মনের মানুষ পর্ব-২৭+২৮

0
688

#মনের_মানুষ ❤️
#সপ্তবিংশ_পর্ব❤️
#কলমে_সাঁঝবাতি

দুর্গাপুজোয় ঢাকের আওয়াজে বিভিন্ন রকম ফের থাকে…..মায়ের আগমনে যেমন আনন্দের বাদ্যি বাজে ঠিক তেমন ফেরার সময় বিষাদের সুর পাওয়া যায়।আজ দশমী…..উমার কৈলাশে ফিরে যাওয়ার সময় এসে উপস্থিত।বেলা বারোটা থেকেই বাবুঘাটে লম্বা লাইন।সমস্ত বনেদিবাড়ির ঠাকুর বিসর্জনের জন্য আসছে একের পর এক সাথে নানান লোকজন।নৌকায় করে দেবী মূর্তি নিয়ে গিয়ে মাঝনদীতে বিসর্জন করা হবে,ঢাক কাঁসর আর শঙ্খধ্বনিতে চারদিক মুখর হয়ে আছে।শরতের ঝকঝকে আকাশে তুলোর মেতে মেঘের খেলা…..অনেকে এসেই ভিড় জমিয়েছে ঠাকুর বিসর্জন দেখার জন্য।আহেলির কাল ফিরে যাওয়ার কথা আছে,এবং খুব ভোরেই ফ্লাইট।মুম্বাই ফিরে বেলা দশটার মধ্যে অফিস জয়েন করতে হবে….আহেলি আজকের দিনটা বাড়িতে থাকতে চেয়েছিলো কিন্তু প্রান্তিক ওকে জোর করে এনেছে বাবুঘাটে।প্রান্তিক আজ একটা সাদা পাঞ্জাবি পরেছে আর গলায় ক্যামেরা ঝুলছে…..আহেলিকে শাড়ি পরার কথা বলেছিলো প্রান্তিক কিন্তু তাতে রাজি হয়নি আহেলি।এই গরম আর ভিড়ের মধ্যে শাড়ি পরে থাকা একেবারে অসহ্যকর ব্যাপার তাই সাদা রঙের সালোয়ার পরেছে।

প্রান্তিকের হাত ধরে ভিড় ঠেলে কোনোরকমে ওরা ভেতরে প্রবেশ করলো….বনেদিবাড়ির একচালার ঠাকুর,কোনোটা রাজকীয় সাজ তো কোনোটা ডাকের।তবে আজ প্রতিমার মুখেও বিষণ্নতার ছোয়া….বরণ শেষে মাথা ভর্তি সিঁদুর আর ওষ্ঠে সন্দেশ নিয়েই মা ফিরবে তার শ্বশুরবাড়িতে।আহেলির সবচেয়ে মজা লাগতো ছোটবেলায়……মন্ডপ থেকে ঠাকুর নামিয়ে বিসর্জন করার আগে যখন পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে যেতো তখন ভাবতো মহিষাসুরকে প্রণাম করবে কিনা।কিন্তু যখনই দেখতো মহিষাসুরের মুখেও সন্দেশ আর কপালে সিঁদুরের টিকা তখন ঝুপ করে একটা নমস্কার সেরে নিতো।

পুরোনো কথা ভাবতেই হেসে ফেললো আহেলি…..ওরা এই মুহূর্তে যেখানে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে নৌকো ছাড়া হবে।গঙ্গার ধারে বেশ জোরে হাওয়া দিচ্ছে…..আহেলির ক্লিপে আটকানো চুলগুলো বারবার এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় বিরক্ত হয়ে আহেলি ভালো করে খোঁপা করে ক্লিপ দিয়ে দিলো।প্রান্তিক এগিয়ে গিয়ে একজন মাঝির সাথে কথা বলছে……কথা বলে আহেলির কাছে এসে বললো,,,,

“চলো….”

“কোথায়?”

