ভূমধ্যসাগরের তীরে পর্ব-৪১+৪২

0
27

#ভূমধ্যসাগরের_তীরে
#পর্বঃ৪১
#লেখিকা_দিশা_মনি

মিষ্টি নিজের রুমে বসে আছে বিষন্ন মনে৷ এমন সময় হঠাৎ করে রাফা মিষ্টির রুমে এসে প্রবেশ করে। রাফা এসেই বলে,
“মম, ড্যাড কোথায়? ড্যাড কি আর আসবে না আমাদের কাছে?”

মিষ্টির মেজাজ এমনিতেই ভালো ছিল না। তার উপর রাফার মুখে এহেন কথা শুনে সে বলে ওঠে,
“ড্যাড, ড্যাড, ড্যাড। এছাড়া কি আর কোন কথা নেই তোমার মুখে? একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো। মরে গেছে তোমার ড্যাড, বুঝতে পেরেছ তুমি? তোমার ড্যাড আর নেই৷ এখন বিদায় হও আমার চোখের সামন থেকে।”

রাফা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“না, তুমি মিথ্যা বলছ মম ড্যাডের কিছু হয়নি৷ আমি তো ড্যাডকে দেখেছি।”

মিষ্টি এবার রাফার গায়ে হাত তুলতে যায় এমন সময় আসাদ এসে রাফাকে আগলে নিয়ে বলে,
“এসব কি হচ্ছে মিষ্টি? তুমি রাফার সাথে এমন করছ কেন? ও তো ছোট বাচ্চা।”

“বাচ্চা তো বাচ্চার মতোই থাকতে বলো না ওকে। কেন আমার মাথা খারাপ করছে।”

এদিকে রাফা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“তুমি দেখো না এঞ্জেল, মম এসব কি বলছে। ড্যাড নাকি মারা গেছে। আমি তো ড্যাডকে দেখেছি বলো।”

আসাদ রাফাকে সামলানোর জন্য বলে,
“তোমার মম একটু অসুস্থ তো তাই আরকি এসব বলছে। তুমি চলো, আমি তোমাকে একটু পার্কে নিয়ে যাই। ওখানে গেলে তোমার একটু ভালো লাগবে।”

বলেই আসাদ রাফাকে নিয়ে চলে যায়। এমন সময় হঠাৎ করে আমিনা মিষ্টির রুমে চলে আসে। আমিনাকে দেখেই মিষ্টি ক্রন্দনরত স্বরে বলে,
“আমার ভাগ্য আমার এ কেমন পরীক্ষা নিচ্ছে আমিনা? আর কত ধৈর্য ধরব আমি বলতে পারো?”

আমিনা বলে,
“আর তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে না, আপু। তুমি আসাদকে বিয়ে করে নাও। তাহলেই তুমি জীবনে সুখী হতে পারবে।”

কথাটুকু বলার সময় আমিনার চোখে জল এসে জমে। তার কন্ঠ শুনেও তার ব্যথা উপলব্ধি করা যায়। মিষ্টিও আমিনার এই ব্যথা উপলব্ধি করতে পারে। সে মনে মনে বলে,
“কার সাথে কার বিয়ে হবে সেটা তো খুব শীঘ্রই স্পষ্ট হয়ে যাবে৷ আমি আগুন নিয়ে খেলছি আমিনা৷ জানি না,এই আগুনে শেষ অব্দি আমি জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাব নাকি। কিন্তু এটা আমায় করতেই হবে। তাছাড়া যে কোন উপায় নেই।”

★★
বিকেল বেলা রাফা হঠাৎ করে ভীষণ অসুস্থ হয়ে যায়। জ্বরে তার গা একদম পুড়ে যাচ্ছিল। ডাক্তার দেখিয়েও কোন লাভ হয় না। তার শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। নিজের মেয়ের এই অবস্থা দেখে মিষ্টির চোখে জল চলে আসে। মিষ্টি রাফার শিয়রে বসে অশ্রুসিক্ত কন্ঠে বলে,
“আমায় ক্ষমা করে দাও মামনি, আমি অনেক বড় ভুল করেছি তোমায় বকা দিয়ে। দয়া করে আর মমের উপর রাগ করে থেকো না। প্লিজ তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাও।”

