মনোভূমির ছায়া পর্ব-৩১+৩২+৩৩

0
213

#মনোভূমির_ছায়া
পর্ব – ৩১
#মাহীরা_ফারহীন

‘কিন্তু এই খাঁচা ভরা ইঁদুর দিয়ে আমরা কী করব?’
বিরক্ত কন্ঠে বলল নিনা। ও এবং অমিত গাড়িতে বসে আছে। ওরা গ্রেউড বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে গাড়ি পার্ক করেছে। এখন বাজে রাত সাড়ে নয়টা প্রায়।
‘আরেহ ভাই ওদের বাড়িতে সব জায়গায় এলার্ম সেট করা। তুই এমনি এমনি ঢুকবি কিভাবে?’ বলল অমিত।

‘বাড়ি বেয়ে উঠব। কি আর? বাড়ি বেয়ে যেকোনো একটা জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে তিন তলায় চলে যাব।’

‘তুই প্ল্যান প্রোগ্রাম না করে যে এইসব কেন করিস বুঝি না। ওদের বাসায় দরজা জানালা না শুধু লক করা থাকে, ওইসবে এলার্মও সেট করা থাকে৷ এমনি এমনি ঢোকা অসম্ভব।’

‘ওফ তুই এইসব আগে বলবি না আমাকে!’

‘আমি কী জানি তুই জানিস না। এইজন্যই তো আমি প্রস্তুতি স্বরুপ ইঁদুর নিয়ে এসেছি।’

‘কিন্তু ইঁদুর দিয়ে হবে টা কী?’

‘ইঁদুর গুলো ওদের বাগানে ছেড়ে দিব। দেন ওদের কারণে এলার্ম বেজে উঠবে। সো ঘরের সবাই উঠে পরবে। সেই ফাঁকে এলার্ম একবার বাজার পর যখন অফ হয়ে যাবে তুই বাসায় ঢুকে যাবি।’

‘বাহ খুবই জবরদস্ত প্ল্যান করেছিস। তারপর? ওরা সবাই জেগে থাকা অবস্থায় আমি বাসায় ঢুকে কী করব?’

‘ধুর ওরা তো বাগানে বের হবে নাকি? তখন বাসা খালি থাকবে। তুই উপরে চলে যাবি। তারপর তোর কাজটাজ করে সব ঠান্ডা হওয়ার পর বের হবি। ভেতর থেকে বের হওয়ার সময় তো আর এলার্ম বাজবে না।’

‘কিন্তু ওরা সবাই যদি বাগানে বের না হয়?’

‘হবে। কারণ দেখ, তোর আমার বাসায় যদি মাঝরাতে কোথাও কোন হইচই হতো তাহলে আমরা সকলেই বেরিয়ে দেখতে চাইতাম ব্যাপারটা কী। কেউ তো ঘুম থেকে উঠেও ঘরের মধ্যে জাস্ট বসে থাকবে না। তাই না? সো লজিক্যালি ওদের সকলেরই বের হওয়ার কথা। এখন তুই বেশি চিন্তা না করে যা।’

নিনা তবুও সম্পূর্ণ আশ্বস্ত হতে পারলো না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ি থেকে নামল। নিনা হাতে গ্লাভস পরে নিয়েছে। অমিতও খাঁচাটা নিয়ে বের হলো গাড়ি থেকে। চারিদিক গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা। পূর্ণিমার গোলগাল শুভ্র চাঁদটা আঁধারে পথ দেখতে যথেষ্ট সাহায্য করছে। ওরা এগিয়ে গিয়ে বাড়ির বাউন্ডারি দেয়ালের সামনে দাঁড়াল। অমিত দেয়ালের ওপর উঠে বসল। নিনা নিচ থেকে ওকে খাঁচাটা দিতেই সেটা নিয়ে ও ওপাশে নেমে গেল। কিছুক্ষণ পর পুনরায় খালি খাঁচা দেয়ালের ওপর তুলে দিতেই নিনা সেটা নামিয়ে রাখল। অমিত দেয়ালে উঠে বসল। এপাশে ঝাপ দিয়ে নামতে না নামতেই তীক্ষ্ণ শব্দে রাতের নিরবতা ছিন্ন করে এলার্ম বাজতে লাগলো। নিনা ও অমিত গেট থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়াল। ক্ষণিকের মধ্যেই বড় তিনতলা সাদা বাংলোতে আলো জ্বলে উঠল। নিরবতা ভেঙে হইচই পরে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির সদস্যরা বাগানে এসে উপস্থিত হলেন৷ ততক্ষণে এলার্মের টিরিং টিরিং শব্দ বন্ধ হয়েছে। অমিত বলল,
‘নিনা এটাই সঠিক সময়। ওরা নিশ্চয়ই বাম দিকের বাগানে বের হয়েছে। তুই ডান দিকের গ্যারাজের ওখান থেকে ঢুকে পর।’
নিনা নিরবে মাথা নাড়ল। ওরা গাড়ির গ্যারাজের দিকের বাউন্ডারির পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। নিনা দেয়াল ছুঁয়েও থেমে গেল। অমিতের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। অমিত ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘কী?’

‘আমি খাঁড়া দেয়াল বেয়ে উঠতে পারি না।’

‘আরেহ কপাল।’ বলে মাথায় হাত দিল। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে খাঁচাটা দেয়ালের সাথে ঘেঁষে রাখল। বলল,
‘এটার ওপর পা দিয়ে উঠে যা। কিন্তু বেশি ভর দিস না পরে ভে*ঙে গেলে শব্দ হবে। আর তোর পা টাও কে*টে গিয়ে আরেক দুর্ঘটনা ঘটবে।’
নিনা সময় নষ্ট না করে মরমরে খাঁচাটার ওপর পা রেখেই দেয়াল ধরে ওপরে উঠল। উঠতে ভারি বেগ পেতে হলো ওকে। দেয়ালে বসে অমিতের দিকে তাকাতেই ও থামজ আপ দেখাল। নিনা সমানে দৃষ্টি ফিরিয়ে সাবধানে নিচে লাফ দিল। মৃদু একটা থপ করে শব্দ হলো। পাশাপাশি ওর হাতেও লাগলো। বোধহয় দেয়ালে ঘষা লেগে ছি*লে গিয়েছে। তবে সেসব দেখার সময় নেই এখন। এখনো বাগানের অপর পাশ থেকে কথাবার্তার শব্দ আসছে। কেউ একজন চিৎকার করে উঠল। খুব সম্ভবত ইঁদুর দেখে মিসেস গ্রেউড চিৎকার করে উঠেছেন। নিনা গ্যারাজের সামনে থেকে পার হলো। এদিকে দু তিনটে ইঁদুর দৌড়ে যেতে দেখলো। কোথা থেকে এতগুলো ইঁদুর যোগার করে এনেছে অমিত আল্লাহই জানে। নিনা রান্নাঘরের দরজার কাছে পৌঁছে নব ঘোরালো। বন্ধ। কাজেই এগিয়ে গিয়ে রান্নাঘরের পাশের করিডোরের জানালার কাছে গেল। জানালার কপাট চৌকোনা নকশা করা কাঠের তৈরি। গতবার আফটারনুন পার্টিতে এসে জানালার এমন নকশা দেখে অবাক হয়েছিল ও৷ কাঠের চারকোনা ফোঁকরে একটু কষ্ট করে হাত ঢুকিয়ে দিল। ভাগ্য ভালো ও শুঁখনো বলে ওর হাতও বেশ চিকন। একটু স্বাস্থ্যবান হলেই হাতটা ঢুকতো না। কনুই পর্যন্ত হাত ঢুকিয়ে ভেতর থেকে না দেখে আন্দাজের ওপরই লকটা খুললো৷ অবশেষে হাত বের করে নিয়ে জানালাটা খুলে ভেতরে লাফ দিয়ে ঢুকলো। তারপর আবার নিরবে জানালা বন্ধ করল। গোটা বাড়িটার কাঠের মেঝে। কাজেই অত্যন্ত সাবধানে হাঁটতে হবে। একটুতেই শব্দ হয়৷ রান্নাঘরের সামনে থেকে কারো পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। ওরা হয়তো আবার বাড়িতে ঢুকে পরেছে। দ্রুত উঠতে চেয়েও পারলো না। শব্দ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ধীরে সন্তর্পণে পা ফেলে উপরে উঠল। ও সিঁড়ি গোঁড়ায় উঠে দাঁড়াতেই লিভিং রুমে মি.গ্রেউডের কন্ঠ শোনা গেল। বলছেন,
‘কিচেনে ঢোকেনি তো? কী আশ্চর্য! রাতদুপুরে ঘরবাড়ি তো সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’
আরেকটা শব্দ ভেসে এলো। এমিলি দূরে কোথাও থেকে উচ্চস্বরে বলছে,
‘ড্যাড স্টাডিতে দেখে যাও একবার!’

