মাতাল প্রেমসন্ধি পর্ব-০৫

0
52

#মাতাল_প্রেমসন্ধি

পর্ব: ৫

“উৎস বাবু।”
শীতল যাওয়ার পর থেকে উৎস একটা ঘোরের মধ্যে ছিলো। বহ্নির ডাকে ধাতস্থ হয় সে। পরক্ষণেই হেসে দেয়। বহ্নি সেই ছোট থেকে ওকে উৎস বাবু বলে ডাকে। মাত্র আট মাসের বড় ওর থেকে। তাও সারাদিন বাবু বাবু করতো। উৎস রাগ হলেও কিছু বলতো না। কলেজে ওঠার পর থেকে বহ্নি ‘উৎস বাবু’ ডাকা ছেড়েই দেয় একরকম। উৎসের খুব ইচ্ছা হয় শুনতে বহ্নির মুখ থেকে, কিন্তু বলেনা কখনো। হঠাৎ হঠাৎ বললে বেশ লাগে।

“বহ্নি।”
“কেমন আছেন এখন নেতা মশাই? আমাদের তো ভয়-ই পাইয়ে দিয়েছিলেন।”
“যেমন দেখছিস।”
“দেখছি তো ভালোই, রাজপুত্তুর আমাদের।”
উৎস আবারও হাসে। ঠোঁটের পাশের কাটা ক্ষতটা দগদগ করছে। হাসতে কষ্ট হয় তার।
বহ্নি উৎসের কপালে হাত রাখে, কপাল ঠান্ডা। যাক, জ্বরটা নেই তাহলে।
বহ্নি উৎসের পাশে এসে বসে।
“কি খেতে ইচ্ছা করছে?”
“ধুর, খাওয়ার কথা আর বলিস না তো। সকাল থেকে মা যা শুরু করেছে। আমি তিনদিন এখন না খেয়েও দিব্বি থাকতে পারবো।”
“তা বললে তো হবে না নেতা মশাই। যা বলবি বানিয়ে এনে দিবো। এ সুযোগ বারবার আসে না কিন্তু।”
“কিচ্ছু খাবো না।”
কথাটা বলেই উৎস চুপ করে যায়। অনেক রকম চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। সবই তো হলো, মেয়েটা বিচার কি পাবে এবার? নাকি তাদের সব ত্যাগ বৃথা যাবে?
“এতো কি ভাবছিস বল তো?”
“তেমন কিছু না। কিন্তু তুই এখন বাড়িতে যে, ক্লাস নেই?”
বহ্নি খাটের উপর পা তুলে বসে।
“অদ্ভুত কথা বলিস না তো উৎস। তোর শরীরের এই অবস্থা আর আমি ক্লাসে যাবো? আজ আভা, আমি, বাবা আমরা কেউ বাড়ি থেকে বের হবোনা।”
উৎসের খটকা লাগে। কেউ বের হবে না কিন্তু শীতল এতো সেজেগুজে গেলো কোথায়? ওর এই রূপ তো আগে কখনো দেখা যায়নি। আবার প্রেম করা শুরু করলো নাকি কলেজে? এই বয়সের মেয়েগুলো ভীষণ রকমের রহস্যময়ী আর আবেগী হয়। কেউ একটু ভালো করে কথা বললেই গলে যায়। তেমন কোনো পাল্লায় পড়লো নাকি?

“এতো গম্ভীর হয়ে কি ভাবিস বল তো সারাদিন? স্কুলের ওই অঙ্কের টিচারটার মতো লাগে তোকে আজকাল।”
উৎস গাঢ় গলায় বললো,”ভয় পাস নাকি?”
“সে তো পাই।”
বহ্নি কি মনে করে উঠে যায়। উৎসের ড্রয়ার খুলে ব্লেড খুঁজে পায় একটা।

“কি করবি ওটা দিয়ে?”
“তোর পায়ের নখগুলো দেখেছিস? নখ, চুল কাটার সময় নেই না?”
উৎস কিছু বলার আগেই বহ্নি খুব যত্নে উৎসের পা টা তুলে নখ কাটা শুরু করে। উৎস কিছুটা আড়ষ্ট হয়।
“এগুলো করার কোনো দরকার নেই।”
“চুপ করে বোস তো।”
উৎস শান্ত গলায় বললো,”ধন্যবাদ তোকে।”
“আমাকে ধন্যবাদ দিতে হবে না। আমি তো কিছুই করতে পারিনি তোর জন্য কাল থেকে। ধন্যবাদ দিলে শীতলকে দে।”
উৎস ভ্রু কুঁচকে বললো,”শীতলকে কেনো?”
“কাল অনেক রাত পর্যন্ত ও তোর পাশে বসে তোকে সেবা করেছে। একটুও নড়েনি তোর পাশ থেকে। তোর তো জ্ঞানই ছিলো না, তুই কীভাবে জানবি?”
উৎস অবাক হয়ে বললো,”শীতল ছিলো?”
“ছিলোই তো, সারারাত-ই থাকতো। পরে মা এলো মাঝরাতে, মা ওকে বললো ঘরে যেতে।”
উৎস কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করে। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হতে থাকে।
বহ্নি আড়চোখে উৎসকে দেখতে থাকে। উৎসের মুখের রেখাগুলো কি কিছুটা নরম হলো? কি জানি, বুঝতে পারলো না বহ্নি ঠিক।

“তোর কি কিছুই মনে নেই রাতের কথা?”
“না মনে নেই।”
“আচ্ছা একটা কথা বল তো।”
“আবার কি?”
বহ্নি নখ কাটা থামিয়ে উৎসের চোখে চোখ রেখে তাকায়।
“অনুপমাটা কে আসলে?”
উৎস বেশ অবাক হয়। সকাল সকাল দুই বোন অনুপমাকে নিয়ে পড়লো কেনো? হয়েছে কি আসলে রাতে?
“কি রে বল।”
“আমি চিনিনা।”
বহ্নি রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসে। উৎস এতো রহস্য পছন্দ করেনা। তার জীবনকে সরলরেখায় চালাতে পছন্দ করে, বক্ররেখা তার পছন্দ না।
উৎস কিছু বলতে যাবে তার আগেই দরজায় আবির এসে দাঁড়ায়।

“তুই ব্যস্ত উৎস? তাহলে পরে আসবো।”
আবির চলে যেতে গেলেই বহ্নি ডাকে তাকে পিছন থেকে।
“আরে আবির চলে যাচ্ছো কেনো? ভিতরে এসো।”
“না না আপা, আমি পরে আসবো। আপনারা কথা বলুন।”
উৎস মুচকি হেসে বহ্নির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো,”আপা?”
বহ্নি চোখ কটমট করে তাকায় উৎসের দিকে। নিজে দুই পয়সার মূল্য দেয়না বড়বোন হিসেবে, কেউ সম্মান জানালেও হাসবে।

“আপা আসলে আপনাদের ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা আমার নেই। আমার কোনো ভাই বোন নেই, মা-ও নেই বছর দুই হবে। বাড়িতে শুধু আমি আর বাবা। এমন একটা পরিবার যে আমার স্বপ্ন। গতকাল রাতে আমি অভিভূত হয়েছি আপনাদের ব্যবহারে। একটা পরের ছেলেকেও কীভাবে আপন ভেবে সেবাযত্ন করলেন আপনি। বিশেষ করে আপনার বাবা, আপনি আর…..”
উৎস চোখ কুঁচকে বললো,”আর?”
“হাব…. না মানে আভা।”
উৎস কেমন সন্দেহভরা চোখে তাকায় আবিরের দিকে। বহ্নি সুন্দর করে হেসে বললো,”এ আর এমন কি ভাই? তুমিও তো উৎসের মতোই। এটা তো আমাদের দায়িত্ব ছিলো তোমাকে দেখভাল করা।”
আবির গাঢ় গলায় বললো,”ধন্যবাদ আপা। আপনাদের ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারবো না।”
বহ্নি ছোট্ট করে হেসে আবিরের কাছে এসে বললো,”যদি ঋণ শোধ করতেই চাও তাহলে একটা জিনিস চাইবো তোমার কাছে, দিবে?”
“কি বলছেন আপা? আমার সামর্থ্যের মধ্যে থাকলে অবশ্যই আমি দিবো।”
বহ্নি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”এই ধ্বংসের জীবন থেকে সরে আসো। তুমি আর তোমার বন্ধু দুইজনকেই বলছি। আমাদের এমন পেরেশানি আর দিও না।”
আবির অস্বস্তি বোধ করে। উৎসের দিকে একবার তাকায়।
“অপ্রস্তুত হতে হবে না তোমাকে। আমি বললাম ভেবে দেখো। আর তোমার বন্ধুটিকেও বুঝাও।”
বহ্নি আর কিছু না বলে সেখান থেকে চলে যায়।
উৎস আবিরের দিকে তাকাতেই দেখে ওর মুখটা কেমন খুশি খুশি হয়ে আছে। এমন একটা অবস্থায় ওর খুশি হওয়ার কারণ কি?