“ওই নৌকাটা আমি আপাতত ভাড়া করলাম…..ফটোগ্রাফি করতে হবে তো নাকি?ওরা আমায় চেনে ভালোমতো।”

“কাউকে তো নিয়ে যেতে রাজি হলো না…..আর তোমার বেলাতেই রাজি হয়ে গেলো?”

“ম্যাজিক বুঝলে?সবার সাথে প্রান্তিকের তুলনা হয় না…..আর ঐ নৌকায় করে কয়েকজন যাবে নদীতে,ওরা সাঁতার কেটে ওই নদীতে ভেসে ওঠা ঠাকুরের বস্ত্রগুলো নেয়।”

আহেলি খেয়াল করলো ঘাটের একপাশে বেশ কয়েকটা জেসিবি দাঁড়িয়ে…..গঙ্গায় ক্রমাগত দূষণ বৃদ্ধি পাওয়ায় জন্য এ ব্যবস্থা।প্রতিমা নিরঞ্জনের খানিক পরই সেগুলো সরিয়ে ফেলা হবে।চারদিকে সিভিক ভলিনটিয়ার আর পুলিশ….এবার শুরু হবে বিসর্জন।প্রান্তিক আহেলি কে নিয়ে নৌকায় উঠলো…..আহেলি বেশ ভয়ের সাথে উঠলো নৌকায়।মাঝ নদীতে ঠিক নয়….বেশ কিছুটা দূরে যেতেই নৌকায় থাকা ছেলেগুলো জলে ঝাঁপিয়ে পরলো।ওদিকে এক এক করে দুর্গাপ্রতিমা আসছে…….প্রান্তিক নিজের ক্যামেরা নিয়ে একদম রেডি হয়ে থাকলো।

শুভ্র রঙের পাঞ্জাবি পরিহিত যুবকটির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে আহেলি……রোদের মধ্যে বেশ ঘেমে উঠেছে অথচ একটুও ক্লান্তি নেই চোখেমুখে।কে বলবে এই ছেলেটা নাইট ডিউটি সেরে সোজা এখানে এসেছে…..প্রান্তিকের কথায় ঘুমানোর তো সময় অনেক আছে কিন্তু দুর্গাপুজো বছরে একবারই আসে।

জলে ডুবে যাওয়ার আগে অব্দি আহেলি তাকিয়েছিলো প্রতিমাটির দিকে…..কখন যে ওর চোখদুটো ভিজে গেছে তা ওর নিজেরই জানা নেই।তবে এই অশ্রুবিসর্জন শুধুমাত্র মায়ের বিদায়ের জন্য নয়….আহেলির বিশ্বাসই হচ্ছে না ও জীবনে এমন একটা মানুষ পেয়েছে যে সেই মানুষটা যতটুকু সময় পায় নিজের জন্য তারমধ্যে আহেলিকেও রাখে।এমন নয় তো যে প্রান্তিকের অঢেল সময়…..ওতো একজন ডক্টর,হসপিটাল নিজস্ব চেম্বার সবমিলিয়ে প্রায় সারাদিন ব্যস্ত থাকে তাও কিসুন্দর করে সময় বের করতে জানে তা সে যতই কম হোক।আসলে চেষ্টা করলে সবই সম্ভব।
🌸🌸🌸🌸

প্রান্তিকের যখন ফটো তোলা শেষ হলো তখন বিকেল হয়ে এসেছে….চারদিকে ভিড়ে ঠাসাঠাসি।কোনোরকমে আহেলিকে নিয়ে বেরিয়ে এলো প্রান্তিক।আজ অবশ্য ওরা গাড়ি বা বাইক কিছুই আনেনি….কারণ আজ রাস্তায় ভালোই জ্যাম হবে।প্রান্তিক আর আহেলি দুজনই পাশাপাশি হাঁটছে…..হঠাৎই আহেলি রাস্তার ধারের একটা ফুচকার দোকান দেখে বললো,,,,,

