মাতাল প্রেমসন্ধি পর্ব-০৮

0
32

#মাতাল_প্রেমসন্ধি

পর্ব: ৮

“শীতল কেঁচো খেতে কেমন?”
শীতল চোখ বড় বড় করে উৎসের দিকে তাকায়। উৎস ভাই কি মজা করছে তার সাথে বোঝার চেষ্টা করে কিন্তু উৎস নির্বিকার।
“কি বললেন? কেঁচো?”
“হ্যা কেঁচো চিনো না? ছোট ছোট সাপের মতো। কিলবিল করে, আবার অনেকটা কৃমির মতোও বলতে পারো?”
শীতল মুখ চেপে ধরে, বমি পাচ্ছে তার।
“কি বলছেন এসব? থামুন বলছি।”
“এইতো চিনেছো, কেঁচো খেতে কেমন লাগলো?”
“আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? আমি কীভাবে জানবো কেঁচো খেতে কেমন?”
“সে কি কথা? খাওয়ার সময় টের পাওনি?”
শীতল হতবাক হয়ে তাকায় উৎসের দিকে। উৎস বুকে হাত বেঁধে বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার দৃষ্টি শীতলের দিকে না, জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে সে।

“এই কি বলছেন এসব আপনি? আমি কেনো কেঁচো খাবো? ছিহ!”
“কেনো চটপটি খাওয়ার সময় বুঝতে পারোনি? চটপটির মধ্যে হালকা কেঁচোর ফ্লেভার আসেনি?”
শীতলের শরীর ঘিনঘিন করে ওঠে। পেট মোচড় দিয়ে ওঠে, যে কোনো সময় বমি হয়ে যাবে।
“তার মানে?”
উৎস বাম হাত দাড়িতে বোলাতে বোলাতে বললো,”তোমার কলেজের সামনের চটপটিওয়ালা বললো যে তোমার চটপটিতে নাকি ছোট্ট একটা কেঁচো পড়েছিলো, অনেকটা ছোট সাপের মতো দেখতে। অবশ্য ওটা তোমাকে খেতে দেয়নি, কেঁচোটা ফেলে দিয়ে খেতে দিয়েছে। কিন্তু ফ্লেভারটা তো পাওয়ার কথা ছিলো, পাওনি?”
শীতল উৎসের দিকে কঠিন চোখে একবার তাকিয়ে মুখে হাত চেপে বাথরুমের দিকে দৌড়ায়। উৎস বিচলিত হয়না, শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

“আপা।”
“বল।”
“উৎস ভাই মেজো আপার সাথে কি এমন গোপন কথা বলছে বল তো?”
“তুইও যেখানে আমিও সেখানে। আমি কীভাবে জানবো উৎস কি বলছে?”
আভা চিন্তিত মুখে কিছুক্ষণ পায়চারি করে। বহ্নি ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকায়।
“এই আভা।”
আভা তাকায় বহ্নির দিকে।
“নিলামে ওঠা হাবা এটার মানে কি?”
আভা ভয়াবহভাবে চমকে বহ্নির দিকে তাকায়।
“মানে?”
“আমি তো জানতে চাচ্ছি মানেটা কি?”
আভা থতমত খেয়ে যায়। সে আবিরের নামে নালিশ করতে চাচ্ছে কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে পারছে না।
“আমি জানিনা আপা, আমি জানিনা।”
“কিন্তু আমার কেনো যেনো মনে হচ্ছে তুই জানিস।”
“তোর এমন কেনো মনে হচ্ছে?”
বহ্নি দুই হাতে চুলের খোঁপা খুলে দেয়। বিরক্ত মুখে চুল আঁচড়াতে থাকে হাত দিয়ে।

“কি রে আপা, বললি না? এই কথা তোকে কে বললো?”
“চুপ থাক এখন, তোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।”
বহ্নি গুণগুণ করে গান করতে করতে উঠোনের আম গাছের সাথে বাঁধা দোলনায় যেয়ে বসে। আজকের আবহাওয়াটা চমৎকার। কয়দিন ভয়াবহ গরম পড়েছে, একেবারে প্রাণ ওষ্ঠাগত। আজ সকাল থেকেই গরমটা কম। রোদ উঠলেও প্রখর না। দোল খেতে ভীষণ ভালো লাগছে তার।
আভা পাংশু মুখে বারান্দা থেকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আপাকে কেমন ভয় ভয় লাগছে তার। যদিও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সে তো আর প্রেম করছে না, তাও কেমন ভয় করছে। খুবই অদ্ভুত একটা অনুভূতি।

