#মাতাল_প্রেমসন্ধি
পর্ব: ৯
বহ্নি সকালে ক্লাসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলো। সায়েরাকে খাবার প্লেট নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায় সে।
“ফুপু একটু দাঁড়াও।”
সায়েরা দাঁড়ায়।
“তোমার না হাঁটুতে ভীষণ ব্যথা? এই ব্যথা নিয়ে তুমি নড়াচড়াই করতে পারো না। উপরে কি কাজ তোমার?”
সায়েরা ছোট্ট করে হাসে। এই মেয়ে তিনটা একেকটা মায়াবতী। সে ভেবেই কূল কিনারা পায়না শেষ বয়সে এই মেয়েগুলোকে ছাড়া সে থাকবে কীভাবে? উৎস চাকরি পেয়ে গেলে তো এ বাড়ি ছাড়তেই হবে তাদের, আর কতোকাল ভাইজানের সংসারে সিন্দাবাদের ভূতের মতো পড়ে থাকবে? কিন্তু এই মেয়েগুলোকে ছেড়ে থাকা কি সম্ভব হবে তার জন্য?
“আমি উপরে না গেলে কীভাবে হবে বহ্নি মা আমার? নতুন ছেলেটাকে খাবার না দিয়ে আসলে ও খাবে কি?”
“খাবে কি মানে? ওর কি হাত-পা নেই? নিচে এসে খাবে। ওর খাবার উপরে দিয়ে আসার কি দরকার?”
“ওমা, তুই জানিস না? তোর মা যে নিয়ম করেছে, এই বাড়িতে যে কয়টা দিন ও থাকবে ও সবার সাথে নিচে এসে খেতে পারবে না। ওর খাবার ও ঘরেই দিয়ে আসতে হবে। উৎসই নিয়ে যেতো, কিন্তু ছেলেটা সকাল সকাল বেরিয়ে গেলো। কি যে রাজকার্য থাকে ওর সবসময়।”
বহ্নি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার মায়ের স্বভাব সে জানে। এমন কিছু বলা তার পক্ষে অসম্ভব কিছু না। কিন্তু মায়ের দিকটাও অবিবেচকের মতো ফেলে দিতে পারে না সে। ঘরে তিনটা বড় মেয়ে থাকলে মায়েদের দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। যদিও মা একটু বেশি-ই কঠোর হয়ে যায় মাঝেমাঝে।
“ফুপু খাবারটা তুমি আমাকে দাও।”
সায়েরা অবাক হয়ে বললো,”তোকে দিবো কেনো?”
“আমি দিয়ে আসি খাবারটা।”
“না না, আমি পারবো। তোর ক্লাসের দেরি হয়ে যাবে। তাছাড়া তোর মা যদি জানতে পারে তুই গিয়েছিস ও ঘরে একটা কুরুক্ষেত্র বেঁধে যাবে।”
বহ্নি বিরক্ত হয়ে বললো,”মা কে সব জানানোর দরকারটা-ই বা কি তোমার? ওটা আমার ভাইয়ের ঘর, আমি সবসময় যেতে পারি ওখানে।”
সায়েরা খুঁতখুঁত করতে থাকে। তার ভাবী যে মানুষ। যদি জানতে পারে ছেলেটার খাবার নিয়ে বহ্নি ও ঘরে গেছে, চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলবে। তাকে তো রাগ করবেই, বহ্নিকেও ছেড়ে কথা বলবে না। রণকে তো নয়-ই।
বহ্নি জোর করে সায়েরার হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে নেয়। সায়েরা দিতে না চাইলেও বাধ্য হতে হয়।
“তুমি -ই কিন্তু দেরি করিয়ে দিচ্ছো আমাকে। তোমার হাঁটুর এই অবস্থায় তোমাকে সিঁড়িতে উঠতে দিবোই না আমি।”
সায়েরা মুখ ভোঁতা করে বললো,”বহ্নি আমার কোনো সমস্যা হতো না কিন্তু…..”
বহ্নি ফুপুর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো,”ফুপু আমি কি প্রেম করতে যাচ্ছি ও ঘরে? এতো ভয়ের কি আছে?”
