিয়ে নামছে। হঠাৎ মিহির কাঁশি আসে। কাঁশির সাথে র’ক্ত বের হয়। সবাই ভয় পেয়ে যায়। আরিয়ান দৌড়ে আসে। মিহি কে কোলে তুলে বলে-
-” রাইয়ান গাড়ি বের কর। কুইক।
রাইয়ান মিহির এই অবস্থা দেখে হতবুদ্ধি হয়ে যায়। অনিক গিয়ে দৌড়ে গাড়ি বের করে। রাইয়ান, আরিয়ান, শায়লা রহমান আর আরাফা আসে মিহির সাথে। আরিয়ান মিহি কে নাড়াচ্ছে আর বলছে-
-” প্লিজ মেহু পাখি চোখ খোলা রাখ। বন্ধ করিস না চোখ প্লিজ। অনিক তাড়াতাড়ি ড্রাইভ কর। মেহু চোখ খোল।
মিহি চোখ খুলে কষ্টে বলে-
-” ভাইয়া আমার কিছু হলে মাহিকে দেখে রাখিস প্লিজ।
-” প্লিজ বোন এসব বলেনা।
-” আমাকে বলতে দে, তুই ওকে তোর পরিচয়ে বড় করবি। ওকে চৌধুরী বাড়ি যেতে দিস না রে। আর আমায় রাজের পাশে কবর দিস প্লিজ। আর.
মিহির কথা থেমে যায়। একটা হিচকি উঠে। নাক দিয়ে র:ক্ত পড়ছে। হাসপাতালের সামনে গাড়ি থামতেই আরিয়ান মিহিকে নিয়ে নামে। সবাইকে পেছনে ফেলে দৌড়ে হাসপাতালে ঢোকে। একটা বেডে শুইয়ে চিৎকার করে বলে-
-” মেহু চোখ খোল প্লিজ। ডক্টর ডক্টর!
মিরান দৌড়ে আসে। মিহির পালস রেট চেক করে মিলান বলে-
-” আরিয়ান কোন ফর্মালিটিজ করতে চাইছি না। কিন্তু মিহি আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।
ততক্ষণে পেছনে সবাই এসে গেছে। সবার মাথায় যেন বজ্রপাত হল। এত তাড়াতাড়ি এত কিছু হয়ে যাবে কেউ কল্পনাও করেনি। রাইয়ান ধাক্কাটা সামলাতে পারেনা সে ফ্লোরে বসে পড়ে। আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে মিহির দিকে তাকিয়ে আছে। মিহির পাশে গিয়ে বলে-
-” এই মেহু পাখি। ওঠ না, রাগ করেছিস? চকলেট আইসক্রিম এনে দেইনি বলে? সরি রে সব এনে দেবো প্লিজ তুই ওঠ। মিরান সব মিথ্যা বলছে আমি জানি। ওঠ না তুই।
শায়লা রহমান আর আরাফা আরিয়ানের পাশে এসে দাঁড়ায়। শায়লা রহমান চোখের পানি মুছে বলে-
-” বাবা ও আর নেই। ও কথা বলবেনা রে।
আরিয়ান চিৎকার করে বলে-
-” না না না । ও কোথাও যাবেনা। ও ওয়াদা করেছিল সবাই ছেড়ে গেলেও ও যাবেনা। এই মেহু তুই প্রমিজ পূরন করলিনা কেন? তুই তো এমন না ওঠ না সবাইকে দেখিয়ে দে তুই কোথাও যাবি না আমায় ছেড়ে। মাহি তো কাঁদবে প্লিজ ওঠ না। মা মা আমি ওকে বড় করেছি মা। ও কেন আমাদের ছেড়ে যাবে? আমি ওকে কখনোই অভাব বুঝতে দেইনি। ও কেন এমন করলো। মা মা ও মা আমি কি ওকে কষ্ট দিয়েছি? ও রাগ করলো কেন?
