#মাতাল_প্রেমসন্ধি
পর্ব: ৩৬
“আভা একটু দাঁড়াও।”
টিউশন ক্লাস শেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরছিলো আভা। আজ বান্ধবীরাও নেই তার সাথে। একা একা হাঁটতে ভীষণ বিরক্ত লাগে তার। বিরক্ত মুখে পিছনে তাকাতেই থমকে যায় সে। চোখ বড় বড় করে তাকায় মানুষটার দিকে।
“আবির ভাই, আপনি?”
আবির হেসে এগিয়ে আসে আভার দিকে। আভা এখনো নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
“কেমন আছো আভা?”
আভা মুখ টিপে হেসে বললো,”আমি কেমন আছি জানতে এতোদূর এসেছেন?”
আবির বিব্রত হয়ে বললো,”না না, এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম।”
আভা খিলখিল করে হেসে ওঠে, আবির থতমত খেয়ে মাথা চুলকায়।
“আপনার কি এদিকেই কাজ থাকে সবসময়?”
“না মানে আসলে….”
“থাক হয়েছে। আর বানিয়ে বানিয়ে বলতে হবে না।”
আবির অবাক হয়ে বললো,”বানিয়ে বলছি?”
“হ্যা বলছেন। স্বীকার করলেই পারেন আপনি আমাকে দেখার জন্য এসেছেন। সেই অপরাধে কি ফাঁ’সি হবে আপনার?”
আবির অস্বস্তিতে পড়ে যায়। ক্যাম্পাসের এমন জাঁদরেল নেতা কিনা এইটুকু একটা পিচ্চির সামনে ভেবাচেকা খেয়ে যাচ্ছে। আজাদ ঠিকই বলে, এই নওশার খাঁ এর মেয়ে তিনটা একেকটা আগুন।
“কি এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবেন নাকি যাবেন?”
“কোথায় যাবো?”
“আমাকে এগিয়ে দিয়ে আসুন বাড়ি পর্যন্ত। দেখতেই পারছেন আজ আমার বান্ধবীরা কেউ আসেনি। একা একা গল্প না করে হাঁটতে আমার একদমই ভালো লাগেনা। কি যাবেন তো?”
আবির মুচকি হেসে বললো,”মহারানীর আদেশ শিরোধার্য, চলুন।”
আভা হাসতে যেয়েও হাসতে পারেনা। আজকের বিকেলটা এতো সুন্দর লাগছে কেনো? কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা মিলাবে। প্রকৃতিতে ইতোমধ্যে কন্যা সুন্দর আলো ছড়িয়ে পড়েছে। এটা বাংলা কি মাস? আশ্বিন নয় তো? শরৎকালই হবে হয়তো। তীব্র গরমের মধ্যেও মনটা প্রশান্ত হয়ে যায় আভার। একরাশ ভালো লাগা ছুঁয়ে যায় তাকে। মনে হয় আজকের দিনটা আসলেই ভীষণ সুন্দর।
যদিও আভা বলেছিলো সে সারারাস্তা গল্প করতে করতে আসবে আবিরের সাথে। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে আভা একটা কথা-ও বলতে পারেনা। আবির দু’একবার চেষ্টা করেও থেমে যায়। দুইজনই ভাবে অন্যজন কথা বলবে কিন্তু কেউ-ই কিছু বলতে পারেনা। আবির শত চেষ্টা করেও আভার সিকে দশ সেকেন্ডের বেশি তাকাতে পারেনা। মেয়েটা পরীর মতো সুন্দর, পদ্মের মতো ফুটন্ত আর পুষ্পের মতো কোমল। আবিরের মনে হয় ছুঁয়ে দিলেই সে সিঁদুর রঙে রাঙিয়ে যাবে। ছুঁতেও ভয় হয় আবিরের।
এভাবেই পুরোটা রাস্তা দুইজন চুপচাপই হাঁটতে থাকে। মাঝে মাঝে আঙ্গুলে আঙ্গুল ছুঁয়ে যেতেই আভা লজ্জায় লাল হয়ে কিছুটা দ্রুত হাঁটে। আবির তাকে আটকায় না। আভা সামনে, আবির কিছুটা দূরত্ব রেখে পিছনে হাঁটে। লুকোচুরি প্রেমের পরশ বয়ে যায় দুই মানব মানবীর মধ্যে। একজন সদ্য যৌবনে পা রাখা যুবক আর একজন কিশোরী। প্রকৃতি তাদের মিলিয়ে দিতে চায় কিনা কে জানে! প্রকৃতির খেয়াল বোঝা দায়।
বাড়ির সামনে আসতেই থেমে যায় দু’জন। আবির ম্লান হেসে বললো,”যাও আভা। আবার দেখা হবে।”
লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে আভা বললো,”কবে?”
