#মাতাল_প্রেমসন্ধি
পর্ব: ৭
মাত্রাতিরিক্ত বিষাক্ত পদার্থ পাওয়া গেছে শীতলের পাকস্থলীতে। কোনো এক বিষাক্ত খাবার খাওয়ায় এই অবস্থা হয়েছে। রাত থেকেই শরীর অসম্ভব খারাপ ছিলো তার। সবাই দুশ্চিন্তা করবে তাই কিছু বলেনি কাউকে। ফলস্বরূপ সকালের আগেই জ্বর, রক্তবমি।
হাসপাতালের করিডরে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে নওশাদ। তার কেমন এলোমেলো লাগছে। এই মেয়ে তিনটা তার শরীরেরই অংশ। তারা অসুস্থ হলে যেনো সে নিজেই অসুস্থ হয়ে যায়। শরীরে একবিন্দু শক্তি পাচ্ছে না সে। তার দুই পাশে বসে আছে বহ্নি আর আভা। আভা কেঁদেকেটে একশেষ। আবির সেদিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। ডাক্তারের সাথে কথা বলছে উৎস নিজেই।
“স্যার এমন হওয়ার তো কোনো কারণ নেই। রাতে তো ও সবার সাথেই খাওয়া দাওয়া করেছে। সবাই যা খেয়েছে, শীতলও তাই খেয়েছে। তাহলে ওর এমন হওয়ার কারণ কি?”
“দেখুন এটা তো আমি বলতে পারবো না। তবে প্রাথমিক সব রিপোর্টে এটাই এসেছে। হতে পারে উনি এমন কিছু খেয়েছেন, যা অন্য কেউ খায়নি।”
উৎস ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ কি যেনো ভাবে। এরপর পিছন ঘুরে আভার দিকে তাকিয়ে বললো,”এই আভা এদিকে আয় তো।”
আভা চোখ মুছতে মুছতে এগিয়ে আসে।
“শীতল গতকাল বাড়িতে ফেরার আগে কোথাও গিয়েছিলো?”
আভার চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। এদিক ওদিক তাকায়। অসহায় লাগে তার।
“কি হলো কি? কিছু জিজ্ঞেস করছি না?”
হালকা ধমকে কেঁপে ওঠে আভা। উৎস বিরক্ত হয়ে তাকায়। বাড়ির ছোট মেয়েগুলো অতিরিক্ত আহ্লাদ পায়। যার ফলে কেউ উঁচু গলায় কিছু বললে ঢং শুরু হয়ে যায়।
আবির হঠাৎ কিছু না বুঝে এগিয়ে আসে।
“তুই ওকে এভাবে বকছিস কেনো উৎস? ওর স্কুল আর শীতলের কলেজ দুইটা দুইদিকে। শীতল কলেজের পর কোথাও গেলে ও জানবে কীভাবে?”
আভা ভরাট চোখে আবিরের দিকে তাকায়। সেদিনের পর থেকে এই ছেলেটা খুব গায়ে পড়ে কথা বলতে আসছে তার।
উৎস ভ্রু কুঁচকে তাকায় আবিরের দিকে। আবির ঢোক গিলে অন্যদিকে তাকায়। সত্য বলতে সে নিজেও উৎসকে কিছুটা ভয়-ই পায় বলতে গেলে। কেনো যে যেচে পড়ে কথা বলতে এলো।
কিন্তু উৎস সেদিকে কথা বাড়ায় না। এখন সেসবের সময় না।
“আভা গত কাল সন্ধ্যায় দুইজন একসাথে বাড়ি ফিরেছিস আমি দেখেছি। কোথায় গিয়েছিলি তোরা?”