“ওই দেখো ফুচকা…..সেদিন তো রাত হয়ে যাওয়ায় খাওয়া হলো না।চলো না আজ খাই…প্লিস,না করতে পারবে না।”

“না করবো কেনো আহেলি?সেদিন বারন করেছিলাম অনেকটা রাত হয়েছিলো তাই….খেলে তোমারি সমস্যা হতো।কিন্তু আজ তো বিকেল…তুমি খেতেই পারো।”

“আমি একা নয়…সাথে তুমিও খাবে।”

“সত্যি বলতে কি আহেলি….নাইট ডিউটির পরই আমি ফ্রেশ হয়েই বেরিয়েছিলাম।এতকিছুর মধ্যে মাথাটা বেশ ধরেছে…..তাই তুমি খাও।”

“কেনো আমি একা কেনো খাবো?তুমি তো নিজেই বলো ফুচকা খেতে ভালোবাসো তাহলে আজ না করছো কেনো?”

“ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড আহেলি….আমার মাথাটা ধরেছে।তাই এখন না….অন্যসময় ঠিক খাবো।”

“ওকে ফাইন!খেতে হবে না….আমিও খাবো না।চলো বাড়ি ফেরা যাক,কাল ভোরের আগে উঠতে হবে তাই বাড়ি ফিরে রেস্ট নেওয়া দরকার।”

“ওকে দেন চলো…..তোমায় বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আমিও যাবো।আজকে ছুটি নিলেও কাল আমাকেও তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।”

আহেলি অবাক হয়ে তাকালো প্রান্তিকের দিকে….ছেলেটা একবারও ওর রাগ ভাঙলো না কেনো?রাগে আহেলি আর তেমন কিছু বললো না।

🌸🌸🌸🌸

আহেলির রাগ থাকলেও প্রান্তিকের সাথেই এয়ারপোর্ট যাচ্ছে…..অনেকটা তাড়াতাড়ি বেরিয়েছে ওরা।এখনো রাতের অন্ধকার চারদিকে…..রাস্তায় আলোর মালা আর প্যান্ডেলগুলো একেবারে ফাঁকা।কয়েকদিনের ভিড় সামলে যেনো বিশ্রাম নিচ্ছে শহর কলকাতা।আহেলি এখনো কথা বলেনি প্রান্তিকের সাথে…..প্রান্তিকও তেমন কিছু আর বলেনি।দুজনই চুপচাপ….হঠাৎই প্রান্তিক গাড়ি থামাতে চমকে উঠলো আহেলি।বাইরে তাকিয়ে বললো,,,

“এখন তুমি ভিক্টরিয়ার সামনে এলে কেনো?আমায় কিন্তু টাইমলি পৌঁছাতে হবে।”

“তোমায় টাইমলি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার কাঁধে তাই ওটা নিয়ে ভেবো না।এখন গাড়ি থেকে নামো।”

আহেলি কিছু বলতে গেলেও প্রান্তিক ওকে গাড়ি থেকে নামার ইশারা করলো।চারপাশটা অন্ধকার….সাথে হালকা কুয়াশার স্তর।কথা অনুযায়ী ঠাকুর জলে পড়ার সাথে সাথে ঠান্ডার ভাব আসে আর সত্যিই সেরকম একটা ভাব।সামনে থাকা ভিক্টরিয়া প্যালেসের দিকে তাকিয়ে আহেলি ভাবলো এখন প্রান্তিক এখানে কেনো এলো?ঘুরে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো আহেলি কারণ প্রান্তিক ওর সামনে হাঁটুমুড়ে বসেছে।আহেলি অবাক হয়ে তাকাতেই প্রান্তিক পকেট থেকে একটা প্যাকেট বের করলো যার মধ্যে পোড়ামাটির গয়না আছে আর এটা সেই গয়না যেটা আহেলি নিজের জন্য শান্তিনিকেতনে পছন্দ করেছিলো।প্রান্তিক প্যাকেটটা আহেলির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,,,,

“এটা আমি শান্তিনিকেতনে কিনেছিলাম তোমায় দেবো বলে,কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে নি।কিন্তু ভগবান চেয়েছিলো আমরা এক হই তাইতো আমি আর তুমি এখানে।তাই আপাতত আমার প্রথম গিফটটা দিয়েই বলছি আহেলি…..

