ভালোবাসি তাই পর্ব-০৮

0
649

#ভালোবাসি_তাই
তন্বী ইসলাম-৮

সাদ এগিয়ে এলো নিয়াশার দিকে। তীক্ষ্ণ গলায় বললো
“ঠিক আছে, বিকেলে আমি তোমায় নিয়ে ঘুরতে যাবো। তাও এই দুর্বল শরীর নিয়ে ভার্সিটি যেও না যেনো।
সাদের মুখে এমন কথা শুনে খুশিতে আত্মহারা হওয়ার মতো অবস্থা নিয়াশার। সে প্রচন্ড উৎফুল্ল মেজাজে বললো
“সত্যি? সত্যিই তুমি আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে? কথাটা বলার সাথে সাথেই জিভে কামড় দিলো নিয়াশা। এক গাল হেসে বললো
“স্যরি, তুমি করে বলে ফেললাম। সাদ হেসে বললো
“নো প্রব্লেম বিউটি, আমাকে তুমি করেই বলতে পারো। আমার ভালো লাগবে আরো বেশি।

কথাটা শেষ করে রুমে চলে গেলো সাদ। এদিকে নিয়াশার হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো অবস্থা। সে নীলা আর আশার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে তুড়ি বাজাতে বাজাতে বললো
“বনুরা, তোরা যা। শুনলি না, আমায় নিয়ে ঘুরতে যাবে বললো। এতো বড় সুযোগ মিস করি কিভাবে বল। নিয়াশা এক হাতে শিষ বাজাতে লাগলো এবার। নীলা বিরক্তি নিয়ে বললো
“যা খুশি তা কর, তোর জন্য আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমরা গেলাম। নীলা হনহন করে নেমে গেলো সিড়ি দিয়ে, কিন্তু আশা নামলো না। সে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে নিয়াশার দিকে। আশাকে এভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ওর চোখের সামনে আবারও তুড়ি বাজালো নিয়াশা। এতে আশা সামান্য হতচকিত হলো।

নিয়াশা বললো
“তোর আবার কি হলো, স্ট্যাচু হইলি নাকি। যাবিনা ভার্সিটি?
আশা মৃদু হেসে বললো
“যাচ্ছি।
আশা আর একদন্ড না দাঁড়িয়ে দৌড়ে নেমে গেলো সিড়ি দিয়ে। নিয়াশা তার যায়গায় দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে।
এতোক্ষণ সমস্ত কান্ড দুটি চোখ আড়াল থেকে দেখে গেছে। ক্রোধে ফেটে পরছে সে। এই চোখের দৃষ্টি এতোই প্রখর, যেনো এক্ষুনি নিয়াশারকে ভষ্ম করে দিবে।

ভার্সিটির কাছাকাছি গিয়েই হটাৎ থেমে গেলো আশা। সেই ছেলেটা বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনেই। ছেলেটির ঠোঁটের কোনে এক ভয়ার্ত হাসি। আশার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে ছেলেটিকে দেখে। তখন নীলা রেগে আগে আগে চলে আসায় এখন আশা একা, যে কারণে ওর প্রাণ যায় যায় অবস্থা। সে এক পা এগুচ্ছে তো দুই পা পিছিয়ে যাচ্ছে। ছেলেটা আবারও অদ্ভুত ভাবে হেসে বললো
“হেই লেডি, ভয় পাচ্ছো কেন? ভালোবাসার মানুষকে ভয় পেতে নেই, এতে ভালোবাসা আদান প্রদানে বিঘ্ন ঘটে।

কথাটা আশার কানে খুবই বাজেভাবে ঠেকলো। সে চোখমুখ খিচে বললো
“আজেবাজে কথা আমার সামনে একদমই বলবেন না দয়া করে। ছেলেটি এভার বাইকে থেকে নামলো। বাইকের চাবিটা আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে আশার সামনে এগিয়ে এলো। আশা যেনো এবার নড়ার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। ছেলেটি আশার কানের কাছে মুখ এনে আস্তে আস্তে বললো
“এসব কথা তোমার কাছে আজেবাজে লাগছে কেন? আর যদি আজেবাজে কথাও হয়ে থাকে, তাহলেও এইসব আমি তোমাকে বলবোই। এই ধরনের আজেবাজে কথা ভালোবাসার মানুষকেই বলতে হয়, অন্যদেরকে এইসব কথা বললে তো গণধোলাই খেতে হবে।
কথাটা বলে আবারও অদ্ভুতভাবে হাসতে লাগলো ছেলেটা।