আভা কাঁপা চোখে বহ্নির দিকে তাকাতেই বহ্নি অন্যদিকে তাকায়। এমন একটা ভাব, কে তুই? আমি তোকে চিনিনা। বাঘের খাঁচায় ধরা পড়েছিস, যা পারিস কর। আভা দাঁত কিড়মিড় করে।
উপায়ন্তর না পেয়ে নওশাদ উঠে আসে।
“আভা।”
“বলো বাবা।”
“তুমি যদি কিছু জানো বলে ফেলো, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলে তো সমাধান হবে না কোনোকিছুর।”
আভার বেকায়দা অবস্থা দেখে আবিরের খুব কষ্ট হয়।
“বাবা।”
“বল।”
“আসলে মেজো আপা বলতে নিষেধ করেছিলো। বিশেষ করে তুমি বা উৎস ভাই যেনো না জানে।”
“কি এমন কথা? আর আমরা জানলে কি হবে?”
উৎস শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় আভার দিকে। আস্তে আস্তে ডান পা নাড়ছে সে। সেদিকে তাকাতেই আভার বুকটা ধকধক করে ওঠে। অসম্ভব রেগে গেলে নিজেকে শান্ত রাখতে উৎস ভাই ডান পা নাড়ায়। অনেক আগে থেকেই দেখে আসছে সে।
নওশাদ কিছু বলতে গেলে উৎস তাকে হাত দিয়ে থামায়।
“তুই কি বলবি? না বললে সমস্যা নেই। কীভাবে তোর মুখ থেকে কথা বের করতে হয় আমার জানা আছে।”
আভা ভয়ে ভয়ে বললো,”তার মানে?”
“তোর প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে?”
আভা বাবার দিকে তাড়াতাড়ি একবার তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে।
“উৎস ভাই, মেজো আপা কাল কোচিং-এর পর কলেজের সামনে থেকে চটপটি কিনে খেয়েছে। আমাকেও নিয়ে গিয়েছিলো জোর করে। কিন্তু আমি খাইনি। বাবা নিষেধ করে দিয়েছিলো তো আমাদের বাইরে খেতে। তাই…..”
নওশাদ রাগী চোখে আভার দিকে তাকায়, আভা মিইয়ে যায়। আভা ভেবেছিলো উৎস একটা ধমক দিবে তাকে। কিন্তু উৎস চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। আভার কিছুটা অবাক লাগে।
“উৎস ভাই।”
উৎস জবাব দেয়না, যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে।
“উৎস ভাই বিশ্বাস করুন আমি একটুও খাইনি। আমি তো যেতেও চাইনি। মেজো আপা আর ওর ওইযে বান্ধবীটা, অগ্নি ওরা দুইজন আমাকে জোর করে নিয়ে গেছে। ওরা দুইজনই খেয়েছে, আমি খাইনি। মেজো আপা অনেক অনুরোধ করেছিলো আমি যেনো বাড়িতে এসে কাউকে কিছু না বলি। বাবা শুনলে তো রাগ করবে, তাই।”
নওশাদ কঠিন গলায় বললো,”এতোক্ষণ চুপ করে ছিলে কেনো তুমি? জানতেই যখন, আগে বলোনি কেনো?”
“আমি কীভাবে জানবো বাবা? ওই চটপটি খেয়েই যে মেজো আপার এমন হয়েছে এটা কি আমি বুঝতে পেরেছি?”
নওশাদ কিছু বলতে যেয়েও থেমে যায়। এই মেয়েগুলোর সাথে কথা বলা অনর্থক। যেটা নিষেধ করা হবে, তাই যেনো বেশি করে করা লাগবে এদের।
“উৎস।”
“মামা বলুন।”
“আমার শরীরটা আর চলছে না বাবা। তুই একটু খোঁজ নে, চিকিৎসার কি অবস্থা।”
উৎস নওশাদের হাত ধরে তাকে বসায় বহ্নির পাশে। বহ্নি বাবার মাথাটা নিজের কাঁধে রাখে।
“মামা ওরা ওদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। ঠিক সময় এসেছি আমরা, দেরি হয়নি বেশি। আপনি দয়া করে একটু শান্ত হয়ে বসুন।”
“আমার তো তোরা ছাড়া আর কেউ নেই রে বাবা। তোদের কিছু হলে আমি কীভাবে ভালো থাকি?”
