ভুল সত্য
১৩
মুকুল আজকাল কেমন সিনেমার নায়কদের মতন আচরণ করছে। হুটহাট জড়িয়ে ধরছে। আলটপকা চুমু খাচ্ছে। কাজে বেরুনোর আগে তো যা করছে সেটা বলার মতো না। ওর এইসব আচরনে আমার বিরক্ত হওয়া উচিত, রাগ হবার কথা কিন্তু অদ্ভুত ব্যপার হল আমার রাগ হচ্ছে না বরং ভালো লাগছে। আশ্চর্যের কথা হল ও এমন না করলেই অস্বাভাবিক লাগছে। এটা খুবই খারাপ লক্ষণ। এতে একধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়, যেটা পূরণ না হলে হতাশা জন্মায়।
আমি এসব থেকে শতহস্ত দূরে থাকতে চাই। নিজেকে প্রতিদিন বোঝাচ্ছি এসব আর কিছু নয়, অভ্যাস মাত্র; কিংবা বলা যায় এক ধরনের চাহিদা। মুকুল যখন আমাকে বাইরে খেতে নিয়ে যায়, আমি কি খাচ্ছি না? খাবারটা যেমন একটা চাহিদা সেই রকম শরীরেরও নিজস্ব কিছু চাহিদা আছে। এর বেশি তো কিছু নয়। এর বেশি কিছু হলেও আমি সেটা ভাবতে চাই না। চাইনা মনের মধ্যে কোন দুর্বলতাকে স্থান দিতে। চাইনা আবার নতুন করে কারো প্রতি বিশ্বাস তৈরি করতে। সত্যি কথা বলতে আরেকবার ঠকতে চাই না।
অনেক রাত হয়েছে। আজ খুব শখ করে পুরনো কতগুলো সুতি শাড়ি হাতে ধুয়ে দিয়েছিলাম। আমি আর তিথি এই শাড়িগুলো বঙ্গবাজার থেকে কিনেছিলাম। বঙ্গবাজার মার্কেটটা তিথিদের বাড়ির একেবারেই কাছে।। ক্লাসের শেষে আমরা দুজন প্রায়ই ওদের বাসায় চলে যেতাম। পথেই মার্কেটে ঢু মারতাম। এত কম দামে এত সুন্দর সুন্দর শাড়ি; মোটামুটি আমাদের পকেটে মানির টাকা দিয়েই হয়ে যেত। কলেজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে পহেলা ফাল্গু্ন একুশে ফেব্রুয়ারি সব উপলক্ষেই শাড়ি কিনতাম। বিয়ের পর এখানে আসার সময় এগুলো নিয়ে আসতে পারিনি। মা কাল বস্তা ভরে পাঠিয়ে দিয়েছে। আমার একটু সুচিবাই এর মত আছে। সব শাড়ি গুলো আজ ধুয়ে দিয়েছি। ছাদে মেলতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম ওদের ছাদটা বেশ সুন্দর। আমি বিকেলে কিছুক্ষণের জন্য যাই। শাড়ি গুলো বিকেলে ছাদ থেকে নিয়ে এসেছি। গুছিয়ে রাখা হয়নি। আলমারিতে
শাড়ি গুলো রাখতে গিয়ে মনে পড়ল বিয়ের পর মুকুল আমাকে কয়েকটা শাড়ি কিনে দিয়েছিল। সে সময় খুলে ও দেখিনি। আজ বের করে নিয়ে বসলাম। দুটো গোলাপি আর একটা সবুজ রঙের। গোলাপি রং আমার দু চক্ষের বিষ। ছোট বেলায় মা আমকে সারাক্ষণ গোলাপি জামা পরিয়ে রাখত।
আমি সবুজ শাড়িটা খুলে দেখলাম। ঘন সবুজ রঙ্গে কালো পাড়। নরম বাটিকের সুতি শাড়ি। আমি খুব যত্ন করে পরলাম। ঘন করে কাজল দিলাম চোখে। আয়নার সামনে দাড়িয়ে কয়েকবার নিজেকে বললাম
ওকে খুশি করার জন্য পরিনি। পড়তে ইচ্ছা হয়েছে তাই পরেছি।
মনে হচ্ছে কিছু একটার অভাব। ছোট করে একটা কালো টিপ দিলাম। হ্য, এবার ঠিক আছে। সব শেষে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলাম। সাড়ে নয়টা বাজে। ও তো সাতটার মধ্যেই চলে আসে। দেরী হলে ফোন করে। আজ কি হল?
