#মন_ভেজা_শ্রাবণে
#পর্ব_১৯
—————
বাঁশের তৈরি ছোট্ট পালঙ্কের ওপর বিধস্ত রুপে বসে আছে নিহাত। দু হাঁটুর মধ্যে মুখ গুজে সমানে ফুপিয়ে যাচ্ছে। আদ্র যে তার ভালবাসা আদ্র নয় এটা মনে হতেই বুকের পা পাশে অদ্ভুত বেদনায় তলিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ সু্ঁচ দিয়ে ক্রমাগত আ’ঘা’ত করছে জায়গাটায়। তবুও তাকে এবার সত্যিটা মেনে নিতেই হবে। সে এতদিন ধরে একটা ভুলের মধ্যে আটকে ছিল তা ভাবতেই বুকের মধ্যে হাহাকার করে উঠছে। মনের কোণে শুধু একটি প্রশ্নই জাগ্রত হচ্ছে, ‘মিহু কেন তাকে এতদিন ধরে মিথ্যে প্ররোচনা দিত।” মস্তিষ্ক একটু সচল হলে সে যখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল আদ্র তার নয়। তার আদ্র তাকে ধোঁকা দিয়ে চলে গেছে ঠিক তখনই মিহু সকলের অগোচরে তাকে বুঝিয়ে – সুঝিয়ে আদ্র’র প্রতি দূর্বল করে তোলে। কিন্তু মিহু এমনটা কেন করল? সে যদি আজ নিজের কানে নাবিলের বলা কথা গুলো না শুনত তাহলে তো কখনোই বুঝতে পারত না কতবড় ভুল, কতবড় অন্যায় সে করছিল। শুধু শুধু একটা পবিত্র ভালবাসা নষ্ট করে দিচ্ছিল। ভাগ্যিস আজ নাবিলের পিছু সে নিয়েছিল। কিন্তু মিহুর থেকে এসব অপকর্মের জবাব সে নেবে। কেন মিহু তার অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে এতবড় অন্যায় তাকে দিয়ে করালো তার জবাব মিহুকে দিতেই হবে। দিতেই হবে!
———–
“সারারাত কী এভাবেই বসে থাকবেন মহারানী?”
“আরেকটু থাকি না। প্রকৃতিটা বেশ মনোরম।”
“তা শুধু প্রকৃতি দেখে চোখ জুরালেই হবে পেটও তো জুরাতে হবে।”
“আমার এখন খিদে নেই। আপনি গিয়ে খেয়ে নিন।”
এই বলে যখনই আদ্র’র বক্ষপিঞ্জিরা থেকে অন্তি আলাদা হতে উদ্যত হয় ঠিক তখনই আদ্র তাকে দ্বিগুণ শক্ত করে আগলে নেয়। চাপা কন্ঠে বলে,
“পেটের খিদে ভোলাই যায় যদি মনের খিদে মেটাতে পারো।”
অন্তি কিঞ্চিৎ মাথা তুলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল আদ্রর পানে। আদ্র’র মুখে রহস্যময় হাসি। দৃষ্টি চঞ্চল। অন্তি সেদিক পানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“মানেটা কী?”
“প্রাকটিকালি বোঝাই।”
আদ্র অন্তির সঙ্গে ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। ঘটনাচক্রে ভড়কে গিয়ে খানিকটা দূরে সরে যায় অন্তি। আদ্র যেন এই কান্ডে বেশ মজা পায়। সে অধর কোণে বক্রহাসি নিমজ্জিত রেখে এক ঝটকায় অন্তিকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আসে। অন্তির সর্বাঙ্গে কম্পন সৃষ্টি হয়ে গেছে। কম্পিত কণ্ঠ কাপিয়ে সে এবারে বলল,
“কী করছেন টা কী? ছাড়ুন আমায়?”
“উহুম আজ তো ছাড়াছাড়ি চলবে না। আজ ছাড়লে যে অ’ন’র্থ ঘটে যাবে। আমি জেনে শুনে সেই অ’ন’র্থ কী করে হতে দেই বল?”