এদিকে রাফা সমানে, “ড্যাড, ড্যাড”
করে চলছিল। রোকসানা শিকদার এসে মিষ্টির পাশে বসে। তাকে দেখামাত্রই মিষ্টি রোকসানা শিকদারকে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত স্বরে বলে,
“আমি মা হিসেবে খুব খারাপ তাই না মা? আজ শুধুমাত্র আমার জন্য আমার মেয়েটার এই অবস্থা। আমার তো জীবনটাই ব্যর্থ। না ভালো স্ত্রী হতে পারলাম আর না তো ভালো মা। ”

রোকসানা শিকদার মিষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
“নিজেকে দোষ দেওয়া বন্ধ করো মিষ্টি। যা কিছু হয়েছে তাতে তোমার কোন দোষ নেই।”

এদিকে রাফা ক্রমশ বলে চলেছিল,
“ড্যাড..ড্যাড প্লিজ তুমি চলে এসো। তোমাকে ছাড়া আমরা কেউ হ্যাপি নেই।”

মিষ্টি রাফার মাথায় হাত বোলাতে থাকে। এদিকে আসাদ রুমে এসে বলে,
“আমার ডাক্তারের সাথে কথা হলো। রাফাকে সুস্থ করার এখন একমাত্র উপায় হলো ওর ড্যাডের সাথে ওর দেখা করানো।”

রোকসানা শিকদার হতবাক স্বরে বলেন,
“কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব?”

আসাদ বলে,
“অবশ্যই সম্ভব। আপনি শুধু আমার উপর একটু ভরসা রাখুন।”

বলেই সে নিজের ফোন বের করে কাউকে একটা কল করে। অতঃপর আসাদ বলে,
“আমাকে ইমিডিয়েটলি ইন্সপেক্টর ইমানুয়েল পলের ফোন নাম্বার দিন। আমার ভীষণভাবে দরকার তার নাম্বার।”

কিছু সময় পর,
ইমানুয়েল পল এসে বসে রাফার শিয়রের কাছে। রাফা বলতে থাকে,
“ড্যাড..”

এমন সময় পল বলে ওঠে,
“হ্যালো সুইটিপাই..”

রাফা পলের কন্ঠ শোনামাত্রই বলে ওঠে,”তুমি এসেছ ড্যাড। আমি জানতাম তুমি ফিরবে। মম কিচ্ছু জানে না। মম বলছিল তুমি নাকি আর ফিরবেনা। তুমি আমার হয়ে একটু মমকে বকে দাও তো।”

“ঠিক আছে, আমি তোমার মমকে বকে দেব। তুমি এখন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো।”

“জানো ড্যাড, ছোটবেলা থেকে আমার সব ফ্রেন্ডসদের কাছে তাদের ড্যাডের সাথে মজা করার গল্প শুনতাম। কিন্তু আমার সাথে মজা করার কেউ ছিল না জানো। আমি খুব মিস করেছি তোমায়।”

পল এবার একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। এদিকে ওষুধের প্রভাবে ও পলের আসায় কিছুটা স্বস্তি অনুভব করায় রাফা ধীরে ধীরে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে।

রাফা ঘুমিয়ে পড়ার কিছু সময় পর পল উঠে দাঁড়ায়। আসাদ এগিয়ে এসে পলকে বলে,
“আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এখানে আসার জন্য। আপনি না এলে যে কি হতো..”

“কোন ব্যাপার না। মেয়েটা বড্ড ইনোসেন্ট।”

“হুম। আর ভীষণ অভাগী জানেন তো৷ জন্মের পর থেকে বাবার সহচর্য পায়নি।”

“একচুয়ালি আমায় এখন কিছু জরুরি কাজে যেতে হবে।”

“হ্যাঁ যান।”

পল রুম থেকে বেরিয়ে কিছুদূর যেতেই হঠাৎ কেউ পেছন থেকে ডাক দেয়,
“রাফসান!”

