#ভূমধ্যসাগরের_তীরে
#পর্বঃ২৯
#লেখিকা_দিশা_মনি
মিষ্টি অন্ধকার কক্ষে বসে ঝিমোচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ করে রুমে আলো জ্ব্বলে ওঠে। মিষ্টি সামনে তাকাতেই দেখতে পায় ইয়াসিন তার সামনে খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ তাকে দেখেই মিষ্টি মৃদু হেসে বলে,
“আপনি এসেছেন! আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।”
ইয়াসিন উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে,
“নিশ্চয়ই আপনার খুব খিদে পেয়েছে, তাই না? এই খাবার টুকু খেয়ে নিন।”
বলেই মিষ্টির দিকে একটা খাবারের থালা এগিয়ে দেয়। মিষ্টির সত্যিই খুব ক্ষিধে পেয়েছিল। তাই সে খেতে শুরু করে দেয় এবং বলে,
“আপনার সাথে খুব জরুরি কথা আছে। আসলে আমি রাফসানের সাথে কথা বলতে চাই। আপনি একটু ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন?”
“কেন? আমার উপর বিশ্বাস হচ্ছে না, বুঝি?”
“না, না বিষয়টা মোটেই সেরকম নয়। আসলে…”
“আপনি আগে খাবারটা খেয়ে নিন৷ তারপর বাকি সব হবে।”
মিষ্টি আর কথা না বাড়িয়ে খেতে শুরু করে। আচমকা ইয়াসিন বলে ওঠে,
“আচ্ছা, মিষ্টি আপনি কি আমার জীবনের গল্প শুনতে ইচ্ছুক?”
“আপনার জীবনের গল্প?”
“হুম। আমার অতীত সম্পর্কে। শুনবেন?”
ইয়াসিনের কন্ঠে ছিল কাতরতা। মিষ্টি আর বেশি কিছু না ভেবে বলে,
“আচ্ছা, বেশ। বলুন আমি শুনছি।”
ইয়াসিন এবার তার অতীতের কথা বলতে শুরু করে,
“আমার জন্ম হয়েছিল আফ্রিকার দেশ মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কা শহরের নিম্ন-মধ্যবিত্ত একটা পরিবারে। আমার বাবা ছিলেন একজন সাধারণ দিনমজুর। তবে আমাদের জীবনে স্বচ্ছলতার অভাব থাকলেও ভালোবাসার কোন অভাব ছিল না। আমার বয়স যখন ৫ বছর তখন আমার বোন, আমার আমিনা পৃথিবীতে আসে। আমার আনন্দ যেন তখন আরো বেড়ে যায়। তবে..এই সুখ বেশিদিনের জন্য ছিল না। খুব শীঘ্রই এই নোংরা, জঘন্য পৃথিবী তার জঘন্য খেলা শুরু করে আমার সাথে। আমার বয়স তখন ১২ কি ১৩ হঠাৎ করে একদিন আমাদের বাড়িতে কিছু লোক এসে হামলা চালায়। আমার বাবা তাদের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছিল কিন্তু সময়মতো সেই টাকা ফেরত দিতে পারে নি। এজন্য তারা এসে অনেক চিল্লাপাল্লা করে। আমি আমার ৭ বছর বয়সী বোনটাকে সাথে নিয়ে চুপচাপ সব দেখে যাই। ততদিনে আমার বাবার অবস্থাও খারাপ হয়ে যায়। মাদকের কবলে পড়ে তিনি নিজের নৈতিকতা হারিয়ে ফেলেন৷ আর এরপরই আমাদের জীবনে সবথেকে কালো রাতটা চলে আসে। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে আমার বাবা তার কয়েকজন বন্ধুর কাছে আমার..আমার মা বোনকে এক রাতের জন্য বিক্রি করে দেয়..”
কথা বলতে বলতে ইয়াসিনের গলা ধরে আসছিল। এদিকে মিষ্টি এসব শুনে হতবাক হয়ে যায়। ইয়াসিন আবারো বলা শুরু করে,
“সেই রাতটা আমি কখনো ভুলব না। আমার চোখের সামনে ওরা আমার মা-বোনকে একের পর এক..”