আমি নিচে নেমে গেলাম। পুরো বাড়িটা কেমন খাঁ খাঁ করছে। আমার শাশুড়ি নতুন ডায়েট শুরু করেছে। আটটার সময় গ্রিন জুস আর ডিম খায়। রাতে খাবারের সময় আমাদের সঙ্গে দুধ আর ওটস নিয়ে বসে। আজ আটটার সময়ই খেয়ে শুতে চলে গেল আমাকে বলে। আমি কয়েকবার ফোন দিলাম, মুকুল ফোন ধরল না। আমার কেমন কান্না পাচ্ছে। বাইরে শো শো শব্দে ঝোড়ো বাতাস দিচ্ছে। এত দেরী হচ্ছে কেন? কোন বিপদ হয়নি তো?
মুকুল ফিরল সাড়ে দশটার দিকে। আমাকে দেখে ভুরু নাচিয়ে বলল
কি? রাত বিরাতে এত সাজগোজ করেছ কি আমার জন্য?
রাগে আমর ইচ্ছা করছিল ওর উপর ঝাপিয়ে পড়তে। আমি ওর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললাম
ফোন ধরছিলেন না কেন?
ফোন ভেঙে গেছে
আমি ভুরু কুচকে অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে তাকালাম
সত্যি। এই দেখো
তাকিয়ে দেখলাম ফোন আসলেই ভাঙ্গা
ভাঙল কেমন করে?
মুকুল টাই খুলতে খুলতে চেয়ারে বসে বলল
সে অনেক কথা। পরে বলব। আগে এদিকে এস তো। তোমাকে একটু দেখি
আমার মেজাজ খারাপ হচ্ছে। একে তো দেরী করে এসেছে আবার বলছে ও না কিছু ঠিকমত উল্টো ঢং দেখাচ্ছে।
আমাকে দেখার কি আছে?
বাহ! নিজের বউকে দেখব নাতো কি পাশের বাসার মেয়েকে দেখব
আমার ভেতরটা হঠাত জ্বলে উঠল। আমি ওর কাছে গিয়ে বললাম
অন্য কোন মেয়ের দিকে যদি তাকান তাহলে কাটা চামচ দিয়ে চোখ তুলে নেব।
মুকুল কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল তারপর হো হো করে হাসতে শুরু করল। আমার হঠাতই কেমন লজ্জা করতে লাগল। আচ্ছা ও কি ভাবল। অন্য মেয়ের কথা শুনে আমি জেলাস। ব্যপারটা তো তা নয়। একজন বিবাহিত পুরুষ অন্য মেয়ের দিকে চোখ দিচ্ছে বিষয়টাই তো অশ্লীল। কিন্তু এখন ওকে এটা কে বোঝাবে। ধুর! কি বলতে যে কি বলে ফেলি।
আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললাম
খাবার গরম করছি
ও আমার একটা হাত ধরে বলল
আচ্ছা শোনো। একটু পরে খাই। চল ছাদে যাই
আমি অবাক হয়ে বললাম
কেন? এখন তো বৃষ্টি পরছে।
এজন্যই তো
চল বৃষ্টিতে ভিজি
বৃষ্টির পানি গায়ে লাগলে আপনার ঠান্ডা লেগে যাবে।
একদিন ভিজলে কিছু হবে না
না।
আচ্ছা ঠিক আছে আমি রেইন কোট পরে নিচ্ছি
সেটা খুবই হাস্যকর হবে
কিচ্ছু হবে না। চলো তো
না এখন না
মুকুল আমার কথা শুনল না। জোর করে ছাদে নিয়ে গেল।আজকের বৃষ্টিটা একেবারেই অন্যরকম। কতদিন পর বৃষ্টিতে ভিজলাম। আমি ইচ্ছা করেই ওকে আমার সঙ্গে ভিজতে দিলাম না। চিলেকোঠার ঘরের সামনের সেডটার নিচে দাড়িয়ে থাকতে বললাম। অনেক অনেকদিন পর এমন নিশ্চিন্তে মনের আনন্দে বৃষ্টিতে ভিজলাম। চোখ বুজে আকাশের দিকে মুখ করে অনেকক্ষণ ভিজলাম। হঠাৎই গালে কারো হাতের স্পর্শ টের পেলাম। আমার ভয় করলো না। যেন এ স্পর্শ আমার অনেক দিনের চেনা। চোখ মেলে দেখলাম ও কেমন ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
