#মনোভূমির_ছায়া
পর্ব – ২৮
লেখনী – #মাহীরা_ফারহীন
তার একদিন পর উনিশ অক্টোবর স্কুলে গেল নিনা। কালো টপ, প্যান্ট এবং সানগ্লাস পরে এসেছে। ওর মোটা ভারি প্ল্যাটফর্ম সু টাও কুচকুচে কালো। চুলটা ঢিলে করে বেনি করেছে। ওর বাদামি ফোর্ড গাড়িটা সোজা পার্কিং লটের মাঝে এনে দাঁড় করালো। গাড়ি থেকে বের হতেই রিকের ছাদ খোলা লাল গাড়ি এসে থামল ওর পেছনে। উচ্চস্বরে বলল,
‘কী আশ্চর্য! এটা তোমার বাপের জায়গা নাকি? পার্কিং লটের মাঝখান থেকে গাড়ি সরাও।’
নিনা এমন ভাবে গটগট করে হেঁটে চলে গেল যেন শুনতেই পায়নি। মাথার ওপর সূর্য বহালতবিয়তে দীপ্তি ছড়াচ্ছে। পরিষ্কার নীল আকাশে বড় বড় দুধ সাদা মেঘ ভেলা ভেসে যায়। সূর্যের তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। তাই বড় একটা সানগ্লাস পরেছে। স্কুলে প্রবেশ করে সোজা ভিরের মাঝখান থেকে হেঁটে গেল। বাইরে অমিত স্কুলে প্রবেশ করে পার্কিং লটের মাঝে নিনার গাড়ি দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ভাবল,
‘এইতো আবার মাথা খারাপ হয়েছে।’
নিনা গোমড়ামুখে ক্লাসে বসে আছে। আশেপাশে প্রচুর কোলাহল হচ্ছিল। ছাত্র ছাত্রীরা কেউ কেউ বেঞ্চের ওপর উঠে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর ইভান এলো। নিনার সামনের সিটটায় বসেই যথারীতি পেছনে ঘুরে ওকে শুভ সকাল জানালো। নিনা তেমন কোন প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করল না।
ইভান বলল,
‘কেমন আছো এখন?’
‘ভালো।’
‘আচ্ছা কাল থেকে যে এতবার ফোন দিলাম, ম্যাসেজ দিলাম। উত্তর দাও না কেন?’
‘এমনি।’ নির্বিকার চিত্তে বলল নিনা। ইভান ভ্রু কুঁচকে তাকাল। পুনরায় কিছু বলতে যাচ্ছিল তখনই মি.ফিলিক্স ক্লাসে প্রবেশ করলেন। আজ ওনার পড়ায় তেমন একটা মনোযোগ নেই নিনার। ফিলিক্স স্যারের কোন প্রশ্নের উত্তর দিতেও আগ্রহ প্রকাশ করল না। কোথা থেকে যেন প্যানকেকের সুবাস ছড়িয়ে পরল ক্লাস জুড়ে। সকলে পেছনের দিকে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। হয়তো বা পেছনে বসে ছাত্র ছাত্রীরা প্যানকেক বানাচ্ছে। যদিও নিনার মাথায় আসে না ব্যাকবেঞ্চারদের এমন কী ক্ষমতা থাকে যে ক্লাসে রান্নাবান্না শুরু করে দিলেও কেউ টের পায় না। ক্লাস শেষে ও বেরিয়ে লকার করিডোরে পৌঁছল। ওমানা ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
‘আরেহ স্কুলের মধ্যে সানগ্লাস কেন পরে আছো?’
‘এমনিই। মাথা ব্যাথা করছে তাই।’
‘ওহ আচ্ছা।’ বলে একটু বিরতি দিয়ে আবার বলল,
‘আচ্ছা গত কয়েকদিন স্কুলে আসোনি কেন?’
‘অসুস্থ ছিলাম।’
‘ওহ।’ ছোট করে বলল ও। ওর সাথে টুকটাক কথা শেষ হতে হতে এরপরের ক্লাস শুরু হওয়ার ঘন্টা বেজে গেল। আবারও ওর এবং ইভানের একই সাথে ক্লাস। কিন্তু সেখানে গিয়ে ওর মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করল না। ক্লাস না শেষ হওয়া পর্যন্ত প্লে গ্রাউন্ডে গিয়ে একা বসে থাকল। সারা মাঠা, গ্যালারি একদম ফাঁকা। ভিড় ভাট্টা ভালো লাগছে না। হালকা ঠান্ডা বাতাসে কেমন যেন অদ্ভুত একটা ধাতব সুবাস।
ও বুঝতে পারলো না বাতাসে সত্যিই কী এমন সুবাস আছে নাকি ওর নাসারন্ধ্রেই সমস্যা হয়েছে। মনের আঙিনায় কোন আনন্দের প্রজাপতি উড়ছে না৷ কোন ফুলের সুবাস ওকে নাড়িয়ে দিচ্ছে না। মন কেমন করা একদল ধূসর মেঘ ভেসে ভেসে মনের আকাশে উঁকি দিচ্ছে। অস্থির অস্থির একটা অনুভূতি গ্রাস করছে ওকে। বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ ভাবে নরম ঘাসে ঢাকা মাঠে বসে রইল। ক্লাস শেষ হওয়ার সময় হয়ে আসতেই অমিতকে ম্যাসেজে অফিস রুমের সামনে আসতে বলে নিজেও উঠে দাঁড়াল। সোজা স্কুল বিল্ডিংয়ে ঢুকে একতলার অফিস রুমের দিকে এগিয়ে গেল। অফিস রুমের কয়েকটা অংশের মধ্যে যেখানে এনাউন্সমেন্টের জন্য স্পিকার রাখা সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। ক্লাস শেষের ঘন্টা পরার কিছুক্ষণ পর অমিত সেখানে এসে উপস্থিত হলো। ডেপুটি ম্যাডাম এনাউন্সমেন্টের যাবতীয় কাজ সামলান। কাজেই ওনার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন লাঞ্চ ব্রেক। অমিত ওর পাশে এসে দাঁড়িয়ে কৌতুহলী হয়ে বলল,
‘কী ব্যাপার? তুই ক্লাসে আসিস নি কেন? আর এরকম মাফিয়ার মতো সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন? স্কুলের মধ্যে সানগ্লাস কেন পরে আছিস?’
‘আরেহ এইসব ছাড়। শোন ডেপুটি ম্যাডাম যেকোন সময় টিচারস ওয়াশরুমে যাবেন।’
‘তো?’
‘তুই বাইরে থেকে দরজা লক দিবি।’
‘কী!? তুই পাগল হয়ে গেলি? আমাদের খবর করে দিবে এইসব করলে।’
‘ধুর উনি কিভাবে জানবেন আমরা এইসব করছি। আমি একটা জরুরি কাজ করব এখন। উনি থাকলে সেটা করতে দেবেন না। কাজটা হয়ে যাওয়ার পর তুই গিয়ে এমন ভাবে দরজাটা খুলবি যেন তুই এমনি ওখান থেকে যাওয়ার সময় আবিষ্কার করেছিস উনি লক হয়ে আছেন। ওকে?’
অমিতকে বিভ্রান্ত দেখাল। নিনা বিরক্ত হয়ে ওর দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই অমিত প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বলল,
‘ওকে ফাইন। বলেই চলে গেল।’ নিনা অফিস থেকে বের হয়ে পাশের করিডরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় রইল। দুই হাতে গ্লাভস পরে নিল। কিছুক্ষণ পরই ডেপুটি ম্যাডাম বের হলেন এবং ওয়াশরুমের দিকে গেল। নিনা অফিস রুমে ঢুকতেই অমিতের কাছ থেকে ম্যাসেজ এলো, ‘ডান’।
নিনা এগিয় গিয়ে পকেট থেকে একটা পেনড্রাইভ বের করে স্পিকারটা অন করল। স্পিকারে পেনড্রাইভটা লাগিয়ে দিতেই সারা স্কুল জুড়ে প্রতিটা ক্লাস, করিডর, হল, ক্যাফেটেরিয়ার স্পিকারে স্পষ্ট ভাবে অরল্যান্ডো এবং হারিনের কথোপকথন শোনা যেতে লাগলো,
‘ফাইন আমিই রেখেছিলাম ইভানের ব্যাগে টাকা। বাট সেটার মানে তো এটা নয় যে আমি সারাসরি টনিকে ফাঁসাতে চেয়েছিলাম। আমি তো ওর বিরুদ্ধে ছিলাম না।’ বলে উঠল অরল্যান্ডো।
‘কথা একই। তোমার কী মনে হয় টনি কখনো যদি এটা জানতে পারতো যে তোমার কারণে ওকে সাস*পেন্ড হতে হয়েছে। তোমার সাথে বন্ধুত্ব রাখতো ও?’ শোনা গেল হারিনের কন্ঠ।
‘বাট যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে এবং সেটা এই জীবদ্দশায় টনি কখনো জানতেও পারেনি৷ ও কখনোই জানতে পারবে না যে ইভান নির্দোষ ছিল। ইভানকে সকলের কাছে সারাজীবন দোষি হয়েই থাকতে দাও। এই বিষয়ে তুমি হস্তক্ষেপ করতে এসো না।’
নিনা সাথে সাথে বের হয়ে গেল। এখন যতক্ষণ না পেনড্রাইভটা খোলা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত একই অডিও বারবার চলতেই থাকবে। হাতের গ্লাভসটা খুলতে খুলতে গটগট করে হেঁটে গেল। চারিদিকে সকল শিক্ষার্থী যে যেখানে ছিল থেমে গিয়ে চুপচাপ মনোযোগ সহকারে অডিওটা শুনছে। সকলের মুখে বিস্ময়ের ছাপ। কেউ হাঁটছে না, কথা বলছে না। সকলেই থেমে গিয়েছে। শুধু নিনা কারোও দিকে দৃষ্টিপাত না করে সোজা এগিয়ে যেতে থাকলো। একবার অডিওটা সম্পূর্ণ শেষ হতেই স্কুলে একটা হট্টগোল পরে গেল। চারিদিকে কানাঘুঁষা শুরু হয়ে গেল। স্কুলের সামনের চত্ত্বরে বের হয়ে আসতেই আবিষ্কার করল সেখানে একটা বড় গন্ডোগোল লেগে গিয়েছে। অনেকগুলো ছেলে মেয়ের জটলার মধ্যে ইভানকে দেখা গেল। অরল্যান্ডোকে গ*লা টিপে ধরেছে সম্ভবত। নিনা সেদিকে কিছুক্ষণ নিরবে তাকিয়ে থাকল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তখনই লিজা দ্রুত ওর পাশ দিয়ে যেতে যেতে থেমে গেল। নিনার দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
‘ওই অডিওটা তুমি কোথা থেকে পেয়েছ?’
‘হারিনের কাছ থেকে সেদিন নিয়েছিলাম।’
‘ওহ আচ্ছা। তো এতদিন পর ওটা সামনে আনলা কেন?’
‘ সুযোগ পাইনি তাই।’
‘ওহ যাই হোক থ্যাঙ্কিউ সো মাচ নিনা! এর চাইতে সেরা উপহার ভাইয়াকে আর কেউ দিতে পারতো না।’
আজ ইভানের জন্মদিন তাই লিজা কথাটা বললো। নিনা শান্ত কন্ঠে বলল,
‘ওর জন্মদিনের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই। হাতে প্রমাণ থাকলে অবশ্যই কেউ চুপ করে বসে থাকবে না। এখন তোমার ভাইকে গিয়ে সামলাও।’ বলে গটগট করে হেঁটে
সোজা পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে গেল। অমিত প্রায় ছুটতে ছুটতে নিনার কাছে এসে পৌঁছল। ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
‘আরেহ ভাই তুই কী যে বম্বটা ফেললি৷ সারা স্কুল জুড়ে কী যে একটা হল্লা শুরু হয়েছে। তুই যদি দেখতি!’
‘আমার স্কুল ড্রামায় কোন ইন্টারেস্ট নাই।’ বিরক্ত কন্ঠে বলল নিনা।
‘হুহ তুই লিটারেলি জিনিসটা স্টার্ট করেছিস।’
‘আমি জাস্ট সত্যটা সবার সামনে আনলাম। আচ্ছা আর ডেপুটি মিস কে বের করেছিস?’
‘হ্যা হ্যা আমার কাজ ডান।’ বলে আবার বলল,
‘চলে যাচ্ছিস? বাকি ক্লাস করবি না?’
