#মাতাল_প্রেমসন্ধি
পর্ব: ২
উৎস তৈরি হচ্ছে ক্লাসে যাওয়ার জন্য। আয়নার সামনে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে দাঁত দিয়ে জিভ কাটে। কতোদিন থেকে ভাবছে চুলটা ছোট করবে, সময়ই পাচ্ছে না। কান ছাড়িয়ে কাঁধ পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। একরাশ ঘন কালো চুল মাথায়, কাটলেও কয়দিন পরই আবার বেড়ে যায়। ঘন চাপদাড়ির কারণে বয়সের তুলনায় একটু বেশি ভারিক্কি লাগে দেখতে। তবে এতে উৎসের সুবিধাই হয়েছে, গম্ভীর ভাবটা ধরে রাখা যায়।
কয়েকদিনের কোঁচকানো ধূসর শার্টটা আলনা থেকে টেনে নামাতেই দেখে ওটা বেশ সুন্দর, পরিপাটি করে গোছানো। উৎস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, নিশ্চিত শীতলের কাজ। মেয়েটা তার অভ্যাস পরিবর্তন করে দিচ্ছে, খুবই বিরক্তিকর ব্যাপারটা। মায়া কাটানো সোজা না হলেও অসম্ভব নয় কিন্তু অভ্যাস কাটাতে গেলে জীবন পার হয়েও যেতে পারে।
কালো ক্যাপটা মাথায় চাপিয়ে ব্যাগটা কাঁধে ঝোলাতে যাবে তার আগেই দরজার বাইরে করাঘাতের আওয়াজ পেয়ে দরজা খোলে উৎস।
“মামা আপনি?”
নওশাদ হাসে উৎসের দিকে তাকিয়ে। ছেলেটা কেমন দিন দিন বলিষ্ঠ হয়ে উঠছে। এইতো সেদিনই তো স্কুলে পড়তো, এই এত্তোটুকু ছিলো। আর কয় দিনের মধ্যেই সিংহের মতো পুরুষ হয়ে যাচ্ছে। সিংহের কেশরের মতো আবার দাড়ি রাখাও শুরু করেছে। তবুও এতো কিছুর মধ্যে ছেলেটার নিষ্পাপ চাহনিটা সেই আগের মতোই আছে, একটুও বদলায়নি।
“ঘরে ঢুকি?”
“অনুমতি চাচ্ছেন মামা?”
নওশাদ উৎসের পিঠে হাত দেয়।
“এ কি রে? ঘরটার এমন বেহাল দশা কেনো রে? চারদিকে জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমি বহ্নি বা শীতল কাউকে বলে দিবো ঘরটা গুছিয়ে দিয়ে যেতে।”
উৎস সাথে সাথে বললো,”না মামা তার জন্য প্রয়োজন নেই, আমার এমন অগোছালো ঘর ভালো লাগে।”
নওশাদ আপন মনে হাসে, এই বয়সের ছেলেগুলো একটু অগোছালো হয়। ঠিকই ঘরে বউ আসার পর সোজা হয়ে যায়। যার অন্যতম উদাহরণ সে নিজেই।
“মামা কিছু বলবেন?”
“কেনো কিছু না বললে আমি তোর ঘরে আসতে পারিনা?”
“একশবার পারেন মামা।”
“অনেকদিন তোর সাথে আড্ডা দেওয়া হয়না। আগে মনে আছে তুই যখন কলেজে পড়তি। কতো রাত আমরা একসাথে এই ছাদে বসেই আড্ডা দিতাম? অবশ্য বকবক আমিই করতাম, তুই বরাবরই নিশ্চুপ। কিন্তু ভার্সিটিতে ওঠার পর তুই একেবারেই গুটিয়ে নিলি নিজেকে নিজের মধ্যে। আমার জন্য তোর সেটুকু সময়ও এখন হয়না।”
নওশাদের কণ্ঠে শ্লেষ টের পায় উৎস। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে শুধু, কিছু বলেনা।
“কি এতো ব্যস্ততা তোর বল তো? ছুটির দিনগুলোতেও পাওয়া যায়না তোকে।”
“মামা আসলে…..”
