#মন_কারিগর🩷 [পর্ব-২৪]
~আফিয়া আফরিন
রাফি জুহির নতুন জীবনের প্রথম সকাল আজ। অন্যান্য দিনের মধ্যেই সাধারণ, কিন্তু জুহি অসাধারণ অনুভব করছে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই শাশুড়ির মুখোমুখি পড়ে গেল। তাকে দেখেই জুহি মিইয়ে গেল। কেন যেন এই মানুষটার সামনে পড়লে অদ্ভুত লাগে। যদিও ওসব কথা জুহি মনে রাখে নাই, আর সায়রা হক নিজেও ক্ষমা চেয়েছেন তাই এসব ভাবনা মস্তিষ্ক আসাও পাপ। কিন্তু অবচেতন মন হারহামেশাই এসব ভাবনা ভাবতে থাকে। কী আশ্চর্য! যেটা আমরা ভুলে যেতে চাই সেটা নিয়ে বেপরোয়া মন এত তুলকালাম সৃষ্টি বাধায় কেন?
জুহিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি বললেন, ‘ঘুম ভাঙ্গল?’
জুহি তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়িয়ে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, অনেক আগেই।’
‘রাফি কি ঘুমে মা?’
‘জি। কিছু বলবেন? ডেকে দিব?’
তিনি আশপাশে তাকিয়ে বললেন, ‘ডেকে তো অবশ্যই দিবে, তবে সেটা আমার ডাকার কারণে না। এখানে এসে এতোবেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকলে তোমার মামা-মামী কি মনে করবেন বলো তো?’
‘সমস্যা নাই আন্টি। তারা কিছু মনে করবেন না। আপনাদের কি সকালের নাস্তা হয়েছে?’
‘তোমাদের রেখে খাওয়া-দাওয়া করব নাকি?ভেবেছিলাম সকাল সকাল বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিব। নিজেদের বাসায়ও তো একটা গোছগাছের ব্যাপার আছে। আত্নীয়-স্বজন কাউকে জানানো হয় নাই রাফির বিয়ের কথাটা। কিন্তু তোমার মামা কিছুতেই ছাড়বেন না। বারবার বলেছেন, একমাত্র ভাগ্নির বিয়েটা দিলাম কোন রকম ভাবে। এভাবে বিদায় দেওয়া যায় নাকি? আমাদের কাছের কয়েকজনকে দাওয়াত দেওয়ার কথা বললেন। কিন্তু এভাবে হুট করে এতো দূরে কে আসবে বলো? সবকিছুর জন্যই তো সময় প্রয়োজন। মাহিদ বোধহয় শুধু ফোন করে রাফির দু’একজন বন্ধু-বান্ধবকে আসতে বলল।’
জুহি শুনল বটে, কিন্তু কথার উত্তর দেওয়ার মত কোনো কথা খুঁজে পেল না। কিছুক্ষণ বাদে আমতা আমতা করে বলল, ‘আচ্ছা, আপনারা তো আমাদের জন্য এখনো খাওয়া দাওয়া করেন নাই। আমি বরং রাফিকে ডেকে তুলি।’
‘যাও।’
জুহি সুড়সুড় করে এখান থেকে কেটে পড়ল। তার মূল উদ্দেশ্য মোটেও রাফিকে ডেকে তোলা নয়, বরং শাশুড়ির সামনে থেকে সরে আসা। সে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে লম্বা একটা শ্বাস নিল। এমন সময় পেছন থেকে নিজের কাঁধে কারো টোকা পেয়ে চমকে ঘুরে তাকাল।
মিমিকে দেখতে পেল। মিমি ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কি ব্যাপার এইভাবে উঁকি ঝুঁকি মেরে কাকে দেখ? রাফি ভাইয়াকে? হুঁ হুঁ, বলো বলো।’
‘রাফি এখানে আসবে কি করে? ও তো ঘরে ঘুমাচ্ছে।’
মিমি পুনরায় ভুরু নাচিয়ে বলল, ‘এতো বেলা পর্যন্ত ঘুম? বাবাহ, কাল সারা রাত জেগে ছিলে? তা কেমন কাটল বাসর রাত? গল্প বলো, শুনি একটু।’
জুহি কোমড়ে দু’হাত গুঁজে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, ‘বিয়ে আগে কার হয়েছে? তোর না আমার?’
