মন কারিগর পর্ব-২৬+২৭

0
278

#মন_কারিগর🩷 [পর্ব-২৬+২৭]
~আফিয়া আফরিন

মানসিক সংযুক্তির অপর নামই তো ভালোবাসা। “ভালোবাসা” শব্দটি এক বিশাল ব্যঞ্জনা। ভালোবাসা বর্ণনাতীত। এটা শুধু অনুভব করা যায়। শব্দ দিয়ে এ অনুভূতি বর্ণনা করা যায় না। ভালোবাসার মধ্যে এতো জটিলতা এবং বহুমাত্রিকতা?
রাফির ওষ্ঠকোণে আচমকা স্মিত হাসির রেখা ফুটে উঠলো। “মন কারিগর, মন কারিগর!” শব্দখানা বেশ কয়েকবার উচ্চারণ করল। জুহি তাকে ভালোবাসে অথচ স্বীকার করে না। মাত্র কিছুটা মুহূর্ত যাবত রাফি জুহির মুখ থেকে ভালোবাসা শব্দটা শোনার জন্য তৃষ্ণার্ত হয়েছিল, অথচ মনে হচ্ছিল সে কতকাল তৃষ্ণার্ত! মরুভূমির বুকে এক পশলা বৃষ্টি যেরকম রৌদ্রের খাঁ খাঁ নিমিষেই দূর করে দিতে পারে ঠিক সেরকম ভাবেই, রাফির হাহাকার আজ নিঃশেষ হয়ে গেল। জীবনের কাছে তার অতিরিক্ত আর কিছুই চাওয়ার নেই। এই ছোট্ট জীবনে যতটুকু চেয়েছিল, তার থেকে অনেকটা বেশিই পেয়ে গেছে।
যে মন চুরি করতে জানে, সে জানে বুকে ছুরি মারার সকল কৌশল। আর তারপর সে অন্তরালে লুকিয়েও থাকতে জানে, নিজের অনুভূতিগুলোকে লুকিয়ে রাখতেও জানে। এমন রহস্য জানা মানুষটিকে ভালোবেসেছে রাফি। জীবন তার সার্থকতায় ছেঁয়ে গেছে!
ডায়েরীর পরের পৃষ্ঠাখানা উল্টাতে যাবে, এমন সময় কারো পায়ের আওয়াজের সেটা জায়গা মতো রেখে দিল। পেছন ঘুরে জুহিকে দেখল।
‘কি ব্যাপার এখনো কি কিছুই খুঁজে পাও নাই? তোমার জিনিসপত্র না আমি ঠিকঠাক করেই রাখি, কিন্তু তুমি সেগুলো অগোছালো করো। আর কাজের সময় নিজে তো খুঁজে পাওই না, সাথে সাথে আমার নাম জপ করো।’
জুহি যেভাবে ঠোঁট নাড়িয়ে অবারিত ভঙ্গিতে কথাগুলো বলছে, মুহূর্তেই তা রাফির হৃদয় কাঁপিয়ে দিল। জুহি তার মতো করে নানান কথা বলতেই আছে, সেই পর্যায়ে রাফি একটা সাংঘাতিক কান্ড ঘটিয়ে ফেলল। জুহিকে একহাতে কাছে টেনে তার কপালে নিজের ওষ্ঠ্যযুগলের আগ্রাসী শাসন চালাল। অতঃপর নিজেও আর কিছু বলল না জুহিকেও কিছু বলার সুযোগ দিল না। বড়ো বড়ো পা ফেলে নিজ গন্তব্যে রওনা হলো।
জুহি কিছু মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর হুঁশে ফিরতেই “ও মাই গড” উচ্চারণ করে খাটের একপাশে বসে পড়ল। সারা শরীরে উষ্ণ উত্তাপ ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে। জাগরণের দোলা উঠল অতৃপ্ত প্রাণে।