“আচ্ছা থাক, একটা সিগারেট দে তো।”
উৎস হতভম্ব হয়ে নওশাদের দিকে তাকায়। মামা কীভাবে জানলো সে সিগারেট ধরেছে? দেখে ফেলেছে কোনোদিন? আড়ষ্ট হয়ে এদিক ওদিক তাকায় সে। কোনো প্যাকেট কি দেখে ফেললো মামা? কিন্তু একটাই তো শেষ প্যাকেট ছিলো, যেটা শীতল রাতেই নিয়ে গেছে।
উৎস যথাসম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে।
“মামা ঠিক বুঝলাম না আপনার কথা।”
“ভাগ্নে চুলগুলো আর বাতাসে পাকেনি। তোমাদের বয়স আমরা পার করে আসছি।”
উৎস থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
“এরপর যদি সিগারেট খাস, আমাকে নিয়েই খাবি।”
“আপনি তো সিগারেট খাননা।”
“তুই খেতে পারলে আমি খাবো না কেনো? এইটুকু বয়সে তোর বাঁচার ইচ্ছা না থাকলে, এই বুড়ো বয়সে আমি বেঁচে কি করবো?”
উৎস কি মনে করে হেসে দেয়। নওশাদ অবাক হয়ে দেখে, ছেলেটার হাসি সেই একই আছে। মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছে ছেলেটা। তখন থেকেই মামার কাছে মানুষ। সবকিছু পালটে গেলেও হাসিটা সেই একই আছে। ষোলো বছরে ছোট্ট ছেলেটা আজ তেজী পালোয়ান হয়েছে, কিন্তু হাসিটা পাল্টাতে পারলো না। এখনো হাসলে যে কারো মন কেড়ে নিতে পারে।
“উৎস।”
“বলুন মামা।”
“শুনলাম রাজনীতি করছো ভার্সিটিতে?”
নওশাদ এতো সহজভাবে এমন একটা কথা বলে ফেলতে পারে উৎস ভাবতেই পারেনি। মামাকে দেখলে মনে হয় সে অফিস আর বাড়ি ছাড়া কিছুই চিনেনা। নিতান্তই সাদামাটা একজন ছাপোষা মধ্যবিত্ত মানুষ, যার পৃথিবী শুধু এই পরিবারটিকে ঘিরেই। সে এতো খবর কীভাবে রাখে?
এটা ঠিক উৎস রাজনীতিতে জড়িয়ে গেছে ভার্সিটিতে ওঠার পর থেকেই আর খুব বিশ্রীভাবেই জড়িয়ে গেছে। সে চাইলেও এখন সরে আসতে পারছে না। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গেছে বলতে গেলে। কিন্তু এই অস্থিতিশীল জীবন থেকে সে বেরিয়ে আসতে চায়। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখোমুখি হতে তার ভালো লাগেনা। কিন্তু পারছে না কোনোভাবেই। খরস্রোতা নদীর ঢেউয়ের সামনে যেমন ঠুনকো কাগজের নৌকার বয়ে যাওয়া বা ডুবে যাওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকেনা, তার জীবনটাও তেমনই হয়ে গেছে।
উৎসকে চুপ থাকতে দেখে নওশাদ এগিয়ে যায় তার দিকে। ক্যাপটা খুলে উল্টোদিক করে পরিয়ে দেয়, শার্টের বোতামগুলো খুলে দেয় যাতে নিচে পরা টি-শার্টটা দেখা যায়।
“এইতো বয়স ভাবসাব নেওয়ার, এখনই এমন মুরুব্বি সাজলে হবে? মুরুব্বি সাজার দিন তো পরেই আছে সামনে। একসময় কতো ঘুরেছি এভাবে। বাটন খোলা শার্ট, নিচে চে গুয়েভারার আর্ট করা টি-শার্ট, উলটো ক্যাপ। মেয়েরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকতো। তারপর আর কি, জীবনে তোর মামি এলো। সবকিছু আমার বরবাদ হয়ে গেলো। তাই বলছি কি ভাগ্নে, ঘরওয়ালী আসার আগেই একটু সেজে নাও, পরে আর সুযোগ পাবে না।”
উৎস লাজুক মুখে হাসে।