মিমি সোজাসাপটা উত্তর দিল, ‘আমার।’
‘বাসর আগে কার হয়েছে? তোর না আমার?’
‘অবশ্যই আমার।’
‘তো এক্সপেরিয়েন্স কার বেশী? তোর না আমার? গল্প কে শোনাবে? তুই না আমি?’
মিমি আনমনে জবাব দিল, ‘আমি!’
জুহি হেসে তাকাতেই মিমি তড়িগড়ি করে বলল, ‘না না তুমি কিন্তু চিটিং করছ। আমার টা তো পুরোনো হয়ে গেছে। এইবার তোমার পালা, সদ্য বিয়ে করেছ। বিয়ে সম্পর্কে বর্ণনা দাও।’
‘কি বললি তোর টা পুরোনো হয়ে গেছে? ওহো, মাথায় কি চলে বল তো? নতুন করে আবার বউ সাজার ধান্ধা না? তোর তো আরো বেশ কয়েকমাস পড়েই অ্যানিভার্সারি। মামীকে বলে রাখব, কোনো চিন্তা করিস না।’
এটুকু বলেই সে চোখ টিপি মেরে চলে গেল। মিমি শুধুমাত্র অবাক হলো। এটা আসলেই জুহি? এতদিনের চেনা জুহির সাথে এই জুহির কিছুতেই খাপ খাওয়ানো যাচ্ছে না। এতদিনের আপাদমস্তক মানুষের মধ্যে কী সজীবতা! সত্যি জীবনে সঠিক ভালোবাসা এলে জীবনটাই অন্য রকম হয়ে যায়। কিছুটা দায়সারা, কিছুটা আনন্দময়, কিছুটা রাগারাগি আর অভিমান, কিছুটা অভিযোগ আর বাদবাকি সময়টুকু ভালোবাসা ময়!
.
রাফি ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই ঠাওর করতে পারল না সে কোথায় আছে। কেমন অন্য একটা ঘর, আসবাবপত্র গুলোও অন্য রকম। নিজের ঘরের কোনো জিনিসের সাথে এই ঘরের কোনো কিছুর মিল নেই। আধো জাগরণে ভাবছিল, ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছে সে।
কিন্তু হঠাৎ ঘরে প্রবেশ করা এক রমণীর পদ শব্দে সে চোখ মেলে তাকাল। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রাফির তাকানো দেখে জুহি নিজেও ভুরু কুঁচকে চেয়ে রইল। কিছুক্ষণ বাদে বলল, ‘কি হয়েছে? আমাকে চিনতে পারছ না, এমন ভাবে তাকিয়ে আছ? বিয়ের পুরোপুরি একদিন অতিক্রান্ত হয় নাই এরই মাঝে বউকে ভুলে গেলে?’
রাফি হতভম্ব গলায় বলল, ‘বিয়ে? বউ? মানে কার বিয়ে আর কিসের বউ? কে বিয়ে করেছে?’
জুহি দু’কদম এগিয়ে এল। বলল, ‘বউ চিনতে পারছ না? তোমার গ’লা আমি চি’পে ধরব। কাল রাতে তিন কবুল বলে আজ সকালে সব ভুলে হজম করেছ?’
রাফি মিনিট দুয়েক ভাবল। তারপর ক্ষীণ স্বরে বলল, ‘আমি তো ভাবছিলাম আমি স্বপ্ন দেখছি। সিরিয়াসলি! আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, আমার বিয়ে হয়ে গেছে। চলো, দুজন মিলে সেলিব্রেশন করি। যতযাই হোক বিয়ে করেছি তো!’