বহ্নির কথা শুনে ফিক করে হেসে দেয় সায়েরা। মেয়েটা মাঝে মাঝে এমন মজা করে কথা বলে।
বহ্নি আর কথা না বাড়িয়ে তরতর করে উঠে যায় সিঁড়ি বেয়ে। সায়েরা সেদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললো,”তুই প্রেমে না পড়লেও তোর প্রেমে পড়া যে অসম্ভব না কোনো ছেলের পক্ষে। বরং তোর মতো মেয়ের প্রেমে না পড়াই কোনো ছেলের জন্য অস্বাভাবিক।”
তিন বোনের মধ্যে আভা সবচেয়ে বেশি সুন্দরী। একদম আগুন সুন্দরী যাকে বলে। গায়ের রঙ যেনো দুধে আলতা, চুলগুলোও বেশ সুন্দর। বাদামী চোখের মণিতে বেশ মানায় ওকে। হাসলে আবার টোলও পড়ে গালে। এখন থেকেই ঘটকরা লাইন দিয়েছে তার জন্য। তবে সেভাবে বলতে গেলে, শীতলও কম যায়না। তার শরীরের আকর্ষণীয় অংশ হলো তার চোখ, হাসি আর চুল। গায়ের রঙ আভার মতো না হলেও উজ্জ্বল ফর্সাই বলা যায়। যে কেউ একবার তাকালে সহসা চোখ ফিরিয়ে নিতে পারেনা। মেয়েরা পেয়েছে তাদের দাদীর রূপ। তাদের দাদী কম বয়সে ভয়ংকর রূপবতী ছিলো। কথিত আছে, তার দাদী একবার কিশোরী বয়সে সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে যায় চুল ছেড়ে। তারপর থেকে তাকে জ্বীনে ধরে। বিয়ের জন্য পাগল হয়ে যায় তারপর থেকে। আভা অবশ্য সে কথা হেসেই উড়িয়ে দেয়। তার ধারণা তার দাদীর বিয়ের ইচ্ছা হয়েছিলো, তাই ওসব নাটক করেছিলো।
তবে আক্ষরিক অর্থে দুই বোনের তুলনায় বহ্নি হয়তো অতোটা সুন্দরী নয়। তবে তাকে কোনোভাবেই অসুন্দরও বলা যায়না। তার চোখ, হাসি খুবই তীক্ষ্ণ। চোখ যেনো জ্বলজ্বল করছে সবসময়। গায়ের রঙ নেহাৎ কিছুটা চাপা তাই ছোট থেকে কম হীনমন্যতায় ভোগেনি সে। বাড়িতে নতুন কোনো অতিথি আসলেই তারা শাহানাকে বলতো, ছোট দুই মেয়ে এতো সুন্দর, বড়টা কেনো এমন? নওশাদের সামনে এমন কিছু বলার সাহস কেউ পায়না। নওশাদের কাছে তার তিন মেয়েই রাজকন্যা। বিশেষ করে বহ্নি তার কলিজার পুরোটাই। সায়েরার কাছেও বহ্নি অসম্ভব রূপবতী। সে যখন পাটভাঙা শাড়ি পরে চুল খোঁপা করে তখন তাকে শাশ্বত বাংলার সেই নারীরূপ মনে হয়। কেউ মনের চোখ দিয়ে বহ্নিকে দেখলে তাকে ভালো না লাগার উপায় নেই।
স্বস্তিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সায়েরা চলে যায় সেখান থেকে। মেয়েগুলো কেমন তরতর করে বড় হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন পরই এই ঘর অন্ধকার করে পরের ঘরে চলে যাবে। সে কথা ভাবতেই বুকটা কেমন করে ওঠে তার।
বহ্নি উৎসের ঘরের সামনে আসতেই থমকে যায়। রণ নামের ছেলেটা খালি গায়ে লুঙ্গি পরে মেঝেতে বসে পড়াশোনা করছে। পড়াশোনায় এতোটাই মগ্ন সে যে কারো উপস্থিতি টের পাচ্ছে না সে।
বহ্নি অস্বস্তি বোধ করে। এই মুহুর্তে কি করা উচিত বুঝতে পারেনা। দরজায় ঠকঠক করে আওয়াজ করাই শ্রেয় মনে করলো।
দুই/তিনবার আওয়াজ করার পর রণ শুনতে পায়। তড়িঘড়ি করে তাকাতেই বহ্নিকে দেখে তার আত্মারাম ছুটে যাওয়ার দশা। গতকাল এই মেয়েকে দেখেছিলো সে। একেবারেই ধানি লঙ্কা একটা। ঝড়ের বেগে উঠে দাঁড়ায় সে। শার্ট নিয়ে পর্দার তলে লুকায়।
বহ্নি বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে বললো,”আচ্ছা আপনি জামা পরে নিন৷ আমি এখানে অপেক্ষা করছি।”
রণ বিদ্যুৎ বেগে বললো,”দুই সেকেন্ড সময় দিন আমাকে, মাত্র দুই সেকেন্ড।”
তার জন্য একটা মেয়ে দরজার বাইরে অপেক্ষা করবে এটা সে ভাবতেই পারছে না, কোনোভাবেই না। কি মনে করে বহ্নি মুখ টিপে হেসে দেয়।
“এই মেজো আপা, এই।”
শীতল কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললো,”কি হয়েছে কি? আর এভাবে চিৎকার করছিস কেনো? আস্তে কথা বলতে পারিস না?”