আশা বিরক্ত নিয়ে বললো
“বার বার ভালোবাসার মানুষ কেন বলছেন। কে আপনার ভালোবাসার মানুষ? ছেলেটি এবার হাসলোও না আবার কথাও বললো না। একভাবে আশার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে রইলো সে। কিছুক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে আকস্মিক আশার হাত থেকে খাতা কলমটি ছিনিয়ে নিলো সে। আশা প্রচন্ড অবাক হলো তাতে। ছেলেটি খাতায় কিছু একটা লিখে তা আশার হাতে দিয়ে বলে
“লিখে দিলাম কে আমার ভালোবাসার মানুষ। ভুলে গেলে পড়ে নিও।

টকটকে লাল রঙ এর একটা গাউন পরে ব্রাইডাল মেকাপে সেজে নিয়েছে নিয়াশা। কপালে লাল টিপ আর ঠোঁটে গাড় লাল লিপস্টিক টা দিতেও ভুলেনি সে। সবশেষে হাতে লাল স্টোন বসানো ব্রেসলেট টাও পরে নিলো। ওর এইসব গর্জিয়াস সাজগোছ দেখে ক্ষিপ্ত গলায় নীলা বললো
“বিয়ে বাড়ি যাচ্ছিস নাকি, এতো সেজেগুজে বেরোচ্ছিস যে।
নিয়াশা এক গাল হেসে নীলার সামনে গেলো। দুহাতে ওর দুগাল টিপে দিয়ে বললো
” কারো বিয়েতে যাচ্ছিনা বনু, নিজের বিয়েটা কনফার্ম করতে যাচ্ছি। নীলা ফুসে উঠে বললো
“এতো লোভ করিস না নিয়াশা, মিথ্যা স্বপ্নও দেখিস না। সাদ ভাইয়া তোকে ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছে, বিয়ে করতে নয়।

নিয়াশা পালটা প্রশ্ন করলো
“শুধু আমাকেই কেন? আমরা তিনজন আছি এখানে। চাইলে সে আশাকেও নিয়ে যেতে পারতো, কিংবা তোকে। অথবা আমাদের তিনজনকেই। তা না করে শুধু আমাকেই কেন নিয়ে যাচ্ছে বল তো?
নীলা চোখমুখ খিচে বললো
“হয়তো বন্ধু ভাবে তোকে তাই। অসুস্থ তুই, তাই মন ফ্রেশ করাতে নিয়ে যাচ্ছে। আর তুইও বলেছিলি, বাসায় একা থাকতে তুই বোরিং হচ্ছিস।
নিয়াশা এবার সামান্য বিরক্ত হয়ে বললো
“এতো বেশি বুঝিস না তো। সাদ তো তোকে বন্ধু ভাবে, আশাকেও বন্ধু ভাবে। আর মাঝে মাঝে তোরাও বাসায় থেকে বোর হোস। কই, তখন তো তোদের নিয়ে যায় নি। আমি ওর কাছে স্পেশাল, তাই আমাকেই নিয়ে যাচ্ছে। দেখলিনা, কার আমার অসুস্থ শুনে কি করলো।

নীলা নিশ্বাস ছেড়ে বললো
“কাল যেটা হয়েছে আমরা নিজ চোখেই দেখেছি। আমরাও সেটা নিয়ে মজা করেছি। তার মানে তো এটা নয়, যে আমরা যেটা ভাবি সেটাই ঠিক। এর উল্টোও হতে পারে। এতো বেশি আশা করিস না নিয়াশা। তুই আমার বন্ধু, তাই বলছি।।
“আমাকে বাধা দিস না তো। কোনটা কি সেটা আমি বুঝি।
নীলা এবার হতাশ গলায় বললো
“তোর সাথে কথা বলাই আমার ভুল হইছে। তুই যা খুশি তা কর। নিয়াশা বেরোতে বেরোতে
“হুম! কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে রাখিস।

