ভূমধ্যসাগরের তীরে পর্ব-৪৩

0
27

#ভূমধ্যসাগরের_তীরে
#পর্বঃ৪৩
#লেখিকা_দিশা_মনি

মিষ্টি কবুল বলতেই যাবে এমন সময় হঠাৎ করে বাইক নিয়ে ঘটনাস্থলে এন্ট্রি নেয় কেউ একজন। সবাই হতবাক হয়ে তাকায়। বাইকে থাকা ব্যক্তিটি হেলমেট খুলতেই সবাই হতবাক হয়ে যায়। কারণ এ আর কেউ নয়, রাফসান। রাফসান হেলমেট খুলেই বাইক থেকে নেমে কাজি সাহেবের উদ্দ্যেশ্যে বলে,
“একজন বিবাহিত মেয়ের স্বামী থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বার কিভাবে বিয়ে হয় কাজি সাহেব? এই বিয়েটা বন্ধ করুন।”

রাফসানের মুখে এই কথাটা শুনেই সবাই উঠে দাঁড়ায়। মিষ্টির চোখে জল ছলছল করছিল। সুইটি চৌধুরী রাগী কন্ঠে বলে ওঠেন,
“এসবের মানে কি? এই ছেলে তুমি কি বলছ এসব?”

রাফসান সামান্য হেসে বলে,
“কেন শাশুড়ী মা? আমি কি ভুল কিছু বলছি? আপনি কিভাবে আপনার জামাই বেঁচে থাকার পরেও আপনার মেয়েকে দ্বিতীয় বার বিয়ে দিতে পারেন৷ ইসলাম মতে তো এটা সম্ভব না।”

সুইটি চৌধুরী বিরক্ত হন বেশ। বলেন,
“তুমি তো বলেছিলে তুমি রাফসান নও ইমানুয়েল পল তাহলে এখন আবার নিজেকে আমার মেয়ের স্বামী দাবি করছ কেন?”

“একটু অপেক্ষা করুন৷ সব জানতে পারবেন। আপাতত এই বিয়েটা বন্ধ করতে বলুন। মিষ্টি তুমি উঠে আমার পাশে এসো৷ আর আসাদ তুমি মিষ্টির পাশ থেকে উঠে গিয়ে নিজের ভালোবাসার মানুষের কাছে গিয়ে বসো। আমি এতদিন যেই ভুল করেছি সেই ভুল তুমি করোনা। নিজের ভালোবাসার মানুষের অনুভূতির মূল্য দিতে শেখো।”

আসাদ রাফসানের কথা শোনামাত্রই ছুটে যায় আমিনার রুমের পানে। এদিকে রোকসানা শিকদার এসে জড়িয়ে ধরেন নিজের ছেলেকে। অতঃপর বলেন,
“আমি জানতাম, তুই আমার রাফসান। তুই কেন এতদিন আমাদের থেকে দূরে ছিলি। সব সত্যি বলবি আজ।”

রোকসানা শিকদারের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল রাফা। রাফসান নিজের মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে অসংখ্য চুমোয় ভড়িয়ে দেয়। অতঃপর মিষ্টিকে বলে,
“আমি এতদিন পর ফিরে এলাম, তবুও কি তুমি ওমন দূরে দূরে থাকবে মিষ্টি?”

মিষ্টি অভিমানী সুরে বলে,
“হ্যাঁ, আমি দূরেই থাকব। আপনার কাছে কেন যাব আমি? আপনি তো আমার থেকে দূরে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন। দীর্ঘ ৬ টা বছর তো আমার থেকে দূরে ছিলেন। আপনার থেকে দূরে থাকার অভ্যাস হয়ে গেছে আমার। আমি দূরেই ভালো আছি।”

রাফসান ব্যথিত স্বরে বলে,
“তোমার সব অভিমানের কথা আমি জানি। কিন্তু কি করবো বলো, আমি তো নিরুপায় ছিলাম।”

সুইটি চৌধুরী রাগী কন্ঠে বলেন,
‘কি এমন নিরুপায় ছিলে তুমি যে এতগুলো দিন নিজের স্ত্রী সন্তানের থেকে দূরে থাকতে হলো তোমায়?’

রাফসান কিছু বলতে নেবে এমন সময় মিষ্টি বলে ওঠে,
“থাক, তোমাকে আর কোন অজুহাত দিতে হবে না৷ তুমি এসেছ খুব ভালো হয়েছে। এখন নিজের মেয়ে, মা সবাইকে নিয়ে একটু সুখে শান্তিতে থাকো।”

বলেই মিষ্টি চলে যেতে নেয়। এমন সময় রাফসান মিষ্টির পথ আটকে দেয়। মিষ্টি বলে,
“আমার সামনে থেকে সরে দাঁড়াও।”

“না, সরবো না৷ আমি জানি, তোমার এই রাগ করা স্বাভাবিক। কিন্তু আমার কথাটা তো শোন, যে কেন এতদিন আমি তোমার থেকে দূরে ছিলাম।”

“কি লাভ হবে এসব শুনে? আমি কি আবার আমার হারানো দিনগুলো ফেরত পাবো? আমার সেই কষ্টগুলো কি মুছে যাবে? আর আমার মেয়ে যে এতদিন নিজের বাবার ভালোবাসা ছাড়া বড় হলো, তোমার বৃদ্ধ বাবা তোমার অপেক্ষা করতে করতে ইন্তেকাল করলেন, তোমার মা যে তোমার জন্য কেঁদে কেঁদে জীবন যাপন করল সব কি ঠিক হয়ে যাবে? আমি জানি, তোমার কাছে তোমার মিশনটাই সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হয়তোবা এসব কিছুও নিজের মিশনের জন্যই করেছ। তুমি তো আগেই বলেছিলে, তোমার ফাস্ট প্রায়োরিটি তোমার মিশন।”

“হুম, ঠিক বলছ তুমি। কিন্তু এতদিন আমি স্বেচ্ছায় তোমাদের থেকে দূরে ছিলাম না। বরং আমাকে পরিকল্পনা করে তোমাদের থেকে দূরে রাখা হয়েছিল।”

“পরিকল্পনা করে মানে?”