উত্তপ্ত দীর্ঘ চুমু। অনেকটা সময় পর মুকুল খুব আস্তে আস্তে বলল, চলো ভেতরে যাই, আর ভিজতে হবে না। আমি ভেবেছিলাম ও হয়তো আমাকে নিচে নিয়ে যাবে কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ও আমাকে চিলেকোঠার ঘরটাতে নিয়ে গেল। পুরনো দিনের রঙ চটা একটা বেতের সোফা রাখা ওখানে। আমি ওটাতেই বসলাম। ও আমার হাতে চায়ের মগ দিয়ে পাশে বসতে বসতে বলল
তোমাকে এরকমই বৃষ্টির দিনে প্রথম দেখেছিলাম
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম
হ্য, মনে আছে
ও খুব অবাক হয়ে বলল
তোমার সত্যিই মনে আছে?
থাকবে না কেন? এইতো সেদিনের কথা
মুকুল হাসছে। কেন হাসছে বুঝতে না পেরে আমি বললাম
হাসছেন কেন?
ও হাসি থামিয়ে বলল
তোমাকে আমি প্রথম তিথিদের ছাদে দেখিনি। দেখেছিলাম আরো প্রায় বছরখানেক আগে। তুমি শহীদ মিনারের সামনে একটা ছোট কুকুর ছানা কোলে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে যাচ্ছিলে।
আমার শরীর কেমন শিরশির করে উঠলো। সেদিনের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমি ঢাকা মেডিকেলে বাবার কাছে গিয়েছিলাম। মেডিকেলের গেটেই ছোট কুকুরছানাটাকে দেখে এত কষ্ট হলো যে তুলে নিলাম। বাবাকে এত করে অনুরোধ করার পরও বাবা রাজি হলো না ওকে আমাদের সঙ্গে রাখতে। আমি তখন ওকে নিয়ে কি করি? বাইরে তখন বৃষ্টি নেমেছে, ভাবলাম ওকে তিথিদের বাসায় দিয়ে আসি। ওদের বাসায় তো আরো কিছু কুকুর আছে। বেরিয়ে কোন রিক্সা ও পাচ্ছিলাম না। শহীদ মিনার পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম। এত কান্না পাচ্ছিল। কেন ওকে আমাদের সঙ্গে রাখতে পারব না? হঠাৎ করেই কোত্থেকে একটা ছেলে এসে আমাকে বলল
কি হয়েছে খুকি? কোন সমস্যা? তোমার কোন সাহায্য লাগবে?
আমার এত রাগ হয়েছিল। মনে হয়েছিল ছেলেটা গায়ে পড়ে কথা বলতে এসেছে। নিশ্চয়ই কোন বদ মতলব আছে। খুব খারাপ ব্যবহার করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা রিক্সায় উঠে গিয়েছিলাম। কি অদ্ভুত! ওটা মুকুল ছিল? আমি কোনমতে বললাম
ওটা আপনি ছিলেন?
হ্যাঁ এরপর আমি কতবার যে ওখানে তোমাকে খুঁজেছি। অথচ তুমি আমার এত কাছেই ছিলে। সেদিন তিথিদের ছাদে তোমাকে দেখে এত অবাক হয়েছিলাম নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
মুকুল আরো কি সব বলছে। আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। বারবার শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছে; তার মানে ও সেদিন আমার বৃষ্টি ভেজা শরীর দেখে আমাকে বিয়ে করতে চায়নি। আমি শুধু শুধু এতদিন ওকে ভুল বুঝেছি। আমার ভেতরে কিছু একটা হল। সেদিনের মতো আমি আবারো ওকে দুই হাতে আঁকড়ে ধরলাম। বোধহয় একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলেছিলাম। ও আমাকে দুই হাতে তুলে নিয়ে নিচে আমাদের ঘরে নিয়ে গেল।
উত্তাল রাত্রির শেষ প্রহরে মুকুল আমাকে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে বিষন্ন কন্ঠে বলল
আমার সাথে যাবে তুলি?
