#মনমোহিণী
#Part_02
#Writer_NOVA
সেভেন আপের বোতলে চুমুক দিতে দিতে আশেপাশে তাকাচ্ছি। যে যার যার মতো ব্যস্ত। এতো মানুষের ভিড়ে নিজেকে অসহায় বাচ্চা মনে হচ্ছে। যদিও আমি উঠানের এক কোণায় চেয়ার পেতে বসে আছি।তন্বী গিয়েছে রায়হান ভাইয়ার বউয়ের সাথে ছবি তুলতে। আইরিন ভাবী দেখতে বেশ মিষ্টি। বেচারী ছবি তুলতে হয়রান হয়ে গেছে তবুও মুখে হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে। এদিক সেদিক তাকিয়ে তায়াং ভাইয়াকে খুঁজলাম। নজরে এলো না। এখানে আসার পর এনাজকেও মাত্র একবার দেখেছি। বন্ধুর বিয়েতে কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে নাকি! কত কাজ তাদের। তন্বী একবার ঘরের ভেতর থেকে হাত নাড়িয়ে বললো,
‘নোভাপু এদিকে আসো।’
‘নাহ, এখানে ঠিক আছি।’
‘আচ্ছা, তাহলে এখানেই থেকো।’
নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে তন্বী অনেক পটু। কিন্তু আমি একটু গুটানো স্বভাবের। কারো সাথে সহজে মিশি না। তবে একবার মিশে গেলে তাকে পাগল করতেও খুব বেশি সময় লাগে না।
‘একলা বইসা রইছো কেন? কেউ আসে নাই লগে?’
ভারী কন্ঠের শব্দ পেয়ে পাশে তাকালাম। এক মধ্য বয়স্ক মহিলা আমার বরাবরি চেয়ার টেনে বসে কথাগুলো একদমে জিজ্ঞেস করলেন। মুখে ভারী মেকআপ চকচক করছে। ঠোঁটে মাত্রাতিরিক্ত ম্যাট লিপস্টিক লাগানোয় তাতে ফাটল ধরে গেছে।পরনে গর্জিয়াস থ্রি পিস। তার ড্রেসের সাথে সাজটা বড্ড বেমানান লাগছে। আমি সৌজন্য মূলক হাসি দিয়ে বললাম,
‘এমনি!’
‘নাম কি গো তোমার?’
‘জ্বি, নোভা।’
‘শুধু নোভা? লগে কিছু নাই?’
‘নোভা ইসলাম।’
‘তুমি কি মাইয়ার বাড়ির লোক?’
‘না আন্টি!’
‘তাহলে?’
‘বরপক্ষের।’
‘রায়হান কি হয় তোমার?’
বিরক্তিতে মুখ লুকিয়ে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লাম। এই আন্টি সমাজ আমার কাছে বিশাল বিরক্তির কারণ। পেটের নাড়িভুড়ি বের না করা অব্দি এদের শান্তি নেই। এতো কথা বলতে পারে যে আপনার কানের পর্দা ফাটিয়ে ফেলার মতো দুরবস্থা করবে। আর কথা এতো পরিমাণে পেঁচাতে পারে যে গল্মলতাকে বলবে দূরে থাক তুই। এর জন্য এদের থেকে দশ হাত দূরে থাকি আমি।
‘কি গো কি জিগাইলাম?’
‘জ্বি আন্টি বলেন।’
‘রায়হান কি হয় তোমার?’
‘ভাইয়ার বন্ধু।’
‘ওহ আচ্ছা।’
উনি চুপ হয়ে গেলেন।মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ পরেছিলাম এবার বোধহয় একটু বাঁচা যাবে।কিন্তু আমার ভাবনায় এক বালতি পানি ঢেলে উনি ফের কথা বলে উঠলেন।
‘বিয়ে হইছে তোমার?’
সবেমাত্র সেভেন আপের বোতলে একটা চুমুক দিয়েছিলাম, উনার কথা শুনে হকচকিয়ে গেলাম। ভাগ্যিস মুখ থেকে ছিটকে পরেনি।দ্রুত ঢোক গিলে তার মুখপানে তাকালাম। উনি উৎসুক চোখে আমার উত্তরের আশায় আছেন। আমার মাথায় দুষ্টবুদ্ধি উদয় হলো। মুখটা লাজুক রাঙা করে উত্তর দিলাম,
‘জ্বি আন্টি।’
‘বলো কি? তোমায় দেখে তো মনে হয় না!’
উনি আৎকে উঠলেন। আমি মনে মনে হেসে তাকে বললাম,
‘হ্যাঁ, সবাই বলে। আমার বাবুর আব্বু তো মাঝে মাঝে বলবে, তোমার যে দুটো বাচ্চা আছে তা তোমায় দেখে বোঝা যায় না। মনে হয় অবিবাহিত মেয়ে।’
‘তোমার দুটো বাচ্চাও আছে?’
চোখ দুটো কপালে উঠিয়ে একপ্রকার চেচিয়ে উঠলো। আমার পেট ফেটে হাসি পাচ্ছে। যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে স্বাভাবিক ভাবে মাথা নাড়িয়ে বুঝালাম হ্যাঁ।
‘তোমার বাচ্চারা কোথায়? নিয়ে আসোনি?’