“এই আবির।”
আবির থতমত খেয়ে বললো,”হ্যা বল।”
“আমার পাশে এসে বোস, কথা আছে।”
“বল।”
উৎস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সিগারেট ধরায়। আপনমনে ধোঁয়া ছাড়তে থাকে। আবির চুপ থাকে, সে জানে উৎস এখন তাকে কাজ দিবে কোনো একটা।
“তোকে একটা কাজ করতে হবে।”
“কি কাজ?”
উৎস কিছুটা ইতস্তত করে বললো,”মহিলা কলেজে একবার যেতে হবে।”
আবির অবাক হয়ে বললো,”মহিলা কলেজে যাবো মানে? তোর কি মনে হয়, আমি মহিলা?”
“মহিলা ছাড়া মহিলা কলেজে কেউ যেতে পারেনা?”
“পারে, কিন্তু যাদের দরকার থাকে। আমার কি দরকার ওখানে?”
“দরকার আছে বলেই তো বলছি, চুপ থাক না।”
আবির উশখুশ করতে থাকে। ছেলেটা তাকে দিয়ে মাঝে মাঝে ঢেঁকি গেলানোর মতো অসাধ্য কাজও করিয়ে নেয়। নেহাৎ উৎসকে কিছু বলতে পারেনা বলে।

“দ্বিতীয় বর্ষের খ শাখার একটা মেয়ের ব্যাপারে খোঁজ নিবি।”
উৎসের কথা শেষ হওয়ার আগেই আবির লাফ দিয়ে ওঠে। তার চোখেমুখে অপার বিস্ময়। উৎসের মুখে মেয়ের নাম? প্রেম ঘটিত কোনো ব্যাপার? উৎস করবে প্রেম? তা-ও কি সম্ভব? কে সেই সৌভাগ্যবতী কিংবা দুর্ভাগ্যবতী?

“কি বললি তুই? মেয়ে?”
“এতো চিৎকার করার কি আছে বুঝলাম না।”
আবির থামে না, আরো জোরে চিৎকার করে।
“চিৎকার করবো না মানে? স্বপ্নের অনুপমাকে বাস্তবে খুঁজে পেয়েছিস?”
উৎস বিরস মুখে তাকায়, এই ছেলেটা অতিরিক্ত কথা বলে। ছেলে মানুষ এতো কথা বলবে কেনো? কারণটা কি?

শীতলের বান্ধবী অগ্নি অবাক হয়ে শীতলের দিকে তাকিয়ে আছে। শীতলের হয়েছে কি আজ? মনে হচ্ছে বিয়েবাড়িতে এসেছে। এতো সাজগোজ কেনোও হঠাৎ? ক্লাস নিতে এসে তূর্য স্যারও বারবার বাঁকা চোখে দেখেছে শীতলকে। অনেক মেয়েরাই খেয়াল করেছে, তবে শীতল খেয়াল করেনি। এলোমেলো চোখে বাইরের দিকে তাকিয়েই দিনটা কাটাচ্ছে আজ সে। পড়াশোনাতেও বিশেষ মন নেই।
ক্লাস শেষ হতেই অগ্নি একরকম ঝাপিয়ে এসে পড়ে শীতলের উপর।

