মনোহারিণী পর্ব-২৮+২৯

0
413

#মনোহারিণী
লেখনীতে—ইলোরা জাহান ঊর্মি

২৮.
আমাদের জীবনে এমন কিছু মানুষ থাকে যারা অনেকটা জাদুকরের মতো। এই মানুষগুলো আমাদের মন পড়তে জানে। তুড়ি মে’রে মন ভালো করে দেওয়ার মতো অসাধারণ ক্ষমতাও এদের আছে। এদের থেকে নিজেকে লুকানোর চেষ্টাটুকুও করা যায় না। কিন্তু এই মানুষগুলো যখন হুটহাট অপরিচিত আচরণ করে, তখনকার সময়গুলো হয় ভয়’ঙ্কর। কারণ এই জাদুকররা অনায়াসে অন্যের মন পড়তে জানলেও, এদের মন পড়ার সাধ্য কাউকে দেয় না। এ কারণে তাদের অপরিচিত আচরণ কেবল এবং কেবলই আমাদের পী’ড়া দেয়। সেই পী’ড়া থেকে বেরোনোর সাধ্যটুকুও আমাদের থাকে না। আমার জীবনেও এমনই এক জাদুকর আছে। সে তাজ। সে খুব অনায়াসেই তার স্থান আমার মাথায় করে নিয়েছে। এ তার রাজত্ব। এই রাজত্বের বলে সেও আজ আমায় পী’ড়ায় আক্রা’ন্ত করে নিজে লাপাত্তা হয়েছে। গতকাল গোটা রাত আমি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে কা’টিয়েছি। মাথায় শুধু একটা আর্তনাদই ঘুরেছে, উনি আমায় অবিশ্বাস করলেন! ভোরের দিকে একটুখানি ঘুমিয়েছিলাম। তাতে কি আর রাতের ঘুম পূরণ হয়? ফলস্বরূপ আবার সেই মাথার য’ন্ত্রণার সূচনা। সহ্য করতে না পেরে সকালে রান্নাঘরে উঁকি দিলাম তাড়াতাড়ি চা পাবার আশায়। আম্মি আমাকে সূক্ষ্ম চোখে দেখে বলল,
“চোখ-মুখ অমন দেখাচ্ছে যে? তোমার কি মাথাব্যথা করছে?”
আমি অসহায় মুখে হ্যাঁ-সূচক মাথা ঝাঁকালাম। আম্মি কুলসুম আপাকে তাড়া দিলেন আমাকে চা দেওয়ার জন্য। তারপর আমাকে বললেন,
“কী একটা অভ্যাস হয়েছে মেয়েটার! সকালে ঘুম থেকে উঠেই চা। যাও, চুপচাপ বসো। জানি তো চা খেলে ঠিক হয়ে যাবে।”
আমি ডাইনিং টেবিলে চুপচাপ বসে রইলাম। এরমধ্যেই তাজ ভাই রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা চললেন রান্নাঘরে। আম্মিকে ডেকে বললেন,
“আম্মি, চা/কফি কিছু পাওয়া যাবে? আমি বেরোব।”
“দিচ্ছি, একটু অপেক্ষা কর। এত তাড়া কিসের?”
“দেরী করা যাবে না।”
এত সকালে উনি বেরোনোর জন্য তাড়া দেখাচ্ছেন কেন জানা নেই আমার। আম্মিও কোনো প্রশ্ন করছে না। অফিসে তো এখন যাওয়ার সময় না। তাহলে? কুলসুম আপা আমার জন্য চা নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসতে নিতেই তাজ ভাই চায়ের কাপটা নিজে নিয়ে নিলেন। আম্মি বলল,
“ওটা ইলোর। তোরটা দিচ্ছি আমি।”
উনি উত্তর দিলেন,
“চায়ের কাপে তো নাম লেখা নেই। আমার তাড়া আছে।”
কুলসুম আপা বলে উঠলেন,
“ছোডো আফার অনেক মাতায় ব্যতা। ওনারডা ওনারে দিয়া দেন। আহারে! আফার চোখ-মুখ কেমন টান ধরছে, দেহেন না?”
উনি সরু চোখে এক পলক আমাকে দেখলেন। আমি ওনার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। চোখাচোখি হলো এক মুহূর্তের জন্য। সঙ্গে-সঙ্গেই উনি চোখ সরিয়ে চলে যেতে-যেতে বললেন,
“কুলসুম আপা, নিজের ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে গিয়ে যেচে রাত জাগলে তো যে কারোরই মাথা ব্যথা করবে। এরজন্য চা নয়, পছন্দের বরের ব্যবস্থা করুন।”
আম্মি চেঁচিয়ে উঠল,
“ছেলে পেয়েছি আমি একটা! নিজের ভবিষ্যত নিয়ে হেলদোল নেই, সে আরেকজনের ভবিষ্যত নিয়ে খোঁচা মা’রে। বিদেশ-বিভূঁই চষে এসেও তার কোনো মেয়েকেই চোখে লাগল না। এর পেছনে এত মেয়ে ঘুরল কী করতে? নিরামিষাশী নিরামিষই চায়, আজকাল তারও খোঁজখবর নেই।”
কথাগুলো আমার কানে এলেও তখন আমার দৃষ্টি অদূরের ওই বদ্ধ দরজায়। টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে আমি তাজ আর শ্রেয়ান নামক দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বন্ধুত্বের হিসাব মিলাতে ব্যস্ত। কীভাবে কী হয়ে গেল? অদ্ভুত! আম্মি আবার চা নিয়ে এসে আমাকে দিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“বেশি খারাপ লাগছে?”