‘ওর আব্বুর কাছে।’
মনে মনে বললাম, ভুল কিছু তো বলিনি। আমার জামাই জীবনে এলে না বাচ্চাকাচ্চা আসবে।তাহলে তো ওরা ওর আব্বুর কাছেই। কিন্তু এরপর পরলাম বিপাকে। মহিলা জেদ ধরে বসলো আমার হাসবেন্ডকে দেখবে। মরি জ্বালা! এখন আমি জামাই পাবো কোথায়? কত কি ভুজুংভাজুং দিলাম। কিন্তু মহিলা নাছোড়বান্দা! আমার জামাই দেখেই ছাড়বে। এখন কি আমি জামাই অনলাইন থেকে অর্ডার দিবো নাকি? চোখ দুটো পিটপিট করে আন্টিকে বললাম,
‘আন্টি, আমার জামাইকে আরেকদিন দেখাবোনি? ও এখন কোথায় আছে আমি তো বলতে পারছি না।’
‘না না তা হবে না। আবার দেখা হয় কিনা তাতো জানি না। মরেও তো যেতে পারি। তুমি ওকে কল দাও।’
আমার এখন হাত-পা ছুঁড়ে কান্না করতে মন চাইছে। কি দরকার ছিলো আগ বাড়িয়ে বলার আমার যে বিয়ে হয়েছে। এখন আমি জামাই, বাচ্চা পাবো কোথায়? মনে মনে নিজেকে ইচ্ছে মতো গালি দিলাম। নিজের ফাঁদে নিজেই পরছি।আল্লাহ বাঁচাও আমারে।ততক্ষণাৎ এনাজকে দেখতে পেলাম। কোলে বছর তিনকের এক বাচ্চা মেয়ে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম। আন্টিকে হাত দিয়ে ইশারা করে এনাজকে দেখিয়ে বললাম,
‘ঐ তো আমার স্বামী আর বাচ্চা। আপনি দাঁড়ান আমি আমার মেয়েটাকে নিয়ে আসি।’
উনার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত গতিতে এনাজের সামনে চলে গেলাম।এনাজ দুজন লোকের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো। আমি পেছন থেকে ডাকলাম,
‘শুনুন।’
‘জ্বি।’
‘বাবুটাকে একটু দিবেন?’
এনাজের সম্মতির আগেই আমি ছোঁ মেরে পিচ্চি মেয়েটাকে কেলে তুলে নিলাম। বাবুটা অপরিচিত মানুষ দেখে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো।সেদিকে তোয়াক্কা না করে দ্রুত পায়ে মহিলার দিকে আগাতে লাগলাম। পেছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারলাম এনাজ অবাক হয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।
★
‘তায়াং ভাইয়া বাসায় যাবা না?’
তায়াং ভাইয়া এক পলক আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
‘বন্ধুকে বিদায় না দিয়ে কি করে যাই?’
‘তাহলে আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও।’
তন্বী বললো। দুপর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। এখানে আর ভালো লাগছে না। এদিকে তায়াং ভাইয়াও বন্ধুকে বিদায় না দিয়ে যেতে ইচ্ছুক নয়। আমি আর তন্বী কখন থেকে ঘ্যান ঘ্যান করছি গাড়ি করে দাও আমরা চলে যাবো। ভাইয়া আমাদের একা ছাড়তেও নারাজ। কি একটা অবস্থা! বিরক্ত লাগছে সবকিছু।
‘বন্ধুদের মধ্যে সর্বপ্রথম রায়হান বিয়ে করলো। এখন ওকে বিদায় না দিয়ে যাই কি করে?’
আমি ও তন্বী একে অপরের দিকে তাকিয়ে গাল ফুলিয়ে রইলাম। ভাইয়ার এক বন্ধু ভাইয়াকে ডাকতেই ভাইয়া বেরিয়ে গেলো। এনাজের সাথে এরপর আর দেখা হয়নি। বাচ্চাটাকে তায়াং ভাইয়ার কোলে দিয়ে এনাজের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। কে জানে কার বাচ্চা! মহিলাকে অবশ্য পরে সব সত্যি বলে দিছি। উনি মুচকি হেসে বলছিলো, সে নাকি সব আগেই ধরতে পেরেছে। তাই আমার স্বামী, বাচ্চাকে দেখতে চেয়েছে। কি এক বিতিকিচ্ছিরি পরিস্থিতি। আমার কাজের জন্য তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি। নিজেকে নিজে ইচ্ছে মতো বকেছি। কি দরকার ছিলো এসবের।
‘আন্তি নাও এতা তোমার?’
বছর পাঁচেকের এক মেয়ে আমার দিকে লাল গোলাপ এগিয়ে দিলো। আমি বিস্মিত চোখে একবার তন্বীর দিকে তাকালাম। কিন্তু তন্বীর রেসপন্স নেই। ও তো মোবাইলে ডুবে আছে। আমি হাঁটু মুড়ে বসে ওর গাল দুটে টেনে বললাম,
‘কে দিয়েছে এটা?’