‘যখন প্রথম ফুটেছে ফুল আমার মল্লিকা বনে।’
বহ্নির গানের কণ্ঠ চমৎকার। আভা মুগ্ধ হয়ে শোনে। ইশ! আপাটা যে কেনো গানটা শিখলো না। বড় আপা, মেজো আপা দুইজনই চমৎকার গান করে। সে একা শুধু একটা ঢেঁড়স, কিচ্ছু পারেনা।

“এই কে আপনি? বলা নেই, কওয়া নেই হুট করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছেন।”
সামনে দাঁড়ানো একহারা গড়নের ছেলেটা থতমত খেয়ে ঢোক চাপে। বহ্নি মারমুখো হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে তাকিয়ে।
“ইয়ে মানে আপনি খুব সুন্দর গান করছিলেন তো। তাই বিরক্ত করতে ইচ্ছা করেনি। অপেক্ষা করছিলাম আপনার গান শেষ হওয়া পর্যন্ত।”
বহ্নি সরু চোখে তাকায়। নিতান্তই সাধারণ চেহারার নিপাট ভদ্রলোক। সাদা চেক শার্ট, কালো প্যান্ট, চোখে কালো চশমা। আহামরি কোনো বিশেষত্ব নেই চেহারায়, তবে চোখগুলো ভীষণ তীক্ষ্ণ।
বহ্নি অনেক ছোট থেকেই এমন, অপরিচিত কেউ সামনে এলে তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে।

“কিন্তু আপনার পরিচয় কি?”
“মানে আসলে…..”
বহ্নি মহাবিরক্ত হয়ে বললো,”এই আপনি চোর টোর না তো?”
“কি বললেন? আমাকে কি দেখে চোর মনে হচ্ছে?”
“শুধু চোর মনে হচ্ছে না, আরেকটা জিনিস মনে হচ্ছে, বীমা অফিসের লোক। আজকাল এমন ধরণের ভদ্রলোক সেজে এই দুই ধরণের লোকই বাড়ি বাড়ি ঘুরছে। কখন বীমা করিয়ে ছেড়ে দেয় ঠিক নেই। আবার চোরগুলোও তাই। এভাবে সেজেগুজে আসবে, কখন বাড়ি ফাঁকা করে দিবে কেউ টেরও পাবেনা। তা আপনি কোন শ্রেণির মধ্যে পড়ছেন?”
লোকটা হতাশ চোখে তাকায় বহ্নির দিকে। এটা মেয়ে নাকি নড়াইল এক্সপ্রেস? একনাগাড়ে কেমন কঠিন কঠিন কথা শুনায় দিলো। জীবন নিয়ে পালাতে পারলেই ভালো এখান থেকে।

“এই আভা, উৎসকে ডাক তো, এই বান্দা সহজে মুখ খুলবে না।”
আভা চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে থাকে লোকটার দিকে, এটা আবার কে?

শীতল দুই প্রস্থ বমি করেছে। স্বাভাবিক হতে গেলেই বারবার মনে পড়ছে ছোট একটা কেঁচো কিলবিল করছে৷ তাও আবার সেই জিনিস নাকি তার খাবারে পড়েছে, সে আবার খেয়েছে। ইশ, তার কপালটাই এমন কেনো? প্রতিদিন কতো মেয়েরা চটপটি খায়, আর তার ভাগ্যেই কিনা কেঁচো ফ্লেভারের চটপটি পড়লো? আর এই অসভ্য লোকটা কিনা রসিয়ে বশিয়ে সেই গল্প করতে এসেছে? এই লোকটা কি কোনোদিন ভালো হবে না? শীতলের এই অবস্থাতেও কেমন নির্লিপ্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আজ তার জায়গায় অনুপমা হলে কি পারতো এমন করতে? মুখ ভেংচি কাটে একবার অন্যদিকে তাকিয়ে। উৎসের দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটার সাহস তার এই জনমে হবে না।