‘ফাজলামি করো তুমি আমার সাথে? আর একটা কথা না বাড়িয়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে খেতে আসো। আমি যাচ্ছি।’
রাফি কিছু বলার আগেই জুহি চলে গেল। রাফি বিড়বিড় করে বলল, ‘পাকা গিন্নির মতো আমায় যে একদম আদেশ করে চলে গেল, বলছি নতুন বর আমি আমার লজ্জা করে না বুঝি।’
ফ্রেশ হয়ে আসার পরও রাফি ঘর ছেড়ে বের হতে পারল না। দরজায় উঁকি ঝুঁকি দিতেই লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। আশ্চর্য এত লজ্জা হঠাৎ কোথা থেকে এল? আগে তো কখনো ছিল না। বিয়ে করলে কি আপনাআপনি এসব এসে ভর করে নাকি? রাফি উপায় না পেয়ে মাহিদকে ফোন করল। মাহিদ ফোন না ধরে জুহির কাছে এগিয়ে এল। বলল, ‘রাফি কই?’
জুহি নির্বিকার উত্তর দিল, ‘ঘরে তো।’
মাহিদ ঘরের দিকে এগিয়ে এল। হ্যাঁ, আসলেই রাফি ঘরে। ঘরে বসে থেকে এখান থেকে এখানে, ফোন করার কি প্রয়োজন মাহিদ সেটাই বুঝল না। মাহিদ এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল, ‘কি ভাই? এখান থেকে এখানে, ফোন করছিস কেন?’
রাফি মাহিদকে দেখে খুশি হয়ে গেল। আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলল, ‘ভাই আসছ তুমি? তোমাকেই মনে মনে খুঁজছিলাম।’
‘বউ থাকতে হুট করে আমাকে খোঁজার কারণ?’
রাফি ছেলেমানুষি গলায় বলল, ‘বউ বউয়ের জায়গায়, তুমি তোমার জায়গায়। আর তাছাড়া যে বউ আমার কথার আগেপিছে শুধু ধমক দেয়। এতো ধমক খেলে আমি বাঁচব বলো তো?’
মাহিদ ফিক করে হেসে দিল রাফির কথা শুনে। আর কথা না বাড়িয়ে রাফিকে নিয়ে ডাইনিং-এ চলল।
.
আদনান আর প্রান্ত চট্টগ্রাম এসে পৌঁছাল দুপুরের পর। তারা এখনো পর্যন্ত রাফির বিয়ের সংবাদ জানে না। শুধুমাত্র মাহিদ জরুরি ভিত্তিতে ফোন করে আসতে বলেছে, তাই তারা চলে এসেছে। মাহিদ যখন তাদের রিসিভ করতে মেইন রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে এল, তখন থেকেই দুজনের একের পর এক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। শেষমেষ বলেই দিল, তারা এখন রাফির শশুড় বাড়ি যাচ্ছে।
দুই বন্ধু মুখ চাওয়াচাওয়ি করল কিন্তু বিশ্বাস করল না কেউ।
অবশেষে বাড়ি গিয়ে জানা গেল, এটা আসলেই রাফির শশুর বাড়ি—মামা শশুর বাড়ি।
আদনান তো বিস্ময়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘ভাই তুই আসলেই বিয়ে করছস? তাও প্রেম করে? অথচ তোকে আমরা হাজারবার প্রেমের কথা জিজ্ঞেস করার পরও তুই নিজের মুখে স্বীকার করিস নি। আমরা তো সেদিন আন্টির মুখে শুনেছিলাম। দুই দিন আগে শুনলাম প্রেমের কথা, আজ শুনি বিয়ের কথা, মামা তুমি তো মিনিটে মিনিটে আমাদের চমকায় দিতেছ। কই ভাবি কই? আলাপ করাবা না?’