সেদিনই স্টুডিওতে মনের অস্পর্শনীয় আনন্দে মুহুর্তের মধ্যে রাফি একখানা গান লিখে ফেলল। এটা হবে তার জীবনের সবচেয়ে সেরা কাজ। গানের টাইটেল-ই হবে “মন কারিগর”।
রাফি গুনগুন করে গান গাইছিল। এমন সময় পরিচালক এসে রাফিকে বললেন, ‘গতমাসে তোমার মুম্বাই যাওয়ার কথাবার্তা হলো, সেটা কিন্তু ফাইনাল। তৈরি হও। সামনের সপ্তাহের রেকর্ডিং কিন্তু মুম্বাইয়ে হবে।’

‘আচ্ছা হোক কিন্তু আমাদের পরবর্তীতে যে সিনেমা হবে, তার জন্য একটা গান লিখে রেখেছি। সেটায় সুর দিয়েই তারপর যাব।’

‘ওখান থেকে ফিরে এসো তারপর এইদিক সম্পূর্ণ করো। মাথায় এত চাপ নিও না। মুম্বাইয়ে যে গানের রেকর্ডিংটা হবে, সেটাই প্র্যাকটিস করতে থাক। ফিরে এসে তারপর এখানের একটা দেখা যাবে।’

রাফি সম্মতির ভঙ্গিতে বলল, ‘আচ্ছা।’
.
ইদানিং রাফিকে নিয়ে দেশের জনগণের মধ্যে একধরনের চাপা উত্তেজনা রয়েছেই, দিনকে দিন সেসব আরো বাড়ছে। নিজেদের মানুষ ছাড়া কেউ জানে না, রাফির বিয়ের কথাটা। জুহি ক্যাম্পাসে গেলে তার সামনে রাফিকে নিয়ে সহস্র আলোচনা হয়, মুখ বুজে জুহিকে সবটাই সইতে হয়। তবে রাফি জানিয়েছে, ঘটা করে তার বিয়ের খবর সবাইকে জানাবে। জুহি সেই অপেক্ষাতেই রয়েছে। তবে দিনকে দিন রাফিকে নিয়ে মেয়েদের মাতামাতি তার অসহ্যই লাগছে বটে।
সেদিন তো একজনের ওয়ালে রাফির ছবি দেখল, আবার করো ফেইসবুক কভারে।
জুহির সাথেই পরে তার এক বান্ধবী তো বলেই ফেলল, ‘ইশশশ এইটাতে যদি কোনোভাবে বিয়ে করতে পারতাম!’
জুহি বহু কষ্টে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করল। মুখের উপর বলে দিতে ইচ্ছা করছিল, ‘ছেলেমানুষ দেখলেই এত বিয়ের শখ কিসের জন্য? আশ্চর্য! সেই ছেলের বউ আছে না গার্লফ্রেন্ড আছে কিছুই জানে না, আসছে উড়ে এসে জুড়ে বসার জন্য।’
এই যে সবার উপর চাপা রাগগুলো জুহি খুব সুন্দর করে রাফির উপর ঝেড়ে দেয়। আর রাফি বেচারা, বউয়ের ধমক চুপচাপ সহ্য করে যায়। মুখের উপর একটা কথাও বলে না!
রাফি না থাকার সময়টুকু সায়রা হক এবং এহসানুল হক জুহিকে আগলে রাখছেন। এমনিতেও আগলেই রাখেন, তবে এখন সেটা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই। জুহির নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে হয়। জীবনে মা বাবার আদর পায় নাই ঠিকই, কিন্তু মামা মামীর অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছে। এখনও পায়, প্রতিটা বেলায় বেলায় তারা ফোন করে খোঁজখবর নেয়। মাঝে মাঝে তো মিমি অভিমান করে বলেই ফেলে, ‘আমার মা বাবা তোমার যতটা খোঁজখবর নেয় আমার খোঁজ খবরও ততটা নেয় না!’
আর এখন, বাবা-মার সমতুল্য শ্বশুর শাশুড়ি। কিন্তু জুহি তাদের প্রতি উপযুক্ত ভালোবাসাটা ঠিক প্রকাশ করতে পারে না। শুধু তাদের প্রতিই না, কারো প্রতিই পারে না। মামা-মামীকে কতো ভালোবাসে, কিন্তু কখনো জড়িয়ে ধরে তাদের ভালোবাসাটা প্রকাশ করতে পারে নাই। আর রাফি, জীবনে প্রথম প্রেমের অধিপতি সে। তাকে তো সবোর্চ্চ দিয়ে ভালবাসে, কিন্তু তার এক ভাগও জুহি প্রকাশ করতে পারে না। এই যে রাফির উপর রাগ করে, কেউ রাফিকে নিয়ে কিছু বললে হিংসায় অন্তরাত্মা জ্বলে যায়, কারণে-অকারণে রাফির সাথে ঝগড়া করে; সবটাই তো জুহির অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। এটা রাফি বুঝে নিতে পারবে তো?
.
একদিন সকাল সকাল এহসানুল হক সোফায় বসে পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছিলেন। জুহি আশেপাশে বেশ কিছুক্ষণ ধরে ঘুরঘুর করছিল। তারপর সাহস করে বলেই ফেলল, ‘বাবা আপনাকে কি চা বানিয়ে দিব?’
এহসানুল হক ডানে বামে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। জুহি উত্তর পেয়ে রান্না ঘরের দিকে ছুটল। এহসানুল হক প্রথমে জুহির কথাটা খেয়াল করেন নাই, যখন খেয়ালে এলো তখন অবাক দৃষ্টিতে ফিরে তাকালেন। এতদিন জুহি আঙ্কেল সম্বোধন করছিল, আজকে বাবা বলল! যাক, মেয়েটা তাহলে সব সহজভাবে মেনে নিয়েছে। ওনার ওষ্ঠকোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
রান্নাঘরে দুপুরের রান্নার আয়োজন করছিলেন সায়রা হক। জুহি দরজায় উঁকি দিয়ে এলো বারকয়েক। তারপর ওড়নার প্রান্তদেশ খুঁটিয়ে বলল, ‘মা আমি বাবার জন্য এখন একটু চা বানাই। আপনি গিয়ে বিশ্রাম নেন। আজ দুপুরের রান্নাটা না হয় আমিই করি!’
সায়রা হকও অবাক হয়ে তাকালেন। তবে জুহির লাজুক রাঙা মুখ দেখে, কিছু বলে আর লজ্জা দিতে চাইলেন না। মুচকি হেসে চলে গেলেন। শ্বশুর শাশুড়ির জন্য দু কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এলো জুহি। এহসানুল হক জুহির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘একটা মেয়ের কত শখ ছিল আমার, আজ সেই শখটাও পূরণ হয়ে গেল। জীবনে আর কোন অপূর্ণতা রইল না। পূর্ণতা নিয়ে মরতে পারব এখন এটাই আমার শান্তি।’