যাব
কোথায় যাবে জানতে চাইলে না?
যেখানে নিয়ে যাবেন সেখানেই যাব
সত্যি?
হু
আমি অস্ট্রেলিয়ায় ইমিগ্রেশনের জন্য এপ্লাই করেছি। অনেকটা প্রসেস এগিয়ে গেছে। হয়ে গেলে আমরা দুজন চলে যাব। কেমন?
শুধু আমরা দুজন যাব?
হ্যাঁ, শুধু তুমি আর আমি। যাবে তো?
যাব
একটা বড় উঠানসহ বাড়ি নেব। সেখানে তুমি যত ইচ্ছা হাস, মুরগি, বিড়াল, কুকুর হরিণ রাখতে পারবে।
হরিণ ও রাখতে পারব?
পারবে না কেন? নাকি তুমি ক্যাঙ্গারু রাখতে চাও?
আমি হেসে ফেললাম। পুরোটা আমার কাছে কেমন স্বপ্নের মতন লাগছে। হঠাত কেমন ভয় করতে লাগল। স্বপ্ন তো হয়ই ভেঙে যাবার জন্য।
চলবে………
ভুল সত্য
১৪
দরজা খুলে আমি যতটা না অবাক হলাম খুশি হলাম তার চাইতে অনেক বেশি। রেহানা আন্টি কতদিন পর বাসায় এসেছে। আমি উকি দিয়ে তিথিকে খুঁজতে লাগলাম। আন্টি হাসতে হাসতে বললেন
ও আসছে একটু পরেই
আমি হরবর করে অনেক কথা বলতে লাগলাম। তারপর আন্টিকে হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেলাম। উনি আশেপাশে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বললেন
তোর শাশুড়ি কোথায়?
ঘরে। একেবারে নামাজ গোসল শেষ করে খেতে আসবেন। তুমি আমাদের সঙ্গে খাবে তো?
খাব। তিথি আসুক তারপর একসঙ্গে খাবো। রান্না কি তুই করলি নাকি?
হ্যাঁ আজকে আমার ক্লাস ছিল না। আমি রান্না করেছি
রেহানা আন্টি ভুরু কুচকে বললেন
প্রতিদিন তোকে রান্না করতে হয় নাকি?
কাজের একটা মহিলা আসে। আমার ক্লাস থাকলে ওই করে।
কে? নাজু?
হ্যাঁ তুমি দেখি সবকিছুই জানো
আরে, নাজুকে তো আমি ব্যবস্থা করে দিয়েছি
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। তবে যে তাদের দুজনের মধ্যে খুব আঁতাত চলছে এখন। তার কি?
উনি মনে হয় আমার মন পড়ে ফেললেন। বললেন
আমি বলেছি বেশি ঝগড়া ঝামেলা না করে একটু বন্ধুত্ব করে নিতে।
বন্ধুত্ব? মানে এখন ওদের দুজনের মধ্যে যেটা চলছে তুমি সেটাও জানো?
জানব না কেন? ওই যে তোর শাশুড়ির বস্তা ভরে ওকে খাবার দিয়ে দিচ্ছে ওইটা তো?
আমি আবারো অবাক।
তোর শাশুড়ি নিজেকে খুব বুদ্ধিমতী মনে করে। সে বুদ্ধিমতী এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে বাকিদের বোকা ভাবে এটা ঠিক না
একটা ব্যাপার অবশ্য আমিও লক্ষ্য করেছি; আমার শাশুড়ি অন্যদের সঙ্গে যতই ঝামেলা করুক না কেন রেহানা আন্টিকে কেমন একটু সমীহ করে। আন্টির ব্যাপারটাও অদ্ভুত ওনাকে ভাবি না ডেকে কেমন কোন সম্বোধন এড়িয়ে যায়। এমনকি আপনি তুমিও বলে না। কথাবার্তা হয় ভাববাচ্যে। ওনার আচরণটা আবার সম্পূর্ণই বিপরীত। উনি রেহানা আপা আর আপনি আপনি বলে নিজেকে ছোট প্রমাণ করার একটা চেষ্টা সবসময় চালিয়ে যান। আন্টি অবশ্য এতে বিরক্ত না হয়ে বরং খুশি হন।
তুই গোসল করেছিস?
