#মন_ভেজা_শ্রাবণে
#পর্ব_২০
—————————–
নিহাত নিজের রুমে বসে টুকিটাকি জিনিস প্যাক করে নিচ্ছে। আর তো বেশিদিন হাতে নেই। তাই আগে থেকেই গোছগাছ সেরে নিচ্ছে। এমন সময় প্রবল ক্রোধে ক্রোধান্বিত হয়ে সেখানে উপস্থিত হয় মিহু। দু চোখ জুড়ে যেন তার আগুন ঝড়ছে। মিহুকে দেখে নিহাত বেশ বিরক্ত বোধ করল সেই সঙ্গে চাপা রাগ হল। মিহু নিহাতের দিকে এগিয়ে এসে কটমট চোখে তাকিয়ে বলল,
“তুই কী শুরু করেছিস নিহাত। আমার ফোন কেন তুলছিস না। আমাকে সবসময় এভয়েড করছিস। নিজেকে কী মহান ভাবতে শুরু করেছিস নাকি?”
” মহান ভাবার মতো কোনো কাজ তো আমি করি নি। যা করেছি সবই অ’ন্যা’য়। যা তুমি আমাকে দিয়ে করিয়েছ।”
মিহু নিহাতের বাহু বেশ শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
“কী বলতে চাইছিস তুই?”
“তুমি কী সত্যিই বুঝতে পারছ না আমি কী বলতে চাইছি?”
মিহুর প্রচন্ড রাগ উঠল নিহাতের ওপর। সে এক ধাক্কায় নিহাতকে বিছানায় ফেলে দিয়ে ওর গ’লা চে’পে ধরল। অকস্মাৎ ঘটনায় নিহাত কিছু বুঝে ওঠার আগেই মিহু সর্বশক্তি দ্বারা ওকে মা’রা’র চেষ্টা করতে করতে বলল,
“তুই আমার কথার অবাধ্য হবি। এই মিহুর কথার। এবার দেখ আমি তোর কী অবস্থা করি।”
নিহাত মিহুর সঙ্গে পেরে উঠতে পারছে না ঠিক সে সময়ই নিহাতদের বাড়ির কাজের মেয়েটা সেখানে উপস্থিত হয়। সে এসেছিল মিহুর জন্য নাস্তা নিয়ে কিন্তু এসে যে এমন পরিস্থিতির সাক্ষী হবে তা কখনোই ভাবতে পারে নি। কাজের মেয়েটির নাম হলো মিতা। মিতা ওদেরকে এমন অবস্থায় দেখে বিকট এক চিৎকার করে ওঠে। সেই সঙ্গে তার হাত থেকে মিহুর জন্য আনা নাস্তার ট্রে টাও স্বশব্দে মেঝেতে পড়ে গুড়িয়ে যায়। হঠাৎ শব্দে পেছন ঘুরে মিহু৷ মিতাকে ওভাবে দেখে সে নিহাতকে ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে মিতাকে ধরতে যায়। কিন্তু তার আগেই মিতা দৌড় লাগায়৷ একেবারে মেইন গেট পেড়িয়ে বাহিরে চলে যায় মিতা। মিহুও পিছু নেয়। মিহু কেমন হিংস্র আচরণ করছে। তার মধ্যে অদ্ভুত পশুত্ব স্বত্বা এসে ভর করেছে যেন। কিছুদূর যেতেই এক পর্যায়ে মিহু মিতাকে ধরে ফেলে। কোনো কথা ছাড়ায় কষিয়ে দেয় এক চ’ড়। তখনই সেখানে উপস্থিত হয় নাবিল। সে বাড়ির পথে আসছিল ওদেরকে এভাবে দেখে গাড়ি দার করায়। নাবিল কৌতুহল নিয়ে ওদের সামনে যায়। আশ্চর্যান্বিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“কী হচ্ছে এখানে? মিহু তুই মিতার গায়ে হাত তুলছিস কেনো?”
মিহু নাবিলকে দেখে কিছুটা শান্ত নরমাল হয়, পুরোপুরি না। জোরে জোরে শ্বাস টানছে সে। নিজেকে ধাতস্ত করে কিছু বলতে চাইলে মিহুর আগেই মিতা ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বলে
“আ আপা মনি! আপামনিরে মা’র’তে চাইছিল এই আফায়। আপামনি বিছানায় ছটপট করতাছে।”
মিহু চোখ গরম করে তাকায় মিতার দিকে। নাবিলের চাহনি অবিশ্বাস্য। তার এখনো কিছুই বিশ্বাস হচ্ছে না। কী হচ্ছে সব মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। নাবিলের দৃষ্টি দেখে মিহু বলে ওঠে,
“ও ও সব মিথ্যে বলছে নাবিল। ও নিজেই নিহাতকে মা’র’তে চাইছিল। আমি সময় মতো এসে পড়ায় পালাচ্ছিল। তাই আমি ওকে ধরতে এসেছি।”
মিতু কেঁদে কেঁদে বলল,”বিশ্বাস করেন ভাইজান আমি সত্য কইছি। ওই আফায়….”