“কি বলছেন এসব আপনি? ফাতিমা আন্টি…আর আমিনা তো তখন অনেক ছোট ছিল।”
“এই নোংরা পৃথিবীর নোংরামোর শিকার বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ সবাই হতে পারে মিষ্টি। জানেন, সেদিনের ঘটনা নিজ চোখে দেখার পর আমার এই পৃথিবীর প্রতি চরম ঘৃণা জন্মাতে শুরু করে। আর তার পরের দিনই আমি একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলি। নিজের বাবার প্রতি আমার ঘৃণা এতোটাই বেড়ে গেছিল যে আমি নিজের হাতে তাকে….আমি একটা রড হাতে নিয়ে সেটা দিয়ে তার মাথায় কমপক্ষে ২০-২৫ বার আঘাত করি। কি আর করবো বলুন? আমার বাবা যে আর আগের মতো ছিল না। নেশার বশে আর টাকার লোভে এক জানোয়ারে পরিণত হয়েছিল। এই নোংরা পৃথিবী যে কাউকে ভালো থাকতে দেয় না, কাউকে না। এই ঘটনার পরই আমার মা খুব ভয় পেয়ে যায়। তিনি সেদিনই আমাকে আর বোনকে নিয়ে পালিয়ে কাসাব্লাঙ্কা সমুদ্র বন্দরে চলে যান। সেখানে একটা কন্টেইনার ভর্তি জাহাজ ফ্রান্সে আসার জন্য রওনা দিচ্ছিল। মা তখন নিজের কাছে থাকা কিছু গহনা তুলে দেয় জাহাজের কিছু কর্মীর হাতে। তার বিনিময়ে তারা অবৈধভাবে আমাদের এই মার্সেই শহরে নিয়ে আসে। তারপর এখানে আমাদের এক নতুন জীবন শুরু হয়।”
এতক্ষণ ধরে এসব শুনে মিষ্টির গলা দিয়ে আর খাবার নামছে না। ইয়াসিনের চোখের দিকে তাকিয়ে সে তার দুঃখগুলো বোঝার চেষ্টা করছে। ইয়াসিনের চোখ দিয়ে অবিরাম অশ্রুবর্ষণ হচ্ছে। মিষ্টি কাপা কাপা হাতে ইয়াসিনের কাধে হাত রেখে বলে,
“এখানে আসার পর তো সব ঠিক হয়ে যায়, তাই না?”
ইয়াসিন একটা উপহাসের হাসি দিয়ে বলে,
“এই নোংরা, জঘন্য পৃথিবী কি এতটা মহান যে সব কিছু ঠিক করে দেবে? মার্সেই শহরে এসে কিচ্ছু ঠিক হয়নি মিষ্টি। বরং আমাদের জীবন যেন এক নতুন জাহান্নামে প্রবেশ করে। এখানে আসার কিছুদিন পরই আমাদের এখানকার পুলিশ ধরে ফেলে। তারা আমাকে এবং আমার মা-বোনকে অভিবাসী ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে আরো এক দূর্বিষহ জীবন কাটাই আমরা। সেই অভিবাসী ক্যাম্প যেন ছিল একখন্ড নরক
আমাদের সেখানে মাত্র একবেলা খাবার দেয়া হতো। তাও বাসি খাবার। ফ্রান্সের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে যেসব খাবার বেচে যেত বা মানুষ এটো করে রাখত তাই দেয়া হতো আমাদের। বিনিময়ে করিয়ে নেয়া হতো অমানবিক পরিশ্রম। জানো, নিজের চোখে আমি কয়েকজন ঐ ক্যাম্পে আত্ম** করতে দেখেছি এইসব সহ্য করতে না পেরে। শুধু তাই নয়, এই ক্যাম্পের কিছু কর্মী ছিল ভয়ংকর নারীলোভী। প্রতিদিন রাতেই তারা বহু নারীকে ক্যাম্পের পেছনে নিয়ে গিয়ে..”