“উইল ইউ ম্যারি মি?সারাজীবন আমার সাথে থাকবে?”

আহেলি ওপর নিচে মাথা নারাতেই প্রান্তিক হাসলো…..হাসির সাথে ওর চোখ দিয়ে টপ করে একফোটা জল পরলো।উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো আহেলিকে শক্ত করে।আহেলির গলায় মুখ রেখে জড়ানো গলায় প্রান্তিক বললো,,,,

“আমি তোমায় ভীষণ ভালোবাসি আহেলি…..সেই প্রথমদিন থেকে,যেদিন আমায় তুমি সানগ্লাস পরতে দেখে সাউথের ভিলেন বলেছিলে।”

প্রান্তিকের কথায় হেসে ফেললো আহেলি…..বড়ো করে একটা নিশ্বাস নিয়ে আরো শক্ত করলো হাতের বাঁধন।তখনই প্রান্তিক আহেলির কানের কাছে বললো,,,,,

“কাল তোমায় এমনি এমনি রাগিয়ে ছিলাম,দেখলাম অভিমান হলে কি করো তুমি।কিন্তু তুমি তো চুপ করে গেলে।এটা করবে না আর কখনো….রাগ অভিমান যাইহোক সেটা ঝগড়া করে মিটিয়ে নেবে।”

“সেকি?তুমি চাও সব্বার মতো আমিও ঝগড়া করি তোমার সাথে?”

“অফকোর্স….তুমি আমি কি আলাদা?আমরাও আর পাঁচজনের মতো করেই ভালোবাসবো।ওই যাকে টিপিক্যাল ভালোবাসা বলে সেটাই।আর প্রোপস করার পর কি হয় জানোতো?”

প্রান্তিকের কথায় আহেলি অবাক হয়ে তাকাতেই প্রান্তিক ভ্রূ নাচিয়ে হাসলো।আহেলি ঠোঁট কামড়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেও আবার তাকালো প্রান্তিকের দিকে…..প্রান্তিক একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলো আহেলির ঠোঁটের দিকে।তারপর স্বাভাবিক নিয়মেই কমে এলো দুই ঠোঁটের ব্যবধান….মিলিত হলো প্রাকৃতিক নিয়মে।ক্যালারি বার্ন করার মোক্ষম উপায় হলো নাকি চুম্বন….এমনটাই শোনা যায়।তো এহেন প্রোপোসাল চুমুতে কতো ক্যালারি ঝড়লো কে জানে?!

প্রান্তিকের গাড়িটা আবারো এগিয়ে চলেছে এয়ারপোর্টের দিকে…..আহেলি প্রান্তিকের একটা হাত ধরে ওর কাঁধে মাথা রেখেছে।হয়তো আবার কয়েকমাসের দূরত্ব থাকবে ওদের দুজনের মাঝে তবে ও দূরত্ব এর পরই আরো কাছাকাছি আসবে দুজন।গাড়ির রেডিওতে আহেলির বাজানো একটা গান বেজে চলেছে লো ভলিউমে,,,,

Meri Rahein Tere Tak Hain,
Tujhpe Hi Toh Mera Haq Hai,
Ishq Mera Tu Beshaq Hai,
Tujhpe Hi Toh Mera Haq Hai,
Saath Chhodungi Naa,
Tere Pichhe Aaungi,
Chheen Lungi Ya Khuda Se Maang Laaungi,Tere Naal Taqdeeran Likhvaungi,
Main Teri Ban Jaungi,
Hm..Main Teri Ban Jaungi,

