ভূমধ্যসাগরের তীরে পর্ব-৪৪ এবং শেষ পর্ব

0
29

#ভূমধ্যসাগরের_তীরে
#পর্বঃ৪৪(অন্তিম)
#লেখিকা_দিশা_মনি

মিষ্টি ও রাফসান পাশাপাশি বসে আসে। রাফসানের কোলে বসে আসে রাফা। সে একটু আগেই ঘুমিয়ে গেছে৷ রাফসান হঠাৎ করে মিষ্টির হাত স্পর্শ করল৷ মিষ্টির শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। মিষ্টি বললো,
“আজ দীর্ঘ ৬ বছর পর,আপনাকে এতটা কাছ থেকে উপলব্ধি করতে পারছি।”

রাফসান মিষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
“আমিও।”

মিষ্টির এবার কান্না পেয়ে গেল। রাফসান মিষ্টির চোখের জল মুছে দিয়ে বললো,
“কেঁদো না মিষ্টি। তোমার চোখের জল আমার সহ্য হবে না৷ আমি তোমাকে সব সময় হাসতে দেখতে চাই।”

মিষ্টি একটু হাসার চেষ্টা করে। রাফসান ঘুমন্ত রাফাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। অতঃপর মিষ্টিকে নিয়ে অন্য একটি রুমে যায়। মিষ্টির চোখ দুটো ঢেকে ধরে সে। মিষ্টি রাফসানকে জিজ্ঞেস করে,
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমায়?”

রাফসান বলে,
” এই তো আর একটু অপেক্ষা করো..সব জানতে পারবে।”

একটু পরেই রাফসান মিষ্টির চোখ থেকে হাত সরিয়ে নেয়। আর সাথে সাথেই মিষ্টি অবাক হয়ে যায়। কারণ চারপাশে ভীষণ অন্ধকার। মিষ্টি সামান্য ভয় পেয়ে বলে,
“রাফসান..কোথায় তুমি?”

হঠাৎ করেই ঘরের আলো জ্বলে ওঠে। মিষ্টি দেখতে পায় পুরো ঘরটা বেলুন, নানারকম ফুলে সাজানো। হঠাৎ করেই সামনে একটা বড় স্ক্রিনে কিছু ছবি ভেসে ওঠে। মিষ্টি সেখানে দেখতে পায় কিছু ছবি ভেসে ওঠে। রাফসান ও মিষ্টির বিয়ের কিছু ছবি, মার্সেই শহরে তাদের প্রথম দেখা হবার পরের দৃশ্য, মিষ্টি ও রাফসানের ভূমধ্যসাগরের তীরে কাটানো কিছু সময়, প্রথমবার তুষারপাতের সেই চুম্বনের মুহুর্তের ছবি। এছাড়াও তাদের আবার দেখা হওয়া সহ ভীষণ সুন্দর মুহুর্ত ভেসে ওঠে। মিষ্টি এসব দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। রাফসান পিছন থেকে এসে মিষ্টিকে জড়িয়ে ধরে। অতঃপর বলে,
“তোমার আর আমার জীবনে অনেক অপূর্ণতা রয়ে গেল, তাই না মিষ্টি?”

মিষ্টি মাথা নাড়ায়। রাফসান আচমকা মিষ্টিকে কোলে তুলে নেয়। অতঃপর তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলে,
“আজ আমাদের মধ্যকার সব অপূর্ণতা আমি পূর্ণ করে দেব।”

বলেই রাফসান মিষ্টির কপালে একটা চুমু খায়। মিষ্টির মনে পড়ে যায় সেই দিনকার কথা যেদিন তারা প্রথম মিলিত হয়েছিল। রাফসান ধীরে ধীরে মিষ্টিকে নিজের আপন করে নেয়। নিজের সাথে মিশিয়ে নেয় মিষ্টিকে।

★★
আমিনা অভিমান করে তার রুমের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। আসাদ অনেকক্ষণ ধরে তার পানে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর ধৈর্য ধরতে না পেরে আমিনার পিঠে আলতো করে স্পর্শ করে। আমিনা আসাদের হাতটা সরিয়ে দেয়। আসাদ ব্যথিত স্বরে বলে,
“এখনো রেগে আছ আমার উপর?”