শায়লা রহমান আরিয়ান কে স্বান্তনা দিয়ে বলে –
-” না রে বাবা তোর কোন দোষ নেই। তুই এভাবে কাঁদলে মিহি কষ্ট পাবে।
আরিয়ান মিহির কাছে গিয়ে ওকে নাড়িয়ে বলে-
-” মিহি এই মিহি ওঠ না। দেখ আমি তোকে আর মেহু পাখি ডাকবো না। তুই রাগ করে গাল ফুলা আমি চকলেট নিয়া আসি। ওঠ না বোন আমার।
সুহাস আর শিহাব আরিয়ান কে টেনে এনে বলে –
-” ভাই থাম প্লিজ। মিহি আর নেই এটা চরম সত্য। মেনে নে।
আরিয়ান চিৎকার করে বলে-
-” মিহি বোন তুই আমাকে রেখে যাসনা। ডাক্তাররা সব নিকর্মা। এই মিরান তুই ও বাঁচা’তে পারলি না ওকে। যা সর তোকে আমি খু’ন করে ফেলবো। আমার বোন আমার ছোট মেহু পাখি।
আরিয়ানের আহাজারি তবে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আসে। খবর পেয়ে শহিদ আর সৈকত ছুটে এসেছে হাসপাতালে। হাসপাতালের লোকদের চোখেও পানি। সবাই কাঁদছে একজনের জন্য। মেয়েটা সবার প্রান ছিলো। ছোট বাচ্চাটাও আজ কাঁদছে। মা নেই এটা যেন সেও বুঝে গেছে। সে বুঝে গেছে পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ রইলো না।
____________
মিহির দাফন শেষে কবরস্থানে পাশে বসে আছে দুজন। একজন তার ভাই আরেকজন তাকে গোপনে ভালোবেসে আসা মানুষটা। রাইয়ান হাউমাউ করে কাঁদছে। আরিয়ান হেসে বলে-
-” অন্যের বোন আর বউয়ের জন্য তুই কেন কাঁদছিস?
রাইয়ান জবাব দেয় না। কলিজা টা পু:ড়ে যাচ্ছে। না পেলেও এতদিন চোখের সামনে ছিলো। আজ থেকে তাকে আর দেখতে পাবেনা। আরিয়ান মিহির কবরের উপর কান পেতে বলে-
-” বোন তোর অন্ধকারে কি ভয় করছে। আমরা আছি তো। ভয় পাশ না।
_________
সময় কারো জন্য থেমে থাকেনা। এক সেকেন্ড এক সেকেন্ড করে পুরো দুইটা বছর কেটে গেছে। সিনহা কে তার বাবা মেনে নিয়েছে। এখন আর মেয়েটা বালিশ ভিজিয়ে কাঁদে না। মিহি কে সবাই ভুলে গেলেও দুইজন মানুষ কখনোই ভুলতে পারবে না। তাদের মস্তিষ্কের প্রতি নিউরনে নিউরনে ঘুরে বেড়াবে মেয়েটা। কখনো কি ভুলতে পারবে আরিয়ান আর রাইয়ান। আরাফা আর আরিয়ানের একমাত্র মেয়ে মাহি। আরাফা কখনো মা হতে পারবেনা। আরিয়ান এতে খুশি কারন মাহি তাকালেই হবে। আরাফাও আরিয়ানের খুশিতে খুশি। মাহি লাল ড্রেস পড়ে দৌড়ে আসে আরাফার কাছে। আরাফা কে টানতে টানতে বলে-
-” আমাল সাতে আসো আম্মু।
আরাফা মাহিকে কোলে নিয়ে বলে-
-” কি হয়েছে আমার মাম্মামের?এতো ডাকাডাকি কেন?
মাহি আরাফার গলা জড়িয়ে ধরে বলে-
-” আব্বু ডাকে।
আরাফা মাহিকে কোলে নিয়ে আরিয়ানের কাছে যায়। ভ্রু কুঁচকে বলে-
-“কই যাও তুমি? রেডি হচ্ছো যে?
আরিয়ান রেডি হতে হতে বলে-
-” আজকে কত তারিখ দেখে এসো। তাহলে বুঝতে পারবে।
আরাফা মনে করেই বলে-
-” আমিও যাবো।
আরিয়ান কথা না বলে তৈরি হয়ে নেয়। আরাফা আর মাহি রেডি হয়ে আসে। তিনজনে মিলে একসাথে যায় কবরস্থানে। রাজ আর মাহির কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে কতক্ষন। নীরবে চোখের পানি ফেলে হাসপাতালে চলে যায়। এক জীর্ণ শীর্ণ জামা গায়ে পাগলামি করছে রাইয়ান। দুর থেকে রাইয়ান কে দেখে চলে আসে তারা। জীবনটা কীভাবেই না মোড় নিলো একজনের জন্য! আরিয়ান আরাফা আর মাহিকে নিয়ে একটা পার্কে এসে বসে। আরিয়ান একটা প্যাকেট আরাফা কে দিয়ে বলে-
-” এনিভার্সারি গিফট তোমার।
আরাফা হেসে বলে-
-” তা তো গতকাল ছিলো!
আরিয়ান আরাফার হাত শক্ত করে ধরে বলে-
-” জানি তবুও আজ দিলাম। আর প্লিজ আমাকে কখনো ছেড়ে যেওনা। সবাই চলে গেল তুমি থেকে যেও প্লিজ। আমরা একসাথে বাঁচবো।
আরাফা হেসে বলে-
-” ভালোবাসার বাজীটায় আমরা দুজনেই হেরে গেলাম। কেউ কাউকে ভাঙতে পারলাম না অথচ একে অপরের পরিপূরক হয়ে গেলাম।
ছোট মাহি হাতে তালি দিল। দুজনেই মাহির দিকে তাকিয়ে হাসলো।
#সমাপ্ত