আভা চোখ বড় বড় করে তাকায়। উঠোনের এক কোণায় শাহানা বাড়ির পুরোনো জিনিসগুলো স্তূপ করে রেখেছে। কিছু অপ্রয়োজনীয় গাছও জন্মেছে এদিক ওদিক। আগাছা আর শ্যাওলা ভরে আছে। তাদের বাবা প্রায় ছুটির দিনেই পরিষ্কার করে, আবার এমন জঙ্গল হয়ে যায়। এদিকটায় ওরা একটু কমই আসে। প্রচুর পোকামাকড় আর মশার আড্ডা এখানে। কিন্তু সকাল সকাল শীতল এখানে কি করছে আভা বুঝতে পারেনা।
“তুই এই জংলার মধ্যে কি করছিস?”
“তোর কি সমস্যা? যা এখান থেকে। স্কুল নেই তোর?”
“আমার তো স্কুল আছে, তুই কলেজে যাবি না? এখনো তৈরিই হোস নি।”
“আমি আজ কলেজে যাবো না।”
আভা বেশ অবাক হয়। শীতল সহজে কলেজে যাওয়া বন্ধ দেয়না। কি এমন কাজ তার এই নোংরা জায়গায় যে কলেজেই যাবে না?
“কিন্তু তুই এখানে কি করছিস তা তো বলবি।”
শীতল চিন্তিত মুখে এদিক ওদিক কি যেনো খুঁজতে থাকে। আভার কথার উত্তর দেয়না।
“মেজো আপা বল না।”
শীতল বুঝতে পারে এই আঠার মতো মেয়েটা তার পিছু ছাড়বে না। না বলা পর্যন্ত ক্রমাগত কথা বলেই যাবে, বাচাল একটা।
“একটা জিনিস খুঁজছি।”
“এই নোংরা জায়গায় কি খুঁজছিস তুই? পাগল হয়ে গিয়েছিস?”
শীতল ফিচেল হেসে বললো,”কেঁচো খুঁজছি, কেঁচো।”
আভা আঁৎকে ওঠে। এমন অনাসৃষ্টি কথা যেনো সে জীবনেও শোনেনি। একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের কেঁচোর সাথে কি প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে?
শীতল কথাটা বলেই দাঁত দিয়ে জিভ কাটে। কেনো যে বলতে গেলো সে কেঁচোর কথা। আভা এখন একশ সতেরোটা প্রশ্ন করবে। এই মেয়েটা এমন অসহ্যকর কেনো?
“কেঁচো দিয়ে কি হবে মেজো আপা? এই বড় আপা শুনছিস….?”
শীতল ক্ষীপ্রতার সাথে এসে আভার মুখ চেপে ধরে। আভা খানিকক্ষণ গোঁ গোঁ আওয়াজ করে।
“আপাকে ডাকছিস কেনো বেয়াদব?”
আভার মুখ ছেড়ে বিরস মুখে দাঁড়ায়।
“বড় আপাকে ডাকবো না? তুই যে পাগল হয়ে গিয়েছিস এটা আপাকে জানাবো না?”
“চুপ থাক অশিক্ষিত। কেঁচোর শরীর ব্যবচ্ছেদের কথা শুনেছিস কখনো? অবশ্য পড়িস তো স্কুলে, জানবি কীভাবে এসব? মূর্খের ঘরের মূর্খ।”
আভা মুখ অন্ধকার করে বললো,”এমন একটা ভাব করছিস যেনো জীবনেও তুই স্কুলে পড়িসনি। জন্মের পরেই লাফ দিয়ে কলেজে উঠে গিয়েছিস।”
শীতল আভার কথার উত্তর না দিয়ে আবারও কেঁচো খোঁজায় মন দেয়।
“এই মেজো আপা।”
“আবার কি?”
“কেঁচোর শরীর ব্যবচ্ছেদ জিনিসটা কি বল না আপা। আমি স্কুলে যেয়ে আমার বান্ধবীদের সামনে গল্প দিবো।”
শীতল থতমত খেয়ে বললো,”গল্প দেওয়ার কি আছে আবার?”
“বল না আপা।”
শীতল প্রমাদ গোণে। এই বেহায়া মেয়েটাকে তাড়ায় যে কীভাবে!
“কলেজে প্রাণিবিজ্ঞান ব্যবহারিকের জন্য কেঁচোর শরীর ব্যবচ্ছেদ করতে হয়।”
আভা হাত দিয়ে মুখ চেপে বললো,”কে করবে? তুই?”