‘না। আমার ভাল্লাগছে না।’ বলেই দরজা খুলে গাড়িতে উঠে বসল। তখনই এমিলি ছুটে এলো সেখানে। ছুটে আসার কারণে হাঁপিয়ে উঠেছে। নিনা গাড়ির গ্লাস নামাল। এমিলি ঝুঁকে বলল,
‘নিনা পেনড্রাইভ টা কী তোমার?’
‘হ্যা।’
‘ওহ। উম তুমি কী আগামীকাল একবার আমার বাসায় আসবা? এখন তো আমিও জানি যে তুমিই কোকোনাট। সো….’ শেষের কথাটা ইতস্তত করে বলল।
নিনা প্রচন্ড বিরক্ত হলো। বারবার ওকেই কেন গ্রেউড বাড়ি যেতে হবে? কিন্তু আরেকবার গ্রেউড বাড়ি যাওয়াটা এখন সবচেয়ে বেশি দরকার। কারণ সেদিন আরেকজন ছিল। আরেকজন ব্যক্তি যে ওই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত ছিল। যে বই পড়ছিল। অবশ্যই কেউ মানুষের বাসায় অল্প সময়ের জন্য এসে বই পড়ে না। তাহলে তার ব্যাপারটা নিশ্চয়ই অন্য রকমই ছিল। অগত্যা নিনা গম্ভীরমুখে বলল,
‘ওকে।’ এমিলি সোজা হয়ে দাঁড়াল। অমিত হতাশ ভাবে ওর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। নিনা গাড়ি স্টার্ট দিল।
——————-
স্কুলের ইনফার্মারিতে বসে আছে ইভান। মা*রামা*রি করতে গিয়ে হাতে লেগেছে। মনে হচ্ছে কতগুলো বিষন্নতার ভারি চাদর মনের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে কেউ। তাইতো মনটা ভার হয়ে আছে। পরশুদিনই বলতে গেলে সারাটা দিনই নিনার বাসায় কাটিয়ে বের হওয়ার পর বেশ উৎফুল্লই ছিল ও। তবে এরপর না নিনা ওর ফোন ধরছে না কোন ম্যাসেজের উত্তর দিচ্ছে। এমনকি দেখা হওয়ার পরও তেমন ভাবে কথা বলছে না। এড়িয়ে চলছে। লিজা নিজের ও ইভানের স্কুল ব্যাগ নিয়ে ইনফার্মারিতে প্রবেশ করল। ইভান যেই বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে আছে সেখানে এসে দাঁড়াল। বলল,
‘অহেতুক কেন মাথা গরম করো? এখন খুব ভাল্লাগছে হাতটা কে*টে?’
‘ওই শয়তান অরল্যান্ডো এত বছর ধরে আমার আর টনির সম্পর্ক নষ্ট করে দিয়ে আমাদেরই চোখের সামনে দিয়ে দিব্যি ঘুরে বেরালো! আশ্চর্য! এইসব কেন করলো ও? আমার ক্যারিয়ার নষ্ট করে কী পেত? মাঝখান থেকে টনির এতগুলো বছর নষ্ট হলো।’
লিজা ওর পাশে বসল। নরম কন্ঠে বলল,
‘ আপাতত হেড স্যারের কামরায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে ওকে।
অবশ্য এর আগে সকলে ওকে চেপে ধরার পর মুখ খুলেছে।
ও সিম্পলি জেলাস ছিল। তুমি আর টনি দুজনেই খুব ভালো খেলোয়াড় ছিলা। বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলা। তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে গিয়ে সেটা অন্যদিকে চলে গেছে।’ বলে থামল। একটু বিরতি দিয়ে আবার বলল,
‘কিন্তু এগুলো জাস্ট মানে মানুষ কিভাবে এসব করতে পারে? কেনোই বা করে?’ বলতে বলতে চুপ হয়ে গেল। উদাসীন দৃষ্টিতে সাদা মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকল। ইভান বলল,
‘মন খারাপ করিস না। যা হয়ে গেছে তা তো হয়েই গেছে।’
‘নাহ। আমার এখন একটাই আফসোস হচ্ছে। সেই হোমকামিং পার্টির সময় রাগ করে টনিকে আমি বলেছিলাম ওর কয়েকমাসের পরিশ্রম করে তৈরি করা প্রোজেক্ট আমিই ইচ্ছে করে নষ্ট করে দিয়েছি। ওর ওইটার প্রতি কী ডেডিকেশন ছিল, সেটা দেখার পরও আমি ওর ফিলিংসের গুরত্ব দেইনি। বলেছিলাম, আমিও ফার্স্ট এ ওকে আমার ভাইয়ের শত্রু হিসেবে দেখেই রিলেশনে গিয়েছি। ওকে শুধু কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে।’
‘কী!? এই জন্যে টনি সেদিন এসে আমার সাথে মা*রামা*রি শুরু করেছিল? তুই এইসব আবার কেন করতে গেলি? এইসবের জন্যে তো ও তোকেই চিটার ভেবে বসেছিল। যেখানে ওই প্রোজেক্ট আমার জন্য নষ্ট হয়েছিল।’
‘ওয়েল তুমি তো আর সরাসরি সেটা করোনি। যারা করেছিল, তাদের কথা শুধু তুমি জানতে।’
‘বাট স্টিল হেড স্যারের বাসার গ্যারাজের চাবিটা তো আমিই ওদের দিয়েছিলাম।’
‘আচ্ছা যাই হোক। টনিও তো জানতো যে অরল্যান্ডো তোমার এনার্জি ড্রিংকে ওয়াইন মিশিয়েছে তোমাকে ফাঁসানোর জন্য। ও কিছু বলেছে বা করেছে? না করেনি। তো ব্যাপারগুলো সমান সমান ভেবে ভুলে যাও।’
ইভান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। লিজা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
‘আচ্ছা চলো বাসায় যাই। আর ক্লাস করার ইচ্ছা নেই।’
‘আচ্ছা রেকর্ডিং টা চালিয়েছিল কে? নিনা?’
‘হ্যা। তোমার জন্মদিনের উপহার ছিল এটা।’ হাসি মুখে বলল লিজা।
‘ও বলেছে এটা?’ কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ইভান।
লিজা ইতস্তত করে উত্তর দিল,
‘না ও নিজে বলেনি। বাট এটা আর কীই বা হতে পারে?’
‘নিনা আমাকে এড়িয়ে চলছে। ফোন ধরছে না। কথা বলছে না ভালো করে। কিছু ভালো লাগছে না আমার।’ বলে দুহাতে মুখ চেপে ধরল।
‘স্বাভাবিক। একটা মানুষকে তুমি এত বেশি বিরক্ত করলে সে আর কী করবে বলো? এখন বুঝো ঠেলা।’ বলল লিজা।
———————–
অন্ধকার চারিদিক। পায়ের নিচে স্যাঁতস্যাঁতে মেঝে। বহু দূরে মৃদু আলো টিমটিম করে জ্বলছে। জায়গাটা দেখা যায় না। কত বড়, কত ছোট বোঝা যায় না। তবুও দম বন্ধ হয়ে আসে যেন। সেই মৃদু আলোটা হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে নিমা। আমি নিমার দিকে যতই এগিয়ে যাই ততই সে দূরে সরে যায়। এগিয়ে যেতে যেতে পায়ের নিচে স্যাঁতস্যাতে বস্তু গুলো আরোও পিচ্ছিল তরলের মতো ঠেকল। মনে হলো সেই তরল ক্রমেই উপরে উঠে আসছে। ক্ষণিকের মধ্যে মনে হলো আমি ডুবে যাচ্ছি সেই অন্ধকার তরলে। দম বন্ধ হয়ে আসছে তখনই একজন মহিলা আমাকে ঠেলা দিল। আমাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল মা। অন্ধকার থেকে দূর। আমি অনেক ডাকলাম সে আঁধার থেকে আর বের হলো না। মা…মা করে চিৎকার করলাম। কেউ সারা দিল না। কেউ আর আশেপাশে। আমি ঠান্ডা, স্যাতস্যাতে অন্ধকার জায়গাটায় একা বসে রইলাম। কিন্তু ঠান্ডাটা কেউ কমে এলো মনে হয়।
আমাকে উষ্ণতা দিয়ে জড়িয়ে ধরল কেউ। আমি তার সুন্দর মুখের দিকে তাকালাম। ইভান। ইচ্ছে করল ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। মায়ের মতো ওকেও হারিয়ে যেতে দেব না আমি। ঠিক তখনই কালো ছায়ার মতো ধূলোয় মিশে গেল সে।
‘নিনা! নিনা। উঠো!’ হঠাৎ কারো ডাকে ঘুম ভেঙে গেল নিনার। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। ঘেমে চুলগুলো গলা, গালের সঙ্গে আঠার মতো আঁটকে রয়েছে। হৃদয়ে দ্রিম দ্রিম করে ডঙ্কা ভাজছে। এ্যাভরিল পানির প্লাসটা এগিয়ে দিল ওর দিকে৷ নিনা একটু পানি পান করে বড় বড় শ্বাস নিল। কিছুটা শান্ত হয়েছে ও। হঠাৎ খেয়াল করল ওর গাল নোনা জলে সিক্ত। এ্যাভরিল ওর সাথেই শুচ্ছে গতকাল থেকে। জ্ঞান হারানোর পর থেকে এ্যাভরিল একেবারেই ওকে একা ছাড়ছে না। নিনা শুধু ওর কান্ড দেখে আর উদাসীন ভাবে চিন্তা করে, ‘নিমা এখানে থাকলে এভাবেই আমাকে আগলে রাখতো। এভাবেই আমার জন্য চিন্তা করত। খেয়াল রাখত। যতই হোক নিমা তো আমার বড় বোন। এক মিনিটের বড়।’
এ্যাভরিল চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
‘তুমি বোধহয় দুঃস্বপ্ন দেখছিলা। ঘুমের মধ্যে কাঁদছিলা।’
নিনা ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলল,
‘হ্যা…আমি…আমি আমার বোনকে দেখেছি। সে থেকেও আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। কোন এক অজানা অন্ধকারে। আর..আর আমার মা, সেও আমাকে বাঁচিয়ে ডুবে গেল। আর ফিরলো না। আর ইভান! আমার পাশে ছিল
ইভান। আমাকে আগলে রেখেছিল। কিন্তু সেও ছায়ার মতো গায়েব হয়ে গেল।’ বলতে বলতেই চোখ থেকে নোনা জলের ধারা নেমে এলো অজান্তেই। এ্যাভরিল ওকে জড়িয়ে ধরল। ধীরে ধীরে পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
———————–
বিকেলে মি.মালিক নিজের স্টাডিতে বসে কাজ করছিলেন। আজ উনি দুপুরেই ঘরে ফিরে এসেছেন। নিনা গাড়ি নিয়ে গ্রেউড বাড়ি যাচ্ছে। এ্যাভরিল স্টাডির দরজায় নক করল। উনি ভেতর থেকে সারা দিতেই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। জানালার পর্দা গুলো ফেলা। টেবিলের দুপাশে রাখা দুটি ল্যাম্পই জ্বালানো। উনি বললেন,
‘মা কিছু বলবা?’
‘জ্বী আঙ্কেল। আসলে এই কয়েকদিন ধরেই একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম আপনাকে।’
‘হ্যা অবশ্যই বলো। বসো না।’
এ্যাভরিল সিঙ্গেল সোফাটায় বসল। অপ্রস্তুত কন্ঠে বলল,
‘আঙ্কেল নিনা আপনার মেয়ে। নিনাকে আমার থেকে ঢেড় বেশি আপনি চেনেন। আমি তো এখানে আছিই মাত্র এক মাস হলো।’ বলেই থেমে গেল। মি.মালিক ওনার ল্যাপটপ বন্ধ করে মনোযোগ সহকারে শুনছেন। কিছুক্ষণ মৌন থেকে আবার বলতে শুরু করল,
‘দুদিন আগে যেটা হলো। নিনার ওভাবে প্যানিক এটাক আসা এবং জ্ঞান হারানো। ওটার কারণ হচ্ছে ইভান।’
‘ইভান? ইভান দানির? ওর সাথে এর কী সম্পর্ক?’