“না, আমি রেগে থাকব কেন? আমার কি কোন অধিকার আছে আপনার উপর রাগ করার?”

“আমি জানি, এসব তুমি রাগের মাথায় বলছ। আমি ক্ষমাপ্রার্থী আমিনা..আমি নিজের অনুভূতি তোমার কাছে প্রকাশ করতে পারিনি। আর..”

আমিনা হঠাৎ করে কাঁদতে কাঁদতে আসাদকে জড়িয়ে ধরে। আসাদ আমিনাকে সান্ত্বনা দেয়। আমিনা বলে,
“আমার এই দুনিয়ায় আপন বলতে কেউ নেই জানেন, আমি যে বড্ড অসহায়। কারো একটা সঙ্গের প্রয়োজন আমার। আপনি কি আমার সেই সঙ্গী হবেন?”

আসাদ মাথা নাড়ায়। অতঃপর দুজনের মধ্যে কিছু সুন্দর মুহুর্ত অতিবাহিত হয়। আসাদ একটু পর বিদায় নিয়ে নিজের রুমে যায়।

★★
সুইটি চৌধুরী আজকাল বড্ড বিষন্ন থাকেন৷ তার স্বামী যে এতো বড় অন্যায় করতে পারেন, নিজের মেয়ের জীবনটা শেষ করতে পারেন সেটা তিনি কস্মিনকালেও ভাবতে পারেন নি। রোকসানা শিকদার সুইটি চৌধুরীর পাশে এসে বসেন। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, অতীতে যা হয়েছে সেসব কিছু ভুলে যেতে। নিজের মেয়ে, নাতনী তাদের নিয়ে বাকিটা জীবন শান্তিতে কাটাতে।

সুইটি চৌধুরীও কিছুটা স্বাভাবিক হোন। এমন সময় রাফা চলে আসে। সে ছিল রাফসানের কোলে। রাফা এসেই সুইটি চৌধুরী ও রোকসানা শিকদারেরর উদ্দ্যেশ্যে বলে,
“গ্রানি, তোমরা এখানে কি করছ? এঞ্জেলের বিয়েতে যাবে না?”

সুইটি চৌধুরী অবাক স্বরে বলেন,
“এঞ্জেলের বিয়ে মানে? আসাদের কথা বলছ? কিন্তু ওর বিয়ে কার সাথে হবে?”

তখনই মিষ্টি আসাদ ও আমিনাকে একসাথে ধরে নিয়ে এসে বলে,
“আজ এই দুই কপোত কপোতীকে এক করতে চলেছি আমরা। ভূমধ্যসাগরের তীরে সুন্দর পরিবেশে দুজনের চারহাত এক করে দেব।”

রোকসানা শিকদার খুশি হয়ে বলেন,
“বাহ, বেশ ভালো কথা। চলো, এই শুভ কাজটাও সেরে আসি।”

রাফা আজ ভীষণ খুশি ছিল।

ভূমধ্যসাগরের তীরে মনোরম পরিবেশে আসাদ ও আমিনার বিয়ে সম্পন্ন হয়। এখন মূলত সবাই একটি জাহাজে উঠে বসেছে এবং এই জাহাজে করেই ভূমধ্যসাগর ঘুরে দেখছে।

মিষ্টি জাহাজের একদম কিনারায় এসে দাঁড়িয়ে। রাফসান এসে তার হাতে হাত রাখে৷ দুজনে একদম টাইটানিক পজিশনে দাঁড়ায়। মিষ্টিকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে রাফসান। হঠাৎ করে মিষ্টি সামনে ঘুরে বলে,
“কি করছ টা কি? কেউ দেখে ফেলবে তো!”

রাফসান বলে,
“কেউ দেখবে না। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত আছে।”

মিষ্টি বলে,
“আচ্ছা, আপনার মিশনের কি হলো? এই মিশন মিশন করেই তো এত গুলো বছর আমাদের থেকে বিছিন্ন থাকলেন। সেই মিশন কি ছেড়ে দিয়েছেন?”