আমি সোজা হয়ে বসে বললাম,
“না আম্মি, ঠিক হয়ে যাবে।”
চা শেষ করেও আমি একই জায়গায় ঠাঁয় বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পরেই আবার তাজ ভাই বাইরে এলেন। এবার ওনাকে দেখে আমি দৃষ্টি সরালাম না। প্রশ্নভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। উনি কোনোরকমে রেডি হয়ে বেরিয়েছেন। তার থেকেও বড়ো ব্যাপার হচ্ছে ওনার কাঁধে ব্যাগ ঝুলানো। উনি কোথাও যাওয়ার সময় ওই ব্যাগে জামা-কাপড় নেন। তাহলে সত্যিই উনি কোথাও যাচ্ছেন? কিন্তু ওনার তো অফিস আছে। উনি আম্মিকে ডাকলেন। আম্মি ছুটে এসে হা-হুতাশ করে বলল,
“না খেয়ে কোথায় যাচ্ছিস তুই? বোস, রুটি করা হয়ে গেছে। কুলসুম, তাজের খাবার রেডি করো।”
তাজ ভাই বাঁধা দিয়ে বললেন,
“না আম্মি, এখন খাওয়ার ইচ্ছে নেই। আমি বাইরে থেকে খেয়ে নিব।”
“তুমি কত যে খাবে তা কি আমার অজানা? কাজের আগে খাবার। ঠিকমতো না খেলে বিছানায় পড়ে থাকবে। তখন দেখা যাবে কীভাবে খেয়ে, না খেয়ে কাজের পেছনে ছোটো।”
উনি আম্মিকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“তোমার ছেলে এমনিতেই ফিট আম্মি। এত চিন্তার কিছু নেই। আমি সময়মতো খেয়ে নিব। আব্বুর সাথে দেখা করে আসি।”
উনি নূর আঙ্কেলকে খুঁজতে ঘরের দিকে হাঁটা দিলেন। আম্মিও চেঁচাতে-চেঁচাতে ওনার পিছু নিলেন। আমি এক চুলও নড়লাম না। মূর্তির মতো এক জায়গাতেই বসে কাহিনি দেখতে লাগলাম। মিনিট তিনেক পর মা-ছেলের সাথে নূর আঙ্কেলও বেরিয়ে এলেন। বাবা-মা দুজনেই খেয়ে যাওয়ার জন্য ছেলেকে তোষামোদ করছেন। কিন্তু ছেলে এখন খাবেই না। তার রুচি আজ চান্দের দেশে পাড়ি জমিয়েছে। নূর আঙ্কেল আর আম্মির থেকে বিদায় নিয়ে উনি জেনিফার ভাবির থেকেও বিদায় নিলেন। শেষমেষ কুলসুম আপাকেও বাদ দিলেন না। অথচ আমি ছিলাম চোখের সামনে বসে থাকা এক অদৃশ্য মানবী। আমাকে যেন খালি চোখে দেখা যায় না। দেখতে হলে দূরবীন অতীব জরুরী। ডিটেকটিভ দৃষ্টিতেও এই অদৃশ্য মানবী ধরা পড়ল না। দেখেও না দেখার ভান করে দিব্যি বেরিয়ে পড়লেন নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। আমার গত রাতের য’ন্ত্রণাগুলোতে অভিমানের মরিচা ধরল। এ মরিচা ছাড়ানোর উপায়ও আমার জানা নেই। ভেবেছিলাম আম্মিকে জিজ্ঞেস করব উনি কোথায় যাচ্ছেন। কিন্তু এরপর আর সেটা জিজ্ঞেস করার ইচ্ছেটুকুও থাকল না। ইগো কারোর একার নয়। রাগ, অভিমান, অভিযোগও কারোর একার নয়। ওনার থাকলে আমারও এসব সমানভাবেই আছে। কিন্তু আফসোস, উনি শুধু নিজেরটাকেই গুরুত্ব দিয়ে অপরজনেরটা পায়ে ঠেলে দিয়েছেন। তবে বেশ, থাকুক যে যার মন নিয়ে। যেখানে আমার দোষ নেই, সেখানে আমি দায়বদ্ধও নই। আজ আর ভার্সিটিতে যাওয়ার ইচ্ছেও হলো না। জুম্মান ভাইয়া আমাকে ডাকতে এলে আমি শরীর খারাপের কথা বললাম। ভাইয়া খুব কৌতুহল নিয়ে বলল,
“এই ইলো, তুই শ্রেয়ান ভাইয়াকে নিয়ে কিছু ভেবেছিস?”
আমি ভাবলেশহীন উত্তর দিলাম,
“হঠাৎ এসব জিজ্ঞেস করছেন কেন? আমি তো যা বলার আগেই বলে দিয়েছিলাম।”
“তাহলে শ্রেয়ান ভাইয়া এখনও যে তোর পেছনে পড়ে আছে?”
