#ভালোবাসি_তাই
তন্বী ইসলাম-৬
আশা আবারও হাঁটা শুরু করলো। পেছন থেকে ছেলেটি বললো
“যত ইচ্ছে পালানোর চেষ্টা করে যাও। কিন্তু জেনে রাখো, আমার কাছ থেকে পালানো তোমার কপালে লেখা নেই।
আশা সেসব কথাকে পাত্তা না দিয়ে একমনে বাসায় চলে আসে। বাসার আসার পর রান্নার জন্য লাউটা কেটে ধুয়ে চিংড়ির খোসা ছাড়িয়ে নিলো ভালো করে। লাউ চিংড়ি রান্না করবে আজ। আজ দুটো চুলাতেই নিয়াশা রান্না বসিয়ে দিয়েছে। যেকারণে আশাকে কিছুটা সমস অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই অপেক্ষার মুহুর্তটুকু সে বসে থাকেনি। ঘর গুছিয়েছে, বিছানা ঝাড় দিয়েছে আর বই এর টেবিলটা পরিষ্কার করে নিয়েছে।
চুলা খালি হলে সে দ্রুত রান্না চাপিয়েছে। এমনিতেও চিংড়ি মাছ আশার অনেক পছন্দের। আর লাউ চিংড়ি হলে তো কোনো কথায় নেই। খুব মনোযোগ সহকারে রান্না করছে সে। আর কেউ নেই তখন। বাকিরা রান্না করে রুমে চলে গেছে আগেই।
লাউ চিংড়ির ঘ্রাণ যখন চারিদিকটায় ছড়িয়ে পরেছে ঠিক সেই সময় রুম থেকে বেরিয়ে এলো সাদ। আশাকে রান্না করতে দেখে এগিয়ে এলো তার দিকে। মিষ্টি করে বললো
“হেই কিউটি, কি করছো?
সাদের কথায় আশার কোনোরুপ সাড়া এলোনা। সাদ আবারও বললো
“কিউটি, কথা বলছো না কেন?
আশা এবার তাকালো সাদের দিকে। অবাক হয়ে বললো
“আমাকে বলছেন?
“এখানে কি তুমি ছাড়া আর কেউ আছে?
“নাহ নেই, তবে কিউটি কে?
“তুমি?
“আমাকে এইসব ছাইপাঁশ কেন ডাকছেন? আমার নাম তো কিউটি নয়, আমার নাম আশা।
“সে যাইহোক, আমি তোমাকে কিউটি বলেই ডাকবো।
আশা আর কথা বাড়ালো না। সাদ বললো
“কি রান্না করছো?
আশা মুচকি হেসে বললো
“লাউ চিংড়ি।
“ওয়াও! যাস্ট লোভনীয় একটা আইটেম। আশা আবারও হাসলো।
এতোক্ষণ নিয়াশা ওর রুমেই ছিলো। আশাকে এভাবে কথা বলতে শুনে সে বেরিয়ে এলো রুম থেকে, কার সাথে কথা বলছে সে জানার জন্য। সাদকে দেখে ওর চোখ যেনো কপালে উঠে গেলো। খুশিতে গদগদ হয়ে দুই লাফে এগিয়ে গেলো ওদের কাছে। নিজ থেকেই সাদকে উদ্দেশ্য করে বললো
“হায়!
সাদ তাকালো নিয়াশার দিকে। নিয়াশা এমনিতেই সুন্দরী, তার উপর সাদ এ বাসাতেই থাকবে শুনে আরো কিছুটা সাজগোছ সে করেছিলো, যার জন্য ওকে আরো বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে।
সাদ নিয়াশাকে দেখে বলল
“ওয়াও! সো বিউটিফুল গার্ল। হু আর ইউ বিউটি?
সাদের মুখে নিজের প্রশংসা শুনে খুশি হয়ে গেলো নিয়াশা। এক গাল হেসে বললো
“আই এম নিয়াশা।
“নাইস নেইম। তুমিও কি এ বাসাতেই থাকো?
“হ্যাঁ, ওই রুমটাতে আমি থাকি। নিজের রুমের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে ইশারা করলো নিয়াশা। সাদ একবার ওই রুমটার দিকে তাকিয়ে আবারও নিয়াশার দিকে তাকালো। ভালোই হলো, এখানে আমার কোনো ফ্রেন্ড নেই। তার উপর সারাদিন আম্মু অফিসে থাকে, খুব বোরিং হই আমি। এখন থেকে আর বোর হওয়া লাগবে না।
নিয়াশা খুশিমনে বললো
“অবশ্যই।
আশা ওদের কথা শুনছে আর মুচকি হাসছে। নিয়াশার মনের ইচ্ছে বুঝি এবার পূরণ হতে যাচ্ছে, এটাই ভাবছে সে।
দেখতে দেখতে আরো দুটো দিন কেটে গেলো। সেদিন বিকেলে রুমে বসে পড়ছিলো আশা। এমন সময় সাদ এসে ঢুকলো ওর রুমে। ঠোঁটের কোনে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে বলল
“কি করো কিউটি?