রুম থেকে বেরিয়েই আশা সামনে পরলো নিয়াশা। আশা নিয়াশাকে এমন গেটআপে দেখে মুচকি হেসে বললো
“ঘুরতে যাচ্ছ?
নিয়াশা হাসিমুখে উত্তর দিলো
“হ্যাঁ।
“সাদ ভাইয়া কোথায়?
“আমার জন্য অপেক্ষা করতেছে নিচে। আমি যাই রে আশা। আশা মাথা নাড়ালো। নিয়াশা প্রফুল্ল চিত্তে এক পা একপা করে নিচে নামতে থাকলো। আশা সেদিকে তাকিয়ে আছে। হটাৎ আশা অজানা কোনো এক কারণে মনের কোনে অদ্ভুত এক ব্যথার উপস্থিতি টের পেলো। কি রকম চিনচিন ব্যথা। আশা বেশ অবাক হলো। এমন কেন হচ্ছে? এমন ব্যথা হওয়ার কারণ কি? একমনে ভাবে সে, কিন্তু উত্তর খুজে পায় না।

আশা এবার নিজের রুমের দিকেই যাচ্ছিলো, এমন সময় একটা কন্ঠস্বর ওর কানে এলো।
“আশা, আমার রুমে আসোতো একটু।
পিছন ফিরে দেখলো বাড়িওয়ালা আন্টি দাঁড়িয়ে আছে উনার রুমের সামনে। আশা এগিয়ে গেলো সেখানে। ইদানিং ঠিকমতো আন্টির সাথে কথা হয়না তার। ছেলে আসার পর থেকে অফিস টাইমের পর বাকি সময়টুকু ছেলের সাথেই কাটান উনি। আর সাদ বাসায় থাকায় আশাও বেশি পা বাড়ায় না সেদিকে। আন্টির কাছাকাছি যাওয়ামাত্রই উনি আশার হাতটা ধরে ভেতরে নিয়ে গেলেন। আশা কিছুটা অবাক হলো আন্টির এমন ব্যবহারে। কি কিছুটা চিন্তিত গলায় বললো
“কিছু হয়েছে আন্টি?
“হয়নি কিচ্ছু। তুমি এসো আমার সাথে। তোমার সাথে কিছু কথা আছে আমার।

আশা অপেক্ষা করতে লাগলো আন্টি কি বলবে সেটা শোনার জন্য। ভেতর রুমে গিয়ে আশাকে নিজের মুখোমুখি বসালেন তিনি। কিছু সময় পার হওয়ার পরেও উনি কিছু বলছেন না। গম্ভীরমুখে বসে আছেন তিনি। আশা নিরবতা ভেঙ্গে শান্ত গলায় বললো
“কোনো সমস্যা হয়েছে আন্টি? আপনাকে এমন দেখাচ্ছে যে?
আশা উনার মুখের দিকে উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে। আরো কিছুটা সময় নিরব থাকার পর উনি বললেন
“নিয়াশার সাথে আমার সাদের কোনো সম্পর্ক আছে আশা?
হটাৎ আন্টির মুখে এমন কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলো সে। এই মুহূর্তে কি বলা উচিৎ সে বুঝতে পারছেনা। আন্টি আবারও ওকে তাড়া দিয়ে বললো
“কিছু বলছো না যে?

আশা আমতাআমতা করে বললো
“ওরাতো ভালো বন্ধু আন্টি।
আন্টি ঠান্ডা গলায় বললেন
“দেখো আশা, আমি এতোটাও বোকা না। বন্ধুত্বের সম্পর্কটা কেমন হয় সেটা আমার জানা আছে। তবে এটাকে আমি কোন সম্পর্কে ঠাই দিবো সেটা নিয়েও চিন্তায় আছি। এই মেয়েটার ভাবগত মোটেও আমার কাছে সুবিধার ঠেকছে না। সারাক্ষণ আমার ছেলের সামনে ঘুরঘুর করছে। আর এর কথা বলার স্টাইল দেখেছো? কিভাবে সবার সাথে সে কথা বলে, আমার আমার ছেলের সামনে এলেই কথা বলার ডিজাইন টা পর্যন্ত পালটে যায়। আশা কিছু বলছেনা, শুধু শুনে যাচ্ছে।।