মিষ্টি আর শুনতে পারছিল না। মানুষের জীবন যে এতো কঠিন হতে পারে সেটা ভেবেও তার কেমন জানি লাগছে৷ অথচ সে জীবনে এর সিকি ভাগ কষ্টও ভোগ করে নি। ইয়াসিন আরো বলে ওঠে,
“ঐ ক্যাম্পে আমাদেরকে আরো ২ বছর থাকতে হয়। ততদিনে পৃথিবীর প্রতি আমার ঘৃণা আরো বেড়ে যায়। আমি বুঝতে পারি, এই পৃথিবীতে মানুষ রূপী এক একটা শয়তান কিভাবে ঘুরে বেড়ায়। তখন থেকে আমার শুধু মনে হতে লাগে, যদি সুযোগ পেতাম তাহলে আমি এই নোংরা পৃথিবীকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতাম।”
মিষ্টি বলে,
“আমি আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছি মিস্টার ইয়াসিন। আপনার উপর দিয়ে অনেক ঝড় গেছে। কিন্তু কি করবেন বলুন? জীবন কারো কারো জন্য ভীষণ নির্মম হয়৷ এক্ষেত্রে আমাদের কারোর কিছু করার নেই। কিন্তু এই পৃথিবীর সব মানুষ খারাপ না। এত খারাপের মাঝেও অনেক ভালো কিছুও আছে এই পৃথিবীতে।”
ইয়াসিন হঠাৎ করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। মিষ্টি অবাক হয়। ইয়াসিন হাসি থামিয়ে বলে,
“কোন ভালো কিছু নেই এই পৃথিবীতে। জানেন, ঐ শরণার্থী শিবির থেকে বের হবার পর আমাদের সাথে কি হয়েছিল? আমার মা আর কোন কাজ না পেয়ে প**তিতালয়ে নাম লিখিয়েছিল। আর সেই পতিত**লয়ের মালিক কে জানেন? মিস্টার ল্যুঁই, এলিসের বাবা! যাকে সবাই মহান লোক মনে করেন।অথচ ঐ মহান লোকটাই আমার মাকে এই নোংরা কাজে নামিয়েছিল!”
“কি বলছেন কি আপনি এসব?”
“হ্যাঁ, ঠিকই বলছি আমি। তারপরেও দেখবেন, আমার মা ঐ লোকটার প্রতি কত কৃতজ্ঞ। কারণ উনি আমার মাকে একটা কর্মের সংস্থান করে দিয়েছেন যাতে উনি আমাকে আর বোনকে লালন পালন করতে পারেন।”
“কিন্তু আপনার মা তো একটা গ্রোসারি শপে কাজ করে।”
“ওটা তো দিনের বেলা। কিন্তু রাতের বেলা আমার মা…”
থেমে যায় ইয়াসিন। তার মুখ দিয়ে আর কোন কথা বের হয়না। এদিকে মিষ্টি তখনো হতবিহ্বল হয়ে গেছিল একদম। এত নির্মম সত্য জানার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ইয়াসিন হঠাৎ করে মিষ্টিকে প্রশ্ন করে বসে,
“এখন আপনি বলুন, আমার যায়গায় থাকলে কি আপনার এই পৃথিবীর প্রতি ঘৃণা জন্মাতো না?”
মিষ্টি বলে,”হয়তো জন্মাতো..”
“আমি নিশ্চিত বলতে পারি, আমার যায়গায় থাকলে আপনিও এই পৃথিবীকে ধ্বংস করতে চাইতেন। যেমনটা আমি চাই।”
মিষ্টি এবার পুরোদস্তুর অবাক হয়ে যায়। সে বলে ওঠে,
“তার মানে..”