“হ্যা আমি করবো।”
আভা কিছুক্ষণ ওয়াক ওয়াক করে। সে ভাবতেই পারছে না তার মেজো আপা কেঁচোর শরীর কাটবে। সেই হাত দিয়ে তার চুল বেঁধে দিবে কিংবা খাইয়ে দিবে।
শীতল আড়চোখে তাকায় আভার দিকে। আভার চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। শীতল মুচকি হাসে সেদিকে তাকিয়ে।
আভা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আপার কাজকর্ম দেখতে থাকে। সে ঠিক করে আজ সে-ও স্কুলে যাবেনা। মেজো আপার পেছনে আঠার মতো লেগে থাকবে। মেয়েটা কি করে না করে দেখতে তার বড় ভালো লাগে।
“আমাকে ক্ষমা করবেন, মাফ করবেন আমাকে। আমি আসলে বুঝতেই পারিনি আপনি আসবেন এখানে। জানলে একদমই এভাবে এখানে বসে থাকতাম না। আপনি বললে আপনার পা ধরে ক্ষমা চাইবো।”
বহ্নি কৌতুকপূর্ণ হাসি দিয়ে বললো,”পা ধরে ক্ষমা চাইবেন? বেশ চান তো।”
এই বলে বহ্নি পা এগিয়ে দেয়। রণ থতমত খেয়ে যায়। মেয়েটা কি তাকে নিয়ে মজা করছে? অবশ্য মজা করারই তো কথা। শহরের ঝাঁ চকচকে ছেলেমেয়েদের সামনে তো সে বেমানান বটেই। মজা করারই কথা। যদিও বহ্নির চোখেমুখে কোনো মজার চিহ্ন নেই।
“আপনি ইতোমধ্যে আমার পাঁচ মিনিট সময় নষ্ট করেছেন। আমি ভার্সিটি যাচ্ছিলাম, এমনিতেই দেরি হয়ে গিয়েছে।”
“আমি লজ্জিত, আমি ভীষণ লজ্জিত। আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমি শরমিন্দা।”
বহ্নি আচমকা শব্দ করে হেসে দেয়। তার গজদন্ত ভেসে ওঠে। সেদিকে একবার অপার মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয় রণ। এই মেয়েটা এতো সুন্দর করে হাসছে কেনো?
“আমি কতোক্ষণ আর আপনার খাবার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো?”
রণ হতবাক হয়ে যায়। এই মেয়ে তার জন্য খাবার এনেছে? তার মতো একটা অধমের জন্য স্বয়ং রাজকন্যা খাবার নিয়ে এসেছে? এটা কি স্বপ্ন নাকি বাস্তব?
“আপনি আমার জন্য খাবার এনেছেন?”
“এখানে তো আর কেউ নেই, নিশ্চয়ই আপনার জন্যই এনেছি।”
রণ কাঁপা কাঁপা হাতে প্লেটটা হাতে তুলে নেয়। লজ্জায় যেনো মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে সে। কেনো যে বাড়ি ছেড়ে এলো সে এখানে।
“খেয়ে নিন, আমি আসি কেমন?”
রণ মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এমন লজ্জিত তাকে জীবনেও হতে হয়নি।
“আর একটা কথা।”
রণ ঝট করে তাকায়। এই মেয়ের দিকে বেশিক্ষণ তাকানো যায়না। একদম আগুণ সে, আগুণের লেলিহান শিখার দিকে বেশিক্ষণ তাকালে চোখ জ্বালা করে।
“জ্বি বলুন।”
“এখানে থাকতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো? আসলে আমাদের অতিরিক্ত কোনো ঘর নেই তো। তাই আপনাকে উৎসের সাথেই থাকতে দেওয়া হয়েছে। কোনো সমস্যা হলে জানাবেন।”
রণ হতভম্ব হয়ে বললো,”কি বলছেন আপনি? আপনার বাবা আমাকে ছাদে থাকতে দিলেও আমি খুশি হতাম। তিনি আমাকে কৃপা করে মাথার উপর একটা ছাদ দিয়েছেন। আমি তার এই ঋণের কথা কোনোদিন ভুলবো না। আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তবে মনে হচ্ছে উৎস ভাইয়েরই সমস্যা হচ্ছে। ছোট খাট, উনি আমাকে খাটে দিয়ে নিজে মেঝেতে শুয়েছেন। লজ্জায় আমার সারারাত ঘুম হয়নি। আমি এসে উনাকে অনেক বড় বিপদে ফেলে দিলাম। উনাকে বলেছি আমি ছাদে ঘুমাতে যাই, আমার কোনো সমস্যা হবে না। উনি শুধু হেসেছেন শুনে।”
