#মাতাল_প্রেমসন্ধি
পর্ব: ৪
“কি হয়েছে শীতল? উৎস তোর হাত ধরে আছে কেনো?”
শীতল থতমত খেয়ে বললো,”মা আসলে কি হয়েছে বলো তো?”
“কি হয়েছে? আর তোর চোখমুখ এমন ফ্যাকাসে লাগছে কেনো?”
“মা আমার কথাটা শোনো। উৎস ভাই ফুপু ভেবেছে আমাকে। দেখো এখনো মা মা করছে। ফুপু তো এখানে নেই, তাই আমাকেই…..”
কথাটা বলেই শীতল চোখ বন্ধ করে দাঁড়ায়। মনে মনে দোয়া করতে থাকে, কোনোভাবেই যেনো এখন উৎস ভাই আবোলতাবোল যা বলছিলো তা না বলে। খুব বিশ্রী হয়ে যাবে সবটা।
শীতলের মন বলছিলো মা তার কথা বিশ্বাস করবে না। কারণ শাহানা ভীষণ চালাক একজন মহিলা।কিন্তু শীতলকে অবাক করে দিয়ে শাহানা বললো,”তাই-ই হবে, ছেলেটা তো ভীষণ মা পাগল।”
শীতল স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে।
“তুই ঘরে যা এখন শীতল।”
“আমি ঘরে যাবো? কিন্তু বাবা যে আমাকে….”
“তোর বাবা এখানে তোকে থাকতে বলেছে তাই তো? আমি বলছি ঘরে যা। এখন আমি আছি ওর পাশে। তোর ফুপুও আসছে।”
শীতল অবাক হয়ে বললো,”তুমি থাকবে?”
“কেনো তোর খুব অসুবিধা হবে তাতে?”
হঠাৎই মায়ের কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা টের পায় শীতল।
“না না আমার কেনো অসুবিধা হবে? আসলে রাতে না ঘুমালে তো তোমার শরীর খারাপ হয় তাই।”
“বাড়িতে এমন একটা পরিস্থিতিতে আমি নাক টেনে ঘুমাবো ঘরে? আমাকে এতোটা স্বার্থপর মনে হয়?”
“না মা, আমি ওভাবে বলতে চাইনি।”
“বুঝেছি, তুই যা এখন। আমি বসছি ওর পাশে।”
শীতল কিয়ৎক্ষণ দাঁড়িয়ে একবার উৎসের দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে। যাওয়ার সময় কেমন অস্বাভাবিক লাগে তাকে, যা চোখ এড়ায় না শাহানার।
শীতল মুখ চেপে ধরে ঘরে আসে। আজ ঘরে দুই বোন নেই। এখানে মন খুলে, চিৎকার করে কাঁদা যাবে। নিজেকে কোনোরকমে নিয়ন্ত্রণ করে ঘরের দরজা খুলতেই চমকে ওঠে শীতল। বহ্নি, আভা দুইজনই ঘরে। আভা ঘুমিয়ে পড়েছে। ও ভীষণ ঘুমকাতুরে, যা কিছু হয়ে যাক ও ঘুম ছাড়তে পারেনা। শুধু বহ্নি জানালায় মাথা ঠেকিয়ে আকাশ দেখছে।
শীতল অতি সন্তোর্পনে কান্নাটা গিলে ফেলে।
“আপা।”
“শীতল তুই চলে এসেছিস?”
“আসলে মা গেলো ওখানে, তাই আমাকে বললো চলে আসতে।”
বহ্নি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। আজ ভীষণ মন খারাপ লাগছে তার। ছেলেটা ছোট থেকে গম্ভীর হলেও তাদের তিন বোনকে যে অসম্ভব ভালোবাসে তা সে জানে। বহ্নির মনে আছে ও নবম শ্রেণিতে থাকতে দশম শ্রেণির একটা ছেলে ওকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলো। বহ্নি না করে দেওয়ায় ছেলেটা ফাঁকা রাস্তায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলো ওকে। ইটের টুকরোয় মাথা লেগে মাথা বেশ অনেকটা কেটে গিয়েছিলো তার। কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে উৎসকে সামনে পেয়ে তাকে সব বলে দিয়েছিলো বহ্নি। ঠিক তার পরদিন ছেলেটা হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়েছিলো বহ্নির কাছে। বহ্নি তো অবাক, হলো কি এটার আবার? পরে অন্য বন্ধুদের থেকে জানতে পারলো অষ্টম শ্রেণির একটা ছেলে নাকি ওই ছেলে আর ওর বন্ধুদের রাস্তায় ফেলে মেরেছে। যদিও এ কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছিলো উৎস তখন। কিন্তু তার কপালের কোণায় ক্ষত আর কনুইয়ের চামড়া উঠে যাওয়া দেখে বহ্নি ঠিক বুঝেছিলো, এটা আর কারো কাজ না। তার দুষ্টু ভাইটারই কাজ। এরপর থেকে স্কুল, কলেজে আলাদাই ভাব নিয়ে ঘুরতো সে। কারণ সে জানতো, যা কিছু হয়ে যাক তার ভাই তাকে রক্ষা করবে।
আজ সেই ভাইটার এতো বড় বিপদ, আর সে কিচ্ছু করতে পারছে না। কিচ্ছু জানতে পারলো না সে। জানতে পারলে নিজের ভার্সিটি থেকে ছুটে চলে যেতো উৎসের কাছে। নিজের ওড়নার মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে বাড়ি নিয়ে চলে আসতো। কেনো জানতে পারলো না সে?
“আপা আমার বিছানা থেকে সরে নিজের বিছানায় যা, আমি ঘুমাবো।”
বহ্নি যেনো কানেই শুনতে পায়নি শীতল কি বলেছে। নাকি ভুল শুনলো?
“কি বললি তুই?”
“শুনতে পাসনি নাকি? বলছি আমার ঘুম পাচ্ছে ঘুমাবো। নিজের বিছানায় যেয়ে বোস।”
বহ্নি অবাক হয়ে বললো,”তোর ঘুম আসবে?”
“কেনো ঘুম না আসার মতো কি হয়েছে?”
“উৎসের এই অবস্থা, আমরা কেউ ঘুমাতে পারছি না। তুই ঘুমিয়ে যাবি?”
“কেনো আভা তো ঘুমিয়েছে, ওকে চোখে পড়ছে না তোর?”
“তুই কি অদ্ভুত কথা বলছিস আমি বুঝতে পারছি না।”
“তোর এতো কিছু বুঝতে হবে না। আমার ঘুম পাচ্ছে, আমাকে ঘুমাতে দে।”
বহ্নি খেয়াল করে শীতল ঠিকমতো কথা বলতে পারছে না। একটু পর পর কেঁপে কেঁপে উঠছে। আবার মা নাকি ও ঘরে গেছে। মা কি কিছু বললো ওকে?
বহ্নি উঠে এসে শীতলের পাশে এসে দাঁড়ায়। শীতল দাঁতে দাঁত চেপে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।
“কি হয়েছে শীতল? কোনো সমস্যা? মা কিছু বলেছে?”
“কেউ কিছু বলেনি আপা। আমার শরীরটা ভালো লাগছে না।”
বহ্নি শীতলের কপালে হাত দেয়। আসলেই গা টা গরম বেশ। ওরও কি জ্বর এলো?
“তোর জ্বর এসেছে কখন?”
“জানিনা।”
“এভাবে কথা বলছিস কেনো?”
শীতল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ বহ্নির চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,”আপা একটা কথা জিজ্ঞেস করি? ঠিকঠাক উত্তর দিবি?”
“কি কথা?”
শীতল চাপা গলায় বললো,”অনুপমা কে আপা? এই নামের কাউকে চিনিস তুই?”
বহ্নি ভ্রু কুঁচকে তাকায়। রাত-বিরেতে মেয়েটার কি হলো হঠাৎ? ও ঠিক আছে তো?
“কার নাম বললি?”
“অনুপমা, নাম শুনেছিস এর আগে কখনো?”
বহ্নির নামটা খুব চেনা চেনা লাগে, কোথায় যেনো দেখেছে নামটা। কিন্তু এতো রাতে, তাও আবার এই পরিস্থিতিতে শীতলের মাথায় এই নাম কে ঢুকালো?
“কি হলো বল না, শুনেছিস?”
হঠাৎ ভ্রু উঁচু করে বহ্নি কিছু মনে করার চেষ্টা করে।
“হ্যা মনে পড়েছে। এই নামটা আমি উৎসের খাতায় দেখেছি।”
শীতল উৎকণ্ঠিত হয়ে বললো,”উৎস ভাইয়ের খাতায়?”
“হ্যা, সে তো সেই কলেজ থেকেই। ওর প্রতিটা খাতায় শুধু একটা নাম লিখে রাখতো। অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি ওকে, কে এই অনুপমা? ও উত্তর দেয়নি। আর এখন ভার্সিটিতে ওঠার পর তো ওর জিনিস ধরতেই ভয় লাগে। কখন হুট করে রেগে যায়। এখন আর জানিনা সেসব পাগলামি ওর মাথায় আছে কিনা।”
শীতল বিড়বিড় করে বললো,”আছে, খুব করেই আছে।”
“কিছু বলছিস?”
“না কিছু না।”
“কিন্তু তুই এতো রাতে এই নাম কোথায় পেয়েছিস? কি হয়েছে সত্যি করে বল তো।”
“বললাম তো কিছু না। এখন আমার খুব মেজাজ খারাপ লাগছে। সামনে থেকে সরে যা।”
বহ্নি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুই বুঝতে পারেনা শীতলের কথা। মেয়েটার হয়েছে কি?
শীতল এই তীব্র গরমের কাঁথা মুড়ি দেয়। ভেবেছিলো বোধহয় খুব কাঁদবে সে। কিন্তু সে অবাক হয়ে খেয়াল করে, তার একটুও কান্না পাচ্ছেনা। বুকটা শুধু ভার হয়ে আছে। তবে এই ব্যাপার! কলেজ থেকেই কাহিনী চালাচ্ছে। আর সবার সামনে এমন ভাবে করে যে, কিছুই বোঝে না এসব। আহা! কি ভদ্র। চেহারা একটু ভালো দেখে একদম প্রেমিক পুরুষ হয়েছে। কি প্রেমের কবিতা বাবা গো!
শীতল ঘন ঘন শ্বাস ফেলে। সে নিজে অসুন্দর নাকি? নেহাৎ সাজগোজ করেনা বলে। কিন্তু না, আর না। কাল থেকে নেতা মশাইও দেখবে শীতল কতোটা সুন্দর। একটুও পাত্তা দেওয়া যাবে না ওকে।
পরক্ষণেই তার শরীরের কথা ভেবে চুপসে যায়, সুস্থ হয়ে যাবে তো মানুষটা? জ্বরটা কমলো কিনা কে জানে। ‘যা হয় হোক’ কথাটা যেনো সে ভাবতেই পারছে না। কেউ জানলো না, শীতলও সবার সাথে একটা নির্ঘুম রাত কাটালো।
ভোরের দিকে চোখটা একটু লেগে এসেছে বহ্নির। এরমধ্যেই আভার খোঁচাখুঁচিতে ঘুম ভেঙে যায় তার। ঘুম থেকে উঠেই বেশ বিরক্ত লাগতে থাকে। সারারাত জেগে কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছে। এখনই আভাকে ডাকতে হবে? নিজে তো ঘুমিয়েছে সারারাত, তাও নাক ডেকে।
“সমস্যা কি তোর? ডাকছিস কেনো?”
আভা চোখের ইশারা দেয় সামনের দিকে। বহ্নি কিছু না বুঝে তাকাতেই চমকে ওঠে।
শীতল সাজছে, অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাকে। এমনিতেই সে সাজগোজ খুব বেশি পছন্দ করে না। সাজের মধ্যে একটু কাজল দেয় চোখে কলেজে যাওয়ার সময়। চুলগুলোও এলোমেলো খোঁপা করে রাখে একটা। কিন্তু আজ কিসের কি? নীল চুমকি বসানো একটা ঝিলিমিলি জামা পরেছে সে, দুই হাতে নীল কাচের চুড়ি, চুলও ছেড়ে দিয়েছে। সত্যি বলতে বহ্নি, আভার চেয়ে ভীষণ সুন্দর চুল শীতলের। কোমর ছাড়িয়ে আরো অনেক দূর। চুল খোলা রাখলে তাকে দারুণ লাগে। কিন্তু শীতলের দুনিয়ায় খোঁপা আর বেনী ছাড়া আর কোনো চুল বাঁধার নিয়ম নেই।
কাজল অন্যদিনের তুলনায় বেশি টেনে দিয়েছে, ভ্রু জোড়ার মাঝে নীল টিপও দিয়েছে। নীলপরীর মতো লাগছে শীতলকে। মেয়েটা বেশ রূপবতী। টানা চোখ, খাড়া নাক, বাম গালের তিলটা তাকে আরো সুন্দর করেছে। তিন বোনের মধ্যে আভা সবচেয়ে বেশি সুন্দরী হলেও শীতলও কম যায়না। তবে তার সৌন্দর্যটা সে গোপন রাখতেই যেনো বেশি পছন্দ করে। কোনোসময়ই আহামরি সাজে না। কিন্তু আজকের দিনে, তাদের বাড়িতে এমন একটা দুর্যোগ চলছে তার মধ্যে ওকে এভাবে সাজতে হবে কেনো? কোথায় যাবে ও এমন সেজেগুজে?
“শীতল।”
“বল।”
“আমার দিকে তাকা।”
“আপা দেখছিস তো সাজছি। এরমধ্যে তাকাবো কীভাবে?”
“তুই সাজছিস বা কেনো?”
“তোদের সমস্যা?”
বহ্নি আভার দিকে তাকায়। আভা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে শীতলের দিকে। এই মেয়েকে আজ এমন মারাত্মক সুন্দরী লাগছে কেনো?
শীতল সাজগোজ শেষ করে আভার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে।
“এই আমাকে কেমন লাগছে রে?”
“আগুন লাগছে মেজো আপা, আগুন।”
শীতল প্রশান্তির হাসি হাসে।
বহ্নি রাগী চোখে আভার দিকে তাকিয়ে বললো,”এসব কি ভাষা? আর তুই, এভাবে সেজে যাচ্ছিস কোথায়?”
“রোজ যেখানে যাই, আজও সেখানে যাচ্ছি।”
“তোর সাজ দেখে তো মনে হচ্ছে না তুই কলেজে যাচ্ছিস।”
“তো কি মনে হচ্ছে?”
“মনে হচ্ছে বিয়ে বাড়ি যাচ্ছিস।”
“তেমন কিছু মনে হলে কিছু তো করার নেই আমার আপা।”
বহ্নি উঠে আসে। শীতল ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে। ওড়নাটা কীভাবে নিলে সুন্দর লাগবে বুঝতেই পারছে না।
“এই আমার দিকে তাকা।”
“কি হয়েছে বলো।”
“তাকা বলছি।”
শীতল বিরক্ত মুখে তাকায় বহ্নির দিকে।
“বলো কি বলবে।”
“এসব কি শুরু করেছিস? বাড়িতে একটা অসুস্থ মানুষ। আমরা কেউ আজ বের হবো না বাড়ি থেকে। আর তুই সকাল সকাল এমন সেজে কলেজে যাবি?”
শীতল উত্তর না দিয়ে ব্যাগ গোছাতে থাকে।
“শীতল আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি তো তোকে।”
শীতল বহ্নির মুখোমুখি দাঁড়ায়।
“শোনো আপা, সকালেই বাবা ডাক্তার নিয়ে এসেছে। তোমাদের অতি আদরের উৎস আর তার বন্ধু আবির ভাইকে দেখে গেছে। আবির ভাই বেশ সুস্থ। আর তোমাদের রাজপুত্তুরের জ্বর নেই। সকালে এক গামলা ভাত সেঁটেছে, ওষুধ খেয়েছে। শরীর কিছুটা দূর্বল, তবে এভাবে গামলা ধরে গলাধঃকরণ করতে থাকলে সেটাই কেটে যাবে। ক্ষত শোকাতে সময় লাগবে। আমি সব খবর নিয়েছি। উনি বিশ্রাম করুক। এতোকিছুর মধ্যে আমার কেনো শুকনো মুখ করে বাড়ি বসে থাকতে হবে তাই বুঝতে পারছি না। আমি তো ডাক্তার না। তাছাড়া তোমরা সবাই আছো, দেখো তাকে।”
বহ্নি স্তম্ভিত হয়ে শীতলের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর কি মাথাটা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেলো? কাল রাত থেকে এমন উল্টাপাল্টা আচরণ করছে। উৎসকে কি একবার জিজ্ঞেস করবে? কিন্তু এখন না, সুস্থ হোক আগে।
বহ্নি কিছু বলতে যাবে তার আগেই শীতল ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে ফেলে।
“দেখ আপা আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। আর কোনো কথা শোনার সময় নেই আমার। তোরা তো আর বের হবি না আজকে। তোদের হাতে বস্তাভর্তি সময়, আমার কাছে নেই। চললাম।”
কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে একরকম উড়তে উড়তে শীতল বেরিয়ে যায়। বহ্নির ঠিক হজম হচ্ছে না ব্যাপারটা। কি হলো এটা? আভাও মোটামুটি অবাকই বলা যায়। তার মেজো আপা তো মোটেই এমন মানুষ না।
“এইযে শুনছেন? ভিতরে আসি?”
আবির তৈরি হচ্ছিলো। বেরিয়ে যাবে সে এখনই। তার অবস্থা মোটামুটি ভালোর দিকে। খুব বেশি আহত হয়নি সে। একরাত বিশ্রাম করে সুস্থ হয়ে গেছে। তাই আর পরিবারটাকে ঝামেলায় ফেলতে চায়না সে। এমনিতেই উৎস অনেক অসুস্থ, পেরেশানিতে আছে সবাই।
“আমাকে বলছেন?”
আভা বড়দের মতো ভাব নিয়ে হেঁটে ঘরে ঢোকে। তাকে কেউ কোনোদিন আপনি বলে ডাকেনা। বড় ভালো লাগছে শুনতে।
“আপনাকেই বলছি, আপনি কি চলে যাবেন?”
“আপনি বললে থাকবো।”
আভা থতমত খেয়ে যায়। উৎস ভাইয়ের বন্ধুগুলোও কি উনার মতোই ঠোঁটকাটা?
আবির হেসে চুল আঁচড়াতে থাকে।
“নাশতা করবেন না?”