“হ্যাঁ, আমি সেই কুখ্যাত সন্ত্রাসী দলের অন্যতম এক সদস্য যে এই পৃথিবীকে ধ্বংস করতে চাই।”
চলবে ইনশাআল্লাহ ✨
#ভূমধ্যসাগরের_তীরে
#পর্বঃ৩০
#লেখিকা_দিশা_মনি
ইয়াসিনের মুখে তার অপরাধী হওয়ার স্বীকারোক্তি শুনে মিষ্টি হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। ইয়াসিন মিষ্টির এই হতবাক চাহনি দেখে মলিন হেসে বলে,
“আমি জানি, আমার এই পরিচয় জানার পর আপনি আমায় ঘৃণা করবেন….আমাকে বিশ্বাস করার জন্য পস্তাবেন। তবে এটাই সত্যি যে, আমি সেই জঘন্য সংগঠনের একজন সদস্য যে এই পৃথিবীকে ধ্বংস করতে চাই।”
মিষ্টি বলার মতো কিছু খুঁজে পায় না৷ কিছু সময় নীরব থেকে বলে,
“এটা কিভাবে হতে পারে মিস্টার ইয়াসিন? আমি যেই ইয়াসিনকে চিনেছি যাকে নিজের বন্ধু ভেবেছি সে কিছুতেই এমন হতে পারে না।”
“এটাই আমি মিসেস মিষ্টি। ”
“আপনি এটা হতে পারেন না।”
মিষ্টির চোখে এই অবিশ্বাস দেখে ইয়াসিনের এলিসের চেহারাটা মনে পড়ে যায়। তার চোখেও এই অবিশ্বাস ছিল। ইয়াসিন বলে ওঠে,
“জানেন, এলিসকেও আমি নিজের হাতে শেষ করেছি। আরো অনেক নিরপরাধ মানুষকে আমি শেষ করেছি।”
মিষ্টি যেন অবাকের উপর অবাক হচ্ছিল। ইয়াসিন একটু দম নিয়ে বলে,
“ঐ শরণার্থী শিবির থেকে বেরোনোর পর থেকেই আমি এই পৃথিবীকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম। এভাবে সময় কাটতে থাকে একসময় আমার ফ্রান্সেরই এক স্থানীয় তরুণ ক্রিস্টোফারের সাথে পরিচয় হয়। তার বাবা ছিলেন চার্চের একজন পাদ্রী যাকে মিথ্যা অভিযোগে হ**ত্যা করা হয়েছিল৷ সেজন্য সেও এই পৃথিবীকে ঘৃণা করত। ক্রিস্টোফার আমাকে মার্সেই শহরের আন্ডারগ্রাউন্ডে গড়ে ওঠা এক নিষিদ্ধ সাম্রাজ্যে নিয়ে যায়। যেখানে আমাদের মতো আরো অনেক মানুষ ছিল৷ যাদের বেশির ভাগই নিম্ন-বিত্ত, দরিদ্র, অসহায় মানুষ যারা এই পৃথিবীর কষাঘাতে জর্জরিত। যারা ঘৃণা করত এই পৃথিবীতে। আমরা ঐ নিষিদ্ধ যায়গায় এক মাসের বেশি ছিলাম। সেখানে থাকাকালীন কিছু মানুষ প্রতিদিন এসে আমাদের বোঝায়, আসলে এই পৃথিবী হলো বড়লোকদের জন্য সুখের যায়গা আর আমাদের মতো যারা আছি তাদের শুধু কষ্ট পেয়ে যেতে হয়। এই পৃথিবী আমাদের জন্য শুধুই অভিশাপ। তাই এই পৃথিবীর টিকে থাকা উচিৎ নয়। যদি আমরা এই পৃথিবী ধ্বংস করতে পারি তাহলেই আমাদের মতো অসহায় মানুষেরা এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে। এসব কথা আমাদের উপর অনেক বড় প্রভাব ফেলে। তাই আমরা এই সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে যাই। ”
মিষ্টি ইয়াসিনের মুখে এসব শুনে বলে,
“কি বলছেন এসব আপনি? তার মানে তো এই সংগঠন মানুষের দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের ব্রেনওয়াশ করে ভুলপথে পরিচালনা করছে।”
“হয়তোবা তাই। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন তো, আমার মতো পরিস্থিতিতে থাকলে যে কেউই কি তাদের দ্বারা ব্রেনওয়াশড হবে না?”