“আশা করি আর কোনোদিন চটপটির ধারেকাছে যাবে না। অবশ্য একটা উপায় আছে। তাতে করে চটপটিও খাওয়া যাবে আবার স্বাস্থ্যকরও হবে।”
শীতল ভেবাচেকা খেয়ে বললো,”সেইটা কি উপায়?”
“খুব সাধারণ, একটা চটপটিওয়ালাকে বিয়ে করে নিবে। নিজের বউকে তো আর কেউ অন্তত কৃমি সদৃশ কেঁচো ফ্লেভারের চটপটি খাওয়াবে না।”
উৎস দাঁড়ায় না। কথাটা বলেই শান্তভাবে হেঁটে চলে যায় ঘর থেকে। শীতল আরেকপ্রস্ত বমির উদ্দেশ্যে বাথরুমের দিকে দৌঁড়ায়। যেতে যেতে উৎসের দিকে তাকায়। আচ্ছা, লোকটা কি একটু হাসলো? কৌতুক করে হাসলো? ফাজিল লোক একটা।
প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মনটা নিশপিশ করে ওঠে তার। কিন্তু কীভাবে?

শাহানা চিৎকার করে যাচ্ছে সমানে। স্টিলের বাসনগুলো ঝনঝন করে ফেলছে। একটা বাসন পড়ছে আর সায়েরা দৌড়ে যেয়ে সেগুলো আবার জায়গায় রেখে আসছে। শাহানা ভীষণ রেগে গেলে তুমুল কান্ড করে।

নওশাদ শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রান্নাঘরের দরজায়। অপেক্ষা করছে শাহানার রাগ কমার। সে জানে কিছুক্ষণের মধ্যেই শাহানার রাগ কমবে। বাকি কথা রাগ কমলেই বলা যাবে।
“বিয়ের পর থেকে শান্তি পেলাম না। এক ফোঁটা শান্তি দিলো না তোমার ভাই আমাকে। চলে যাবো আমি, আমার মেয়েদের নিয়ে চলে যাবো এই বাড়ি ছেড়ে। তোমার ভাই থাকুক এক গাদা আশ্রিতকে নিয়ে বাড়ির মধ্যে।”
সায়েরা নওশাদের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। নওশাদ কিছুটা রেগে যায়, তবে প্রকাশ করেনা। বিবাহিত জীবনে একজন আগুন হলে অন্যজনকে পানি হতে হয়।
সায়েরা মাথা নিচু করে রান্নাঘরের বাইরে যেতে গেলে শাহানা কি মনে করে তাকে ডাকে পিছন থেকে।

“সায়েরা দাঁড়াও।”
সায়েরা দাঁড়ায়, কিছু বলেনা।
শাহানা আমতা আমতা করে। সায়েরা কিংবা উৎসের উপর ভয়ংকর রাগ করতে চায় সে মাঝে মাঝে। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে পারেনা। বিশেষ করে উৎসের উপর তীব্র রাগ করার ইচ্ছা পোষণ করলেও ছেলেটা সামনে আসলে সে একদম রাগ করতে পারেনা। দুষ্টু ছেলেটা মনে হয় বুঝে ফেলেছে তার এই ব্যাপার। এজন্য মামিকে একদম ভয় পায়না ছেলেটা। এতেও রাগ হয় শাহানার।

“তুমি আবার নিজের দিকে কথাটা টেনে নিও না।”
সায়েরা ম্লান হাসে।
“না ভাবী, কিছু টেনে নিইনি। তবে তো এটা ঠিক, আমি আর আমার ছেলে আশ্রিত এই বাড়িতে। আমাদের জন্য তোমাদের অনেক অসুবিধা হয়। ভাইজানের অল্প রোজগার, সেখানে দুইটা অতিরিক্ত পেট চালাতে হয় তাকে। তোমাদের অনেক শখ পূরণ করতে পারেনা। বিশ্বাস করো ভাবী, আমাদের যদি যাওয়ার আর একটা জায়গা থাকতো, আমি চলে যেতাম। আমার নিজেরও ভালো লাগেনা এখানে থাকতে। নিজের কাছে ছোট হয়ে যেতে হয়।”
নওশাদ কিছু বলতে যাবে তার আগেই শাহানা মুখ বাঁকিয়ে বললো,”হ্যা এখন তো তাই বলবে। এখানে তো খারাপ আছো তোমরা। আমার তিনটা মেয়ে মায়ের চেয়ে ফুপুকে বেশি ভালোবাসে, আমার স্বামী তার মেয়েদের চেয়ে ভাগ্নেকে বেশি ভালোবাসে আর এখন তুমি বলছো তোমরা খারাপ আছো।”
“ভাবী আমি ওভাবে বলতে চাইনি, ভুল বুঝছো তুমি…..”
“থাক সায়েরা, আর বলোনা কিছু।”
সায়েরা হতাশ মুখে তাকায় নওশাদের দিকে। নওশাদ মুচকি হাসে। সে তার স্ত্রীকে চিনে। রাগ করার পর নিজেই অনুতপ্ত হয়। তার এই শিশুসুলভ স্বভাবটাই ভীষণ ভালো লাগে নওশাদের।
নওশাদ সায়েরাকে রান্নাঘর থেকে চলে যাওয়ার ইশারা করে চোখ দিয়ে। সায়েরা কিছুটা ইতস্তত করে বেরিয়ে যায়।
সায়েরা চলে যেতেই নওশাদ পা টিপে টিপে শাহানার পিছনে এসে দাঁড়ায়। শাহানা টের পায়, তার ইচ্ছা করছে একটা স্টীলের বাসন লোকটার কপালে ছুঁড়ে দিতে।