বহ্নির কিছুটা খারাপ লাগে। মানুষটা নিতান্তই সহজ সরল। গ্রামের ছেলে, এতোটুকুতেই কেমন লজ্জা পাচ্ছে।
“আপনি কি দয়া করে উৎস ভাইকে রাজি করাবেন আমাকে যেনো ছাদে ঘুমাতে দেয় রাতে। একটা চাদর ফেলেই ঘুমাতে পারবো আমি।”
বহ্নি দুই হাত বুকে বেঁধে বললো,”হ্যা সে আপনি পারবেন৷ তবে মশা আপনাকে কখন তুলে নিয়ে তাদের ডেরায় চলে যাবে আপনি টেরও পাবেন না। ঘুম ভাঙার পর দেখবেন আপনি মশাদের আস্তানায়। আমাদের বাড়িতে প্রচুর মশা।”
রণ মুখ হাঁ করে বহ্নির দিকে তাকায়। এ বাড়ির সব ছেলেমেয়েগুলোই কি এমন? গম্ভীর মুখে অবলীলায় মজা করে যায়। বাকি দুই মেয়ের সাথে দেখা হয়নি। তাদের কি অবস্থা কে জানে।
রণকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বহ্নি চলে যায়। তাকে যতোক্ষণ দৃষ্টিসীমার মধ্যে দেখা যায় রণ ততক্ষণ অপলক তাকিয়ে থাকে। মেয়েটা ভীষণ রহস্যময়ী। কিছু একটা ব্যাপার তো আছেই তাকে ঘিরে, আছেই।
নওশাদ বাড়িতে ফিরেছে সন্ধ্যার বেশ কিছু পরে। শাহানা তার সাথে কথা বলছে না। দূরে দূরে থাকছে। তাকে চা-ও দিয়ে গেছে সায়েরা। বিষয়টা নওশাদের ভালো লাগছে না। যতো যা-ই হোক তার বউটা তার সাথে কথা না বললে তার ভালো লাগেনা। বার বার অযুহাত খুঁজছে সে শাহানার সাথে কথা বলার, কিন্তু শাহানা তাকে এড়িয়ে চলছে। নওশাদ বুঝতে পারে রণের এখানে থাকাটা পছন্দ করছে না সে। নওশাদ কিছু বলতে পারেনা। এই মুহুর্তে রণকে এখান থেকে চলে যেতে বলাটা অমানবিক। সে নিজেই তার বাবাকে বলে বড় মুখ করে এখানে এনেছে। বলেছে তার ছেলের কোনো অসুবিধা হবে না এখানে। এখন কীভাবে এখান থেকে চলে যেতে বলবে সে রণকে?
“বাবা আসবো?”
বহ্নিকে দেখে প্রশান্তিতে হাসে নওশাদ। তার দুশ্চিন্তার সময়ে মেয়েগুলোকে কাছে পেলে খুব ভালো লাগে তার।
“আয় মা, আমার কাছে আসতে আবার অনুমতি কিসের?”
বহ্নির হাতে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত। নওশাদ মাঝে মাঝে অবাক হয়। এই মেয়েটাকে মাঝে মধ্যে তার নিজের মা মনে হয়। কীভাবে কীভাবে যেনো সে বুঝে যায় তার বাবার কখন কি লাগবে। এই অতিষ্ঠ গরমে এই এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত খুব দরকার ছিলো তার।
নওশাদ হাসিমুখে গ্লাসটা নেয়। এক চুমুকে পুরোটা শেষ করে। বহ্নি মায়াভরা চোখে তাকিয়ে থাকে বাবার দিকে। তার কপাল বেয়ে ঘাম পড়ছে। বহ্নি পরম মমতায় নিজের ওড়না দিয়ে বাবার কপালের ঘাম মুছে দেয়। নওশাদ সুন্দর করে হাসে তার দিকে তাকিয়ে। মেয়ের কোমল ওড়নার ছোঁয়ায় সব ক্লান্তি দূরে চলে যায় তার।
নওশাদ মেয়ের হাত ধরে তার পাশে বসায়।
“তুই কেমন আছিস মা?”
“ভালো আছি বাবা। তোমার মতো বাবা থাকলে কোনো মেয়ে কি খারাপ থাকতে পারে?”
নওশাদ শব্দ করে হাসে।
“তুই কি আমাকে কিছু বলবি মা?”
“কেনো বাবা কিছু না বললে কি তোমার কাছে আসা যাবে না?”
“এ কি বলছিস মা? কেনো যাবেনা?”
বহ্নি কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে ওড়না নিয়ে নখ খোটে। নওশাদ শান্ত হয়ে বসে থাকে। সে জানে বহ্নি তাকে কিছু বলবে এখন।
“বাবা একটা অনুরোধ করবো?”
“তুই আমার মা, তুই আমাকে আদেশ করবি।”
বহ্নি ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ কি যেনো ভেবে বললো,”বাবা উঠোনের ওই কোণায় তুমি যে একটা ঘর তুলতে চেয়েছিলে, কবে তুলবে?”
“হঠাৎ এই কথা?”