“কি গো সখী, হয়েছে কি তোমার?”
“কি হবে?”
“আজ তো তূর্য স্যারের মাথা নষ্ট করে দিয়েছো তুমি। তূর্য স্যারের আর কি দোষ দিবো? আমি ছেলে হলে আজকেই তোকে কাজী অফিসে নিয়ে বিয়ে করে ফেলতাম।”
“ফাজলামি করিস না অগ্নি, ভালো লাগছে না।”
অগ্নি অবাক হয়ে বললো,”ভালো না লাগলে কেউ এভাবে সেজে আসে? নবীন বরণেও এভাবে সাজতে দেখলাম না।”
শীতল অগ্নির কথার উত্তর দেয়না, অতিরিক্ত কথা বলে মেয়েটা।
“আচ্ছা তুই কি প্রেমে পড়েছিস?”
“কেনো তোর সমস্যা তাতে?”
“না আমার কি সমস্যা? তা দুলাভাইটা কে? তূর্য স্যার জানে এ কথা?”
শীতল হতবাক হয়ে অগ্নির দিকে তাকিয়ে বললো,”তূর্য স্যার কেনো জানবে? তোর কি মনে হচ্ছে না তুই সীমা ছাড়ানো কথা বলছিস?”
“আচ্ছা বাবা, রাগ করছিস কেনো? তোর সাথে কি একটু মজাও করতে পারবো না?”
শীতলের চোখটা লাল হয়ে ওঠে হঠাৎ, যে কোনো মুহুর্তে কেঁদে দিবে।
অগ্নি ব্যস্ত হয়ে শীতলের মুখটা দুই হাতে চেপে বললো,”কি হয়েছে তোর?”
“আমার মন ভালো না অগ্নি, আমার মনটা ভালো করে দে।”
“বল আমাকে কি করতে হবে?”
“জানিনা আমি জানিনা।”
অগ্নি অবাক হয়ে দেখলো শীতলের এতো সুন্দর কাজল টানা চোখ দিয়ে মুক্তোর মতো দানা পড়ছে। শীতল নিজেকে সামলানোর চেষ্টাও করছে না।

“সব শুনেছিস, বুঝেছিস?”
আবির ভ্রু কুঁচকে উৎসের দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলের ভাবগতিক মোটেই সুবিধার মনে হচ্ছে না। কাহিনী তো আছেই।
“সবই বুঝলাম শুধু একটা জিনিস বুঝলাম না।”
“কি?”
“তোর মামাতো বোন প্রেম করে কিনা এটা কলেজে যেয়ে জানার কি দরকার? করলে করবে, তোর কি তাতে?”
উৎস বিরক্ত হয়ে বললো,”তুই পারবি কিনা বল, এতো কথার তো দরকার নেই।”
“পারবো না মানে? কিন্তু ওই কলেজে তো কোনো ছেলে পড়েনা, ও প্রেম করবে টা কার সাথে?”
উৎস বিড়বিড় করে বললো,”যে গাধী, দারোয়ানের সাথে প্রেম করলেও অবাক হবো না। স্টুপিড একটা।”
“কিছু বলছিস?”
“না কিছু বলছি না। কলেজে ছেলে নেই তো কি, কোচিং-এ আছে না? ছেলের অভাব দুনিয়ায়? হতেও তো পারে রাস্তার পাশের ঝালমুড়িওয়ালা বা ফুচকাওয়ালার প্রেমে পড়ে গেলো। ওর দ্বারা অসম্ভব কিছুই না। কেউ দুইটা ভালো কথা বললেই ও গলে ট্যালট্যালা হয়ে যায়।”
আবির কিছুক্ষণ উৎসের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভীষণ উত্তেজিত লাগছে ওকে আজ। যে কোনো পরিস্থিতিতে খুব শান্ত থাকতে পারে ও। কিন্তু আজ কি হয়েছে?

“তোর বোনগুলো কিন্তু দারুণ রূপবতী।”
উৎস চোখ লাল করে তাকাতেই আবির তাড়াতাড়ি করে বললো,”না না এমনিই বললাম। আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।”
“তুই এখানে বিশ্রাম করতে এসেছিস নাকি মেয়ে দেখতে?”
“এক ঢিলে দুই পাখি মারা গেলে ক্ষতি কি? নিলামে ওঠা হাবাও কিন্তু মন্দ না।”
“কি বলছিস? নিলামে ওঠা হাবা?”
আবির উঠে দাঁড়ায় তড়িঘড়ি করে।
“আচ্ছা যাই, কাজটা করে আসি। তবে এই কাজের বিনিময়ে আমাকেও কিছু দিতে হবে তোকে।”
“তোর আবার কি লাগবে?”
আবির মুচকি হেসে বললো,”পরে চেয়ে নিবো, কেমন?”
উৎসকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আবির চলে যায়। উৎস অশান্ত অবস্থায় কিছুক্ষণ পা নাচায়। সবকিছুই কেমন বিস্বাদ লাগছে হঠাৎ করে। গলার ভিতরটা কেমন তেতে আছে। অসহ্য লাগছে সবকিছু, অসহ্য।

কোচিং ক্লাস শেষ হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। শীতল গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, বাবা আসার কথা তাকে নিতে। আজ যেহেতু সে অফিসে যায়নি, তাই সে-ই আসবে। ওই উল্লুকটা আবার আসতে চেয়েছে। কে বলেছে এতো দরদ দেখাতে তাকে? কোনো দরদের দরকার নেই। অনুপমা না কি, তাকে যেয়ে দরদ দেখাক। রাগে পায়ের কাছে থাকা একটা ইটের টুকরোকে লাথি মারে শীতল।
বারবার হাতঘড়িটা দেখতে থাকে শীতল। বাবার তো এমন করার কথা না। সে তো সবসময় সময় মতো পৌঁছে যায় সব জায়গায়। একবার ভাবে, বেশি তো দূর না, হেঁটেই চলে যাবে নিজে। পরেই আবার ভাবে, বাবা খুব রাগ করবে একা গেলে। রাস্তাটাও কেমন নির্জন। ভয় ভয়ও লাগে শীতলের। ব্যাগটা বুকের শক্ত করে চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। পড়তে আসা বাকি মেয়েরাও একে একে চলে গেছে। সে একাই বাকি আছে।

হুশ করে একটা মোটরসাইকেল এসে থামে শীতলের একদম গা ঘেঁষে। ভয় পেয়ে দুই কদম পিছিয়ে আসে শীতল। চালকের মুখ হেলমেটে ঢাকা থাকলেও সে বুঝতে পারে কে এসেছে। বিরক্তিতে মুখটা বিষিয়ে ওঠে তার।
“শীতল, বাড়িতে যাও নি কেনো?”
“তূর্য স্যার আপনি এখানে?”
তূর্য শীতলদের কলেজের ইংরেজির লেকচারার। দেখতে বেঁটেখাটো কিংবা মাথায় কিঞ্চিৎ টাক পড়া হলেও অসাধারণ ইংরেজি পড়ায়। তুখোড় ছাত্রও ছিলো এক সময়।
“কেনো আমার কি এখানে আসা মানা?”
“না স্যার তা হবে কেনো?”
“তোমাকে বলেছিলাম আমি তোমাকে বাসায় যেয়ে পড়িয়ে আসবো। তা না করে কোচিং-এ ভর্তি হয়েছো তুমি।”
শীতল প্রমাদ গোণে। এই লোকের কেনো আসতে হবে এখানে? বাবা-টাও যে কেনো এখনো আসছে না।
“স্যার আপনাকে তো আমি আগেও বলেছি। বাড়িতে শিক্ষক রেখে পড়ানোর মতো সামর্থ্য আমার বাবার নেই। আমার বড় বোনও এভাবে কোচিং-এ পড়েই পাশ করেছে।”
“আমি কি টাকার কথা কিছু বলেছি তোমাকে?”
“কি যে বলেন স্যার। আপনি যেমন তেমন নয়, একজন কলেজের স্বনামধন্য শিক্ষক। আপনার সম্মানিও তো তেমনই হবে।”
“আরে বোকা মেয়ে! সব জায়গায় কি সবকিছু খাটে?”
“তার মানে স্যার?”
তূর্য এদিক ওদিক তাকিয়ে বললো,”তুমি বললে আমি এমনিতেই পড়িয়ে দিয়ে আসবো তোমাকে, টাকা দেওয়া লাগবে না।”
শীতল ভীষণ অবাক হয়ে তাকায় তূর্যের দিকে। ভিতরে ভিতরে চরম বিরক্ত সে। কিন্তু প্রকাশ করেনা। প্রকাশ করার সাহসও নেই। সামনেই নির্বাচনী পরীক্ষা, যদি ফেইল করিয়ে দেয়?