উনি সেদিকেই এগিয়ে গেলেন। নিনা করিডোর ধরে এগিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠলো। তারপর তৃতীয় তলায় উঠে গেল। তৃতীয় তলায় লফ্ট। নিনা নব ধরে ঘোরাল। দরজাটা খুলে গেল৷ স্বস্তিতে প্রলম্বিত শ্বাস ফেললো। ভাবল,
‘অন্তত একটা কিছু পাওয়া গেল এই বাড়িতে যেটা লক করা নেই।’
ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। ভেতরে বেশ অন্ধকার। আইসক্রিমের কোনের মতো সিলিং। চার দেয়ালের সাথে সিলিংয়ের জোড়া দেওয়া অংশগুলো ঢালু। ছোট সিঙ্গেল বেডের ওপরের ঢালু সিলিংয়ে গ্লাস দেওয়া। বিছানায় শুয়ে রাতের তারা ঝলমলে আকাশ দেখা যায়। জানালার সামনে উইন্ডোশীলে একটা পাতাবাহার রাখা। জানালায় সুন্দর একটা ড্রিম ক্যাচার ঝুলছে। থেকে থেকে বাতাসে নড়ে উঠছে সেটা। চাঁদের আলোয় কামরাটা কে বেশ রঙিন দেখাল। বিছনার সামনাসামনি দেওয়ালে সেলফ ভরতি বই। কী ভেবে যেন নিনা সেদিকে এগিয়ে গেল। বেশির ভাগ ক্লাসিকাল। শেকসপিয়ার, চার্লস ডিকেনস, দস্তয়েভস্কি, আর্নেস্ট হ্যামিংওয়ের সমস্ত বই সমূহ। বিছানার পাশের বেড টেবিলের ড্রয়ারগুলো সব খুলে দেখলো একে একে। বইয়ের সেলফটাও খতিয়ে দেখল। ড্রেসিং টেবিলের ওপর ক্রিম লোশন রাখা। তার ড্রয়ারে এখনো খুঁটিনাটি জিনিসপত্র, ঘড়ি রাখা আছে। গোটা কামরাটা বেশ পরিষ্কার এবং গোছানো। কামরাটা তন্য তন্য করে খোঁজার পরও তেমন কাজের কিছুই পাওয়া গেল না। নিনা হতাশ হয়ে বেরিয়ে যেতে গিয়েও বের হলো না৷ এত কষ্ট করে, কাঠখড় পুড়িয়ে যখন ঢুকেছে তখন এত সহজে হাল ছেড়ে দিলে হবে না। তাছাড়া চাইলেও ঘরের আলো জ্বালাতে পারছে না৷ মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। বিছানার নিচে দেখার জন্য মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসল। বিছানার নিচটা ফাঁকা। মনে হলো যেন হাঁটুতে সূ*চালো কিছু বিঁ*ধল। নিনা সেখান থেকে সরে বসল। কাঠের মেঝেটা একদম মসৃণ। সেখানে সূ*চালো কিছু কোথা থেকে এলো? মোবাইলের আলো ফেলেও কিছু চোখে পরল না। কিন্তু সেখানে হাত বুলিয়ে অনুভব করল কিছু একটা উঁচু হয়ে আছে। নিনা মেঝেতে প্রায় শুয়ে পরে সেটা দেখার চেষ্টা করল। মেঝের একটা তক্তার কোণা উঁচু হয়ে আছে। নিনা সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল। কাঠের তক্তার উঁচু হয়ে থাকা স্থানটা নাড়াচাড়া করার চেষ্টা করল। কিছুই হলো না। ওই নির্দিষ্ট তক্তায় ঠোকা দিয়ে দেখলো। বেশ জোড়ে শব্দ হলো। কিন্তু মেঝের অন্যান্য স্থানে ঠোকা দিলে অতটা তীব্র শব্দ হয় না ৷ নিনা নিশ্চিত হলো এই তক্তার নিচের অংশটা ফাঁপা। ও ঠিক জায়গাতেই হাত দিয়েছে। কিন্তু অনেক কিছু করেও সেটা খুলতে পারলো না। অবশেষে হতাশ হয়ে উঠে দাঁড়াল। তাপমাত্রা বেশ কম। বাইরে থেকে হিমশীতল বাতাস হু হু করে জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। তবুও নিনা ঘেমে ভিজে আছে। উঠে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে উঁচু হয়ে থাকা স্থানটায় লাথি দিল। সাথে সাথে বেশ জোড়ে ঠক করে একটা শব্দ হলো। নিনা চমকে উঠল। দেখল তক্তাটা খুলে অর্ধেক উঁচু হয়ে আছে। ওর বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গিয়েছে। উত্তেজিত চিত্তে পুনরায় মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসল। সেখানে আলো ফেলতেই দেখলো তক্তার নিচের অংশ ফাঁপা। ও ঠিকই ধরেছিল। কাঠের তক্তার নিচে প্রায় আট ইঞ্চি নিচু জায়গা আছে। সেখানে একটু ভেতরে আড়ালে একটা প্যাকেট রাখা। এক হাতে মোবাইল ধরে, আরেক হাতে প্যাকেটটা বের করল। তখনই বাইরে কাঠের সিঁড়িতে পদশব্দ শোনা গেল। নিনা প্রায় ভূত দেখার মতো আঁতকে উঠল। একটুর জন্য প্যাকেটটাও হাত থেকে খোসে যাচ্ছিল। সেটা কোন রকমে ধরল। সেটার মুখ খুলে ভেতরে আলো ফেলতেই কোন একটা মোটা চামড়ায় বাঁধা বই বা ডায়েরি চোখে পরল। নিনা সেটা নিয়ে তড়িঘড়ি তক্তাটা আবার মেঝের সাথে লাগাতে ব্যস্ত হলো। সেই পদশব্দটা আরো জোড়ালো ভাবে শোনা গেল। তক্তাটা ভালোভাবে বসছে না। জোড়াজুড়ি করা বাদ দিয়ে সযত্নে জায়গা মতো বসিয়ে দিল। এবার সেটা মৃদু খট করে শব্দ করে লেগে গেল। নিনা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বের হওয়ার দরজার নিচে আলো দেখা গেল। নিনা আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। আলমারির পাল্লা খুলে অল্প কিছু কাপড়ের আড়ালে ঢুকে গেল। আলমারির একপাশটায় কোন থাক নেই৷ সেখানেই নিনা উঠে দাঁড়িয়েছে। পাল্লাটা সম্পূর্ণ বন্ধ করল না। অল্প একটু খোলা রেখে চাপিয়ে দিল। তখনই বাইরের দরজাটা খোলার ক্লিক করে শব্দ হলো। আলমারির চাপানো দরজার ফাঁক থেকে আলো দেখা গেল৷ কিছুক্ষণের মধ্যে টিক করে একটা শব্দ হলো এবং সারা কামরা আলোকিত হয়ে উঠল। কেউ একজন সারা কামরা জুড়ে ঘুরল। তারপর আলমারির সামনে এসে তার পদশব্দ থেমে গেল। নিনা প্রায় শ্বাস আঁটকে দাঁড়িয়ে আছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের তফাতে ও ধরা পরে যেতে পারে। দরজাটা অল্প একটু নড়ল। একজন মহিলার বিরক্ত কন্ঠ বলল,
‘ওফ এটাও খোলা। না জানি কোথায় কোথায় এই ইঁদুর এসে ঢুকেছে।’ বলতে বলতেই দরজাটা লাগিয়ে দিল। চাবির ঝনঝন শব্দ হচ্ছে। তারপর দরজায় আরেকটা ক্লিক করে শব্দ হলো। অর্থাৎ তিনি চাবি দিয়ে লক করে দিয়েছেন। এরপর কামরার আলো নিভে গেল৷ বাইরের দরজাটাও ধম করে লেগে গেল। তারপর সেটাও চাবি ঘুরিয়ে লক করে দিলেন। এদিকে নিনা আলমারির মধ্যে বন্দি হয়ে আছে। ভেতরে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আলমারির ছোট্ট চিপায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিনা ওর কোন পকেটেই নিজের মোবাইলটা খুঁজে পেল না। আলমারির মেঝেতেও খুঁজলো, পেল না। মনে পরল, তক্তাটা দুহাতে লাগাতে গিয়ে মোবাইলটা বিছানার পাশে বা নিচের দিকে রেখেছিল। মিসেস গ্রেউড হয়তো খেয়াল করেননি। নাহলে এত নিশ্চিন্তে তিনি চলে যেতেন না। নিনার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। যতটা সম্ভব বড় বড় করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে। বন্ধ জায়গায় শ্বাসকষ্ট হয় ওর। প্রচন্ড ঘামছে। ধীরে ধীরে আলমারির মেঝেতে চাপাচাপি করে বসে পরল। খুব কষ্ট হচ্ছে বুকে। ফুসফুস যথেষ্ট অক্সিজেন পাচ্ছে না। সেই ছোটবেলার কথা মনে পরল।

একবার লুকোচুরি খেলছিল নিনা এবং নিমা। খেলতে খেলতে আলমারির মধ্যে গিয়ে লুকিয়েছিল নিনা। কিন্তু অপরদিক থেকে ওকে খুঁজে পেয়ে নিমা দরজা লক করে দিয়ে চলে যায়। সেখানে প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ওর ক্লাস্টোফোবিয়া এবং প্যানিক এটাকের সমস্যা শুরু হয় সেই সাগরের হইয়ার্ল পুলে পরে যাওয়ার পর থেকে। সেই পানির ঘূর্ণিতে শ্বাস আঁটকে আসছিল। ও ক্রমেই ঘূর্ণির সঙ্গে পানির গভীরে তলিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সেভাবেই যত সময় যাচ্ছিল সেই ছোটবেলায় আলমারিতে আঁটকে থেকে ক্রমেই ফুসফুসের সব বাতাস শেষ হয়ে যাচ্ছিল। প্রায় দেড় ঘন্টা আঁটকে ছিল সেখানে। প্রচুর ধাক্কাধাক্কি করেছিল। অনেক চিৎকার করে ডেকেছিল নিমাকে। কিন্তু কেউ আসেনি। নিনা শেষ পর্যন্ত জ্ঞান হারিয়েছিল। পরে জ্ঞান আসার পর জানতে পেরেছিল ও মা*রা যায়নি। বাবা এসে ওকে উদ্ধার করেছিলেন।

একে একে জীবনের সব তিক্ত দুঃস্বপ্নের মতো তমশা মাখা স্মৃতি গুলো মানসপটে ভেসে উঠছে। নিনা রিতীমত কাতরাচ্ছে ওই ছোট্ট, অন্ধকার, বাতাস বিহীন জায়গাটায়। মনে হচ্ছে যে কোন সময় বেহুশ হয়ে যাবে ও। ফোনটাও সাথে নেই। কে আসবে ওকে বের করতে? বেশি দেড়ি হলে অমিত অবশ্যই আসবে। কিন্তু আসলেও কিভাবে কামরার চাবি খুঁজে পাবে? কিভাবে আলমারির চাবি খুঁজে পাবে? আর কতক্ষণে আসবে ও? যদি না আসে? তাহলে কী এখানেই বন্ধ হয়ে মা*রা যাবে ও? ঘামে নিনার শরীর নেয়ে উঠেছে। এমনিতেই জায়গাটা অন্ধকার। বুঝতেও পারলো না ও কী চোখেই অন্ধকার দেখছে নাকি জায়গাটা অন্ধকার বলেই এমন লাগছে। তাই বলে ধরা না খাওয়ার পাল্লায় ম*রে যাওয়া যাবে না। জীবন কী এতই ঠুনকো? নিনা ধীরে ধীরে কাঠের পাল্লায় বারি দিতে লাগলো। হাতেও যেন জোর পেল না। ওর এবার সত্যিই মনে হলো ও আর কিছুই অনুভব করতে পারছে না। শুধু জানে, কোন পাথরের টুকরো যেভাবে ধীরে ধীরে পানির নিচে ডুবে যেতে থাকে সেভাবেই ও কোন অন্ধকার গভীর সাগরে তলিয়ে যাচ্ছে। যেখান থেকে ও কখনোই উঠে আসতে পারবে না। মনে হলো বহু দূর থেকে একটা শব্দ কর্ণকুহরে এসে ঢুকলো। কারো মৃদু স্বরে ডাক শুনতে পেল, ‘নিনা?’
নিনা যেন মৃত্যু সাগরে ডুবে যেতে যেতে কোন রকমে হাত দিয়ে পাল্লায় ঠোকা দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে ক্লিক শব্দে দরজাটা খুলে গেল। কেউ একজন ওর ওপর ঝুঁকে এলো।
কোনক্রমে চোখের পাতা টেনে খোলার চেষ্টা করল। কোন কিছুর তীব্র আলো ওর চোখ ধাঁধিয়ে দিল। কেউ ওকে সযত্নে ধরে বের করে আনার চেষ্টা করছে। অতি পরিচিত কন্ঠটি এ্যাভরিলের। নরম কন্ঠে বলছে,
‘কিচ্ছু হবে না। বড় বড় করে শ্বাস নাও। আমরা এখুনি এখান থেকে বের হয়ে যাব।’
নিনাকে ধরে ধরে বের করে আনলো। নিনা কোন ক্রমে এ্যাভরিলের গায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। তারপর ধপ করে বিছানায় বসে পরল। বড় বড় করে শ্বাস নিচ্ছে। এ্যাভরিল বলল,
‘ভাগ্যিস তুমি বেহুঁশ হয়ে যাওনি। গড আমি কী ভয়ে পেয়েছিলাম জানো? আমাকে একবার জানিয়ে তো আসবা কোথায় যাচ্ছ।’ বলে ওর হাত ধরল। নিনা নিস্পৃহ কন্ঠে বলল,
‘স..সরি। তুমি..কিভাবে?’ বলতে গিয়ে কেসে উঠল। এ্যাভরিল বলল,
‘তোমার মোবাইলটা কোই? তোমাকে কতবার কল দিলাম কোন খবরই নেই। তারপর নিমা বলল, তুমি নাকি অমিতের সাথে গাড়ি নিয়ে কোথাও গিয়েছ। কাজেই অমিতকে ফোন দিয়ে জানলাম তুমি এখানে। এখন চলো বের হই এখান থেকে।’ নিনা কোন রকমে উঠে দাঁড়াল। এখনো মনে হলো ওর চারিপাশের সবকিছু ঘুরছে। বিছানার পাশ থেকে মোবাইলটা তুলে পকেটে রাখল। হাতে থাকা প্যাকেটটা শক্ত করে ধরে থাকল। ওরা দুজন কামরা থেকে বের হয়ে সিঁড়ি দিয়ে সন্তর্পণে নিচে নামল। এখন সারা ঘর অন্ধকারে ঢাকা। নিস্তব্ধ চারিদিক। এ্যাভরিল নিনার হাত ধরে নিয়ে চলেছে ওকে। ওরা রান্নাঘরে এসে দাঁড়াল। নিনা মৃদুস্বরে বলল,
‘দরজা খুলতে গেলে তো এলার্ম বাজবে।’