“বলো না।”
“টাকা অনেকটাই গুছিয়ে ফেলেছি। তোর বিয়ের আগেই তুলে ফেলবো। নতুন জামাই এসে নতুন ঘরে উঠবে।”
বহ্নি মুখ বাঁকিয়ে বললো,”থামো তো বাবা, আমি এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করছি না।”
“সে দেখা যাবে।”
“বাবা আমি বলছি যে পাকা ঘর তুলতে না পারো একটা টিনের চালার ঘর নাহয় তুলো আপাতত।”
নওশাদ কিছুটা অবাক হয়ে তাকায়।
“টিনের ঘর?”
“হ্যা বাবা। তোমার যদি টাকায় কম পড়ে আমি নাহয় কিছুটা সাহায্য করবো তোমাকে।”
নওশাদ স্তম্ভিত হয়ে যায় বহ্নির কথায়।
“তুই টাকা পাবি কোথায়?”
বহ্নি চুলে খোঁপা করতে করতে বললো,”স্কলারশিপের টাকাগুলো তো পড়েই আছে। তাছাড়া হাতখরচের টাকা জমিয়েছি বেশ কিছুদিন ধরে। বেশ অনেক টাকাই জমেছে। তোমার হয়ে যাবে এতে।”
নওশাদ কাঁপা হাতে মেয়ের মাথায় হাত রাখে। মেয়েটা কবে এতো বড় হয়ে গেলো?
“বাবা আসলে উৎসের ঘরে ছেলেটার থাকতে সমস্যা হচ্ছে। একে তো অতোটুকু ঘর। উৎস রাতে মেঝেতে ঘুমায়। দুইজনেরই অসুবিধা হচ্ছে।”
নওশাদ ইতস্তত করে বললো,”কিন্তু আমি তো টাকা জমাচ্ছি তোদের জন্য একটা পাকা ঘর তুলবো তাই। তোদের তিন বোনের এক ঘরে থাকতে সমস্যা হয়, আমার খারাপ লাগে দেখতে। এখন তো বড় হয়েছিস তোরা।”
বহ্নি বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বললো,”বাবা তুমি কি ভেবেছো নতুন ঘর পেলে আমরা আলাদা থাকবো? আমাদের জন্য তুমি সাত মহলা রাজপ্রাসাদ বানিয়ে দিলেও দিনশেষে দেখবে আমরা সেই একসাথেই থাকবো, একই ঘরে।”
নওশাদ হাসে, কিছু বলতে পারেনা। তার মেয়েগুলো এতো ভালো কেনো? দারিদ্রতা তাদের এতোটুকুও ক্ষুদ্রমনা করে দেয়নি।
“কি ভাবছো বাবা? নিবে টাকাটা তুমি?”
“তোর কাছ থেকে টাকা নিয়ে ঘর তুলতে হবে এতোটাও খারাপ অবস্থা তোর বাবার হয়নি মা। এখনো হাত-পা আছে আমার।”
“বাবা আমি ওভাবে…..”
“থাক আমি বুঝেছি। তুই সেইটাই করছিস যা আমার মা থাকলে করতো। তবে আমাকে একটু ভাবতে দে। আমার খুব শখ তোদের জন্য ঘরটা করবো।”
“বাবা ওই ছেলেটা তো বছরের পর বছর এখানে থাকবে না। চাকরি পেলে চলে যাবে। তখন তো আমরাই থাকবো ও ঘরে। আর পাকা ঘরের চেয়ে টিনের চালার ঘর বেশি সুন্দর হয় জানো তুমি? বৃষ্টি হলে কি সুন্দর আওয়াজ হয়। ঝমঝম ঝমঝম করে।”
নওশাদ মাথা নিচু করে বসে থাকে। সে স্বার্থক, যে বাবার মেয়েরা এতো উদার মনের সে বাবা অবশ্যই স্বার্থক। আর কি চাই এই ছোট্ট জীবনে?
শীতল মহাসমারোহে চটপটি রান্না করছে। সে নাকি আজ বাড়ির সবাইকে নিজে হাতে চটপটি বানিয়ে খাওয়াবে। আভা তার পিছ ছাড়ছে না। সায়েরাকে শীতল রান্নাঘর থেকে বিদায় দিয়েছে। সায়েরা চিন্তিত মুখে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। শীতল খুব অগোছালো। কখন যে দুর্ঘটনা বাঁধিয়ে ফেলে ঠিক নেই।
“মেজো আপা রান্না তো শেষ, সবাইকে দিয়ে আসি?”
শীতল আমতা আমতা করে বললো,”তুই যা মরিচ কেটে ফেল। আমি বাকিটা করছি।”
আভা সরল মনে মরিচ কাটতে চলে যায়। শীতল একটা বাটি বের করে সবার আগে তাতে চটপটি পরিবেশন করতে থাকে। তাকে বমি করানো? আজ তো আপনার খবর আছে। আহা রে, নেতা মশাই। আপনি তো আজ গেলেন। ভাবের বাজবে আজ বারোটা। কথাটা ভাবতেই আপনমনে হেসে দেয় শীতল।
“বাবা।”
“কই রে মা তোর চটপটি কই? ঘ্রাণেই তো আমার খিদা পেয়ে গেছে। কখন খেতে দিবি?”