“রাজনীতি করবে ভালো কথা, একটা জিনিস মাথায় রাখবে। ওই জায়গায় তুমিই শুধু আছো তোমার নিজের, বিশ্বাস করো আর কেউ নেই। ওটা এমন একটা জায়গা কেউ কারো আপন নয়। ভালোবেসে আগলে রাখার মানুষের যেমন অভাব হবে না আবার সেই মানুষগুলোই গাছে উঠিয়ে মই কেড়ে নিতে দুইবার ভাববে না। তাই নিজেকে নিজেরই বাঁচাতে হবে। তুমি অত্যন্ত বুদ্ধিমান একটা ছেলে, আমার দেখা সবচেয়ে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির কোনো মানুষ বললে আমি চোখ বন্ধ করে তোমার নাম নিবো। বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই যথেষ্ট। আমি কি বলতে চাচ্ছি বুঝেছো নিশ্চয়ই।”
উৎস কিছুক্ষণ থেমে গম্ভীর গলায় বললো,”বুঝেছি মামা।”
“খুব ভালো। এখন নিচে চলো। খাওয়া দাওয়া না করে বের হবে না।”
“মামা আমি ক্যান্টিনে খেয়ে নিবো।”
নওশাদ কিছু না বলে উৎসের দিকে শুধু তাকায়। যে দৃষ্টির অর্থ, আমি নিচে যাচ্ছি, দুই মিনিটও যেনো না লাগে তৈরি হয়ে নিচে চলে আসতে।
উৎস জোর করে হেসে সম্মতি জানায়।
নওশাদ চলে যেতেই উৎস আয়নার সামনে দাঁড়ায়। সাজটা খারাপ লাগছে না। তার মামা একদিকে যেমন মজার মানুষ, অন্যদিকে খুবই ভয়ংকরও। এখনো মানুষটাকে ঠিকমতো আবিষ্কার করতে পারলো না সে।
নাশতার টেবিলে তিন বোন অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে বাবার জন্য। বাবাকে ছাড়া তারা সকালে আর রাতে খেতে বসে না। দুপুরে একেকজন একেক সময় খায় কিন্তু সকাল আর রাত একসাথে খেতেই হবে, এটা নওশাদের নিয়ম।
“একটু অপেক্ষা করো বাবারা, আজ উৎস আমাদের সাথে খাবে। ও আসলে একসাথে শুরু করবো।”
আভা চোখ বড় বড় করে বললো,”আজ উৎস ভাই আমাদের সাথে খাবে?”
“হ্যা তোমার কোনো আপত্তি আছে?”
মিইয়ে যায় আভা বাবার কথায়।
“আমার আপত্তি থাকবে কেনো বাবা?”
শীতলের বুকটা কেমন ঢিপঢিপ করে ওঠে। চোখ লাল হয়ে ওঠে মুহুর্তেই। যা চোখ এড়ায় না বহ্নির। অতি সূক্ষ্ম চোখে শীতলের দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটার ভাবগতিক মোটেই ভালো লাগছে না তার।
শীতলের সামনা সামনি চেয়ার টেনে বসেছে উৎস। কিন্তু শীতলের দিকে বিশেষ নজর নেই তার। একমনে মাথা নিচু করে খেয়ে যাচ্ছে সে। শুধু শীতল কিছু খেতে পারছে না। গলা দিয়ে নামছে না।
বহ্নি ঠান্ডা গলায় শীতলের দিকে তাকিয়ে বললো,”রুটি বেশি শুকনো লাগলে পানিতে ভিজিয়ে খা। এতোক্ষণ ধরে খেলে তো কলেজের পৌঁছানোর আগেই ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।”
উৎস কিছুক্ষণ খাওয়া থামিয়ে দেয়, কিন্তু তাকায় না একবারও শীতলের দিকে।
শীতল অপ্রস্তুত বোধ করে।
নওশাদ হঠাৎ কি মনে করে উৎসের দিকে তাকিয়ে বললো,”উৎস তোকে একটা কাজ করতে হবে। জোর করবো না, যদি পারিস।”
“বলুন মামা, অবশ্যই চেষ্টা করবো।”
“শীতল আজ থেকে নতুন একটা টিউশনে যাবে কলেজের পর। তুই যেখানে টিউশন পড়তিস ওখানেই। সন্ধ্যা হয়ে যাবে ফিরতে ফিরতে। আমারই অফিসের পর ওকে বাড়িতে আনার কথা। কিন্তু কিছুদিন অফিসে একটু চাপ যাবে। এই ধর সপ্তাহ খানিক। এরপর থেকে আমি পারবো। এই কয়দিন তোকে ক্লাসের পর ওকে বাড়িয়ে আনতে হবে।”
শীতল অবিশ্বাস্য চোখে বাবার দিকে তাকায়। সত্যি এমন সৌভাগ্য হবে তার? সত্যিই? ভয়ে উৎসের দিকে তাকাতে পারেনা সে। যদি না করে দেয়?