“জানি না ভাইয়া। আমি একবার ‘না’ বলে দিয়েছি। আমার ‘না’ আর ‘হ্যাঁ’ হবে না।”
“বুঝি না ভাই তোদের কাহিনি। আমি তো ভেবেছিলাম গতকাল শ্রেয়ান ভাইয়া এত আয়োজন করে তোর বার্থডে সেলিব্রেশন করেছে তোকে খুশি করার জন্য। যাতে তুই ওনার প্রতি ইমপ্রেসড হোস।”
আমি বেশ অবাক হলাম। কারণ এই বিরাট খবরের বিন্দুমাত্র আমার জানা ছিল না। বিস্ময় নিয়ে বললাম,
“উনি বার্থডে সেলিব্রেশন করেছে মানে?”
“কেন, তুই এখনও জানিস না?”
“না তো।”
“তোর বার্থডে সেলিব্রেশন প্ল্যানিং আমরাই করছিলাম। শ্রেয়ান ভাইয়াকেও বলেছিলাম। তখন উনি আমাদের প্ল্যান বাদ দিয়ে নিজে একাই সব আয়োজন করেছেন। আমাদের শুধু সাথে রেখেছেন, আর কাকিকে দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করিয়েছেন। তখন আমাদের বলেছিলেন তোকে না জানাতে, তাই জানাইনি।”
“তাজ ভাই জানত?”
“নাহ্। তাজ ভাই তো সেলিব্রেশনের আগে জেনেছে। তোর মতো উনিও প্রথমে ভেবেছিলেন সব আমরাই করেছি। পরে তুই আসার আগে শ্রেয়ান ভাইয়া-ই ওনাকে সত্যি কথা বলে দিয়েছে। আমি আরও ভাবলাম তোর মন গলবে।”
“মন গলার মতো কিছুই হয়নি ভাইয়া।”
“তোর মতো নিরামিষদের মন গলবেও না। থাক, আমি আসি।”
“আচ্ছা।”
জুম্মান ভাইয়া চলে যাওয়ার পর আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর মিলল। গতকাল শ্রেয়ান ভাইয়া বার্থডে সেলিব্রেশনের আয়োজন করেছিলেন বলেই তাজ সাহেবের কোনোরকম হেলদোল ছিল না। এখন সবচেয়ে বড়ো প্রশ্নই রয়ে গেছে। শ্রেয়ান ভাইয়া কবে, কখন এবং কেন তাজ ভাইয়ের কাছে মিথ্যে কথা বললেন? নানা চিন্তার মাঝে আমি গতকালের সব গিফট নিয়ে বসলাম দেখার জন্য। গতকাল ওনার ওমন আচরণের পর আর এসব ছুঁয়ে দেখাও হয়নি। সব গিফটের মাঝে আমার দৃষ্টি পড়ল বেশ বড়ো একটা বক্সের ওপর। এটা কে দিয়েছে? এটা তো গতকাল দেখেছি বলে মনে পড়ে না। সবাই তো আমার হাতেই গিফট তুলে দিয়েছিল। খুব কৌতুহল নিয়ে আমি ওই বক্সটাই আগে খোলার সিদ্ধান্ত নিলাম। কেন জানি মনের ভেতর খচখচ করছে। দ্রুত হাত চালিয়ে প্যাকেট খুললাম। ভেতরের জিনিসগুলো দেখে কিছু মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলাম। দুইটা শাড়ি, চার মুঠো চুড়ি, শাড়ির সাথে মিলিয়ে দুই সেট গহনা আর তিনটা নতুন বই। ফুল প্যাকেজ। জিনিসগুলো দেখামাত্রই যেন আমি প্রেরকের নাম জেনে ফেললাম। কেউ যেন আমার কানে-কানে বলে গেল সেই নাম। জিনিসগুলো ছুঁয়ে দেখতে-দেখতে সবকিছুর সাথে একটা চিরকুটও পেলাম। মন অস্থির হয়ে উঠল চিরকুটের ভেতরের কথাগুলো পড়ার জন্য। দ্রুত চোখ বুলাতে লাগলাম।

মনোহারিণী,
কে জানত এই বাক্সে মুড়ানো অনুভূতি তোমার হাতে পৌঁছানোর আগেই সেই অনুভূতি স্থানান্তর হয়ে যাবে? হয়েই যখন গেছে, তখন তো আর অনুভূতি ফিরিয়ে আনা যাবে না। অনুভূতি মনের ব্যাপার। ওসবে কারোর জোর চলে না। আমি কখনোই তোমার ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চাইনি। আজ সব কথা থাক, তোমার জীবনের সুখ কামনা করি। যার জন্য বাক্স ভর্তি অনুভূতি রেখেছিলাম, তাকে সেসব না দিয়ে তো আর ফেলে দেওয়া যায় না। সব মূল্যবান উপহারের মাঝে এটাও না হয় রেখে দিয়ো দোষী এক মানুষের শেষ স্মৃতি হিসেবে। ভালোবাসা নিয়ে খুব বেশি ভালো থাকো আমার ছোট্ট হরিণী।
ইতি
থাক, আজ আর কিছু মনে পড়ছে না

এ চিরকুট একবারের বেশি দুবার পড়ার সাহস আমার হলো না। অবাধ্য মন আর চোখ জোড়া বাঁধ সাধল। সব বাদ দিয়ে তখনই শ্রেয়ান ভাইয়ার নাম্বারে কল করলাম।
উনি রিসিভ করলেন না। পরপর তিনবার কল করার পরও উনি রিসিভ করেননি। তারপর ম্যাসেজ করলাম যে, ওনার সাথে কথা বলতে চাই। সঙ্গে-সঙ্গেই ওনার উত্তর এল।
“যা বলার ম্যাসেজেই বলো। আমি টিমের সঙ্গে আছি। জানোই তো আমরা নরসিংদী যাচ্ছি।”
ওনার এই ম্যাসেজেই জানতে পারলাম ওনারা নরসিংদী যাচ্ছেন। একসঙ্গে যখন যাচ্ছেন নিশ্চয়ই কাজেই যাচ্ছেন। ওসব চিন্তা বাদ দিয়ে পুনরায় ম্যাসেজ করলাম।
“আপনি তাজ ভাইকে কী বলেছেন?”