নাবিল দুজনকেই থামিয়ে দেয়। দুজনের হাতটা দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরে গাড়িতে ওঠায়। নিয়ে যায় ওদের বাসায়। গাড়িতে বসেই সে সকলকে কল করে দেয়। বাড়িতে গিয়ে নিহাতের ঘরে গিয়ে দেখে নিহাত বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে। নাবিল দৌড়ে এগিয়ে যায় নিহাতের কাছে। বুকে জড়িয়ে নিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে,
“কী হয়েছে বোন তোর? কী হয়েছে? কে করেছে তোর এমন অবস্থা।”
নিহাত অনেক কষ্টে হাতের আঙুল উঁচিয়ে মিহুকে দেখিয়ে দেয়। মিহু ততক্ষণাৎ দৌড়ে পালাতে চায় কিন্তু তার৷ আগেই ওখানে সাহেল,রওনক,তিহা,আদ্র উপস্থিত হয়ে যায়। তিহা মিহুকে পালানোর আগেই ধরে ফেলে। তারপর নাবিলের থেকে সবকিছু শুনে ওরা পুলিশে কল করে মিহুকে ধরিয়ে দেয়। আর নিহাতকে হসপিটালাইডজ করে।
———
“কী হয়েছিল তোর বোন বল আমাদের। মিহু কেন এমন করল তোর সঙ্গে?”
“হ্যাঁ নিহাত বলো তুমি কীভাবে এসব হলো?”
নিহাত দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পুরো ঘটনা টা ওদের বলল। সবকিছু শুনে কেউই বুঝতে পারছে না মিহু কেন এমন করল। সকলেই বিষয় টা নিয়ে বেশ চিন্তিত। আদ্র’র পেছনে নিহাতকে লেলিয়ে দিয়ে মিহুর কী লাভ?
নিহাতকে বাড়িতে আনা হয়েছে। সে এখন সুস্থ। থা’না’য় যখন মিহুকে আ’ট’ক করা হয় তারপর সেখানে এক ছেলে উপস্থিত হয়। ছেলেটি পা’গ’লের মতো করছিল মিহুকে আ’ট’ক দেখে। ছেলেটি নাকি মিহুর ভাই। পরবর্তীতে ছেলেটিকেও আ’ট’কে রাখা হয়। এই খবর শুনে নিহাত ঠিক করেছে একবার থা’না’য় যাবে। ওদের সঙ্গে দেখা করে আসবে। মিহুর থেকে জ’বা’ব তো নিতেই হবে। সেই সঙ্গে ওর কোন ভাইয়ের উদয় হলো তাও তো দেখতে হবে। যে ভাইকে কী না আগে ওরা কেউ কখনো দেখে নি। তাহলে সে এতোদিন কোথায় লুকিয়ে ছিল?
———
থা’না’য় গিয়ে নিহাত তো বাকরুদ্ধ। ধীরে ধীরে পুরোনো সব স্মৃতি তার অক্ষিপটে জ্বলজ্বল করে উঠছে। পাথরের ন্যায় দাড়িয়ে আছে সে। আদ্র! সেই আদ্র! সেই প্রতারক আদ্র তার সম্মুখে উপস্থিত। নিহাতের মন,মস্তিষ্ক সবকিছু যেন সচল হতে চলেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে তীব্র ক্রোধের আবির্ভাব ঘটছে। অকস্মাৎ ঘটনায় সে নিজেকে সামলাতে না পেরে দু-হাতে চুল খামচে ধরে স্ব জোরে চিৎকার করে ওঠে। গগনবিদারী সেই চিৎকারে হকচকিয়ে উঠে পুরো থা’না’র কর্মকর্তারা। নিহাতের অবস্থা দেখে এক মহিলা কর্মকর্তা এগিয়ে আসে। জিজ্ঞাসা করে,
“কী হয়েছে তোমার? এমন করছ কেন? কার সঙ্গে দেখা করতে এসেছ?”
