মাতাল প্রেমসন্ধি পর্ব-০১

0
51

#মাতাল_প্রেমসন্ধি

পর্ব : ১ (সূচনা পর্ব)

সকালেই বাড়িতে একপ্রস্ত ঝগড়া-বিবাদ হয়ে গেলো। ‘খাঁ’ বাড়িতে যা একদমই নতুন কিছু না, বরং নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তাই বাড়ির লোকও বিশেষ কিছু চিন্তা করেনা এসব নিয়ে। বরং কোনোদিন সকালে শাহানা বেগমের চিৎকার না শুনলে তার স্বামী নওশাদ আলম খাঁ দুশ্চিন্তায় পড়ে, বউটার শরীর ভালো আছে তো?
ছোটখাটো কারণেই একমাত্র ননদ সায়েরার সাথে ধুন্ধুমার বেঁধে যায় তার। সায়েরা নিতান্তই সাদাসিধে, শান্ত মানুষ। তার উপর ভাইয়ের বাড়িতে একরকম আশ্রিতাই বলা যায়। সে প্রতিবাদ করেনা৷ ঝগড়া বলতে একপাক্ষিক চিৎকারই চলে শাহানার পক্ষ থেকে।
তবে আজ ঘটনা মোটেই সামান্য নয়। বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার আজই শেষ দিন ছিলো। বিল দেওয়ার দায়িত্ব ছিলো উৎসের উপর, সায়েরার একমাত্র ছেলে। কথা ছিলো ভার্সিটিতে যাওয়ার আগে সে দিয়ে যাবে। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণ বশত সে কাজটা করেনি, ভার্সিটি চলে গেছে। তা নিয়েই যতো কাণ্ড সকালের।

“তোমার ছেলে কি আজীবন এমন অসভ্যই থেকে যাবে সায়েরা? ভদ্র, সভ্য আর বানাতে পারবে না?”
সায়েরা নির্লিপ্ত গলায় বললো,”এমন বলছো কেনো ভাবী? তোমাকে তো বললাম ছেলেটার তাড়াহুড়ো ছিলো। কিছু খেয়েও গেলো না।”
“তোমার ছেলে খেয়ে গেলো কি গেলো না এটা আমার দেখার বিষয় না সায়েরা। আজ দিনের মধ্যে বিল না দিলে দেখবে আমি কি করি।”
শাহানা রাগান্বিত অবস্থায় সেখান থেকে চলে যায়। সায়েরা বিচলিত হয়ে পাশে থাকা চেয়ারের উপর বসে পড়ে। আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মোছে। ছেলের ফিরতে ফিরতে তো সেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে। বিদ্যুৎ অফিস কি খোলা থাকবে ততক্ষণ? আরেকটা অশান্তি বাঁধবে আজ।

“সায়েরা।”
নওশাদ আলমকে দেখে সায়েরা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায়। নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে।
“ভাইজান কিছু বলবে?”
“কি হয়েছে তোর?”
“আমার আবার কি হবে?”
“তোর ভাবী সকাল সকাল আবার কি নিয়ে বাঁধালো আজ?”
“ও কিছু না ভাইজান। তুমি অফিসে যাবে না? দেরি হয়ে যাচ্ছে তো।”
নওশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের দিকে পা বাড়াতেই সায়েরা তাকে আটকায়।

“ভাবীকে কিছু বলোনা ভাইজান। আসলে দোষটা উৎসেরই। ছেলেটা কোনো কথা গায়ে লাগায় না।”
নওশাদ ভ্রু কুঁচকে বললো,”উৎস আবার কি করেছে? কথা গায়ে না লাগানোর মতো ছেলে তো ও নয়।”
“তুমি ওকে আর আস্কারা দিও না ভাইজান। শুধুমাত্র তোমার আস্কার পেয়ে ও দিন দিন একটা বাঁদর তৈরি হয়েছে। আবার মনে হয় সিগারেটও ধরেছে।”
“কি বলিস?”
“হ্যা ভাইজান, আমি ওর ঘর থেকে সেদিন সিগারেটের প্যাকেট পেয়েছি।”
নওশাদ কিছুক্ষণ বোনের দিকে তাকিয়ে থাকে তারপর হঠাৎ শব্দ করে হেসে দেয়।
“ভাইজান হাসছো কেনো? এটা কি হাসির মতো কিছু?”
“আচ্ছা সায়েরা, একটা কথা বল তো। ধর আমি বাইরে থেকে বাড়ি ফেরার পর আমার হাতে একটা শাড়ির প্যাকেট দেখা গেলো। শাড়িটা কার? আমার?”
“ভাইজান যে কি বলো। তুমি কি শাড়ি পরো? হতে পারে ওটা ভাবীর জন্য এনেছো বা আমার জন্য।”
নওশাদ স্মিত হেসে বললো,”তাহলে উৎসের ঘরে সিগারেটের প্যাকেট দেখেছিস মানে কীভাবে নিশ্চিত হয়ে গেলি যে আমার উৎস সিগারেট খায়।”
সায়েরা হতাশ চোখে ভাইয়ের দিকে তাকায়। এই মানুষটার কাছে উৎস ফেরেশতা। দুনিয়ার সবাই যদি এক হয়ে যায় যে উৎস খারাপ ছেলে, শুধুমাত্র এই মানুষটা সবার বিপরীতে দাঁড়াবে। অবশ্য আরেকজনও আছে, সায়েরা সেইটা বোঝে।