অন্তি চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে নিল। আদ্র তার পুরুষালী পুরু ওষ্ঠজোড়া দ্বারা চেপে ধরল অন্তির কোমল অধর। কেটে গেল কিছু সুখকর মুহুর্ত।
———–
পরদিন খুব সকাল সকাল ওরা রওনা হয়ে গেল বাড়ির উদ্দেশ্যে। নিহাত এবারে নিজে থেকেই নাবিলদের সঙ্গে গিয়ে বসল। আর কেমন জানি বিভৎস দেখাচ্ছিল ওকে। এ বিষয় টা সকলেরই নজরে পড়েছে। খেয়াল করেছে মিহু নিজেও। তাই তো সে ইনিয়ে বিনিয়ে আদ্র’র সংস্পর্শে যাওয়ার জন্য ওকে ইন্ধন জোগাচ্ছিল কিন্তু দেখা যায় নিহাত মিহুর সঙ্গে একটি প্রতুত্তোরও করে নি। মিহু বেশ রেগে যায় এমন ব্যবহারে। চেয়েও কিছু বলতে পারে না তখন আশেপাশে সকলে থাকায়। অগত্যা দাঁত কিড়মিড়িয়ে চলে যায় গাড়িতে। এদিকে দুষ্টু, মিষ্টি খুনসুটিতে আদ্র -অন্তি অতিক্রম করে দেয় নিজেদের যাত্রাপথ।
————
দৈনন্দিন জীবনে সকলেই সকলের মতো ব্যস্ত। কেবল একটি মানুষ ব্যতিত। সে হচ্ছে নিহাত। তারই কেবল কোনো ব্যস্ততা নেই। আছে শুধু প্রিয়জন থেকে দূরে যাওয়ার তাড়া। এক মাস কেটে গেছে। বিগত একমাসে নিহাত কলেজ কেন একদম বাহির মুখো হয়নি। ঘরবন্দী থেকেছে বেশিরভাগ সময়ে। খুব প্রয়োজন ব্যতিত তাকে ড্রয়িংরুমেও দেখা যায় নি। আদ্র-অন্তির জীবন ঝামেলাহীন বয়ে চলেছে। নিহাত না থাকায় আলাদা প্রশান্তির ছাঁয়া উপলব্ধি করছে তারা। এমনই একদিন আদ্র অন্তিকে নিয়ে কলেজ থেকে বাহিরর দিকে রওনা হবে। অন্তি কেবল আদ্রর পেছনে বাইকে চেপে বসেছে আর আদ্র বাইকে স্টার্ট দিয়েছে। ঠিক তখনই কোত্থেকে নিহাতের দেখা মেলে। হন্তদন্ত হয়ে বাইকের সামনে এসে পড়ে সে। আদ্র সঙ্গে সঙ্গে স্টার্ট বন্ধ করে দেয়। একটু হিমশিম খেয়ে যায়। এতদিন পর এই আতঙ্ক আবার সামনে আসায় অজানা আশঙ্কায় চুপসে যায় অন্তির অন্তরিক্ষ। চোখ, মুখে কেমন ভয়ের ছাপ। সে চুপচাপ পৃষ্ঠদেশ বরাবর আদ্র’র শার্টের অংশবিশেষ শক্ত করে খামচে ধরে আছে। নিহাত একবার আদ্র’র পেছনে লুকিয়ে থাকা ভয়ার্ত অন্তির সুশ্রী মুখশ্রী উঁকি দিয়ে দেখল। পরপরই দেখল আদ্র’র ভাবুক দৃষ্টি। অতঃপর কিঞ্চিৎ হেসে উঠল। আদ্র লক্ষ্য করল সে হাসিতে প্রাণ নেই। কেমন এক নির্জীব হাসি। আদ্র ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল। নিহাত হাসি থামিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। মলিন চাহনিতে, মলিন কন্ঠে বলল,
“ভয় পাবেন না ভাইয়া। আমি আজ কোনো অপ্রীতিকর কান্ড ঘটাতে আসিনি। এসেছি আমার এতদিনের করা ভুলের ক্ষমা চাইতে। অন্যের প্ররোচনায় আর নিজের অসুস্থতার মধ্যে দিয়ে যে অন্যায় আমি আপনার সঙ্গে করেছি তার ক্ষমা হবে কি না আমি জানি না। তবে একুটু বুঝতে পারছি আজ যদি ক্ষমা না চাই তবে বাকি জীবন টা আমাকে আফসোস করেই কাটাতে হবে।”
নিহাত অন্তির দিকে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ অন্তির অবাকান্বিত মুখশ্রীতে দৃষ্টি রেখে বলল,”পারলে ক্ষমা করে দিও বোন। তোমাকে না জেনেই অনেক কষ্ট দিয়েফেলেছি। নেক্সট উইক আমার ভিসা কনফার্ম। দোয়া করিও আমার জন্য যেন সঠিক ট্রিটমেন্ট নিয়ে ফিরে আসতে পারি।”
“ইনশাল্লাহ আপু অবশ্যই পারবে।”
নিহাত আরও একবার অন্তির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে গেল। আদ্র নিরব দর্শকের ন্যায় সবটা দেখল । নিহাত চলে যেতেই অন্তি দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। চাপা কন্ঠে বলল,
“আল্লাহ তুমি আপুটার সব কষ্ট দূর করে দাও। তাকে একটা সুন্দর, স্বচ্ছন্দপূর্ণ জীবন দান কর।”
আদ্র শুনল অন্তির করা দোয়া টুকু। সেও ততক্ষণাৎ মৃদু স্বরে বলল,”আমিন!”
———–
“নাহহহ এটা কিছুতেই হতে পারে না। আমার একে একে সাজানো প্ল্যান ওই এক মেয়ে কিছুতেই ভেস্তে দিতে পারে না। নিহাত এতটা বদলে গেল কী করে। ডক্টর সজিব (নিহাতের পার্মানেন্ট ডক্টর) কী তবে বে’ই’মা’নী করছে আমার সঙ্গে?”
“নাহ আপু আমি খবর নিয়ে জেনেছি ডক্টর সজিব কোনো বে’ঈ’মা’নী করছে না কিন্তু ওই নিহাত কেন জানি ঘোল পালটে ফেলেছে।”
“এভাবে সবকিছু হাতের বাহিরে যেতে দিলে চলবে না। আমি আজই নিহাতের সঙ্গে মিট করব এ্যট এনি কস্ট।”
“তবে দেখো যা করবে সা’ব’ধা’নে। উত্তেজিত হয়ে কোনো ভুল পদক্ষেপ নিয়ে নিও না যেন।”
“উহুম এত কাঁচা খেলোয়াড় এই মিহু নয়। তুই একদম নিশ্চিন্ত থাক।”
——
চলবে,
সাদিয়া আফরিন নিশি ®__