নওশাদ পাঞ্জাবির হাতায় চোখ মোছে।
উৎস বিড়বিড় করে বললো,”গাধীটা আগে সুস্থ হোক, এরপর ওকে দেখছি। সারা রাত কাউকে কিছু না জানানোর ফল ওকে বোঝাবো।”
বহ্নি ঘোলাটে চোখে উৎসের দিকে তাকিয়ে বললো,”কিছু বলছিস?”
“না কিছু না। তুই মামা আর আভার পাশে থাক। আমি আবিরকে নিয়ে একটা কাজে যাচ্ছি।”
“তুই এখন আবার কোথায় যাচ্ছিস? আমি একা কীভাবে থাকবো? বাবার অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছিস।”
“আমি খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবো।”
আভা ছুটে এসে বললো,”উৎস ভাই আমি যাই আপনাদের সাথে?”
আবির মৃদু হেসে বললো,”হ্যা চলো না।”
উৎস চোখ পাকিয়ে আবিরের দিকে তাকায়।
“তোমাকে কি আমি যেতে বলেছি হাবা রানী? তোমার কপালে কি আছে তুমি ভাবতেও পারছো না, একটু সবুর করো।”
আভা মুখ ভোঁতা করে দাঁড়িয়ে থাকে। বাইরের একটা মানুষের সামনেও উৎস ভাইয়ের এভাবে ‘হাবা রানী’ বলা লাগলো? কীভাবে দাঁত কেলিয়ে হাসছে পাশেরজন আবার। ইচ্ছা করছে দেয়ালে মাথাটা ঠুকে দিতে।
উৎসের যাওয়ার আগে নওশাদ নরম গলায় বললো,”তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস বাবা।”
উৎস ছোট্ট করে হেসে বললো,”এক্ষুনি চলে আসবো।”
যাওয়ার আগে আবির আভার দিকে তাকিয়ে সুন্দর করে হেসে বললো,”আভা আসি, তুমি মন খারাপ করোনা কিন্তু।”
আভা মুখ বাঁকিয়ে বললো,”যান তো এখান থেকে।”
আবিরের অপমানিত বোধ করার কথা, কিন্তু সে করলোনা। ইশ, কি সুন্দর করে বললো। ‘যান তো এখান থেকে।’
এমন মিষ্টি করে শুধু কেউ ‘যান তো এখান থেকে’ বললেও সে সারাজীবন শুনতে রাজি।
ধাতস্থ হয়ে তাকাতেই দেখে উৎস সরু চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। দেরি না করে দ্রুত এগোতে থাকে সে সিঁড়ির দিকে।
শীতলের কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকায় উৎস। আবির বিরক্ত হয়ে উৎসের দিকে তাকিয়ে বললো,”দয়া করে বলবি আমরা এখানে কেনো এলাম?”
“তুই কেনো এসেছিস আমি কীভাবে বলবো?”
আবির অবাক হয়ে বললো,”তার মানে? তুই তো আমাকে এখানে…..”
আবির কথা শেষ করার আগে উৎস আবিরের চোখে চোখ রাখে। তার দৃষ্টি কঠিন।
“কি হয়েছে? এভাবে তাকিয়ে আছিস যে আমার দিকে?”
“আভার প্রতি আজকাল একটু বেশি দরদ দেখছি। সাবধান নিজে থেকেই হবি নাকি সাবধান করে দিতে হবে?”
আবির কিছুটা থতমত খেয়ে যায়। কথা জড়িয়ে যায় মুখে।
“কি করেছি আভার সাথে?”
“বাচ্চা মনে হয় আমাকে? সেরিলাক খাই এখনো আমি?”
আবির কিছুটা রেগে যেয়ে বললো,”নিজে অনুপমার জন্য দেবদাস হয়ে যাচ্ছো আমি কিছু বলেছি? আর আমি তো এখন এটাও বুঝতে পারছি কে সেই অনুপমা। কৃষ্ণ করলে লীলা আর আমরা করলে বিলা?”
উৎস লাল চোখ আবিরের দিকে তাকায়। আবির চুপ করে যায়।
উৎস কিছু বলার আগেই আবিরের পিছনে কিছু একটা দেখে চুপ করে যায়। চোখের ইশারা অনুসরণ করে আবির তাকায়। তেমন কিছু দেখতে পায়না।
“কি দেখছিস ওদিকে?”
“আয় আমার সাথে।”
আবির কিছু বোঝার আগে উৎস এগিয়ে যায় সামনের দিকে।
“কি মামা? কয় প্লেট লাগবে?”
উৎস শান্ত গলায় চটপটি ওয়ালার দিকে তাকিয়ে বললো,”প্লেট তোর পশ্চাৎদেশ দিয়ে চালান করে দিলে কয়দিন লাগবে হজম হতে?”
চটপটিওয়ালা হতবাক হয়ে উৎসের দিকে তাকায়। উৎস নির্লিপ্ত। অবাক হয় আবিরও, কিন্তু সে কিছু বলেনা।
“এই মামা কি কন এসব? এখন কি ফাজলামি করার সময়? দেখতেছেন না কতো চাপ এখানে? না খাইলে যান ডিস্টার্ব দিয়েন না তো।”
উৎস স্বাভাবিক থাকে।
“কি হলো যাচ্ছেন না কেনো?”
“চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে এই ভ্যানগাড়ি সহ পগার পার হবি তুই। শুধু এই কলেজ থেকে না, এই শহর থেকেই দূর হয়ে যাবি। আর কোনোদিন যদি তোকে এই ভ্যানসহ কলেজের আশেপাশে দেখেছি। মনে করবি সেদিন তুই শেষ।”
চটপটিওয়ালা হতভম্ব হয়ে যায়। উৎস যদিও তাকে কঠিন করে কথা বলছে না বা ধমকও দিচ্ছে না। সাধারণ কথা যে এতোটা ভীতিকর লাগতে পারে উৎসকে না দেখলে বুঝতেই পারতো না সে।
মুখে জোর করে তেলতেলে একটা হাসি ফুটিয়ে সে বললো,”মামা চাঁদা নিবেন? বললেই পারেন। আপনাদের দোয়ায় রোজগার তো কম না। দিবো চাঁদা, সমস্যা নেই তো।”
উৎস আচমকা চটপটিওয়ালার কলার চেপে ধরে। ভয়ে চিঁ চিঁ করে ওঠে সে। আবির কিছু বুঝতে না পেরে উৎসকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
“এই উৎস, এসব কি করছিস? ছাড় ওকে, ওর সাথে কিসের শত্রুতা তোর?”
উৎসের খেয়াল নেই আবিরের দিকে। তার চোখমুখ টকটকে লাল হয়ে আছে। চটপটি খেতে আসা মেয়ে গুলো ভয়ে দৌড় দিয়েছে।
“আরে মামা করতেছেন কি? ছাড়েন। কেউ বাঁচান আমারে। মেরে ফেলবে এই লোক আমারে, কেউ বাঁচান।”
“এই তুই আমার দিকে তাকা। গতকাল সন্ধ্যায় তিনটা মেয়ে চটপটি খেতে এসেছিলো। তাদের মধ্যে একজনকে কি খাইয়েছিস তুই? সে অসুস্থ হলো কেনো?”
“আরে মামা বলেন কি? আমার দোকানে রোজ কতোশত মেয়েরা আসে। আপনি কার কথা বলতেছেন?”
“একদম চুপ, তুই খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিস। কি খাইয়েছিস বল। স্বীকার না করলে জানিস তো কি হবে?”
উৎস নিজের শার্ট উঁচু করে। পেটের কাছে রাখা বিশাল আকৃতির ক্ষু’রটা দেখে কাপড় নষ্ট করে ফেলার দশা চটপটিওয়ালার। ক্ষু’র দেখেই বোঝা যাচ্ছে কতোটা ধার হবে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে আর সাধারণ মনে হচ্ছে না তার।
“মামা বিশ্বাস করেন আমি কিচ্ছু খাওয়াইনি কাউরে। আপনি কার কথা বলছেন আমি বুঝতেও পারছি না। আচ্ছা আমার কাছে তো আরো কতো মেয়েরা খেতে আসে। উনার একার কেনো সমস্যা হবে?”