চলবে……

#মনের_মানুষ❤️
#অষ্টবিংশ_পর্ব❤️
#কলমে_সাঁঝবাতি🌸

ঋষভ আজ ভীষণ অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশিই ব্যস্ত….পরপর দুটো প্রেসমিট সামলানোর পর এসে বসলো নিজের জায়গায়।এই পদটায় বসার পর থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দায়িত্ব সামলাতে হয় ওকে….তবে তাতে কি?ওতো নামমাত্র চেয়ারে বসে সমস্ত দায়িত্ব সামলায় যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সারার দাদা নেয়।সারার দাদা অর্থাৎ মন্ত্রী মশাইয়ের ছেলে শ্রীনাথ যে কিনা একজন বখে যাওয়া ছেলে..পড়াশোনা কিংবা মানসিকতা সবকিছুতে অনেকটা পিছিয়ে….একবার ইফটিসিংয়ের কেসে কয়েকদিন জেলে ছিলো।মন্ত্রী মশাই সকলের চোখে ভালো সাজার জন্য নিজের ছেলের বদলে ঋষভ কে টিকিট দেয়…..তবে সংসদ পদটা পেলেও এর সব সিদ্ধান্ত নেয় ওই ছেলে।ঋষভ এর কোনো পরামর্শ বা কথা ধার ধারে না…..কিন্তু আজ যা কান্ড ঘটেছে তাতে ও কি জবাবদিহি করবে?ঋষভ এর নামে ওদের এলাকায় লোক দিয়ে শ্রীনাথ তোলা আদায় করেছে….তখন ভয় পেয়ে সকলে টাকা দিলেও পরে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে থানায় অভিযোগ জানায়।থানা থেকে কোনোভাবে খবরটা লিক হয়ে মিডিয়ার কাছে চলে যায় আর সেই থেকে সমস্যার শুরু।

ঋষভ মাথায় হাত দিয়ে চুপচাপ বসেছিলো এমন সময় মন্ত্রী মশাই এসে ঢুকলো ভেতরে….ওনাকে দেখেই ঋষভ উঠে দাঁড়ালো।হাতের ইশারায় ঋষভকে বসতে বলে নিজেও একটা চেয়ার দখল করে বসলেন।ঋষভ কিছু বলবে তার আগেই উনি গম্ভীর গলায় বললেন,,,,

“তোমার জন্য আজ আমার দলের কি অবস্থা হয়েছে দেখছো ঋষভ?তুমি এমনটা কি করে করলে?”

“আমার জন্য?আপনার কোথাও একটা ভুল হচ্ছে…..এসবই কিন্তু শ্রীনাথ করেছে।”

“হ্যাঁ জানি ও করেছে….তো আর কি করতো?তুমিই বা ওকে ওর প্রয়োজনীয় টাকা দাওনি কেনো?”

“স্যার আপনি ভালো করে জানেন যে টাকাটা ফান্ডে জমা হয়েছে ওটা রাস্তা সারাইয়ের কাজে লাগবে।আমি ক্ষমতায় এলে ওই রাস্তা সারাবো কথা দিয়েছিলাম।”

“আরে রাখো তোমার কথা…..আগামী পাঁচবছর তো তুমি এই চেয়ারে থাকছো তাহলে কথা রাখার কি দরকার?আমার ছেলেটা টাকা চাইলো আর তুমি না করলে তাইতো ও বাধ্য হয়ে…..”