“আপনি বানিয়েছেন নাশতা? তাহলে করতে পারি।”
আভা ভীষন অপ্রস্তুত বোধ করে। লোকটার সাথে কথা বলতে আসাই ভুল হয়েছে। কতো রাত পর্যন্ত সেবা করলো লোকটার। নেহাৎ বাবা বললো, রাত হয়েছে শুয়ে পড়তে। বাবা নিজেই ছিলো সারারাত আবিরের কাছে। কিন্তু ছিলো তো সে অনেক রাত পর্যন্ত। একটা ধন্যবাদও কি দিবে না? তা না বলে কিসব বকে যাচ্ছে।
“মিস ধন্যবাদ আপনাকে।”
আভা চমকে ওঠে। এই লোকটা কি মাইন্ড রিডিং জানে নাকি? কীভাবে বুঝলো সে তার মনের কথা? আবিরের ঠোঁটের কোণে হাসি, বড়ই রহস্যময়। না, মানসম্মান থাকতে থাকতে এখান থেকে পালাতে হবে। এই লোক সুবিধার না বিশেষ। ভেবেছিলো মুরগি বানাবে, কিন্তু সে নিজেই মুরগি হয়ে যাচ্ছে।
“আচ্ছা আসছি। আপনি উপরে আসুন উৎস ভাইয়ের ঘরে। ওখানেই নাশতা করবেন।”
“এইযে মিস দাঁড়ান। আসার সময় অনুমতি নিলেন, যাওয়ার সময় নিলেন না যে।”
আভা প্রমাদ গোণে। ভারী অন্যায় হয়েছে মাতব্বরি করে এ ঘরে আসা। কচ্ছপ নাকি লোকটা?
“কিসের অনুমতি আবার?”
আবির শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে এগিয়ে আসে আভার দিকে। আভা এদিক ওদিক তাকায়, ভীষণ অস্বস্তি হয় তার।
“আপনার নামটা তো জানলাম না।”
“নাম দিয়ে কি করবেন?”
“বাহ রে, মায়ের পর এই প্রথম কোনো মেয়ে সেবা করলো আমার। নামটা জানবো না? স্মৃতির খাতায় যত্ন করে রেখে দিবো নামটা।”
আভা বুঝতে পারে এই লোকের সাথে কথা পেঁচায় লাভ নেই। এটা আরো উচ্চতর পর্যায়ের ঘাড় ত্যারা। তাড়াতাড়ি কথা শেষ করে সামনে থেকে চলে যাওয়াই ভালো। কখন কি বলে বসে ঠিক নেই।
“আমার নাম আভা, নিলীমা ওয়াহিয়া আভা।”
“কি? কি বললেন? নিলামে ওঠা হাবা?”
হতভম্ব হয়ে যায় আভা। তার এতো সুন্দর নামটাকে কি বানিয়ে দিলো এই লোক? ভারী অসভ্য তো।
“কি বললেন আপনি? আমার এতো সুন্দর নাম। আপনার কি কানে সমস্যা?”
“কানে সমস্যা হবে কেনো? আপনিই তো বললেন নিলামে ওঠা হাবা।”
“উফফ অসহ্য। আপনার সাথে কথা বলতে আসাই ভুল হয়েছে আমার। যত্তসব।”
আভা ঝড়ের বেগে ঘরের বাইরে যেতে গেলেই দরজায় ধম করে মাথাটা লাগে। রাগে, লজ্জায় দরজায় একটা লাথি দিতেই পায়ে আবারও লাগে।
আবির মুখ টিপে হাসি আটকে রাখে।
আভা রাগে লাল হয়ে তার দিকে একবার তাকিয়ে হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে যায়। আভা যেতেই আবির হাসতে হাসতে বসে পড়ে খাটের উপর। হঠাৎই হাসি থামিয়ে ভাবে, মেয়েটা দারুণ তো!
উৎসের ঘরে তার দুই পাশে বসে আছে সায়েরা আর নওশাদ। সায়েরা উৎসকে খাইয়ে দিচ্ছে। নওশাদ গম্ভীর মুখে বসে আছে তার অন্য পাশে। সে আজ অফিসে যাবে না, ছুটি নিয়েছে।
“মা আর খাবো না, মাফ করো।”
“ভাইজান কিছু বলো ওকে। না খেলে দূর্বলতা কাটাবে কীভাবে?”
