ভুল সত্য পর্ব-১৮

0
12

ভুল সত্য

১৮

কিরে, তুই আজকে কলেজে এলি যে?
তিথির কথা শুনে আমি বিরক্ত হয়ে তাকালাম
কেন? কলেজে আসব না কেন?
শুনলাম ভাইয়ের জ্বর, তা বরকে ফেলে চলে এলি?
জ্বর তো কি হয়েছে? তাকে দেখার লোকের কি অভাব?
খুব সেবা যত্ন করছিস শুনলাম
আমার আপাদমস্তক জ্বলে গেল। এরা দেখি সব খবরই রাখে, তা এত খবরই যখন রাখে তখন শাওনের খবরটা রাখতে পারল না? এক মিনিট! নিশ্চয়ই এরা শাওনের ব্যাপারে সব জানে। আমি একটু রাগত স্বরেই বললাম
সব খবরই রাখিস দেখছি।
রাখবো না কেন? আমার প্রিয় বান্ধবী আর আমার একমাত্র ভাই
তাহলে তো শাওনের খবরও জানিস নিশ্চয়ই
তিথি একটু অবাক হয়ে বলল।
কেন, তার আবার কি হলো?
যা ভেবেছিলাম তাই। তার মানে এরা সবাই শাওনকে চেনে।
তুই শাওন কে চিনিস?
ওমা, চিনবো না কেন?
কতটুকু চিনিস?
মাঝেমধ্যে আমাদের বাড়িতে এসেছে। আমার চেয়ে মায়ের সঙ্গে ভাব বেশি ।
এই কথা শুনে আমার রাগ আরো বেড়ে গেল । যাও ভেবেছিলাম তিথির সঙ্গে পুরো বিষয়টা শেয়ার করব সবকিছু নিয়ে একটা আলোচনা করব তারপর হোস্টেলে ওঠার ডিসিশন নেব। কিন্তু না, এখন ঠিক করে ফেলেছি, আর কোন অবস্থাতেই কারো সঙ্গে কোনো কথা বলবো না।

আমি ক্লাস আছে এই ছুতো করে ওর সামনে থেকে চলে গেলাম। ক্লাস আসলেই ছিল কিন্তু মন বসলো না। আমি পরের ক্লাসটা না করে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। কাল দুটো হোস্টেলের সাথে কথা বলেছি। কথা বলে তো ভালোই মনে হয়েছে। লোকেশন ভালো। একটা আজিমপুরে অন্যটা রায়ের বাজারে। আজিমপুর হলেই আমার জন্য ভালো। কলেজ থেকে কাছাকাছি হবে তাছাড়া আমি রায়ের বাজারে থাকতেও চাই না। মুকুলদের বাসা শংকর, কাছাকাছি এলাকায় থাকলে দেখা যাবে দেখা-সাক্ষাৎ হয়ে যাবে।

আমি রিক্সা নিয়ে হোস্টেল দুটো থেকে ঘুরে এলাম। দুটোর একটাও পছন্দ হলো না। আজিমপুরেরটাতে শেয়ারের রুম, শেয়ারের বাথরুম। জঘন্য অবস্থা। আর রায়ের বাজারেরটা এমন চিপা গলির ভেতর যে রাত বিরাতে ওখানে যেতে গেলে ভয়ই আমি মরে যাব। লাভের লাভ কিছু তো হলোই না উল্টো ড্রেনের মধ্যে পা পিছলে পা কেটে ফেললাম খানিকটা। কাটা পা নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাসায় ফিরে আমি হতবাক। আমার শাশুড়ি নাজুকে নিয়ে বাজার করতে চলে গেছে। অসুস্থ ছেলেকে একা ফেলে এই মহিলা বাজার করতে চলে গেল? আমি আসা পর্যন্ত একটু অপেক্ষা পর্যন্ত করতে পারল না। কি জানি কি খেয়ে আছে সকাল থেকে। আমি দৌড়ে সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলাম। ঠিক যতটা উদ্বেগ আর অস্থিরতা নিয়ে ঘরে ঢুকেছিলাম ততটাই রাগ আর হতাশা আমাকে ঘিরে ধরল। মুকুল পা ছড়িয়ে বিছানায় বসে কারো সঙ্গে ফোনে কথা বলছি আর উচ্চস্বরে হাসছে। আমি একটু থেমে ওর কথা শুনতে লাগলাম ও হাসতে হাসতে বলছে