আশা একটু নড়েচড়ে বসলো সাদকে দেখে। এরপর মুচকি হেসে বললো
“পড়ছি।
সাদ বিছানার এক প্রান্তে বসে চারপাশটায় একটু চোখ বুলালো। এরপর আশাকে জিজ্ঞেস করলো
“কি নিয়ে পড়ছো তুমি?
“ব্যবস্থাপনা।
“ওহ! কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সাদ আবারও প্রশ্ন করলো
“বিউটি কোথায় বলতে পারো, ওর রুমে নেই দেখলাম।
আশা মুচকি হেসে বললো
“আপনার বিউটি কোথায় আছে সেটা আমি কি করে বলবো। আপনাকে বলে যায় নি?
সাদ ভ্রু বাকিয়ে তাকালো আশার দিকে। অদ্ভুত ভাবে বললো
“আমার বিউটি!!
আশা কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ফোনটা বেজে উঠলো ওর। মা ফোন করেছে। আশা কলটা রিসিভ করে প্রথমে সালাম জানালো মাকে। এরপর কথা শুরু করলো।
“কেমন আছো মা?
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুই কেমন আছিস মা?
“ভালো আছি। কি করো মা?
“কিছু করিনা। শোন, তোকে একটা খবর দেওয়ার জন্য কল করেছি।
“কি খবর?
“আজ মেয়ে দেখতে গিয়েছিলাম এক যায়গায়।
“কেন? অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো আশা।
“কেন আবার, তোর ভাইয়ের বিয়ের জন্য। মেয়ে খুব সুন্দরী, শিক্ষিতও। আমাদের তো খুব পছন্দ হয়েছে।
আশা মলিন কন্ঠে বললো
“আমাকে রেখে তোমরা এতোকিছু করে ফেললে, একবার আমাকেও জানাও নি পর্যন্ত।
“মন খারাপ করিস না আশা। তুই তো এখন আসতে পারবিনা, তাই তোকে আর জানানো হয়নি। সামনের শুক্রবার ওদের বাড়ি থেকে আমাদের বাড়িতে লোকজন আসবে। যদি ওরা পছন্দ করে তাহলে সেদিনই বিয়ের ডেট ফিক্সড করা হবে।
“ওহ, ভাইয়া কোথায়?
“কি জানি, কোথায় গেলো আবার কে জানে। আচ্ছা এখন রাখছি।
আশা ছোট্ট করে বললো
“হুম।
আশাকে নিরব থাকতে দেখে সাদ বললো
“মন খারাপ?
“নাহ।
“তাহলে? আচ্ছা তুমি কি সবসময় এভাবে চুপচাপ থাকো?
“মাঝে মাঝে।
“তোমরা বড়ই আজব। দুইজন দুই রকম।
আশা অবাক হয়ে বললো
“কোন দুইজন?
“তুমি আর বিউটি। তুমি বড্ড কম কথা বলো। আর বিউটি কিন্তু প্রচুর কথা বলে।
“নিয়াশাকে ভালো লাগে আপনার?
সাদ অদ্ভুদ ভাবে তাকালো আশার দিকে। মৃদু হেসে বললো
“বিউটির মতো একটা সুন্দরী মেয়েকে কি ভালো না লেগে পারা যায়? সেতো ভালো লাগার মতই একটা মেয়ে।
আশা হাসলো। তবে, কথাটায় সামান্য কষ্ট অনুভব করলো সে। কি কারণে সেটা সে জানে না।
এর মাঝে নিয়াশাও চলে এসেছে। সাদকে আশার রুমে দেখে এগিয়ে এলো এখানে। হাসিমুখে বললো
“কি করছিস আশা?
সাদ নিয়াশার দিকে তাকিয়ে বললো
“চলে এসেছো? কোথায় গিয়েছিলে?
নিয়াশা রুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো
“এক ফ্রেন্ডের বাসায় গিয়েছিলাম। কি করছো তোমরা?
আশা মুচকি হেসে বললো
“তোমার কথায় হচ্ছিলো।
“তাই! হাসতে হাসতে বললো নিয়াশা। সে সাদের দিকে তাকালো। মিষ্টি কন্ঠে বললো
“তা কি কথা হচ্ছিলো আমাকে নিয়ে?
“বেচারা তোমাকে খুজতে খুজতে হয়রান।
আশার কথায় অবাক হয়ে সাদের দিকে তাকালো নিয়াশা। বিস্মিত কন্ঠে বললো
“সত্যি?
সাদ হাসলো। সে বিছানা থেকে উঠে বলল
“হেয় বিউটি কিউটি, তোমরা গল্প করো। আমি আসছি। সে তৎক্ষনাৎ উঠে চলে গেলো সেখান থেকে। কিছুটা অবাক হলো আশা। নিয়াশা বললো
“এই আশা, ও কি বলছিলো আমাকে নিয়ে?