রাফি ইশারায় তাদের চুপ করতে বলল। কিন্তু কে শোনে কার কথা। জুহিও কিছুটা দূর থেকে এসব কারবার লক্ষ্য করে হাসছিল।
এরই মধ্যে আদনান বলে উঠল, ‘ভাই তুই বিয়ে করছস? মিতার কি হইব? তোর শোকে দুঃখে ও এখন আমাদের পেছনে লাগবে। এমনিতেই আমাদের দুজনের সাথে একচান্সে প্রেম করার সুযোগ খুঁজতেছে, তার উপর যদি শোনে তার না হওয়া বয়ফ্রেন্ডের বিয়ে হয়ে গেছে তাহলে তো……।’
রাফি আর কিছু বলার সুযোগ দিল না আদনানকে, মুখ চেপে ধরল। তারপর তিনজন মিলে চলল, ভেতরের ঘরে।
সবার সাথে পরিচয় পর্ব শেষে সন্ধ্যাবেলা মিমি সকলকে ছাদে আসতে বলে দিয়েছে। সকলেই সময় মত চলে এসেছে কিন্তু জুহিকে দেখা যাচ্ছে না বলে রাফি তাকে ডাকতে গেল।
জুহি রাফিকে দেখা মাত্রই প্রশ্ন করল, ‘মিতা কে?’
আচমকা আক্রমণে রাফি থতমত খেয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল, ‘মিতা? মিতা মানে ওই যে আছে না? কি যেন বলে? ওই তো, ওই তো…..।’
‘হুঁ বলো?’
জুহির আগুনঝরা দৃষ্টি দেখে রাফি ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেল। রোবটের ন্যায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে উত্তর দিল, ‘পাশের ফ্ল্যাটের একটা মেয়ে।’
‘আর তুমি ওর না হওয়া বয়ফ্রেন্ড?’
‘উহু মোটেও না। আমি তো শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। সত্যি সত্যি সত্যি—তিন সত্যি। ও একটা বাড়তি অধ্যায়।’
জুহি কিছুক্ষণ নিরব থেকে উল্টো দিকে পা বাড়াল। রাফির উদ্দেশ্য বলল, ‘ছাদে এসো।’
জুহির সাথে রাফি ছাদে এল। কিছুক্ষণের মাঝেই গল্প জমে উঠল। গল্পের মূল বিষয়ই ছিল, বিয়ে। কে কবে বিয়ে করছে, বিয়ের আগের লাইফ কে কীভাবে ইনজয় করেছে, এবং বিয়ের পর কীভাবে পস্তাচ্ছে এসব বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।
সাইমুমের কথাগুলো রাফি মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। আহারে, বেচারা! বিয়ে করে জীবনটা বরবাদ। নিজের জীবনের কথা ভাবতে ভাবতে জুহির দিকে চোখ পড়ল। মেয়েটার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি, থুতনিতে দু’হাত ঠেকানো। রাফির আর মনে হলো না, সে বিয়ে করে ভুল কিছু করেছে বরং মনে হলো, বিয়ে করে জুহির মত এই মেয়েটিকে পেয়ে সে জিতে গিয়েছে।
গল্পগুজব শেষে সকলের অনুরোধ রাফিকে একটা গান শোনাতেই হবে। রাফি অবশ্য সে অনুরোধ ফেলল না। জুহির দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসল। তারপর খালি গলায় সুর দিল, —“তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম
নিবিড় নিভৃত পূর্ণিমা নিশীথিনী-সম,
তুমি রবে নীরবে
মম জীবন যৌবন, মম অখিল ভুবন
তুমি ভরিবে গৌরবে নিশীথিনী-সম
তুমি রবে নীরবে!
জাগিবে একাকী, তব করুণ আঁখি,
তব অঞ্চলছায়া মোরে রহিবে ঢাকি
মম দুঃখবেদন, মম সফল স্বপন
তুমি ভরিবে সৌরভে নিশীথিনী-সম
তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম
নিবিড় নিভৃত পূর্ণিমা নিশীথিনী-সম
তুমি রবে নীরবে!”
.
.
.
চলবে….
#মন_কারিগর🩷 [পর্ব-২৫]
~আফিয়া আফরিন
পরদিন সকাল সকাল সবাই পাড়ি জমাল রাজধানীর উদ্দেশ্য। যাওয়ার আগে মিমি রাফিকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল, ‘ভাইয়া এবার ঝটপট আমায় একটা অটোগ্রাফ দিয়ে দিন তো। আপনি জানেন আমি গানের কত বড় ভক্ত? বেশ কয়েকদিন ধরে আপনার নতুন কোন গান পাচ্ছি না, আর কতো অপেক্ষা করাবেন বলেন তো?’