তুমি যে কি বলো না তোমার কথা শুনে আমার কান গরম হয়ে যাচ্ছে।

ওই পাশের কথা শোনা যাচ্ছে না তবে মুকুলের হাসি আবারো শুনতে পেলাম।
রাগে আমার ব্রহ্মতালু জ্বলে গেল। আমি ঘরের ভেতর ঢুকে ব্যাগ একপাশে রাখলাম শব্দ করে। মুকুল আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তারপর ইশারায় জানতে চাইলো এত তাড়াতাড়ি কেমন করে এলাম। আমি দাঁতে দাঁত পি্ষে মনে মনে বললাম এসে মনে হয় বিপদে ফেলে দিয়েছি? মুকুল আবারো ফোনে মনোযোগী হয়ে বলল
আচ্ছা ঠিক আছে রাখছি এখন
আবার ওই দিককার কথা শোনা গেল না। মুকুল বোধহয় আমাকে শোনানোর জন্যই বলল
হ্যাঁ বউ চলে এসেছে এখন আর তোমাকে দরকার নেই।
কত বড় বেয়াদব। আমার সামনে এসব কথা বলা শুরু করেছে। সামান্যতম চক্ষু লজ্জা পর্যন্ত নেই। মুকুল হাত বাড়িয়ে আমাকে কাছে ডাকল। আমি কাছে এসে বললাম কার সঙ্গে কথা বলছিলেন ?
আমার কলিগ
কোন কলিগ?
তুমি চিনবে না
শয়/তান একটা। না চেনালে চিনব কি করে? আমি ইচ্ছে করেই বললাম
আমাদের বিয়েতে এসেছিল?
কে শাওন? না ও আসতে পারেনি। কি যেন একটা ঝামেলা ছিল ওর। বাদ দাও ওর কথা। তুমি এত তাড়াতাড়ি এলে কি করে?
কেন তাড়াতাড়ি এসে কি আপনাকে ঝামেলায় ফেলে দিলাম?
তোমার পরীক্ষা বলেছিলে, তাই জানতে চাইছি
আরে তাই তো! আমার তো পরীক্ষা ছিল লাস্ট পিরিয়ডের একদম ভুলে গেছি। কি যে সব হচ্ছে আমার সঙ্গে। কেন যেন রাগ অভিমান বাদ দিয়ে ভীষণ মন খারাপ লাগছে। আমি ওর পাশে বসে বললাম
শাওনকে কি আপনি অনেক দিন ধরে চেনেন ?
হ্যাঁ প্রায় তিন বছর
ও কি শুধুই আপনার কলিগ?
আমরা ভালো বন্ধু ও। তুমি হঠাৎ ওকে নিয়ে পড়লে কেন?
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম এমনি। দুপুরে খেয়েছেন কিছু?
না এখনো খাইনি। বাসায় কি কেউ নেই?
না সবাই বাজার করতে গেছে। টেবিলে নোট রেখে গেছে। আপনার খাবার কি এখানে নিয়ে আসবো?
না তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো তারপর একসঙ্গে খাই
খাওয়া টেবিলেও আমি বিশেষ কথা বলতে পারলাম না। আমার কেন যেন অসম্ভব মন খারাপ লাগছে। চেষ্টা করেও একটু স্বাভাবিক আচরণ করতে পারছি না । যে আমি সারা জীবন অভিনয় করে এসেছি, নিজের বাবা-মা অতি পরিচিত মানুষজনের সঙ্গে অভিনয় করেছি সারাক্ষণ; সেই আমি এখন কিছুতেই নিজেকে লুকাতে পারছি না। মুকুল বোধ হয় সেটা লক্ষ্য করেই বলল
কি হয়েছে তুলি? মন খারাপ? পরীক্ষা খারাপ হয়েছে? আমার জন্য পড়তে পারেনি তাই না?
আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললাম
না না আজকে পরীক্ষা হয়নি।
তাহলে কি হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে?
আমি ওর কথার জবাব না দিয়ে বললাম কালকে আপনি অফিসে যাবেন?
হ্যাঁ যাবো। সামনে ছুটি নিচ্ছি তো তাই এখন মিস করা যাবে না।
সামনে কিসের ছুটি ?
ও খাওয়া থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