‘ওয়েল দেখেন ইভান এখন আর নিনার স*ন্দেহের তালিকায় নেই সেটা তো আপনি জানেনই। এবং ওরা… দু..দুজন একে-অপরকে পছন্দ করে। বাট একটা ভুলবোঝাবুঝির কারণে ওদের বলতে গেলে ব্রেক আপ হয়েছিল।’
‘কী?! নিনা করছে টা কী এসব।’
‘না আঙ্কেল। শোনেন এখানে ওর কোন দোষ নেই। ইভান ভুল বুঝে সম্পর্কটা শেষ করে দিয়েছিল। তাই তো ওর এমন অবস্থা। যদিও সেটা মিটে গিয়েছে। তাছাড়া আপনি তো দেখতেই পাচ্ছে আপনার মেয়েটা কতটা ভে*ঙে পরেছে। ওকে দেখে মাঝে মাঝে আমার অবাকই লাগে। ও প্রচন্ড একা। ও ভাবে ওর কেউ নেই। অথবা যেই অল্প কয়েকজন মানুষ ওর সাথে আছে তারাও সকলেই দূরে সরে যায়। যেমন কিছুদিন আগে টনিকে হারালো। এরপর দুদিন আগে প্রায় আরেকজন কে হারিয়ে ফেলেছিল। এই কষ্টটা আরোও বেশি। যে বেঁচে আছে। কোথাও আছে বা আপনার চোখের সামনেই আছে শুধু আপনার সাথে নেই তখন কেমন লাগে? আমিও কী সবসময়ই এখানে থাকবো? একটা না একটা সময় আমিও তো চলে যাব। নিনা থেকে দূরে সরে যাব। সবসময়ই কী অমিতও ওর সাথে থাকবে? ফাতিমা আপা ওনার অনেক বয়স হয়েছে। উনিও বা কতদিন ওর সাথে থাকবে? আপনিও কী সারা জীবন ওর সাথে থাকতে পারবেন?’
মি.মালিক অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন। বেশ কিছু নিশ্চুপ থেকে কিছু একটা ভাবলেন। তারপর বললেন,
‘তো তুমি কী করতে চাও?’
‘আমার শুধু একটাই অনুরোধ। এই জীবনটা অনেক ছোট। অনেক ক্ষ্ণীণ। আপনি তো একজন পুলিশ অফিসার। অপনি তো অনেক মিসিং কেস পেয়েছেন, খু*নের, এ*ক্সিডেন্টের কেস পেয়েছেন। কত সহজেই না মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায়। জানেন আমার একটা ছোট বোন আছে অথচ সে জানেও যে আমিই তার আপন বোন। আমার মা, বাবা নেই। আমি অনাথ। আমার বোন থেকেও সে আমার সাথে নেই৷ আমার আত্নীয় থেকেও তারা আমার কেউ না। অথচ আপনি আপনার একটা মেয়েকে আগলে রেখেছেন। আরেকটা মেয়ের প্রতি আপনার দায়িত্ব নেই? কিছু মনে করবেন না। এই কয়েকদিনে আমাকে যেই আদর, ভালোবাসা দিয়েছেন। সেই অধিকার থেকেই বলছি। দেখেন নিমাও তো নিনার মতো নিজের মাকে হারিয়েছিল। নিমাও একটা ছোট বাচ্চা ছিল। মাকে ওরকম একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনায় হারিয়ে ফেলার পর ওই টুকু একটা মেয়ের মানসিক অবস্থাটা কেমন হয়েছিল আপনিই ভাবেন? সেই সময় ওর সবচাইতে বেশি প্রয়োজন ছিল আপনাকে। কিন্তু আপনি ওকে আগলে না রেখে আরোও দূরে সরিয়ে দিলেন। কবে কার কী হয়ে যায় তার কী কোন ঠিক রয়েছে? আপনি কিসের অপেক্ষা করছেন? কী ভরসা আছে যে আগামীকালও নিমা সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে ওর স্থানে থাকবে? যতই হোক নিমাও আপনারই মেয়ে। আপনি যদি একবার গিয়ে আপনার মেয়েটাকে ভালোবেসে কাছে ডাকেন ও কী আসবে না? ওর এবং নিনার মধ্যে তো সম্পর্ক ঠিকই আছে দেখি। তাহলে? সমস্যা টা কোথায়? নিমা যেখানে আছে সেখানেই থাকবে? থাকুক। কিন্তু ওকে একবার বাসায় আনতে তো সমস্যা নেই।’
বলে থামল। মি.মালিক নিশ্চুপ রইলেন। এ্যাভরিল অনুনয়ের স্বরে বলল,
‘এই একটা অনুরোধ শুধু। ওকে ফিরিয়ে আনুন।’
মি.মালিক নরম কন্ঠে বললেন,
‘আমি জানি আমি নিমার বাবা হিসেবে একেবারেই ব্যর্থ। আমার সিদ্ধান্তগুলো একেবারেই ভুল ছিল। কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি। আমি ওর বোর্ডিং স্কুলে গেলে নিমা আমার সাথে দেখা করতেই অসম্মতি জানায়। আমাকে প্রতিবার হতাশ হয়ে ফিরে আসতে হয়।’
‘তাহলে এবার আমি যাব আপনার সাথে।’ দৃঢ় কন্ঠে বলল এ্যাভরিল। চোখ ভরা উদ্যম।
ইনশাআল্লাহ চলবে।
#মনোভূমির_ছায়া
পর্ব – ২৯
#মাহীরা_ফারহীন
বাইশ অক্টোবর সকাল বেলা নিনা গ্রেউড বাড়িতে উপস্থিত হলো। আকাশটা আবারও মন খারাপ করে রেখেছে। থেকে থেকে সেই কষ্টের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে বর্ষনে সিক্ত হয়ে যাচ্ছে গোটা ন্যাশভিল। কলিং বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করছে নিনা। কাঠের দরজার মাঝে ঘোলা চৌকোনা কাঁচ লাগানো। নিনা সেদিকে তাকিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ভাবল,
‘আমি এই দরজার সামনে বছরের পর বছর অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকলেও টনি এসে সেটা খুলবে না। কে তোমার সাথে করেছে এমন নিষ্ঠুর কাজ? কে? খুব কাছাকাছি চলে এসেছি আমি। খুব তাড়াতাড়ি বের করে ফেলব তাকে। আই প্রমিজ।’ তখনই ওকে চমকে দিয়ে দরজাটা খুলে গেল। ওপাশে এমিলি দাঁড়িয়ে। ওর গোল্ডেন ব্রাউন চুলগুলো পোনিটেল করা। স্বাভাবিক ঘরোয়া পোশাকে রয়েছে। দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ভেতরে এসো।’
নিনা ভেতরে ঢুকলো। দরজা বন্ধ করে এমিলি এগিয়ে গিয়ে লিভিং রুমে প্রবেশ করল। বাগানে যাওয়ার কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা হা করে খোলা। হু হু করে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। টিভিতে “দ্যা ভ্যাম্পায়ার ডায়েরিস” সিরিজ চলছিল৷ সেটা বন্ধ করে দিল। নিনা সোফায় বসল। এমিলি ওর সামনা সামনি বসে বলল,
‘তুমি ভালো আছ? কয়েক দিন ধরে মুখ টুক কেমন শুঁকিয়ে গেছে দেখছি।’
‘হ্যা। একটু জ্বর এসেছিল কয়েকদিন আগে। তারই প্রভাব।’
‘ওহ। ওয়েল সেদিন যেটা করলা….একচুয়ালি ধন্যবাদ তার জন্য। বাট বেশি খুশি হতাম যদি এই সত্যটা টনি জেনে যেতে পারতো। ওদের ফ্রেন্ডশিপটা ঠিক হতে দেখতে পারার চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে।’ স্তিমিত স্বরে কথাটা বলল।
‘হুম। আচ্ছা একটা কথা বলো তুমি সত্যিই লিজা আমার কোকোনাট হওয়ার কথাটা জানার পর সত্যটা জেনেছো?’
‘কোন স*ন্দেহ আছে?’
‘আছে বলেই তো বললাম।’
এমিলি নিরব রইল। কি যেন একটা ভেবে নিয়ে বলল,
‘না। সেদিন তুমি যখন আফটারনুন পার্টিতে এসেছিলা তখনকার কথা। মনে আছে লিজা বলেছিল, তুমি একদম কোকোনাটের মতো? ঠিক তখনই আমার মাথায় কথাটা আসে।’
‘তাহলে এতদিন চুপ করে ছিলা কেন?’
‘আমি দেখতে চেয়েছিলাম তোমার উদ্দ্যেশ টা আসলে কী।’
‘তো আমার উদ্দেশ্যটা কী?’
‘টনির খু*নিকে খুঁজে বের করা।’ বলে থামল। অস্বাভাবিক ভাবে শান্ত কন্ঠে পুনরায় বলল,
‘কিন্তু দুঃখীত এক্ষেত্রে আমি তোমাকে কোন প্রকার সহযোগিতা করতে পারবো না।’
নিনা অবাক হলো। তবে সেটা প্রকাশ না করে বলল,
‘যাকে নিয়ে কথা হচ্ছে সে তোমার আপন ভাই। ভাবতে বাধ্য হচ্ছি কেন তুমি তার খু*নি কে জানতে চাও না।’
‘আমার পরিবার নিনা। তাঁরা মনে করেন এটা আ*ত্মহ*ত্যা ছিলো।’
‘আর তুমি কী মনে করো?’
‘আমি আমার ভাইকে চিনি নিনা। তুমি কী মনে করো আমার বাড়ির বাগানে হেমলক গাছ আছে সেটা আমি জানি না? সেই গাছটা যে টনি নিজেই মালিকে রেখে দিতে বলেছিল সেটাও আমি জানবো না? টনি নিজেই সেদিন সিসিটিভি বন্ধ করেছিল সেটাও জানবো না?’
নিনা চুপচাপ তাকিয়ে আছে এমিলির দিকে। ওর সবসময়ই মনে হয়েছিল এমিলি যেমনটা দেখায় তেমনটা নয় ও। যতটা জানার ভান করে তার চেয়ে ঢের বেশি জানে ও৷ এবং এটাও খুব ভালো ভাবে বুঝতে পারল, এমিলির কাছ থেকে সত্যি বিন্দু মাত্র সাহায্য আশা করাটাও বোকামি। নিনা প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে স্তিমিত স্বরে বলল,
‘ভেরি ওয়েল। আমি তোমার ধারণাকে স*ন্দেহ করবো না। তবে আমার ধারণাটাও যে ভুল নয় খুব তাড়াতাড়ি তা প্রমাণ করব।’
‘দেখা যাক।’ ওর কথার সুর যেন কোন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল নিনার দিকে। নিনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর ভাবল, এবার উঠবে কিনা তখনই এমিলি বলল,
‘ওয়েল এক কাপ কফি হলে কেমন হয়?’
হঠাৎ করেই আবার কফি খাওয়ার ইচ্ছে কেন হলো ওর তা নিনার ঠাহর হলো না। তবে সুযোগটা ছাড়ল না। বলল,
‘অবশ্যই।’ এমিলি হালকা একটা হাসি দিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। নিনা উঠে দাঁড়াল। বাগানের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। বাউন্ডারি দেওয়ালের পাশেই একটা বড় জ্যাকারান্ডা গাছ। একটা বড় ডাল থেকে সাদা একটা হ্যামোক ঝুলানো। ভেতরে ফিরে এলো। সিঁড়ি ভে*ঙে দুই তলায় উঠে গেল। টনির কামরা৷ পাশের করিডোরে এমিলির কামরা। আবারও মূল করিডোরে ফিরে এলো। প্রতিটি দেওয়াল একদম শুভ্র এবং ফাঁকা। কোন ছবি, কোন ওয়ালমেট কিছুই নেই। করিডোরের শেষ মাথায় চিকন সিঁড়ি আরোও একতলা উপরে উঠে গিয়েছে। হঠাৎ মনে পরল এই বাড়িটা তৃতীয় লতায় লফ্ট। কিন্তু তিন তলাটা কখনো দেখাই হয়নি। উপরের তলায় উঠে দেখা গেল করিডোরের শেষ মাথার জানালায় একটা ড্রিম ক্যাচার ঝুলছে। দেয়ালে দস্তয়েভস্কি’র একটি উক্তি ফ্রেম করে লাগানো। এই করিডোর একটি মাত্র দরজা৷ হয়তোবা লফ্টের। সেটা ঘুরালো নিনা। বন্ধ। তখনই এমিলির কন্ঠ ভেসে এলো নিচ থেকে,
‘নিনা?’
নিনা দ্রুত দ্বিতীয় তলায় নেমে এলো। তখনই এমিলি নিচের সিঁড়ির গোঁড়ায় এসে দাঁড়াল। বলল,
‘ওহ তুমি ওখানে। এইতো কফি নিয়ে এসেছি।’
‘ওকে।’ বলেই নিচে নেমে এলো। বলল,
‘তোমাদের বাসার লফ্টে কী আছে? কখনো দেখিনি তো।’
‘ওহ। ওই অংশটা গেস্ট দের জন্য। আর একজন ফ্রেন্ড বাঁধা ধরা ভাবে থাকতো ওখানে।’
‘বাঁধা ধরা ফ্রেন্ড?’
‘হ্যা। তবে অনেকদিন যাবৎ আর কেউ থাকে না ওখানে।’
নিনা নিজের কফিতে এক চুমুক দিয়ে ভাবল,
‘ওই রুমটাতে আমাকে ঢুকতে হবে। কেন জানি মনে হচ্ছে ওইখানে অনেক প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে।’
—————————
তেইশ অক্টোবর আজ। নিনার জন্মদিন৷ কাজেই আজই এ্যাভরিল ও মি.মালিক বেরিয়েছেন। ভোর ছয়টার দিকে একটি রুপালি ক্যাডিলাক এসে থামল বাইলোর বোর্ডিং স্কুলের গেটের সামনে। মি.মালিক জানালা দিয়ে গার্ডকে নিজের পরিচয় দিতেই ওনারা গেট খুলে দিলেন। ন্যাশভিল হতে চ্যাটানোগা আসতে প্রায় ২ ঘন্টা লেগেছে। এখন বাজে ভোর ভয়টা। আকাশের রঙ ফ্যাকাসে। সূর্যের আলো ঘন কালো মেঘের আস্তর ভেদ করে আসতে পারছে না। এতক্ষণে সকল ছাত্র ছাত্রী আরামদায়ক বিছানা ছেড়ে উঠেছে পরেছে। ক্যাম্পাসের ভেতর এদিক ওদিক শিক্ষার্থীদের ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেল। এ্যাভরিল ও মি.মালিক হেঁটে বড় মাঠ এবং চত্ত্বর পার করলেন। লাল ইটে গাঁথা বড় একটি বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করলেন। বিল্ডিংটির নকশা কোন রাজবাড়ীর আদলে তৈরি। ভেতরে ঢুকে অফিস রুমে গিয়ে উপস্থিত হলেন। এ্যাভরিল মুগ্ধ হয়ে চারিদিক পরখ করছে। করিডর গুলো বেশ বড় বড়। অনেক করিডোরে চোখে লাগার মতো তৈলচিত্র দেয়ালে সোভা পাচ্ছে। এমনকি অভিস রুমটিও খুব রাজকীয় ভাবে সাজানো। এ্যাভরিলের মনে হলো ও কোন ব্রিটিশ রাজবাড়ীতে চলে এসেছে। ভাইস প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলার পর উনি কেয়ারটেকারকে কল করে নির্দিষ্ট ডর্মেটোরিতে গিয়ে নিমা কে খবর দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। কিছুক্ষণ পর কেয়ারটেকার ফিরে এসে বলল,
‘মিস মালিক দেখা করতে অসম্মতি জানিয়েছে।’
মি.মালিক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। হতাশ কন্ঠে বললেন,
‘লাভ নেই এ্যাভি। ও দেখা….
‘না আঙ্কেল। প্লিজ আরেকবার চেষ্টা করি না। ওকে জানাতে বলেন যে আমি বিশেষভাবে ওর সাথে কথা বলতে চাই। এত দূর যখন চলেই এসেছি যখন একবার কথাও বলবো না?’ আশাবাদী হয়ে বলল।
মি.মালিক প্রিন্সিপাল ম্যাডামকে আরেকবার অনুরোধ করলেন। কেয়ারটেকারকে বেজায় বিরক্ত দেখাল। উনি বোধহয় মি.মালিকরা চলে গেলেই বাঁচেন। কিন্তু প্রিন্সিপালের নির্দেশে অগত্যা প্রস্থান করলেন। উনি বেশ কয়েকটি করিডোর পার করে একটি নির্দিষ্ট কামরার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ভারি নকশা করা কাঠের দরজাটি মেঝে থেকে প্রায় সিলিং পর্যন্ত লম্বা। দরজাটি খুলে ভেতরে উঁকি দিয়ে কর্কশ গলায় বললেন,
‘মিস নিমা!’
ভেতর থেকে একটা মেয়ে সারা দিয়ে বলল,
‘ওফ আবার কী!?’
‘তোমার সাথে একটা মেয়ে দেখা করতে এসেছে।’
‘কীহ!? ও কী আমার মতো দেখতে?’
‘না। স্যারের সাথেই এসেছে। আমি জানি না কে। কিন্তু তোমার সাথে দেখা করতে এক পায় খাঁড়া।’
‘এ আবার নতুন কী ঝামেলা।……আচ্ছা আমি দেখা করব৷ কিন্তু শুধু ওর সাথে।’
কেয়ারটেকার মহিলা বেরিয়ে গেলেন৷ অফিস-রুমে গিয়ে এ্যাভরিলকে সাথে করে নিয়ে এলেন। ওকে দরজার সামনে অপেক্ষা করতে বলে ভেতরে উঁকি মেরে জানিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। শূন্য করিডোর একা দাঁড়িয়ে থাকল ও। করিডোরের মেঝে লাল টেরাকোটা টাইলসের তৈরি। দেয়ালগুলো সব চকলেট রঙের। পাশের করিডোরে বড় বড় জানালা রয়েছে বোধহয়। সেখানকার আলোয় ম্লান ছটা এদিকে এসে পরছে। এ্যাভরিল দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। কিছুটা নার্ভাসনেস কাজ করছে। আরেকজন মানুষের পরিবারের ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে ও। নিনা এখনোও এসব জানেই না। এদিকে নিমা ওকে চেনে না। বিষয়টা সে কিভাবে নিবে তাও বুঝতে পারছে না। ক্লিক করে একটা শব্দ হলো। দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে একটা মেয়ে বেরিয়ে আসল। যদিও এ্যাভরিল নিমার ছবি দেখেছে তবুও সামনাসামনি তাকে দেখে অবাক না হয়ে পারল না। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো ওর সামনে নিনাই দাঁড়িয়ে। ফর্সা লম্বা গড়নের ও। চৌকোনা সুন্দর মুখখানা। কিন্তু চাহনিটা একটু অন্যরকম। চিকন ঠোঁটের নিচে ছোট্ট একটা তিল। কিন্তু নিনার কোন তিল নেই। তাছাড়া নিমা নিনার মতো ছিপছিপে শুঁখনো নয়। কিছুটা গোলগাল ভাব আছে। লম্বা সিল্কি স্ট্রেইট চুলগুলো এমনি শক্ত করে বাঁধা। এ্যাভরিল হালকা হাসার চেষ্টা করে বলল,
‘আমি এ্যাভরিল।’
নিমা চোখ সরু করে চাইল। কিছু একটা ভেবে বলল,
‘ওহ তুমি তো নিনার সাথে থাকো৷ তাই না?’ ওর কন্ঠ একদম অন্যরকম। কিছুটা খসখসে।
‘ঠিক ধরেছো।’
‘অবাক হলাম।’
‘মানে?’
‘মানে তোমাকে এখানে দেখে অবাক হলাম।’
‘ওহ।’ বলে একটু থামল। কিছুটা ইতস্ততভাব নিয়ে বলল,
‘উম আমি তোমার সাথে কিছু কথা বলতেই এতদূর এসেছি। যদিও আমি জানি আমি তোমার পরিবারের কেউ নই। একজন আউটসাইডার জাস্ট।’
‘সেটা সমস্যা নয়। চলো বাইরে বেরিয়ে কথা বলি। কিছুক্ষণের মধ্যে করিডোর দিয়ে সবাই যাওয়া আসা শুরু করবে।’ বলেই বাম দিকে এগিয়ে গেল। এ্যাভরিল ওর সাথে সাথে চললো। ওরা বেশ কয়েকটা করিডর পার করল। এর মধ্যে দুটো মেয়ের মুখোমুখি হতেই নিমা ওদের গ্রিট করল।
ওরা একটা গোল চত্ত্বরে বেরিয়ে এলো। চত্বরের মাঝে বড় একটা স্যাকামোর গাছ। চারপাশে বড় লালচে পাথরের পুরু রেলিঙ দেওয়া। রেলিঙ আঁকড়ে ধরে বেড়ে উঠেছে কোন একটা নাম না জানা উদ্ভিদ। তাতে ছোট ছোট তারার মতো লাল, কমলা ফুল। দুটো মেয়ে রেলিঙে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল।আরো কয়েকজন আশপাশ দিয়ে হাটাহাটি করছে। নিমাকে দেখে কয়েকজন গ্রিট করল। নিমা কয়েক মিনিট একটা মেয়ের সাথে কথা বলে পুনরায় এ্যাভরিলের পাশে এসে দাঁড়াল। এ্যাভরিল এসব পরখ করে ভাবল,
‘নিমার স্বভাব চরিত্র একদম উল্টো। ও বেশ মিশুক প্রকৃতির।’
নিমা বলল, ‘তো নিনা কেমন আছে?’
এ্যাভরিল ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো। উত্তরে বলল,
‘ভালো বলা যায় কিনা বুঝতে পারছি না। আজকাল অদ্ভুত যাচ্ছে ওর দিনকাল।’
‘কেন? কী হয়েছে ওর?’ ভ্রু সুচালো হলো নিমার।
‘ইদানীং অনেক বেশি কিছু একসাথে ঘটছে৷ চাপ নিতে পারছে না আর। অবশ্য সেটা একটা কারণ আমার এখানে আসার।’
‘তো নিনা তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে?’
‘না। নিনা তো জানে না। ওহ ওয়েইট! হ্যাপি বার্থডে। ভুলেই গিয়েছিলাম।’
নিমা মুচকি হাসল। বলল,
‘ধন্যবাদ। প্রতি জন্মদিনে নিনা এবং আমি একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাই। ওর অবশ্য জন্মদিন টন্মদিন পছন্দ না।’
‘হ্যা আসলেই।’ বলে থামল। কিছুক্ষণ মৌন থেকে বলল,
‘নিনার সাথে দেখা হওয়ার পর বেশি দিন হয়নি আমার। এর মধ্যেই অনেক কিছু ঘটে গিয়েছে। আমার এখন বলতে গেলে নিনা ছাড়া কেউই নেই। তাকে এভাবে কষ্টে দেখতে পারি না।’
‘ওয়েট ওয়েট। তোমার পরিবারের কী হয়েছে?”
‘আমি অনাথ।’
‘ওহ আই এম সরি।’ স্তিমিত স্বরে বলল নিমা।
ওরা একটা কাঠের বেঞ্চিতে বসল। এ্যাভরিল স্বল্প মৌনতা পালন করে বলতে আরম্ভ করল,
‘যাকে তুমি মাফ করতে পারবা না তাকে ভুলে যেতে হয়। আর যাকে তুমি ভুলে যেতে পারবা না তাকে মাফ করে দিতে হয়।’ বলে থামল। নিমা কিছুটা বিস্ময় এবং কিছুটা বিভ্রান্তি ভরা দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল। শুধু ভ্রু জোড়া কুঁচকে তাকিয়ে থাকল। কোন মন্তব্য করল না। এ্যাভরিল বলল,
‘তুমি প্রকাশ করো না হয়তো কিন্তু তাই বলে অস্বীকার করতে পারো না যে নিজের বাবার প্রতি তোমার মনে এতটুকুও ভালোবাসা নেই। তুমি চাইলেও তোমার একমাত্র পরিবার, আপনজন কে জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারো না। মন থেকে ভুলে যেতে পারো না। সেটা যখন সম্ভব না তখন তাদের মাফ করে দেওয়াটা কেনো অসম্ভব মনে হচ্ছে?’
নিমা দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। স্যাকামোর গাছের গোড়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আশেপাশের শিক্ষার্থীদের গল্পগুজব, হইচইয়ের শব্দ ওর কর্ণকুহরে ঢুকলেও মস্তিষ্কে যেন পৌঁছল না। আবারও শুনতে পেল এ্যাভরিলের কন্ঠ,
‘ধরো হঠাৎ এমনই একটি দিন। সকাল সকাল স্বাভাবিকভাবেই ঘুম থেকে উঠেছ৷ কিন্তু তারপরই খবর পেলে তোমার বাবার কিছু হয়ে গিয়েছে। তার শেষ সময় তার পাশে ছিল, সাথে ছিল নিনা। যে তোমাদের মায়ের শেষ সময়ও তার সাথে ছিল। তুমি নয়। এতদিন ভেবে এসেছো, জেনে এসেছো যে বাবা বেঁচে আছেন। যেকোনো সময়ই হয়তো, হয়তো একটু হলেও তোমার মন গলতে পারে তখন তুমি যাবে। তাকে মাফ করে দিয়ে ফিরে যাবে বাবার বাড়ি। কিন্তু সে তো আর নেই। সে সুযোগও আর নেই৷ সময় শেষ। এখন আফসোস করা ছাড়া আর তো কোন পথ নেই।’ এরপর ওর কন্ঠ শোনা গেল না আর। নিমা গুম হয়ে মূর্তির ন্যায় বসে থাকল। কখন অজান্তেই বাবাকে হারিয়ে ফেলার কথা ভেবে কঠিন বরফের মতো হৃদয় গলতে শুরু করেছে জানে না ও। কখনই বা সেই বরফ গলা নোনা জল চোখের কোটর বেয়ে বেরিয়ে এসে গাল ভিজিয়ে দিল তাও টের পেল না। ঠান্ডা বাতাসের ঝাঁপটায় ভেজা গাল শিরশির করে উঠল। পুনরায় শোনা গেল এ্যাভরিলের নরম কন্ঠ,
‘শেষ সময়ের ঘন্টা কখন কার বাজবে কেউ জানে না। কে কে নিজের ভুল শুধরে নেওয়ার, সময়কে কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে কেউ জানে না। সেরকমই কে সারাজীবন আফসোস করে যাবে সেটাও কেউ বলতে পারে না। তুমি কী সেটা চাও? কারণ মানো আর না মানো একটা সময় গিয়ে তোমার আফসোসের শেষ থাকবে না নিমা।’ বলে থেমে গেল। এই শেষ। এ্যাভরিলের কথা শেষ। ও সান্ত্বনা স্বরুপ নিমার কাঁধে আলতো করে হাত রাখল। কিছুক্ষণ নিরবে বসে থেকে উঠে দাঁড়াল। নিমার হঠাৎ বুকের আকাশ ভরে ক্লেশি ভরা কালো মেঘেরা জায়গা করে নিল। গলার কাছে কান্না দলা পাকিয়ে গেল। খুব ইচ্ছে হলো এখনই ছুটে গিয়ে বাবাকে এক নজর দেখতে। খুব ইচ্ছে হলো একবার তার সাথে কথা বলতে। খুব ইচ্ছে হলো একবার বাড়িতে, নিজের কামরায় ফিরে যেতে। নিনার কাছে ফিরে যেতে৷ ঝট করে উঠে দাঁড়াল। বলল,
‘দাঁড়াও। উনি কোথায়?’
এ্যাভরিল থেমে ঘাড় ঘুড়িয়ে পেছনে তাকাল এবং মুচকি হাসলো।
————————-
মি.মালিক ওয়েটিং রুমে একা বসে আছেন। নিমা ভেতরে ঢুকতেই বিস্মিত নয়নে তাকালেন। ক্ষণিকের মধ্যে তার চোখে, মুখে ছড়িয়ে গেল আনন্দের আভাস। মেয়েকে দেখার আনন্দে চোখও টলমল করে উঠল। কিন্ত কোন নোনা জল চোখের বাঁধ পেরিয়ে যেতে ব্যর্থ হলো। নিমা মৃদুস্বরে সালাম দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মি.মালিক ৬ঠে দাঁড়িয়ে গেলেন। সালামের উত্তর দিয়ে বললেন,
‘ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলি কেন? এদিকে আয় মা।’
নিমা ইতস্তত পায়ে এগিয়ে গেল। ভেলভেটের পিত সোফার সামনে দাঁড়াল। হঠাৎ যেই ভাবনা সেই কাজটা তো করেছে। কিন্তু এখন জড়তা কাটিয়ে সহজ হতে পারলো না। মি.মালিক বললেন,
‘কেমন আছিস?’
‘আছি আলহামদুলিল্লাহ।……তু..তুমি?’
‘তোর সাথে দেখা হয়েছে যখন অবশেষে, আমি কী আর খারাপ থাকতে পারি?’ বলে একটু বিরতি দিয়ে আবার বললেন,
‘আমাকে মাফ করে দে। আমি জানি আমি বাবা হিসেবে ব্যর্থ৷ আমার কারণে তোর ছোটবেলাটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। সে সময় আমার বাবা হিসেবে, তোর একমাত্র অভিভাবক হিসেবে যেভাবে আচরণ করা উচিৎ ছিল সেটা আমি করিনি। আমি তোর মানসিক অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা না করেই তোকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম। আসলে আমি নিজেই পালিয়ে বেরিয়েছি এতদিন। নিজের দায়িত্ব, নিজের ভুল থেকে পালিয়েছি। কিন্তু মা একবার আমাকে মাফ করে দে। একবার বাসায় ফিরে চল।’
নিমা চোখে অশ্রুর উপস্থিতি টের পেলো। প্রাণপণ চেষ্টা করল যেন চোখ দিয়ে পানি না পরে। তবুও সে জল অবাধ্যের মতো গাল ভিজিয়ে দিয়ে গড়িয়ে পরল। সকালের কড়া ঝলমলে রোদ বড় জানালা দিয়ে এসে পরছে। রোদের আলোর ছোঁয়ায় ভেজা গাল চিকচিক করে উঠে। নিমা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। তার মনে জমে থাকা অভিমান এবং ভালোবাসার মধ্যে কোনটি অধিক ভারি তা বুঝতে হলে হয়তো দাঁড়িপাল্লায় মাপা লাগবে। আপাতদৃষ্টিতে সে নিজেও তার প্রভেদ ঠাহর করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বলল,
‘মাফ কর। আপাতত আমি তোমার সাথে দেখা করার থেকে বেশি কিছু করতে পারবো না। আশা করি আমাকে জোর করবে না।’
—————————-
মাত্র ঘড়ির কাঁটা ছয়টায় এসে থেমেছে। হঠাৎ পিনপতন নিরবতা ভে*ঙে ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ কর্ণকুহরে তীক্ষ্ণ ভাবে বিঁ*ধল। পরিবেশটা যথেষ্ট ঠান্ডা। আজকাল প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টির চেহারা দেখতে হয়। সারা ঘর আবছা আলোয় আচ্ছাদিত। জানালাটা হা করে খোলা। নিনা ঘুম ঘুম চোখে চারিদিক পরছ করল। জানালার দিকে চোখ পিট পিট করে চাইল। জানালাটা ও শোয়ার সময় ভেজিয়ে দিয়েছিল। এখন খোলা। সেখান থেকেই ম্লান আলোটা আসছে। উইন্ডোশীলে কি যেন একটা রাখা। নিনা বিছানা থেকে নেমে ধীর পায় এগিয়ে গেল। মেঝেটা বেশ শীতল ঠেকল। জানালার কাছে এগিয়ে যেতেই চোখ বড় বড় করে চাইল। একগুচ্ছ কালো এবং র*ক্ত লাল গোলাপ রাখা। এবার ওর আঠারো বছর পূর্ণ হলো। গোলাপের তোড়া হাতে নিয়ে গুণে দেখলো, ঠিক নয়টি কালো এবং নয়টি লাল গোলাপ। তার সাথে একটা চিরকুট। চিরকুটের কাগজটা পুরনো আমলের মতো দেখতে। বাদামি বাদামি একটা ভাব।
অত্যন্ত পরিচিত হাতের লেখা,
‘যে কষ্টে হৃদয় র*ক্তাক্ত হয় তা র*ক্তের মতো লাল।
যে ভালোবাসার দাম তুমি দাওনি তার রঙ কালো।’
শূন্য হৃদয়ের ঘরে কতগুলো চনমনে পুলকিত অনুভুতি এসে কড়া নাড়ল। নিনার ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল। ও জানে এটা কে দিয়ে গিয়েছে। জানালার উইন্ডোশীলে উঠে বসল। ভাবল,
‘এই ঘর বাড়ি বেয়ে ওঠার অভ্যাস একমাত্র ওরই আছে। তাছাড়া এমন পাগলামো ইভান ছাড়া আর কে করবে?’
কিছুক্ষণ পর নিচে নেমে সারা ঘর ঘুড়ে বেড়াল। লেটার বক্স থেকে খবরের কাগজটা নেয়ার জন্য দরজা খুলে বাইরে বের হতেই পায়ের সাথে কী যেন একটা ঢা*ক্কা খেল। অবাক দৃষ্টিতে নিচে পোর্চের দিকে তাকাল। একটা ঝুড়ি রাখা। ঝুঁকে ঝুড়িটা হাতে তুলে নিল। এক গাদা ক্যাডবেরি চকোলেট যত্নের সঙ্গে মুড়িয়ে একটা গিফ্ট বাস্কেট তৈরি করা হয়েছে । নিনা আশেপাশে চোখ বুলালো। কোথাও কেউ নেই। সামনে এগিয়ে খবরের কাগজটা নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। ও ভালো করেই জানে এটা কার কাজ। কী শুরু করেছে এই ছেলে? চকোলেটের ঝুড়িটা ডাইনিংয়ে রেখে কিচেনে গেল। গিয়ে অবাক হয়ে দেখল রান্নাঘরের জানালার গ্রিলে আরেকটা চিঠির খাম ঝুলছে। নিনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল। একটু আগেই রান্নাঘর থেকে ঘুরে গিয়েছে। তখন তো কিছুই ছিল না। তার মানে ইভান এখনও ওর বাড়ির আশেপাশেই ঘুরঘুর করছে। নিনা বাদামি দেখতে চিঠির খামটা খুলে নিল। সেটায় অল্প কয়েকটা বাক্য কার্সিভ অক্ষরে লেখা,
‘মানুষ মানুষ কে সেভাবেই দেখে যেভাবে সেই মানুষটা তার জীবনে প্রভাব ফেলে। তুমি আমার জীবনে এক টুকরো উজ্জ্বল রোদের আলো। তাই হ্যাপি বার্থডে মাই সানশাইন।।’
নিনা চিঠিটা পড়ে আবার খামে ঢুকিয়ে রাখল। হালকা একটা মুচকি হাসি লেগে রইল ঠোঁটের কোণে। এরপর কফি বানাতে মনোযোগ দিল। এ্যাভরিল, বাবা কেউই ঘরে নেই। কেউ ওকে কিছু বলেও যায়নি। এত ভোরে সকলে কোথায় গিয়ে বসে আছে তা নিনা ভেবে পেল না। ওদের কাউকেই ফোন দিয়েও পাওয়া গেল না। একটা সময় গোলাপ ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিষন্নতা পেয়ে বসল ওকে৷ ফাতিমা আপাও এর মধ্যে চলে এলেন। ঘড়িতে প্রায় সাড়ে নয়টা বাজে তখন। কলিং বেল বাজল। নিনা দ্রুত নিচে নেমে এলো। গাড়ির শব্দ কানে এসেছে ওর। ফাতিমা আপা রান্না ঘর থেকে বের হলেন। নিনা দরজা খুলতেই চোখ বিস্ফারিত হলো৷ ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক হুবুহু ওর মতোই দেখতে একটি মেয়ে৷ নিমা। নিনা বিস্ময় কাটিয়ে উঠতেই নিমার ওপর ঝাপিয়ে পরে ওকে জড়িয়ে ধরল। এত বছর পর বোনকে চোখের সামনে দেখা আনন্দে চোখ ভিজে এলো। মনের ভেতর কাঁ*টাতারে বাঁধা আনন্দের দুয়ার যেন নিমিষেই খুলে গেল। মনের আঙ্গিনা ভরে গেল শতশত রঙিন উল্লাসকর প্রজাতি দিয়ে। নিনার মনে হলো অনেক দিন এতটা আনন্দিত অনুভব হয়নি ওর। অবশেষে নিজেকে সামলে নিয়ে নিমাকে ছেড়ে দিল। নিমার মুখেও হাসি। বলল,
‘বাপরে বাপ আমাকে পেতে না পেতেই তো মে*রে ফেলছিস৷ ছাড় ছাড়।’ নিনা হেসে ওর থেকে দূরে সরে দাঁড়াল। দরজা থেকে সরে দাঁড়াতেই নিমা ভেতরে ঢুকলো। ওর পেছন পেছন ভেতরে এলো এ্যাভরিল এবং তারপর মি.মালিক। নিনা এ্যাভরিলের দিকে সন্তুষ্ট হয়ে তাকাল। বলল,
‘তোমার কাজ না এসব। তুমি যেটা করেছো সেটা কেউ করতে পারবে না এ্যাভি!’ বলেই ওকেও জড়িয়ে ধরল নিনা। এ্যাভরিল মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল,
‘আমিও কিন্তু তোমার বোন। আসল বোনকে পেয়ে আমাকে ভুলে গেলে চলবে না।’ নিনা হাসল। নিমা মুচকি হেসে লিভিং রুমের দিকে এগিয়ে গেল। নিনা এ্যাভরিলকে ছেড়ে দিতেই ও ভাবল,
‘আমি আর আঙ্কেল তো আশাহত হয়ে বেরিয়েই যাচ্ছিলাম। গাড়িতেও উঠে পরার পর হঠাৎ ছুটতে ছুটতে এলো ও। বলল,
আমাদের সাথে যাবে। ভাগ্যিশ নিজের মন পাল্টেছিল। নাহলে আজকের এই আনন্দিত মুখগুলো আমি কখনোই দেখতে পেতাম না।’ ভেবে আনমনে হাসল এ্যাভরিল।
নিনা লিভিং রুমে প্রবেশ করল। মি.মালিক নিমার স্যুটকেসটা নিয়ে ভেতরে এলেন। নিমার উদ্দ্যেশে বললেন,
‘তুই ফ্রেস হয়ে নে।’
নিমা আলতোভাবে মাথা নাড়ল। ফাতিমা আপা এগিয়ে এসে নিমার কাঁধে হাত রাখলেন। হালকা হেসে বললেন,
‘কেমন আছিস মা?’
‘এইতো আলহামদুলিল্লাহ আন্টি। আপ….ওর কথার মাঝখান দিয়ে উনি পুনরায় বললেন,
‘আমি তো জানতাম না তুই আসবি কিন্তু নিনার জন্মদিনে সবসময় ভালো রান্নাবান্না করি। আজও পোলাও মাংসই করছি। তুই খাবি তো এসব?’
‘অবশ্যই। আমার খুব ভালো লাগে। কত দিন খাওয়া হয় না এসব।’
নিনা উচ্ছসিত কন্ঠে বলল,
‘চল তোকে তোর কামরা দেখাই। আর ফ্রেস হয়ে নে।’
বলে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। উপরে উঠে নিজের কামরায় নিয়ে এলো ওকে। নিমা ভেতরে ঢুকে গোটা কামরা পরখ করল। বলল,
‘কিরে তোর রুম এমন অন্ধকার অন্ধকার কেন? কেমন ডার্ক এ্যাসথেটিক একটা ভাইব দিচ্ছে।’
‘আহ হ্যা আমার তো এমন পরিবেশই পছন্দ।’
‘আমার এখনই মনে হচ্ছে আমি কোন হরোর ফিল্পের সেটে এসে পরেছি।’ ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা ফুলদানিতে কাঁচা গোলাপের তোড়াটার দিকে তাকাল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘গোলাপও কালো কিনেছিস? এই রঙের ফুল কেউ ঘরে রাখে।’
‘না মানে আমি কিনি নি। উপহার পেয়েছি।’
নিমা হেসে উঠল। বলল,
‘তুই যেমন তোর বন্ধু বান্ধবরাও তেমনই মনে হচ্ছে।’
নিনা হালকা হাসল। কিছু একটা মনে হতেই বলল,
‘ওহ হ্যাপি বার্থডে।’
‘ওহহ হ্যা ভুলেই গিয়েছিলাম। হ্যাপি বার্থডে টু। কিছু আনতে ভুলে গিয়েছি। ভাবিইনি তো আজ এভাবে এসে পরব।’
‘আরেহ না। কোন উপহার নিয়ে তো আমিও প্রস্তুত নই। কিন্তু তোকে এতদিন পর দেখাটাই সেরা উপহার।’ নিমা হাসল।
ইনশাআল্লাহ চলবে।
#মনোভূমির_ছায়া
পর্ব – ৩০
#মাহীরা_ফারহীন
মাথার ওপর পরিষ্কার নীল আকাশ। গুচ্ছ গুচ্ছ এলোমেলো নাড়ুর মতো পেলব সাদা মেঘগুলো ভেসে চলেছে অজানার উদ্দেশ্যে। বাগানের গাছপালা রোদের স্নিগ্ধ পরশে খিলখিলিয়ে হাসছে। লিভিং রুম হতে বাগানে যাওয়ার দরজা খোলা। নিনা ও নিমা সেখানে মেঝেতে বসে নরম ঘাসের ওপর পা মেলে রেখে গল্প করছে। ফাতিমা আপার রান্না প্রায় হয়ে এসেছে। এ্যাভরিল রান্নাঘরে তাকে হাতে হাতে সাহায্য করছে। অবশ্য বাসায় থাকলে ফাতিমা যখন রান্না করেন, ওকে রান্নাঘর থেকে কেউ বের করতে পারে না। নিনা ও নিমাও গিয়েছিল কিছু কাজে হাত লাগাতে, তবে ওদের দুজনেরই আজ জন্মদিন বলে কোয়ে এ্যাভরিল তাড়িয়ে দিয়েছে। রান্নাঘরের ধার দিয়েও ঘেঁষতে দিচ্ছে না। মি.মালিক কেক সহ আরও বেশ কিছু জরুরি জিনিসপত্র কিনতে বাইরে গিয়েছেন।
‘তো তুই এত বড় বড় কাহিনী করলি। লিটারাল এ্যাডভেঞ্চারস! আমাকে বলিস নি কেন?’ বলে উঠল নিমা।
নিনাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আবার বলল,
‘আর তোর দেখি এই গোয়েন্দা গোয়েন্দা কাজকর্মের মাঝে রোমান্স আছে! ওফ সেই। অল ইন ওয়ান। বাট এর মধ্যে আমাদের কতবার কথা হয়েছে? বললে কী হত? আজব!’
অতি দ্রুত উত্তেজিত চিত্তে কথাগুলো বলে অবশেষে থামল।
‘বললে কী হতো?’ উত্তর দিল নিনা। নিনা কিছুক্ষণ পূর্বে গোসল করে বের হয়ে এসেছে। ভেজা চুলগুলো শুখাতে রোদে বসে আছে। দুজনই শুভ্র রঙের সালোয়ারকামিজ পরেছে।
‘কী হতো মানে? এমন ঘটনা কী রোজ রোজ আর পাঁচটা মানুষের সাথে হয় নাকি? আমি তোর বোন। আমাকে বলবি না কেন?’ অভিমানী কন্ঠে বলল।
‘আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। এখন বললাম তো।’
‘না পুরোটা বলিসনি।’
‘পুরোটাই তো বললাম। আর খু*নি যে কে সেটা তো আমি নিজেও জানি না। কিভাবে বলবো?’
‘আরেহ ধুর! খু*নি কে সেটা না জানলেও চলবে। তুই বল ওই ছেলেটার কথা। ইভান।’
‘ও স*ন্দেহের তালিকা থেকে বাদ। বলেছি তো।’
‘আর কিছু হয়নি?’
‘আর কী হবে?’
‘নাহ তোর মিডনাইট ডেটিং এন্ড এসবের কথা শুনে মনে হলো আর কিছু তো হতেই পারে। হয়নি? তোর ওকে একটুও ভাল্লাগে না?’
নিনা কিছু বলার আগেই লিভিং রুমের ভেতর থেকে এ্যাভরিলের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
‘নিনা কেন ওকে ক্লাইম্যাক্সটা বলছো না?’ বলেই নিমার দিকে তাকাল। ভারি প্রফুল্লচিত্তে বলল,
‘তলে তলে জল অনেক দূর গড়িয়েছে। ইভান আসলে ওর বয়ফ্রেন্ড…’
‘ওয়াট দ্যা হেল! রিয়েলি!?’ ওর কথা শেষ না হতেই লাফ দিয়ে উঠল নিমা। উৎফুল্ল হয়ে বলল,
‘ওহ মাই গশ! সিরিয়াসলি বলছো?’
‘অবশ্যই।’ হাসি মুখে উত্তর দিল এ্যাভরিল। নিনা হালকা হেসে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। নিমা নিনাকে কনুই দিয়ে গুঁতো দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
‘তোর সাথে বসবো না। যাহ! আমাকে কিছুই বলিস না।’
‘আরেহ না, না বলছি।’ বলেই নিনাও উঠে দাঁড়াল।
‘না না তা আর হচ্ছে না। এখন আমি এ্যাভরিলের কাছ থেকেই শুনবো। তোর সাথে কথা নাই।’ বলেই তিড়িং বিড়িং করে এ্যাভরিলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। এ্যাভরিলও আজ একটা মিষ্টি রঙের সালোয়ারকামিজ পরেছে। নিনার কাছ থেকেই বেছে নিয়েছে। ওদের দুজনের কানেই ঝুমকা। যদিও নিনার কোন ঝুমকা ছিল না। সেটা নিমার। নিমা এ্যাভরিলের খালি কানের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘তুমি ঝুমকা পরোনি কেন? দাঁড়াও তোমাকে এনে দিচ্ছি।’
‘আরেহ না থাক…
‘বেশি কথা বলবা না। আমার আজ জন্মদিন, তাই আমার কথাই শেষ কথা।’ নাটকীয়ভাবে কথাটা বলেই সিঁড়ি বেয়ে উঠরে উঠে গেল। নিনার কামরা, যেটা মূলত ওরও কামরা এখন সেখানে গিয়ে ঢুকলো। ড্রেসিং টেবিলের ওপর জুয়েলারি বক্সটা রাখা ছিল। ঝুমকা অতটা পরার সুযোগ হয় না ঠিকই কিন্তু ওর ভালো লাগে বলেই কিনতে কিনতে একটু বেশিই হয়ে গিয়েছে। এক জোড়া ঝুমকা হাতে নিয়ে নিচে নেমে এলো। করিডর ধরে লিভিং রুমে যাওয়ার আগেই পাশের করিডোরে একটা শব্দ হলো। এই করিডোর দিয়ে পেছনের বাগানে বের হওয়ার গেট। নিমা সেদিকে হেঁটে গিয়ে দরজাটা খুললো। বাইরে কেউই নেই। হঠাৎ নিচের দিকে চোখ পরতেই দেখল একটা হলুদ গোলাপের তোড়া রাখা। অবাক হয়ে সেটা হাতে তুলে নিল। বাইরে বেরিয়ে এদিকওদিক চাইলো। সত্যিই কেই নেই। আবারও ভেতরে চলে গেল। তোড়ার সাথে একটা চিঠি। চিঠিটা খুলতে খুলতে লিভিং রুমে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
‘নিনা তোর এত এডমায়ারার কেনো? সকাল সকাল লাল, কালো গোলাপের তোড়া দেখলাম এখল আবার হলুদ এসে হাজির। এসব কীরে ভাই?’
নিনা ও এ্যাভরিল দুজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। নিনাই প্রথমে বলল,
‘ওর এখনো এসব পাগলামি শেষ হয়নি?’ বলতে বলতে এগিয়ে এসে তোড়াটা নিমার হাত থেকে নিল।
‘কার? ইভানের?’ জিজ্ঞেস করল নিমা।
‘আর কে হবে বলো?’ ভ্রু উঁচু করে বলল এ্যাভরিল।
‘ওহ্হ! এই নিয়ে তিন নম্বর তোড়া! ভিন্টেজ চিঠি! চকোলেটের ঝুড়ি! সত্যিই প্রেমে পাগল হয়েছে বৈকি।’
নাটকীয় স্বরে বলল।
‘আহ্ নিমা!’ বলে নিনা বাগানে বেরিয়ে এলো। চিঠিটা খুলে পড়তে আরম্ভ করল,
‘আমি অনেক আজব!
অনেক বিরক্তিকরও,
অনেক জটিল এবং
অনেক খারাপ।
তাও তুমি আমাকেই তোমার মন দিয়েছো।
আর আমি বার বার তোমাকে সন্দেহ করেছি।
যেখানে তোমার ওপর বিশ্বাস রাখা উচিত ছিল আমার।
জানি না কী বললে বা কী করলে তোমার রাগ ভাঙবে,
তাই আমি চেষ্টা করেই যাব। তোমার কাছে এগুলো পাগলামি মনে হতেই পারে। কিন্তু তবুও আমি থামবো না। অতঃপর এই পাগলটাকে তো তুমিই বেছে নিয়েছো। আর কেউ তো নয়। তোমাকে হলুদ গোলাপ দিলাম। এই গোলাপের মানে জানো? পজিটিভি, প্রণয়, উষ্ণতা এবং আনন্দ। ঠিক যেমন আজকের দিনটা। এবং তোমাকে সাথে নিয়ে সবগুলো দিন!’
নিনা চিঠিটা পড়ে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বাগানের সাদা সাদা ডেইসি ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ভেতরে চলে গেল। তখনই কলিং বেল বাজল। বাবা এসে পরেছেন। সাথে সুন্দর একটা কেক এনেছেন। ফাতিমাপার রান্না হয়ে গিয়েছে। ওরা সবাই প্লেট পিরিচ টেবিলে সাজাতে ব্যস্ত তখনই আরেকবার বেল বাজল। এবার দেখা অমিত এসে হাজির। হাতে একটা বড় বাক্স। বাক্সরা এ্যাভরিলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিনা ও নিমা দুজনের দিকেই তাকিয়ে বলল,
‘ওহ মাই গড! দুটো নিনা! আই মিন নিমা!’
বলে হা করে তাকিয়ে থাকল। নিমাও ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। তারপর বলল,
‘তুমি কী অমিত?’
‘আর কতক্ষণ হা করে থাকবি? মুখে মাছি ঢুকে যাবে।’
নিমার প্রশ্নের উদ্দেশ্যে মাথা নেড়ে সায় জানালা অমিত। তারপর বলল,
‘হ্যাপি বার্থডে টু বোথ অপ ইউ! আমি তো জানতামই না নিমাও এখানে থাকবে নাহলে ওর জন্যই কিছু…
‘আরেহ ধুরো অত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নাই।’ বলল নিমা।
‘ওয়েহ বাপরে বাপ তুমিও আরেকটা কেক নিয়ে হাজির?’
বক্সটা খুলে বলল এ্যাভরিল।
‘কেন তোমরা অলরেডি কেক কিনেছো? আমি তো জানি নিনা জীবনেও জন্মদিনের দিন বাসায় কেক আসতে দেয় না। তাই প্রতিবছর আমিই জোরজবরদস্তি কেক নিয়ে হাজির হয়ে যাই।’
‘নিনা তোর মতো ঘাটত্যাড়ার জন্য ওই পার্ফেক্ট বেস্ট ফ্রেন্ড।’ বলল নিমা। নিনা হালকা হেসে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
মি.মালিক ডাইনিং এ ঢুকে বললেন,
‘আরেহ কী খবর অমিত?’
‘এইতো আঙ্কেল আছি। আপনি?’
‘আলহামদুলিল্লাহ আছি। ঠিক সময় মতো এসে পরেছো। বসে পরো। আমরা এখুনি খেতেই বসছিলাম।’
ওরা পোলাও, মাংস, কোরমা, ডিম ভুনা, মাছ ভাজা ও সালাদ টেবিলে পরিবেশণ করল। গল্প করতে করতে ধীরে সুস্থে খেয়ে দেয়ে উঠতে উঠতে সাড়ে চারটা বেজে গেল। এরপর লিভিং রুমে বসে ওরা সবাই ছেলেমেয়েরা গল্প করছে। এরই মাঝে নিনা একবার ওয়াশরুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে উঠে গেল। নিজের কামরায় ঢুকতেই দেখে জানালায় আরেকটা চিঠির খাম রাখা। খামটা হাতে নিয়ে ভাবল,
‘কোন পাগলের পাল্লায় পরেছি! মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। এর ওপর রাগ হয়ে তো কাল হয়েছে আমার।’
এবার ও চিঠির খামটা নিয়ে না পড়েই ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিল। তারপর নিচে নেমে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে বের হলো। ভাবল,
‘অনেক হয়েছে। এবার মজা দেখাচ্ছি সাহেব!’ ভাবতে ভাবতে বাড়ির চারপাশটা পুরো চক্কর কাটলো। কোথাও ইভানের টিকিটাও দেখা গেল না। অবশেষে নিনা বাড়ির সামনের বাউন্ডারি দেয়ালে উঠে বসে চারিপাশে তাকাল। কেউ নেই। বাড়ির পেছনের বাউন্ডারি দেয়ালে উঠে বসে যখন এদিক ওদিক তাকাল তখন বাড়ির ছাদের ওপর একটা জোড়া পা দেখা গেল। সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ভাবল,
‘এইতো পাওয়া গেছে ওনাকে। এই ডরমার ছাদের ওপর উঠে বসে আছে। মানে পাগলামি আর কাকে বলে? আমিও দেখাচ্ছি মজা।’
যেই ভাবা সেই কাজ। বাগানে পানি দেয়ার পাইপ টা হাতে নিয়ে কল ছেড়ে দিল। পাইপের মুখের মাঝ বরাবর ধরলে পানি ঝর্নার মতো ছিটকে এদিক ওদিক পরে। কাজেই ওভাবেই পাইপের মুখ টা ধরে ছাদের দিকে পাইপটা তুলে ধরল। প্রায় গোটা ছাদের ওপরই বৃষ্টির মতো পানি পরতে লাগলো। একটু পরেই দেখা গেল ইভান মাথা তুলে বসেছে। নিচের দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে বলছে,
‘এ্যই নিনা থামো। এটা কী হচ্ছে? পিছলে পরে যাব তো।’
‘তো তোমাকে কে বলসে ওখানে উঠে বসে থাকতে?’ নিনাও উচ্চস্বরে উত্তর দিল। তারপর পানির পাইপ সরিয়ে আনল। নিনা বলল,
‘নামো ওখান থেকে!’
‘নাহ নামবো না।’
‘কেন? ওখানে বসে খুব মজা লাগছে তাই না? উপরে উঠে যখন ফেলে দিব তখন বুঝবা মজা।’
‘তাহলে ফেলে দিতে উপরে এসে। তুমিও তো গাছটাছ, বিল্ডিং টিল্ডিং ভালোই বাইতে পারো।’
নিনা বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর বলল,
‘ওখানেই বসে থাকো।’ বলে আবার ভেতরে চলে গেল। করিডোরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর বাগানে রাখা মইটা বাড়ির ডান পাশের দেয়ালে ঠেকিয়ে রাখল। ও বাড়ির ছাদে প্রায়ই ওঠে। এটা কোন বড় ব্যাপার না। তবে মই দিয়ে উঠে। ইভান যে কিভাবে মই টই ছাড়াই উঠে যায় তা শুধু ওই বলতে পারবে। নিনা মই দিয়ে ওপরে উঠে নিজের জানালার সানসেটে পা রাখল। তারপর সেখান থেকে ছাদে উঠে গেল। এদিকে হালকা পাতলা পানির ছিটা পরেছে। হালকা কমলা ও বামাদি রঙের মিশ্রণ সারা আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ। এর মাঝে গাঢ় বাদামি রঙা টানা লম্না লম্না মেঘ সারি ভেসে যায়। পরন্ত বিকেলে রোদের ছিটাখাটা কোন কোন বাড়ির ছাদে এসে পরছে। ইভানকে দেখা গেল একদিকে হাতের ওপর মাথা রেখে চিত হয়ে শুয়ে থাকতে। নিনা সেদিকে তাকিয়ে বলল,
‘অবশেষে বাদরটা কে হাতের নাগালে পেয়েছি।’ ভেবে সাবধানে এগিয়ে গেল। যেহেতু টালি দিয়ে ডরমার করা ছাদ। চারিদিকেই ঢালু৷ নিনা ইভানের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
‘এইযে অনেক বাঁদরামি হয়েছে। এবার নামো এখান থেকে।’
‘আহহা! এভাবে বললে হয় বলো? তুমি আমার জন্মদিনে যা করেছো তার তুলনায় তো এইসব ধূলো মাত্র।’
‘অনেক ফিল্মি ডায়লগ দিয়ে ফেলেছো। তোমার ভান্ডার নিশ্চয়ই শেষ হয়ে গিয়েছে। যাও যাও বাসায় গিয়ে আরো কয়েকটা মুভি দেখে ঝোলা পুরন করো।’
‘তুমি আমার সাথে ঠিকঠাক ভাবে কথা বলো। তাহলেই আমি এখান থেকে বিদায়।’
‘তো আমি এখন কী করছি? তুমি কী সত্যিই চাচ্ছো তোমাকে এখান থেকে ঢা*ক্কা মে*রে ফেলে দেই?’
‘ওপস তা তুমি করবা না।’
‘কেন করবো না?’
‘এখান থেকে পরে গেলে কোমরের হাড্ডি যাবে ভে*ঙ্গে। তখন আমাদের বাচ্চা কাচ্চাদের কোলে নিব কিভাবে?’
নিনা বিরক্ত হয়ে ইভানের বাহুতে খোঁচা দিয়ে বলল,
‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল!’
‘ইশ ঠিকই তো বলেছি। তখন মিশমিকে কী বলবো? ওর মা আমাকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে কোমড় ভে*ঙে দিয়েছে?’
‘মিশমি টা আবার কে?’ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল নিনা।
‘আমাদের মেয়ে।’ আমুদে স্বরে বলল ইভান। নিনার গাল দুটোয় র*ক্ত জমা হয়ে লালচে আভা ফুটে উঠল। হালকা গরমও হয়ে উঠেছে।
নিনা ইভানকে ঝাঁকি দিয়ে বলল,
‘ইভান! বারাবারি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু! চলো এখান থেকে। নামো।’ বলেই ওর হাত ধরে টানতে টানতে মইয়ের দিকে নিয়ে গেল। ইভান ওর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। প্রথমে ইভানকে জোর করে নামাল। তারপর নিজে নিচে নামলো। ইভান বলল,
‘তোমার বাসায় এতগুলো মানুষ দেখতে পাচ্ছি।’ বলতে বলতেই ওর ফোন বেজে উঠল। সেল ফোনটা বের করে দেখল, মায়ের নম্বর থেকে কল আসছে। নোটিফিকেশন বারে লিজার সাতটা মিস কল উঠে আছে। নিনা বলল,
‘ধরছো না কেন?’
ইভান অবশেষে ফোনটা রিসিভ করল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে লিজার ঝাঁঝাল কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
‘তুমি কী ম*রে গেসো কোথাও গিয়ে!? মানুষকে এতগুলা ফোন দিলে একটা তো ধরে! সেই সকাল থেকে কোন হদিস নাই! আশ্চর্য!’
‘আচ্ছা আচ্ছা সরি। বাট এত ফোন দিচ্ছিসই বা কেন?’
‘বাসায় আসো আগে। তোমার খবর আছে। এদিকে জানো কী হয়েছে?’
‘কী হয়েছেটা কী?’
‘বাসায় এসে নিজেই দেখো।’ বলেই লাইন কেটে দিল।
ইভান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল সেল ফোনের দিকে। নিনা বলল,
‘দেখেছ তোমার এখন বাসায় যাওয়া উচিৎ।’
‘তা তো বুঝতেই পারছি। বাট বললে না তো কে এসেছে।’
‘আমার বোন এসেছে।’
‘ওহ্। তাহলে চলো ওর সাথে দেখা করে…
‘কোন দেখা টেখা করা যাবে না। এইযে আমাকে দেখছ, ও আমার মতোই দেখতে। হয়ে গিয়েছে নিমাকে দেখা শেষ। বাট একটা শর্তে বাসায় আসতে পারো, যদি তুমি খাওয়া দাওয়া করো।’
‘না না, এইটা কেমন কথা।’
‘তাহলে বাসায় যাও। তোমার বোন নাহলে আমাকে এসে ধরবে। বায় বায়।’
ইভান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বলল,
‘আচ্ছা ঠিক আছে।’
———————
ইভান কলিং বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করছে। না জানি বাসায় কী হয়েছে। সেই নিয়ে এখন একটু চিন্তাও হচ্ছে। বাসায় আসতে আসতে লিজাকে কল করেছে দুইবার। ফোন ধরেনি। অবশেষে দরজাটা খুলে গেল। লিজা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ওর দিকে। বলল,
‘কোথায় ছিলা?’
‘ছিলাম কোথাও একটা।’
‘তুমি যে কতগুলা সময় মিস করেছো এখন বুঝো।’ বলে সরে দাঁড়াল। ইভান ভ্রু কুঁচকে ভেতরে প্রবেশ করল। লিভিং রুমে ঢুকেই বিস্মিত হলো। সোফায় বসে আছে দুটো ছেলে। একজন দেখতে ফরসা, হিরে আকৃতির চেহারা। লম্বা চওড়া গড়ন। আরেকজন শুকনা সাকনা, হলদেটে ফরসা গড়ন।
রায়েদ ও রাবিত মাদিহ। ওরা দুজনেই ইভানকে দেখে উঠে দাঁড়াল। ইভান রায়েদকে দেখে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,
‘রায়েদ!! তুই কখন আসছিস? আমাকে একবার বলে আসলি না কেন? কবে আসছিস? কতদিন আছিস?’
এক নিঃশ্বাসে বলে গেল।
‘আরেহ থাম থাম। নিঃশ্বাস তো নে।’
রাবিত এগিয়ে এসে বলল,
‘হ্যালো? ভাইয়া? আমিও তো এখানে আছি নাকি?’ ইভান হেসে ওকেও জড়িয়ে ধরে বলল,
‘কী খবর তোর? তুই তো আমার লিটল সহচর। তুইও আমাকে বললি না যে ন্যাশভিলে আসছিস।’
লিজা সোফার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। বলল,
‘তুমি যদি আল্লাহর ওয়াস্তে ফোনটা ধরতা তাহলে আরোও কতক্ষণ আগেই দেখা হয়ে যেত। আজব একটা!’