রাফি নিজের চুল গুলো কপালের ওপর থেকে দু’হাতে পেছনে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘অটোগ্রাফ আজ না অন্য কোন সময় দিব! আর রইল গানের কথা? আমার গানের সুর, আমার গানের প্রতিটা বাক্যের কারিগরকে পেয়েই গেছি; খুব শীঘ্রই আবার ফিরছি।’
রাফি নিজের কথার হেরফের করে নাই। ঢাকা ফিরে গানের রেকর্ডিং শুরু করে দিয়েছে। মাঝখানে বেশ কয়েকটা দিন গ্যাপ পড়ে গিয়েছিল, ওভারটাইম রেকর্ডিংয়ে সেটাও পুষে নিয়েছে। জুহিও তার অফিসের কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের দুটো মেয়ে নাকি নিখোঁজ, সেই নিয়ে অফিসে বেশ কয়েকদিন ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে।
রাফিরও প্রচুর ব্যস্ততা, এতো ব্যস্ততার কারণে রাফি বাসায় কম, স্টুডিওতে ছিল বেশি। তার উপর গানের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হতো।
তবে জুহির সাথে রাফির সম্পর্কটা ঠিক সহজ হতে পারছে না। পূর্ববর্তী সময়ে রাফি যেমন হারহামেশাই কোনো দ্বিধা ছাড়া জুহির সান্নিধ্য উপলদ্ধি করতে পেরেছে, কিন্তু বর্তমানে তার মধ্যে এক ধরণের জড়তা চলে এসেছে। জুহির চোখে চোখ রেখে কথা বলতেও লজ্জা করে।
গানের একটা রেকর্ডিংয়ের জন্য বর্তমানে রাফিকে ঢাকার বাহিরে অবস্থান করতে হয়েছে। প্রথম প্রথম যেতে একটু খারাপ লাগছিল, তার মূল কারণ হচ্ছে জুহি। ব্যাপারটা এখন এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে রাফি পারলে কাজকর্ম বাদ দিয়ে সারাক্ষণ জুহিকে চোখের সামনে বসিয়ে রাখে নয়ত নিজে জুহির চোখের সামনে বসে থাকে।
সেদিন তো জুহিকে বলেই ফেলেছিল, ‘তোমাকে দেখতে ভালো লাগে। তোমার চোখে-মুখে কি নেশা লুকিয়ে রেখেছ বলো তো? এতো টানে কেনো আমাকে?’
জুহি তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিল। পরমুহুর্তেই রাফি আবার বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ এই চাহনির কথাই বলছিলাম আমি। এত ভালো লাগে যা বলার বাহিরে। যখন এইভাবে আমার দিকে তাকাও, বুকের ভিতর উথাল পাথাল ঝড় বয়ে যায়। এত নেশা তোমার চোখের চাহনিতে! এতো জাদুশক্তি তোমার দু’চোখের চাহনিতে! মরে যেতে ইচ্ছে করে আমার।’
এরপর জুহি মুচকি হেসেছে শুধু, কিছু বলে নাই।
.
সকাল থেকে আধঘন্টা পরপর ফোনটা বিকট শব্দে বাজতেই আছে। রাফি একের পর এক কল দিয়েই যাচ্ছে, জুহি বারবার কল কেটে দিচ্ছে। রাফি বোধহয় পণ করেই ছিল যতক্ষণ পর্যন্ত জুহি ফোন না ধরবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে জ্বালাতেই থাকবে। ফোন দিয়ে বারবার জিজ্ঞেস করছে কেমন আছ, কি করছ? জুহি এইটুকু বোঝেনা আধা ঘন্টার মধ্যে কি এমন হয়ে যাবে যে, তার ভালো থাকা অথবা খারাপ থাকা পাল্টে যাবে।
জুহি বিরক্ত হয়ে এবার ঝাঁঝিয়ে ওঠে। ফোন রিসিভ করে রাফিকে কড়া এক ধমক দিয়ে বলল, ‘তুমি তো বড্ড ঝামেলা করছ। এত বারবার ফোন দেওয়ার কারণ কি? গায়ক মানুষদের হাতে এত সময় থাকে বলে তো আমার মনে হয় না।’
‘ইয়ে মানে, তোমার একটু খোঁজখবর নিতে হবে না।’ ছেলেমানুষী কন্ঠে বলে রাফি।
‘হ্যাঁ খোঁজখবর নাও। আমি কি খোঁজখবর নিতে মানা করেছি? কিন্তু আধা ঘন্টা অন্তর অন্তর ফোন করছ কেন? এত বিরক্ত করার আসলেই কি কোন অর্থ হয়?’