“আপনি শ্রীনাথকে সাপোর্ট করছেন স্যার?ওকে বোঝান….এভাবে এলাকার লোকের থেকে জোর করে টাকা নিলে কিন্তু আমাদেরই ক্ষতি হবে।”

“হ্যাঁ জানি জানি…আর সেজন্য বলছি তুমি এরপর সবটা নিজের ঘাড়ে নেবে।যতই মিডিয়ার লোককে বলো এটা বিরোধী পক্ষের চাল সেটা কখনো মানবে না।তাই তুমি আরেকটা কনফারেন্স ডেকে সবটা স্বীকার করে বলো যা করেছো ভুল করেছো।”

“স্যার আপনি এসব কি বলছেন?এতে আমার কি অবস্থা হবে একবারও ভাববেন না?সকলে তো আমায় অবিশ্বাস করবে।”

“সো হোয়াট?পার্টির জন্য এটুকু করতে পারবে না?এরআগে তো কতকিছু করেছো আজ নয় এটাও করলে।তবে শ্রীনাথের নাম যেনো না আসে….এখন ওকে সকলে একটু হলেও ভালো নজরে দেখে।আমি চাই না সেটা ভুল প্রমাণিত হোক।”

কথাটা শেষ করে মন্ত্রী মশাই চলে যেতেই দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরলো ঋষভ।
🌸🌸🌸🌸

আহেলি অফিস থেকে বেরিয়ে একটা অটোয় উঠলো…..আর কদিন পরেই কালীপুজো আর মুম্বাইতে দিওয়ালি।সেসবের প্রস্তুতি চলছে চারদিকে….বাতাসে ঠান্ডার হালকা আমেজ।অটোয় বসে কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে নিউস চালালো আহেলি…..সারাদিনের পর এভাবেই নিজের শহরের খবরাখবর নেয়।অত্যন্ত জনপ্রিয় একটা বাংলা নিউস চ্যানেলে টেলকাস্ট হচ্ছে…..

“অন্যতম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সংসদ ঋষভ স্বীকার করলো যে নিজেই লোক লাগিয়ে এলাকা থেকে তোলা আদায় করতো।এবং সেটা এই প্রথমবার নয় এরআগেও বহুবার এমন করেছে ঋষভ…..লোককে ভয় দেখিয়ে তাদের থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে নিজে বিলাসবহুল জীবন কাটাতেন বলেই জানা যাচ্ছে।ঋষভ এর মত একজন যুবনেতার থেকে এমনটা কেউই আশা করেনি।আসুন জেনে নিই ঋষভ এর দলের প্রতিক্রিয়া।বলেই আরেকটা ভিডিও টেলিকাস্ট হলো যেখানে মন্ত্রী মশাই নিজের বাড়ির ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে।রিপোর্টার ঋষভ এর কথা জিজ্ঞেস করতেই উনি বললেন,,,,,
“আমার ভীষণ লজ্জ্বা হচ্ছে ঋষভকে আমার দলের একজন সদস্য বলতে….আমি ভাবিনি ও এরকম একটা কাজ করতে পারে।এসব সমন্ধে কোনোভাবে অবগত ছিলাম না আমরা…..তবে এধরনের লোককে আমি কোনোমতে দলে রাখতে রাজি নই।আমি ঋষভকে আমার দল থেকে কালই বহিষ্কার করবো।এ নিয়ে আমাদের সকলের আলোচনা হয়ে গেছে।

খবরটা বন্ধ করে কান থেকে ইয়ারফোন খুলে ফেললো আহেলি।ম্লান হাসি ফুটে উঠলো আহেলির মুখে…..এভাবেই হয়তো প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয়।
সামনে বেশ কয়েকদিন ছুটি হবে তাই অফিসে এখন বেশ কাজের প্রেশার….আহেলি ক্লান্ত দেহে যখন নিজের বাসস্থানে ফিরে এলো তখন ওর মধ্যে আর কোনোপ্রকার এনার্জি অবশিষ্ঠ নেই।অন্যান্য দিন আহেলি বাড়ি ফেরার পর নিজের হাতে নিজের জন্য ডিনার তৈরি করে তবে আজ আর রান্না করতে ইচ্ছা হলো না।ফুড ডেলিভারি এপ থেকে রুটি আর তড়কা অর্ডার দিয়ে প্রান্তিককে কল করলো।ফোন সুইচ অফ বলতেই আহেলি বুঝলো এখনো প্রান্তিকের ডিউটি শেষ হয়নি।ফোন রেখে ক্লান্ত দেহটা বিছানায় এলিয়ে দিলো।আজকে নিউসে দেখা ঘটনাটা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না আহেলির….ঋষভ যে এরকম একটা কাজ করতে পারে তা ধারণার বাইরে।তবে কি…..