পল এবার পিছন ফিরে তাকায়। রোকসানা শিকদার পলের দিকে এগিয়ে যান। অতঃপর তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন,
“এতদিন কোথায় ছিলিস বাবা? এই বুড়ো মায়ের কথা কি একবারো মনে পড়েনি? তোর বাপ তো তোর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন৷ আর আমি…আমার কথা আর কি বলবো৷ দেখতেই পারছিস আমার কি অবস্থা হয়েছে।”

পল বলে ওঠে,
“আপনি ভুল করছেন আন্টি। আমি রাফসান নই। আমি ইমানুয়েল পল।”

“চুপ৷ একদম চুপ কর তুই। গোটা দুনিয়ার সামনে তুই নাটক করতে পারবি কিন্তু নিজের মায়ের সামনে তোর কোন নাটক চলবে না। আমি ঠিক চিনতে পেরেছি, তুই আমার রাফসান।”

পল আর কিছু বলবে এমন সময় মিষ্টি সেখানে এসে বলে,
“উনি ঠিক বলছেন মা। উনি আপনাদ ছেলে নন৷ উনি হলেন ইমানুয়েল পল। উনি যদি আপনার ছেলে হতো তাহলে আপনার এত কষ্ট দেখেও এইসব অভিনয় চালিয়ে যেতে পারত না।”

মিষ্টির দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায় পল। এদিকে মিষ্টির পিছনে মোর্শেদ চৌধুরী ও সুইটি চৌধুরীও ছিল৷ মিষ্টি বলে ওঠে,
“এতক্ষণ সময় যখন দিতে পারলেন আর একটু সময় কি দিতে পারবেন মিস্টার পল? একচুয়ালি আজ আমাদের বাড়িতে ছোট পরিসরে আমার আর আসাদের এনগেজমেন্ট হতে চলেছে। এমনিতে বাইরের কাউকে বলিনি। আপনি নাহয় গেস্ট হিসেবে উপস্থিত থাকলেন।”

পল বলল,
“আসলে আমার কিছু..”

“বেশিক্ষণ লাগবে না। আপনি শুধু আমাদের সাথে ড্রয়িংরুমে চলুন এক্ষুনি সব হয়ে যাবে।”

বলেই মিষ্টি একপ্রকার জোর করে পলকে ড্রয়িংরুমে নিয়ে যায়। সেখানে আসাদ অপেক্ষারত ছিল। মিষ্টি আসতেই রাফসান একটা আংটি নিয়ে এগিয়ে আসে মিষ্টির দিকে। সুইটি চৌধুরী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। মিষ্টি পলের দিকে তাকায়। তার দৃষ্টি ছিল স্থির। ধীরে ধীরে আসাদ মিষ্টিকে আংটিটা পড়িয়ে দেয়। অতঃপর মিষ্টিও একটা আংটি পড়িয়ে দেয় আসাদের হাতের অনামিকা আঙুলে। সুইটি চৌধুরী বলেন,
“যাক, তোমাদের এনগেজমেন্ট সুসম্পন্ন হলে।”

কিছুটা দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে আমিনার চোখ জলে ভিজে উঠল। এদিকে মিষ্টিও ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে গেল৷ তবে নিজের দুঃখ প্রকাশ করল না৷ পলের দিকে তাকিয়ে দেখল সে এখনো ভাবলেশহীন ভাবে দাঁড়িয়ে৷ মিষ্টি মনে মনে বলে,
“আমিও দেখব তুমি আর কতদিন এভাবে শক্ত থাকতে পারো৷ নিজেকে আর আমাকে আর কত কষ্ট দিতে পারো।”
চলবে ইনশাআল্লাহ ✨

#ভূমধ্যসাগরের_তীরে
#পর্বঃ৪২
#লেখিকা_দিশা_মনি

মিষ্টি বধুবেশে তৈরি হয়ে নিচ্ছে। কারণ আজ তার সাথে আসাদের বিয়ে হবার কথা। সুইটি চৌধুরী চান নি বেশি সময় নষ্ট করতে তাই আজকের দিনেই পারিবারিক ভাবে সাদামাটা আয়োজনে বিয়েটা সম্পন্ন করা হবে বলে ঠিক করেছেন তিনি।