উৎস কলার ছেড়ে দিয়ে এদিক ওদিক তাকায়। আবিরের দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় বললো,”একটা সিগারেট লাগা তো।”
আবির বাক্যব্যয় না করে সিগারেট ধরায়। উৎস ঠোঁটের এক কোণায় চেপে ধরে। এরপর হঠাৎই ক্ষু’র রাখা জায়গাটা চুলকাতে থাকে শার্ট উঁচু করে।
সাথে সাথে চটপটিওয়ালা পায়ে পড়ে যায় উৎসের। উৎস শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
“মামা বিশ্বাস করেন আমি বুঝতে পারিনি এমন কিছু হয়ে যাবে। ছোট্ট একটা পোকা পড়েছিলো ওই আপার প্লেটে। আমি ভেবেছিলাম সাধারণ ছোট্ট একটা পোকা, শুধু শুধু পুরো প্লেটটা নষ্ট করবো। তাই পোকাটা ফেলে আপাকে খেতে দিই। আর কোনোদিন এমন হবে না মামা। আমারে মাফ করে দেন।”
উৎস আবিরের দিকে তাকায়। আবির রেগে চটপটিওয়ালাকে ধরতে গেলেই উৎস থামিয়ে দেয় তাকে।
“তুই জানতিস পোকাটা সাধারণ নাকি বিষাক্ত?”
“মামা বিশ্বাস করেন যদি জানতাম বিষাক্ত পোকা, আমি জীবনেও আপারে দিতাম না খেতে। মামা আমারে মাফ করে দেন। গরীব মানুষ মামা, না খেয়ে মরে যাবো। গরীবের পেটে লাথি দিবেন না।”
উৎস আপনমনে ধোঁয়া ছাড়ে। তার পায়ের কাছে বসে কেউ চিৎকার করে কাঁদছে সেদিকে যেনো তার খেয়ালই নেই।
“উৎস বেটারে মেরে পুলিশে দিয়ে দিই। ওটাই ওর জন্য উচিত শিক্ষা হবে।”
“না না মামা আমারে পুলিশে দিবেন না। আমার ছোট একটা বোন আছে। এই আপাদের মতোই সে। না খেয়ে মরে যাবো আমরা।”
উৎস সিগারেট ফেলে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে লোকটার সামনে। চুলগুলো আস্তে করে চেপে ধরে নিজের দিকে ফেরায় মুখটা।
“সত্যি করে বল, ওটা কি পোকা ছিলো। সত্যি বল, কিছু বলবো না। ছেড়ে দিবো।”
“মামা….”
“বল।” উৎসের গলায় উত্তাপ, চুল চেপে ধরেছে আরো। ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে লোকটা।
“মামা মারবেন না আমারে। আমি বলছি, সব বলছি।”
উৎস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”বল।”
“কলেজ এরিয়ায় মামদোবাজি হচ্ছে? এসব আমি সহ্য করবো না। গরীবদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি? চিনো আমাকে?”
পিছন দিক থেকে কারো গলার আওয়াজ পেয়ে উৎস আস্তে করে ঘাড় ঘুরায়। বাইক থামিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে এক ভদ্রলোক, খুব চেনা চেনা লাগছে তাকে।
উৎস চটপটিওয়ালাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। লোকটাকে কোথায় যেনো দেখেছে।
উৎসকে দেখেই ভয়াবহভাবে চমকে ওঠে লোকটা। কারণ এই ছেলের সাথে তার আগেও দেখা হয়েছে আর যে অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়।
“আপনি?”
উৎস ভরাট গলায় বললো,”কে আপনি?”
“আমাকে চিনতে পেরেছেন?”