‘চিন্তা করো না। এখানে বাজবে না। বলেই ও দরজার নব ঘোরাল।’ নিনা সচকিত হয়ে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু কোন শব্দই হলো না। দরজাটা খুলে গেল। ওরা দুজন বাইরে বেরিয়ে এলো। দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে এ্যাভরিল বলল,
‘তোমার যেই অবস্থা দেয়াল বেয়ে উঠতে পারবা না। তাছাড়া বাইরের মেইন গেটের সামনে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে।’

‘তো আমরা কীভাবে বের হবো?’

এ্যাভরিল একটু ভেবে নিয়ে বলল,
‘আচ্ছা আসো আমার সাথে।’

বলেই ওর হাত ধরে টেনে পেছনের বাগানে নিয়ে গেল। এখানে বড় বড় ফুলের ঝোপ। এদিকেই কোথাও সেদিন হেমলকটা দেখেছিল। এ্যাভরিল কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে কিছু একটা পরখ করল। তারপর একদিকের ঝোপ হাতিয়ে সেটায় ঢুকে দাঁড়াল। বলল,
‘আমার সাথে আসো।’
নিনা অবাক হলেও কিছু না বলে চুপচাপ ঝোপঝাড় সরিয়ে এগিয়ে গেল। ঝোপগুলো অত্যন্ত ঘন। মনে হলো পুনরায় সেই ডান হাত কোন ডালে আঁ*চড় লেগেছে। জ্ব*লতে শুরু করল জায়গাটা। এ্যাভরিল একদম বাউন্ডারি দেয়ালের পাশে গিয়ে থামল। তারপর নিচে মাটিতে ঝোপঝাড়ের শিকড় বাকর সরিয়ে কিছু একটা দেখা গেল অন্ধকারে। সেখানে মোবাইলের আলো ফেলতেই দেয়ালের মধ্যে একটি ফোকর চোখে পরল। এ্যাভরিল বলল,
‘আমি ঝোপঝাড় সরিয়ে ধরে আছি। তুমি আগে বের হও।’

নিনার ভ্রু সূচালো হলো। জিজ্ঞেস করল,
‘তুমি এই ফোকরের সন্ধান পেলা কিভাবে?’

এ্যাভরিল হালকা হাসল। বলল,
‘নিনা আমি ছোট বেলা থেকে টনির ফ্রেন্ড। এসব তো খেলাধুলা করতে গিয়ে অনেক আগেই আবিষ্কার করেছি।’

‘ওহ আচ্ছা। যাক ভালোই হয়েছে।’ বলেই নিনা হাঁটু গেঁড়ে মাটিতে বসল। ওর কালো প্যান্টের যে কী বেহাল দশা হচ্ছে তা আর বলার নয়। কোন রকমে ফোকর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে আসল। ওর জন্য অবশ্য সেটা খুব একটা কষ্টকর হলো না। যেহেতু ও যতটা শুকনা, ওরকম দুজন একসাথে ফোকর থেকে অনায়সে পার হয়ে যাবে। নিনা জামা কাপড় ঝেরে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই এ্যাভরিল বেরিয়ে এল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
‘তুমি ঠিক আছ তো? তোমার এখন কেমন লাগছে?’

‘এখন ঠিক আছি। চলো। অমিত অপেক্ষা করতে করতে না জানি ঘুমিয়ে পরেছে হয়তো।’

এ্যাভরিল হালকা হাসল। ঝিঁঝি পোকাদের নিরবচ্ছিন্ন ডাক ছাড়া আর কোন শব্দ কানে এলো না। হঠাৎ কোথায় যেন একটা পেঁচা ডেকে উঠল৷ ওরা বাউন্ডারি দেয়াল ঘেঁষে এগিয়ে গিয়ে বড় রাস্তায় বেরিয়ে আসল। একটু দূরেই আবছা অন্ধকারে ওদের গাড়িটা দেখা গেল। ওরা দুজন ক্লান্ত পায় এগিয়ে গেল। অমিত গাড়িতেই হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ওদের দেখা মাত্র প্রায় লাফ দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
‘নিনা তুই ঠিক আছিস? কী হয়েছিল? এত ফোন দিচ্ছিলাম।না কাটছিলি, না ধরছিলি। জাস্ট বেজেই যাচ্ছিল।’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল।

‘আরেহ থাম ভাই। গাড়িতে বসে সব খুলে বলছি।’ বলল নিনা।

‘হ্যা এমনিতেও অনেক রাত হয়েছে। আমাদের রওনা দেওয়া উচিৎ আগে। তারপর কথাবার্তা হবে।’ বলল এ্যাভরিল।

অমিত সায় জানিয়ে মাথা নাড়ল। এবং এগিয়ে গিয়ে ড্রাইভারের সিটে উঠে বসল।

ইনশাআল্লাহ চলবে।

#মনোভূমির_ছায়া
পর্ব – ৩২
লেখনী – #মাহীরা_ফারহীন

পরেরদিন সকাল বেলা নিনা গাড়ি নিয়ে একা বের হয়েছে। সকাল থেকে গুম হয়ে আছে ও। কথায় কথায় চমকে উঠছে। নিমা, নিনা ও এ্যাভরিল একসাথে নাস্তা করার পর নিমা আশপাশটা ঘুরে দেখতে বেরিয়েছে। যদিও এ্যাভরিলের আজ সকালে কাজ নেই বলে জেদ করছিল নিমার সাথে গাইড হিসেবে সঙ্গ দিবে। কিন্তু ওকে জোর করে ধরে বেঁধে নিমা নিনা স্কুলে পাঠিয়েছে। কারণ টানা বেশ অনেক দিনই ও স্কুলের মুখ দর্শন করেনি। তবে নিনার যেহেতু পুলিশ স্টেশনে কাজ আছে তাই ওকে সাথে নেয়নি আর। ক্লাসে ভাবনার জগৎ এ হারিয়ে বসে আছে ও। মিস ইনস্তিকার রসায়ন পড়াচ্ছেন। নিনা সবার সামনের দিকের একটি টেবিলে বসে আছে। অপর পাশের পেছনের দিকের একটি টেবিলে ইভান বসে আছে। ইভান এখন পর্যন্ত টিচারের একটি কথাও কানে তোলেনি। পুরোটা সময় নিরবে নিনার দিকে তাকিয়ে থাকল। এদিকে নিনারও ক্লাসে কোন মনোযোগ নেই৷ হঠাৎ মিস ইনস্তিকারের মুখে নিজের নাম কয়েকবার শুনে নিনা বাস্তবে ফিরে এলো। তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
‘জ…জ্বী মিস ইনস্তিকার।’

‘আশ্চর্য তোমার মন কোথায়!? কতবার ডাকলাম এই নিয়ে?’

‘অত্যন্ত দুঃখিত।’

উনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিনার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন,
‘আরেকবার যেন না দেখি বসে আছো এখানে মন আছে অন্য কোথাও।’

নিনা আলতো করে মাথা নাড়ল। ক্লাস শেষের ঘন্টা পরেছে কী পরে নাই তখনই সকল ছাত্র ছাত্রীরা হইচই করতে করতে ক্লাস থেকে বের হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু করল। নিনা চুপচাপ বসে থাকল। গোটা ক্লাস খালি হয়ে গেল। কিন্তু দুজন থেকে গেল। নিনা এক দৃষ্টিতে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছে। পেছনে কয়েকটি টেবিল পরে ইভানও বসে আছে। নিনার দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবছে,
‘কী হয়েছে ওর? পরশু দিনই তো কী খুশি খুশি লাগছিল ওকে। ওর রাগের ধরনও বড় অদ্ভুত। পুরোপুরি কথা বলা বন্ধ করে না কিন্ত একটা ঠান্ডা আচরণ করে। সেটা আরোও খারাপ লাগে। বাট এই মুহূর্তে ও আমার ওপর রাগ করে নেই। বরং অন্য কিছু হয়েছে৷ কিছু একটা নিয়ে ওর মনে অশান্তি চলছে।’
ভেবে উঠে দাঁড়াল। দ্বিধাগ্রস্ত পায় এগিয়ে গেল নিনার দিকে। কাঁধে হাত রাখতেই চমকে উঠল নিনা। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। ইভান ওর চোখের দিকে তাকিয়ে এক রাশ শূন্যতা এবং বিষন্নতা ভিন্ন আর কিছুই দেখতে পেল না। ওর বুকটা চিনচিনে ব্যাথায় মোচড় দিয়ে উঠল। ইভান ওর পাশের চেয়ারে বসল। নিনার হাত দুটো নিজের হাতে নিল। নিনা ওর দিকে নিরবে তাকিয়ে আছে। ইভান বলল,
‘নিনা।’
কিছুক্ষণের নিরবতা। তারপর নিনা নিস্পৃহ কন্ঠে বলল,
‘কী?’
ইভান কিছু একটা বলতে যাবে, তখনই বাইরে হইচই পরে গেল। কাউকে বলতে শোনা গেল,
‘পু*লিশ এসেছে!’ সাথে সাথে নিনা ঝট করে উঠে দাঁড়াল। বলল,
‘বাইরে চলো।’ বলেই আর এক মুহূর্তে দাঁড়াল না। প্রায় ছুটতে ছুটতে ভিরের সাথে সাথে বাইরের দিকে এগিয়ে গেল। সকলের মধ্যেই দাবানলের মতো খবরটা ছড়িয়ে গিয়েছে। গোটা স্কুলে যে যেখানে আছে সেই ছুটে বাইরের দিয়ে যাচ্ছে। নিনা বাইরে বেরিয়ে গোল চত্ত্বরে দাঁড়াল। পু*লিশের গাড়িতে অনবরত সাইরেন বেজে চলেছে। ইতোমধ্যেই প্রায় গোটা স্কুলের শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে গিয়েছে চত্ত্বরে। পাশাপাশি শিক্ষকরাও আছেন। নিনা একে একে ভিরের মধ্যে অমিত, লিজা, এমিলি, এ্যাভরিল, হারিন এবং ইভানকে দেখতে পেল। মি.মালিক সহ আরো কয়েকজন পু*লিশ অফিসার গাড়ি থেকে বের হলেন। স্কুলের প্রিন্সিপাল এগিয়ে গিয়ে মি.মালিকের সামনে দাঁড়ালেন। বললেন,
‘অফিসার আপনার এই সময় স্কুলে কী কাজ?’