আমার হঠাৎই মনে পড়ল, আরে তাইতো, আমাদের তো মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা সামনের সপ্তাহে। মনটা আগের চাইতেও বেশি খারাপ হয়ে গেল।

আমি পুরো বিকেলটা ছাদেই থাকলাম। মুকুল সারা দুপুর বিকেল ঘুমিয়ে কাটাল। সন্ধ্যার দিকে উঠে ওষুধ খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। সত্যিই অনেক ধকল গেছে ওর উপর। কনফারেন্স এর আগেও দিনরাত পরিশ্রম করেছে, তারপর জার্নির ধকল। আমি অনেক রাত করে ছাদ থেকে নামলাম। ঠিক করে রেখেছিলাম একটুও কাঁদবো না কিন্তু কেন যেন ওর ঘুমন্ত মুখটা দেখে ভীষণ কান্না পেল।

ঘরে ঢুকে দেখি ওর ফোন বাজছে। ও একেবারে ঘুমে কাদা হয়ে আছে। আমি কাছে গিয়ে ফোন ধরার আগেই রিং বন্ধ হয়ে গেল। তারপর টুং করে একটা মেসেজ এল। সেই মেসেজের ভাষা দেখে আমার ইচ্ছা হল বার্তা প্রেরণকারী আর গ্রহীতাকে যদি একসাথে দাঁড় করিয়ে ঝা/ড়ু দিয়ে পি/টাতে পারতাম তাহলে আমার মনে শান্তি আসতো। মেসেজ লিখেছে
হ্যভ আ সুইট নাইট বাবু। তার সাথে বেলুনের মতো উড়ে যাওয়া কতগুলো হার্ট সাইন।

চলবে………

ভুল সত্য
১৮

ভেবেছিলাম হোস্টেলে গিয়েই ঘুমের ওষুধ খেয়ে লম্বা ঘুম দেব কিন্তু ঘরে ঢুকেই মাথা আউলা হয়ে গেল। আমাকে বলা হয়েছিল সিঙ্গেল রুম সঙ্গে একটা এটাচ বাথরুম। কিন্তু ভেতরে ঢুকে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছি না। ছোট্ট একটা ঘুপচি টাইপের ঘর। কায়দা করে তিনটা বেড ফেলা হয়েছে। বিছানার পাশে নিয়ম মত একটা টেবিল ঠিকই আছে কিন্তু এই সাইজের টেবিল কোথা থেকে আমদানি করেছে সেটা একটা বিস্ময়। আমাদের টি টেবিলের সাইজ এর থেকে বড়। কোন বইয়ের তাক নেই। জামা কাপড় কোথায় থাকবে বুঝতে পারছি না।
আমাকে যে মেয়েটা ঘর দেখিয়ে দিল সে এখানে রান্নাবান্নার কাজ করে। আমি তার কাছে জানতে চাইলাম হোস্টেল ম্যানেজার বা সুপার যাই হোক তার সঙ্গে কি করে দেখা করা সম্ভব। সে জানালো তিনি ঘন্টাখানেক পর আসবেন। এখানে এসে আমার সঙ্গে দেখা করে যাবেন। উপায়ান্তর না দেখে আমি ঘরের ভেতর পা বাড়ালাম। ।