আশা মুচকি হেসে নিয়াশার দিকে তাকালো। নিয়াশা উৎফুল্ল মেজাজে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছে আশার দিকে। আশা বললো
“আমি সাদ ভাইয়াকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সে তোমাকে পছন্দ করে কিনা।
আশার কথা শুনে নিয়াশা উৎকন্ঠা নিয়ে বললো
“তারপর? ও কি বললো?
“বললো তোমার মতো একটা সুন্দরী মেয়েকে ভালো না লেগে থাকা যায় না ।
এতোক্ষণে নিয়াশার চোখেমুখে বিশ্বজয়ের খুশি ভেসে উঠলো। সে লাফিয়ে উঠে আশাকে জড়িয়ে ধরে বললো
“তুই এইটা কি শুনাইলি রে বনু, আমি তো খুশিতে পাগল হইয়া যামু রে। আশা হাসলো। ওদের হাসির শব্দ কানে পৌছুতেই নীলা ছুটে এলো আশার রুমে। নিয়াশাকে এভাবে লাফালাফি করতে দেখে অবাক হলো সে। বিস্ময় নিয়ে বললো
“এভাবে ব্যাঙ এর মতো লাফাচ্ছিস কেন?
“এভারেস্ট জয় করেছি রে নীলা। তাই সেলিব্রেট করছি। নীলা মুখ বাকিয়ে বললো
“যত্তসব ঢং। এই বলে সে আবারও নিজের রুমে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর নিয়াশাও চলে গেলো সেখান থেকে। আশা আবারও পড়ায় মন দিলো।
রাতের বেলা আশা যখন খাওয়ার বন্দোবস্ত করছিলো ঠিক সেই সময় সাদ আবারও এসে ঢুকলো ওর রুমে। আশা অবাক হলো এবার। সাদ যখন তখন ওর রুমে আসা যাওয়া করছে, ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু। তবে মুখ ফুটে সে কিছু বলতেও পারছেনা। সাদ আশাকে লক্ষ্য করে মিষ্টি কন্ঠে বললো
“কি করছো কিউটি?
আশা ভাতের প্লেটটা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বললো
“ভাত খাবো এখন।
“এতো তারাতাড়ি?
“হুম। খিদে পেয়েছে খুব।। আপনি খেয়েছেন?
সাদ হেসে বললো
“এখন তো মাত্র সন্ধ্যে হলো। আরো পরে খাবো।
আশা প্রতিবাদ করে বললো
“এখন মোটেও সন্ধ্যা না, সাড়ে ন’টা বাজে অলরেডি।
সাদ আশার কথার কোনো প্রতিউত্তর না করে হাসলো শুধু।
কয়েক মুহূর্ত বাদে সাদ বললো
“কি রান্না করলে? খাবে কি দিয়ে?
“ঝাল ঝাল করে আলুভর্তা করেছি, আর ডিম ভাজা।। সাদ সামান্য নাক সিটকিয়ে বললো
“এগুলো দিয়ে তুমি খেতে পারবে?
“অবশ্যই। তাছাড়া ঝাল ঝাল আলুভর্তা দিয়ে আমি ভাত বেশিই খেতে পারি। আমার খুবই পছন্দ এটা।
“সিরিয়াসলি কিউটি! আলুভর্তাও কারো ফেভারিট হয় জীবনে প্রথমবার শুনলাম।
“আমার হয়। কারণ, আমার করা আলুভর্তাটা খুবই স্পেশাল তাই।
“তাই, তাহলে তো তোমার ওই স্পেশাল ভর্তাটা আমাকে টেস্ট করে দেখতে হয়।
সাদের কথা শুনে বিষম খেলো আশা। বিস্ময়ভরা কন্ঠে প্রশ্ন করলো
“আপনি আলুভর্তা খাবেন? তাও আমার হাতে বানানো ভর্তা!!
” তাতে কি, আমি খাবো। দাও আমাকে একটা প্লেটে অল্প ভাত আর ভর্তা।
আশার এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা সাদের বলা কথাগুলো। সে সন্দিহান কন্ঠে বললো
“আপনি মজা করছেন তাইতো?
সাদ কপাল কুচকালো। বাকা দৃষ্টিতে আশার দিকে তাকিয়ে বললো
“তুমি কি আমাকে খাওয়াতে চাইছো না?
আশা এক গাল হেসে বললো
“না না। তা হবে কেন। কিন্তু আপনি এইসব খেতে পারবেন না।
“না খাওয়ানোর ধান্ধা তাইতো।
আশা এবার বিপাকে পড়লো। উপরন্তু কোনো উপায় না পেয়ে সে বললো
” আপনি বসুন, আমি দিচ্ছি আপনাকে।
চলবে…
[এডিট করা হয়নি। ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন]