#মাতাল_প্রেমসন্ধি
পর্ব: ৩
থানার বারান্দায় একটা কাঠের বেঞ্চে জবুথবু হয়ে বসে আছে নওশাদ। রাত বাজে প্রায় এগারো, তারও বেশি হতে পারে। নওশাদের ঠিক খেয়াল নেই সময়ের। অনেক কষ্টে সে উৎসের সন্ধান পেয়েছে। ওকে সহ ওর বেশ কিছু বন্ধুকে থানায় আনা হয়েছে গ্রেপ্তার করে। ওদের দলেরই দুইটা ছেলেকে বিপক্ষ দল মেরে ফেলেছে। আহত হয়েছে দুই পক্ষের ছেলেরাই। কিন্তু তাদের কাউকে গ্রেপ্তার না করে, করা হয়েছে উৎসদের।
থানার বাইরে সাংবাদিকদের প্রচুর চাপ, কিন্তু কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
গ্রেপ্তার করা ছেলেগুলোর অভিভাবকদের মধ্যে শুধু সে এসেছে, আর কেউ আসেনি। হয়তো কেউ খবর পায়নি বা পেলেও আসতে পারেনি। উদ্ভ্রান্ত চোখে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে নওশাদ। রাগ, ঘৃণা, দু:খ কিছু হচ্ছে না তার। নির্লিপ্ত হয়ে আছে ভিতরটা।
“শাহরিয়ার উৎসের বাড়ির লোক কে আছে?”
ধাতস্থ হয়ে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায় নওশাদ।
“আমি আছি, আমি।”
কনস্টেবলটা একবার তাচ্ছিল্যের চোখে দেখে তাকে।
“এমনভাবে আমি আমি করছেন যেনো আপনার ছেলে কি না মহৎ কাজ করেছে, গর্ববোধ করছেন তার জন্য। স্যার ডাকে, ভিতরে আসুন।”
নওশাদ ধীর পায়ে তাকে অনুসরণ করে। এমন লজ্জিত তাকে এই জীবনে হতে হবে কোনোদিন ভাবতে পারেনি। তার সবসময়ই একটা নীতি ছিলো। তিনবেলা না খেয়ে দুই বেলা খেলেও হবে, দুইটা জামা দিয়ে বছর পার করা যাবে। শুধু মানসম্মানের যেনো কোনো ঘাটতি না হয়। আজ তাও হয়ে গেলো। কোনোদিন দু:স্বপ্নেও সে ভাবেনি, তাকে থানায় আসতে হবে। তাও নিজের কাউকে ছাড়ানোর জন্য।
থানার ওসি গম্ভীর মুখে বসে ছিলো। কনস্টেবল এসে বললো,”স্যার শাহরিয়ার উৎসের বাড়ির লোক।”
ওসি চোখের ইশারায় তাকে বসতে বলে। নওশাদ চেয়ার টেনে বসে।
“আপনার ছেলে?”
নওশাদ ঠান্ডা গলায় বললো,”ছেলে বললে ভুল হবে না।”
“তার মানে?”
“আমার ভাগ্নে, আমি ওর মামা।”
ওসি নিজের মনে হাসে।
“কেনো বাবা আসেনি? অবশ্য আসবেই বা কি, ছেলে যে কীর্তি করেছে। বাবার আসার মুখ আছে নাকি। এজন্যই মামাকে পাঠিয়ে দিয়েছে।”
নওশাদ ওসির চোখে চোখ রেখে বললো,”ওর বাবা বেঁচে নেই। এই মুহুর্তে বাবা বলুন বা যে কোনো অভিভাবক, আমি-ই আছি।”
ওসি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়।
“কেমন অভিভাবক আপনারা? ছেলে ভার্সিটিতে ওঠার পর কি করছে না করছে খেয়াল করেননা? মেধাবী ছাত্র তোরা, পড়াশোনা করবি, বড় চাকরি করবি এরপর। তা না, ভার্সিটিতে এসেই রাজনীতিতে জড়িয়ে যাস। আর লাগতে যাস কাদের সাথে? চুনোপুঁটি হয়ে রুই কাতলার সাথে লাগতে যাস। আপনারা খেয়াল রাখেন না কেনো? নাকি নিজের ছেলে নয় বলে দুশ্চিন্তাও নেই তার প্রতি?”
নওশাদ দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”ওকে কখনো নিজের ছেলে ব্যতীত আর কিছু ভাবিনি স্যার। ওর সাথে আমার সম্পর্ক বাবা-ছেলের চেয়ে অন্যকিছু না। আর আমার ওর প্রতি বিশ্বাস আছে। ও খারাপ কিছু করতেই পারেনা।”
ওসি রাগান্বিত হয়ে বললো,”রাখুন আপনার বিশ্বাস। অনেক দেখেছি আপনাদের মতো। এসব অন্ধবিশ্বাসের জন্যই কমবয়সী ছেলেগুলো বিপথে যাচ্ছে। এইযে দুইজন প্রাণ হারালো, ওদের দায় কি আপনার ভাগ্নে নিবে? নেতা সেজেছে, নেতা।”
নওশাদ গম্ভীর গলায় বললো,”যারা মেরেছে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে?”