“আপনি কোন দোকানের রসগোল্লা যে আপনাকে দেখেই চিনে ফেলতে হবে?”
লোকটা অপমানিত বোধ করে।
“আমি তূর্য ইব্রাহীম, সেদিন সন্ধ্যায় যে আপনার সাথে দেখা হলো। আপনি তো সম্ভবত শীতলের ভাই, তাইনা?”
উৎস ভ্রু উঁচু করে। আচ্ছা! এই সেই নায়ক। শীতলকে বাইকে উঠাতে চায়!
“আচ্ছা আজ শীতল কলেজে এলো না কেনো? আজ ওদের পরীক্ষা ছিলো। আমি অবশ্য শীতলের প্রশ্নটা আলাদা করে রেখেছি।”
“তাহলে তো হয়েই গেলো, ওর পরীক্ষাটাও নাহয় আপনি দিয়ে দিন।”
তূর্যের মুখ কালো হয়ে যায়।
“আপনি কিন্তু আমাকে বার বার অপমানিত করছেন। নেহাৎ ভদ্রলোক বলে আপনাকে কিছু বলছি না। আমি ওর শিক্ষক, আমার একটা দায়িত্ব আছে না?”
“ভদ্রলোক বলে কিছু বলছেন না নাকি আমাকে শালা বানাতে চান বলে?”
“জ্বি কি বললেন?”
“উৎস এক কথা দুইবার বলেনা। আপনার ছাত্রী হাসপাতালে। আর এই বদমাশের জন্যই ও হাসপাতালে। এখন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করুন। উচিত শিক্ষা দিন একে, দেখি আপনার ক্ষমতা কতোটুকু।”
তূর্য যেনো আকাশ থেকে পড়ে। তার চোখ গোল গোল হয়ে যায়।
“শীতল হাসপাতালে? কি হয়েছে ওর? আর এই চটপটিওয়ালাই বা কি করেছে?”
“স্যার বিশ্বাস করেন আমি বুঝতে পারিনি কি থেকে কি হয়ে গেলো।”
উৎস তার দিকে তাকাতেই সে চুপ করে যায়।
“আমাকে দয়া করে খুলে বলুন শীতলের কি হয়েছে। আমাকে নিয়ে চলুন হাসপাতালে, কোন হাসপাতালে আছে ও?”
উৎস কিছুক্ষণ অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে ভ্রু কুঁচকে। এরপর আবিরের দিকে তাকিয়ে বলে,”এই আবির উনাকে নিয়ে যা তো, কিডনিটা নাহয় উনি-ই দিবে।”
তূর্য হতভম্ব হয়ে বললো,”কিডনী মানে?”
“কিডনী মানে বৃক্ক। ইংরেজির শিক্ষক হয়ে এটা জানেন না?”
“কেনো জানবো না। কিন্তু কিডনী আমি দিবো মানে? আমি কেনো দিবো আর কাকেই বা দিবো?”
“শীতলের দুইটা কিডনী অচল হয়ে গেছে। আমরা ওর জন্য একটা কিডনী খুঁজছি। আপনি যেহেতু খুব দায়িত্ববান শিক্ষক। সন্ধ্যার পর ছাত্রীকে নিজের বাইকের পিছনে করে বাড়ি পৌঁছে দিতে চান, পরীক্ষার প্রশ্ন আলাদা করে রাখেন। তাহলে কিডনী আর বড় কি ব্যাপার? একটা কিডনীই তো।”
তূর্যের মুখ হাঁ হয়ে যায়। আবির সমানে মুখ টিপে হাসছে। এমন মুহুর্তে এভাবে কথা বলার ক্ষমতা মনে হয় শুধু উৎসেরই আছে।
“আপনি কিন্তু এবার বেশি বেশি বলছেন। আমি বলেছি আমি কিডনী দিবো?”