নওশাদ বোঝে উৎসের এখন কি লাগবে। যদিও মামা হয়ে তাকে ওই জিনিস হাতে তুলে দেওয়া গর্হিত অপরাধ। কিন্তু এই অভ্যাস হুট করে চলে আসলেও, হুট করে চলে যায়না। আস্তে আস্তে যাবে।
“সায়েরা তুই নিচে যা বরং।”
“না ভাইজান, আমি আজ সারাদিন আমার ছেলের কাছে থাকবো। ভাবী বলেছে আজ কোনো কাজ করতে হবে না আমার।”
“তোকে নিচে যেতে বলছি যা।”
সায়েরা মুখ কালো করে উঠে দাঁড়ায়। ভাইজানের মুখের উপর কথা বলার সাহস তার নেই।
সায়েরা চলে যেতেই নওশাদ উৎসের দিকে তাকিয়ে বললো,”কীভাবে করলি এই অভ্যাস?”
“কোন অভ্যাস মামা?”
নওশাদ হাসে। ছেলেটা তাকে বোকা ভাবে বোধহয়। কতো বড় হয়ে গেছিস তুই? তোর মামাকেই বোকা ভাবছিস।
“অভ্যাস কাটিয়ে ফেল, এ অভ্যাস ভালো না।”
উৎস উত্তর দেয়না। গত রাতের পর থেকে এই মানুষটার চোখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কথা বলতে পারছে না সে। সে কোনো অন্যায় করেনি, তারপরেও পারছে না।
নওশাদ উৎসের পিঠে হাত রাখে।
“শোন উৎস আজ থেকে তুই সিগারেট খাওয়ার সময় আমাকেও একটা দিবি।”
“মামা কি বলছেন এসব? আপনার তো এমনিতেই ফুসফুসে সমস্যা। তাছাড়া এ অভ্যাস আপনার নেই, কোনোদিন খাননি।”
“আজ থেকে খাবো। কারণ আমাকে না খাওয়ানোর জন্য তুইও আস্তে আস্তে সিগারেট খাওয়া কমিয়ে দিবি। এক সময় হয়তো আর খাবি-ই না।”
উৎস হাসার চেষ্টা করে, কাটা ঠোঁটে হাসতে পারেনা।
“শোন আমি পারতাম তোর হাত থেকে সিগারেটের প্যাকেট ফেলে তোকে নিষেধ করতে। কিন্তু আমি তা করবো না। এতে তুই আরো আকর্ষিত হবি এটার প্রতি। মানুষের নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি লোভ সেই সৃষ্টির শুরু থেকে।”
“এজন্যই অন্য পথ ধরলেন?”
“বলতে পারিস তেমনই।”
উৎস প্যাকেটটা লুকিয়ে ফেলে।
নওশাদ উঠে দাঁড়ায়।
“আজকের মতো তোকে ছুটি দেওয়া হলো। তবে কাল থেকে তোর একটা খাওয়ার সাথে, আমিও একটা। এটা মাথায় রাখিস। আর ভয় পেতে হবে না, আমি চলে যাচ্ছি।
উৎস মুচকি হেসে বললো,” এজন্যই মা’কে চলে যেতে বললেন?”
নওশাদ হেসে চলে যায়, যার অর্থ, হতে পারে তেমন কিছুই।
নওশাদ চলে যেতেই উৎস সিগারেট ধরায়। কালকের পর থেকে সিগারেট খাওয়া হয়নি। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছিলো না খেতে পারে। মনের সুখে ধোঁয়া ছাড়ে কিছুক্ষণ। মনে হচ্ছে শান্তি ফিরে আসছে।
“ফুপু, ফুপু।”
সিঁড়ি থেকে শীতলের গলার আওয়াজ পাওয়া যায়। উৎস ভ্রু কুঁচকে তাকায়। সাথে সাথেই আধখাওয়া সিগারেটটা ফেলে দেয় জানালা দিয়ে বাইরে।
শীতল জানে তার ফুপু এখানে নেই। সেই ইচ্ছা করেই এসেছে এখানে। সে-ও যে অনুপমা, নিরুপমার চেয়ে কম সুন্দর না এটা ওই লোকটাকে বুঝাবে। ডুবে ডুবে জল খাওয়া তো ভালোই শিখেছে। ঘোমটার তলে খেমটা নাচ।
শীতলকে দেখে কিছুক্ষণের জন্য থমকে যায় উৎস। এটা কে? কে এটা?