শীতল জোর করে হেসে হাতের বাটিটা নওশাদের দিকে বাড়িয়ে দেয়।
“বাবা এটা উৎস ভাইকে দিয়ে এসো। উনি বাসায় ফিরেছেন দেখেছি।”
“রণের জন্যও দে, একসাথে নিয়ে যাই।”
“সবাইকে দিবো বাবা। আগে তুমি এটা উৎস ভাইকে দিয়ে এসো তো।”
নওশাদ অবাক হয়ে বললো,”ওকে আগে কেনো দিবো? একসাথেই দিই।”
“উফফ বাবা তুমি বেশি কথা বলো, এটা স্পেশাল।”
“স্পেশাল?”
শীতল ঢোক চাপে, ধরা না পড়ে যায়। সে নিজেও একটা গাধী, কোনো কথা চেপে রাখতে পারেনা।
“আসলে বাবা উৎস ভাই ঝাল খেতে পারেনা তো। এটা ঝালছাড়া, তাই আর কি।”
“আচ্ছা তাই বল। আচ্ছা ওকে এটা দিয়ে আসি। তুই বাকিদেরটা তৈরি কর।”
শীতল হাসে। নওশাদ চলে যেতেই তার বুকে হাতুড়িপেটা হতে থাকে। মনে হচ্ছে হৃৎপিণ্ডটা খুলে বেরিয়ে আসবে এক্ষুনি গলা দিয়ে।
সিঁড়ির মুখে পায়চারি করতে থাকে শীতল। বাবাকে দিয়ে পাঠানোর কারণ সে নিজে নিয়ে বদ লোকটা জীবনেও খেতো না। কিন্তু প্রতিশোধ তো তাকে নিতেই হবে।
বাবাকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলে শীতল। হাসিমুখে এগিয়ে যায়।
“বাবা দিয়েছো উৎস ভাইকে?”
নওশাদ হাসিমাখা মুখে বললো,”না রে মা।”
“না মানে? কোথায় রেখেছো ওটা?”
“আর বলিস না, উৎস নাকি বেরিয়েছে আবার। নিশ্চয়ই বেটা সিগারেট কিনতে গিয়েছে। এতো করে মানা করি, কে শোনে কার কথা।”
শীতলের অন্য কোনো কথা কানে ঢুকছে না। কান গরম হয়ে গেছে।
শীতল হালকা চিৎকার করে বললো,”তাহলে কি করেছো ওটা?”
“আর বলিস না রণও নাকি ঝাল খায়না। তাই ওটা ওকেই দিয়েছি। উৎস বাড়ি ফিরলে ওকে ঝালছাড়া আরেক বাটি দিয়ে আসবো নাহয়।”
শীতল হতভম্ব মুখে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। নওশাদ চলে যেতেই পাখির মতো যেনো উড়তে উড়তে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে সে। যেভাবে হোক ওই বাটি রণ ভাইয়ের কাছ থেকে কেড়ে নিতে হবে। কি সর্বনাশ কি সর্বনাশ!
“রণ ভাই দাঁড়ান।”
চটপটি দেখে খুশি হয়েছিলো রণ। হাতমুখ ধুয়ে মাত্রই এসেছে খেতে। চামচটা কেবলই মুখে তুলতে যাবে, তার আগেই শীতলকে দেখে থেমে যায় সে। শীতলকে প্রথমবার দেখলো সে। সাথে দাঁড়িয়ে পড়ে সে।
“আপনি?”
“আমার পরিচয় পরে জানলেও হবে। আগে বাটিটা ফেরত দিন।”
রণ ভেবাচেকা খেয়ে যায়। মাত্রই মেয়েটার বাবা এসে দিয়ে গেলো, এখন আবার মেয়েটা এসেছে ফেরত নিতে?
শীতল কথা না বাড়িয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে যায় ঘরে। রণ চুপসে দাঁড়িয়ে থাকে এক কোণায়। এ বাড়ির ছেলেমেয়েগুলোর কাণ্ড কিছুই বুঝতে পারছে না সে। সবাই যেনো কেমন!