আভা ভ্রু কুঁচকে বললো,”কেনো বাবা মেজো আপা কি ছোট মানুষ যে একা আসতে পারবে না? বরং আমিই আপার চেয়ে ছোট। উৎস ভাই চাইলে আমাকে স্কুল থেকে বাড়িতে আনতে পারে।”
ভয়ংকর রাগী চোখে শীতল তাকায় আভার দিকে, আভা মুখ বাঁকায়।
নওশাদ আভার কথায় পাত্তা দেয়না।
“পারবি উৎস?”
উৎস সবাইকে অবাক করে দিয়ে নওশাদের দিকে তাকিয়ে বললো,”ছুটির পর যেনো অপেক্ষা করে কোচিং গেটে, আমি না যাওয়া পর্যন্ত যেনো রাস্তায় না নামে। পরিস্থিতি ভালো না, সন্ধ্যার পর রাস্তাটা অনেক নিরিবিলি হয়ে যায়।”
শীতলের নিজের কানকে বিশ্বাস হয়না। কেউ পাশে না থাকলে বোধহয় লাফই দিয়ে বসতো খুশিতে। হয়তো সারা রাস্তা মানুষটা একটা কথাও বলবে না তার সাথে, এমন ভাবে হাঁটবে যেনো চিনেই না তাকে। তবুও একসাথে পাশাপাশি কিছুক্ষণ হাঁটা তো হবে, মাঝে মাঝে আড়চোখে একবার নজর বোলানো তো যাবে। ব্যস, শীতলের জান শীতল করার জন্য আর কি চাই।
বহ্নি শীতলের দিকে একবার তাকায়, কিছু বলেনা। শুধু আভা মুখ গোঁজ করে বসে থাকে। কবে যে সে কলেজে উঠবে, তাহলে তারও এমন দিন আসবে। আর তো মাত্র কয়টা মাস। মাধ্যমিকটা হয়ে গেলেই কলেজে। এমন নয় যে আভা উৎসের প্রেমে পড়েছে বা প্রেমিক পুরুষ হিসেবে তার এই মানুষটাকেই চাই। কিন্তু তবুও, মনের কোথাও যেনো এই মানুষটাকে নিয়ে সুক্ষ্ম একটা অনুভূতি আছে তার। সবসময় তার পাশাপাশি থাকতে ইচ্ছা করে, তার সঙ্গও দারুণ উপভোগ করে। এটাকে প্রেম বলা যায়না, হতে পারে কম বয়সের মোহ বা আবেগ।
“উৎস, একটু দাঁড়াও।”
বের হওয়ার মুখে শাহানার ডাক শুনে থমকে যায় উৎস। শাহানা তার সাথে বিশেষ কথা বলেনা কখনোই। যদি কোনো কাজ করতে দেয় তাহলেই শুধু বলে, নাহলে না। আজও নিশ্চয়ই কোনো কাজ করতে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে ডেকেছে।
“কি করতে হবে বলুন?”
“কেনো কোনো কাজ ছাড়া তোমার সাথে কথা বলা যাবে না?”
উৎস অবাক হয়ে তাকায়, কিছু বলেনা।
“বলছি যে আজ ভার্সিটিতে না গেলে হয়না?”
“কেনো বলুন তো? কোনো দরকার আমাকে?”
“আমার কোনো দরকার না।”
“তাহলে?”
শাহানা কিছুটা ইতস্তত করে বললো,”আসলে খবরের কাগজে দেখলাম কিছুদিন ধরেই নাকি কি অস্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে তোমাদের ভার্সিটিতে। রাজনীতি বিষয়ক দুই দল ঝামেলা, মারামারি করছে। আজ নাকি খারাপ কিছু হতে পারে।”
শাহানার উৎকণ্ঠা চোখ এড়ায় না উৎসের। হ্যা, মানুষটা কিছুটা রগচটা, রাগী। কিন্তু তার মধ্যেও এক মমতাময়ী মায়ের শীতল ছায়া আছে, উৎস বুঝতে পারে। হয়তো নিজেকে জোর করে রাগী প্রমাণ করতে চায় সে সবসময়। কি জানি, মানব জাতি বড়ই অদ্ভুত। তাদের মানসিকতা বোঝার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কারো নেই।
“দুশ্চিন্তা করবেন না, আমি ঠিক থাকবো।”
“তুমি এসব রাজনীতিতে নেই আমি জানি। তবুও…..”
উৎস স্মিত হাসে শাহানার দিকে তাকিয়ে। শাহানা অস্বস্তিতে পড়ে। নিজের দূর্বলতা দেখাতে ভালো লাগেনা তার।
“হাসছো কেনো? আমি কি জোকার? খুব মজার কিছু বলেছি? কিছু হলে তো সেই তোমার মামাকেই দেখতে হবে। মানুষটা এই বয়সে কম ঝক্কি তো সামলায়নি তোমার জন্য। সেই স্কুল-কলেজ থেকেই মারামারি করো। বিচার আসে সেই মামার কাছেই।”
“একদিনও আমার কোনো দোষ ছিলো মামি?”
শাহানা উত্তর দেয়না। এটা সত্যি, উৎস খারাপ ছেলে নয়, এমন কোনো কাজ সে করতেই পারেনা যাতে তাদের মানহানি হয়। হয়তো কেউ মেয়েদের রাস্তায় বিরক্ত করেছে বা গরীব মানুষের সাথে অন্যায় করেছে আর সেইটা ওর চোখে পড়েছে। ব্যস, ওতেই ওর মেজাজ কড়া হয়ে যায়। ফলস্বরূপ, মারামারি, বিচার, শালিস।
“আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না, আমি জানি কোন পরিস্থিতিতে কি করতে হয়।”
শাহানাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উৎস বেরিয়ে যায়। শাহানা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে উৎসের দিকে। যতক্ষণ না সে চোখের আড়াল হয়। আজ কেনো জানি ছেলেটার জন্য কেমন দুশ্চিন্তা হচ্ছে তার।
“উৎস ওরা আমাদের দাবি মেনে নিতে চাচ্ছে না। এখন আমাদের কি করা উচিত?”
উৎস উত্তর না দিয়ে উত্তর না দিয়ে একমনে ধোঁয়া ছাড়তে থাকে সিগারেটের। তার দৃষ্টি এলোমেলো।
“উৎস আমি কিছু বলছি তোকে। ক্যাম্পাস গরম করে রেখেছে ওরা। বলছে আমাদের দেখে নিবে, বিশেষ করে ওদের নজর তোর দিকে।”
উৎস স্থির দৃষ্টিতে তাকায় আবিরের দিকে। আবির বেশ দুশ্চিন্তায় আছে বোঝা যাচ্ছে। সেই তুলনায় উৎস শান্ত। পায়ের উপর পা তুলে আয়েশ করে সিগারেট খাচ্ছে আর পা নাড়াচ্ছে।
“তুই কি কিছু বলবি না?”
“ঝামেলা করতে চাইলে তো কিছু করার নেই। আমরা চেয়েছিলাম শান্তিপূর্ণ সমাধান, ওরা যদি না চায় তাহলে কি করা। ওরা ঝামেলা করলে তো আর আমরা হাতে চুড়ি পরে বসে থাকবো না।”
“তারপরেও তুই এতো শান্ত আছিস? ওদের পিছনে কার হাত আছে তুই জানিস না? আমাদের দুই মিনিটে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।”
উৎস ঘন ঘন শ্বাস ফেলে। সিগারেটটা আধখাওয়া অবস্থায় ফেলে দিয়ে পা দিয়ে মাড়িয়ে দেয়।
ঘটনা মোটেই সামান্য নয়। নেতা শ্রেনীর এক ছেলে গ্রাম থেকে আসা এক সহজ সরল মেয়েকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধ’র্ষ’ণ করেছে। এখন অস্বীকার করছে। উৎসদের দল বিচার চায়। হয় মেয়েটাকে বিয়ে করতে হবে নাহয় ভার্সিটি থেকে বের করে দিতে হবে ওই বদমাশকে। কিন্তু ছেলেটা এগুলো কিছুই করবে না। ছেলের দু:সম্পর্কের চাচা নাকি রাজনীতির কি বিরাট ব্যক্তিত্ব। এলাকা কাঁপে তার কথায়। তার ভাতিজার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, কম কথা তো নয়।
“উৎস আমি একটা কথা বলি?”