করেছি সকালে একবার এখন আবার করব। কথাটা বলেই মনে মনে জিভ কাটলাম। এত ডিটেলে না বললেও চলবে।
চল তো, তোর ঘরে গিয়ে দেখি ঘর কেমন সাজিয়েছিস।
আমি আন্টিকে নিয়ে উপরে যাওয়ার সময় দেখলাম আমার শাশুড়ির ঘরের দরজা বন্ধ। আন্টির কাছ থেকেই জানতে পারলাম তিথি একজনের সঙ্গে দেখা করতে কাছেই একটা রেস্টুরেন্টে গেছে। আমাদের বাড়ির কাছেই ধানমন্ডি সাতাইশে। ছেলেপক্ষ ওদের বাড়িতে এসে আনুষ্ঠানিক দেখাদেখি করে গেছে।। আজ ছেলের সঙ্গে আলাদা কথা বলবে তাই একটা রেস্টুরেন্টে বসেছে। আমাকে বলেছিল আগে। ইস! একদম ভুলে গেছি। কি যে হয়েছে আমার, নিজেকে নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে আছি। তাকিয়ে দেখলাম আন্টি কেমন জহুরীর মত চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর বলল
মুকুলের সঙ্গে তোর সব ঠিকঠাক চলছে?
আমি একটু লজ্জা পেয়ে বললাম, হু
উনি আর কথা বাড়ালেন না। বললেন
যা তাড়াতাড়ি গোসল করে আয়। তিথি চলে আসবে, টেক্সট করেছে।
আমি হাফ ছেড়ে বাচলাম। অন্তত মায়ের মতন করেনি। গত মাসে মায়ের ওখানে গিয়েছিলাম এক শুক্রবারে। সেদিন মুকুল আমাকে নিয়ে সকাল সকাল বেরিয়েছিল। আমরা বাইরে সকালের নাস্তা করে একটু রিক্সা করে ঘুরলাম। ফুলার রোড শহীদ মিনার ওই দিকটাতে। তারপর মুকুল বলল
তুলি তোমাকে একটু তোমাদের বাসায় নামিয়ে দেই? অনেক দিন তো যাও না
আমি বুঝলাম নিশ্চয়ই তার অন্য কোথাও যাবার আছে। তার তো আবার বন্ধুর অভাব নেই। আমি বললাম
আজ কোন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন? নার্সারিতে যাদের সঙ্গে পড়েছেন?
ও একটু লজ্জা পেয়ে বলল
না মানে অনেকদিন ধরে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয় না তো; তাই ওরা খুব করে ধরেছে। বেশি সময় লাগবে না আমি লাঞ্চের পর তোমাকে ওখান থেকে পিক করে নেব, তারপর সারা বিকেল ঘুরবো। কেমন?
ওর কৈফিয়ৎ দেয়া দেখে আমি হেসে ফেললাম। বেচারার জন্য একটু খারাপই লাগলো। আমার জন্য ওর স্বাধীন জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল অথচ আমার সঙ্গেও সুবিধা করতে পারছে না।
অসময়ে আমাকে দেখে মা ভীষণ খুশি হয়ে গিয়েছিল। কি খেতে দেবে, কি রান্না করবে এই নিয়ে কতক্ষণ ছুটাছুটি করলে। আমি বিরক্ত হয়ে একসময় বললাম
কি শুরু করলে
ঠিক আছে চুপচাপ বসতো একটু কথা বলি
কি কথা?
দেখি এদিকে তাকা।, তুই কি মোটা হয়েছিস? চোখের নিচে কালি পড়েছে
কি সব অদ্ভুত কথা বলছো।
মুকুল কি তোকে খুব বিরক্ত করে?