মি.মালিক ভারি কন্ঠে বললেন,
‘মি.শ্যারন আমি টনি গ্রেউড মা*র্ডার কেস সম্পর্কিত কারণে এসেছি। টনি গ্রেউডকে মার্ডা*রের সমস্ত তথ্য আমরা হাতে পেয়েছি।’
অনেক ছেলে মেয়েই মোবাইল তুলে ভিডিও রেকর্ড করা শুরু করেছে। সকলেই একদম নিরব। টানটান উত্তেজনার সাথে প্রিন্সিপাল ও মি.মালিকের কথা শুনছে সবাই। আকাশের মুখ কালো। বড় ভারি ধূসর মেঘগুলো দেখে মনে হয় যে-কোন সময় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে। বেশ তীব্র বাতাস হচ্ছে। মি.মালিক একবার ভিরের মধ্যে চোখ বুলিয়ে নিনার দিকে তাকালেন। প্রিন্সিপাল শ্যারন বললেন,
‘কিন্তু তার সাথে এখানে আসার কী সম্পর্ক? খু*নি কী এখানে আছে বলে মনে হয় আপনার?’

‘অবশ্যই। আমরা টনি গ্রেউডকে মা*র্ডারের অভিযোগে ইমোজেন কক্সকে গ্রে*ফতার করছি।’
সকলকেই বিভ্রান্ত হতে দেখা গেল। ছেলে মেয়েরা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। কানাকানি করছে। তখনই একটা মেয়ে সামনে এগিয়ে এলো। শান্ত কন্ঠে বলল,
‘আমি ইমোজেন কক্স।’ বলে এ্যাভরিল এক হাত উঁচু করে ধরল,
‘আমি প্রস্তুত।’

এবার এখানে উপস্থিত সকলে যেন বর্জ্রাহত হলো। প্রিন্সিপাল বিস্মিত কন্ঠে বললেন,
‘ওয়াট ইজ দিস!’

মি.মালিক এ্যাভরিলের বাড়িয়ে দেওয়া হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিলেন। নিনা উদাসীন চোখে তাকিয়ে থাকল সেদিকে। লিজা এ্যাভরিলের কাছে এগিয়ে গিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
‘কেন এ্যাভরিল? কেন?’ ইভানও লিজার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
এ্যাভরিল নিশ্চুপ রইল। মি.মালিক বললেন,
‘আমাদের তথ্য মতে মি. গ্রেউডের মৃ*ত্যুর পূর্বে বাড়িতে লিজা দানিরও উপস্থিত ছিলেন। কাজেই স্টেটমেন্ট দিতে লিজা দানির কেও থানায় আসতে হবে।’
ইভান বলল,
‘অফিসার এর কী প্রমাণ আছে?’

‘আমরা প্রমাণ ছাড়া কোন কাজ করছি না মি.দানির। আমাদের কাজ আমাদের করতেই হবে।’
ইভান লিজার দিকে ঘুরে বলল,
‘তুই চিন্তা করিস না। আমি আসছি সাথে।’

তখনই এমিলি এগিয়ে এসে এ্যাভরিলের সামনে দাঁড়াল। উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
‘তাই বলে আমি এটা আশা করিনি জেন। তুমি এতটা জঘন্য কাজ করলা কিভাবে?’
এ্যাভরিল এবারও নিশ্চুপ। মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। এ্যাভরিল নিনা যেদিকে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে কয়েক পা এগিয়ে গেল। মি.মালিকও ওর হ্যান্ডকাফ ধরে এগিয়ে গেলেন। এ্যাভরিল নিনার দিকে তাকিয়ে নরম কন্ঠে বলল,
‘ধন্যবাদ নিনা। আমাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য ধন্যবাদ।’ বলেই ঘুরে দাঁড়াল। এরপর পু*লিশের বাকি সদস্যরা ওকে এবং লিজাকে গাড়িতে বসিয়ে বেরিয়ে গেলেন। সাথে সাথে এমিলিও নিজের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। যেহেতু লিজাকেও থা*নায় যেতে হয়েছে কাজেই ইভানও তড়িঘড়ি নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ওকেও থা*নায় পৌঁছতে হবে। তখনই হঠাৎ করে আকাশ নিজের কষ্ট উজার করে দিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করল। ভারি বর্ষনের ফলে সকল শিক্ষার্থীরা যেভাবে ছুটতে ছুটতে বাইরে বের হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই আবারও ছুটতে ছুটতে স্কুলের ভেতর ঢুকে গেল। শুধু দাঁড়িয়ে রইল নিনা একা। বৃষ্টিতে ভিজে চুপেচুপে হয়ে গেল ও। চোখ দিয়েও পানি পরছে কিনা বুঝতে পারল না। চোখের নোনা জল বৃষ্টির পানির সাথে মিশে হারিয়ে যাচ্ছে।
ভাবছে, ‘সেই চিঠিতে তুৃমি ঠিকই লিখেছিলা এ্যাভরিল। আমি কোন আপনজন কে হারিয়ে ফেলব। আসলেই ততো এ্যাভি। তোমাকে হারিয়ে ফেললাম আমি।’
.
.
.
.
.
‘লাইক সিরিয়াসলি মেয়েটাকে কী সুইট এন্ড পজিটিভ লাগলো। অথচ ও এমন একটা কাজ করেছে? অবিশ্বাস্য!’
বলল নিমা। নিনা ড্রাইভিং সিটে বসে আছে। স্টিয়ারিং হুইলে হাত। নিমা পাশেই বসে নিনার ফোনে এ্যাভরিলের যত ছবি আছে সেসব ঘেটে দেখছে। কিছুক্ষণ পর পর এটা সেটা মন্তব্যও করছে। নিনা স্তিমিত স্বরে বলল,
‘কেই বা ভাবতে পেরেছিল।’
গাড়ির জানালার বাইরে অন্ধকার। তবে রাস্তার দুপাশের জমজমাট দোকান পাটের আলোগুলো দিনের মতো আলোকিত করে রেখেছে রাস্তা। সন্ধ্যা সাতটা বাজে প্রায়।
একই সাথে গাড়ির হর্নের পি পি শব্দ কানে বাজচ্ছে। ওরা গাড়ির মিউজিক প্লেয়ারে লানা ডেল রেয়ের ‘ইয়াং এন্ড বিউটিফুল’ গানটি শুনছে। নিনা বলল,
‘তোর সাথে এতদিন থাকল। তোর কখনো ওর কোন আচরণ স*ন্দেহজনক লাগেনি?’

নিনা নিরবে সামনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে। কিছু একটা ভেবে নিয়ে বলল,
‘হয়তো এমন আচরণ করেছে কিন্তু আমি খেয়াল করিনি। তাছাড়া ওরই লেখা চিরকুট পেয়ে ওকেই দেখালাম। টনির ডায়েরির ওই ছেঁ*ড়া টুকরোটায় বলা আরেকজন তৃতীয় ব্যক্তি এ্যাভরিল নিজেই ছিল। এ্যাভরিলকে সাথে নিয়েও আমি ওই গ্রেউড বাড়ি গিয়েছি। যেখানে ও থাকত। অথচ কখনো এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র রিয়্যাক্ট করেনি।’

‘অদ্ভুত তো! কখনো তো তোকে থামানোর চেষ্টা করেনি৷ ইভেন এই জিনিসটা আরোও বেশি স্ট্রেঞ্জ না যে ও নিজেই তোকে সাহায্য করছিল ওরই কীর্তিকলাম খুঁজে বের করতে? লাইক ও তোর কাছাকাছি থেকে, সবকিছু আগে আগে জেনে যদি তা মুছে দিত তাও একটা কথা ছিল। সেটাও করেনি।’

‘আচ্ছা তোর কী মনে হয়? ওকে এই দুইদিনে কেমন লেগেছে?’

‘বললামই তো আমার ওকে সত্যিই খুব ভালো লেগেছিল। তাছাড়া তোর না সিক্সথ সেন্স খুব প্রখর। তোর কখনোই ওর আশেপাশে অস্বস্তি হয়নি?’

‘আরেহ ভাই না। সেটাই তো অবাক করছে আমায়। লাইক ও যখন আমার বাসায় প্রথম এসে উঠেছিল তখন একটু কেমন জানি লাগছিল। নিজের সিদ্ধান্তকে স*ন্দেহ হচ্ছিল। যদিও সেটা শুধু ওই সময়ের জন্যই ছিল। বাট এখন তো সত্যিই দেখতে পাচ্ছি আমার দুশ্চিন্তাটা ভুল ছিল না। যে খু*নি, যাকে পুরো দুনিয়া উজার করে খুঁজে বের করলাম সে আমার বাড়িতেই বসে ছিল।’

‘বাট ও আমাকে কেন ফিরিয়ে আনার জন্য এতকিছু করলো? তুই যখন অসুস্থ ছিলি কাজ থেকে ছুটি নিয়ে ও তোর দেখাশুনা করল। কোন খারাপ মানুষ কী এতদিন ধরে এভাবে ভালো হওয়ার নাটক করতে পারে?’
নিনা রাস্তার দিকে চোখ রেখে মানসপটে ভেসে ওঠা এক স্মৃতির মাঝে হারিয়ে গেল।

‘আমি ভোর বেলায় উঠে নাস্তা তৈরি করছিলাম। আগের দিনই এ্যাভরিল এসেছে। আরেকটু সময় যেতেই ও সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। রান্নাঘরে প্রবেশ করেই থমকে দাঁড়াল। রান্নাঘরের কাউন্টার টপের সামনে নিরবে দাঁড়িয়ে রইল। আমি বললাম,
‘গুড মর্নিং। ঘুম ভালোভাবে হয়েছে?’