আমিনা মিষ্টির পাশেই আছে৷ মিষ্টিকে সাজানোর পুরো কাজটাই সে সম্পন্ন করেছে নিজের বুকে পাথর চেপে৷ মিষ্টির সাজ সম্পন্ন হতেই আমিনা মুখে একটা মেকি হাসি দিয়ে বলে,
“বাহ, আপু। তোমাকে কি সুন্দর লাগছে। মিস্টার আসাদ তো আজ তোমায় দেখে পাগল হয়ে যাবে।”

আমিনার মনে লুকানো কষ্ট ঠিকই উপলব্ধি করতে পারে মিষ্টি। তাই সে কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। এরমধ্যে সুইটি চৌধুরী সেখানে এসে বলেন,
“সাজগোজ হয়ে গেছে? ইশ, মিষ্টির ড্যাড যে কোথায়। সেই কখন গেছে মার্সেইয়ের ওল্ড মসজিদের ওখানে কাজি ডাকতে কিন্তু এখনো আসার কোন খেয়াল নেই। ধুর।”

বলেই তিনি আবার কাউকে একটা ফোন করে বাইরে ছুটে যান৷ তিনি চলে যাবার কিছু সময় পর আসাদ বরবেশে মিষ্টির রুমে চলে আসে৷ আসাদকে আসতে দেখেই আমিনার বুকটা হাহাকার করে ওঠে। লোকটাকে বরবেশে কতটাই না সুন্দর লাগছে। আমিনার মনে হঠাৎ করে একটা প্রশ্ন জেঁকে বসে।

“আচ্ছা,খুবই কি খারাপ হয়ে যেত, যদি এই লোকটা আমার জন্য এভাবে বর সাজত?”

নিজের মনে আসা এই প্রশ্নের জন্য নিজেই লজ্জিত হয় আমিনা। মনে মনে নিজেকে ঝাড়ি দিয়ে বলে,
“ছি ছি! এটা তো কেমন চিন্তাভাবনা আমিনা? আর কিছুক্ষণ পর লোকটা অন্য কারো স্বামী হবে। আর তুই কিনা তাকে নিয়ে এমন ভাবছিস!”

অতঃপর আমিনা আসাদকে বলে,
“মিস্টার আসাদ, আপনারা কথা বলুন। আমি আসছি।”

বলেই সে বেরিয়ে যায়। আমিনার যাওয়ার পানে ব্যথিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আসাদ। মিষ্টি আসাদকে জিজ্ঞেস করে,
“কেমন লাগছে আমায় বউ সাজে?”

আসাদ একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,
“তোমাকে তো সব সাজেই ভালো লাগে মিষ্টি। তোমার সৌন্দর্যের কোন তুলনা হয় না।”

“ধন্যবাদ।”

“আচ্ছা, তুমি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছ ভেবেচিন্তে নিয়েছ তো? কি হবে যদি তোমার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। যদি রাফসান শেষ মুহুর্তে এসে সত্যিটা স্বীকার না করে?”

“তাহলে আমাদের ভালোবাসা মিথ্যা প্রমাণিত হবে।”

“এখনো সময় আছে মিষ্টি। আবেগ দিয়ে না ভেবে বিবেক দিয়ে ভাবো। যদি রাফসান বিয়েটা না থামায় তাহলে কিন্তু আমাদের বিয়েটা করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।”

মিষ্টি বলে,
“আমার বিশ্বাস আছে নিজের ভালোবাসার প্রতি। আমি জানি, রাফসান শেষ মুহুর্তে এসে বিয়েটা থামাবেই। এটা আমাদের ভালোবাসার পরীক্ষা, সারাটা জীবন তো আমি পরীক্ষা দিয়ে গেলাম। এবার ওর পালা। এবার রাফসানকে নিজের ভালোবাসার পরীক্ষা দিতে হবে।”