নওশাদ খপ করে শাহানার একটা হাত ধরে। শাহানা ঝাঁঝের সাথে সরিয়ে নিতে চায় নিজের হাত। নওশাদ জোর করে চেপে ধরে।
“শাহানা, আমার দোয়েল পাখি। আমার কথাটা শোনো।”
শাহানা বেশ অনেকটা নরম হয়ে যায়। সে রেগে গেলেই এই বাজে লোকটা তাকে এই নামে ডেকে তাকে দুর্বল করে দেয়। খুবই বিশ্রী ব্যাপার।

“ছেলেটার গ্রামে অন্ধ বাবা ছাড়া কেউ নেই গো। ওর দাদা আমার শিক্ষক ছিলো। কতো মাস গেছে, টাকা দিতে পারিনি তাকে। কোনোদিন চায়নি আমার কাছে। আমার বাবা গরীব মানুষ ছিলেন, আমাকে পড়ানোর সামর্থ্য তার ছিলো না। সবই জানো তুমি। ওই মানুষটা এগিয়ে না আসলে আমার পড়াশোনাটাই শেষ হতো না হয়তো। আজ তার আদরের নাতিটা একটা চাকরির জন্য হন্যে হয়ে আছে। আমি যদি ওকে কয়টা দিন এখানে আশ্রয় দিই, আমাদের কি খুব ক্ষতি হয়ে যাবে? ও একটা চাকরি পেলেই এখান থেকে চলে যাবে।”
“চাকরি বুঝি ছেলের হাতের মোয়া তাইনা? কয়দিন চাকরি খুঁজলেই পেয়ে যাবে। আহা! কি স্বপ্ন।”
নওশাদ মুচকি হেসে বললো,”স্বপ্ন তো মানুষই দেখে শাহানা। ও অনেক মেধাবী একটা ছেলে। চাকরি ঠিক একটা পেয়ে যাবে, তুমি দেখো।”
শাহানা দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”আর ও থাকবে কোথায়? আমাদের কি আর কোনো ঘর আছে?”
“ও নাহয় এই কয়টা দিন উৎসের সাথেই থাকবে চিলেকোঠার ঘরে।”
“উৎস রাজি হবে? ওর নিজস্ব গন্ডিতে যে আর কারো প্রবেশ ওর পছন্দ না, এটা জানো না?”
নওশাদ মুখ টিপে হেসে বললো,”তুমি তাহলে উৎসকে এতোদিন চিনতেই পারোনি। ও হলো মহাপুরুষ, আমার দেখা শুদ্ধতম মানুষ ও।”
শাহানা হালকা চিৎকার করে বললো,”হ্যা সবাই মহাপুরুষ তোমার চোখে। এতো এতো মহাপুরুষ দিয়ে ঘর ভরলে তো কয়দিন পর জাদুঘর হয়ে যাবে তোমার এই ‘খাঁ’ বাড়ি। সবাই টিকিট কেটে মহাপুরুষ দেখতে আসবে এখানে।”
“তাহলে কি তুমি রাজি?”
শাহানা নওশাদের চোখে চোখ রেখে তাকায়।
“আমি রাজি না বহ্নির বাবা। তবে বাড়িটা যেহেতু তোমার, তুমি যা বলবে তাই হবে।”
“শাহানা….”
“ওই ছেলে যেনো আমার সামনে না আসে। খাবার ওর ঘরেই দিয়ে আসবে। আর একটা কথা, আমার তিন মেয়ের ছায়া যেনো ওই ছেলে না মাড়ায়। শত হাত দূরে থাকতে হবে আমার মেয়েদের থেকে। আর খুব বেশি হলে দুই মাস। দুই মাসের বেশি আর একটা দিনও ওকে সময় দিবো না এ বাড়িতে। এরমধ্যেই ওকে চাকরি পেয়ে এই বাড়ি ছাড়তে হবে। এই শর্তগুলো মানতে পারলেই ও এই বাড়িতে থাকতে পারবে, নাহলে না।”
নওশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার প্রিয় সেই শিক্ষকটার কথা। নওশাদ অভুক্ত থাকলে যে কোনো কথা না বলে ঘরের মধ্যে চলে যেতো। ফিরে আসতো একটা থালা হাতে নিয়ে। যেখানে থাকতো ধোঁয়া ওঠা শিউলী ফুলের মতো শ্বেতশুভ্র ভাত, সাথে আলু ভর্তা, ডিম ভাজি আর ডাল। উনি নিজেও নিম্নবিত্ত ছিলেন। তবুও তার কোনো ছাত্র অভুক্ত শুনলে তার মাথা খারাপ হয়ে যেতো। যা পারতো এনে খেতে দিতো। অতি সাধারণ সেসব খাবার গোগ্রাসে গিলতো নওশাদ। সেই স্বাদ এখনো যেনো মুখে লেগে আছে তার। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে তার সেই প্রিয় শিক্ষকের মুখটা ভেসে উঠছে বারবার।