আহেলির ভাবনার মাঝেই ডোরবেল বেজে উঠলো….হয়তো ওর অর্ডার চলে এসেছে,কাছের একটা রেস্টুরেন্ট থেকে অর্ডার করেছিলো।প্লেটে খাওয়ার নিয়ে আহেলি যখন খেতে বসলো ঠিক তখনই বেজে উঠলো আহেলির ফোনটা।প্রান্তিকের কল…..

এককানে ফোন ধরে খাওয়া শুরু করলো।আহেলি কিছু বলার আগেই প্রান্তিক বললো,,,

“ব্যাপার কি?আজ ম্যাডাম নিজে থেকেই কল করলো যে….!”

“না এমনিই….এসে রান্নার ঝামেলা ছিলো না তাই ভাবলাম কল করি।”

“কেনো?কোনো কলিগের বাড়িতে ইনভিটেশন ছিলো বুঝি?”

“আরে না তা নয়….শরীরটা ভালো লাগছিলো না তাই জন্য।”

“শরীর ভালো ছিলো না মানে?কি হয়েছে…..আবার মাথার যন্ত্রণা হচ্ছে নাকি?আর কতবার বলবো এতো স্ট্রেস নিও না।”

“উফফ…..এতকিছু হয়নি।জাস্ট টায়ার্ড ছিলাম তাই আর ভাললাগেনি।তুমি এখন কোথায়?”

“আমি ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফিরবো….আজ মায়ের কাছে যেতে হবে কারণ সৌরিক বাবুর বার্থডে যে।দুপুরে যেতে পারিনি তাই এখন যেতেই হবে।”

“আমি সৌ কে ফোনেই উইশ করেছি,তুমি কি কিনলে ওর জন্য?আমার তো তেমনকিছু দেওয়াই হলো না।”

“গিফ্ট দেওয়াটা বড়ো কথা না আহেলি….তুমি যে ওকে উইশ করেছো এটাই বেস্ট।আর সারাদিনে আজ সত্যিই ভীষণ বিসি ছিলাম,তাই এখনো কিছু কেনা হয়নি।”

“কিছু কেনো নি মানে?খালি হাতেই ভাইয়ের সামনে দাঁড়াবে?ও কি ভাববে বলোতো?ওর তো একটা আশা থাকতে পারে মনে তাই না?”

“সৌরিকের জন্য খুব টান দেখছি ম্যাডামের…..এরমধ্যে কিছুটা আমার জন্য হলে ভালোলাগতো।”

“বাজে বকবে না একদম….সৌরিক বাচ্ছা ছেলে।ওর সাথে হিংসা?তুমি জানো আমার ভাইয়ের খুব শখ ছিলো….ছোটবেলায় যখন সবাইকে ভাইদের রাখি পরাতে,ভাইফোঁটা দিতে দেখতাম তখন মনেহতো আমার যদি এমন একটা ভাই বা দাদা থাকতো।সৌরিক তো আমার ভাইয়ের মতোন….তাই ওর জন্য তো টান থাকবেই।”

“আপনার ভাইয়ের জন্য আমি অবশ্যই গিফ্ট কিনে তারপর যাবো…..এখনো কয়েকটা মল খোলা পাবো হয়তো।”

“হুমমম….আচ্ছা তুমি আজকের নিউস দেখেছো গো?”