আসাদের চোখে দুশ্চিন্তা অনুভব করতে পারছিল মিষ্টি। তাই সে বলে,
“চিন্তা নেই। আমিনার সাথে তোমার মিলন হবেই৷ এই দায়িত্ব আমি নিলাম।”

বলেই মিষ্টি আয়নায় নিজেকে দেখায় মনযোগ দেয়। একটু পরই রাফা ছুটে আসে রুমে। তার সাথে রোকসানা শিকদারও আসে।

রাফা এসেই মিষ্টিকে দেখে বলে,
“ওয়াও মম, তোমাকে ব্রাইডাল লুকে একদম কুইনের মতো লাগছে।”

মিষ্টি হালকা হেসে রাফার গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
“তাই বুঝি?”

রোকসানা শিকদার এগিয়ে এসে বলেন,
“বৌমা..আমার কেন জানি ভীষণ ভয় হচ্ছে।”

“কেন মা? আপনি কিসের ভয় পাচ্ছেন? আপনি তো নিশ্চিত যে আপনার ছেলে রাফসান এখনো বেঁচে আছে এবং ইমানুয়েল পলই রাফসান। তাহলে এখানে ভয় কিসের? রাফসান বেঁচে থাকতে কিছুতেই আমার দ্বিতীয় বিয়ে হতে দেবে না। এই ব্যাপারে নিশ্চিত থাকুন।”

রাফাও বলে,
“হ্যাঁ, গ্রানি। মম আমাকে বলেছে আজ ড্যাডের সাথেই মমের বিয়ে হবে। তুমি এত চিন্তা করো না।”

রোকসানা শিকদার এবার একটু স্বস্তি পান। মিষ্টি বলে,
“আমি নিজের হাতে গিয়ে আমার আর আসাদের বিয়ের ইনভাইটেশন কার্ড মিস্টার ইমানুয়েল পলকে দিয়ে এসেছি৷ তাকে তো আসতেই হবে।”

★★
মিষ্টিকে বিয়ের আসরে নিয়ে আসা হয়েছে। বিয়েতে সেরকম বাইরের কাউকে ডাকা হয় নি। শুধুমাত্র পরিবারের লোকজনই এখানে উপস্থিত। সাথে আশেপাশের কিছু প্রতিবেশী। শুধুমাত্র ইমানুয়েল পলের জন্যই আলাদা করে ইনভাইটেশন কার্ড বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিল মিষ্টি। তাকে প্রধান অতিথি করেছিল নিজের বিয়েতে। কিন্তু সেই ইমানুয়েল পলেরই এখনো কোন আসার খবর নেই! মিষ্টি একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে।

মিষ্টি ও আসাদকে পাশাপাশি বসানো হয়। কাজি সাহেবও ইতিমধ্যেই এসে উপস্থিত হয়েছেন। আমিনা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সমস্ত কিছু দেখছে। নিজের ভালোবাসার মানুষটা এভাবে অন্য কারো হয়ে যাবে সেটা ভাবতেই তার দুচোখে জল চলে আসছে৷ তবুও সে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে রেখেছে। কেননা, আমিনা চায় তার মিষ্টি আপু ভালো থাকুক। নিজের সব আপনজনকেই তো সে হারিয়ে ফেলেছে। নিজের মা-ভাই সবাইকে। এখন তো শুধুমাত্র মিষ্টিই এমন একজন যার সাথে তার কোন রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও এমন এক আত্মিক বন্ধন আছে যা রক্তের সম্পর্কের থেকেও বেশি দৃঢ়। মিষ্টির জন্য তো সে হাসতে হাসতে নিজের জীবনও দিয়ে দিতে পারে। তার কাছে তো এটা কিছুই না।