“কোন ব্যাপারে?”
“আপনার আর আমার ব্যাপারে। আপনি মিথ্যে কথা কেন বলেছেন? আপনার থেকে কখনও এমনটা আশা করিনি ভাইয়া।”
“আমার উত্তর কাজে পাবে, মুখে নয়।”
ওনার কথাটা আমার কাছে সুবিধার মনে হলো না। তবু স্বাভাবিকভাবেই লিখলাম,
“আপনার কথা, কাজ কোনোটাই আমি বুঝতে পারছি না ভাইয়া। দয়া করে বুঝিয়ে বলবেন? হঠাৎ এসবের মানে কী?”
“বুঝতে হবে না ইলোমিলো। বললাম তো সব উত্তর আমার কাজেই পেয়ে যাবে। একটু অপেক্ষা করতে হবে। এসবের জন্য আমায় বিরক্ত কোরো না। আমি ব্যস্ত আছি।”
শ্রেয়ান ভাইয়া বলছেন ওনাকে আমি বিরক্ত করছি। বিশ্বাস করতেও যেন আপত্তি হচ্ছে। আমি আর ওনাকে একটা ম্যাসেজও করলাম না। এরপর ফোন করলাম তাজ ভাইকে। উনিও রিসিভ করলেন না। কল তো দূর, উনি ম্যাসেজের উত্তরও দেননি। ইচ্ছে করেই এমন করছেন। জানি না কবে ফিরবেন। তবে এটুকু নিশ্চিত, না ফেরা অবধি এসব উড়ে আসা ঝামেলার নিষ্পত্তি হবে না। অপেক্ষা ছাড়া গতি নেই।

চলবে, ইন শা আল্লাহ্।

#মনোহারিণী
লেখনীতে—ইলোরা জাহান ঊর্মি

২৯.
গ্রামের সকাল আর শহরের সকালের মাঝে বিরাট ব্যবধান। শহরের সকাল শহরের মতোই ব্যস্ততা দিয়ে শুরু হয়। সেখানে সকাল মানেই বিরক্তিকর কোলাহলের সূচনা। অপরদিকে গ্রামের সকাল মানেই অন্যরকম এক স্নিগ্ধতা আর ভালোলাগার মুহূর্ত। এখানে নেই কোনো কোলাহল, নেই ন্যূনতম বিরক্তি। বহুদিন পর আমি এই ভীষণ প্রিয় মুহূর্ত অনুভব করার সুযোগ পেয়েছি। তাজ ভাই ঢাকার বাইরে চলে যাওয়ার পরদিনই কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া হুট করে নূর আঙ্কেল আমাদের নিয়ে শরীয়তপুর চলে এসেছে। শরীয়তপুর সদর অর্থাৎ নূর আঙ্কেলের বাড়িতে আমি ছিলাম দুদিন। তারপর আব্বুকে খবর দিয়ে গতকালই গোসাইরহাট চলে এসেছি। শরীয়তপুর ফিরলেও, নিজের এলাকায় পা না রাখা অবধি যেন আমি স্বস্তিই পাচ্ছিলাম না। কেবল মনে হচ্ছিল আম্মুর কাছে এলেই আমি ঠিক থাকব। আমার মানসিক দুরবস্থার ঔষধ শুধু এই মানুষটার কাছেই আছে। গোসাইরহাট ফিরে নিজের সবচেয়ে আপন মানুষগুলোর ভিড়ে আমি সত্যি-সত্যিই নিজের মানসিক টানাপোড়েন কিছু সময়ের জন্য হলেও ভুলে গিয়েছিলাম। এসে হতে গল্প আর আদর, আহ্লাদেই মেতে আছি যে। সকালের আলো আবছা হয়ে ছড়িয়ে পড়ার পরেই আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম আমার প্রিয় মুহূর্তের প্রিয় গন্তব্যে। সেই নদীর পাড়ের জায়গাটা, যেখানে সকালের সমস্ত সৌন্দর্য উপচে পড়ে। খালি পায়ে নদীর পাড়ে অনেকটা সময় হাঁটাহাটি করেছি, পানিতে পা ভিজিয়েছি। তারপর নদীর পাশের মাটির টিলায় দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় উপভোগ করেছি। সূর্য ওঠার পরেও আমি ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। এক মাস আগেও এই উঁচু মাটির টিলায় দাঁড়ালে নিচের সবুজ ঘাসে ঢাকা ইটের ভাটা চোখে পড়ত। কিন্তু এখন সেই ঘাস নেই। ইট বানানোর কাজ শুরু হবে বলে পরিষ্কার করা হচ্ছে। হয়তো দু-এক দিনের মধ্যে কাজ শুরুও হয়ে