“আপনার জন্য আমি নতুন করে পাঠাচ্ছি, এটা তো ঠান্ডা হয়ে গেছে।”
“না না আমার সমস্যা নেই।”
শীতল কঠিন গলায় বললো,”আমার সমস্যা আছে। ধৈর্য্য ধরুন, পাঠাচ্ছি আবার।”
রণ লজ্জায়, অপমানে গুটিয়ে যায়। ইশ, আজকে সারাদিন লজ্জার উপর কাটাতে হচ্ছে তাকে।
শীতলের খারাপ লাগে রণের মুখ দেখে। কিন্তু এখন তার কিছুই করার নেই।
ঝড়ের বেগে ঘরের বাইরে যেতেই কারো সাথে পা বেঁধে উলটে মাটিতে পড়ে শীতল, সাথে সেই মানুষটাও। চটপটির বাটি দূরে যেয়ে পড়ার সাথে কাঁচের ঝনঝনানি আওয়াজ শোনা যায়। ভেঙে টুকরো হয়েছে মুহুর্তেই।
উৎস হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। শীতলের মাথার নিচে তার হাত। ওকে বাঁচাতে যেয়ে বেকায়দা ব্যথা পেয়েছে সে নিজেই। শীতল চোখমুখ কুঁচকে একমনে দোয়া দরুদ পড়ে যাচ্ছে।
‘খোদা এই যাত্রায় বাঁচিয়ে দাও। আমি সারারাত নফল নামাজ পড়বো আজ।’
উৎস নিজে ওঠে শীতলের উপর থেকে। শীতল ভেবেছিলো ওকে ওঠাবে উৎস। কিন্তু না, নিজে উঠে অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। অনেক কষ্টে নিজে উঠে দাঁড়ায় সে। বাম হাত কেটে গেছে মনে হয় কনুইয়ের কাছে, জ্বালা করছে। সেদিকে তাকানোর সময় নেই তার।
“দেখেশুনে হাঁটবেন না? চোখ নেই?”
উৎস উত্তর দেয়না। মেয়েটা কেমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে।
“চোখ আকাশে তুলে হাঁটে, বাজে লোক।”
উৎস চোখ বড় বড় করে তাকায়। শীতলের চোখে পানি চলে এসেছে।
শীতলকে বকবক করেই যাচ্ছে। উৎস একটা বড় করে শ্বাস ফেলে এগিয়ে যায় ভাঙা বাটি পরিষ্কার করতে।
“একদম ওদিকে যাবেন না, একদম না।”
উৎস শীতলের দিকে তাকিয়ে বললো,”গেলে কি করবে? কেঁচো ফ্লেভারের চটপটি খাওয়ানোর চেষ্টা করবে আবার?”
শীতলের শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে। ঠোঁট কাঁপতে থাকে তিরতির করে। উনি কীভাবে জানলো?
পড়ে যাওয়া চটপটির মধ্যে সাঁতার কাটতে থাকা কালো রঙা কেঁচোটা উৎস ধরে রেখেছে শীতলের মুখের সামনে। শীতল চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। কোনোভাবেই সে চোখ খুলবে না, কোনোভাবেই না। কি লজ্জা!
“শীতল, চোখ খোলো।”
“আমাকে মাফ করে দিন উৎস ভাই, আর কোনোদিন হবে না।”
“তোমাকে চোখ খুলতে বলেছি আমি।”
“না না না।”
উৎস বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। শীতল ভয়ার্ত অবস্থায় চোখ বন্ধ করেই সিঁড়ির দিকে ছুটতে গেলে উৎস তার হাত চেপে ধরে পিছন থেকে।
শীতল বরফের মতো জমে যায়। আজ সে নিশ্চিত মরে যাবে, কেউ বাঁচাতে পারবে না।
“পালাচ্ছো কেনো? আমি কি তোমাকে কিছু বলেছি?”
শীতল অসম্ভব অবাক হয়। এই মানুষটা এভাবে কথা বলছে কেনো? মনেই হচ্ছে না এটা উৎস। উৎস ভাই হলে এতোক্ষণে মেরেই বসতো তো তাকে। এটা কি উৎস ভাইয়ের রূপ নেওয়া কোনো ভূত?
“লুকোচুরি করে কেনো দিতে হবে? শুধু কেঁচো কেনো? তুমি বললে তো বিষও খেয়ে নিতে পারতাম। সাহস থাকলে হাতে করে এনে দিও।”
শীতল উৎসের দিকে তাকায় তড়িৎবেগে। এটা কে? এটা কে?
“উৎস ভাই।”
“বলো।”
“আমি আমি…..”
আচমকা উৎস কেঁচোটা শীতলের চুলের মধ্যে ছেড়ে দেয়। শীতল দুই সেকেন্ড সময় নেয় বুঝতে কি হলো। উৎস মুচকি হেসে সেখান থেকে চলে যেতেই শীতল আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠে।
“বাবা, ফুপু, বড় আপা আমাকে বাঁচাও কে আছো। আমি মরে যাচ্ছি।”
ভয়ে শীতলের অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার যোগাড়। উৎস পাত্তাই দেয়না সেদিকে।
(চলবে…….)