“স্যার আপনি যে এতোটা ভেবেছেন আমার কথা, আমি তাতেই কৃতজ্ঞ। আমাকে আর লজ্জায় ফেলবেন না। আমার জন্য কোচিং-ই ঠিক আছে।”
“না না তুমি আরেকটু ভেবো। দরকার হয় তোমার বাবার সাথেও কথা বলবো আমি।”
আঁৎকে ওঠে শীতল। বাবা যে রাগী, উল্টাপাল্টা কথা বললে সামকে কে আছে দুই মিনিটও ভাববে না।
“আচ্ছা ভেবে বলো আমাকে। এখন উঠে পড়ো পিছনে।”
“ঠিক বুঝলাম না স্যার।”
“না বোঝার মতো কিছু বলেছি? পিছনে উঠো, বাড়িতে নামিয়ে দিই।”
শীতল অস্বস্তিতে এদিক ওদিকে তাকায়।
“স্যার এসব কি বলছেন? কোনো দরকার নেই তো। আপনি যান, আমার বাবা আসবে আমাকে নিতে।”
“আরে বাবা একদিন আমার সাথে গেলে কি হবে? এমন একটা ভাব করছো যেনো আমি বাঘ নয়তো ভাল্লুক।”
শীতল ভয়ে শিউরে ওঠে। লোকটার চাহনীও এখন ভালো লাগছে না। শীতল ওড়নাটা ঠিক করে সাবধানে।
“তোমাকে আজ অসম্ভব সুন্দর লাগছিলো শীতল। সাজলে তো তোমাকে দারুণ লাগে। এতো সুন্দর একটা মেয়ে, মাঝরাস্তায় একা দাঁড়িয়ে থাকবে অন্ধকারের মধ্যে আর আমি চলে যাবো? আমার একটা দায়িত্ব আছে না?”
শীতল কাঁপা গলায় বললো,”স্যার আমার বাবা চলে আসবে। আপনি যান স্যার। আমার কিচ্ছু হবে না।”
“আরে ওঠো তো। সামনেই দারুণ একটা ফুচকার দোকান আছে। মেয়েরা আবার ফুচকা খেতে পছন্দ করে। তুমিও নিশ্চয়ই করো। তোমাকে খাইয়ে বাড়িতে দিয়ে আসবো।”
“কেনো জোর করছেন স্যার? আমি আপনার সাথে যাবো না।”
“আরে চলো, লজ্জা পাচ্ছো কেনো?”

“আমি যাবো, আমারে নিবেন?”
উৎসের গলার আওয়াজ শুনে যেনো প্রাণ ফিরে পায় শীতল। রাত থেকে করা সব রাগ নিমিষেই হাওয়া হয়ে যায়। মনে হচ্ছে এক লাফে তার কোলে উঠে পড়তে। ছুটে যেয়ে উৎসের পাশে যেয়ে দাঁড়ায়।
“উৎস ভাই।”
উৎস ঘুরেও তাকায়না তার দিকে। তার দৃষ্টি তূর্যের উপর নিবদ্ধ।
তূর্য শীতলের দিকে তাকিয়ে বললো,”উনাকে চিনো তুমি? তোমার বাড়ির লোক?”
শীতল খুশিতে টগবগ করতে কর‍তে বললো,”হ্যা হ্যা আমার লোক, না মানে আমার বাড়ির লোক।”