“ভাইজান তুমি ওকে আহ্লাদ দিয়ে নষ্ট বানাচ্ছো। আজ সিগারেট খাচ্ছে কাল যে অন্য নেশা করবে না তার নিশ্চয়তা আছে?”
নওশাদ বোনের হাতের উপর হাত রেখে বললো,”এগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তা করা বন্ধ কর সায়েরা। উৎস আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে শুদ্ধতম মানুষ। ও এই ভুল কখনো করবে না, আমি ওকে বিশ্বাস করি।”
সায়েরা মাথা নিচু করে দাঁড়ায়, কিছু বলেনা।
“তুই এগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল।”
“তবুও ভাইজান, এবার একটু শক্ত হও তুমি। বাপমরা ছেলে, যদি খারাপ সঙ্গে পড়ে যায়? কি করবো আমি তখন?”
নওশাদ ম্লান হেসে বললো,”আমি কি ওর কিছু না সায়েরা? আমি ওর মামা কিন্তু সেই ছোট থেকে ওকে তো আমি বুঝতে দিইনি বাবার অভাব। আমার দিক থেকে কোনো চেষ্টার ত্রুটি ছিলো?”
“ভাইজান আমি ওভাবে বলিনি……”
সায়েরাকে থামিয়ে দেয় নওশাদ, সায়েরা চুপ করে যায়।
নওশাদ কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে ঘরে চলে যায়।

“শাহানা।”
শাহানা উত্তর দেয়না। মেজাজ তেতে আছে তার, বেশিরভাগ সময় তাই-ই থাকে।
নওশাদ আবার ডাকে।
“শাহানা।”
শাহানা ঝাঁঝের সাথে বললো,”বলে ফেলো।”
“বিদ্যুৎ বিলের কাগজটা দাও।”
শাহানা ভ্রু কুঁচকে তাকায় স্বামীর দিকে। বাবাহ, ইতোমধ্যে ভাইকে নালিশ করা হয়ে গেছে?

“তুমি কাগজ দিয়ে কি করবে?”
“বিদ্যুৎ বিলের কাগজ দিয়ে কি কেউ কাগজের উড়োজাহাজ বানিয়ে উড়িয়ে দেয়?”
“মশকরা করবে না আমার সাথে, আমি মশকরা পছন্দ করিনা।”
“আমি জানি তুমি মশকরা পছন্দ করোনা। তুমি হলে হাইস্কুলের অঙ্কের শিক্ষিকা। শুধু তাদের সাথে তোমার পার্থক্য তারা অঙ্ক পারে, তুমি পারোনা।”
শাহানা রাগী লাল চোখে নওশাদের দিকে তাকায়।

“কি হলো কাগজটা দাও।”
“ওটা আমার কাছে নেই, উৎসের কাছে।”
নওশাদ শান্ত গলায় বললো,”ওটা কি উৎসের কাছে থাকার কথা?”
“না অন্যায় হয়ে গেছে আমার। এখন কি তোমার বোন আর ভাগ্নের কাছে যেয়ে ক্ষমা চাইবো আমি? পা ধরবো ওদের?”
নওশাদ মুচকি হেসে শাহানার হাত ধরে। শাহানা এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নেয়।

“শাহানা শোনো, উৎস আমার কাছে একটা আমানত বলতে পারো। ওর বাবার মৃত্যুশয্যায় আমি তার হাত ধরে কথা দিয়েছিলাম, আমি উৎসকে ভালো রাখবো, আমার নিজের সন্তানের মতো দেখবো। ছোট থেকে ও প্রচন্ড মেধাবী। ও একদিন পড়াশোনা শেষ করে অনেক বড় মাপের একজন মানুষ হবে। আমি ওর পাশে থাকবো সে পর্যন্ত, ব্যস। এরপর আমার কাজ শেষ। তুমি দেখো আমি আমার লক্ষ্যের খুব কাছে। খুব তাড়াতাড়ি ওর পড়াশোনা শেষ হবে, বড় চাকরি পাবে। তুমি শেষ ক’টা দিন ওদের সাথে একটু ভালো ব্যবহার করবে?”
শাহানা বেগম কিছু বলতে যেয়ে থেমে যায়। নওশাদ কথা বললে ও থেমে যায়। যতো রেগেই থাকুক, নওশাদ ভালো করে একটু কথা বললে সে থেমে যায়।
“শাহানা আমি জানি তুমি হয়তো নিজের ছেলে মনে করেই ওকে কাজটা দিয়েছো।”
শাহানা অপ্রস্তুত বোধ করে। নওশাদ জানে শাহানাকে কীভাবে দূর্বল করা যায়।
“তবে আজ তো শেষ দিন জমা দেওয়ার। তুমি তো জানো ও সেই সকালে ভার্সিটি যায়, সন্ধ্যায় ফেরে। কাগজটা আমাকে দিতে পারতে। অবশ্য ভুলটা আমারই, বয়স বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে সব কেমন ভুলে যাচ্ছি। আমারই মনে করা উচিত ছিলো।”
“কেনো ওর এতোটুকু করলে কি সম্মানহানি হবে? ও নাকি এ বাড়িরই একজন, তোমাকে খুব ভালোবাসে।”
“হ্যা ভালোবাসে, ও আমার জন্য ওর শরীর কেটে শেষ র’ক্তবিন্দুটা পর্যন্ত দিয়ে দিতে পারে। এ বিশ্বাস ওর প্রতি আমার আছে।”
শাহানা মুখ বাঁকায়। এসব ওর কাছে আদিখ্যেতা ছাড়া কিছুই মনে হয়না। মামার কাঁধে পা দিয়ে উপরে ওঠার চেষ্টায় আছে ছেলেটা। উপরে উঠে যেতে পারলে মামার দিকে ঘুরেও তাকাবে না, এটা তার বিশ্বাস।