“আল্লাহ মুখ দিছে বলার জন্য, বলে ফেল।”
আবির গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বললো,”তুই তোর জায়গা থেকে সরে আয়। আমরা ওদের সাথে পারবো না।”
উৎস ভ্রু কুঁচকে আবিরের দিকে তাকায়।
“কি রে টাকা খেয়েছিস নাকি?”
“কি বলছিস এসব? আমাকে এই চিনলি এতো বছরে?”
“এছাড়া আর তো কারণ দেখছি না। রাজনীতিতে আসার আগে আমরা কি শপথ করেছিলাম মনে নেই? সত্যের সাথে কোনো আপোষ করবো না। অন্যায়ের সামনে মাথা নিচু করবো না, দূর্বল হবো না। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ে যাবো তবুও অন্যায়কারীকে সুযোগ দিবো না কোনো। এতে যদি প্রাণনাশও হয় তবুও নিজ জায়গায় অটল থাকবো।”
আবির অসহিষ্ণু হয়ে বললো,”সব মনে আছে আমার। কিন্তু এখন অন্য ব্যাপার। তাছাড়া আমাদের দলের সবাইকে তুই পাবি কিনা পাশে তারও নিশ্চয়তা নেই। সবাই ভয় পেয়েছে।”
উৎস শান্ত চোখে আবিরের দিকে তাকিয়ে বললো,”একটা কথা বলতো আবির, তোর না একটা দুঃসম্পর্কের বোন আছে? এবার উচ্চমাধ্যমিক দিলো?”
“হ্যা, কেনো?”
“আজ যদি তার সাথে এমন হতো? কেউ তার এমন সর্বনাশ করতো? তুই কি করতিস? এভাবেই ছেড়ে দিতিস তাদের তোর পাশে কেউ নেই বলে? নাকি নিজেই নিজের বোনের হয়ে যতোক্ষণ পর্যন্ত শ্বাস আছে লড়ে যেতিস?”
আবির উত্তর দেয়না, উৎস তার ভিতরের উত্তাপ কিছুটা টের পায়।
“বিড়াল-কুকুরের মতো বছরের পর বছর না বেঁচে, সিংহের মতো একদিন বাঁচ। পুরুষের জন্ম অন্যায় দেখে চুপচাপ বসে থাকার জন্য নয়, এটা মাথায় রাখ।”
“কিন্তু আমাদের পাশে কাউকে কি পাবো?”
উৎস মুচকি হেসে আবিরের কাঁধে হাত রাখে।
“কে বলেছে পাবো না? ওদিকে একবার তাকা। আমাদের সিংহ বাহিনী আসছে এদিকেই।”
আবির পিছন ঘুরে তাকাতেই ভিরমি খায়। তাদের দলবল সব আসছে এদিকেই। সবার হাতেই কিছু না কিছু অ’স্ত্রশ’স্ত্র। আবিরের ঠোঁটের কোণায় একটা হাসি ফুটে ওঠে। ভিতর ভিতর তেজ অনুভব করে। উৎস উঠে দাঁড়ায়। সিগারেটের তেষ্টা হচ্ছে আবার, হোক। ফুলের মতো একটা মেয়ের বিচার না নিয়ে আসা পর্যন্ত সে পানি স্পর্শ করবে না, নিজের কাছে নিজেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সে।
নওশাদ বাড়ি ফেরে মোটামুটি সাড়ে আটটা থেকে নয়টার মধ্যে। কিন্তু অফিসে ভীষণ চাপ থাকায় আজ ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে নয়টার বেশি বেজে যায়। সাইকেলটা গেটের কাছে ঠেকিয়ে ঘরে ঢুকতে যাবে এমন সময় হঠাৎই সায়েরা কোথা থেকে যেনো ছুটে এসে নওশাদের সামনে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। হতবাক হয়ে যায় নওশাদ।
“সায়েরা কি হয়েছে? এভাবে কাঁদছিস কেনো?”