“কি যেনো বলছিলেন আপনি? ওকে বাড়ি পৌঁছায় দিবেন?”
তূর্যের কেমন যেনো ভয় লাগে। আলো আঁধারিতে এই বিশাল শরীরের ছেলেটাকে দেখে বেশ থতমত খেয়ে যায় সে। কপালে ব্যান্ডেজ, হাঁটছেও কেমন খুঁড়িয়ে। কে এই ছেলে? কি হয় শীতলের? ওর ভাই?
“আমি ওর শিক্ষক। আমার একটা দায়িত্ব আছে না?”
“আমার পা’টা মচকে গেছে। ওরা ডাঁসা দিয়ে খুব মেরেছে পায়ে। আমিও হাঁটতে পারছি না। আমাকেও নেন আপনার মোটরসাইকেলে। দায়িত্ব পালন করেন।”
তূর্য ভয়ে ভয়ে তাকায় উৎসের দিকে। ছেলেটাকে মোটেই সাধারণ লাগছে না। তাড়াতাড়ি করে হেলমেট পরে নেয়। শীতল তো ভিতর ভিতর হেসেই মরে যাচ্ছে।
“শীতল আমি আসছি।”
এক মুহুর্তে আর দাঁড়ায় না তূর্য। উৎস দুই হাত পিছনে বেঁধে শান্ত চোখে তাকায় থাকে তার দিকে। যাওয়ার আগে একবার তাকায় তূর্য উৎসের দিকে। মুখের মধ্যে একটা টুথপিক চাবাতে চাবাতে তাকিয়ে আছে ছেলেটা তার দিকে। এই গরমেও গলায় মাফলার বাঁধা। তূর্যের কেমন গা কেঁপে ওঠে।
খুব দ্রুত মোটরসাইকেল স্টার্ট দিয়ে চলে যায় সে, উৎস একটুও আটকায় না।

তূর্য যেতেই শীতল হাসতে হাসতে উৎসের মুখোমুখি দাঁড়ায়। হাসির দিকে একবার তাকিয়ে সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নেয় উৎস। কিছু কিছু জিনিস বেশি দেখা যায়না, বুকে ব্যথা করে।
“বেশ হয়েছে, বেশ হয়েছে।”
“মা’লটা কে?”
শীতল হাসি থামিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকায় উৎসের দিকে।
“কি বললেন?”
“বলছি নমুনাটা কে? পরিচিত?”
শীতল আস্তে আস্তে বললো,”আমাদের কলেজের ইংরেজির স্যার।”
“খুব ভালো পড়ায়?”
“তা পড়ায়, কেনো?”
“ভূগোল কেমন পড়ায়?”
“কি অদ্ভুত, সে ইংরেজির শিক্ষক। ভূগোল কেনো পড়াবে?”
“বেশ, এবার ওকে নাহয় একটু ভূগোল পড়ানো যাক।”
শীতল অবাক হয়ে বললো,”মানে?”
“কিছু না, চলো।”
“কিন্তু আপনার যে পায়ে ব্যথা। রিকশা ডাকি?”
“পা ঠিক আছে, তোমাকে আর তোমার বাবাকে একসাথে কোলে নিয়ে হাঁটতে পারবো। উৎসের এতো সামান্য আঘাতে কিছু হয়না।”
মুখ হাঁ হয়ে যায় শীতলের। এই লোকের মুখ কি পাশ করা? এমন একটা কথা এভাবে কীভাবে বলে? পরক্ষণেই লজ্জায় কান লাল হয়ে যায় শীতলের।

শীতলকে ওভাবে রেখেই কিছুটা এগিয়ে যায়। শীতল ঠাঁয় দাঁড়ানো।
“কি সত্যি কোলে করবো ভেবেছো নাকি? দাঁড়িয়ে আছো কেনো?”
লজ্জা পেয়ে দ্রুত পা চালায় শীতল। এই লোকের উপর বিশ্বাস নেই। কখন কি বলে বসে।
পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ শীতলের মনে হয়, ইশ! অনুপমাটা যদি সে হতে পারতো!

(চলবে…..)