মিষ্টি এই মুহুর্তে আর কিছু বলতে পারে না। ইয়াসিন বলে,
“জানেন, আমার বোন আমিনা..ও খুব সাহসী। আমার থেকে লুকিয়ে ও ফ্রান্সের গোয়েন্দা সংস্থায় যোগ দিয়েছিল। আমি সব জেনেও ওকে কখনো বলিনি। অথচ ও আমার আসল সত্যটা জেনেছে অনেক পরে। এলিসের মৃত্যুর একদিন আগে। আমিনাই আমাকে বলেছিল আপনাকে সাহায্য করতে। আমি তখন ভেবেছিলাম, আপনিও পৃথিবীকে বাঁচানোর এই মিশনে যুক্ত। সেই জন্য আপনাকে আমি শত্রু হিসেবেই গণ্য করেছিলাম। আমার উদ্দ্যেশ্য ছিল, সেদিন মেট্রোস্টেশনের বাইরেই আপনাকে মে**রে ফেলি।”
মিষ্টির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সে সেই জলটুকু মুছে নিয়ে বলে,
“তাহলে কেন মারলেন না আমায়?”
“যে কারণে আজ অব্দি আপনাকে মারতে পারছি না! ঠিক সেই কারণেই। জানেন, আমি অনেক অনেক মানুষকে নির্দয়ভাবে হ**ত্যা করেছি কিন্তু কখনো আমার হাত কাপেনি। কিন্তু আপনাকে দেখার পর না..আমি আপনাকে মারতে পারিনি। এই প্রথম কোন মানুষের প্রতি আমার মায়া জন্মেছিল। আমি নিজেই বুঝতে পারছিলাম না এর কারণ কি। অতঃপর আপনার ব্যাগ চুরি হলে আমি আপনাকে সাহায্য করতে এগিয়ে যাই৷ না চাইতেও আপনাকে সাহায্য করি৷ আপনাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আশ্রয় দেয়ার পর আমি আরো বেশি করে আমি আপনার মায়ায় আটকে গেলাম। তারপর যখন আপনার স্বামীর ব্যাপারে জানলাম, তখন আমার মনে হয়েছিল তাকে শেষ করে দেই। আপনি যখন বলেছিলেন ইমানুয়েল পল আপনার স্বামীর মতো দেখতে তখন আমি তাকে মেরে ফেলতে পর্যন্ত গিয়েছিলাম। তবে সেটা আর হয়ে ওঠে না। তবে পরে যখন ইমানুয়েল পল আপনাকে জেলে বন্দি করে অত্যাচার করেছিল তখন আমি সত্যিই তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করি কিন্তু অল্পের জন্য সে বেচে যায়। ”
মিষ্টি এসব শুনে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এরমধ্যে ইয়াসিন কাতর স্বরে বলে ওঠে,
“আপনিই সেই কারণ, যার জন্য আমার মনে হয়েছিল সব খারাপ কাজ বাদ দিয়ে আবার সঠিক পথে ফিরে আসতে। আপনাকে ভালোবেসে নতুন জীবন শুরু করতে।”
মিষ্টি এবার বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে বলে,
“ইয়াসিন!”
ইয়াসিন কাতর কন্ঠে বলে,
“জানি এটা সম্ভব নয়! তবে আমি একথা নিদ্বিধায় বলতে পারি, আমি যদি এই পৃথিবীতে কাউকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে থাকি, যেই পৃথিবীকে আমি চরম ঘৃণা করি সেখানে যদি আমার ভালো লাগার শুধুমাত্র একটা বিষয় থাকে সেটা শুধু আপনিই মিষ্টি শুধু আপনি।”
মিষ্টি ও ইয়াসিন দুজনেই একসাথে কাঁদতে থাকে। ইয়াসিন বলতে থাকে,
“আমি ভীষণ পাপিষ্ঠ তাই না, মিষ্টি? আমার সাথে থাকতে আপনার নিশ্চয়ই ভীষণ ঘৃণা হচ্ছে।”
“আপনি চুপ করুন প্লিজ..আমি আপনার এই পরিচয় মেনে নিতে পারছি না। আপনি আমার কাছে শুধুই ইয়াসিন। সেই ইয়াসিন যাকে আমি বন্ধু ভেবেছি।”
“যাক, এটা জেনে ভালো লাগল যে আপনি আমায় অন্তত বন্ধু ভেবেছেন। জানেন, এলিস মেয়েটা আমায় ভীষণ ভালোবাসত। নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসত। তবুও ওকে মা**রতে আমার হাত কাপেনি। অথচ আপনার গায়ে একটা আচড় দিতেও আমার হাত কাপবে।”
মিষ্টি জিজ্ঞেস করে,
“তাহলে কি আমার ব্যাগে বো-মা রাখা, জাহাজের মধ্যে আমায় গু**লি করা এসবের সাথে আপনি জড়িত ছিলেন না?”