ঘরে আয়না একটা-ই হওয়ায় সকালের এই সময়ে তিন বোনের একরকম মারামারি লেগে যায়। একজন ভার্সিটি, একজন কলেজ তো আরেকজন স্কুলে যাবে। সকালে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় কে আগে আয়নার ভাগ পাবে।
দুইবোনের হুটোপুটি দেখে বহ্নি চশমাটা চোখে ঠেলে বললো,”শীতল, আভা ভুলে যাস না আমি তোদের বড়। আমি তোদের মতো স্কুল, কলেজে যাবো না। আমি যাবো ভার্সিটি। আমাকে আগে জায়গা দে।”
আভা মুখ বাঁকিয়ে বললো,”বড় আপা, এমন ভাব করছো যেনো তুমি কোনোদিন স্কুল, কলেজে পড়োনি। একবারে ভার্সিটিতে উঠে বসে আছো।”
“আভা বড্ড পেকেছিস তুই। পড়াশোনার নাম নেই, খালি সঙ সাজা।”
“বড় আপা সঙ সাজলেও আমাকে সুন্দর লাগে, রাস্তায় আমাকে সবাই হাঁ করে দেখে।”
“হ্যা যতোসব বখাটেগুলোই হাঁ করে দেখে তোকে।”
বহ্নি, আভার ঝগড়ার মধ্যে শীতল আয়না দখল করে নেয়, সুন্দর করে এক চোখে কাজল টেনে আরেক চোখে লাগাতে যাবে ঠিক এই সময় আভা তার হাত টেনে ধরে। কাজল কিছুটা লেপ্টে যায়।
শীতল শান্ত প্রকৃতির, সে অতি ঠান্ডা চোখে আভার দিকে তাকায়।

“কাজটা কি করলি আভা?”
“ভুল হয়ে গেছে, এখন সরে যাও তো। অনেকক্ষণ আয়না দখল করেছো।”
আয়নার দিকে তাকাতেই কান্না পেয়ে যায় শীতলের। কি সুন্দর হয়েছিলো একটা চোখের কাজল আঁকা, সব নষ্ট হয়ে গেলো এই বজ্জাত মেয়েটার জন্য।
শীতল কান্নাজড়িত গলায় বহ্নির দিকে তাকিয়ে বললো,”আপা তুমি আভাকে কিছু বলবে না? দিন দিন কেমন অসভ্য হয়ে যাচ্ছে।”
বহ্নি বিরক্ত হয়ে বললো,”কথায় কথায় ফ্যাচফ্যাচ করে কান্নাটা বন্ধ কর শীতল। এ কেমন স্বভাব? কথা নাই, বার্তা নেই কান্না শুরু। চোখের কোণায় লেবুর রস তৈরি সবসময়।”
আভা মুখ টিপে আসে। শীতল হতাশ মুখে বহ্নির দিকে তাকাতেই বহ্নি আভার কান টেনে আয়নার সামনে থেকে সরিয়ে দেয়।
আভা তারস্বরে চিৎকার কর‍তে থাকে।

“আমার বাবারা কি করে?”
বাবাকে দেখে সবার আগে ছুটে আসে শীতল।
“বাবা তুমি আভাকে কিছু বলবে কিনা বলো। দেখো আমার কাজলের কি অবস্থা করেছে ও।”
আভাও থেমে থাকার পাত্রী নয়। সেও মারমুখী হয়ে ছুটে আসে।
“ইচ্ছা করে করেছি? ক্ষমা চেয়েছি না তার জন্য? এই বড় আপা।”
কে শোনে কার কথা, বহ্নি সাজতে ব্যস্ত।
নওশাদ হাসে, এগুলো নতুন না। রোজ সকালেই তিন বোনের এসব চলে। আবার রাত হতে না হতেই তিন বোন যেনো একই আত্মা, একই মন। কেউ কাউকে ছাড়া কিছু বুঝেনা।
নওশাদ আলম তিন মেয়েকে বসায় খাটের উপর। নিজে হাঁটু গেড়ে বসে তাদের সামনে।
“আমার বাবারা, আমি জানি আমার উপর তোমাদের অনেক অভিযোগ। তোমাদের আলাদা ঘর, আলাদা আয়না দিতে পারিনি। আয়না কেনাই যায় আরো, কিন্তু এই ঘরে রাখার জায়গা হবে না। তবে তোমাদের কথা দিতে পারি, একদিন ঠিক তোমাদের জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করে দিবো আমি, সবার আলাদা আলাদা আয়না থাকবে। আর এমন ঝামেলা হবে না। চেষ্টা করবো খুব তাড়াতাড়িই তোমাদের জন্য এটুকু করতে।”
বহ্নি, শীতল, আভা একে অন্যের দিকে তাকায়। তারপর হঠাৎই তিন জন বাবার বুকে মাথা রাখে। নওশাদ দুই হাতে তিন মেয়েকে জড়িয়ে ধরে।

শীতল ধরা গলায় বললো,”বাবা আমাদের আলাদা ঘর চাইনা। তুমি জানোনা, এভাবে রোজ সকালে ঝগড়া করার কি মজা।”
বহ্নিও তাল মেলায় শীতলের সাথে।
“এভাবে থাকলেই মনে হয় আমাদের বন্ধনটা ঠিক আছে। দিনশেষে আমরা তিনজন তিনজনের ভরসার জায়গা।”
আভাও মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

নওশাদ প্রশান্তির হাসি হাসে। কি মায়াবতী মেয়েগুলো তার। হীরার টুকরো একেকটা। খুব গর্ববোধ হয়ে নিজের উপর এমন তিনটা চাঁদের খণ্ডকে পেয়ে। আবার এই মেয়েগুলোই তার ঘর অন্ধকার করে পরের বাড়ি চলে যাবে এটা ভাবতেই বুক চিঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