“কি বলতে চান আপনি?”
“বলতে চাচ্ছি না বলছি। আমার জানামতে যারা মেরেছে তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। কিন্তু ঠিকই উৎসদের ধরে আনা হয়েছে। এগুলো কেমন বিচার?”
নওশাদ ভেবেছিলো ওসি রেগে যাবে, চিৎকার করবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে ওসি অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বললো,”তারা পালিয়েছে। তাদেরকে খোঁজা চলছে। পেলেই গ্রেপ্তার করা হবে।”
নওশাদ বলতে চায়, তাদের খোঁজা হচ্ছে নাকি তারা আপনাদের ছায়াতলেই আছে? ইচ্ছা করেই পালিয়ে যেতে দেওয়া হচ্ছে তাদের?
কিন্তু না, নওশাদ চুপ করে যায়। সব কথা সব জায়গায় বলা উচিত না। কিছু জায়গায় উচিত কথাও বলতে নেই।
বেশ কিছু ফর্মালিটির পর ওসি একজন কনস্টেবলকে ডেকে উৎস আর আবিরকে ছেড়ে দিতে বলে। বাকিদের সকালের আগে ছাড়া হবে না।
“এইযে শুনুন।”
নওশাদ ঘুরে তাকায়।
“পরবর্তীতে খেয়াল রাখবেন। পানিতে থেকে কুমিরের সাথে দ্বন্দ্ব করা যায়না, এটা আপনার ভাগ্নেকে বুঝিয়ে বলবেন।”
নওশাদ মুচকি হেসে বললো,”তাহলে আপনাদের কাজটা কি স্যার?”
“মানে?”
“আপনাদের কাজই তো পানিতে থাকা সব প্রাণীদের রক্ষা করা। আপনারা তা না করে শুধু কুমিরকে রক্ষা করছেন, এটা কি ঠিক?”
ওসি চরম অবাক হয়ে বললো,”আপনার কাছ থেকে আমার শিখতে হবে কোনটা আমাদের কাজ, কোনটা কাজ না?”
“ছি ছি স্যার, সে স্পর্ধা কি আমার আছে? আপনাকে শেখাতে যাবো কেনো? আমি শুধু জানতে চাচ্ছি পানিতে কি শুধু কুমিররাই থাকবে? বাকিরা কেউ থাকবে না?”
ওসি রাগী লাল চোখে তাকায় নওশাদের দিকে। নওশাদ সালাম দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। বারান্দায় অপেক্ষা করতে থাকে উৎসের জন্য।
“মামা।”
নওশাদ ঝট করে তাকাতেই হতভম্ব হয়ে যায়। এটা কি দেখছে সে? উৎসের কপাল কেটে গেছে অনেকটা, ঠোঁটের কোণা ফুলে উঠেছে। রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে সেখান থেকে। ঘাড়ের বাম পাশে কালচে লাল দাগ। এছাড়াও সারা শরীরে অতিরিক্ত মারের দাগ। তার পাশে বন্ধু আবিরের শরীরেও মারের চিহ্ন কিন্তু উৎসের মতো এতোটা নয়।
নওশাদ অবাক হয়ে দেখে এতো মারের পরেও ছেলেটা এভাবে অটল দাঁড়িয়ে আছে কীভাবে? শুধু তাই না, ওর চোখেমুখে এক ছাঁইচাপা দেওয়া আগুনও দেখতে পাচ্ছে সে। এ আগুন ভয়ংকর। একবার জ্বলে উঠতে পারলে শেষ করে দিবে সবকিছু।
“মামা আমি……”
উৎসকে থামিয়ে দেয় নওশাদ।
“বাড়িতে চলো। সব কথা পরে শুনবো। আর এই যে আবির, তুমিও চলো আমার সাথে। এতো রাতে তোমাকে একা ছাড়ার সাহস পাচ্ছিনা। তোমরা এসো আমি এগোচ্ছি।
উৎস আর আবিরকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে নওশাদ বাইরে যেয়ে দাঁড়ায়। অসংখ্য সাংবাদিক উৎস আর আবিরকে দেখে ছুটে আসে। নওশাদ দুই হাতে দুইজনকে জাপটে বের করে আনে। এখন কিছু বলার মতো অবস্থাই তাদের নেই।
সারা রাস্তায় একটা কথাও হয়না ওদের। লজ্জায়, অনুশোচনায় উৎস তাকাতে পারেনা মামার দিকে। এ কি হয়ে গেলো? তার এমন নিষ্পাপ মামাকে কিনা তার জন্য থানায় আসতে হলো? এতোটা অপমানিত হতে হলো? এ অপরাধের শাস্তি কীভাবে দিবে সে নিজেকে?
নওশাদও তাকাতে পারেনা উৎসের দিকে। একটু পর পর শার্টের হাতায় চোখ মোছে। তার ফুলের মতো ছেলেটা। এইতো সেদিনই এতোটুকু ছিলো। তার গায়ে একটা ফুলের টোকা দেওয়া হলে যেনো নওশাদেরই কলিজা ছিঁড়ে যেতো। আজ তার সেই ছেলেকে এভাবে অমানুষের মতো মারা হয়েছে। কীভাবে সহ্য করবে এই যন্ত্রণা সে? উৎস যদি কোনো অন্যায় করতো সে শাস্তি দিতো তাকে, রাগ করতো। কিন্তু ও তো কোনো অন্যায় করেনি। বহ্নি, শীতল কিংবা আভার মতোই কোনো একটা মেয়ের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করেছে। যে সত্যের পথে থাকার উপদেশ সে ছোট থেকে ওদের চারজনকে দিয়েছে, আজ সেই সত্যের লড়াইয়ের জন্য কীভাবে উৎসকে শাস্তি দিবে সে? কোন মুখে?
পুরোটা রাস্তা এসব চিন্তায় কেটে যায়। দুইজনই অনুতাপে পুড়ছে কিন্তু কেউ নিজে থেকে কিচ্ছু বলতে পারছে না। কয়েক কিলোমিটার রাস্তাকে কয়েক হাজার কিলোমিটার মনে হলো ওদের।
চিলেকোঠার ঘরে উৎসকে নিয়ে সায়েরা থাকবে আজ। নিচতলায় সায়েরার ঘরটা দেওয়া হয়েছে আবিরকে। বহ্নি, শীতল, আভা সবাই চিলেকোঠার ঘরেই ছিলো। আবিরকে দেখার কেউ নেই। শাহানা রাগ করে সেই যে ঘরে ঢুকেছে, আর কোনো খোঁজ নেই তার। তার ধারণা, এই ঘটনার পর তার মেয়েদের নাকি বিয়ে দিতে সমস্যা হবে। যে বাড়িতে বড় হওয়া ছেলেকে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয় মারামারির অপরাধে, ছাড়িয়ে আনার জন্য মামাকে যেতে হয়৷ সে বাড়ির মেয়েকে কে বিয়ে করবে? সে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে নওশাদকে। উৎসকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিতে হবে। নাহলে সে মেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যাবে।
শাহানার কথায় আপাতত কারো মাথা ব্যথা নেই। সবাই উৎসকে নিয়েই আছে। বাড়ির ফেরার পর পর তার ধুম জ্বর এসেছে। অনেকটা অজ্ঞানের মতোই পড়ে আছে সে। সায়েরা কিছু খাইয়ে দিতে চেয়েছিলো। আবির খেতে পারলেও উৎস খেতে পারেনি, বমি হয়ে গেছে।
নওশাদ চুপচাপ দরজার কোণে দাঁড়িয়ে আছে। এক ধাক্কায় যেনো তার বয়স কতো বছর বেড়ে গেছে। ছেলেটার দিকে তাকাতে পারছে না সে। বুক ভেঙে কান্না আসছে তাকালেই।
তিন বোন মূর্তির মতো খাটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। শীতল এক মুহুর্তের জন্যও চোখ সরাতে পারছে না উৎসের উপর থেকে। দুই গাল বেয়ে দরদর করে পানি পড়ছে। বহ্নি আর আভার চোখেও পানি।
“বহ্নি, শীতল।”
বাবার কথায় দুইজন তাকায়।
“বলো বাবা।”
“সবাই তো এখানে থাকলে হবে না। নিচে আরেকজন অসুস্থ মানুষ আছে। তাকে আমি নিজে এ বাড়িতে এনেছি। তাকেও তো দেখতে হবে। আমি যাচ্ছি ওখানে, তোমরা দুইজন আমার সাথে এসো। আর আভা তুমি ফুপুর কাছে থাকো। তার যা লাগে দেখো। আজ রাতটা কারো ঘুম হবে না।”
বহ্নি বাঁকা চোখে শীতলের দিকে তাকায়। সে বুঝতে পারে শীতল এখান থেকে এক পা-ও নড়তে চায়না। কিন্তু বাবার মুখের উপর কিছু বলার সাহস তার নেই।
বহ্নি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,”বাবা আমি আর আভা যাচ্ছি তোমার সাথে নিচের ঘরে। শীতল এখানে থাকুক। ফুপু একা মানুষ, আভা পারবে না সব করতে।”
আভা তাড়াতাড়ি করে বললো,”আমি পারবো, আমি পারবো।”
নওশাদ বিরক্ত হয়ে আভার দিকে তাকিয়ে বললো,”সব ব্যাপারেই কি তোমার কোনো না কোনো আপত্তি থাকে? বড় আপা যা বলছে ঠিক বলছে। তুমি ছোট, ফুপুর সাথে থাকতে পারবে না। উৎসের এই অবস্থায় কখন কি দরকার হয়। তুমি আর বহ্নি আমার সাথে আবিরের ওখানে চলো।”
আভার মুখ অন্ধকার হয়ে যায়। শীতল সজল চোখে বহ্নির দিকে তাকায়। বহ্নি ম্লান হাসে তার দিকে তাকিয়ে।
“শীতল দেখিস, ফুপুকে সাহায্য করিস। ঘুমিয়ে পড়িস না আবার।”
বহ্নি জানে শীতল ঘুমাবে না, ঘুমাতে পারবেই না সে।
শীতল যন্ত্রের মতো বললো,”ঘুমাবো না আপা। নিশ্চিন্তে থাকতে পারো।”
বহ্নি শীতলের হাতে আলতো করে চাপ দেয় একটা।
যাওয়ার আগে নওশাদ এসে দাঁড়ায় উৎসের খাটের পাশে। উৎসের জ্ঞান নেই বললেই চলে। মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে আছে। সারা গায়ে ব্যথা, ব্যথায় কেঁপে কেঁপে উঠছে কিছুক্ষণ পর পর। সায়েরা আকুল হয়ে কাঁদছে আর জলপট্টি দিচ্ছে। তার মাথা কাজ করছে না। সে নিজেও জানেনা কোন দুনিয়ায় আছে সে এখন।
নওশাদ সায়েরার মাথায় হাত রাখে। সায়েরা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো,”ভাইজান আমার ছেলেটা বাঁচবে তো?”
শিউরে ওঠে শীতল ফুপুর কথা শুনে।
“এসব কি বলছিস সায়েরা? তোর ছেলেকে যে বাঁচতেই হবে। সৃষ্টিকর্তা যে ওকে অনেক দায়িত্ব দিয়েছে রে। ওর হাত দিয়ে তিনি হয়তো অনেক অনেক মানুষকে বাঁচাবে। ও না বাঁচলে কীভাবে হবে?”
“ভাইজান……”
“আর কোনো কথা না। ওর পাশে থাক, আমি মাঝে মাঝে এসে খোঁজ নিয়ে যাবো। পারলে কিছু খাইয়ে দিস, শরীর খুব দূর্বল।”
কথা শেষ করে নওশাদ উৎসের কপালে হাত রাখে। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে কপাল। চোখ থেকে দুই ফোঁটা পানি এসে পড়ে উৎসের কপালে। উৎস ঈষৎ কেঁপে ওঠে।
“শীতল।”
“বলো বাবা।”
“আসছি আমি, উৎসকে দেখো। প্রয়োজন হলে ডাক দিবে আমাকে।”
“আমি আছি বাবা, চিন্তা করোনা।”
হালকা মাথা নেড়ে নওশাদ দুই মেয়েকে নিয়ে নিচে চলে যায়। আবির ছেলেটাও তো এখন অসহায়, তাকেও তো দেখতে হবে।
ঘড়ির কাঁটার টিকটিক আর সায়েরার নাক টানার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ছোট্ট ডিমলাইটটা জ্বলছে আর কোনো আলো নেই ঘরে। ওটুকু আলো যেনো ঘরের অন্ধকার আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সায়েরা একমনে শুধু জলপট্টি দিয়েই যাচ্ছে উৎসের কপালে। জ্বর নামার কোনো সম্ভাবনা নেই। রাতটা অনেক বেশি দীর্ঘ মনে হচ্ছে তাদের। কেনো কাটছে না এই অন্ধকার? কখন ভোরের আলো ফুটবে? মাত্র আড়াইটা বাজে, কখন বাকি সময়টা যাবে?
উৎসের মাথার কাছেই সটান হয়ে বসে আছে শীতল। ঈষৎ আলোয় মানুষটাকে অল্প দেখা যাচ্ছে। প্রায় জ্ঞানহীন অবস্থায় শুয়ে আছে। দূর থেকেই যেনো গরমের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে তার শরীর থেকে। মাঝে মধ্যে কি যেনো প্রলাপ বকে যাচ্ছে। অস্ফুট আওয়াজ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
“শীতল মা।”
শীতল তড়িঘড়ি করে ফুপুর দিকে তাকিয়ে বললো,”বলো ফুপু, কি লাগবে তোমার?”
“মা আমি নামাজে বসবো। আমার ছেলের জ্বর না নামা পর্যন্ত আমি জায়নামাজ থেকে উঠবো না। আমার জায়নামাজ, তসবি তো সব নিচে, আমার ঘরে।”
“আমি এনে দিবো ফুপু?”
“না তুই উৎসের কাছে থাক, ওকে জলপট্টি দিতে থাক। আমি ওযু করে ওগুলো নিয়ে আসি। পারবি না মা?”
শীতল ঘোর লাগা গলায় বললো,”কেনো পারবো না ফুপু? তুমি যাও। আমি দেখছি উনাকে। কোনো অসুবিধা হবে না।”
সায়েরা উঠে দাঁড়ায়। শীতলের মাথায় একটা হাত রেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে। শীতল আটকায় না, নিজেরও যে ভীষণ কান্না পাচ্ছে। শুধু সে ফুপুর মতো চিৎকার করে কাঁদতে পারছে না।
সায়েরা বেরিয়ে যায়। শীতলের ঠোঁট কাঁপতে থাকে তিরতির করে। ছোট থেকে একসাথে বড় হওয়া হলেও এ পর্যন্ত এই মানুষটার এতো কাছে, একাকী সময় কাটানো হয়নি তার। শরীরটা কেমন ঝিমঝিম করতে থাকে তার। মনে হচ্ছে তার নিজেরও জ্বর আসবে। গা কাঁপিয়ে ভীষণ ভাবে জ্বর আসবে।
নিচতলায় নওশাদ-শাহানার ঘর টপকে সায়েরার ঘর। নিচে আসতেই ও ঘর থেকে গুণগুণ আওয়াজ শুনে থমকে দাঁড়ায় সায়েরা। নওশাদ তো এখন আবিরের ঘরে থাকার কথা। আর শাহানা যেভাবে চিৎকার চেচামেচি করে ঘরের দরজা দিলো। সায়েরা অবশ্য তখন কিছু মনে করার মতো অবস্থায় ছিলোনা। ওদিকে তার ছেলের মৃতপ্রায় অবস্থা। কারো রাগ দেখার মতো মন, মেজাজ বা অবস্থা কোনোটাই সায়েরার ছিলো না। কিন্তু এতো রাতে ও ঘরে কিসের আওয়াজ?
আড়ি পাতার স্বভাব সায়েরার কোনোকালেই ছিলোনা। কিন্তু আজ আর কৌতুহলটা দমাতে পারলো না সে। যেহেতু তার ভাই ঘরে নেই, তাই ভিতরে উঁকি দেওয়াটা একেবারেই অশোভন কিছু হবে কি? দোমনা করে এগিয়ে যায় সায়েরা ঘরের দিকে। জানালা খোলাই আছে।
কিছুটা ইতস্তত করে সায়েরা জানালার পর্দাটা সরাতেই দেখে শাহানা মেঝেতে জায়নামাজ পেতে বসে আছে। টিমটিমে একটা আলো জ্বলছে ঘরে। সেই আলোয় সে স্পষ্ট দেখলো শাহানার গাল চকচক করছে। সায়েরা অবাক হয়, ভাবী কাঁদছে কেনো? কি হলো তার? কিন্তু তাকে ডেকে বিরক্ত করতে ইচ্ছা হলো না সায়েরার এখন। তবে কি নিজের সংসার নিয়ে চিন্তিত সে? মেয়েদের বিয়ে নিয়ে কিংবা সমাজের মানুষের কটুক্তি নিয়ে। মানসম্মানের ভয়েই এভাবে কাঁদছে সে?
নিজের কাছেই নিজেকে অসম্ভব ছোট লাগে সায়েরার। সে না চাইতেও কতো কি বদলে গেলো তার জীবনটার। তার নিজের একটা ছোট্ট সংসার ছিলো। সে, উৎস আর উৎসের বাবা। বিলাসিতা না থাকলেও অভাব ছিলোনা। মানুষটা ছিলো অসম্ভব সৎ আর ভালো একজন মানুষ। অসৎ পথে একটা পয়সা রোজগার করতে চাইতো না সে। উৎসকে নিজের জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসতো। ভীষণ সুখেই ছিলো সায়েরা। কিন্তু ওইযে, ভাগ্য। প্রকৃতির বোধহয় তার এ সুখটা সহ্য হলোনা। কথা নেই, বার্তা নেই হুট করে সুস্থ, সবল মানুষটা হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেলো। মাত্র ছয় বছর বয়স তখন উৎসের। তেমন কোনো টাকাপয়সাও রেখে যেতে পারেনি মানুষটা। শ্বশুরবাড়ির লোকেরাও কোনো দায়িত্ব নিতে চায়নি তার বা তার ছেলের। চোখে অন্ধকার দেখা শুরু করে সে। হাসপাতালে নিতে নিতেই মারা যায় লোকটা। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে তার ভাইজানের হাত ধরে বলে গিয়েছিলো উৎসকে দেখতে। নওশাদও রাজি হয়েছিলো সাথে সাথে। কিন্তু সায়েরা কখনোই চায়নি তার নিম্নমধ্যবিত্ত ভাইয়ের বাড়িতে এভাবে ঘাঁটি গেড়ে বসতে। নিজের পড়াশোনাও বেশি দূর ছিলোনা যে একটা চাকরি করবে। নওশাদ জোর করে নিয়ে আসে তাদের দুইজনকে এ বাড়িতে। শাহানার খুশি বা অখুশি কোনোটাই চোখে পড়েনি সায়েরার তখন। মানুষটা বেশ অদ্ভুত। তার অনুভূতি কখনোই প্রকাশ করতে চাইতো না৷ কিন্তু সে বুঝতো, অখুশি হলেও শাহানাকে দোষ দেওয়া যাবেনা। অল্প রোজগার তার ভাইয়ের। তার উপর সাত বছরের বহ্নি, তিন বছরের শীতল আর সদ্যোজাত আভাকে নিয়ে নিজেদেরই কষ্টেসৃষ্টে চলে তাদের। এরমধ্যে আরো দুইটা উটকো মানুষের দায়িত্ব নিতে কেউই রাজি হওয়ার কথা না। যদিও শাহানা রাগ বা অভিমান কিছুই দেখায়নি। শুধু কাজ করাটা কমিয়ে দেয়। বেশিরভাগ কাজের ভার সায়েরাকে দিয়ে দেয় আস্তে আস্তে। সায়েরার এতে সমস্যা ছিলোনা। নিজের মধ্যে লজ্জা আর অনুশোচনায় গুটিয়ে থাকতো সে। ভাবী কোনো কাজ করতে বললে সেইটা তাড়াতাড়ি করে নিজেকে ধন্য মনে করতো, এখনো তাই। শুধু একটা মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতীক্ষায় দিন গুণছে সে। একমাত্র আশার আলো তার ছেলে, উৎস। একদিন ও অনেক বড় চাকরি করবে, মা’কে এখান থেকে নিয়ে যাবে। কিন্তু যতো যাই হোক, নিজের শিকড়কে ভুলে যেয়ে নয়। যে মামা মামি এতো কিছু করলো তার জন্য, তাদের আর তাদের তিন মেয়েকে যেনো উৎস কোনোভাবেই ভুলে না যায় সেই শিক্ষাও মা হয়ে দিয়েছে সে উৎসকে। কিন্তু কোথায় কি? ছেলেটা নিজে থেকে নিজের ভবিষ্যৎ কবেই খুইয়ে রেখে দিয়েছে, মা হয়ে সে টেরও পেলোনা?
“সায়েরা।”
ভাবনার মধ্যে ডুবে গিয়েছিলো সায়েরা। কখন যে শাহানা দরজা খুলে তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে সে একটুও বুঝতে পারেনি।
“ভাবী আসলে আমি…..”
শাহানা ধীর পায়ে সায়েরার কাছে এসে দাঁড়ায়। সায়েরা কিছু বোঝার আগে তাকে জোরে জাপটে ধরে শাহানা। সাথে সাথেই কান্নায় ভেঙে পড়ে শাহানা।
সায়েরা হতবাক হয়ে যায়, কিছুই বুঝতে পারে না কি হচ্ছে। কাঁপা কাঁপা হাতে শাহানার পিঠে হাত রাখে।
“ভাবী কি হয়েছে আপনার?”
“ছেলেটা এখন কেমন আছে সায়েরা? ওর ওই মুখ দেখার পর থেকে আমি চোখ বুঁজতে পারছি না। কষ্ট হচ্ছে খুব। ক্ষণিকের জন্য রাগ হলেও এখন আমি আর নিজেকে সামলাতে পারছিনা।”
সায়েরার চোখও পানিতে ভরে যায়।
“ছেলে কি আমার একার ভাবী? আপনার না? সব দায়িত্ব আমাকে দিয়ে আপনি নিচে বসে আছেন। ছেলের মাথার কাছে যেয়ে একটু বসেন, ওর কপালে জলপট্টি দিয়ে দেন। সুস্থতার জন্য মায়ের দোয়া আর মায়ের ছোঁয়া দুইটাই তো দরকার আছে। আপনি নিজে যেয়েই দেখুন আপনার ছেলের শরীর এখন কেমন?”
সায়েরাকে ছেড়ে শাহানা সোজা হয়ে দাঁড়ায়, চোখের পানি মোছে।
“আমি যাবো সায়েরা?”
“যাবেন না? ছেলের কাছে মায়ের যেতে আবার অনুমতি কিসের?”
“তুমি কোথায় যাচ্ছো?”
“আমি ওযু করে তসবি আর জায়নামাজ নিয়ে যাচ্ছি। আপনি ততক্ষণে যেয়ে বসুন ওর কাছে।”
“ও কি একা আছে?”