“ভাইজান, ভাইজান।”
আর কিছু বলতে পারেনা সায়েরা। আতঙ্কে মুখটা এতোটুকু হয়ে আছে। নওশাদ কাঁধের ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে সায়েরার দুই বাহু চেপে ধরে।
“তুই কি দয়া করে বলবি কি হয়েছে? বাকিরা কোথায়? উৎস কোথায়?”
“ভাইজান উৎস এখনো ফেরেনি।”
ভয়াবহভাবে চমকে ওঠে নওশাদ। উৎস আর যাই হোক, আর যাই করুক কখনো রাত করে বাড়ি ফেরেনা। যেখানেই থাকুক সন্ধ্যার মধ্যে বাড়িতে হাজির। ও অনেক ছোট থাকতেই নওশাদ তাকে এ কথা বলে দিয়েছিলো, রাত করে বাড়ি ফিরলে সে উৎসের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিবে। তারপর থেকে উৎস কখনো এই কাজ করেনি।
“শীতল কোথায়?”
“শীতল বাড়িতে ফিরেছে। উৎস ওর ক্লাসের দুইটা ছেলে আর দুইটা মেয়েকে পাঠিয়েছিলো শীতলের কোচিং-এ। ওরাই ওকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেছে। আর বলেছে উৎস নাকি কি বড় ঝামেলায় আছে, তাই ও আসতে পারেনি।”
সায়েরার কান্নার বেগ বাড়ে। ছেলেটা অসম্ভব দায়িত্ববান সেই ছোট থেকেই। নিজে আসতে না পারলেও বন্ধু সেই সাথে দুইটা মেয়েকেও পাঠিয়েছে শীতলকে বাড়ি পৌঁছিয়ে দিতে। কিন্তু কথা হলো, ও এখন কোথায়? আর কি ঝামেলায় আছে ও?
সায়েরাকে নিয়ে ঘরে ঢোকে নওশাদ। তিন মেয়েকে নিয়ে শাহানা টেলিভিশনের সামনে বসে আছে।
বাবাকে দেখেই তিন মেয়ে ছুটে আসে। শীতলের গাল ভেজা, বোঝাই যাচ্ছে কেঁদেছে।
“বাবা উৎস কোথায়?”
বহ্নির প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনা নওশাদ। সে তো কিছুই বুঝতে পারছে না। মাত্রই এসেছে অফিস থেকে।
শীতল কান্নাজড়িত গলায় বললো,”আমি উনাদের বারবার জিজ্ঞেস করেছি বাবা, উৎস ভাইয়ের কি হয়েছে, কি ঝামেলায় আছে সে? এখন কোথায় আছে, কিচ্ছু বলেনি। বাবা আমরা এখন কি করবো?”
আভাও নাক টানছে। সকাল থেকেই চোখের কোণাটা কেমন কাঁপছিলো তার, মন বলছিলো কোনো বিপদ হতে পারে। ঠিক তাই হলো।
নওশাদ তিনজনকে বসায়। কারো মাথাই ঠিক নেই, কার সাথে কথা বলবে?
“শাহানা তুমি আমাকে বলো কি হয়েছে? তুমি জানো কিছু?”
শাহানার চোখেমুখে ভয়, গলা কাঁপছে ভীষণভাবে।
“খবর যা দেখছি তাতে তো কিছু ভালো মনে হচ্ছে না। খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে।”
“কি দেখাচ্ছে খবরে?”
“উৎসের ভার্সিটিতে নাকি রাজনৈতিক দুই পক্ষের মধ্যে খুব মারামারি হয়েছে। দুইজন ছাত্র নাকি ইতোমধ্যে মারা গেছে, বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আবার বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। উৎস তো রাজনীতি করেনা, কিন্তু ও এখনো ফিরলো না কেনো?”
বরফের মতো জমে যায় নওশাদ। উৎস রাজনীতিতে জড়িয়েছে ভার্সিটিতে ওঠার পর সে খবর পেয়েছে। তবে তার বিশ্বাস ছিলো উৎসের উপর। ও এমন কোনো কাজ করবে না যাতে ওর নিজের বা এই পরিবারের কোনো ক্ষতি হয়। তবে কি ও এই বিশ্বাসটুকু রাখবে না? খারাপ কিছু হলো ওর?
নওশাদ কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,”যে দুইজন মারা গেছে তাদের পরিচয় পাওয়া গেছে?”