রাফি মুখ কালো করে বলল, ‘আমি তোমায় বিরক্ত করছি?’
‘শুধুই কী বিরক্ত? আপনিতো রীতিমতো আমার মাথায় চড়ে নাচছেন।’
রাফি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার এখন ইচ্ছে করছে জুহিকে দেখতে। জড়িয়ে ধরে মনের সমস্ত অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে। দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া সে বর্তমানে আর কিছুই করতে পারছে না।
রাফি দৃঢ় কন্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছ?’
‘ঠিক আধাঘন্টা আগেও এই প্রশ্ন করেছিলে। আধা ঘন্টার মধ্যে নিশ্চয়ই মরে যাই নাই। আধা ঘন্টা আগে যেরকম ভালো ছিলাম এখনো ঠিক সেই রকম ভালই আছি।’
রাফি নির্বিকার ভাবে বলল, ‘ও! মা কি করে?’
‘কাজ করে। আচ্ছা কথা শেষ? আমি রাখছি এখন। আর শোনো, যে কাজে গেছ সেটা মন দিয়ে করো। বারবার এত ফোন দিবে না। আমি ঠিক আছি, কোন সমস্যা হলে তো তোমাকে জানাবোই।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে আর ফোন দিব না। সাবধানে থাকবে কেমন? কোন সমস্যা হলে আমাকে বলতে না পারলেও আমার মাকে বলো। আর শোনো, আমাকে তো ফোন দিতে মানা করলে মাঝে মাঝে তুমি একটু ফোন দিও। যতযাই হোক, আমি তো এখন তোমার স্বামী; আমার খোঁজ খবর নেওয়া তোমার বিশেষ প্রয়োজন। একা একা আছি কত রকম সমস্যা হতে পারে, তাইনা? একটু আধটু ফোন দিও!’
জুহি রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেলল রাফির ছেলে মানুষীতে। জুহির হাসির আওয়াজে রাফির সারাদিনের বিষন্নতা যেন নিমিষেই দূর হয়ে গেল।
রাফি স্পষ্ট কণ্ঠে শুধাল, ‘হাসছ কেন?’
‘ও তুমি বুঝবে না। রাখছি কেমন! তোমার মা ডাকছে।’
‘আমার মা? তোমার বুঝি মা হয় না?’
‘হু।’
জুহি আর কিছু না বলে ফোন রেখে দিল। শ্বাশুড়ি পূর্বে যতযাই বলুক না কেন, এখন জুহিকে একদম আপন করে নিয়েছে। কিন্তু যেকোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে জুহি সহজে স্বাভাবিক হতে পারে না। কোন একটা অজানা অস্পর্শীয় বাঁধা মাঝখানে দন্ড হয়ে দাঁড়ায়। তবে সায়রা হক জুহির দিকটাও বোঝেন, তাই মেয়েটার যেন কোন অসুবিধা না হয়; সে যেন খুব তাড়াতাড়ি পরিবারের সবার সাথে মানিয়ে নিতে পারে সেই চেষ্টাই করেন। ওরা ঢাকায় ফেরার পরপরই তিনি একটা ছোটখাটো অনুষ্ঠান রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রাফি সময় করেই উঠতে পারছে না। যে কারণে সবমিলিয়ে তার মনটা একটু খারাপ।
জুহি ডাইনিং এ আসতেই সায়রা হক জুহিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘রাফির সাথে কথা বলছিলে?’