“না শীতল আছে ওর কাছে।”
শাহানা মাথা নাড়ে। এরপর সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। সায়েরা সেদিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। বুকের উপর থেকে একটা ভারী পাথর নেমে যায় তার।
দূর থেকে স্ত্রীর সব কথা শোনে নওশাদ। কষ্টের মধ্যেও হেসে দেয়, যদিও চোখে পানি। মাঝে মধ্যে মনে হয় সে তার স্ত্রীকে সবচেয়ে ভালো বোঝে আবার মাঝে মাঝে মনে হয় চিনতেই পারেনা সে এই দূর দ্বিপবাসিনীকে। নিজেই চিৎকার করবে, নিজেই বলবে উৎসকে মাথায় না তুলতে, আহ্লাদ না দিতে আবার নিজেই ভিতর ভিতর কষ্ট পাবে ছেলেটার জন্য। আসলে শাহানার কোনো দোষ নেই। ছেলেটাই এমন মায়াকাড়া যে ওকে না ভালোবেসে উপায় নেই। চুপচাপ, গম্ভীর কারো সাথেই তেমন কথা বলেনা অথচ সবাইকে কেমন মায়ায় আটকে রেখেছে। ছেলেটা আসলেই অসাধারণ। ও একদিন ঠিক প্রমাণ করবে, ও কোনো অন্যায় করেনি। অন্যায়ের সাথে আপোষ করা ছেলে উৎস না। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে নওশাদের বুল চিরে।
সায়েরা নিচে যাওয়ার পর থেকে উৎস বিড়বিড় করে কি বলেই যাচ্ছে। কোনোকিছুই স্পষ্ট না। শীতল জলপট্টি দিয়েই যাচ্ছে। জ্বর কমার বদলে আরো মনে হচ্ছে বেড়েই চলেছে। বারবার ঘড়ির দিকে তাকায় শীতল। আজ রাতটাই কেনো এতো দীর্ঘ? কখন আলো ফুটবে? কখন সকাল হবে? কেনো কাটছে না এই আঁধার তাড়াতাড়ি?
উৎসের মুখ থেকে গরম ভাপ বের হচ্ছে। ঠোঁটজোড়া চুম্বকের মতো টানছে শীতলকে। একদৃষ্টিতে শীতল সেদিকে তাকিয়ে থাকে। তার শরীর ভার হয়ে আসছে সে বুঝতে পারছে। নিজেকে কতোক্ষণ সে সংযত করতে পারবে সে জানেনা। ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় তার। প্রায়শ অন্ধকার ঘর, একাকীত্বে প্রিয় পুরুষটার একদম কাছে। কোনো রমনীর পক্ষে বেশিক্ষণ দূরে থাকা অসম্ভব। ভুল করার ইচ্ছা বেড়ে যায়, প্রবল সে ইচ্ছা। হতাশ মুখে তাকায় বারবার সে দরজার দিকে। কেনো এখনো ফুপু আসছে না?
পরক্ষণেই নিজের ভাবনায় নিজেই শিউরে ওঠে শীতল। এসব কি বিশ্রী চিন্তা আসছে তার মাথায়? এতোটা অসভ্য চিন্তা কীভাবে করতে পারলো সে? যে মানুষটা তাকে দেখতেই পারেনা তাকে নিয়ে এসব কি ভাবছে?
শীতল উঠে দাঁড়ায়। জোরে জোরে শ্বাস ফেলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে সে। না, এভাবে বসে থাকা যাবে না এখানে। সঠিক কাজ করতে সময় লাগলেও ভুল করতে সময় লাগেনা। এমন ভুল হলে সারাজীবনেও সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না। আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারবে না এই মুখ নিয়ে। উৎস ভাই তো জানতেই পারবে না কি হয়ে গেলো, কিন্তু সে? সে তো জানবে। না না, এই ভুল করা যাবেনা।
সে ঠিক করে সায়েরা না আসা পর্যন্ত সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকবে। এটুকু সময় জলপট্টি না দেওয়া হলে এমন কিছু হবেনা। জ্বর এমনিও পড়ছে না।
শীতল চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই হঠাৎ ওড়নায় টান লাগে তার। পিছনে ঘুরে তাকাতেই দেখে উৎসের বালিশের নিচে ওড়না চাপা পড়েছে। ওড়নাটা টেনে আনতেই আচমকা উৎস হাত চেপে ধরে শীতলের……..
ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে যায় শীতল। তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে যায়। অসম্ভব উষ্ণ একটা হাত চেপে ধরে রেখেছে তার অত্যন্ত ঠান্ডা হাতটা। উৎসের জ্ঞান নেই সেভাবে, সে কি করছে নিজেও জানেনা। ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে তাকায় শীতল। কেউ এসে দেখে ফেললে কি ভাববে? এখন যদি তার ফুপু আসে?
নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে শীতল। যদিও অসুস্থ, তবুও যেনো উৎসের শক্তি এক ফোঁটা যেনোকমেনি। পাটকাঠির মতো শরীর শীতলের। সে পারবে কীভাবে?