জুহি ওখান থেকে কোনোরকমে পালিয়ে এলো। চোখের পানি আর আড়াল করতে পারল না। রান্নাঘরে পা দিতেই চোখের কার্নিশ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সায়রা হকও এলেন পিছু পিছু। জুহির উদ্দেশ্য বললেন, ‘তুমি একা রান্না করতে পারবে নাকি আমি সাহায্য করব?’

জুহি চোখ মুছল হাতের উল্টোপিঠে। তারপর ধরা গলায় বলল, ‘না আমি পারব। আমি গিয়ে একটু বিশ্রাম করুন।’

‘তুমি কাঁদছ মা?’

‘না না চোখের মধ্যে কি যেন পড়েছে। বারবার চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।’

তিনি হেসে জবাব দিলেন, ‘মায়েরা কিন্তু সব বুঝতে পারে। আচ্ছা, তুমি নিজের মতো কাজ করো আমি বিরক্ত না করি। শোনো মা, মা বলে যেহেতু একবার ডেকেই ফেলেছ; তো মায়ের কাছে কিছু গোপন করতে হবে না। মায়েরা সব বোঝে, ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চোখের অশ্রু গড়ালেও বোঝে; আবার চোখে পোকামাকড়ের আক্রমণের অশ্রুও তারা বোঝে। নয়তো মা হবে কেন বলতো?’
জুহি নির্বাক রয়। এর উত্তর আসলেই তার জানা নেই।