কথাটা শেষ করতেই সায়েরা চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়ে, মেঝেতে বসে পড়ে সে। যে কোনো মুহুর্তে যেনো জ্ঞান হারাবে সে। বহ্নি আর আভা ছুটে যেয়ে তাকে ধরে। শুধু শীতল জায়গা থেকে নড়তে পারেনা। মনে হচ্ছে একটা দু:স্বপ্ন দেখছে সে, ভয়ংকর কোনো দু:স্বপ্ন।
নওশাদ সাইকেলের চাবিটা নিয়ে ঘর ছেড়ে বের হতে গেলেই শাহানা তাকে আটকায়।
“তুমি এখন আবার কোথায় যাচ্ছো? মাত্রই তো এলে।”
“উৎসকে খুঁজতে যাচ্ছি।”
“এখন ওকে কোথায় খুঁজবে?”
“থানায়, হাসপাতালে কিংবা….”
“কিংবা?”
“কিংবা যেটা সেটা আমি বলতে চাচ্ছিনা এখন। এমন কিছু হলে হয়তো আমি নিজে আর ফিরে আসতে পারবো না বাড়িতে।”
“তাই বলে তুমি যাবে এখন?”
“আমানতটা তো আমার, আমাকেই যেতে হবে। হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার সময় এটা?”
সায়েরা চিৎকার করতে করতে এগিয়ে আসে। বরাবরই শান্ত প্রকৃতির মানুষ সে। কিন্তু আজ সে নিজেকে কোনোভাবেই শান্ত থাকতে পারছে না। একমাত্র কলিজার টুকরো ছেলে। স্বামী-সংসারকে হারিয়ে ওই একটা রত্নের মুখের দিক তাকিয়েই তো এতোগুলা বছর ভাইয়ের বাড়ি পড়ে আছে আশ্রিত হয়ে। ওই ছেলেটা ছাড়া তো আর কেউ নেই তার এতো আপন। ওর কিছু হয়ে গেলে তো সে শেষই হয়ে যাবে।
“ভাইজান আমি যাবো, আমাকে নিয়ে চলো।”
“না সায়েরা, তোর শরীর ভালো না। তুই বাড়িতে থাক।”
সায়েরা সজল চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। নওশাদ তার মাথায় হাত রাখে।
“আমার উপর একটু আস্থা রাখ। তোর কলিজার টুকরোকে নিয়েই আমি বাড়ি ফিরবো।”
সায়েরা শান্ত গলায় বললো,”আর যদি ওই দুইজনের মধ্যে ও থাকে?”
শীতল চমকে উঠে তাকায় সায়েরার দিকে, এসব কি বলছে সে?
“এসব কথা বলিস না মা হয়ে। আমি আসছি।”
নওশাদ দাঁড়ায় না, এক নিশ্বাসেই বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। সায়েরা আবারও ভেঙে পড়ে কান্নায়। বহ্নি, আভা তাকে ধরে। শাহানা উৎকণ্ঠিত হয়ে বাইরের দিকে তাকায়।
“বাবা।”
বের হওয়ার মুখে শীতলের ডাকে নওশাদ থামে।
“কিছু বলবে বাবা?”
“বাবা আমি যাই তোমার সাথে?”
মেয়েটা অসম্ভব ঠান্ডা হয়ে আছে। নওশাদের খটকা লাগার কথা কিন্তু এখন খটকার লাগার মতো অবস্থায় সে নেই।
“না শীতল, তুমি বাড়িতে থাকো। আমরা খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো। ঠিক আছে বাবা?”
শীতল যন্ত্রের মতো মাথা নাড়ে, নওশাদ চলে যায়।
গ্রিলে মাথা ঠেকায় শীতল। এই মুহুর্তে বৈশাখের আকাশ ভেঙেচুরে যেমন ঝড় নামে ঠিক যেভাবে হৃদয় ভেঙেচুরে কান্না আসছে তার। কিন্তু সে ঠিক করেছে সে কাঁদবে না। উৎস ভাই বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত সে কাঁদবে না। সে ফিরলে সবটুকু আবেগ ঢেলে আয়োজন করে কাঁদবে, আনন্দে কাঁদবে।
মূর্তির মতো গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে শীতল।
(চলবে……)