উৎস আবিরের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত স্বরে বললো,”কিরে, দাঁড়িয়ে দেখছিস কি? নিয়ে চল উনাকে হাসপাতালে। শীতলের পরীক্ষাটা নাহয় উনি হাসপাতালের বেডে শুয়েই নিবেন। দুই বেডে দুইজন পাশাপাশি।”
তূর্য পড়িমরি করে বাইকে উঠে বসে। হেলমেট পরার সময়ও নেই। এই ছেলে ভয়ংকর, ওর পক্ষে অসম্ভব কিছুই না। তার থেকে এই জায়গা যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিত্যাগ করা যায় ততই ভালো।
তূর্য চলে যেতেই আবির হাসতে হাসতে বসে পড়ে। উৎসের মুখে তখনও হাসি নেই। এই ছেলে মনে হয় হাসতেই পারেনা।
প্রায় ছয়দিন পর শীতলকে বাড়িতে আনা হয়েছে। শরীর অসম্ভব দূর্বল তার এখনো। কিন্তু সে আর হাসপাতালে থাকতে চায়না। সে বলেছে তাকে যদি আর একটা দিন হাসপাতালে রাখা হয়, সে হাসপাতালের দশ তলায় উঠে নিচে লাফ দিবে। এ কথা শোনার পর আর তাকে হাসপাতালে রাখা যায়না। যদিও বাড়ির সবাই উৎসকে এ কথা জানায়নি। জানালে হয়তো উৎস ঠিকই তাকে ছাদে তুলে নিয়ে যেয়ে বলতো, ‘দাও লাফ। নিজে না দিলে আমি ধাক্কা দিবো।’
বহ্নি আর আভা শীতলের তদারকিতে আছে। আভা বলেছে, মেজো আপা পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সে স্কুলে যাবেনা। শাহানা আর সায়েরা তো আছেই। নওশাদের কথা, কোনোভাবেই যেনো তার রাজকন্যার কোনো অসুবিধা না হয়।
“আপা, এই আপা।”
বহ্নি ছোট্ট করে উত্তর দেয়,”বল।”
“তোরা কি সবাই আমার উপর রেগে আছিস?”
আভা হড়বড় করে বললো,”কেউ রেগে নেই মেজো আপা। তবে উৎস ভাই তোদের কলেজ গেট থেকে চটপটিওয়ালাকে তাড়িয়েছে। তার বদলে তাকে একটা দোকানে কাজ দিয়েছে। এই মানুষটাকে আমি ঠিক বুঝিনা। মাঝে মধ্যে মনে হয় যেনো ভিলেন একটা, পরক্ষণেই আবার হিরো। উফফ, এতো দারুণ কেউ কেনো হবে?”
বহ্নি আর শীতল দুইজনই অদ্ভুত চোখে তাকায় আভার দিকে। আভা চুপ করে যায়।
“আপা, এই আপা।”
“উফফ কি হয়েছে?”
“উৎস ভাই অনেক রেগে আছে আমার উপর?”
“আমি কি জানি।”
“আমি নিজেও বুঝলাম না কীভাবে কি হয়ে গেলো।”
“আচ্ছা হয়েছে, এখন চুপ করে বিশ্রাম কর তো।”
শীতল এদিক ওদিক তাকিয়ে চাপা গলায় ফিসফিস করে বললো,”এখন বিশ্রাম করলে কীভাবে হবে আপা? রেওয়াজ করতে হবে না?”
বহ্নি অবাক হয়ে বললো,”কিসের রেওয়াজ?”
“সে কি তুই ভুলে গিয়েছিস? কলেজে যে প্রতি বছর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, আর আমার যে এবার গান করার কথা। কতোগুলো দিন নষ্ট হলো, কোনো অনুশীলন হলো না। এবার তো আরো বড় করে হবে। অতিথি আসবে দূরদূরান্ত থেকে।”
বহ্নি চোখ বড় বড় করে তাকায় শীতলের দিকে। এই মেয়ে কি পাগল? অনুষ্ঠানের আর হাতে গুণে চারদিন বাকি। ও কীভাবে গান করবে শরীরের এই অবস্থায়?
“তুই গান করবি? তোর এতো বাহানা?”