এরই মধ্যে একদিন মিতার সাথে জুহির সরাসরি দেখা হয়ে গেল। মিতা জানত না রাফির বিয়ের কথা। সে শুনে পুরাই হতবাক! এতদিন গ্রামের বাড়িতে ছিল। এসেই রাফির সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে ছুটল। কিন্তু রাফি তো বাংলাদেশে ছিল না। তাই জুহির সাথে দেখা হলো। সেই মুহূর্তে সেও জানত না যে বর্তমানে সে যার সাথে কথা বলছে সেই রাফির বউ।
রাফির হদিস না পেয়ে বলল, ‘রাফি আসলেই বিয়ে করেছে? আমি উড়ো খবর পেলাম। বর্তমানে সে ট্রেন্ডে আছে, তাই তাকে নিয়ে গুজব উঠবে এটাই স্বাভাবিক।’

জুহি হেসে জবাব দিল, ‘তবে এইটা কিন্তু গুজব নয়। রাফির আসলেই বিয়ে হয়ে গেছে।’

মিতা হতবাক হয়ে বলল, ‘কি বলেন? ওর কি বিয়ের বয়স হয়েছে নাকি? এত তাড়াতাড়ি আপনারা ওকে বিয়ে দিলেন? কোনো সমস্যা নাকি?’

জুহি গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘উহু। ওকে দেখলে মনে হয় ওর বয়স বেশি হলেও ২৪/২৫ বছর। কিন্তু না, ওর বয়স আসলে ৩০ এর উপরে। কিন্তু স্বীকার করে না।’

মিতা চোখ বড় বড় করে বলল, ‘হু? ছেলেমানুষ কখনো বয়স লুকায় নাকি?’

‘তুমি বুঝবে না। এসব অনেক সিরিয়াস ব্যাপার। বাই দা ওয়ে, তুমি ওকে পছন্দ করতে নাকি?’

মিতা মুখ কালো করে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ অনেক আগে থেকেই। কিন্তু ও কখনো পাত্তাই দিল না। ভেবেছিলাম ওকে জেলাস ফিল করানোর জন্য ওর দুই বন্ধুর সাথে প্রেম করব। কিন্তু ওরা সব কয়টা ব্যাগাবন্ড। পুরাই পাগল। কোনো কথাবার্তার ঠিক নাই।’

জুহি গলায় যথেষ্ট সিরিয়াস ভাব এনে বলল, ‘তুমি তো শুধুমাত্র ওই দুজনের কাহিনী জানো কিন্তু রাফির কাহিনী তো জানো না। রাফির মাথায়ও গণ্ডগোল আছে, কিন্তু ওর বাড়ির কেউ বলে না এসব কথা। বছরে একটা সময় আসে, যখন ওকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখতে হয়। ওইদিন থেকে পরবর্তী দুইদিন পর্যন্ত ও সিরিয়াস রকমের পাগল থাকে। কত ডাক্তার, কবিরাজ, বৈধ্য দেখানো হলো কিছুতেই কাজ করে না। তুমি বরং ওর পিছু ছেড়ে দাও। ওর এসব দিক জানার পর থেকে তুমি নিশ্চয়ই আর ওকে পছন্দ করবে না।’

মিতা দ্বিধাদ্বন্ধ নিয়ে তাকাল। রাফির যে এত সিরিয়াস সমস্যা থাকতে পারে, এটা কখনো তার কল্পনাতেও আসে নাই। ভাগ্যিস আজ এই মেয়েটা সাবধান করে দিল, নয়ত কি হতো কে জানে? খুব দ্রুত এদের ছাড়তে হবে। দুনিয়াতে অনেক ছেলে আছে, এদের মত মাথা খারাপ দের পিছনে ক্ষতি ছাড়া কোন লাভ নেই।
সে জুহিকে বলল, ‘আপনাকে ধন্যবাদ আমাকে পুরো ব্যাপারটা জানানোর জন্য। আমি না একটু একটু বুঝতে পারতাম। কিন্তু কখনো সিরিয়াস ছিলাম না। আচ্ছা, রাফির এই সমস্যা আবার কবে শুরু হবে?’

জুহি মিনিট দুয়েক ভেবেচিন্তে উত্তর দিল, ‘এই তো সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই। কেন? তুমি আসবে? দেখবে নিজের চোখে?’