জুহি উপর নিচ মাথা ঝাঁকায়। সায়রা হক ফের বলতে শুরু করলেন, ‘দেখি কাছে আসো তো। সব সময় এত দূরে দূরে থাকবে না। আসো কাছে আসো। ওমন মুখ ভার করে রেখেছ কেন?’
জুহি বেশ বিনয়ের সহিত শাশুড়ির পাশে গিয়ে বসল। তিনি ফের বলতে শুরু করলেন, ‘জানো মা, আমার না একটা মেয়ের খুব শখ ছিল। কিন্তু নিজের তো মেয়ে নেই। ভেবেছিলাম ছেলের বউকে দিয়ে সেই শখ মিটিয়ে ফেলব। কিন্তু তোমার এতো দূরে দূরে থাকার কারণ কি বলো তো? ওই ব্যাপারটা কি তুমি এখনো ভুলতে পারো নাই?’
জুহি তৎক্ষণাৎ শাশুড়ির হাত জাপটে ধরে বলল, ‘ছি আন্টি এভাবে বলবেন না। ওই ব্যাপারটার কথা আমি ভুলেই গেছি। আর আপনি মা হিসেবে ঐটুকু বলার অধিকার অবশ্যই রাখেন। এটা নিয়ে প্লিজ অনুতপ্ত হবেন না।’
‘তাহলে এত দূরত্ব কিসের? মা ডাকতে পারো না বুঝি? প্রথম প্রথম হয়ত একটু আধটু ভুল হবে, কিন্তু অভ্যাস হয়ে যাবে। আমি তোমার মুখ থেকে মা ডাক শোনার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছি।’
জুহির ওষ্ঠকোণে সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠল। মা, এই শব্দটা যে তার সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা। নিজের মায়ের মতো কি আর হয় কেউ?
রাফি ঢাকা ফিরে এল পরদিন, তাও আবার কাউকে না জানিয়ে। রাত তখন প্রায় তিনটা বাজে। সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন। ওমন সময় জুহির ফোনে কল আসলে সে ঘুমের ঘোরে ফোন রিসিভ করে জিজ্ঞেস করে, ‘কে বলছেন?’
রাফি ওপাশ থেকে আপনমনে বলল, ‘হায়! এই মেয়ে দেখি নিজের স্বামীকেই চিনতে পারছে না। নতুন নতুন বিয়ে হওয়ার পরেই এই অবস্থা? পুরাতন হয়ে গেলে তো ও আমাকে ভাতই দিবে না।’
তারপর গলা খাকারি দিয়ে বেশ ভাব নিয়ে বলল, ‘ইটস রাফি। ডু ইউ নো রাফি?’
রাফি ভেবেই নিয়েছিল জুহি ঐ পাশ থেকে বলবে, ‘কে রাফি? কোন রাফি? কিসের রাফি? আমি কোনো রাফি-টাফিকে চিনিনা।’
কিন্তু জুহি তা বলল না। জুহি ধমক দিল।
‘সকালে আধাঘন্টা পর পর ফোন করো ঠিক আছে। তাই বলে এখন রাত তিনটার সময় ফোন করে জ্বালাতে হবে? এটা কি ঘুমের সময় না? তোমার ঘুম নাই? এত রাতে জেগে আছ কি করতে? কাকে পাহারা দিচ্ছ শুনি তো একটু?’
রাফি সহসা বলে উঠল, ‘আরে আরে আমি দরজার বাইরে অপেক্ষা করছি তো। দরজা খোল, আমি আর মশার কামড় খেতে পারব না।’
‘দরজার বাহিরে অপেক্ষা করছ মানে?’ অবাক বিষ্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল জুহি।
‘হ্যাঁ মাত্র বান্দরবান থেকে ঢাকা ল্যান্ড করলাম। এখন কি ম্যাডাম আমার উপর একটু কৃপা করবেন? দয়া করে কি দরজাটা খুলে আমায় ভিতরে প্রবেশ করার অনুমতি দিবেন?’