“না,আমি এমন কিছু ভাবতেও পারি না। তবে আপনি মেট্রোস্টেশনে ধরা পড়ার পর যে আপনাকে বাঁচিয়েছিল সে আমিই ছিলাম।”
মিষ্টি অবাক স্বরে বলে,
“তাহলে এসবের পেছনে কে ছিল?”
“জানিনা। তবে আপনাদের অনেক শত্রু থাকতে পারে।”
এরইমধ্যে হঠাৎ করে চারিদিকে পুলিশের গাড়ির সাইরেন বেজে ওঠে। মিষ্টি হতবাক স্বরে বলে,
“পুলিশ এলো কোথা থেকে!”
“হয়তোবা আমার খবর পেয়ে এখানে এসেছে।”
বলেই সে হাতে বন্দুক তুলে নেয়। মিষ্টি ইয়াসিনকে অনুরোধ করে বলে,
“আপনি প্লিজ পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করুন। আমি জানি, আপনার মধ্যে একটা ভালো মানুষ আছে। আপনি..আপনি ভালো হতে পারবেন।”
ইয়াসিন একটা বাকা হাসি দিয়ে বলে,
“আমার এই ভালো রূপ শুধু আপনার জন্য মিষ্টি। বাকি পৃথিবীকে আমি শুধু ঘৃণাই করি। তাই আত্মসমর্পণ আমি করবো না।”
মিষ্টি কাতর স্বরে বলে,
“আমি আমার বন্ধুকে মরতে দেখতে পারবো না।”
ইয়াসিনের বুক হঠাৎ কেপে ওঠে। তবুও সে বলে,
“যেই ইয়াসিনকে তুমি বন্ধু ভেবেছ সে অনেক আগেই মারা গেছে। যেদিন সে তার মা-বোনকে ধ**তা হতে দেখেছিল, যেদিন সে নিজের হাতে তার বাবাকে হ**ত্যা করেছিল। এখন যাকে দেখছ সে সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ।”
বলেই ইয়াসিন বেরিয়ে যেতে নেয়। যাওয়ার আগে বলে,
“আর হয়তো কখনো বলার সুযোগ পাব না, তাই শেষবারের জন্য বলছি, আমি আপনাকে ভালোবাসি মিষ্টি, এই পৃথিবীতে একমাত্র আপনিই সেই ব্যক্তি যাকে আমি শেষদিন পর্যন্ত ভালোবেসে যেতে পেরেছি।”
বলেই ইয়াসিন বেরিয়ে যায়। মিষ্টি তার পেছনে যেতে চায় কিন্তু ইয়াসিন বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
ইয়াসিন বাইরে আসতেই পুলিশের সাথে তার বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। একসময় একটা গুলি এসে লাগে ইয়াসিনের বুকে। এরমধ্যে রাফসানও সেখানে চলে আসলে ইয়াসিন ইশারা করে সেই ঘরটা দেখিয়ে দেয় যেখানে মিষ্টি আছে। রাফসান গেইট খোলা মাত্রই মিষ্টিকে দেখে খুশি হয়। মিষ্টিও রাফসানকে দেখে খুশি হয়৷ কিন্তু তারপরেই একের পর এক গুলি এসে ঝাঝড়া করে দেয় ইয়াসিনের বুক। মিষ্টি গুলির শব্দ শুনে দৌড়ে চলে যায় ইয়াসিনের কাছে। ইয়াসিন একদম ভূমধ্যসাগরের তীর ঘেষে দাঁড়ায়। সে পড়ে যেতেই নেবে এমন সময় মিষ্টি তার হাত ধরে নেয়। ইয়াসিন শেষবারের মতো একটা হাসি দেয়। মিষ্টির হাত আলগা হয়ে যায়। অতঃপর ইয়াসিন পড়ে যায় ভূমধ্যসাগরের জলে। সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায় তার অধ্যায়। মিষ্টি হতবাক নয়নে তার বন্ধুকে বিদায় নিতে দেখে।
চলবে ইনশাআল্লাহ ✨