মিতা তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। দু’হাত একত্রে নাড়িয়ে বলল, ‘না না একদম না। এসব দেখে আমি কি করব? আমি দেখব না, দেখব না। আজ বরং উঠি কেমন? আবার অন্য একদিন দেখা হবে।’

‘আচ্ছা। এসো কিন্তু মাঝে মাঝে। গল্প করব, আর…… আর রাফির পাগলামির কাহিনীও শুনাব।’
মিতা দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এলো। ওকে দেখে জুহি হঠাৎ কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘ও হ্যাঁ রাফির আরও একটা সমস্যা আছে…..।’

মিতা জুহিকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘না আর শুনতে চাই না, প্লিজ।’
তারপর সে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘আচ্ছা রাফির বউ কই? তাকে একটু দেখতে ইচ্ছে করছে।’

জুহি বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। মিষ্টি হেসে নিজের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘এইতো আমি।’

মিতা বোধহয় ভুত দেখার মত চমকে উঠল। এই মেয়েই তো রাফি সম্পর্কে এতক্ষণ এত কথা বলছিল। কেউ নিজের স্বামী সম্পর্কে এত নেগেটিভ কথায় কী করে বলতে পারি মিতা তা ভেবে পেল না।
আমতা আমতা করে বলল, ‘আ-আপনি? আপনি রাফির বউ? সত্যি?’

‘হ্যাঁ। মিথ্যা বলব কেন? কেন আমাকে দেখতে কি ভালো লাগছে না?’

‘না না ঠিক আছে।’ তড়িৎবেগে উত্তর দিল মিতা। পরক্ষণেই আবার বলল, ‘তবে রাফির নামে এত কথা বললেন যে? নিজের স্বামীর নামে কেউ বলে এসব?’

‘আমি আবার কোনো কিছু গোপন রাখতে পছন্দ করি না। মানুষের দোষ তো থাকতেই পারে তাইনা? এটা দশজনে জানলে কি সমস্যা? সমালোচনা করবে? তো করুক। আমি যদি সব ঠিক রেখে আমার স্বামীর ঘর করতে পারি, তবে তাদের কোনো সমস্যা হবে বলে আমার মনে হয় না।’

মিতা ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। তারপর বিদায় নিয়ে কোনোমতে দৌঁড়ে পালায়। আর জুহি? সে ওখানেই খিলখিল করে হাসতে হাসতে সোফায় গড়াগড়ি খায়। কী কাহিনী করল! কেউ শুনলে কী মনে করবে কে জানে? তবে যে যা ইচ্ছে মনে করুক। রাফি শুধুমাত্র জুহির থাকলেই হলো, বাদবাকি মানুষের কথা তার দরকার নাই। আর এই মেয়ে, কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে কে জানে? এহহ, শখ কত! আসছে রাফিকে পছন্দ করতে।
সে না হয় রাফিকে ভালোবাসার কথাটা মুখ ফুটে বলতে পারে না, তাই বলে অন্য কেউ এসে রাফিকে ভালোবাসার কথা বললে জুহি মেনে নেবে নাকি? উহু, কোনভাবেই নয়।
.
রাফি ফিরে এলো পরের সপ্তাহে। এসেই ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল, যা চলল গান রেকর্ডিংয়ের দিন পর্যন্ত। তবে এর মাঝে সামান্য সময় পেল, সেদিন আবার আদনান এসেছিল রাফির সাথে। মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই আদনান আশেপাশে চোখ বুলাচ্ছিল। জুহি বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল। ব্যাপারটা তার নজরে এড়াল না। আদনান এরকম চোরের মত আশেপাশে তাকিয়ে কী লক্ষ্য করছে সেটাই দেখার বিষয়। রাফি নিজেও আদনানের ব্যাপারটা খেয়াল করে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কি ব্যাপার এইভাবে কি দেখছিস? নাকি কাউকে খুজছিস?’
আদনান ইশারায় রাফিকে চুপ করতে বলল। রাফি সেটা বুঝল না। সে ফের বলল, ‘সমস্যা কি ভাই তোর? এমন উঁকিঝুঁকি মারার জন্য আসছি সেখানে? বাড়ির ভেতরে চল।’