আন্টি আবারও বললেন
“ইদানীং আমার ছেলের রুমেও মেয়েটার আনাগোনা বেড়ে গেছে। আমি এটা যাস্ট টলারেট করতে পারছিনা। আশা হটাৎ অবাক চোখে তাকালো আন্টির দিকে। খানিক চমকে উঠলো
“নিয়াশা সাদ ভাইয়ার রুমে আসে? কই, আমার চোখে তো কখনো পরেনি!
“মেয়েটা খুব সেয়ানা। সে সুযোগ বুঝেই আসে আমার ছেলের রুমে। আমি কয়েকদিন দেখেছি। আমাকে দেখলেই মাথা নিচু করে এমন ভাবে চলে যায়, যেনো সে কিচ্ছু বুঝেনা। আশা কয়েক মুহূর্ত নিরব রইলো। এরপর বললো
“একটা কথা বলবো আন্টি?
“বলো।
” নিয়াশা সাদ ভাইয়াকে ভালোবাসে। আর..
“আর কি?
“আর সাদ ভাইয়াও মেবি ওকে পছন্দ করে।
“সাদ এসব বলেছে তোমায়?
“নাহ, তবে ভালো লাগার ব্যাপারটা বলেছে। আর উনার কথাবার্তা, নিয়াশার প্রতি অন্যরকম একটা টান আমরা সবাই খেয়াল করেছি।

আন্টি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন
“আমার ছেলের পছন্দ এতোটাও বাজে হবে, আমি ভাবতেও পারিনি। উনি হতাশায় চোখ বুঝলেন। আশা ধীরেসুস্থে বলল
“আন্টি, এতোটাও হতাশ হবেন না প্লিজ। নিয়াশা মেয়ে হিসেবে কিন্তু খারাপ না। ও যথেষ্ট ভালো একটা মেয়ে। আশার কথায় উনি কিছুটা সরু দৃষ্টিতে তাকালেন ওর দিকে। এরপর আবার স্বাভাবিক গলায় বললেন
“আমার সাদের ফিউচার অনেক ব্রাইট। ও অনেক ভালো কাউকে ডিজার্ভ করে। আমি কা হিসেবে কখনো ওর পছন্দ অপছন্দকে অবহেলা করিনি। ও যদি ওই মেয়েকে সত্যি সত্যি ভালোবেসে থাকে, তাহলে আমি নিশ্চয়ই ওর ভালোবাসাকে অবহেলা করবোনা।

উনি আবারও চোখ বুজলেন। আশা বেশ বুঝতে পারলো উনি ডিপ্রেশনে আছেন। সে আর বিরক্ত করল না উনাকে। শান্ত গলায় বিদায় জানিয়ে চলে এলো নিজের রুমে।

বিকেল ঘনিয়ে সন্ধ্যে নেমে আসছে। নিয়াশা প্রচন্ড খুশি আজ। একটা গগন বিস্তৃত মাঠে সবুজ ঘাসের উপর বসে মিটিমিটি হাসছে সে। পাশের সাদ বসা। নিয়াশা হাসিমুখে বললো
“তোমার ভালো লাগছে আমার সাথে ঘুরতে?
“ভালো না লাগার কি কোনো কারণ আছে?
“তা না, এমনিতেই বলছিলাম।।
সাদ উঠে দাড়ালো। নিয়াশার দিকে তাকিয়ে বললো
“সন্ধ্যে হচ্ছে, এবার আমাদের বাসায় ফেরা উচিত।
নিয়াশা কিছু বললোনা। সে শুধু হাসছে।
সাদ ভ্রু বাকিয়ে বললো
“কি হলো, উঠছো না যে।
নিয়াশা সামান্য লাজুক হেসে বসা অবস্থাতেই সাদের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিলো।
সাদ হাসলো। নিয়াশার হাতটা ধরে দাড় করালো সে। নিয়াশার মনের খুশিটা আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেলো তাতে।

চলবে……
[এডিট করিনি। ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন।]