‘গুড মর্নিং! অবশ্যই।’

‘তুমি ওমন অবাক হলা কী দেখে?’

‘না মানে তুমি এমন সকাল সকাল উঠে রান্নাবান্না শুরু করে দাও ভাবিনি।’

‘না সবসময় এমনটা করি না। তুমি এসেছো বলেই একটু আয়োজন করতে ইচ্ছে হলো।

‘ওহ্হ খুব সম্মানিত বোধ করছি।’

‘ওকে। ওয়েল দেখো প্যানকেক বানাচ্ছি। ফ্রেশ হয়ে আসো। তারপর নাস্তা করো।’

‘না না, আমি ফ্রেশ হয়েই এসেছি।’ বলেই থামল। তারপর ইতস্তত করে বলল,
‘ওইযে রেন্ট… ওর কথার মাঝখান থেকে নিনা বলে উঠল,
‘ধুর ওইটা নিয়ে না কালকে কথা হলো। কোন রেন্ট টেন্ট দেওয়া যাবে না। আর কোন কথা নয় এটা নিয়ে।’

এ্যাভরিল বিচলিত হাসল। রান্নাঘরের ভেতরে ঢুকল। বলল,
‘আচ্ছা কাল ঠিক কয়টার দিকে আমি এসেছিলাম? অত ঝামেলা এবং ঝড়বৃষ্টির মধ্যে খেয়ালই করিনি।’

‘উম এইতো পৌঁনে দশটার দিকে।’

‘ইশ কত রাতে এসে তোমাকে বিরক্ত করেছি।’

‘না না আমি কিছু মনে করিনি।’

————————

‘নিনা! থানা পার হয়ে গেল তো!’ নিমার কন্ঠে খেয়াল করল ও থানা পেছনে ফেলে এসেছে৷ নিজেকে সংযত করে আবার পেছনের দিকে ফিরে এলো। থানার সামনে এসে গাড়ি থামাল। বাইরে বেরিয়ে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলো। গেটের সামনে দুজন গার্ড দাঁড়িয়ে। ভেতরে এদিক ওদিক কনস্টেবল এবং কর্মকর্তারা আসা যাওয়ায় ব্যস্ত। নিনাকে অনেকেই চেনে বলে কেউ ওদের বাঁধা দিল না। কয়েকটা টেবিলে অফিসাররা বসে কাজ করছেন। ওদের পাশ দিয়ে দুজন অদ্ভুত লোককে হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় ঠেলা দিয়ে ভেতরের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। ভেতরে ঢুকে ঠিক হেড অব ডিপার্টমেন্টের অফিসে নক করে ভেতরে ঢুকলো। ভেতরে মি.মালিক বসে আছেন। ওদের দেখে নরম কন্ঠে বললেন,
‘তোরা এই সময়?’

ওরা টেবিলের সামনের দুটো সিটে বসল। নিনা বলল,
‘এখন.. ওম ও কোথায়?’

‘লক-আপে আছে।’

‘ও। আচ্ছা ও কী স্টেটমেন্ট দিয়েছে?’

‘ও কিছুই বলছে না। ওর ধারণা ওই খু*নটা করেছে। কিন্তু ওর কিছু মনে নেই।’

‘ওয়েট তাহলে ও এটা কীভাবে বলছে যে ওই খু*ন করেছে?’

‘ওর কথা শুনে আমরাই বেশ অবাক হয়েছি। ও বলছে, সব তথ্য, সূত্র সেটাই নির্দেশ করে তাই ওই দোষ করেছে। কিন্তু ও বলতে পারছে না কিভাবে অথবা কেন করেছে।’
নিনা ও নিমা দুজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। নিমা বলল,
‘বাই এনি চান্স ওর অ্যামনেশিয়া নেই তো?’

‘ওর ফুল বডি টেস্ট করা হয়েছে। আগামীকাল রিপোর্ট আসবে। এমনিতে ওর মাথা ব্যাথা এবং ডিপ্রেশন ছাড়া আর কোন ধরনের কোন সমস্যা কখনো দেখা যায়নি বলে জানিয়েছ। আর নিনা তোর সাথে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখা করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। কারণ মানসিক সমস্যা অনেক সময় ডায়াগনোসিস করে নির্ণয় করা যায় না।’
নিনার দিকে তাকিয়ে বললেন। নিনা বিভ্রান্ত হলো,
‘কী নিয়ে?’

‘যেহেতু শেষে তুই ওর সাথে বেশি সময় কাটিয়েছিস তাই ওর মধ্যে অন্য কোন ধরনের মানসিক সমস্যার সিম্পটমস দেখা গিয়েছে কিনা সেটা নিয়েই কথা বলবে।’

‘ওহ।’ বলে কিছু একটা ভাবল নিনা।

‘আচ্ছা ওই লিজা মেয়েটা যে স্টেটমেন্ট দেওয়ার জন্য এসেছিল। সে কী স্টেটমেন্ট দিল?’ জিজ্ঞেস করল নিমা।

‘ওহ লিজা স্বীকার করেছে যে ও সেইদিন ওই বাড়িতে গিয়েছিল। কিন্তু ওর কথা মতে ও বাড়িতে টনি ভিন্ন আর কাউকে দেখেনি। দ্বিতীয়ত টনিকে স্ট্রবেরি শেইকটা ফ্রিজ থেকে বের করে এনে ওই দিয়েছিল।’

‘তারপর?’ কৌতুহলী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল নিনা।

‘এবং ওর হাতে ইনফেকশন হওয়া এবং ভুলবশত ইভানের ব্রেসলেট পরে যাওয়ার কথাটাও স্বীকার করেছে। তারপর ওকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এ্যাভরিলের ডায়েরিতে লেখা কথাগুলো লিজার কর্মকান্ড গুলোকে জাস্টিফাই করে।’ এরপর নিনা নিমা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল।
নিনা কিছু একটা ভেবে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘আমি কী ওর সাথে দেখা করতে পারি একবার?’

‘ঠিক আছে৷ কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। আমি কনস্টেবলকে বলছি তোকে ওর সেলের কাছে নিয়ে যেতে।’

নিনা উঠে দাঁড়াল। নিমা ওখানেই বসে রইল। মি.মালিকের নির্দেশে কনস্টেবল ওকে আরোও ভেতরে লক-আপে নিয়ে গেল। বেশ কয়েকটা লক-আপে বিভিন্ন ধরনের ক্রিমিনালরা বন্দি৷ দু’পাশে সারি সারি সেল। লম্বা করিডোর জুড়ে আলো জ্বালানো। তবুও অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা পরিবেশ। শেষের দিকে একটা সেলের সামনে ওকে রেখে দিয়ে গেটের কাছে চলে গেল কনস্টেবল। এ্যাভরিল সকালের সেই কুসুম রঙের টপ এবং জিনসই পরে আছে। চুপচাপ বেঞ্চিতে পা মুড়িয়ে বসে ছিল। নিনাকে দেখেই উঠে দাঁড়াল৷ এগিয়ে এসে লোহার বার ঘেঁষে দাঁড়াল। নিনার মনে হলো অদ্ভুত অচেনা ক্লেশময় এক বাতাস বয়ে যাচ্ছে ওর ওপর দিয়ে। ও প্রাণপন চেষ্টা করছে এই খারাপ লাগাটা মন থেকে টেনে বের করে ফেলতে৷ ওর তো আনন্দিত হওয়ার কথা ছিল। উল্টে ও আরেকটা মানুষকে হারিয়ে ফেলার শোকে ডুবে রয়েছে৷ যতটা সম্ভব স্বাভাবিক স্বরে বলল,
‘আম….তুমি কেন এমন করছ?’

‘মানে?’ জিজ্ঞেস করল এ্যাভরিল।

‘তুমি এতদিন আমার সাথে এত ভালো ব্যবহার করলা। আমার এত খেয়াল রাখলা। আমাকে সবকিছুতে সাহায্য করলা। এমনকি আমার জীবনের সবচাইতে বড় আফসোস ছিল, আমার বোন থেকেও আমার সাথে নেই। সেটাও দূর করলা। আমার বোনকে তো ফিরিয়ে দিলা কিন্তু….কিন্তু নিজে তো আমাকে ছেড়ে চলে গেলা।’ বলতে বলতে ওর চোখ ঘোলা হয়ে উঠল নোনা জলে। ও ঠোঁট কা*মড়ে ধরে চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু তা আর বাঁধ মানে? টুপ করে গাল বেয়ে পরল। এ্যাভরিলের চোখেও অল্প একটু জল ক্ষনিকের জন্য ঝিলিক দিয়ে উঠল। কিন্তু মুহুর্তেই তা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। এ্যাভরিল গ্রিলের বাইরে হাত বের করে ওর গাল থেকে পানি মুছে দিয়ে নরম কন্ঠে বলল,

‘কারণ আমি এমনই নিনা। একটা মানুষ কয়েকদিন নাটক করতে পারে। কতগুলো ভালো কথা বলতে পারে। কয়েকবার মিথ্যে হাসি দিতে পারে। কিন্তু এতদিন মিলেমিশে থাকা, একে অপরের যত্ন নেওয়া। তার খুশিতে খুশি হওয়া। তার কিছু হলে খারাপ লাগা এগুলো কেউ নাটক করতে পারে না। আমিও করিনি।’

‘তুমি তো নিজের চোখের সামনে দেখছিলা আমি কী করছিলাম। তুমিই সেই থ্রে*টটা দিয়েছিলা। গ্রেউড বাড়িতে আমি তোমার কামরায়ই গিয়ে পৌঁছেছিলাম। তোমার ডায়েরিই আমার হাতে ছিল। কেনো সবকিছু জানার পর, দেখার পরও আমাকে আটকালে না? কেনো অজানার মতো আচরণ করে গেলা?’

‘প্রথমত ওই চিরকুটটা থ্রেট ছিল না। ওখানে আমি এটাই ইন্ডাইরেক্টলি বলতে চেয়েছিলাম যে তুমি আমাকেই হারিয়ে ফেলবা। এবং কাকটাকে আমি মা*রিনি। আগে থেকেই ম*রে পরেছিল। যদিও এসব আমি জানি না কখন করেছি। শুধু নিজের হাতের লেখা চিনতে পেরেছি বলে বুঝেছি৷ আর কাকটাকে আগের দিন রাতে বাসায় ঢোকার সময়ই ওখানে পরে থাকতে দেখেছিলাম। আর তোমাকে যেই কারণে থামানোর চেষ্টা করিনি সেটার কারণ আমি দোষ করেছি। আমার শাস্তি পাওয়া উচিৎ।’

‘তুমি যখন জানো তুমি দোষ করেছো। শাস্তিও পাওয়া উচিৎ। সেটার জন্য তুমি প্রস্তুতও হয়ে বসে আছো। তাহলে নিজে থেকে কেনো এগিয়ে আসোনি? কেন নিজে এসে ধরা দাওনি?’