রোকসানা শিকদার রাফাকে কোলে নিয়ে বিষন্নমনে দাঁড়িয়ে আছেন, মোর্শেদ চৌধুরীর চেহারাতেও বিষন্নতার ছায়া। এসব কিছুর মধ্যে যদি কারো চেহারায় আনন্দের আবেশ থাকে সেটা শুধুমাত্র সুইটি চৌধুরী। তার তো শুরু থেকেই রাফসানের সাথে মিষ্টির বিয়েটা একদম পছন্দ ছিলো না। এখন যখন রাফসানকে ভুলে মিষ্টি তার পছন্দমতো ছেলেকে বিয়ে করছেন তখন সুইটি চৌধুরীকে অনেক খুশি লাগছে। সুইটি চৌধুরী কাজি সাহেবের উদ্দ্যেশ্যে বলেন,
“তাড়াতাড়ি বিয়ে পড়ানো শুরু করেন কাজি সাহেব, শুভ কাজে বেশি দেরি করতে নেই।”

কাজি সাহেব বলেন,
“একটু ধৈর্য ধরুন, বিয়ে হলো সারাটা জীবনের মতো একটা পবিত্র বন্ধন। এতোটা তাড়াহুড়ো করার কি আছে? আমায় সবটা প্রস্তুত করতে দিন।”

“আসলে কি বলুন তো,আমার মেয়েটা সারাটা জীবন এত কষ্ট পেয়েছে যে আমি চাই এবার এই বিয়ের মাধ্যমে ওর সব কষ্ট দূর হোক।”

কাজি সাহেব কাবিননামা প্রস্তুত করছিলেন। এদিকে মিষ্টি উদগ্রীব হয়ে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল। রাফসান এখনো আসে নি, অথচ তার তো এতক্ষণে চলে আসার কথা। মিষ্টির দুশ্চিন্তা বাড়ছে। তাহলে কি রাফসান সত্যিই আসবে না? তার ভালোবাসা কি তাহলে মিথ্যা প্রমাণিত হবে?

এদিকে কাজি সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করেন। মিষ্টির অস্বস্তি বাড়ছিল। সে আসাদের দিকে তাকায়। আসাদও নিরাশ চোখে তার দিকে তাকিয়ে।

আমিনা নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্থান ত্যাগ করে। রোকসানা শিকদার মনে মনে বলতে থাকেন,
“কোথায় তুই রাফসান? তাড়াতাড়ি চলে যায়। এত বড় সর্বনাশ হতে দিস না। আজ যদি সত্যিই এই বিয়েটা হয়ে যায় তাহলে আমি তোকে কখনো ক্ষমা করবো না।”

এদিকে কাজি সাহেব মিষ্টিকে উদ্দ্যেশ্য করে বলে ওঠেন,
“মা, এবার কবুল বলো।”

মিষ্টি হতবাক চোখে কাজি সাহেবের দিকে তাকায়। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে এখনো রাফসান আসে নি। মিষ্টির চোখ দিয়ে টপটপ করে অঝোর ধারায় পানি পড়তে থাকে। কাজি সাহেব বলেন,
“বুঝতে পারছি মা, বিয়ের সময় সব মেয়েদেরই কষ্ট হয়। কিন্তু এটা তো আল্লাহর তৈরি করা নিয়ম। কবুলটা বলে দাও। আমার আরো অনেক কাজ আছে। তাড়াতাড়ি কবুল বল।”

সুইটি চৌধুরী এগিয়ে এসে বলেন,
“কি হলো? কবুল বলে দেও মিষ্টি।”

মিষ্টির অশ্রু যেন আজ কোন বাধা মানছিল না। রাফসান আজ তাদের ভালোবাসাকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিলো। মিষ্টি বলে ওঠে,
“পারবো না আমি এই বিয়ে করতে….পারবো না আমি..”

সুইটি বলে,
“বিয়েটা করে নে মিষ্টি। এমন কথা বলিস না।”

মিষ্টির মাথায় এবার হঠাৎ করে জেদ চেপে বসে।

“যদি রাফসান আমার ভালোবাসার মূল্যায়ন না করে তাহলে আমিও করব না। এই বিয়েটা আমি করবো।”

এমন ভাবনা থেকেই সে কবুল বলতে উদ্যত হয়।
চলবে ইনশাআল্লাহ ✨