জুহি ফোন রেখে দিল। হাই তুলতে তুলতে উঠে গিয়ে ঘরের আলো জ্বালাল। ঘুমের ভাবটা উড়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। রাফি এসেছে, এখনো ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকলে চলবে? প্রিয় মানুষকে একনজর দেখার তৃষ্ণা যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, জুহি তা হাড়ে হাড়ে অনুভব করতে পারছে।
রাফি ঘরে ঢুকেই মিষ্টি করে হাসল। জুহির পানে তাকিয়ে থাকল বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো প্রেয়শীকে। চোখে বোধহয় কাজল দিয়েছিল, ঘুম থেকে উঠার কারণে তা লেপ্টে নেত্র পল্লবের সৌন্দর্য আরো দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাফি ভনিতা বিহীন বলল, ‘এই চোখ মায়ার চোখ। চোখে চোখ পড়লে ঘোর লেগে যায়, ডুবে যাই অথৈ সমুদ্রে। তোমার চোখের চাহনিতে কি বিষ থাকে? এক পলক দেখার তৃষ্ণায় আমি এভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরে যাই কেন, বলতে পারো? তুমি জানো, যতবার তোমার তপ্ত চোখে আমার চোখ ততবার আমার মনের মৃত্যু ঘটেছে!’
জুহির কথাটা প্রচন্ড ভালো লাগল কিন্তু সে খুব সূক্ষ্মভাবে রাফির কথাটা এড়িয়ে গেল। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘খেয়ে এসেছ নাকি খেতে দিব?’
রাফি একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলল, ‘কিছুই লাগবে না আমার।’
তারপর সোজা হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।
সকালে রাফির ঘুম ভাঙল দশটার পর। উঠেই চেঁচামেচি শুরু করে দিল। তার কী একটা প্রোগ্রাম আছে, সেটায় অ্যাটেন্ড করতে হবে।
ঘুম থেকে ওঠার পরে একবার ওই ঘর থেকে ওই ঘরে আসছে। এটা খুঁজে পাচ্ছে তো ওটা খুঁজে পাচ্ছে না। জুহি একবার ধমক দিতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল। ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে সোফায় বসে রইল। রাফি ফের হাঁকডাক শুরু করে দিল।
‘জুহি তুমি কি আমার হাত ঘড়িটা কোথাও দেখেছ?’
জুহি খানিক চেঁচিয়ে উত্তর দিল, ‘ওয়ারড্রবের ওপরে ড্রয়ারে রাখা আছে। ভালো করে চোখ দিয়ে খুঁজে নাও।’
রাফি নিজের হাত ঘড়িটা খুঁজে পেল ঠিকই তার পাশেই একটা শুভ্র রঙের মলাট বদ্ধ ডায়েরী নজরে এলো। কৌতুহল বশত ডায়েরিটা হাতে তুলে নিল। প্রথম পাতা উল্টোতেই “জুহি” নাম লেখা দেখে ঠাওর করতে পারল এটা জুহির ডায়েরী। তারপর কী মনে করে পরের পাতাগুলো উল্টাতে লাগল। তেমন বিশেষ কিছুই নাই, তবে মাঝখানের একটা পাতায় তার দৃষ্টি আটকে গেল।
সেখানে লেখা রয়েছে,
—“প্রিয় প্রেমিক!
ভালোবাসি ভালোবাসি,
উহু, আমি এখনো ভালবাসি শব্দ উচ্চারণ করি নাই।
করি না কেন জানেন? আপনার ভালোবাসা যে এভাবে পেয়ে যেতে চাই।
জানেন তো, ভালোবাসা খুব গভীর উপাখ্যান!
আপনার তো জানার কথা গায়ক সাহেব,
শব্দের কারিগরিতে দর্শক কেড়েছেন,
আপনার মন কারিগরি দক্ষতায় আমায় ছাপিয়েছেন।
কী নাম দিব আপনার?
হৃদয়ের নির্বাসন নাকি প্রহার!
ভালোবাসি, এতে আর দ্বিধাদ্বন্ধ নাই,
আমার নিখাদ প্রেমিক আছে, এইবার প্রেম শতভাগ হওয়া চাই!
ওহে মন কারিগর, হৃদয়ভবনে তুলি চলো ভালোবাসা অবিনশ্বর!”
.
.
.
চলবে….