“আজ কার পালা?”
শীতল বাবার বুক থেকে মাথা উঠিয়ে চিৎকার করে বললো,”আমার আমার, আজ আমার।”
সে এমনভাবে কথাটা বললো যেনো বিশ্বজয় করে ফেলেছে। নওশাদ মেয়েদের কান্ড দেখে হাসে।
সেই ছোট থেকে তিন মেয়ের মধ্যে এই প্রতিযোগিতা। বাবা অফিসে যাওয়ার সময় তারা পালাক্রমে তাকে জুতা পরিয়ে দেয়। গতকাল বহ্নি পরিয়েছে, আজ শীতল পরাবে আবার আগামীকাল আভা, এভাবেই চলে।

শীতল দৌড়ে ছুটে যায় বাবার জুতা আনতে। পরম যত্নে বাবার পায়ে পরিয়ে দেয়। নওশাদ অপলক দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবাকে কতোটা ভালো না বাসলে এই অতি সামান্য কাজটা তিন বোন এতো আগ্রহ নিয়ে করে। অলিখিত এক প্রতিযোগিতা চলে তিনজনের মধ্যে এটা নিয়ে।
মাঝে মধ্যে নওশাদের মনে হয় ভাগ্যিস সৃষ্টিকর্তা তাকে মধ্যবিত্ত বানিয়েছে। নাহলে হয়তো তিন মেয়েকে এভাবে পাওয়া সম্ভব হতোনা। তিন মেয়ে তার রাজা-বাদশাহদের অমূল্য রত্নের চেয়েও মূল্যবান।

“আসুন, আসুন নবাবপুত্র আসুন। রাজকার্য ঠিকভাবে সম্পন্ন করে এসেছেন তো? নাকি আরো কিছু বাকি আছে?”
ঘর্মাক্ত মুখে উৎস এসে দাঁড়ায় শাহানার সামনে। বাইরে প্রচন্ড গরম, সারাদিন আজ ভার্সিটিতে অমানুষিক পরিশ্রম গেছে। মাথা এলোমেলো লাগছে তার এই মুহুর্তে।
“তা নবাবপুত্র আপনি যে বিলটা দিতে পারবেন না, এটা যদি কৃপা করে আমাদের একটু আগে বলতেন তাহলে ভালো হতো না? আজ তো শেষ তারিখ ছিলো।”
উৎস উত্তর দেয়না। গলা শুকিয়ে আসছে তার, সিগারেট ধরানো দরকার একটা।
সায়েরা কোথায় যেনো ছিলো। শাহানার গলা শুনে ছুটে আসে বসার ঘরে। শাহানা সেখানে উৎসকে ঝাড়ছে আর উৎস নির্লিপ্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

“কাগজটাও নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন আপনি। নিজেও কোনো উপকারে আসবেন না, অন্য কাউকে কাজটা করতেও দিবেন না।”
সায়েরা রাগান্বিত হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো,”সবকিছুর একটা সীমা আছে উৎস। তুমি যদি মনে করে থাকো, তুমি এগুলো করবে আর আমি সেইটা সহ্য করবো তাহলে তুমি ভুল ভাবছো। অনেক জ্বালা সহ্য করছি তোমার জন্য, আর না।”
শাহানা মুখ বাঁকিয়ে বললো,”আর নাটক করতে হবে না সায়েরা, অনেক করছো। তুমি আর তোমার ভাই আহ্লাদ দিয়ে ওকে মাথায় তুলেছো না? একদিন ঠিক ফল বুঝবে।”
“আমি মাথায় তুলেছি ভাবী? এটা তুমি বলতে পারলে?”

মা আর ফুপুর চিৎকার শুনে ঘর থেকে বাইরে আসে বহ্নি। রোজ রোজ বাড়িতে কোনো না কোনো অশান্তি চলছেই। মাঝেমাঝে বিরক্ত লাগে ওর এ বাড়িতে থাকতে।