যাবে। তারপর থেকে আগামী ছয় মাস যখন-তখন এ মুখো হওয়া যাবে না। চব্বিশ ঘন্টা লোকজনের সমাগম থাকবে যে। সবুজ ঘাসে ঢাকা ইটের ভাটা কেবল ছয়টা মাস নীরবতা ধরে রাখতে পারে। সেই ছয় মাসই আমার কাছে স্বস্তির। সকালটা মিষ্টি থাকে। বাকি ছয় মাস সকাল কা’টে হয় কম্বলের নিচে গুটিসুটি মে’রে পড়ে থেকে, নয়তো বাড়ির পেছনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে দূর থেকে সূর্যোদয় উপভোগ করে। কখনও আবার শীতের সকালে লোকজনের ভিড় কম দেখলে নদীর পাড়েও যাওয়া হয়, তবে তা খুবই কম। সামনের সময়টার কথা ভেবে আমার খারাপ লাগল। এই জায়গাটা যদি সারা বছর এমনই নীরব থাকত, তবে কতই না ভালো হত। একসময় খেয়াল হলো সূর্যোদয়ের পরপরই দৈনিক পারাপারের নৌকা নিয়ে মাঝি নদীতে নেমে পড়েছে। দ্রুত হাত চালিয়ে বৈঠা বেয়ে সে নদীর ওপারে ছুটেছে। এই সময়ে নদীর ওপারে সব কৃষক শ্রেণির লোকজন নিজেদের চাষ করা মাছ, সবজি নিয়ে নৌকার অপেক্ষা করে। বাদ যায় না নারী বা ছোটো শিশুরাও। অভাবের তাড়নায় তাদের মাথায়ও ঝাঁকা তুলে দেওয়া হয়। এপারে এসে তারা ওসব আমাদের এলাকার বাজারে বিক্রি করে। বিক্রয়ের সেই টাকা দিয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় কেনাকা’টা করে তবেই আবার নদীর ওপারে ফিরে যায়। আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল। নদীর টলমলে পানি দেখতে-দেখতে কিছু গভীর ভাবনায় ডুব দেওয়ার ইচ্ছে জেগেছিল। কিন্তু ইতোমধ্যেই নদীর এপারে তিন-চার জন লোক এসে দাঁড়িয়েছে। তারা আগেভাগেই তাজা মাছ বা সবজি কেনার জন্য অপেক্ষা করছে। এতে করে তাদের আর কষ্ট করে বাজারে ছোটা লাগে না। নিজের ইচ্ছেকে আর প্রাধান্য দিলাম না। চুপচাপ বাড়ি ফিরে এলাম। বাড়ি ফিরে বসতেই আম্মু চা দিলো। আমি মুচকি হেসে চা নিলাম। আম্মু বলল,
“এই অভ্যাসটা কিন্তু সুবিধার না। কমানোর চেষ্টা কর।”
“চেষ্টা করতে গেলে তো বিছানায় পড়ে থাকতে হবে।”
আম্মু ছোটো একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“তোর আব্বু ঠিকই বলে। তার মেয়ে সব দিক থেকেই উলটো স্বভাবের।”
“আব্বু কি আর এসব নতুন বলে?”
“ঠিকই বলে। নিজের শরীরের প্রতি তোর যত্ন নেই। দিন-দিন শুধু অবনতিই হচ্ছে।”
“এটাও নতুন কথা না। পুরোনো কথা ছাড়ো এবার, নতুন কিছু বলো।”
আম্মু কপট বিরক্তি দেখিয়ে বলল,
“নতুন কথা তোর বাপের থেকে শোন গিয়ে।”
“মোটেও না। আব্বু কী বলবে তা আমার মুখস্থ আছে। তুমি যেটা বললে, সেটাই বলবে। কারণ এটা তো তোমার কথা না, আব্বুর কথা। আব্বুর মুখে শুনে-শুনে আমার মতো তোমারও মুখস্থ হয়ে গেছে।”
“তোর আব্বু চিন্তায় থাকে বলে ওসব বলে। আমার মতো মুখে তুলে খাওয়াতে তো পারে না।”
“তবু আম্মু, আমার মাঝে-মাঝে কী মনে হয় জানো? মনে হয় চব্বিশ ঘন্টা আমাকে ঠেসে-ঠেসে খাওয়ানোই আব্বুর জীবনের প্রধান লক্ষ্য।”
আম্মু হেসে ফেলল। কথায়-কথায় আমি চা শেষ করে কাপটা আম্মুকে ফেরত দিলাম। আম্মু জিজ্ঞেস করল,
“আজ নাশতা করতে কয়টা বাজবে?”