উৎসকে দেখেও কিছুটা দূর্বল অনুভব করে শীতল। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসটা যেনো ক্রমশই নিচে নেমে যাচ্ছে। ভীষণ অসহায় বোধ করে শীতল।
“কি চাই?”
“ফুপু নেই?”
“থাকলে তো দেখতেই পেতে। খাটের তলায় লুকায় রাখিনি তো।”
দাঁত কিড়মিড় করে শীতল। শরীরের এই অবস্থা, তাও তেজ কমেনা।
“তাহলে যাই।”
শীতল চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই মনের অজান্তে উৎস ডেকে ফেলে তাকে।
“শীতল।”
শীতলের যেনো শরীরের উপর দিয়ে শীতল হাওয়া বয়ে যায়। রাগের পারদ ধীরে ধীরে নামছে। খুবই বিরক্তিকর, খুবই।
“কি হয়েছে?”
উৎস ঢোক চাপে। কেমন তৃষ্ণা লাগছে তার।
“এভাবে সঙ সেজে কোথায় যাচ্ছো?”
নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনা শীতল। বিগত দুই ঘন্টা ধরে সেজেছে সে। আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়েছে। আর তাকে কিনা বলছে সঙ? ইচ্ছা করছে বাজে লোকটার মাথাটা ধরে দেওয়ালে ঠুকে দিতে।
“আপনার সমস্যা কি?”
“আমার আবার কি সমস্যা? এসেছোই যখন পানিটা এগিয়ে দিয়ে যাও।”
শীতল অবাক হয়ে দেখে পানিটা কাছেই আছে তার। নিজে নিয়ে খেতে পারছে না?
রাগে গজগজ করতে করতে পানি এগিয়ে দেয় উৎসের দিকে।
আচমকাই শীতলকে অবাক করে দিয়ে গুণগুণ করে গান ধরে উৎস।
‘পুচ্ছ লাগালেই যদি কাক ময়ুর হতো,
তবে ময়ুর কিভাবে লজ্জায় মুখ ঢাকতো?’
শীতল পানিটা আবার জায়গায় রেখে দেয়।
“নিজে নিয়ে খান।”
উৎস চোখ বড় বড় করে তাকায় শীতলের দিকে। এ কি রে বাবা! এই মেয়ে এতো তেজী হলো কবে?
উৎসের দিকে ভয়ংকর দৃষ্টি ফেলে শীতল বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। পরক্ষণেই নিজেকে শান্ত করে দুই কলি গান শীতলও গেয়ে ওঠে।
‘যে জন প্রেমের ভাব বোঝেনা,
তার সাথে নেই লেনাদেনা।
আসল সোনা ছাইড়া ধরে নকল সোনা,
সে জন সোনা চেনে না।’
উৎস ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। কোনোভাবে কি এই ভদ্রমহিলা তাকে উদ্দেশ্য করে এই গান গাইলো?
“ছুটির পর কোচিং গেটে দাঁড়াবে। আমি নিতে যাবো।”
শীতল ঘুরে তাকায় একবার। মুখ বাঁকিয়ে বলে,”কোনো প্রয়োজন নেই। আপনার অনুপমা রাগ করতে পারে।”
হতভম্ব উৎসকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শীতল চলে যায়। শেষ কথাটা বলতে পারায় নিজের মধ্যে একটা শান্তি কাজ করে।
উৎস অদ্ভুত রকম অবাক হয়। ‘অনুপমা’ র ব্যাপারে শীতল কীভাবে জানলো? কে বলেছে তাকে?
(চলবে…….)