ভেতরের অবস্থা আরো ভয়াবহ। পুরো ঘর জুড়ে সিগারেটের গন্ধ। কারণ অন্বেষণ করতে গিয়ে তাকিয়ে দেখলাম কোনার দিকের খাটে একটা মেয়ে বসে আছে।
শ্যামলা মতন কোঁকড়ানো চুল, বড় বড় চোখ। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। রাতের বেলা হলে ভয় পেয়ে যেতাম নির্ঘাত। মেয়েটা আমার দিকে না তাকিয়েই নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল
শীতের পাখি নাকি?
কণ্ঠস্বর বেশ মিষ্টি তাই রাগ করতে পারলাম না। খাটের উপর ব্যাগ রেখে বললাম
কি বললে?
বাবা মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে এসেছ?
শীতের পাখিরা কি বাবা মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে এখানে আসে?
মেয়েটা একটু অদ্ভুত ভঙ্গিতে আসলো। তারপর বলল
তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে না, রেগুলার মাল
রেগুলার মালরা কি করে?
মেয়েটা আবারো অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসলো। তারপর বলল
তোমার মত মেয়েরা বাবা মা কিংবা স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে বিলাসিতা করে এখানে ওঠে তারপর দু-তিন বাদে তারা এসে মান ভাঙ্গিয়ে নিয়ে যায়। এই আর কি। কমন কেস।
কথাবার্ত এই পর্যায়ে হোস্টেল সুপারকে হন্তদন্ত হয়ে ঘরের ভেতর ঢুকতে দেখা গেল। আমার মেজাজ এমনিতেই খারাপ হয়ে ছিল। আমি তেতে উঠে বললাম
এই রুমটাই কি আমার? আপনি তো বলেছিলেন সিঙ্গেল রুম
উনি ওনার স্থূলকায় শরীর নাচিয়ে ভেতরে ঢুকে বললেন
হ্যাঁ হ্যাঁ সিঙ্গেল রুমই তো
তাহলে এখানে যে বসে আছেন তিনি কি? একটা শোপিস?
ও এখনো যায়নি?
আর অন্য বেডটা কি আমার জামা কাপড় রাখার জন্য?
আরে আপা এত রাগ করেন কেন?
ওই বেডে যে ছিল তার বিয়ে হয়ে গেছে। বেড সরায়া ফেলা হবে।
আর ইনি?
এর তো তিন মাসের ভাড়া পাওনা। পরশুদিনের মধ্যে ভাড়া দিতে না পারলে ইনিও গন
মেয়েটা বসা অবস্থা থেকে হাতের মধ্যে মাথা রেখে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল তারপর আয়েশ করে ধোয়া ছেড়ে বলল
চেষ্টা করে দেখেন। আমি বের হয়ে গেলে আপনার হোস্টেলে না সার্কিট হয়ে যায়
মহিলা এবার একটু নরম হয়ে বললেন।
আচ্ছা ঠিক আছে সে দেখা যাবে। তারপর আমার কাছে এসে গলা নামিয়ে বললেন
আপা, মেয়ে ভালো। একা একা থাকবেন ভয় লাগবে না? থাকুক কয়দিন। সামনের মাসে এরে পাশের রুমে পাঠায়া দিব। তখন পুরা ঘর আপনার।
আপনি ভাঙ্গা মাসে উঠছেন তো
কিন্তু টাকা তো পুরো মাসেরই নিয়েছেন
আচ্ছা ছাড়েন এসব। দুপুরে কি খাবেন বলেন?
ভদ্রমহিলা এমন ভাব করছেন যেন এটা একটা রেস্টুরেন্ট; যা চাইবো তাই এনে হাজির করবে। আমি ইচ্ছে করেই বললাম
সরপুঁটি মাছ ভাজা, ঘন মুগের ডাল আর সাদা ভাত
মহিলা বিগলিত হয়ে বললেন
আপা যে কি বলেন। আজকের মেনু খুচুরি, আলু ভর্তা আর ডিম ভুনা। সাপ্তাহিক মেনু ডাইনিং এ টানানো আছে। চা কফি খেতে চাইলে নিজ খরচে। মোড়ে একটা চায়ের দোকান আছে সেখান থেকেও আনাতে পারেন।