আমি হেসে উত্তর দিলাম,
“দেরী আছে। এত সকালে খেতে ভালো লাগে না।”
“জানতাম, সবই তো বদ অভ্যাস। ওই যে এসেছে, এবার বুঝবি।”
বাইরে আব্বুর হাঁক শোনা যাচ্ছে। বাজার করে ফিরেছে। ঘরে পা রেখে আমাকে সামনে পেলেই নির্ঘা’ত খাওয়া নিয়ে পড়বে। তাই আগেভাগেই কে’টে পড়লাম। আজ পর্যন্ত এনাকে কোনোভাবেই বুঝানো সম্ভব হয়নি খুব সকালে নাশতা করলে আমার শরীর খারাপ লাগে। আম্মু এটা বোঝে, তাই জোর করে না। নিজের রুমে গিয়ে ছোটো একটা ঘুমের আশায় কাঁথার নিচে ঢুকে পড়লাম। জেমি কাঁথার নিচে বেঘোরে শান্তির ঘুম দিচ্ছিল। আমার টের পেয়ে নড়েচড়ে চোখ খুলে তাকিয়ে আছে। আমি তাকাতেই শুয়ে-শুয়ে মিয়াও, মিয়াও শুরু করে দিয়েছে। হয়তো বুঝাতে চাইছে তার ঘুমে ব্যা’ঘাত ঘটিয়ে আমি বিরাট অ’ন্যায় করে ফেলেছি। এতে সে ভীষণ বিরক্ত। আমাকে পানিশমেন্টও দিতে পারে। আমি হেসে ওর গলা চুলকে দিলাম। টেনে এনে হাতের বাহুতে শুইয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। ব্যস, জেমি সাহেব ভদ্র বাচ্চাটির মতো চোখ বন্ধ করে পুনরায় ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমিও ঘুমানোর জন্য চোখ বন্ধ করলাম। কিন্তু ঘুমের বদলে চোখে ধরা দিলো কী সব অগোছালো দৃশ্যপট। শুভ্র পাঞ্জাবি পরিহিত সেই সুদর্শন পুরুষ। সৌন্দর্যে হারিয়ে যাওয়ার আগেই তার থমথমে মুখোভাব আর কথার বি’ষ বাণ হৃদপিন্ড এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিলো। বিধ্ব’স্ত করে দিলো বুকের কোণের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো। বি’ষাক্ত কল্পনার তাড়নায় চোখ বন্ধ রাখাও অসহ্যকর হয়ে উঠল। কিন্তু চোখ মেলতেও মন সায় দিচ্ছে না। চোখ মেললেই যে ওই মুখটা হারিয়ে যাবে। যন্ত্র’ণাগুলো তাজা হয়ে উঠবে। কিন্তু কারো ধাক্কা খেয়ে শেষে কল্পনার জগত থেকে ছিটকে পড়তে হলো। চোখ খুলে দেখলাম ইকরা। চরম বিরক্তি নিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকাতেই ও বলল,
“মা ডাকে।”
“কেন?”
“গিয়ে দেখো।”
আর কোনো প্রশ্ন করার আগেই ও ছুট লাগিয়ে উধাও হয়ে গেল। বিছানা ছাড়তে গিয়ে বরাবরের মতো অলসতা আমায় আঁকড়ে ধরল। কাঁথার ওম ছেড়ে নড়তে ইচ্ছে করছে না। তাই টাইট হয়ে সেভাবেই পড়ে রইলাম। কিন্তু শান্তি অর্জন করা কি আর এত সোজা। শান্তির মা-বাপকে বালিশ চা’পা দিয়ে হ’ত্যা করে দিলো আমার হতচ্ছাড়া ফোনটা। গতরাতে ফোনটা ভাইব্রেশন করে বালিশের নিচে রেখে দিয়েছিলাম। ফোনের ভোঁ-ভোঁ শব্দে আমার কানের ভেতরেও ভোঁ-ভোঁ করে উঠল। চোখ, মুখ কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে আমি ফোন বের করলাম। স্ক্রিনে ‘সায়মা আপু’ নামটা দেখে নিমেষেই সমস্ত বিরক্তি উবে গেল। রিসিভ করে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করলাম। প্রথমদিকে ঠিকঠাক কথা বললেও সায়মা আপু যখন জিজ্ঞেস করল, ‘তাজের কী অবস্থা রে? বেশি ইনজুরড হয়েছে? কেউ ফোনই তুলছে না।’ আমি সঙ্গে-সঙ্গে কথাটা ধরতে পারলাম না। তবু বুকের ভেতর অজানা এক আতঙ্কে দুরুদুরু করতে লাগল। তড়াক করে উঠে বসে উলটো প্রশ্ন করলাম,
“কিসের ইনজুরি?”
“কেন, তুই জানিস না?” সায়মা আপুর কন্ঠে বিস্ময়।
“কই? কেউ তো আমায় কিছু বলল না। কী হয়েছে?”
“কিছুক্ষণ আগে সৌরভ ফোন করেছিল। বলল তাজ ইনভেস্টিগেশনে গিয়ে কীভাবে যেন ইনজুরড হয়েছে। তারপর থেকে আমি আন্টি-আঙ্কেলকে ফোন করে চলেছি। কেউ রিসিভই করছে না। তাই ভাবলাম তোকে ফোন করলে হয়তো কোনো খবর পাওয়া যাবে। অথচ তুই তো কিছুই জানিস না।”
আমি মাথার মধ্যে তখন ওভার থিংকিংয়ের তোলপাড়। ‘ইনজুরি’ শব্দটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। কেবলই মনে হচ্ছে ওনার অবস্থা শোচনীয়। কী না হয়ে গেছে! নিজেকে ধাতস্থ করে আমি মৃদু স্বরে বললাম,
“আপু, আমি একটু পরে ফোন করছি। আব্বু ডাকছে।”
“এই তুই ঠিক আছিস? সরি রে, হঠাৎ করে খবর দিয়ে তোর মন খারাপ করে দিলাম, না?”