“আজ থেকে ৬ বছর আগে যখন মার্সেইতে বিস্ফোরণ ঘটেছিল সেই দূর্ঘটনায় আমি মারাত্মক আহত হলেও নিহত হই নি। সেখান থেকে আমায় একটা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে চিকিৎসার পর আমায় একটা লুকানো স্থানে স্থানান্তর করা হয়৷ একটা বদ্ধ কারাগারের মতো স্থান। যেখানে আমাকে দীর্ঘ ৬ বছর বন্দি রাখা হয়েছিল। আর কয়েক মাস আগেই আমি ঐ স্থান ছেড়ে চলে আসি। তারপর আমি পরিকল্পনা সাজাই এসব কিছুর পেছনে কে আসে তাকে খুঁজে বের করার জন্য। আর পরবর্তীতে খুঁজে পেয়েই যাই। তবে এসব কিছু খোঁজার জন্যই মূলত আমাকে ছদ্মবেশে থাকতে হয়েছিল এই কয়েকমাস। তবে আমি স্বেচ্ছায় তোমাদের থেকে দূরে ছিলাম না মিষ্টি।”

মিষ্টি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। রাফসানকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে শুরু করে। বলে ওঠে,
“কে? কে তোমায় দীর্ঘ ৬ বছর বন্দি করে রেখে আমাদের থেকে দূরে করে রেখেছিল? কে রয়েছে এসবের পেছনে? তার নামটা শুধু একবার বলো আমায়। আমি তার শেষ দেখে ছাড়ব।”

এরইমধ্যে কয়েকজন পুলিশ এসে চারপাশটা ঘিরে ফেলে। মিষ্টি সহ বাকি সবাই অবাক হয়ে যায়। রাফসান পুলিশদের কিছু একটা ইশারা করে। অতঃপর বলে,
“যে এসব কিছুর পেছনে রয়েছে সে এখন আমাদের মাঝেই উপস্থিত আছে। তাকে সবাই খুব ভালো করেই চিনি।”

মিষ্টি বলে,
“কে সে? তার নামটা শুধু একবার বলো।”

রাফসান এবার মোর্শেদ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলে,
“বাকিটা কি আপনি বলবেন নাকি আমি বলব?”

মোর্শেদ চৌধুরী ভয়ে ঘামতে থাকেন। সুইটি চৌধুরী অবাক স্বরে বলে ওঠেন,
“এসব কিছুর মানে কি?”

পুলিশ মোর্শেদ চৌধুরীর হাতে হাতকড়া পড়ায়। মিষ্টি ব্যথিত স্বরে বলে ওঠে,
“ড্যাড তুমি…..
।।।।।।
তুমি রয়েছ এসবের পেছনে?”

মোর্শেদ চৌধুরী বলেন,
“না মানে..”

রাফসান বলিষ্ঠ কন্ঠে বলে,
“সত্যটা অস্বীকার করে আর কোন লাভ নেই মিস্টার মোর্শেদ চৌধুরী। আপনার বিরুদ্ধে সব প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। আপনি এই সন্ত্রাসী সংগঠনের অন্যতম এক সদস্য। যে টাকার বিনিময়ে গোটা বিশ্বের সমস্ত মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন।”

সুইটি চৌধুরী বলে ওঠেন,
“এসব কি বলছে ও মিষ্টির ড্যাড? এসবের মানে কি? তুমি সত্যিই..”

বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন তিনি। মিষ্টি মোর্শেদ চৌধুরীর সামনে গিয়ে বলে
,”কেন এমন করলে ড্যাড? এসবের পেছনে তোমার কি স্বার্থ ছিল? কেন এতগুলো দিন আমার থেকে রাফসানকে দূরে রাখলে। নিজের মেয়েকে এত কষ্টে রেখে কি লাভ পেলে তুমি?”

মোর্শেদ চৌধুরী বলেন,
“এছাড়া আমার কাছে আর কোন উপায় ছিল না মিষ্টি। তুমি যখন অনেক ছোট ছিলে তখন আমার কোম্পানি মাঝখানে অনেক লসে চলছিল। আমি প্রায় দেউলিয়া হতে বসেছিলাম। সেই সময় এই সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে আমি একটা ডিল সাইন করি। যার ফলে আমাকে তাদের হয়ে কাজ করতে হয়। আর তাদের কথামতো বাংলাদেশ থেকে অনেককে আমি এই মিশনের কথা বলে সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিলাম। তারাই আমাকে মূলত একটা গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ পাইয়ে দিয়েছিল। যার বদৌলতে আমি এসব কিছু করছিলাম। আর তাদের আদেশ মতোই আমাকে এতদিন রাফসানকে বন্দি করে রাখতে হয়েছিল। কারণ ও এই সংগঠনের ব্যাপারে অনেক তথ্য জেনে গেছিল আর ভূমধ্যসাগরের তীরে আন্ডারগ্রাউন্ড শহরেও পৌঁছে যাচ্ছিল।”

মিষ্টি ও সুইটি চৌধুরী কাঁদতে থাকেন। রাফসান বলে ওঠে,
“আপনার সব অন্যায়ের শাস্তি এখন আপনাকে পেতে হবে। তার জন্য প্রস্তুত হন।”
চলবে ইনশাআল্লাহ ✨