আচমকাই হাতটা আরো জোরে টেনে নিজের বুকের উপর নামিয়ে দেয় শীতলকে। শীতল চোখ বড় বড় করে তাকায়। একরকম স্তম্ভিত হয়ে গেছে সে। হৃৎপিণ্ডটা যেনো গলার কাছে এসে ধকধক করছে, যে কোনো সময় বেরিয়ে আসবে। এমন অদ্ভুত পরিস্থিতিতে সে জীবনেও পড়েনি। মাত্র দুই ইঞ্চি দূরত্ব হবে দুইজনের। উৎসের তপ্ত শ্বাস এসে ধাক্কা খাচ্ছে শীতলের মুখে। ভালো লাগা উচিত হয়তো, কিন্তু তার বদলে একরাশ ভয় জমা হয় শীতলের। কেউ যদি দেখে ফেলে কি হবে?
“উৎস ভাই কি করছেন? ছাড়ুন আমাকে। আমি শীতল।”
শীতলের খোঁপা করা লম্বাচুল খুলে যায় এসবের মধ্যে। চুলগুলো এসে ভিড় করে উৎসের মুখে। মিষ্টি একটা গন্ধ উৎসের নাকে লাগতেই তার নিশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
“উৎস ভাই ছাড়ুন না দয়া করে। কি করছেন?”
ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দরজার দিকে তাকায় শীতল বারবার। আজ খারাপ কিছু না হয়ে যায়।
হঠাৎই উৎস কিছু বলার চেষ্টা করে। কিন্তু এবার আর অস্ফুট না। আওয়াজ বেশ স্পষ্ট না হলেও কাছাকাছি গেলে শোনা যায় এমন। শীতল ইতস্তত করে মাথাটা ঝুঁকিয়ে কানটা এগিয়ে দেয় আরেকটু উৎসের মুখের দিকে। সে কি বলছে শোনার চেষ্টা করে।
“অনুপমা, আমার কাজল চোখের প্রেয়সী। আমার বসন্তের গোলাপ, আমার সর্বনাশের ফাঁদ।”
হকচকিয়ে যায় শীতল। এসব কি বলছে উৎস ভাই? অনুপমা কে? তার নামে এসব কেনোই বা বলছে? তবে কি অনুপমা নামে কেউ আছে তার জীবনে? প্রেমিকা? শীতল আর কিছু ভাবতে পারেনা।
“আমি জানি তুমি আমার খুব কাছাকাছি আছো। আমি তোমার মেঘবরণ কেশের মিষ্টি সুগন্ধ পাচ্ছি। যে সুগন্ধ পৃথিবীর সবচেয়ে দামী পারফিউমকেও হার মানায়। চলে যেও না, এভাবেই থাকো।”
শীতলের শরীর থেকে যেনো সব শক্তি বের হয়ে যায়। নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ন্যুনতম শক্তিটুকু বেঁচে নেই আর। এ কি শুনলো সে? কেনো শুনলো? ভিতরটা ভেঙেচুরে যাচ্ছে তার, সে যেনো উপর থেকেই তার পাজর ভাঙার আওয়াজ পাচ্ছে।
“তোমার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে নি:স্ব হয়ে যাক আমার এ বিষন্ন জীবন। সব শেকল ভেঙে মিশে যাও আমার সাথে। একাকার হয়ে যাও আমার অনুভূতিতে। বিশ্বাস করো, পৃথিবী ধ্বংস করে হলেও তোমার জন্য সুখ কিনে আনবো নিজের সুখ বিক্রি করে। আমাকে একটু সময় দাও। আমি যে তোমাকে ভুলতে পারবো না অনুপমা। আমার আত্মাকে ছুঁয়ে ফেলেছো তুমি, তোমাকে ভোলা অসম্ভব।”
অনুভূতি শূন্য হয়ে যায় শীতল। কোনোদিকেই আর কোনো খেয়াল নেই তার। উৎস ভাইয়ের প্রেমিকা আছে? নিজের সবটুকু উজাড় করে তাকে ভালোবাসে উৎস ভাই? যতোটুকু আশা মনে ছিলো তাও আর থাকবে না আজকের পর থেকে? আচ্ছা, এটা কোনো দু:স্বপ্ন নয় তো? যদি তাই হয় এরচেয়ে ভয়ংকর দু:স্বপ্ন সে আগে কখনো দেখেনি, কখনো না।
“শীতল।”
একটা রাগী গলার আওয়াজ শুনে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে শীতল। তখনও হাতটা উৎসের কঠিন মুষ্টির মধ্যে শক্ত করে ধরা।
শাহানা অদ্ভুত চোখে শীতলের দিকে তাকিয়ে আছে। এতোক্ষণ সে টেরও পায়নি তার মা কখন এসেছে। দেখার মতো অবস্থা তার ছিলোনা। মস্তিষ্কই তো কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে মিনিট দুয়েকের মধ্যে। মা কি তবে উল্টাপাল্টা কিছু ভাবলো? মায়ের চোখের দিকে তাকানোর সাহস হয়না শীতলের। নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাতের বাঁধন ছোটানোর চেষ্টা করে সে। চিৎকার করে কাঁদবে এখন সে। যেভাবেই হোক এখান থেকে বের হতে হবে তাকে, এখনই।
(চলবে……)