“না আপু, আমি ঠিক আছি। পরে ফোন করব তোমায়।”
নিজের কথাটায় কেন জানি নিজেই ভরসা পেলাম না। সত্যিই কি ঠিক আছি? সায়মা আপুর ফোন পেয়ে না হেসেছিলাম? ফোনটা রেখে রুম থেকে বেরিয়ে চললাম আব্বুর সন্ধানে। আব্বুর রুমের সামনে যেতেই আব্বু আমায় দেখে কাছে ডাকল। সে ভিডিয়ো কলে কথা বলছে। আমি বললাম,
“কথা শেষ করো। পরে আসছি।”
আব্বু বলল,
“অন্য কেউ না, তাজ। আয়, দেখে যা। তোকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। ছেলেটা তদন্তে গিয়ে আঘা’ত পেয়েছে। নূর ভাই আমায় গতকালই বলেছিল, কিন্তু তোরা তখন ঘুমে ছিলি। সকালে উঠে বলতেই ভুলে গিয়েছিলাম। আয়, কথা বল।”
আব্বুর মুখের ওপর কিছু বলতে পারলাম না। বিধায় চুপচাপ গিয়ে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে পড়লাম। আব্বু হাতের ফোনটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“নে, কথা বল। আমি তোর আম্মুকে ডাকছি। কতক্ষণ ধরে ডাকছি, শুনতেই পাচ্ছে না।”
আব্বু তাড়াহুড়ো করে আম্মুকে ডাকতে ছুটল। এদিকে আমি ফোন হাতে নিয়ে উজবুক হয়ে বসে আছি। মন বলছে ফোনের দিকে তাকিয়ে অবস্থা দেখতে। কিন্তু অদৃশ্য এক বাঁধা যেন তাকাতেই দিচ্ছে না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আমি অন্যদিকে তাকিয়ে গোঁ ধরে বসে ঠোঁট কামড়াচ্ছিলাম। মিনিট খানেক পার করেও যখন একটা বাক্য ব্যয় হলো না, তখন বিরক্ত লাগল। পরক্ষণেই গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনে নড়েচড়ে বসলাম। উনি বলে উঠলেন,
“ফোন ধরা শিখিয়ে দিতে হবে, না কি কথা বলা?”
এবারে আমি ফোন ঠিক করে ধরলাম। মুহূর্তেই স্ক্রিনে সরাসরি তাকিয়ে থাকা চোখ দুটো আমায় আটকে দিলো। কপাল, গাল, চিবুক, গলায় লাগাতার ব্যান্ডেজে মোড়ানো ছন্নছাড়া মুখটা দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য আমি থম মে’রে রইলাম। শব্দরা কাঁ’টার মতো গলায় বিঁধে আছে। মন বারংবার প্রশ্ন করছে, কী হয়েছিল? কিন্তু সে কথারা শব্দহীন। উনি একইভাবে তাকিয়ে আছেন। হয়তো এদিক থেকে প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা। কেন অপেক্ষা? তার বি’ষমাখা কথাগুলো মনে নেই? খুব তো বলা হয়েছিল জীবন থেকে মুছে যাবে। উনি ভ্রু কুঁচকে আবারও তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন,
“মায়ের কাছে গিয়ে কি চকোলেট গেলা পিচ্চি থেকে ফিডার গেলা পিচ্চি হয়ে গেছেন? কথা শেখেননি এখনও? কী-কী কথা শিখেছেন, শুনি? বাবু ডাকতে জানেন?”
আমি অবাক চোখে চাইলাম। আঘা’ত কি এর মাথায়ও লেগেছে না কি? তবে বাংলা সিনেমার পর বাস্তবে এই প্রথম মাথায় বাড়ি খেয়ে জীবনচক্র ভুলে যাওয়ার ঘটনার সাক্ষী হতে চলেছি? আহা, ইন্টারেস্টিং তো! কিন্তু অত্যধিক কৌতুহলী ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার আগেই আব্বু-আম্মুর আগমন ঘটল। যাকে বলে সুসময়ে আগমন। আম্মুর হাতে ফোন ফেরত দিয়ে আমি বললাম,
“নাও, তোমার সাথে কথা বলবে।”
মিথ্যে অজুহাত চাপিয়ে দ্রুত কে’টে পড়লাম। সাথে মাথার মধ্যে আরও এক জটিল জট নিয়ে এলাম। হয়েছে কি এই লোকের? কাল এক রূপ, তো আজ আরেক রূপ। সত্যি-সত্যিই সব ভুলে গেল না কি? অদ্ভুত! এখন আমি এত প্রশ্নের উত্তর কোথায় পাব? কী পেয়েছে কী আমায়? মুণ্ডুর মধ্যে একের পর এক জট পাকিয়ে দেয়। আর দোষ শুধু আমার ওভার থিংকিংয়ের? ব’দের হাড্ডি। এর পা থেকে মাথা অবধি শুধুই শয়’তানি বুদ্ধি। আমার মস্তিষ্কের টানাপোড়েনের মধ্যে আমার ছোটো বোনের মাথার পোকাগুলোও কিলবিল করে উঠল। কানের কাছে এসে ওর স্কুলের আর এলাকার বন্ধুদের নিয়ে চাটুকারিতা শুরু করল। ওকে কিছু জিজ্ঞেস করারও দরকার পড়ে না। নিজেই খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে গড়গড় করে সব উগড়ে দেয়, আবার নিজেই হাসতে-হাসতে লুটিয়ে পড়ে। অনেকদিন পর আমাকে পেয়ে ওর জমানো কথাগুলো খুব উৎসাহ নিয়ে বলতে বসেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি কিছুতেই ওর কথায় মন দিতে পারলাম না। ওর অপ্রয়োজনীয় আলাপে উলটো বিরক্ত হলাম। ধমকা-ধমকি করে থামিয়ে দিলাম। এতে ও মোটেও আশাহ’ত হয়নি। কারণ আমাদের জানা আছে, আবার এসে ও এই একই আলাপ নিয়ে বসবে। মানুষকে ফ্রিতে বিরক্ত করার সার্ভিস দিতে ও সদা প্রস্তুত। আবার নিজের চঞ্চলতা দিয়ে সে মানুষের মন জয় করতেও পটু। গুঁড়া থেকে বুড়া, সবার ক্ষেত্রেই চাটুকারিতা জ্ঞান তার প্রবল। আজ সকালে মনটা ছিল একদম রিফ্রেশ। তারপর থেকেই আমার যত ঝটকা খাওয়া শুরু। প্রথমত তাজ ভাইয়ের অদ্ভুত পরিবর্তন। দ্বিতীয়ত আমার স্কুল ফ্রেন্ড অন্তরের টেক্সট। হুট করেই ও নক করে বলে বসল,
“শুনলাম তাজ ভাই ইনজুরড হইছে। কেমনে হইল রে?”