‘কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম না। তুমিই আমাকে বলো তুমি কিভাবে নিশ্চিত হলা যে খু*নটা আমিই করেছি?’
নিনা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল,
‘অনেক দিন ধরেই অনেক ছোট ছোট বিষয় খেয়াল করেছি আমি। যেমন, আফটারনুন পার্টিতে যখন কোন একটা মেয়ে কুকি নিতে এসেছিল তখন সে খুঁজে পায়নি কুকি৷ কিন্তু তুমি একটা সম্পূর্ণ অন্য মানুষের কিচেনে কোথায়, কোন কাবার্ডে, কোন জারে কুকি আছে সেটা নিমিষেই বের করে ফেললে। সেদিন সেই কুকিটা আমিও খেয়েছিলাম। এরপর তুমি যতবারই বাসায় কুকি বানিয়েছ ততবারই বিস্ময়কর ভাবে দুটো কুকির স্বাদ একই রকম লেগেছে। তারপর তুমি এতদিন ধরে আমার বাসায় আছো অথচ কখনো তোমার পরিবার অথবা ছোটবেলা নিয়ে আরেকটা কথাও জানাওনি। তোমার কোন আইডি কার্ড, বার্থ সার্টিফিকেট কিছুই কখনো দেখিনি। তোমার দেখানো ছোটবেলার ছবির ঘরটার সাথে অস্বাভাবিক ভাবেই গ্রেউড বাড়ি মিলে যায়। তাও আবার জ্যাকারেন্ডা গাছটাও। কিন্তু তুমি আসলে আমার জন্য একে একে যা যা করলে শেষে এইসব আমার মাথা থেকে বেরই হয়ে গিয়েছিল বলতে গেলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমার কামরা, ক্ল্যাসিকেল বই, ড্রিম ক্যাচার এসব দেখার পরও মানতে চাচ্ছিলাম না এর সাথে তোমার কোন সম্পর্ক থাকতে পারে। ওই কামরার সুবাস, জিনিসপত্র, ধরণটা দেখে বারবার তোমার কথা মনে পরছিল। কিন্তু তুমি যখন ডান হাতের খেলার মতো বাড়িতে ঢুকে গেলা। এমনকি চাবি দিয়ে দরজা এবং আলমারিটা পর্যন্ত খুলে ফেললা। শুধু তাই নয় রান্নাঘরের দরজার হাতল টা ধরতেও এলার্ম বাজলো না। কিন্তু একটা বাইরের মানুষের হাতের ছাপ কেন ওখানে রেকর্ড করা থাকবে? এবং সর্বশেষ যেটা দেখে আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছি। সেটা হচ্ছে ওই ফোকরটা। ওই ফোকর দিয়েই তুমি যাওয়া আসা করতে তাই তো প্রথমে তদন্তের জন্য আগের বেশ কয়েক দিনের সিসিটিভি ফুটেজ ঘেটেও একবারের জন্য তোমার চিহ্ন মাত্র দেখা যায়নি।’

এ্যাভরিলের চেহারায় কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। নির্বিকার চিত্তে হালকা হেসে বলল,
‘তুমি নিঃসন্দেহে বুদ্ধিমতি একটা মেয়ে।’
নিনা দীর্ঘকাল ফেললো। তখনই কনস্টেবল গেটের কাছ থেকে উচ্চস্বরে বলল,
‘ম্যাম আপনার সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।’

‘আর দুটো মিনিট।’ উত্তরে বলল নিনা।
তারপর এ্যাভরিলের দিকে দৃষ্টি ফেরাল। বলল,
‘জাস্ট একটা প্রশ্ন করব।’ বলে একটু থামল। জিজ্ঞেস করল,
‘তুমি টনিকে কেন খু*ন করলা?’

এ্যাভরিল সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। ও একটুও বিচলিত হলো না। যেন ও এই প্রশ্নের জন্যেই প্রস্তুত হয়ে ছিল। এবার ও ব্যথিত কন্ঠে বলল,
‘এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই নিনা। তুমি গ্রেউড বাড়ি থেকে যেই ডায়েরিটা পেয়েছ সেটা এবং বাসায় যেটা আছে সেটা আমার ডায়েরি। ওই দুটো ডায়েরি পড়। তাহলে হয়তো নিজের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবা।’

‘কিন্তু তুমি কেনো বলতে পারছো না?’

‘কারণ এই প্রশ্নের উত্তরটা আমার কাছে অর্থহীন। যদি এর উত্তরটা আমার কাছে অর্থপূর্ণ হতো তাহলে তো আমি নিজেই ধরা দিতাম।’

তখনই কনস্টেবল নিনার পাশে এসে দাঁড়াল। বলল,
‘ম্যাম আপনি প্রায় বিশ মিনিট যাবৎ এখানে দাঁড়িয়ে আছেন। এতক্ষণ থাকার নিয়ম নেই।’ নিনা আলতোভাবে মাথা নাড়ল। তারপর একবার এ্যাভরিলের দিকে তাকাল এবং ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল। এ্যাভরিলের বাদামি রঙের চোখের মণিতে শুধুই উদাসীনতা ধরা দিল। নিনা আর একবারও ফিরে তাকাল না।

ইনশাআল্লাহ চলবে।

#মনোভূমির_ছায়া
পর্ব – ৩৩
লেখনী – #মাহীরা_ফারহীন

নিনা ঘরে ফিরেই কোন দিকে দৃষ্টিপাত না করে ডায়েরিটা নিয়ে বসল। মি.মালিকের কাছ থেকে ডায়েরিটা চেয়ে এনেছে। যদিও আগের দিন রাতে শেষের কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়েছে। কিন্তু পুরো ডায়েরিটা ভালো ভাবে পড়া দরকার। নিজের কামরায় পড়ার টেবিলে বসে আছে। সারা কামরার আলো নেভানো। শুধু টেবিলে রাখা ল্যাম্পটা জালানো। ল্যাম্পের মোলায়েম হলদে আলোয় ডায়েরিটা খুলে বসল।

|| ২০১৩, ২২ শে মার্চ ||

আমার ছোটবেলায় আরেকটা ডায়েরি ছিল। ছোটবেলার কথাগুলো ওখানে লিখতাম। ওটাই আমার একমাত্র খুশির ডায়েরি ছিল। সেটা অবশ্য হারিয়ে গিয়েছে। আর এখন আমার কোন খুশি নাই। আমার খালি সবসময় মনে হয় আমার সাথে কেন এমন হচ্ছে? আমি কী দোষ করেছি? বাবা মা একসাথে আমায় ছেড়ে চলে গেল। কেনো আমার বাবা মার সাথেই এমনটা হলো? কেন ওরা আমাকে আর এ্যামিলিকে এই পৃথিবীতে একা ছেড়ে চলে গেল? এতদিন জুলস আন্টির বাসায় ছিলাম। আম্মুর ফ্রেন্ড। ওনার বাসারও ভালো অবস্থা না। কিন্তু আন্টি চাচা চাচির মতো পঁচা না। উনি আমাকে আদর করেন। কিন্তু ওনার ড্রিংকিং সমস্যার জন্য কোন চাকরি টেকে না। একা থাকেন। এটা নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা লেগেই থাকে।

প্রতিটা দিন আমার কাছে একেকটা দুঃস্বপ্নের মতো। আমার কোন ঠিকানা নাই। পরিচয়ও নাই। আমি অনাথ। আমার শুধু একটা স্কুল আছে। যেখানে আমি এ্যাভরিল নামে পরিচিত। এছাড়া আমার আর কিছুই নাই৷ চাচা চাচি আমার প্রতিটা ছোট ছোট ভুলের জন্য আমায় মা*রে। আবার কাউকে জানানো নিষেধ যে আমি কে। কোথায় থাকি। স্কুলের যেকোনো সার্টিফিকেটে দেওয়া থাকে ওয়েস্টউডের একটা বাড়ির ঠিকানা। যেখানে বাড়ির কেয়ারটেকার মিস ম্যারি থাকেন। গতকাল সামনের বাসার প্রতিবেশী তাদের জিজ্ঞেস করেছে যে, আরেকটা মেয়ে কে, যে প্রতিদিন এই বাড়ি থেকে বের হয় আর ঢোকে। কিন্তু আমার কী দোষ এখানে? আমি কোথা থেকে যাওয়া আসা করব তাহলে? কিন্তু ওনারা আমাকেই মা*রলেন। শেষে আর কোন পথ না পেয়ে বাড়ির পেছনের বাউন্ডারি দেয়ালের নিচে মি.বার্টনকে বলে ছোট একটা ফোকর বানাই। সেখান থেকেই আমি যাওয়া আসা শুরু করি।

|| ২০১৩, ২৫ শে ডিসেম্বর ||
বড় দিন

আজ বাড়িতে ধুমধামে বড় দিনের পার্টি হচ্ছে। একগাদা মানুষে বাড়ি গিজগিজ করছে। আমাদের স্কুল থেকেও অনেক ছেলেমেয়ে এসেছে। কিন্তু আমার নিচে যাওয়া মানা। তারা আমাকে দেখলে প্রশ্ন করবে তাই। চিনে ফেলবে কাজেই এই তিনতলায় লফ্টে ঘর বন্দি হয়ে আছি। বড় দিনের কোন নতুন জামা, উপহার কিছুই দেয়নি কেউ৷ ওরা একটা বার হাসি মুখে তো দূরের কথা স্বাভাবিক ভাবেও কথা বলে না আমার সাথে। আমার বোনের সাথেও খুব একটা ভালো ব্যবহার করে না। কিন্তু অন্তত ওকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দেয়। অন্তত ওকে ওর দরকারের সব জিনিস এনে দিচ্ছে। সবকিছুতে সাথে রাখছে। সেটাই অনেক। অন্তত এ্যামি জানছে যে ওর একটা পরিবার আছে। বাবা, মা ভাই আছে। আমার মতো অনাথ নয় ও। কিন্তু আমি যখন দুপুরে এ্যামিকে উপহার দিতে গেলাম তখন টনি আমাকে দিতে দিল না। বলল দিল এ্যামিলি যথেষ্ট উপহার পেয়েছে। তার যা-তা উপহারের কোন দরকার নেই। কেনো এমন করে ও? কেনো মনে করে আমি ওর কাছ থেকে ওর বোন কে ছিনিয়ে নেব? আসলে তো ও নিজেই আমার বোন কে ছিনিয়ে নিয়েছে আমার কাছ থেকে। এখন প্রায় রাত একটা বাজে। আজ সকাল থেকে বাড়ির অনুষ্ঠানের আয়োজনে সাহায্য করেছি। কিন্তু ওরা হয়তো ভুলেই গিয়েছে এখানে একটা মেয়ে না খেয়ে বসে আছে। কেউ খাবার দিতে আসেনি আমাকে।