বহ্নি আর উৎস পিঠাপিঠি। বহ্নি উৎসের চেয়ে মাত্র আট মাসের বড়। দুইজনের সম্পর্কটা একদম বন্ধুর মতো। উৎসকে কিছু বলা হলে বহ্নির খুব কষ্ট হয়। শুধু বহ্নি না, ওদের তিন বোনেরই উৎস বলতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। আর এই জিনিসটাই পছন্দ করে না শাহানা।
“মা কি হচ্ছে? চিৎকার করছো কেনো ভরসন্ধ্যায়?”
“না মা, আমার তো চিৎকার করা উচিত না। আমার ভুল হয়েছে। আমার মতো কপাল দোয়া করি তোমার না হোক। যদি হয় সেদিন বুঝবে কেনো চিৎকার করি আমি।”
বহ্নি মায়ের উপর বিরক্ত হয়ে উৎসের দিকে তাকায়। উৎসের কোনো দিকে খেয়াল নেই। শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“কি হয়েছে রে উৎস? তুই আমাকে বল তো।”
সায়েরা কঠিন গলায় বহ্নির দিকে তাকিয়ে বললো,”তুই ঘরে যা বহ্নি, ওকে আমি দেখছি।”
“ফুপু তুমি একটু চুপ করো দয়া করে। ছেলেটা সারাদিন খাটাখাটুনি করে মাত্র বাড়ি ফিরলো। সারাদিন পেটে কিছু পড়েছে কিনা তারও ঠিক নেই। ঘেমে কি অবস্থা মুখের একবার দেখো। আর কি শুরু করলে তোমরা?”
কথাটা শেষ করে বহ্নি নিজের ওড়না দিয়ে উৎসের মুখ মুছে দিতে গেলে উৎস হাত দিয়ে থামায় তাকে।
“এসবের কোনো দরকার নেই বহ্নি, আমি ঠিক আছি।”
কথা শেষ করে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে উৎস শাহানা বেগমের দিকে তুলে ধরে। শাহানা ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
“বিল পরিশোধ হয়ে গেছে, দেখে নিবেন।”
শাহানা বেগম কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করে।
সায়েরা নরম গলায় বললো,”তুই কখন গিয়েছিলি বাবা ওখানে?”
উৎস হাসে, বহ্নি অবাক হয়ে উৎসের হাসি দেখে। কি সুন্দর মায়াভরা একটা হাসি। ওর যে জীবনসঙ্গিনী হবে নিশ্চয়ই অনেক ভাগ্যবতী হবে সে। সারাজীবন এমন একটা রাজপুত্রের হাসি দেখেই কাটিয়ে দিতে পারবে।
উৎস মায়ের কথার উত্তর না দিয়ে শাহানার সামনে যেয়ে দাঁড়ায়। শাহানা মুখে একটা বিরক্তির রেখা টেনে রাখে।
“উৎস কোনো দায়িত্ব নিলে নিজের জীবন দিয়ে হলেও সেই দায়িত্ব পালন করে মামি। এতো বছরে এটুকুও চিনলেন না?”
শাহানা উৎসের দিকে তাকায় না, তার কথার উত্তরও দেয়না। হনহন করে হেঁটে নিজের ঘরে চলে যায়। উৎস আবারও হাসে তার দিকে তাকিয়ে।

“এই হাবা, কি করিস?”
আভা ভয়াবহভাবে রেগে উৎসের দিকে তাকায়। উৎসের সেদিকে খেয়াল নেই। সে আভার সামনে চেয়ার টেনে বসে, পা উঠিয়ে দেয় খাটের উপর।
“উৎস ভাই, আপনাকে আর কতো করে বলতে হবে আমাকে হাবা ডাকবেন না?”
“আরে হাবা বললাম কই? আমি তো হাবা বলেছি।”
আভা হতাশ গলায় বললো,”সেই একই তো বললেন, হাবা।”
“আরে না, আমি তোকে আভা-ই ডেকেছি। তুই সত্যিই হাবা তাই হাবা শুনেছিস।”
আভা চুপ করে যায়। এই লোকটা চরম মাত্রার ফাজিল। তার সাথে মুখ লাগানো মানে নিজের মানসম্মান নিয়েই টানাটানি।

“তা হাবা, তোর মুখটা এমন শুকনো কেনো? প্রেমে ছ্যাকা খেয়েছিস?”
“তাহলে তো বেঁচেই যেতাম। আপনার মতো সুদর্শন একটা প্রেমিক পেতাম যদি।”
উৎস অবাক হয়ে আভার দিকে তাকায়। আভা কুটকুট করে হেসেই যাচ্ছে।
“খুব পেকেছিস বল? দাঁড়া মামাকে বলতে হচ্ছে বহ্নি, শীতলের আগেই যেনো তোর বিয়েটা দিয়ে দেয়। শ্বশুরবাড়িতে যেয়ে বাসন মাজবি আর শ্বাশুড়ির পা টিপবি।”
“উৎস ভাই ভালো হবে না কিন্তু।”
উৎস শব্দ করে হাসে। এ বাড়িতে আভার সাথেই তার সম্পর্কটা অনেক বেশি সহজ। বয়সের অনেকটা পার্থক্য থাকলেও এমন ইয়ার্কি-ফাজলামি চলতেই থাকে। আভাকে রাগিয়ে দেওয়া অনেক সহজ আর এই সহজ কাজটা করে ভীষণ আনন্দ পায় উৎস। এমনিতে বাকি সবার সাথে তার সম্পর্ক খুব একটা সহজ না, বরং বাকি সবসময় গম্ভীর থাকে সে। নিজের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে রাখে।

“আচ্ছা এখন বল, তোকে এমন দেখাচ্ছে কেনো?”
“কেমন দেখাচ্ছে?”
“একটা পেত্নীর মতো লাগছে। মনে হচ্ছে আরেকটু পরেই গাছে উঠে পা দোলাবি।”
আভার মুখ অন্ধকার হয়ে যায়। তিন বোনের মধ্যে সে সবচেয়ে বেশি সুন্দরী। এই বয়সেই কতোগুলো ছেলের কাছ থেকে প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছে। তার বাবা বলেছে সে ক্লিওপেট্রার চেয়েও বেশি সুন্দরী। ক্লিওপেট্রা কে আভা তা জানেনা। কিন্তু বাবা যখন বলেছে নিশ্চয়ই সে অনেক রূপবতী। শুধু সারা দুনিয়ায় এই একটা মানুষের কাছে সে পেত্নী কিংবা মাঝেমাঝে শাঁকচুন্নি। কিন্তু আবার এই মানুষটার কাছেই সে সবচেয়ে সুন্দরী হতে চায়।