চা এর কথা শুনে চা খেতে মন চাইছে। মোড়ের দোকানে গিয়ে খেয়ে আসা যায় বেরোতে ইচ্ছা করছে না। মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করা যায় সেটাও ইচ্ছা করছে না। আমি ব্যাগ খুলে একটা চাদর বের করে বিছানাটা গুছিয়ে ফেললাম।আসার আগে শুধু আমার ব্যগপ্যক টা সাথে এনেছি।দুই জোড়া জামা, একটা বিছানার চাদর তোয়ালে , ল্যাপটপ মোবাইল ছাড়া আর কিছু ই আনতে পারিনি। ভেবেছিলাম সব কিনে নেব। একটা তালা অব্ধি কেনা হয়নি। ভাগ্যিস গয়নাগুলো মার ওখানে রেখে এসেছিলাম।

এভাবে বাড়ির বাইরে কখনো একা থাকিনি। হাত পা ছড়িয়ে কাদতে ইচ্ছে করছে।
কান্নাকাটি করে কোন লাভ হবে না। বাড়ি ফিরে যাও
আমি চমকে উঠলাম। এই মেয়ের দেখি মাথায় পেছনে ও চোখ আছে। আমি কিছু বললাম না। কিন্তু ও কথা থামাল না বলেই যেতে লাগলো।

চার ঘন্টা ও এখানে টিকতে পারবে না। পাশের বেডের মদিনা যখন আসবে তখন টের পাবে।
আমি আতকে উঠে বললাম
কেন? সে না চলে গেছে?
আরে ধুর! ওই মুটকির কথা বিশ্বাস করেছ নাকি। মদিনা আসে গভীর রাতে ভোরের আগে বেরিয়ে যায়। সুটকেস টুটক্যেস তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। ভালো করে তালা মেরে রেখ। ওর হাত টানের অভ্যাস আছে। আমার ন্যপকিনটা পর্যন্ত ছাড়ে না।
এই মেয়ের বকবকানি শুনে মাথা ধরে যাচ্ছে। তোর এত কি? তবে যতই ভাবলেশহীন ভাব ধরে থাকি না কেন এবার আমার সত্যিসত্যিই চিন্তা হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার। মুকুল নিশ্চয়ই এতক্ষনে বাড়ি চলে এসেছে। আমি আসার আগে কাউকে বলে আসিনি। ড্রেসিং টেবিলের উপর একটা চিরকুট রেখে এসেছি। বিস্তারিত কিছু লিখিনি, শুধু লিখেছি “আমি চলে যাচ্ছি। আপনি আপনার শাওনকে নিয়ে সুখে থাকুন”। ও নিশ্চয়ই এতক্ষণে মাকে জানিয়ে দিয়েছে। মা নির্ঘাত তুলকালাম করে ফেলেছে এতক্ষণে।
কেসটা কি? বাবা মায়ের সাথে অভিমান নাকি স্বামীর পরকীয়া।
এবারে আমার মেজাজটা সত্যি সত্যি খারাপ হলো। আমি বিরক্ত কন্ঠে বললাম
তোমাকে কি হোস্টেল খালি করার কাজে নিয়োগ দেয়া হয়েছে? যে আসবে তাকে ভয় দেখিয়ে বিদায় করে দিতে হবে?
মেয়েটা এবার হেসে ফেলল এবং আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম ওর শ্যামলা মুখশ্রী সঙ্গে হাসিটা বেশ মানিয়ে গেছে। ও আমার দিকে সিগারেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল
একাটা টান মেরে দেখো। মাথার ভেতর যে ধোঁয়াশা জমে আছে একটানে সব খালি হয়ে যাবে।। কান্না থেমে যাবে নির্ঘাত।
আমি এর আগে সিগারেট খেয়েছি দুই একবার। তবে বিশেষ সুবিধা করতে পারিনি। তবু হাতে তুলে নিলাম। এই ব্যাপারটা আশ্চর্যের। মানুষ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে পাশের জনকে এগিয়ে দিতে পারে না কিন্তু সিগারেট অবলীলায় অন্য জনকে অফার করা যায় এবং সেও তা নির্দ্বিধায় ঠোটে ছুঁয়ে ফেলে। আমি লম্বা একটা টান দিলাম। মাথার ভেতরের ধোঁয়াশা তো কাটলোই না বরং ফুসফুসের মধ্যে জ্যাম বেধে গেল। আমি কাশতে কাশতে সিগারেট ওর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললাম
এই জিনিস খাও কি করে? সিগারেট নাকি গাজা?
গাজা না। সিগারেটই, তবে সস্তা ব্র্যান্ড।
মেয়েটা এবার হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল
আমি নিবেদিতা। চারুকলা থার্ড ইয়ার।
আমি নিজের পরিচয় দিলাম। চালুকলার সঙ্গে জিন্স এবং সিগারেটের বোধহয় গভীর সম্পর্ক আছে। নারী পুরুষ নির্বিশেষে এই দুটোই তাদের ব্যবহার করতে দেখা যায়। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এই জায়গায় বেশি দিন থাকা যাবে না। ঘর ভর্তি সিগারেটের ধোঁয়া। এক রুমমেট বাচাল অন্যজন চুরিতে সিদ্ধহস্ত। বাথরুম রান্নাঘর তো এখনো দেখাই হয়নি। সেখানে কি অপেক্ষা করছে কে জানে।