আবির কিছুটা চমকে উঠে তাকায় আভার দিকে। তার উদগ্রীব মুখমণ্ডল আবিরকে শিহরণ দেয়। যে শিহরণে উদ্বেলিত হয় তার শিরা-উপশিরা, ধমনী।
“তুমি যদি চাও খুব তাড়াতাড়ি।”
“শুধু আমি চাই বুঝি?”
আবির আরো একপ্রস্ত অবাক হয়। আভার আজকের কথাগুলো তাকে অশান্ত করে তুলছে। মেয়েটা আজ এতোটা মায়া মায়া করে কথা বলছে কেনো আজকে? এটা কি তার আবেগ, ভ্রম নাকি প্রশ্রয়?
“ভিতরে যাও আভা।”
“আপনিও চলুন।”
“কি বলছো? এখন?”
“কি হবে তাতে? উৎস ভাই আর মেজো আপাও নিশ্চয়ই চলে এসেছে এতোক্ষণে। আর আজ সন্ধ্যার পরই বড় আপা আর রণ ভাইয়ের আসার কথা, আজ রাতে ওরা এখানেই থাকবে। বাবার মহাপুরুষেরা একসাথে থাকলে খুব অসুবিধা হবে নাকি?”
“মহাপুরুষ মানে?”
“আপনার অতো বুঝে কাজ নেই। যাবেন কিনা বলুন।”
আবির ঠোঁট কামড়ে হেসে বললো,”ওইযে বললাম মহারানীর আদেশ শিরোধার্য। কিন্তু…”
“কিন্তু কি?”
“উৎস যদি রাগ করে?”
আভা আবিরের দিকে কিছুটা এগিয়ে এসে বললো,”উৎস ভাই যখন তার অনুপমার সাথে প্রেম করে আপনি রাগ হন?”
আবির ফ্যালফ্যাল করে তাকায় আভার দিকে, আভা রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মনে হচ্ছে মেয়েটা কিশোরী নয়, পূর্ণাঙ্গ যুবতী। নাহলে আজ এতো ভারিক্কি কথা বলছে কীভাবে?
“যাবো?”
“হ্যা বলছি তো, আসুন। আরেকটা টোপ দিতে পারি আপনাকে। আমার ফুপু খুব মজা করে মুড়ি মাখে সবাই একসাথে থাকলে। যা খেলে আপনি পাগল হয়ে যাবেন নিশ্চিত।”
আবির বিড়বিড় করে বললো,”আমার পাগল হতে ফুপুর মুড়ি মাখা খেতে হবে না। আমি এমনিতেই পাগল হয়ে আছি তার ভাইঝির চোখের মায়ায়।”
আভা ভ্রু কুঁচকে বললো,”কি বলছেন?”
“না কিছু না, চলো তবে যাওয়া যাক।”
আভা ভিতরে ঢোকে গেট টপকে। আবির কয়েক মিনিট বাদে ঢোকে, যাতে কেউ কিছু সন্দেহ না করে।
কিন্তু বাড়িতে ঢুকতেই আভা চমকে যায় ভীষণ। বসার ঘর থেকে আওয়াজ আসছে। তার মানে বাড়িতে কেউ এসেছে। বড় আপারা কি তবে আগেভাগেই চলে এলো?
আভা ছুটে জানালা দিয়ে ভিতরের দিকে তাকাতেই চমকে ওঠে। আলেয়া দাদী এসেছে? কিন্তু কেনো?
নওশাদ খাঁ এর এক দুঃসম্পর্কের ফুপু এই আলেয়া বানু। ভীষণ ঝগড়াটে আর বিরক্তিকর একটা বুড়ি। তাদের তিনবোনের সাথে কোন জন্মের শত্রুতা বুড়ির কে জানে। এলেই তাদের সাথে কোনো না কোনো ভাবে লাগাবেই ঝগড়া। অন্যদিন আপা সামাল দেয়, আজ তো সে-ও নেই। মেজো আপা কি পারবে সামলাতে বুড়িটাকে? কিন্তু সে কোথায়? এখনো কি ফেরেনি? তাকে তো কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
“ম্যাডাম আপনার নামটা?”
প্রত্যাশা লাজুক গলায় বললো,”আমার নাম প্রত্যাশা আর আপনার?”
রুস্তম হৃষ্টচিত্তে মতিনের দিকে একবার তাকিয়ে গলা খাঁকারি দেয়। শার্টের বোতাম ঠিক করে। ধুর আজ কেনো যে লুঙ্গি পরতে গেলো সে। প্যান্ট পরলে কি ক্ষতি হতো? কোনো রকমে হাত দিয়ে চুলটা ঠিক করার চেষ্টা করে। মতিন মাথা চুলকায় শুধু, ভাইয়ের মতিগতি ভালো ঠেকছে না তার।
“ইয়ে মানে আমার নাম নীলাভ।”
শীতলের মুখ হাঁ হয়ে যায়, মতিনেরও। বলে কি এই লোক?
প্রত্যাশা কিছু বলার আগে মতিন বললো,”রুস্তম ভাই, এসব কি বলছেন? আপনার নাম তো ছোট রুস্তম। মার্কেটে আরেক ডন ছিলো, তার নামও রুস্তম ছিলো। পরে ভার্সিটির অসভ্য চেংরাগুলো বলতে লাগলো আপনার মেশিন নাকি ছোট। সেই থেকে আপনার নাম হয়ে গেলো ছোট রুস্তম। নীলাভ কবে থেকে হলো আপনার নাম?”
মতিনের কথায় খিলখিল করে হেসে দেয় অগ্নি, সেই সাথে শীতলও। দুইজন জড়াজড়ি করে হাসতে থাকে। সেখানেও সমস্যা ছিলো না কিন্তু রুস্তম অবাক হয়ে দেখলো প্রত্যাশাও হাসছে মুখ টিপে। রাগে, অপমানে, ক্ষোভে রুস্তমের মুখ লাল থেকে বেগুনী, বেগুনী থেকে কালো হয়ে যায়।
মতিনের গলাটা শক্ত করে চেপে ধরে রুস্তম তার কনুইয়ের ভাঁজ দিয়ে। শ্বাস নিতে না পেরে খানিকক্ষণ চিল্লাপাল্লা করে মতিন।
প্রত্যাশা মুচকি হেসে বললো,”উনাকে ছেড়ে দিন না। রুস্তম নামটাও খারাপ না, চলবে।”
রুস্তম সাথে সাথে মতিনের গলা ছেড়ে দেয়। মতিন কাশতে থাকে ছাড়া পেয়ে।
শীতল অবাক হয়ে একবার রুস্তমের দিকে আরেকবার প্রত্যাশার দিকে তাকায়। এই মেয়ে না উৎস ভাইকে পছন্দ? তাহলে এই লোকের সাথে এভাবে ঢলে ঢলে কথা বলছে কেনো? রুস্তম নাম সুন্দর লেগেছে তার কাছে? শীতল মুখে হাত দিয়ে বমি আটকানোর চেষ্টা করে।
রুস্তম মুখে একটা তেলতেলে হাসি ফুটিয়ে বললো,”তা আপনি এই মেয়েদের সাথে কি করছিলেন? আপনার কোনো অসুবিধা হয়নি তো আসতে?”
“হয়েছেই তো। আমি তো আমার প্রাডো ছাড়া কোথাও যাইনা। এই পচা লোকটা আমাকে কি এক লক্করঝক্কর মাইক্রোতে করে এনেছে। আমার এখনো মাথা ঘুরছে, জানো রুস্তম?”
রুস্তম এই রূপবতী হুরপরীর মুখে নিজের নামটা শুনে আহ্লাদে গলে যায়। পুনরায় মতিনের গলাটা চেপে ধরে কনুইয়ের ভাঁজে।
“এই শালা তুই ওকে মাইক্রোতে এনেছিস কেনো? ক্ষমা চা এক্ষুনি।”
“ওরে আল্লাহ, ওরে মওলা গেলাম গো, আমি মরলাম।”
“গোলামের পুত আজ মনে কর তুই শ্যাষ।”
প্রত্যাশা উপয়ান্তর না পেয়ে বললো,”থাক না থাক, কিছু বলতে হবে না রুস্তম।”
প্রত্যাশার লাজুক মুখের দিকে তাকিয়ে রুস্তমের দিল ঠান্ডা হয়ে যায়।
“আমার ওটা ছাড়াও অনেক গাড়ি আছে। আপনার যেটা ভালো লাগে ওটাতে করে এই মোটা শালা আপনাকে সসম্মানে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আসবে।”
“না তার প্রয়োজন হবে না। আমার গাড়ি আছে কলেজ গেটের সামনে। আমাদের এখান থেকে যেতে দিলেই আমরা চলে যেতে পারবো।”
এতোক্ষণে রুস্তমের চোখ যায় শীতলের দিকে। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা তার দিকে।
শরীরটা জ্বলে যায় রুস্তমের। তার লোকগুলোকে নিয়ে আর শান্তি নেই। বলেছিলো শুধু শীতলকে তুলে আনতে। না হবে না, সাথে এনেছে এই মোমের পুতুলটাকেও। কোথায় সে ভেবেছিলো উৎস জানার আগেই শীতলকে দূরে কোথাও অপহরণ করে নিয়ে যাবে। প্রাণপাখির জন্য উৎস তার পথ থেকে সরে যাবে। কিন্তু এখন? সোনার ডিম পাড়া হাঁসটাকেও ছেড়ে দিতে হবে।
“এইযে মেশিন ছোট রুস্তম।”
রুস্তম হতবাক হয়ে অগ্নির দিকে তাকায়, এই ধানী লঙ্কাটা আবার কে?