“কি হলো বল?”
আভা মাথা নিচু করে বললো,”একটা উপকার করবেন উৎস ভাই?”
“কি ব্যাপার? দেখ প্রেমঘটিত কোনো ব্যাপার হলে আমি নেই এরমধ্যে। এখন আমাকে বলবি অমুক ছেলের সাথে আমাকে প্রেম করিয়ে দেন, ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো না এসবে আমি নেই। তুই যে মেয়ে, এসব অস্বাভাবিক কিছু না।”
আভা দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”চুপ করবেন দয়া করে?”
“আচ্ছা বল, কি করতে হবে।”
আভা এদিক ওদিক তাকিয়ে চাপা গলায় বললো,”আমি প্রাক-নির্বাচনী পরিক্ষায় ফেইল করেছি উৎস ভাই। স্যার বলেছে অভিভাবক না নিয়ে গেলে মাধ্যমিকে বসতে দিবে না।”
উৎস চোখ বড় বড় করে বললো,”ফেল করছিস তুই? তোকে স্কুল থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়নি? তুই কোন মুখে আমার সামনে এ কথা বলছিস?”
আভা ঝট করে উৎসের হাত চেপে ধরে। উৎস তাড়াতাড়ি করে হাত সরিয়ে নেয়।
“উৎস ভাই, বাঁচান আমাকে। বাবা মা কে বলতে পারবো না, মা খুব মারবে। আপনি আমার অভিভাবক সেজে স্কুলে যাবেন। কাজ বেশি না, শুধু বলবেন এখন থেকে ভালো করে পড়াশোনা করবে ও। মাধ্যমিকে খুব ভালো করবে। উৎস ভাই এটুকু করবেন আমার জন্য।”
উৎস উঠে দাঁড়ায়।
“না না আমি এসব পারবোনা। ফেল্টুস মেয়ে, সারাদিন শুধু সাজগোজ আর সিনেমা দেখা। তোর উচিত শিক্ষা পাওয়ার দরকার।”
আভা দু:খী দু:খী মুখে তাকায় উৎসের দিকে। উৎস চোখ ফিরিয়ে নেয়। মেয়েটা খুবই আহ্লাদী, ঢংঢাং করে ঢেঁকী গিলিয়ে ফেলার মতো অসাধ্য কাজ করিয়ে নেয়।
“উৎস ভাই দয়া করুন না। আপনি যা বলবেন তাই শুনবো।”
উৎস মিনিট খানিক রাগী চোখে আভার দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটা অসম্ভব রূপবতী কিন্তু অত্যন্ত নিম্নবুদ্ধি সম্পন্ন। অনেকটা গাধা শ্রেনীর মানবী। উৎসের ধারণা তার মাথায় মস্তিষ্কের স্থানে এক দলা গোবর ঠাসা৷ পড়াশোনায় মন নেই, মন দিলেও ভালো পারেনা। কারণ তার মস্তিষ্ক বলতে কিছু নেই।
“যা বলবো তাই করবি?”
আভা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
“পাক্কা।”
“বেশ কি করা লাগবে এটা পরে বলবো। তবে এটা মনে রাখিস। পরে আবার কাহিনী করলে খবর আছে।”
আভা চিৎকার করে লাফ দিতেই চেয়ারে পা লেগে ঠাস করে পড়ে যায় মেঝেতে। উৎস তাকে ওঠানোর চেষ্টা করে না। একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে চলে যায় সেখান থেকে। আভা হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এই লোকটা এমন কেনো? একটা মানুষকে পড়ে যেতে দেখে এভাবে কেউ চলে যায় সাহায্য না করে? নিজেকে কি ভাবে? মুখ ভেংচি দেয় আভা সেদিকে তাকিয়ে।

“উৎস।”
বহ্নির গলার আওয়াজ শোনার সাথে সাথে সিগারেট ফেলে দেয় উৎস। কিন্তু ঘুরে তাকায় না পিছনে। ছাদের রেলিঙে হাত ঠেকিয়ে দূরের রাতের আকাশ দেখতে থাকে।
“তুই ধূমপান শুরু করেছিস?”
উৎস উত্তর দেয়না। যেমন দাঁড়িয়ে ছিলো তেমনই থাকে।
“কি হলো কথার উত্তর দে।”
উৎস প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললো,”তুই এতো রাতে ছাদে?”
বহ্নি উল্টোদিকে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় রেলিঙে। তার দৃষ্টি উৎসের দিকে। ছেলেটা এমনিতেই গম্ভীর, একটা নিরেট ইস্পাতের প্রাচীরে নিজেকে আটকে রাখে। সেই ছোট থেকেই। ইদানীং একটু বেশিই গম্ভীর লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় বা কষ্টে আছে।
“বদলে যাচ্ছিস কেনো উৎস?”
উৎস কিছুটা অবাক হয়ে বহ্নির দিকে তাকায়। বহ্নির নজর তীক্ষ্ণ।
“তোর কথা বুঝতে পারলাম না।”
“তুই বুঝতে পারছিস, বুঝেও না বোঝার ভান করছিস।”
উৎস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। দুই হাত বুকে বেঁধে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।

“তুই কি কারো প্রেমে পড়েছিস?”
উৎস ভ্রু উঁচু করে কিছুক্ষণ বহ্নির দিকে তাকিয়ে হেসে দেয়। হাসলে উৎসকে অসম্ভব ভালো লাগে। গালভর্তি দাড়ির মাঝে শুভ্র সুবিন্যস্ত সারির দাঁতগুলো ভেসে ওঠে। ছেলেটা তার মায়ের চেহারা পেয়েছে।
“হাসছিস যে?”
“তুই কি এতো রাতে কৌতুক বলতে এখানে এসেছিস? যদি তাই হয় ঘরে যা। আমি কৌতুক পছন্দ করিনা।”
“কৌতুক মনে হলো কেনো তোর? প্রেমে পড়া কি অন্যায়?”
“অন্যায় তো বটেই, তবে সবার জন্য না। আমার মতো একটা চালচুলোহীন ছেলের জন্য অন্যায়। শুধু অন্যায় না, ঘোরতর অন্যায়।”
বহ্নি ঠান্ডা গলায় বললো,”তোকে কতোবার বলেছি নিজেকে এতো ছোট মনে করবি না কখনো। আমরা কেউ নই তোর? আর চালচুলোহীন মানে? এ বাড়ি কি তোর নয়? কেনো এগুলো বলে আমাদের কষ্ট দিস?”
উৎস ছোট্ট করে হাসে, বিষাদ মাখা হাসিতে উৎসকে দেখলে মনে হচ্ছে ওর বুকের মধ্যে অনেক চাপা কষ্ট।