|| ২০১৪, ৩ রা অক্টোবর ||

আজ এ্যামিলির জন্মদিন ছিল। সারাটা দিন আমি আমার ছোট্ট লফ্টে বসে কাটিয়েছি। বাবা মা থাকলে কী আমার জীবনটা এমন হতো? আর এটা তো আমাদেরই বাড়ি। এক কথায় এখন আমার এবং এ্যামিলির। অথচ নিজের বাড়িতেই কাজের মেয়ের মতো এক কোণায় পরে থাকতে হয়৷ এখন স্কুলে যেতেই অস্বস্তি হয়। সেদিন বাসায় একজন মেহমান এসেছিল। আমি জানতাম না যে কেউ আসবে। তাই হঠাৎ ওদের সামনে পরে গিয়েছিলাম। পরে ওরা চলে যাওয়ার পর আমাকে বেল্ট দিয়ে মে*রেছে চাচি। দুহাত ভর্তি ক্ষ*তের দাগ। এইসব নিয়ে স্কুলেও যেতে পারি না। তাছাড়া বয়স কম হওয়ার কারণে এখনো কোথাও পার্ট টাইম জবও দিতে চায় না। আমার হাতে কোন টাকা থাকে না। চাচা চাচিও হাত খরচা দেয় না। শুধু স্কুলে পড়ার খরচটা দেয়। আমি জানি না আমি কী করব? আমার ভবিষ্যৎ কী?’

|| ২০১৫, ২ রা মে ||

আজ সকালে আমাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে ওরা। আবারও জুলস আন্টির বাসায় দিয়ে গিয়েছে। আন্টি অবশেষে রিহ্যাব থেকে ছাড়া পেয়েছে। কত আশ্চর্য না যেই না একটা সুযোগ পেল আমাকে দূর করার ওমনি বের করে দিল বাসা থেকে। আমি এমন কেন? আমি কষ্ট, অত্যাচার সহ্য করার পরও হাসিখুশি চলাফেরা করি। সবার সাথে ভালো ব্যবহার করি৷ কিন্তু সেই ব্যবহারটা তো ফেরত পাই না।

এর মাঝে ২০১৫, ১৬ এবং ১৭ সাল জুড়ে ছোট ছোট ঘটনা বা কথাবার্তা লেখা। এরপর আবারও কয়েক পৃষ্ঠা জুড়ে লেখা রয়েছে,

|| ২০১৮, ৯ ই অক্টোবর ||

আমি একটা কথা এতদিনে ভালো ভাবে বুঝেছি আর তা হলো ওই বাড়িটা এবং উডিমেয়ার ব্যবসাটার বেশির ভাগ শেয়ার আমার বাবা, মায়ের ছিল। যা তাদের মৃ*ত্যুর পর আমার পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমি প্রাপ্ত বয়স্ক না হওয়ায় অভিভাবক হিসেবে চাচা চাচি নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আসলে ওনাদের একটা শর্ত ছিল যে আমি যেন আমার হক যেকে বঞ্চিত না হই। কিন্তু সেটা তো ওনারা পালন করছে না। তাই আমি জুলস আন্টির সাথে আজ থা*নায় গিয়েছিলাম চাচা চাচির বিরুদ্ধে রি*পোর্ট করতে। এখন এই খবর পাওয়া মাত্র চাচা চাচি আমাকে আবারও বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। একটা শর্তে যে ওনারা আবারও আমার পড়াশোনার খরচ দেবে এবং ওখানে থাকতে দিবে কিন্তু আমি অভিযোগ উঠিয়ে নেব। আমিও তাই করেছি। আমি জানি ব্যাপারটা কেমন জানি। হয়তো বোকামি। কারণ জুলস আন্টি হয়তো খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। উনি বেশির ভাগ মাতাল হয়ে পরে থাকেন। কিন্তু তবুও উনি আমার সাথে ভালো ব্যবহার করেন। আমাকে আদর করেন। কিন্তু আমি শুধু আমার বাবা মায়ের বাড়িতে থাকতে চাই এবং আমার বোনের আশেপাশে থাকতে চাই।

|| ২০২০, ২১ আগস্ট ||

এখন আমার বয়স পনেরো চলছে। দেখতে দেখতে এভাবেই ভাসমান অবস্থায়, অবহেলিত এবং অত্যা*চারিত হতে হতেই বড় হয়ে যাচ্ছি। যখন অন্যদিকে আমার বয়সি ছেলে মেয়েরা হইচই, ফূর্তিবাজিতে মেতে থাকে তখন আমি সারাদিন পার্ট টাইম জব করে খেটে ম*রি। আবার বাসায় এসে স্কুলের পড়াশোনা তারওপর ওদের কটুকথা এবং মানসিক অত্যা*চার তো আছেই। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি৷ অসহ্য লাগে। আমি যাদের সাথে এক ছাদের নিচে বাস করি তাদেরকেই হয়তো আমি পৃথিবীতে সবচাইতে বেশি ঘৃ*ণা করি। তাদের মন কী পাথরের তৈরি? এতটা নি*ষ্ঠুর, লোভি এবং জ*ঘন্য মানুষ কিভাবে হতে পারে? আজকাল ওদের দেখলেই অসহ্য লাগে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। আরেকটা ব্যাপার আছে। মাঝেমাঝে আমি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখি। যেখানে আমি অদ্ভুত আচরণ করছি। আমার আশেপাশের মানুষগুলোর কাছেই আছি অথবা আশেপাশের বাস্তব স্থানগুলোতেই থাকি কিন্তু আমি আমার মতো আচরণ করি না। তারপর পরে জানতে পারি সেগুলো নাকি সত্যিই আমি করেছিলাম। আবার অনেক সময় আমি কথাবার্তা ভুলেই যাই। বা আমি নাকি এমন কাজ করি যে সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই থাকে না। এই যেমন পরশু দিনেরই ঘটনা, আমি ভোরে উঠেছি স্কুল যাওয়ার জন্য। কিন্তু হঠাৎ কোন কথাবার্তা ছাড়াই চাচা এসে আমাকে গা*লিগালাজ করা শুরু করলেন। বলতে লাগলেন, আগের দিন উনি যখন বাসায় ছিলেন না তখন আমি চাচির সাথে দুর্ব্যবহার করেছি। শুধু তাই নয় চার পাঁচটা কাঁচের প্লেট ভে*ঙেছি। এবং একটা ভা*ঙা প্লেট চাচির গলায় ধরেছিলাম। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। আমি জানি এইসব সত্যি না। উনি ইচ্ছে করে এইসব বানোয়াট কথা বলে আমাকে জব্দ করার চেষ্টা করছেন। ওনারা আর কতটা নিচে নামতে পারেন।

|| ২০২১, ৫ ই ফেব্রুয়ারী ||

আমি খুবই অদ্ভুত। হঠাৎ হঠাৎ মনে হয় আমি মোটেও কোন দয়ালু, বিনয়ী এবং নরম সরম মানুষ নই। এইসব আমার সাথে যায়ই না। টনি এবং চাচা চাচির সাথে যেমন ব্যবহার করা উচিৎ আমি ঠিক সেরকম ব্যবহারটা করি। বারবার মনে করিয়ে দেই যে যদি একবার আমি থা*নায় যাই তাহলে ওদের নিমিষে সিধে করে দিতে পারব৷ ভাবেটা কী নিজেদের? নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমাকে উল্টা পাল্টা কিছু বললে জ্বীব কে:টে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। তা হলো এইরকম ভাবনা সবসময় আমার মধ্যে আসে না। আমার মনে হয় আমি অনেক লম্বা সময় যাবৎ ঘুমিয়ে আছি। হঠাৎ করে ঘুম ভে*ঙে গেলে দেখি আগে পিছে, কয়েক দিনের মধ্যে আমি কী কী করেছি কিছুই আমি জানি না। আমি অনেক কিছুই মনে করতে পারি না আমার সম্পর্কে। এই যেমন আমার মোবাইলের পাসওয়ার্ড টা হঠাৎ করেই মিলছে না। কত কী করলাম কিন্তু কিছুতেই মনে পরল না পাসওয়ার্ড আমি কখন পাল্টেছি। কিন্তু হঠাৎ কয়েকদিন পর দেখলাম ফোনে পাসওয়ার্ড দেওয়াই নেই। কখন পাসওয়ার্ড পাল্টেছি আবার কখন পাসওয়ার্ড অফ করে দিয়েছি কিছুই আমার মনে নেই। আমার মনে হয় আমার মধ্যে আরেকটা মানুষ বাস করছে। যে আমি ঘুমিয়ে থাকলে জেগে উঠে।

|| ২০২১, ২২ শে ফেব্রুয়ারী ||

আমি হয়তো সত্যিই কোন মানসিক সমস্যায় ভুগছি যা আজকাল খুবই ঘনঘন হচ্ছে। আমি প্রতিদিন কার বেশির ভাগ ঘটনা ভুলে যাচ্ছি। ডায়েরিতে লেখা শেষ কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়ে আমি নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছি। কারণ আমার মনে নেই আমি সেগুলো লিখেছি। কিন্তু একটা কথা সত্যিই অদ্ভুত লাগলো আমার। আমার ভালো করেই মনে আছে কখন আমি পাসওয়ার্ড বদলেছি ফোনের। এবং এরপর এটাও মনে আছে যে আমিই সেটা বন্ধ করে দিয়েছি। কিন্তু আমি তো এসব ঘটনা কখনো ভুলিই নাই। তাহলে এসব আমি কেন লিখব আর লিখলামই বা কখন?