আদনান ফিসফিস করে বলল, ‘আরে ভাই ঝড় কোন দিক থেকে আসে সেটা বোঝার চেষ্টা করছি। দেখা গেল ভিতরে পা দিলাম, ওমনি সামনে থেকে সুনামি এসে সোজা গায়ের উপর হামলে পরল।’

রাফি আদনানের কথা সারমর্ম বুঝতে পেরে হেসে উঠল। হাসি থামিয়ে বলল, ‘মিতা তাই না? আরে ব্যাটা ভয় পাস না চল, আমি আছি তো।’

‘তুই আছিস বলেই তো ভয়। তুই না থাকলে টেনশনই থাকত না।’
আদনানের বলা কথাটা মাত্র পড়ল, রাফি কিছু বলার সুযোগও পেল না, তার আগেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড়ের মতো মিতা দুজনের সামনে এসে পড়ল। অবশ্য তার আসাটাও ইচ্ছাকৃত ছিল না। প্রাইভেট পড়ে বাসায় আসছিল, তখনই এদের মুখোমুখি পড়ে যাওয়া। নয়ত কে ইচ্ছাকৃতভাবে এই পাগলদের সামনে আসে? আদনান ওকে দেখা মাত্রই ছিঁড়েকেটে দৌঁড়। আদনানের দৌঁড় দেখে মিতাও উল্টো দিকে দৌঁড়। রাফি হা হয়ে বন্ধুর পাগলাছুটের দিকে একবার আর মিতার উল্টো দিকের দৌড়ের দিকে একবার চাইল। কিছুক্ষণ বাদে দুজন দৃষ্টি সীমানার বাইরে যাওয়ার পর সে চোখমুখ কুঁচকে আপনমনে বলল, ‘আগে আমরা ওকে দেখে দৌড়াতাম। আর ও এখন আমাদের দেখে দৌড়াচ্ছে? মানে কাহিনী কি হলো? আগামাথা কিছুই বুঝলাম না।’

উপর থেকে পুরো দৃশ্য টাই জুহির চোখে পড়ল। ব্যাপারটা বুঝতে তার একটুও সময় লাগল না। দুজনের দৌড়ানো দেখে শব্দ করে হেসে উঠল। উপর থেকে রাফিকে চেঁচিয়ে ডাকল, ‘এই রাফি!’

ডাক শুনে রাফি উপর দিকে তাকাতেই জুহি ফের বলল, ‘ওখানে দাঁড়িয়ে কি করছ? আসো আসো ভেতরে আসো।’
জুহির কথা শুনে রাফি কিছু একটা আন্দাজ করতে পারল। তার মন বলছিল, আজকের এই কান্ডটার মধ্যে জুহি কোন না কোন ভাবে জড়িত। তাই সে কোনো প্রকার জটিলতা ছাড়াই জিজ্ঞেস করল, ‘কাহিনী কি বলতো?’

জুহি কিছু না বোঝার ভঙ্গিতে বলল, ‘কীসের কাহিনী?’

‘একদম না বোঝার চেষ্টা করবে না। মিতাকে কি বলেছ তুমি? ও এভাবে পাগলের মত দৌঁড়ে পালাল কেন?’

‘ওমা তোমাদের মিতা কেন দৌড়ে পালাবে সেটা আমি কি জানি? এখন মিতা দৌড়ে পালানোর তার জন্য আমাকে ব্লেম করা হচ্ছে? হুহ! দুইদিন পর মিতা রাস্তায় আছাড় খেয়ে পড়ে গেলে তো তুমি এসে আমাকে জিজ্ঞেস করবে, জুহি মিতা কেন রাস্তায় আছাড় খেয়ে পড়ে গেল? তুমি কি জাদু মন্ত্র করেছ তাকে?’