“উৎস।”
মামাকে দেখে তাড়াতাড়ি সিগারেট ফেলে দেয় উৎস। রাতের এই সময় ছাদে চুপচাপ দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাতে বেশ ভালো লাগে তার। নওশাদ ছোট্ট করে হেসে উৎসের কাঁধে হাত রাখে।

“তোর কাছে আমার ঋণ বেড়েই যাচ্ছে রে বেটা।”
“এসব কি বলছেন মামা? আমার কাছে আপনার ঋণ? আমি আরো ভেবে পাইনা আমি কীভাবে আপনার ঋণ শোধ করবো।”
নওশাদ কিছু সময় চুপ থেকে আস্তে আস্তে বললো,”রণ যদি কিছুদিন তোর ঘরে থাকে তোর কি খুব অসুবিধা হবে?”
উৎস চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, উত্তর দেয়না।
নওশাদ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললো,”তাহলে বরং ওকে মেসেই উঠিয়ে দিবো। আসলে গ্রামের ছেলে তো, এগুলো পারবে কিনা। তাই ভেবেছিলাম আমার বাড়িতেই….”

“মামা।”
“হ্যা বল।”
“মানুষটা অনেকক্ষণ থেকে বসার ঘরে বসে আছে। কতোদূর থেকে জার্নি করে এসেছে। আমি উনাকে আমার ঘরে আসতে বলেছিলাম কিন্তু আপনি না বলা পর্যন্ত সে ওখান থেকে এক পা-ও নড়বে না নাকি। মা’কে বলেছি কিছু খেতে দিতে। খাওয়ার পর আমার ঘরে আসতে বলবেন। উনাকে দেখেই মনে হচ্ছে খুব ক্লান্ত উনি। উনার বিশ্রাম দরকার।”
নওশাদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আসলেই এই ছেলেটা সাধারণ কোনো পুরুষ না, সে মহাপুরুষ। এই পুরুষের হাতে তার অমূল্য কোনো রত্নকে তুলে দিতেও এতোটুকু দ্বিধা হবে না তার।
নওশাদ আচমকা উৎসকে জড়িয়ে ধরে। উৎস স্মিত হাসে। মামার পিঠে হাত ঠেকায়। এই মানুষটা এতো ভালো কেনো সে ভেবে পায়না।