না তো। বিরক্ত করবে কেন?
এরপর আমাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল
খবরদার পিল খাবি না।
আমি এতক্ষণে মায়ের কথা সারমর্ম বুঝতে পারলাম। লজ্জায় আমার সারা শরীর লাল হয়ে গেল। কোনমতে বললাম
এসব কি বলছো মা?
কি আবার বলছি? বিয়ের পর এত লজ্জা পেতে হয় না। বিয়ে হয়ে গেলে মায়েরা বন্ধুর মতন হয়ে যায়, তাদের সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করা যায়। তুই আমাকে সব বল।
আরে আজীব তো। কি বলবো?
সব খুলে বল। দেখ পুরুষ মানুষ ঘরেরটা না পেলে কিন্তু তখন বাইরেরটা খুঁজবে। মা হঠাৎ করেই পুন পুন করে কান্না শুরু করল, তারপর বলল
আমি চাই না তোর জীবনটা আমার মতন হোক।
মায়ের উপর রাগ হলেও সেদিন আমার খুব মন খারাপ হয়েছিল। কতবার যে মাকে বলেছি এসব ছেড়ে ছুঁড়ে চলে যেতে। কিন্তু ওই। লোকে কি বলবে, তার কলিগদের কাছে কি করে মুখ দেখাবে। এসব বলেই আমার মুখ বন্ধ করে দিয়েছে।
বিয়ের আগেও আমি মাকে এই কথাটা বলেছিলাম যে আমার জীবনটাও তো তার মতোই হতে পারে। কিন্তু মা মানেনি। রেহানা আন্টির উপর তার অগাধ বিশ্বাস। উনি যখন বলেছেন ছেলে ভালো তার মানে অবশ্যই ভালো। রেহানা আন্টিকে অবশ্য আমিও ভীষণ বিশ্বাস করি। আমার ভীষণ কঠিন একটা সময় উনি আমার পাশে ছিলেন।
এখনো মনে আছে আশরাফ চাচার ঘটনাটার পর আমি ভীষণ ভেঙ্গে পড়েছিলাম। কারো সঙ্গে শেয়ার করতে পারছিলাম না। শুধু তিথিকে বলেছিলাম।প্রমিস করিয়েছিলাম যেন কাউকে না বলে। তিথি অবশ্য সে প্রমিস রাখেনি। ওর সাথে এজন্য আমার ঝগড়া ও হয়েছিল অনেক। তবে এখন বুঝতে পারি ভাগ্যিস ও প্রমিসটা রাখেনি। । ও যেদিন আমাকে বলেছিল ও মাকে সব বলে দিয়েছে আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম কোনদিন আর ওর সঙ্গে কথা বলবো না। সবাই আমার বিশ্বাস ভেঙেছে । এই পৃথিবীতে সবাই।
এর কদিন পর এক দুপুর বেলা রেহানা আন্টি বাড়িতে এসেছিলেন। সে সময় একা বাসায় থাকতে আমার ভীষণ ভয় করত কিন্তু উপায় ছিল না। মার ছুটি শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমার স্কুলেও যেতে ইচ্ছা করত না। আমি দরজা বন্ধ করে বসে থাকতাম। কেউ এলে দরজা খুলতাম না। আন্টিকে দেখে অবাক হয়েছিলাম খুব। কথা বলতে না চাইলেও উনি কি করে যেন আমার ভেতর থেকে কথাগুলো টেনে বের করে নিয়ে আসলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো ওনার সঙ্গে কথা বলে খুব হালকা মনে হয়েছিল নিজেকে। একমাত্র উনিই মনে হয় আমার অবস্থাটা বুঝতে পেরেছিলেন আমাকে বলেছিলেন