“নিউস?বললামই তো আজ প্রেশার ছিলো পেশেন্টের,পরপর কয়েকটা অপারেশন তারপর ওয়ার্ড ডিউটি।আই এম অলসো টায়ার্ড আহেলি।”

“তাহলে ডিনার করে আজ আর ফেরার দরকার নেই….ওখানে থেকে যেও।ভালো করে রেস্ট নাও।কাল আবার চেম্বার আছে।”

“আই নো দ্যাট….কিন্তু আমার যে আজ তোমার সাথে বড্ড কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছে”

“তো?”

“তো মানে?তুমি ভালো করেই জানো কদিন তোমার অফিসে এতটাই চাপ যে তুমি এই সময়টা ছাড়া সারাদিনে আর একবারও কল করো না।আমার কিন্তু এটুকু তে পোষায় না।কাল শনিবার তাই কোনো বাহানা আমি শুনবো না….আমার চেম্বার আমি ঠিক সামলে নেবো।তুমি জাস্ট আজ আমার সাথে কথা বলবে আর ততক্ষণ কথা বলবে যতক্ষন আমি চাইবো।”

“এতো ডিমান্ড কিন্তু ভালো নয় ডাক্তারবাবু!”

“আমি আমার আহেলির কাছে ডিমান্ড করেছি,তাতে তোমার কি?”

প্রান্তিকের কথায় হাসলো আহেলি।প্রান্তিক অল্প হেসে বললো,,,

“হটাৎ তখন নিউস দেখার কথা বললে কেনো?”

“তুমি জানো কি হয়েছে?!ঋষভদাকে নাকি তোলা আদায়ের অভিযোগের দায়ে দোষারপ করা হয়েছে,এছাড়াও আরো কিসব আছে।আর ওর দল নাকি ওকে বহিষ্কার করে দেবে।”

“তাই নাকি?!রাজনীতি রাজনীতি করে যে এতো কান্ড ঘটালো তার সাথে এমন হলো?না হওয়ার কিছুই নেই….টাকার লোভে মানুষ কতকি করে।”

“কিন্তু ঋষভদা তোলা আদায় করে এটা বিশ্বাস হচ্ছে না….আর যাইহোক ও কিন্তু এসব ক্ষেত্রে অনেস্ট।আমার মনেহয় আবার ও ওর দলের জন্য ফাঁসলো।”

“বাহঃ আহেলি….যে তোমার সাথে এমন ট্রিট করলো তার হয়ে এখনো কথা বলবে?আর বলবেই না বা কেনো?হি ইস ইউর ফার্স্ট লাভ….তাই ওকে তো ভোলা যায় না।সে ও তোমার সাথে যাই করুক….তুমি ওকেই বিশ্বাস করবে।ওকে ফাইন।থাকো তুমি তোমার ঋষভদায়ের ওপর বিশ্বাস নিয়ে…আমি রাখলাম।আর আজ তোমার শরীরখারাপ নয় বরং মনখারাপ হয়েছিলো ঋষভ এরজন্য তাই তো?”

প্রশ্ন করেও উত্তরের অপেক্ষা না করেই প্রান্তিক কলটা কেটে দিলো।প্রান্তিকের এহেন আচরণে অবাক আহেলি….ওতো ঋষভ কে সাপোর্ট করেনি।ইভেন আহেলি মনেমনে খুশিই হয়েছে….যে ক্ষমতার জোরে একদিন ওকে মামনি আর ঋষভ অপমান করেছিলো সেই ক্ষমতাই ওকে ডুবিয়েছে।আহেলির শুধু মনে হয়েছে এসবের মধ্যে ঋষভ এর হাত নেই….কিছু না করে মন্ত্রী-মশাইয়ের হুকুম তামিল করতেই আজ এমন অবস্থা।কিন্তু প্রান্তিক সবটা না শুনেই কল কেটে দিলো।

চলবে……