“উৎস ভাই আমি মনে হয় আপনাকে বিপাকে ফেলে দিলাম।”
উৎস ছাদের উপর পা ছড়িয়ে বসে আকাশ দেখছিলো। আচমকা কারো কথা শুনে চমকে ওঠে সে।
“এ কি আপনি এতো রাতে ছাদে? ঘুমাননি?”
“ঘুম আসছে না, অপরাধবোধ হচ্ছে।”
“অপরাধবোধ কেনো?”
“মনে হচ্ছে আপনাকে বিপদে ফেলে দিলাম। হয়তো নিজের ঘরে একাই থাকার অভ্যাস আপনার। আসলে আমি এখানে একদমই আসতে চাইনি বিশ্বাস করুন। বাবার সাথে নওশাদ চাচার কি কথা হয়েছে জানিনা। আমাকে জোর করে পাঠিয়ে দিলেন। আমি শহরের কিছু চিনিও না। কবে চাকরি পাবো আর কবে যাবো এখান থেকে কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”
উৎস গালভরে হাসে। রণ অবাক হয়ে দেখে। এই ছেলেটার হাসি এতো সুন্দর কেনো? যার হাসি এতো সুন্দর সে না হেসে এভাবে গম্ভীর থাকে কেনো? এতোক্ষণে এই প্রথম হাসি দেখলো ছেলেটার। কি অদ্ভুত সুন্দর হাসি, কি মায়াভরা!

“রণ ভাই, বয়সে আমি আপনার ছোট হবো। আমাকে নাম ধরে ডাকবেন আর তুমি করে বলবেন।”
“দেখো ভাই উৎস, তুমি এভাবে এখানে বসে থাকলে আমার ঘুম হবে না। তুমি ঘরে চলো। তুমি খাটে ঘুমাবে আর আমি মেঝেতে একটা চাদর বিছিয়ে দিব্বি ঘুমিয়ে যাবো। কাল সকাল হলে আমাকে একটা মেসে উঠিয়ে দিয়ে এসো তুমি।”
উৎস আবারও হাসে। একদম মুক্তোদানার মতো হাসিটা তার, রণ আরো একপ্রস্থ অবাক হয়।
“আপনি খাটেই ঘুমাবেন। আর আমি প্রতিদিনই এই সময় ছাদে একা বসে থাকি, ভালো লাগে। এতে আপনার অপরাধবোধের কারণ নেই। আর আপনি খাটেই ঘুমাবেন। আমার কোনো সমস্যা নেই। চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত আপনি এই বাড়িতে, এই ঘরেই থাকবেন।”
রণ মাথা নিচু করে বসে থাকে। তার কিছুই ভালো লাগছে না। শাহানার চিৎকার সে শুনেছে। আর এক মুহুর্ত এই বাড়িতে থাকতে ইচ্ছা করছে না তার। কিন্তু মেসে উঠতে বা থাকতে তো অনেক টাকা লাগবে। এই মুহুর্তে তার কাছে আছে মাত্র দুই হাজার তিনশো আটান্ন টাকা। গোণা টাকা, অনেকবার গুণেছে সে। পুরোটাই রাখা চাকরির আবেদন করার জন্য।

উৎস পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে রণের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।
রণ তাড়াতাড়ি করে বললো,”না না আমি ধূমপান করিনা।”
উৎস আপনমনে হাসে, নিজেই ধরায়।

“আপনার নামটা বেশ ভালো লেগেছে রণ ভাই।”
রণ মাথা নিচু করে হেসে বললো,”আমার দাদা ওই সময় থেকেই বেশ আধুনিক ছিলেন। উনি আমার এই নাম রেখেছিলেন।”
উৎস ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললো,”আপনার হাসিটাও সুন্দর।”
রণ বলতে চায়, তোমার হাসি আরো বেশি সুন্দর উৎস। কিন্তু পারেনা বলতে। কিছু মানুষকে অনেক কিছু বলতে ইচ্ছা করে কিন্তু শেষ মুহুর্তে বলা যায়না। উৎস তেমনই একটা ছেলে হয়তো। অসম্ভব রহস্যময় আর রূপবান এই ছেলেটা সাধারণ হলেও কোথায় যেনো একটা রহস্যের প্রাচীর ঘিরে আছে তাকে। এই প্রাচীর ভেদ করার ক্ষমতা সবার হয়না।

“রণ ভাই।”
“উৎস।”
“আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি খুব ভালো গান করেন। একটা গান শোনান তো।”
রণ লজ্জা পেয়ে বললো,”তোমার এমন ভরাট কণ্ঠ। আমার তো মনে হচ্ছে তুমিই ভালো গান করবে।”
“ওসব আমাকে দিয়ে হবে না। আপনি-ই শোনান বরং।”
“তা অবশ্য ঠিক বলেছো। গ্রামে কলেজে থাকতে একটু আধটু গান করতাম অনুষ্ঠানে। সবাই তো ভালোই বলতো।”
উৎস আড়চোখে তাকায় রণের দিকে। কতোটা সহজ সাধারণ মানুষটা। আহামরি সুদর্শন না হলেও, এই সরলতার জন্যই তাকে অসাধারণ লাগছে দেখতে।