‘আমি বলতে পারবো না। এক আন্তেল বললো তোমায় এটা দিতে।’
‘কোন আঙ্কেল?’
‘বলা যাবে না সিতরেত(সিক্রেট)।’
ভ্রু কুঁচকে এলো। কে আবার আমাকে ফুল পাঠাবে?মেয়েটা অধৈর্য্য হয়ে বললো,
‘নাও ধরো।’
আমি ফুলটা হাতে নিয়ে ওর গালে একটা চুমু দিয়ে বললাম,
‘ভালোবাসা নিও।’
তন্বী আমার কথার মাঝে ফট করে বলে উঠলো,
‘ভালোবাসা কিভাবে নিবে?’
চোখ ছোট ছোট করে বললাম,
‘বোইন তুই একটা গামলা আন আমি ভালোবাসা ছুইড়া মাইরা দেখাইতাছি ভালোবাসা কেমনে নেয়। শক্তপোক্ত আনিস। নয়তো ভালোবাসার ভারে ভাইঙ্গা যাইবো।’
তন্বী মুখ বাঁকিয়ে বললো,
‘তুমি ভালো হলে না।’
ওর কথা শুনে আমি ফিক করে হেসে উঠলাম। বাচ্চা মেয়েটা আমাদের কথার মাঝখানে চলে গেছে। কিছু সময় পর তায়াং ভাইয়া এসে বললো,
‘আয় আমার সাথে?’
‘কোথায়?’
ভাইয়া আমার কথার উত্তর দিলো না। আমরা চুপচাপ তার পিছু অনুসরণ করতে লাগলাম। কতগুলো ছেলের ভিড়ের সামনে এসে থামলো। আমি নিজেকে আবার গুটিয়ে নিলাম। জড়তা নিয়ে ভাইয়ার দিকে তাকালাম। তায়াং ভাইয়া সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘এই হলো আমার খালাতো বোন নোভা। আর আমার বোন তন্বীকে তো চিনিসই।’
থেমে আমার দিকে ফিরে বললো,
‘নোভা এ হলো আমার বন্ধু এনাজ, শাহেদ, নতুন বর রায়হান, ইমরান, মাহমুদ, রিমন।’
ভাইয়া একে একে সবার সাথে পরিচয় করে দিলো। আমি এদের নাম আগের থেকে জানতাম। তন্বী, তায়াং ভাইয়ার মুখে এদের নাম অনেক শুনেছি। কিন্তু আগে কখনো দেখিনি। ইমরান, শাহেদ, এনাজ, রায়হান, তায়াং ভাইয়া এই পাঁচ জন হলো জানে জিগার দোস্ত।আমি মুখে প্লাস্টিকের হাসি ঝুলিয়ে সবার দিকে তাকালাম। এনাজের দিকে তাকাতেই দেখি সে এক ভ্রু উঁচু করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেললাম। তার তাকানোর কারণ খুঁজে পেলাম না। আর খুজতেও গেলাম না। ইমরান ভাইয়া জিজ্ঞেস করলো,
‘কোন ইয়ারে উঠবে এবার?’
‘ফাইনাল ইয়ারে।’
শাহেদ ভাইয়া বললো,
‘তুমি কি ভয় পাচ্ছো নাকি?’
আমি মাথা নাড়িয়ে না বুঝালাম। রায়হান ভাইয়া আশ্বস্ত গলায় বললো,
‘ভয় পেয়ো না। আমরা তোমার ভাইয়ের মতোই।’
এনাজ এক হাত উঁচিয়ে বললো,
‘আমি না।’
সবাই চমকে একসাথে এনাজের দিকে তাকালো। এনাজ ভাবলেশহীন ভাবে আগের মতো তাকিয়ে আছে। সব বন্ধু সমস্বরে জিজ্ঞেস করলো,
‘মানে?’
এনাজ দুই হাত বুকে গুঁজে বললো,
‘মানেটা ওকেই জিজ্ঞেস কর।’
আমি ভ্যবলাকান্ত চেহারায় প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকাচ্ছি। কি উত্তর দিবো আমি তাতো বুঝতে পারছি না। তায়াং ভাইয়া বললো,
‘আমি কাহিনি বুঝলাম না।’
শাহেদ ভাইয়া বললো,
‘আমিও না।’
এনাজ পাঞ্জাবির হাতা গুটাতে গুটাতে ভাইয়াকে বললো,
‘তোর বোন এক মহিলাকে আমাকে দেখিয়ে কি বলেছে তা জিজ্ঞেস করে দেখ।তাহলে কাহিনি বুঝবি।’
আমার মাথায় শুকনা ঠাডা পরলো। এই কাহিনি এই বেডায় জানলো কি করে?সবাই এবার এনাজকে ছেড়ে আমার দিকে তাকালো।আর আমি! আমি তো এখন পারলে মাটির ভেতর ঢুকে পরি। আমার রিয়েকশন এখন,’ছাইড়া দে বাপ, কাইন্দা বাঁচি!’
বেশি পাকনামির ফল। লও এবার ঠেলা সামলাও।
#চলবে