রাফসান বলে,
“ছাড়ো ওসব মিশনের কথা। আমরা ছাড়াও আরো অনেক মানুষ আছে যারা এই মিশনে কাজ করতে পারে। এখন আপাতত আমরা আমাদের ফ্যামিলি মিশন নিয়ে ভাবি৷ আমাদের রাফার তো আরো দুই-তিনটা ভাইবোনের দরকার!”

মিষ্টি লজ্জা পেয়ে যায়। রাফসান বলে,
“এবার আমরা ভালোবাসার মিশনে অংশ নেব। এই মিশন আমাদের জীবন থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছি কিন্তু আর নয়। খুব শীঘ্রই আমরা ফ্রান্স ছেড়ে নিজের দেশে ফিরে যাব ভাবছি। তারপর সেখানেই আমাদের নতুন জীবন শুরু করব।”

মিষ্টি আবেগপ্রবণ হয়ে যায়। আজ দীর্ঘ ৭ বছর থেকে সে এই মার্সেই শহরে কাটাচ্ছে। আবারো নিজের জন্মভূমিতে ফেরার কথা যেন তাকে আবেগপ্রবণ করে তুলেছে।

রাফসান বলে,
“তুমি খুশি তো?”

“ভীষণ খুশি। আমাদের মেয়ে রাফা, আমি সবসময় চাইতাম যে ও আমাদের দেশেই বেড়ে উঠুক। অবশেষে আমার চাওয়াই পূর্ণ হতে চলেছে৷ এই মার্সেই শহরে, এই ভূমধ্যসাগরের তীরেও আমার অনেক স্মৃতি আছে। যদিও তার বেশিরভাগই নেতিবাচক তবে এই অভিজ্ঞতা আমি সবসময় মনে রাখবো।”

রাফসান মিষ্টিকে বলে,
“আচ্ছা,বাংলাদেশে গিয়ে সবার আগে তুমি কি করবে?”

মিষ্টি কিছুটা ভেবে বলে,
“বাংলাদেশে গিয়ে আমি সবার আগে একজনের সাথে দেখা করবো।”

রাফসান জিজ্ঞেস করে,
“কার সাথে দেখা করবে তুমি?”

“আমার এক বান্ধবী আছে। ওর কথা আমার খুব মনে পড়ে। জানেন, ও এখন অনেক কষ্টে আছে।”

“কি বলছ তুমি? কি নাম তোমার বান্ধবীর? আর তার কষ্টই বা কি?”

মিষ্টি বলে,
“আমার বান্ধবীর নাম দৃঢ়তা। জানো, ও ভীষণ ভালো আর মেধাবী একটা মেয়ে। স্বনামধন্য একটি ভার্সিটিতে পড়াশোনা করছে, যদিও আমার থেকে বয়সে ছোট তবুও ওর সাথে আমার বেশ মিল আছে। বিয়ের পরই ওর জীবনে নতুন ঝড় উঠেছে”

“তুমি তো কখনো তোমার এই বান্ধবীর কথা আমায় বলো নি। ”

“বলবো, ওর জীবনের কাহিনি খুব শীঘ্রই বলবো। তবে এখন না, ঈদের পরে। সে অনেক কাহিনি। এখন বলে শেষ করা যাবে না।”

“আচ্ছা, অপেক্ষা করব।”

এমন সময় রাফা, আমিনা, আসাদ সবাই চলে আসে। মিষ্টি রাফাকে জড়িয়ে ধরে। অতঃপর একজন ক্যামেরাম্যান আসে। ভূমধ্যসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে সবাই ছবি তোলে। রাফসান বলে,
“এখানেই তাহলে আমাদের জীবনের সব ঝড় শেষ হলো। বাকিটা জীবন তোমাকে আর আমাদের মেয়েকে নিয়ে সুন্দরভাবে কাটাতে চাই মিষ্টি।”

মিষ্টি বলে,
“আমিও। এবার সব দুঃখ মুছে সুখে ভেসে যাবার পালা।”
✨ সমাপ্ত✨