‘নামি চলো আজ পথে
হাত রাখো এই হাতে
দুজনে চলো যাই বহুদূর
আমার গিটারের সুরে
দোলা লাগে তোমার নূপুরে
উত্তাল ঢেউ তোলে, দোলে হৃদয়-সমুদ্দুর।

তোমার জুলিয়েট হাসি হেসে
ডাকো একবার ভালোবেসে
আমি তোমার চোখে তাকাব, পলক পড়বে না
আজ আমার প্রেমিক-শরীরে
তোমার হাওয়ায় উড়ছি ফুরফুরে
প্রেম আর পাগলামিটাকে লুকাব না।’

উৎস বেশ অবাক হয়। ছেলেটা বেশ সাদাসিধা, তার গানের কণ্ঠ ভালো হবে আশা করেছিলো। কিন্তু এতোটা ভালো হবে আশাই করেনি।
কি মনে করে উৎসও গলা মেলায় তার সাথে।

‘লোকে পাগল বলুক, মাতাল বলুক
আমি তোমার পিছু ছাড়ব না
লোকে পাগল বলুক, মাতাল বলুক
আমি তোমার পিছু ছাড়ব না
তোমার পিছু ছাড়ব না।’

গান থামিয়ে রণ চোখ বড় বড় করে উৎসের দিকে তাকায়। অসম্ভব সুন্দর গানের কণ্ঠ থাকা মানুষটা গান করেনা? কেনো?

উঠোনে বসে জ্যোৎস্না বিলাশ করছিলো নওশাদ আর তার তিন কন্যা। জ্যোৎস্না রাত হলেই নওশাদ কেমন উদাস হয়ে যায়। তিন মেয়েকে নিয়ে চলে যায় উঠোনে। জ্যোৎস্না থইথই করে চারপাশে। অদ্ভুত সুন্দর লাগে সবকিছু। তিন মেয়েকে সেই রুপোলী আলোয় অত্যন্ত রহস্যময়ী তিন মানবী মনে হয়। তাই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়না নওশাদ কখনোই।
উঠোন থেকেই উৎস আর রণের গান শুনতে পায় ওরা। চারজনই চুপ করে শোনে। শীতলের চোখের কোণায় পানি চিকচিক করে ওঠে। বুকের মধ্যে কোথায় যেনো কষ্ট হচ্ছে, প্রকাশ করতে পারছে না সে। পানিটা মুছতে ইচ্ছা করছে না। বহ্নি সেদিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়। আভাও মুগ্ধ হয়ে শুনছে।

আভা চনমনে গলায় বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,”বাবা রণ ভাই তো দারুণ গান করে। আর উৎস ভাইয়ের গলা যে এতো ভালো আগে বলোনি কেনো?”
“আমি নিজেও তো এই প্রথম শুনলাম। ওর বাবা আরিফ খুব ভালো গান করতো। ছেলেটা নিজে হাতে ওর প্রতিভাগুলো গলা টি’পে মেরে ফেলছে প্রতিনিয়ত।”

শীতল হঠাৎ মুখ অন্ধকার করে উঠে দাঁড়ায়।
বাবার দিকে তাকিয়ে যন্ত্রের মতো বললো,”বাবা আমার খুব মাথা যন্ত্রণা করছে, আমি ঘরে গেলাম।”
নওশাদ বিচলিত হয়ে বললো,”সে কি রে মা? আমি আসি? মাথাটা টিপে দিই, দেখবি আরাম লাগবে।”
“দরকার নেই বাবা।”
শীতল চলে যায় নি:শব্দে। নওশাদ ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে সেদিকে তাকিয়ে। অষ্টাদশী মেয়েরা ভীষণ রহস্যময়ী হয়, তাদেরকে সহসা বোঝা যায়না।

বহ্নি ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে। উঠোনের এক কোণায় যেয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ায়। উথলে পড়া চাঁদের আলো, ভীষণ সুন্দর গান সব মিলিয়ে পরিবেশটা আবেশিত হয়ে যায় যেনো। এই পরিবেশে যে কারো মিশ্র অনুভূতি হয়। কি যেনো একটা তীব্র ইচ্ছায় বুকটা খা খা করে ওঠে।

(চলবে…….)