“এগুলো আর কোনোদিন যেনো না শুনি। তোকে আমি কখনো নিজের ভাই ছাড়া অন্য কিছু ভাবিনি। এগুলো বলা মানে আমাকে কষ্ট দেওয়া। তুই যদি আমাকে কষ্ট দিতে চাস, তো দিতে পারিস।”
“বহ্নি আমাকে ভুল বুঝছিস তুই।”
বহ্নি ঝাঁঝালো গলায় বললো,”আর যদি দেখি কোনোদিন সিগারেট খেতে খুব খারাপ হয়ে যাবে।”
উৎস বহ্নির সামনেই আরেকটা সিগারেট ধরায়, অন্যদিকে ফিরে ধোঁয়া ওড়ায়। বহ্নি বিরক্ত হয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। সে ভেবেছিলো উৎস তাকে ডাকবে পিছন থেকে। ভুল হয়েছে বলে ক্ষমা চাইবে।
কিন্তু না উৎস তাকে ডাকেনা। ছেলেটা অদ্ভুত, ভীষণ অদ্ভুত। এতো মেধাবী, উজ্জ্বল একটা ছেলে অথচ নিজের জীবনটা নষ্ট করার জন্য যেনো উঠে পড়ে লেগেছে।
ধুপধাপ করে পা ফেলে সিঁড়ি দিয়ে নামার শব্দ পায় উৎস। বোঝাই যাচ্ছে বহ্নি রাগ দেখাচ্ছে তার উপর।

উৎস ছাদের কোণার এক চিলেকোঠার ঘরে থাকে। নিচতলায় তিনটা শোওয়ার ঘর। তিন বোন এক ঘরে থাকে, আরেকটায় নওশাদ আর শাহানা অন্যটায় সায়েরা থাকে যে ঘরটা অসম্ভব ছোট। যদিও চিলেকোঠায় থাকতে উৎসের সমস্যা নেই, বরং ভালোই লাগে। সবরকম কোলাহল, সাংসারিক চিৎকার চেচামেচি থেকে দূরে থাকা। এসব আর এখন ভালো লাগে না ওর।
সিগারেট ফেলে নিজের ঘরে ঢোকার মুখে থমকে যায় উৎস। ঘরটা যেনো আলোকিত হয়ে আছে এক রমনীর উপস্থিতিতে। নিজের ছোট্ট এই ঘরটায় যেনো এক ফালি চাঁদ জ্যোৎস্না ছড়াচ্ছে।

উৎস ধাতস্থ হয়ে চোখ সরিয়ে নেয়।
“শীতল এতো রাতে তুমি এখানে?”
বহ্নি আর আভাকে উৎস তুই বলে সম্বোধন করলেও কোনো এক অজানা কারণে শীতলকে কখনো সে তুই করে ডাকতে পারেনা, সেই ছোট থেকেই। শীতল বরাবরই শান্ত, অল্পতেই কেঁদে ফেলা মেয়ে। কিন্তু মনের দিক থেকে সে বেশ শক্ত। একটু আহ্লাদী কিন্তু কঠিন পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় মোকাবিলা করার ক্ষমতা রাখে।

উৎসকে দেখে উঠে দাঁড়ায় শীতল। তারই অপেক্ষা করছিলো সে। উৎস বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। শীতল ঘর থেকে না বের হলে সে ঢুকবে না।
“উৎস ভাই।”
“তুমি এখানে কেনো? রাত কয়টা বাজে?”
শীতল নিচু গলায় বললো,”এমনিই এসেছিলাম। এসে দেখলাম ঘরটা নোংরা হয়ে আছে। তাই গুছিয়ে দিলাম।”
উৎস এতোক্ষণে তাকায় ঘরের দিকে। শুধু শুধু মেয়েদের মায়ের জাত বলা হয়না। নিজের ঘর নিজেই চিনতে পারছে না। বিছানার চাদরটা পর্যন্ত টান টান করে বিছানো। তার মা মাঝে মধ্যে গুছিয়ে দিয়ে যায়, সংসারের চাপে সবসময় পারেনা। বাড়ির সব কাজ একাই করতে হয় তাকে।
আর উৎস নিজেও ভীষণ এলোমেলো, অগোছালো। তার এতো গোছানো পরিপাটি ঘর ভালো লাগেনা। গোছানো ঘরেই বরং দমবন্ধ লাগে ওর।
“তোমাকে কি বলেছি আমি গোছাতে?”
“না বলেননি।”
“তাহলে কেনো এসেছো? আমার জিনিসপত্রে অন্য কারো হাত দেওয়া আমি পছন্দ করিনা, তুমি জানোনা?”
শীতল ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মাথা তুলতেও কেমন লজ্জা লাগে তার।
“এখন নিজের ঘরে যাও, আমার খুব ক্লান্ত লাগছে। মাথাটাও ভীষণ যন্ত্রণা করছে। আমি ঘুমাবো।”
শীতলের খুব ইচ্ছা হয় বলতে, আমি মাথাটা টিপে দিই? কিন্তু সে বলতে পারেনা। এটা বলার মতো অধিকার জন্মায়নি তার বোধহয়।