তখনই ওপাশ থেকে আরেকজন বলে ওঠে, “উনি ওই দুই ভাই-বোনদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। যাদের দুদিন আগে আ’ট’ক করা হয়েছে।”
মহিলা কর্মকর্তা টি নিহাতের কাঁধ চেপে ধরে বললেন,”আর ইউ ওকে? বেশি খারাপ লাগলে ঠিকানা বলো পৌঁছে দেয়া হবে তোমায়?”
নিহাত হাতের ইশারায় বোঝালো সে ঠিক আছে। কিন্তু তাকে দেখে যে কেউ বুঝে যাবে সে ঠিক নেই। মহিলা কর্মকর্তা টিও ওর কথা বিশ্বাস করল না। তাই ওকে ধরে নিয়ে একটি চেয়ারে বসিয়ে দিল। পাশের টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি দিল। নিহাত পুরো পানির গ্লাস এক নিমেষেই শেষ করে ফেলে লম্বা শ্বাস নিল। মহিলা কর্মকর্তা টি এতক্ষণ ওকে খুব ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। পানি খাওয়া শেষ হতেই তিনি আদেশের সুরে বললেন,
“তোমার বাড়িতে ফোন করো। কাউকে এসে নিয়ে যেতে বলো তোমায়।”
“আ আমি পারব।”
“উহুম! এটা আমার ডিউটি! একজন অসুস্থ মেয়েকে এভাবে একা ছাড়া আমার ব্যক্তিত্বের মধ্যে পড়ে না। সো যা বলছি তাই করো নয়তো আমি তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসছি।”
নিহাত বুঝতে পারল মহিলা কর্মকর্তা টি তার দ্বায়িত্বে অটল। তাই অনিচ্ছায় সত্ত্বেও নাবিলকে কল করে আসতে বলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাবিল সেখানে উপস্থিত হল। মহিলা কর্মকর্তা টি নাবিলকে পুরো ঘটনা টি বলে দিল। নাবিল সে সব শুনে নিহাতের কাছে এসে বলল,
“কী হয়েছিল তুই কেন এমন বিহেভ করেছিস? আচ্ছা তুই কেন এখানে এসেছিস আগে তাই বল?”
অকস্মাৎ নিহাত নাবিলকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। মহিলা কর্মকর্তা টি তখনো ওখানেই উপস্থিত ছিল। নিহাতকে এভাবে দেখে নাবিল একবার ওনার দিকে তাকায়। তিনি নাবিলকে আস্বস্ত করে বললেন, “ওকে সামলান। ধীরে ধীরে জানতে চান সমস্যা কী?” তারপর উনি ওখান থেকে চলে যায়। নাবিল নিহাতের মাথায় স্নেহের পরশ দিতে দিতে বলে,”কী হয়েছে বোন বল আমায়?”
নিহাত ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলে,”ভাইয়া ও ওই সেই! আদ্র!”
নাবিল ক্ষণকালের জন্য থমকে যায়। নিহাতের ক্রন্দনরত মুখশ্রী আঙুলের সাহায্যে উপরে তুলে ধরে বলে,”কোথায় সে বল?”
নিহাত হাতের ইশারায় কা’রা’গা’রের ভেতরে দেখিয়ে দেয়। নাবিল সেদিকে তাকিয়ে বিষ্ময় নিয়ে বলে,”ও তো মিহুর ভাই মাহাতিব।”
নিহাত করুণ কন্ঠে বলে,”ওই সেই প্রতারক ভাইয়া। আমার জীবন নিঃশেষকারী। আমার জীবনের একমাত্র অ’ভি’শা’প।”
নাবিল প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। নিহাতকে ছেড়ে এগিয়ে যায় কা’রা’গা’রের দ্বারপ্রান্তে। তীব্র ক্ষোভের সহিত গর্জে উঠে বলে,
“ইউ বা’স্টা’র্ড তুই আমার বোনের স”র্ব’না’শের পেছনের কারণ। তোকে তো আমি জি’ন্দা দা’ফ’ন করব।কু***র বা***।”
মিহু, মাহতিব দুজনেই কাচুমাচু হয়ে দূরে সরে যায়। এদিকে নাবিল কা’রা’গা’রের বাহিরে থেকে এমন গর্জন করে চলেছে। তাকে সামলাতে আরও কয়েকজন এসে ভিড় করেছে। নিহাত চেয়ারে বসে ডুকরে কাঁদছে।
——
চলবে,
সাদিয়া আফরিন নিশি ®——