রাফি উদ্ধিগ্ন কণ্ঠে বলল, ‘আরে আরে এ তো দেখি বেশি বুঝে ফেলল।’

‘হ্যাঁ এখন আমি তো বেশি বুঝব। মানুষের কত দরদ! এত দরদ ঘরের মানুষের জন্য দেখালেও কাজে দিত।’ মুখ ভেংচিয়ে বলল সে।
রাফি কানে ধরে অনুনয়-বিনয় করে সহস্রবার সরি বলল। জুহি ভেবে পেল না রাফি এমন কি দোষ করেছে যে এতবার সরি বলছে? তবে এই রাগ ভাঙ্গানোর ব্যাপারটা জুহির মনে ধরল। সে ইচ্ছে করেই আরো কিছুক্ষণ রাগ করে রইল, অকারনেই! তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিল, সে এমন রাগ জীবনে আরও বহুবার করবে আর রাফি এভাবেই হেসেখেলে রাগ ভাঙাবে।
.
রাফি তক্কে তক্কে থাকল, জুহির ডায়েরীটা আরেকনজর দেখার জন্য। একদিন সন্ধ্যার পর সেই সুযোগটা এলো। জুহি মায়ের সাথে বের হলো এক আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু রাফিকে হতাশ হতে হলো, কারণ এর আগের বার ডায়েরীটা যে জায়গায় ছিল এখন সেখানে নেই। ড্রয়ার খুঁজে তন্ন তন্ন করে ফেলল। হতাশ হয়ে ফোন হাতে নিয়ে বসে পড়ল। বিছানায় বসে বালিশ টেনে হেলান দিতে যাবে এমন সময় বালিশের নিচেই ডায়েরীটা দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গেই চোখ জোড়া চকচক করে উঠল।
ডায়েরী হাতে নিয়ে কয়েক পৃষ্ঠা উল্টাল।
একটা পাতায় নিজের নাম চোখ পড়তেই সেটা পড়া শুরু করল,
—“আমি না খুব স্বার্থপর জানো রাফি? নিজেকে স্বার্থপর আখ্যায়িত করছি কেন জানো? এই যে, তোমার ভালোবাসা পরিমাপ করে তারপর তোমায় ভালোবাসি।
তোমার ভালোবাসার কথা আমার কর্ণকুহরে পৌঁছানো মাত্রই আমার অবস্থা শরবিদ্ধ হরিণের মতো হয়ে গিয়েছিল, তাই তোমাকে ভালোবাসি।
চাইলেই যেই শহরে নতুন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়, সেই শহরে একজন মানুষের অবহেলা দিনের পর দিন সহ্য করে তাকে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসার জন্য, আমি তোমাকে ভালোবাসি।
যেদিন মনে হয়েছিল তোমাকে না পেলে খুব আফসোস হবে, সেদিনই তোমাকে পেয়ে হাজার বছর বাঁচার স্বপ্ন দেখেছি; তাই তোমাকে ভালোবাসি।
এত কাজ, এত ব্যস্ততা আর সময়ের অভাবেও যে তুমি আমার জন্য সময় তুলে রাখতে ভুলো না, তাই তোমায় ভালবাসতে শিখেছি।
মেঘেদের ঠিকানায় যখন প্রথম আলগোছে চিঠি লিখতে শিখালে, তখন প্রথম তোমায় ভালোবেসেছি।
ভালোবাসা নামক এই চার অক্ষরের শব্দটা যখন বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণা শেষ করে দিচ্ছিল, তখনও তোমায় ভালোবেসেছি।
তীব্র আঁধারে যখন তোমার মুখের আদল স্পষ্ট দেখেছি, সেদিনও তোমায় ভালোবেসেছি।
তোমাকে দেখার অসুখ যেদিন বাড়তে বাড়তে আমাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছিল, আমি তোমাকে দেখবার যন্ত্রণায় ছটফট করে কাতরাচ্ছিলাম; ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে তোমায় ভালোবাসি।
বুকের ভিতর অবস্থান করা হৃদপিণ্ডে আলতো করে যেদিন ছুঁয়ে দিয়েছিলে, সেদিন বুঝেছিলাম তোমার ভালোবাসা শুধুমাত্র আমার প্রাপ্য। অতঃপর আমি তোমাকে আরেকবার ভালোবেসে ফেললাম!
স্বার্থপর এই আমাকে সারা জীবন আগলে রাখতে পারবে তো রাফি? আমিও না হয় তোমার ভালবাসার কাঙ্গাল হয়ে তোমায় ভীষণ স্বার্থপরের মতই ভালোবেসে গেলাম!”