|| ২০২২, ১৬ ই এপ্রিল ||

যত দিন যাচ্ছে চাচা চাচির ব্যবহার আমার প্রতি আরোও খারাপ হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমি জানিও না আমাকে কোন দোষের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু টনি মাঝে মাঝে আমার সাথে খুবই খারাপ ব্যবহার করে। ওর মা বাবার প্রতি নাকি আমি অ*ত্যাচার করি। আরেহ কখন করলাম? আর করে থাকলেও সেই ছোট বেলা থেকে যে ওরা আমার ওপর অ*ত্যাচার করল সেটা চোখে পরল না? আমার সত্যি ওদের নিয়ে আর কিছু বলার নেই। এত বছর যখন সহ্য করে গিয়েছি আর তেমন কীই বা হবে। অবশ্য আমি বেশ কয়েক বছর ধরে টানা রাত দিন শুধু পার্ট টাইম জব করেছি৷ পড়াশোনার খরচ ওরা আর দেয় না। আমি নিজেই চালাই। কিন্তু এছাড়া আর কোন কিছুর জন্যই আমার খরচ যেহেতু লাগে না ফলে আমার প্রচুর টাকা জমেছে। গ্রেজুয়েশন শুরু করার আগেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার জন্য যথেষ্ট টাকা জমে যাবে। ভবিষ্যতে ভালো কোন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা শেষ করতে পারলে অন্তত আমি ভালো কোন চাকরি করে ভালো জায়গায় সেটেল হতে পারব।

|| সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৩ ||

আজ আমি একটা কাজের কাজ করেছি। লাইক আসলেই মনে হচ্ছে আমি আমার হক ফিরে পাবো এবার। আমি টনিকে শেষ করে দিয়েছি। আজ বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে একে একে অনেকজন এসেছে বাড়িতে। সর্বশেষ এসেছে লিজা। হুহ্ বোকা মেয়ে। ভুল সময় ভুল জায়গায়। টনি ড্রয়িং রুমে বসে ছিল। জানি না কেন জানি লিজা একটা গ্লাসে করে স্ট্রবেরি শেইক আনছিল। ও অবশ্য আমাকে দেখেনি। তবে ভাগ্য ভালো তখনই কলিং বেল বাজার কারণে লিজা গ্লাসটা বাগানের ছোট সাদা টেবিলে রেখে চলে যায়। আমিও কাজে লেগে পরি। যদিও এমন কোন পরিকল্পনা ছিল না৷ কারণ আমার জানা ছিল না লিজা এখানে এসে হাজির হবে। আমি গিয়ে হেমলক গাছের ফুল সহ একটা ছোট ডাল ছিড়*লাম। আমি আগে থেকেই হাতে গ্লাভসে পরে আছি। গ্লাস রাখা টেবিলটা লিভিং রুম থেকে টনির দেখতে পাওয়ার কথা নয়। আমি ফুলটা ছিঁ*ড়েই গুঁড়ি গুঁড়ি পাপড়ি গুলো তার মধ্যে ফেলে দিলাম এবং লিভিং রুমের সামনে দিয়ে ফিরে না গিয়ে পেছনের রান্নাঘরের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। এরপর নিজের কামরায় চলে গেলাম।’

এরপর ডায়েরির বাকি পাতাগুলো সব খালি। নিনা ডায়েরিটা বন্ধ করে কিছুক্ষণ নিরবে বসে থাকল শুধু। বারবার শুধু মনে হলো ওর নিজের জীবনের কষ্ট, জ্বা*লা যন্ত্রণা বোধহয় এ্যাভরিলের দুর্বিষহ জীবনের সামনে কিছুই না। ডায়েরির প্রতিটা পাতায় লেখা শব্দ গুলো ওর মাথায় যেন বিষাদময় ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘুরতে লাগলো। ডায়েরির শেষের পাতাগুলো এর আগের দিন রাতেই বসে পরেছে। আসলে আগের দিন রাতে যখন এ্যাভরিল ওকে উদ্ধার করতে গ্রেউড বাড়িতে টসে ঢুকেছিল, তখনই নিনা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে খু*নিটা ওই। সারা রাস্তা বসে বসে শুধু দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়েছে। তবে ডায়েরিটা পড়াটা তো জাস্ট একটা ফর্মালিটির মতো ছিল। তবে ও নিজে নিজে নিশ্চিত হলেও ডায়েরিটাই আসলে মূল প্রমাণ। এটা ছাড়া প্রমাণ করা যেত না যে এ্যাভরিলই আসল খু*নি।
.
.
.
.
.
‘আম্মু আমার কথাটা তো শোন।’ অনুনয়ের স্বরে বলল লিজা।

মিসেস মায়মুনা মাথায় দিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে সোফায় বসে আছেন। ইভান বুকে হাত বেঁধে রান্নাঘরের কাউন্টার টপের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লিজার গালে নোনা জলের দাগ বসে গিয়েছে। সেই সকালে বেনি করা চুল বেলা গড়ানোর সাথে সাথে ঢিলে হয়ে গিয়েছে। লিজা বলল,
‘আম্মু দেখো খু*নের সাথে তো আর আমার কোন সম্পর্ক ছিল না। আমি জাস্ট দু*র্ঘটনাবশত ভুল সময়, ভুল জায়গায় ছিলাম।’

‘এখানে শুধু খু*নের কথা হচ্ছে না। তুই ওই বিধর্মী ছেলেটার সাথে সম্পর্কে ছিলি। সেইসব আবার কীসব আজাইরা কাহিনি করে ভে*ঙেছিস। তারপর কী? একটা মা*র্ডার স্পটেও উপস্থিত ছিলিস। বাহ! বাহ!’ গর্জে উঠে কথা গুলো বললেন। তারপর একটু থেমে আবারও চেঁচিয়ে বললেন,
‘আমি কী এমনি এমনি তোকে একা কোথাও যেতে দিতে চাই না? সুন্দর তো গেলি বান্ধুবিদের সাথে স্লিপ ওভারে। সেখানে কী হলো? কোন সাহসে তুই রাতের বেলা বেরিয়ে আবার গ্রেউড বাড়ি গেলি? হ্যা!?’

লিজা আবারও ডুকরে কাঁদতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর মায়মুনা বেগম ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন। গর্জে উঠে ঘোষনা দিলেন,
‘যথেষ্ট হয়েছে। তুই এবার বারাবাড়ির সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিস। তোকে এবার সিধা কিভাবে করতে হয় আমি দেখব।’ বলে ইভানের দিকে তাকালেন। বললেন,
‘ইভান আমার আর লিজার জন্য বাংলাদেশের দুটো টিকিট কাট৷ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে নিয়ে এখান থেকে বের হবো আমি।’

ইভান সোজা হয়ে দাঁড়াল। চোখ বড় বড় করে বলল,
‘আম্মু তুমি সিরিয়াস?’

‘অবশ্যই।’

লিজা তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
‘না না না! আমি এখান থেকে যাব না। আম্মু প্লিজ! তুমি যা বলবা আমি তাই করব। আমি ভাইয়ার সাথে স্কুল যাব, ভাইয়ার সাথে বাসায় আসব। এছাড়া আর কোথাও যাব না। আই প্রমিজ। কিন্তু প্লিজ ওই দেশে আমাকে নিয়ে যেও না৷ আমি ওখানে থাকতে পারব না।’

‘তুই এখন থেকে আমার সাথে ওখানেই থাকবি। ওখানেই পড়াশোনা করবি। এটাই আমার শেষ কথা।’

‘তুমি বলছো টা কী? আশ্চর্য তো! তোমরা কিভাবে জাস্ট বাড়িঘর ছেড়ে দিয়ে ওখানে গিয়ে থাকতে পারো? আমাদের কী হবে? আমি আর বাবা কী এখানে, এই বিশাল বাড়িতে একা থাকব?’ উত্তেজিত কন্ঠে বলল ইভান।

‘হ্যা। এটাই ওর শাস্তি এবং তোরও শাস্তি।’

‘আমার শাস্তি মানে? আমি কী করেছি?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ইভান।

‘তোর দায়িত্ব ছিল তোর বোনের খেয়াল রাখা। সেখানে ও নাকি তোর তথাকথিত দুশমনের গার্লফ্রেন্ড ছিল৷ সে নাকি আবার তার মা*র্ডারের সময় উপস্থিতও ছিল। এইসব তুই জেনেও আমাকে জানাসনি কেন!?’

ইভান মাথা নত করে নিশ্চুপ রইল। মিসেস মায়মুনা বেগম গটগট করে হেঁটে নিজের কামরায় চলে গেলেন। লিজা চোখের পানি মুছে বিষন্ন চেহারায় করিডর ধরে এগিয়ে গিয়ে নিজের কামরায় ঢুকলো। ইভান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। নিজের কামরায় গিয়ে নিজের ল্যাপটপ টা খুলে বসল। কিছুই ভালো লাগছে না। মনপর মধ্যে দারুণ অস্থিরতা ও অশান্তি কাজ করছে। বাসাশ এসব চললে কারই বা মন ভালো থাকে?
বিছানায় আরামসে পা মেলে দিয়ে বসে আছে। মোবাইল থেকে গত কয়েক মাসের তোলা ছবিগুলো ল্যাপটপে ট্রান্সফার করবে। সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তোলা সবগুলো ছবি ঘেটেও নিনার সঙ্গে দু তিন চারটে ছবি পেল৷ অবাক হয়ে ভাবল,
‘বাহ কতদিন হয়ে গেল নিনার সাথে পরিচয়। সম্পর্কের বেশ কয়েক দিন হয়ে গেল অথচ ছবি দেখো, খুঁজেই পাওয়া যায় না।’
ঘাঁটতে ঘাঁটতে ওর টনির সঙ্গে তৈরি করা সেই প্রোজেক্টের একটা ছবি পেল। সেটা খুললো৷ সেদিন বিকেলে প্রোজেক্টে ঠিক আর কী কী এড করা দরকার সে বিষয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য ইভান ও টনি একে অপরকে প্রোজেক্টের ছবি পাঠিয়েছিল। নিজের ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর টনির পাঠানো ছবিটা খুললো। ছবিটা মোবাইল আড়াআড়ি করে প্রজেক্টের পাশাপাশি রেখে তোলা হয়েছে। যার কারণে প্রোজেক্টের পাশাপাশি দূরের এটা সেটাও দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ কিছু একটা অদ্ভুত চোখে পরল। ছবিটা জুম করে দেখল। প্রোজেক্টের সামনে দেখা যাচ্ছে সোফার হাতল। তারপর ওপাশে আরেকটু দূরে বাগানের খোলা দরজা। বাগানে কারোও আংশিক ছবি এসেছে। ছবিটার উরুর উপরের অংশ কাটা পরেছে। শুধু কব্জিটুকু দেখা যাচ্ছে। হাতে লাল রঙের গ্লাভস পরা। ইভান চোখ ছোট করে ল্যাপটপের স্ক্রিনে প্রায় ঢুকেই যাচ্ছে ছবিটা দেখার জন্য। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভাবল,
‘মেয়েটার হাতে থাকা ডালটা তো মনে হচ্ছে হেমলক।’
সাথে সাথে লিজাকে ডাক দিল। ক্ষণকাল পরেই লিজা ধীর পায় ইভানের কামরায় প্রবেশ করল। বিরক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
‘কী হয়েছে?’

‘এদিক আয়।’ উৎকন্ঠিত চিত্তে বলল। লিজা এগিয়ে এসে বিছানার পাশে দাঁড়াল। ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। তারপর ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
‘কী? এই ছবি কেন দেখাচ্ছ?’
ইভান ছবিতে সেই মেয়েটার আংশিক ধারণকৃত অংশটা দেখাল। লিজা ঝুঁকে সেটায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর বিস্মিত নয়নে ইভানের দিকে তাকাল।

ইনশাআল্লাহ চলবে।