রায়েদ বলল,
‘আসেলই তো। তুই ছিলি টা কোথায়?’
ইভান ইতস্তত করে বলল,
‘এই একটু গিয়েছিলাম বাইরে।’
‘ওহ্হ ভুলেই গিয়েছিলাম। আজ তো ওনার গার্লফ্রেন্ডের বার্থডে। উনি তো ওই বাড়ির চিপকে থাকবেন। স্বাভাবিক।’
টিটকারির সুরে বলল লিজা।
‘ওহ তাই নাকি ভাইয়া? তাহলে এখানে কী করছো? যাও যাও তোমার ওখানে থাকা উচিত।’ বলল রাবিত।
‘আরেহ ধুরো। তোদের কথা আগে বল।’
রায়েদের পাশেই ইভান বসেছে। রায়েদ বলল,
‘আমরা এইতো আধঘন্টার কাছাকাছি হবে এসেছি। আসলে আমাদের একজন আত্নীয় টেনেসিতেই থাকেন। সে অসুস্থ বলে মা তাকে দেখতে এসেছেন। আর তার পাশাপাশি আমরা এখানে আসছি, তো একবার তোর সাথে দেখা করবা না সেটা হয়? তাই চলে এলাম।’
তখনই মিসেস মায়মুনা রান্নাঘর হতে লিভিং রুমে প্রবেশ করলেন। বিরক্ত কন্ঠে বললেন,
‘লাটসাহেবের এতক্ষণে সময় হয়েছে বাসায় ফেরার! বাহ! কোথা থেকে অকাম করে বাসায় ফিরছিস বল? দুপুরের খাবারেরও হুশ নাই ছেলেটার।’
‘মা ওদের সামনে তোমার এগুলা বলা লাগতো?’
‘থাক থাক ভাইয়া অত ইমব্যারেস হতে হবে না। তোমার অনুপস্থিতিতে আন্টি আর যে কী কী বলেছে সেসব শুনলে এই কথা তো কিছুই মনে হবে না।’ বলল রাবিত।
লিজা হেসে উঠল।
ইভান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা চাপড়ালো।
মিসেস মায়মুনা নরম কন্ঠে রায়েদ ও রাবিতের উদ্দেশ্যে বললেন,
‘তোমরা ডাইনিংয়ে এসে পরো বাবা। টুকটাক নাস্তার ব্যবস্থা করেছি।’ বলেই লিজার দিকে তাকালেন,
‘আর তুই কখন থেকে ডাকছি কথা কানে যায় না? এদিকে আয় রান্নাঘরে।’ লিজা ওনার পিছু পিছু রান্নাঘরের দিকে গেল। ইভান বলল,
‘আহহা এত দূর পর্যন্ত তোরা আসলি, অথচ ভাবিকে সাথে আনলি না? এটা কোন কথা?’
‘কী উল্টা পা্লটা বলিস? ওকে কিভাবে সাথে আনা যায়? আজিব।’
‘আর তোর দিনকাল কেমন কাটছে?’ রাবিতের দিকে তাকিয়ে বলল।
‘সেই ভাইয়া সেই!’ চোখ টিপে উত্তর দিল রাবিত।
‘ওর তো আর কী? সারা দিন ফুর্তিতেই কাটে।’ বলল রায়েদ।
তারপর আবার জিজ্ঞেস করল,
‘আর তোর ব্যাপার স্যাপারও কিছু বল। এসেই যা যা কাহিনী দেখলাম আর শুনলাম। এখনো তো বলার কোন ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।’
ইভান বিচলিত হাসলো,
‘লিজার উল্টা পাল্টা কথায় কান দিস না। তেমন কিছুই হয়নি। আমিই উটপটাং কিছু কাজকারবার নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।’
রান্নাঘর থেকে মিসেস মায়মুনার কন্ঠ স্বর ভেসে এলো,
‘কিরে ইভান ওদের নিয়ে আসছিস না কেন? খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তো।’
ইভান তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল। বলল,
‘এই চল চল। ডাইনিংয়ে গিয়ে বসি।’
ওরাও উঠে দাঁড়াল। হাঁটতে হাঁটতে ইভান জিজ্ঞেস করল,
‘তোরা কয়দিনের জন্য আছিস?’
‘গতকাল সন্ধ্যায় এসেছি। আর আজ রাত এগারোটায় ফ্লাইট।’ উত্তর দিল রায়েদ।
‘বলিস কী? এতদিন পর এসেছিস তাও আবার এত অল্প সময়ের জন্য? ফাজলামো করিস আমার সাথে?’ বলে চোখ পাকিয়ে তাকাল ওদের দিকে।
রাবিত একটা চেয়ার টেনে নিয়ে টেবিলে বসল। রায়েদও একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বলল,
‘ওফ্ফ বাবান্নেম কে মাহীনদের বাড়িতে রেখে এসেছি। তার বয়স হয়েছে। বেশ অসুস্থ হয়ে পরেছেন। কতদিন আর ওদের বাসায় ওভাবে রাখা যায় বল?’
‘হ্যা। মাহীন তো ওর বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য এক পায় খাঁড়া হয়েছিল। কিছুতেই ওর জেদ ভা*ঙানো যায়নি।’ বলল রাবিত।
‘ওহ আচ্ছা। তাই বল।’
লিজাও একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। মিসেস মায়মুনা এসে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,
‘তোমরা সবাই কিন্তু ইচ্ছে মতো তুলে নিও। গল্প করো তাই এখানে দাঁড়াচ্ছি ন। আর তোরা বলদের মতো বসে থাকবি না। যা লাগে তুলে দিবি।’ ইভান ও লিজার দিজে তাকিয়ে বললেন। ওরা দুজনই সায় জানিয়ে মাথা ঝাঁকাল। মিসেস মায়মুনা চলে যেতেই ইভান জিজ্ঞেস করল,
‘হ্যা এখন বল। আজকাল ভাবির সাথে ব্যাপার ট্যাপার কেমন চলছে?’
‘কী ভাবি ভাবি লাগিয়ে রেখেছিস?’
‘আরেহ বুঝতে হবে না। আমার সাথে কথা বলার এফেক্ট।’ বলল রাবিত।
লিজা বলল,
‘হ্যা। রাবিত যখনই মাহীনের কথা তোলে ততবারই বিশেষ ভাবে ভাবি বলে সম্বোধন করে।’
রায়েদ মুচকি হেসে বলল,
‘মাহীনের মাথা খারাপ করে ফেলেছে এই ভাবি বলতে বলতে। ওর বাবা মায়ের সামনে পর্যন্ত বলতে থাকে।’
ইভান ও লিজা হেসে উঠল। ইভান এখনো প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
‘কিরে বললি না? ইশ কী ভাব তোর? ভাবিকে নিয়ে একটা শব্দও মুখ থেকে বের হয় না। আমাদের দেখা তো করাইসনি। এট লিস্ট কিছু তো বল।’
রায়েদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বলল,
‘ওকে নিয়ে তেমন কী বলবো? সবই স্বাভাবিক চলে। সব কিছুই ম্যাচিউর ভাবে সামলে সামলে চলে ও। বাট ওতো ওর মতোই থাকে। আজ-কাল আমার মাথা খারাপ হয়ে থাকে ওর পাগলামি নিয়ে।’
‘মানে?’
‘মানে চিন্তা হয় কখন কোন ঝামেলায় জড়িয়ে যায়। এই যেমন কিছু দিন আগে মাহীন, রাবিত আর ওদের এক ফ্রেন্ড লিম জু ক্যাম্পিং ফেস্টিভ্যালে গিয়েছিল সিনিয়র হিসেবে। সেখানে এক বড় পানির ট্যাঙ্কি ছিল। প্রায় পঞ্চাশ ফিট উঁচুতে। সেখানে এক কবুতর আঁটকে ছিল কিভাবে আল্লাহই জানে। সেটা বাঁচাতে ওখানে উঠেছে, আর রাবিত আরেক চিজ ওর পাগলামোতে সুর সুর করে সায় দিয়ে নিজেও উঠেছে। এবং ওখানে ওঠার পর সিঁড়ির নিচের অর্ধেকটা খুলে গিয়েছে। ফলে প্রায় আড়াই ঘন্টা ওই ওপরে আটকা পরে ছিল ওরা।’
‘আরেহ ভাই কবুতরকে বাঁচাতে হবে না? আজব?’
‘তো তোরা ক্যাম্পিংয়ে কী চেহারা দেখাতে গিয়েছিলি? কর্তৃপক্ষকে জানালেই হত। কিন্তু না ওদের তো সব নিজেদের করা লাগবে।’
‘ওফ সেই তো। মাহীনের সাথে জানো আমার অল্প কয়েকবা চ্যাটে কথা হয়েছে। এই সব অল্প কয়েকটা কাহিনী আমিও জানি।’ বলল লিজা।
‘আরেহ এত চিন্তার কী আছে? ভাবি তো অনেক চিল।’
‘হুহ চিল তোর মাথা। জানিস কয়েক দিন আগে আমাকে ধরে পরিত্যক্ত এ্যাসাইলামে নিয়ে গিয়েছিল।’
‘ওয়াও! কেন কেন?’
‘আমরা কয়েকটা বিড়াল ছানা পেয়েছিলাম একটা বনের আশেপাশে। যদিও মাহীনের বাসায় বিড়াল আছে। কিন্তু আন্টি এতগুলো রাখতে দিবে না। তাই ওই জায়গা খুঁজে বের করেছে ওদের বাসার জন্য।’ বলল রাবিত।
‘মানে ওখানে বিড়াল ছানার বাসা বানাতে নিয়ে গিয়েছিল?’
‘হ্যা। ওকে বুঝিয়ে পারা যায় না। ওর মুখ থেকে কোন কথা একবার বের হলেই হয়েছে। ওটা করেই ছাড়বে ও।’ বলল রায়েদ। একটু বিরতি দিয়ে আবার বলল,
‘বাট ও যাই করুক, যেমনই হোক ওর মতো আরেকটা মানুষ আমি কখনো খুঁজে পাব না। খুঁজে পেতে চাইও না। সত্যি বলতে ও আসার পর থেকে আমার দিনকাল স্বর্গের মতে কাটছে।’
‘ওহ হাউ এডোরেবল!’ বলল ইভান।
‘ভাইয়া!!’ লিজা উচ্চস্বরে বলল।
‘কী? চিল্লাচ্ছিস কেন? এখানেই তো আছি আমি।’ বিরক্ত কন্ঠে বলল ইভান।
‘আমাকে ক্যালিফোর্নিয়া নিয়ে চলো! আমি বাবান্নেম আর মাহীনের সাথে দেখা করব।’
‘আহারে লিজা। তুই বড় হলি না।’ বলল রাবিত। লিজা চোখের মণি ঘোরাল। ইভান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘আহা এটা কত সময়ের ব্যাপার। ক্যালি তো আর পাশের শহর না।’
‘আরেহ ধুর অত কিছু ভাবলে হয় নাকি। চলে আসবি জাস্ট।’
‘আচ্ছা এটা বল বিলের সাথে এখন কেমন সম্পর্ক?’
‘তোর সাথে কথা হয় ওর?’
‘টেক্সটে কথা হয় মাঝেসাঝে। ও বলেছিল ওর সাথে নাকি সব ঠিক হয়ে গিয়েছে?’
‘হ্যা ঝামেলাটা আর নেই। বাট আমাদের বন্ধুত্বটা আর আগের মতো হয়নি।’
‘ওহ আচ্ছা।’
‘আচ্ছা তোর ওপর ওই ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ টা নাকি উঠে গিয়েছে? শুনে ভালোই লাগছে। বাট টনি তো সেটা শুনে যেতে পারলো না।’
‘হুম কী আর করা। বাট ওই এ্যালিগেশন টা যে চলে গিয়েছে সেটা আমার বেস্ট বার্থডে গিফট ছিল। নিনা এইসব বের করে এনেছে সেদিন।’
‘তাই নাকি? আল্লাহ এই ভাবিও তো জোস।’
‘রাবিত!’ বলল ইভান।
‘হুহ এখন বোঝ। ওহ্হ ভুলেই গিয়েছিলাম এই ব্যাপারটা। তো এখন বল আমার ভাবির কী খবর? ভাবির জন্মদিনে তুই কী কী করলি?’
ইভান দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
ইনশাআল্লাহ চলবে।