আমি উত্তর দিলাম,
“জানি না। যার থেকে শুনেছিস, তার থেকেই জেনে নিতি।”
“মানে কী? তুই সত্যিই জানোস না?”
“আমি কি মিথ্যে বলছি?”
“বিশ্বাস হইতাছে না।”
“অবিশ্বাসের কী আছে?”
“তুই খবর নেসনায়?”
“ইনজুরড হয়েছে তা শুনেছি। কীভাবে হয়েছে তা জিজ্ঞেস করিনি। জানতে পারলে বলব নে।”
“লাইক সিরিয়াসলি! ভাই তোর ব্যাপার-স্যাপার আমার মাথার ওপর দিয়া যাইতাছে। গতকাল ইনজুরড হইছে, অথচ তুই এখন পর্যন্ত খবরই নিলি না!”
“তো?”
“তোরে সামনে পাইলে মাথায় কষে একটা মা’রতাম, বিশ্বাস কর। ভাই শোন, আজকে একটা সত্যি কথা না বইলা পারতাছি না। তাজ ভাই যখন সুইডেন ছিল, তখন নিয়ম কইরা তোর প্রত্যেকটা আপডেট আমার থেকে নিত। তুই কেমন আছস, কখন কই যাস, কী করস, পড়াশোনা কেমন চলে, সব। আমি যখন জিজ্ঞেস করতাম, ভাই প্রেমে পড়ছেন নি? তার উত্তর ছিল, প্রস্তুতি নিচ্ছি। পিচ্চি মেয়ে তো। সিক্রেট রাখো ভায়া। সেই লোক ইনজুরড হয়া পইড়া আছে, আর তুই খবর নেস না। তুই কী দিয়া তৈরি ক তো?”
ম্যাসেজটা পড়ে আমি পুরোদস্তুর হতভম্ব বনে গেলাম। এই একটা ম্যাসেজ যদি আমি সেই সময়গুলোতে পেতাম, যখন মন ভুল বুঝাবুঝিতে তিক্ত ছিল; তবে এতকিছু হতই না। অথচ আমার বন্ধুই আমার থেকে এত বড়ো একটা সত্যি গোপন রাখল। বিস্ময় চেপে আমি প্রশ্ন করলাম,
“এসব কথা তুই আমাকে আগে বলিসনি কেন?”
“কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল, তাই।”
“তাই বলে এত বড়ো একটা কথা তুই আমার থেকে গোপন করলি?”
“হুপ, তুই সব বাদ দে তো। ভালো মাইনষের কদর নাই, না? এমন তাজ তুমি দুনিয়া উলটায়া দুইটা পাইবা নি? গাঁ’ধী।”
“না, ছেলের অকাল পড়ছে তো বাংলাদেশে।”
“জীবনে পারেনায় একটা প্রেম করতে, আবার বড়ো গলায় কয় ছেলের অকাল পড়ছে নি। তাজ ছাড়া তোমার গতি নাই বেব। কপালে খোদাই কইরা লেইখা রাখো আমার কথা।”
এই ম্যাসেজটা সিন করে আমি আর উত্তর দিলাম না। কথায় কথা বাড়ে। তাই নেট অফ করে ফোন রেখে দিলাম। মস্তিষ্কের জটগুলো খোলার আর উপায় নেই। একটার পর একটা প্যাঁচ বাড়ছে তো বাড়ছেই। বিরক্তি, রাগ, দুঃখ, কনফিউশনের সংমিশ্রণে এই মুহূর্তে আমার ঠিক কী রিয়্যাকশন দেওয়া উচিত, তা-ই গুলিয়ে গেল। বেচারা মস্তিষ্ক চরম চাপে পড়ে যেন অসহায় হয়ে গলা তুলে চেঁচিয়ে উঠল,
“আমি পারি না আর পারি না
আমি কেন ম’রি না?
আজ’রাইল কি চেনে না আমারেএএএ…?”

চলবে, ইন শা আল্লাহ্।