চারিদিকে মাগরিবের আজান দিচ্ছে। ঘরের পরিবেশ কেমন ভৌতিক। আমি এতক্ষণ পর আমার মোবাইলটা অন করলাম। যা ভেবেছিলাম তার থেকেও খারাপ অবস্থা। ১৯৬ টা মিসকল। ৮৫ টা মেসেজ। শেষ মেসেজটা করেছেন রেহানা আন্টি। সেটা পড়ে আমার আক্কেল গুরুম হয়ে গেল। আমি আমার ব্যগপ্যকটা কাধে নিয়ে ভো দৌড় দিলাম। পেছনে বলতে শুনলাম
চার ঘন্টা বলেছিলাম ২ ঘন্টা ৩৩ মিনিটের মাথায়ই কেল্লা ফতে।
আমি সেই মন্তব্য উপেক্ষা করে সামনে যে খালি রিকশা পেলাম তাতেই লাফিয়ে উঠে পড়লাম।
রেহানা আন্টি লিখেছেন আমার খবর শুনে মা অজ্ঞান হয়ে গেছে। তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেয়া হয়েছিল। এখন তিথিদের বাসায় আছে। অবস্থা আশঙ্কাজনক।

আমি দৌড়াতে দৌড়াতে তিথিদের বিল্ডিং এর সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। ওদের ফ্ল্যাটের দরজা খোলাই। ভেতর থেকে বেশ গল্প গুজবের শব্দ ভেসে আসছে। আসারই কথা ভেতরে যখন আশঙ্কাজনক রুগী। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। মা টেবিলে বসে চা খাচ্ছে। টেবিল ভর্তি নানান পদের মিষ্টি। রেহানা আন্টি বিস্কুট আর ডালপুরি এগিয়ে দিতে দিতে বলছেন
আপা তো কিছুই খাচ্ছেন না। আরেকটু নিন। আজ এত খুশির একটা দিন।
তিথি রান্নাঘর থেকে লজ্জা লজ্জা মুখ করে বেরিয়ে এসে বলল
আরে তুই এসে গেছিস? আয় বস। চা নে।

বিরাট ভুল হয়ে গেছে। উপরে ওঠার আগেই নিচের ডাস্টবিন থেকে এক বালতি ময়লা নিয়ে ওঠা উচিত ছিল।। সেটা টেবিলের উপর ঢেলে দিতে পারলে আমার মনে শান্তি আসতো।

চলবে………