যেদিন জুহিকেই পাওয়ার জন্য মায়ের কাছে ভীষণভাবে বায়না করেছিল, সেদিনও তীব্র কষ্টে তার চোখে পানি চলে এসেছিল। খুব আড়ালে সংগোপনে সেটা সেদিন মায়ের কাছ থেকে আড়াল করেছিল; কিন্তু আজ চোখের পানি আড়াল করার প্রয়োজন নেই। বারবার শুধু মনে হচ্ছিল, জুহি তাকে যেভাবে ভালবাসে রাফি ঠিক সেভাবে জুহিকে ভালবাসতে পারে নাই।
রাফি ডায়েরীটা জায়গায় রেখে দিল। মনে সহস্ত্র কৌতুহল জাগলেও রাফি এই ডায়েরী আর কখনোই পড়বে না। তার যতটুকু জানা প্রয়োজন সে ততটুকু জেনে গিয়েছে।
কিছুক্ষণ বাদেই জুহি ফিরে এলো। রাফির চোখে মুখে বিষণ্নতা তার নজর এড়ালো না। সে রাফির পাশে বসে জিজ্ঞেস করল, ‘কি ব্যাপার তুমি এখনো ঘরে? এই সময় তো ঘরে থাকো না। আজকে কি ব্যাপার?’

রাফি নিম্ন হতে মুখ তুলে জুহির দিকে তাকাল। বলল, ‘কোথায় যাব?’

‘কোথায় যাবে মানে? সবসময় যেখানে থাকো। মাহিদ ভাইয়া, রিয়াদ ভাইয়া আর তোমার বন্ধুবান্ধবদের সাথে।’

‘ওরা শুধু আমায় নিয়ে মজা করে, তাই ভেবেছি ওদের সাথে আমি আর কথা বলব না। রাগ করেছি আমি ওদের সাথে।’ বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে বলল রাফি।

‘কী নিয়ে মজা করে?’ জুহি পাল্টা জিজ্ঞেস করল।

‘মাহিদ ভাই তো আমাকে দেখা মাত্রই এক ধমক দিয়ে বলবে, ছি ছি রাফি! এই তুই আমাদের ছোট ভাই? বড় ভাইদের মুখে চুনকালি লাগিয়ে এভাবে বিয়ে করে ফেললি? এখন আমাদের আর বিয়ে-শাদি হবে? লোকে নিন্দে করবে, বলবে নিশ্চয়ই বড় ভাইদের মধ্যে কোন সমস্যা আছে তাই ছোট ভাইকে আগে বিয়ে দিয়ে দিল।’
রাফির কথা শুনে জুহি হাসতে লাগল। আর রাফি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইল প্রেয়সির পানে। এতোদিন চোখের মায়ায় ডুবেছিল, এখন হাসির উচ্ছ্বলতায় ডুবতে হচ্ছে তাকে। এই মেয়ে তো বোধহয় সারা জীবন ভালোবাসায় মায়ায় তাকে ডুবিয়েই রাখবে।
জুহির বাঁধ ভাঙা হাঁসির উচ্ছ্বাসে রাফি নিষ্প্রাণ ভাবে বলল, ‘তুমি আসলেই সর্বনাশের দেবী!’

জুহি হাসি থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কীভাবে? আমি আবার তোমার কী সর্বনাশ করলাম?’

‘এইতো হাসছ, হাসতে হাসতে আমার বুকের ভেতরটায় ব্যথা ধরিয়ে দিচ্ছ। কী অসহ্য আর অসহনীয় যন্ত্রণা। শীঘ্রই এই ব্যথার অবসান না হলে বাঁচব না বোধহয় জুহি!’

জুহি অবাক হয়ে বলল, ‘আচ্ছা, তাই?’

‘হ্যাঁ। তাছাড়া আবার কী হবে? আমার তো মনে হয় এই বুক ব্যথায় আমি একদিন নিঃশ্বাস না নিতে পেরে দমবন্ধ হয়ে মরেই যাব।’

‘তাহলে এই ব্যথার উপশম কী?’

রাফি নতমুখী হয়ে জবাব দিল, ‘একটাবার জড়িয়ে ধরতে দিবে?’
.
.
.
চলবে…..

[কার্টেসি ছাড়া কপি করা নিষেধ]
শব্দ সংখ্যা— ২৯২২