“শীতল।”
শীতল ঝট করে মাথা তুলে তাকায়। উৎসের কণ্ঠটা এতো গম্ভীর, পুরুষালি। কথা বললেই মনে হয় বজ্রকণ্ঠে কিছু বলবে। শীতলের খুব ভালো লাগে শুনতে।
“বলুন উৎস ভাই।”
“এতো রাতে আমার ঘরে আর আসবে না। আমি জানি পুরো বাড়িটাই তোমাদের, আমরা আশ্রিত। তোমাদের বাড়ি তোমরা আসতেই পারো। কিন্তু যখন আমি থাকবো না তখন আসবে। আমি যখন বাড়িতে থাকবো দয়া করে এখানে আসবে না।”
শীতল লজ্জায়, অপমানে গুটিয়ে যায়। নিজের উপর নিজেরই রাগ হয়। কে বলেছিলো এতো বাড়াবাড়ি করতে? যেচে অপমানিত হয়ে এখন খুব ভালো লাগছে তাইনা?

“এখন যাও।”
শীতল যেনো লজ্জায় হাঁটতেও পারছে না। ধীর পায়ে হেঁটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। দরজার মুখে উৎস দুই হাত বুকে বেঁধে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শীতল তাকায় তার দিকে, উৎস তাকায় না।

শীতল চলে যেতে উৎস হাত মুষ্টিবদ্ধ করে একটা বড় শ্বাস নেয়। ঘরে ঢুকতেই একটা অদ্ভুত সুন্দর গন্ধে মাথাটা কেমন ঘুরে ওঠে তার। কোনো একটা ফুলের গন্ধ। কাঁঠালচাঁপা নাকি বকুল? নাকি দুইটার সংমিশ্রণ? উৎস বুঝতে পারেনা৷ তবে বেশ জোরালো সুগন্ধ। উৎস ঝিম মেরে বসে কিছুক্ষণ গন্ধটা নেয়। তার ঘরের আশেপাশে কোনো ফুলের গাছ নেই। তবে এ সুগন্ধ ছড়ালো কে? শীতল? উৎসের শরীর খারাপ লাগতে থাকে। মাথার যন্ত্রণাটা ক্রমশ বাড়ে, কেমন একটা সূক্ষ্ম চিনচিনে ব্যথা। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে সে।

বেশ কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর বালিশের নিচ থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা আনতে যেতেই কিছুটা অবাক হয়ে উৎস। বালিশের নিচে প্যাকেট নেই। মুহুর্তেই বিছানা উলোটপালোট করে দেয় সে। কোথাও নেই। খাট ছেড়ে সারা ঘর খোঁজে, কোথাও নেই। তন্ন তন্ন করে সব খুঁজতে যেয়ে সাজানো গোছানো ঘরটা নিমিষেই অগোছালো হয়ে যায়। সেদিকে খেয়াল নেই উৎসের। এখন তার সিগারেট লাগবে, নাহলে হয়তো তৃষ্ণায় মরেই যাবে।
তাহলে কি শীতল নিয়ে গেলো? উৎস জোরে জোরে শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে, পারে না। মাথার মধ্যে একটা মুখ ঘুরপাক খাচ্ছে। শীতল, শীতল, শীতল।
‘আমাকে তিলে তিলে শেষ করার অপরাধে তোকে একবারে শেষ করে দিবো আমি একদিন।’
খাটের উপর বসে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে উৎস। রাগ কমেনা, উলটে মাথার যন্ত্রণাটা কয়েক গুণে বেড়ে যায়।

ওড়নার তল থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা অতি সাবধানে বের করে শীতল। বহ্নি, আভা দুইজনই ঘুম। দূর থেকে হলুদ স্ট্রীটের আলো জানালা গলে ঘরে ঢুকেছে। সেই আলোয় প্যাকেটের উপর থাকা লেখাটা ভেসে ওঠে।
‘ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, ধূমপান ক্যান্সারের কারণ।’
প্যাকেটটা গালের সাথে চেপে ধরে শীতল। হয়তো একটা গন্ধ পাচ্ছে সে। ভীষণ কান্না পাচ্ছে হঠাৎ করে তার।

“তোর হাতে ওটা কি শীতল?”
চমকে উঠে তাড়াতাড়ি করে ওঠা লুকানোর চেষ্টা করে শীতল। বহ্নি কখন উঠে তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে সে টেরও পায়নি।
“আপা তুই ঘুমাসনি?”
বহ্নি তীক্ষ্ণ চোখে শীতলের দিকে তাকিয়ে থাকে। শীতল টের পায় তার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে যাচ্ছে। বহ্নি বড়বোন হিসেবে বন্ধুর মতো হলেও তাকে শীতল আর আভা কিছুটা ভয় পায়। বেশ রাগী সে। যদি এখন প্যাকেটটা দেখতে চায় সে? কিছু কি বুঝে যাবে? ভুল বুঝবে আপা তাকে?

কিন্তু বহ্নি সেদিকে কথা বাড়ায় না। ছোট্ট করে একটা শ্বাস ফেলে বললো,”অনেক রাত হয়েছে, ঘুমিয়ে পড়।”
শীতল অস্ফুটে সাড়া দেয়৷ কিন্তু সে জানে, আজ সারারাত তার ঘুম আসবে না। অসহ্য একটা যন্ত্রণা হচ্ছে বুকের ঠিক মাঝখানে। সে কারণ জানেনা, এ ব্যথার কোনো পেইন কিলারও নেই। নির্ঘুম রাত হয়তো এই যন্ত্রণার প্রতিষেধক।

(চলবে…….)