“থাম তো তুই। ও আমি পারবো। আমি ভাবছি অন্য কথা।”
“আবার কি?”
“আমার তো দ্বৈত গান। আমাদের কলেজে তো কোনো ছেলে নেই। সবাই যে যার পার্টনারকে আনবে। কেউ ভাই, কেউ স্বামী। আমার তো কেউ নেই। আমার সাথে কে গাইবে?”
আভা মুখ টিপে হেসে বললো,”কেনো তোর কলেজের ওইযে স্যারটা, কি যেনো নাম? আপা বল না?”
বহ্নিও মুচকি হাসে।
“সূর্য না তূর্য।”
শীতল রাগান্বিত চোখে আভার দিকে তাকায়।
“আপা তুমিও শেষমেশ এই বদমাশটার সাথে মিলে আমাকে কথা শোনাচ্ছো?”
“আচ্ছা শোন….”
“বহ্নি।”
উৎসের ডাকে ওরা তিনবোনই থতমত খেয়ে যায়। বহ্নি উঠে দাঁড়ায়।
“উৎস ভিতরে আয় না।”
উৎস ভণিতার মধ্যে যায়না একদমই।
“তুই আর আভা একটু বাইরে যা। আমার শীতলের সাথে কিছু কথা আছে।”
বহ্নি আর আভা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। শীতলের শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। কি করবে এই লোক? মারবে না তো? মারলে একটুও অবাক হবে না সে।
শীতল বহ্নির হাত চেপে ধরে। এক খন্ড বরফের মতো হাতটা।
বহ্নি শীতলের অসহায় চেহারা দেখে মিনমিন করে বললো,”আরেহ, বকাবকি পরে করলেও তো হবে। এখন মেয়েটা অসুস্থ….”
“বহ্নি।”
বহ্নি সাথে সাথে ছেড়ে দেয় শীতলের হাত। ছেলেটাকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। একদৃষ্টিতে শীতলের দিকে তাকিয়ে আছে সে। সেই দৃষ্টিতে রাগ নাকি খুশি নাকি দু:খ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
“এই আভা, দাঁড়িয়ে দেখছিস কি? চল আমার সাথে। উৎস ভাই কি বললো কানে যায়নি?”
আভা এসে বহ্নি হাত ধরে। শীতল ওদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললো,”স্বার্থের টানে প্রিয়জন কেনো দূরে সরে চলে যায়।”
“আচ্ছা তোরা কথা বল।”
বহ্নি আর আভা চলে যেতেই উৎস দুই হাত বুকে বেঁধে দাঁড়ায় শীতলের দিকে তাকিয়ে। শীতল অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। সে ঠিক করে, ভিতর ভিতর ভয় পেলেও বাইরে বুঝতে দিবে না। কে উনি? অনুপমাকে নিয়ে কবিতা লিখবে আবার তাকে বকতে আসবে। কিছু উল্টাপাল্টা বললে দিবে না মাথাটা তার দেয়ালে ঠুকে?
নিজের চিন্তায় নিজেই শিউরে ওঠে সে। এই জীবনে তার কোনোদিন সাহস হবে উৎসের মাথা দেয়ালে ঠুকে দিতে? তা কি সম্ভব?
“পর্দার ওপাশে না দাঁড়ালেও চলবে বহ্নি, আভা। আমি মানুষ, বাঘ না। তোদের বোনকে খেয়ে ফেলবো না।”
বহ্নি আর আভা দৌড়াতে যেয়ে পাশের ফুলদানি নিয়ে নিচে পড়ে আভা। ঠনঠন করে শব্দ হয় খানিকক্ষণ। কি মনে করে ফিক করে হেসে দেয় শীতল। হঠাৎ সেদিকে তাকিয়ে দমটা বন্ধ হয়ে আসে উৎসের। কি যেনো বলতে এসেছিলো সে, তাই ভুলে যায় বেমালুম। রুগ্ন, ফ্যাকাশে মুখেও শীতলকে পরীর মতো লাগছে কেনো আজ?
(চলবে…..)