তুই যা করেছিস একদম ঠিক করেছিস। মেয়েদের নিজের সেফটি নিজেকেই দেখতে হয়। কোন রাজপুত্র এসে উদ্ধার করবে কিংবা তোর হয়ে অন্য কেউ কিছু করবে এই আশায় থাকবি না। সবসময় চোখ কান খোলা রাখবি। বুঝেছিস? আর এখন থেকে স্কুলের পর আর বাড়িতে একা থাকার দরকার নেই। তিথির সঙ্গে আমাদের ওখানে চলে আসিস। ঢাকা মেডিকেল তো আমাদের বাসার কাছেই ফেরার সময় তোর বাবা তোকে নিয়ে যাবে।
সেই রেহানা আন্টি আমার ব্যাপারে সবকিছু জানা সত্ত্বেও যখন আমার বিয়ের কথা তুললেন আমি ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। রাগ হয়েছিল খুব তার উপর। কিন্তু উনি অনেক বুঝিয়েছিলেন। আমাকে ডেকে নিয়ে আলাদাভাবে অনেক কথা বলেছিলেন
বিয়ে তো একদিন তোকে করতেই হবে, আজেবাজে কোন ছেলের হাতে পড়ার থেকে মুকুলকে বিয়ে কর। ও খুব ভালো ছেলে। আমি ওকে ভালো করে চিনি।
আমার বিশ্বাস হয়নি। আমি বলেছিলাম
সবাই এমন বাইরে থেকে ভালোই হয়। তুমি কি আর তার ভেতরের রূপটা জানো? ও তোমার ভাইয়ের ছেলে তাই হয়তো তোমার তাকে ভালো মনে হচ্ছে। পৃথিবীর সব ছেলেরাই এমন। সবাই তো কারো না কারো ভাই, বাবা, বোনের ছেলে।
আন্টি হেসে ফেলেছিলেন। বলেছিলেন, একদিন বুঝবি।
মুকুল ফিরল অনেক রাতে। আজকাল প্রায়ই রাত করে ফেরে। অফিসে নাকি কাজের অনেক চাপ। সামনের সপ্তাহে ওর কনফারেন্স। কনফারেন্সের জন্য চিটাগাং যাচ্ছে তিনদিনের জন্য। আমাকে বলেছিল মায়ের ওখানে গিয়ে থাকতে আমার ইচ্ছা করেনি। আমি বলেছি এখানেই থাকবো। তাছাড়া কনফারেন্সের পর ও দশ দিনের ছুটি নিয়েছে। আমরা মালয়েশিয়া যাচ্ছি। বিয়ের পর কোথাও যাওয়া হয়নি তাই একবারে ছুটি জমিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি আগে কখনো মালয়েশিয়া যাইনি।
দুপুরে তিথিদের সঙ্গে অনেক খাওয়া-দাওয়া করেছি বলে আমি আর রাতে কিছু খাইনি।। মুকুল ও বলল দেরি হয়েছে বলে অফিস থেকে খাবার দিয়েছে। ওর খিদে নেই। ঘরে ঢুকে একবারে গোসল করতে চলে গেল। । আমি সব গুছিয়ে ঘরে এসে দেখলাম ওর ফোন বাজছে। দেখার আগেই বন্ধ হয়ে গেল। মুকুল নতুন ফোন কিনেছে। একদিন আমি দেখছিলাম তখন লক্ষ্য করলাম ফোন লক করা। আমার একটু রাগ হয়েছিল। ফোন লক করে রাখার কি মানে? আমি কি ওর ফোন নিয়ে ঘাটাঘাটি করব। আমি এই কথা ওকে বলেছিলাম ও। তখন বলেছিল
তোমার জন্য করিনি। তুমি চাইলে তোমাকে কম্বিনেশন বলে দেব। আমার কলিগরা গ্যালারি থেকে ছবি দেখে। আমার ভালো লাগে না সেটা।
এটা অবশ্য ঠিকই বলেছে। মুকুল আমার অনেক ছবি তুলে দেয়। সেসব ছবি অন্য কেউ দেখছে ভাবতে আমার ও ভালো লাগে না।
ফোনটা আবারো বাজছে। আমি কাছে গিয়ে দেখলাম শাওন নাম উঠে আছে। এই শাওন টা আবার কে? ভাবতে ভাবতেই ফোনের স্ক্রিনে একটা মেসেজ ভেসে উঠলো। মেসেজটার দিকে তাকিয়ে আমার সারা শরীর জমে গেল। নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না। এমনটাই যদি হবে তাহলে কেন আরো আগে হলো না। এভাবে আমার বিশ্বাস ভাঙার কি অর্থ ?
চলবে………