রুস্তম দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”এই তোর এতো বড় সাহস? আমাকে কিনা….”
“এই রুস্তম, মেয়েদের সাথে কেউ এভাবে কথা বলে?”
দমে যায় রুস্তম প্রত্যাশার কথায়। জোর করে হেসে দেয় আবার সে।
“তাহলে কীভাবে বলবো ম্যাডাম? আপনি-ই বলে দিন। শুনলেন না ও কি বললো?”
“আপনি করে কথা বলো।”
রুস্তম তপ্ত শ্বাস ফেলতে থাকে ঘন ঘন। শীতল আর অগ্নি দুইজনই মুখে হাত দিয়ে হাসে।
মতিম ভাইয়ের অপমান সইতে না পেরে ওদের দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বললো,”এই আপারা, চুপ করেন, চুপ বলছি।”
শীতল হঠাৎ কিছুটা রেগে মতিনের দিকে তেড়ে যায়, অগ্নি শীতলের ব্যবহারে মুহুর্তের মধ্যে হতভম্ব হয়ে যায়।
“এই মোটা শালা, হলুদ তেল্লাচুরা তুই অনেকক্ষণ ধরে ফালাফালি করতেছিস কিছু বলতেছি না। কি মনে করেছিস আমাদের? ইচ্ছা হলো তুলে আনবি আবার ইচ্ছা হলে ধমকাবি। আমার উৎসকে চিনিস তো? যদি জানতে পারে তুই আমাকে ধমকেছিস তোর এই ঢিবির মতো ভুড়িটা ফুটো করে দিবে। আর কি করবে জানিস?”
মতিন চিঁ চিঁ করে বললো,”কি করবে?”
শীতল ঈষৎ হেসে বললো,”তোর ভাইয়ের ছোট হলেও আছে তো, আমার উৎস তোর ওটা একদম নাই করে দিবে। মেশিনও নেই, রসুনও নেই, নাচবি তুই ধেই ধেই।”
অগ্নি অপলক চোখে তাকায় শীতলের দিকে। বাপরে! এটা কে? এটা তো দেখি শীতলের খোলস থেকে বেরিয়ে অনলে রূপ নিয়েছে। ধাতস্থ হয়েই অগ্নি দুই আঙ্গুল ঠোঁটের নিচে দিয়ে শিষ বাজায়। শীতল ওভাবেই মতিনের দিকে তাকিয়ে থাকে কঠিন চোখে।
“ভাই, ও ভাই। এর একটা বিহিত আপনাকে করতেই হবে। একবার উৎস আরেকবার এই বোতল….”
ঝাঁঝিয়ে ওঠে শীতল সাথে সাথে।
“এই তুই বোতল বললি কেনো? আমার নাম শীতল।”
“ওই হলো, শীতল বোতল।”
“দাঁড়া তোরে দেখতেছি। উৎস ভাইকে না বলেছি।”
“ক্ষমা চাই মা জননী। ওই পাগলাটারে খেপায়েন না। আমার জীবন যৌবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে বদমাশটা।”
“সাবধানে কথা বলবি আমার সাথে। আমি রেগে গেলে কি করবো জানিস?”
“কি করবেন আপা?”
শীতল কিয়ৎক্ষণ কিছু একটা ভেবে বললো,”তোর রসুন পাচার করে দিবো আফ্রিকায়।”
মতিন আর্তনাদ করে বললো,”ও ভাই…..”
রুস্তম ত্যক্তবিরক্ত হয়ে বললো,”উফফ তোকে দিয়ে আমার একটা কাজ ঠিকমতো হয়না, একটাও না।”
“এখন আমি কি করবো ভাই?”
“জানিনা মোটা শালা, হলুদ তেল্লাচুরা।”
“ভাই আপনিও?”
প্রত্যাশা হেসে গড়িয়ে পড়ছে, রুস্তম মুগ্ধ হয়ে তাকায় সেদিকে। একটা মেয়ের হাসি এতো সুন্দর হবে কেনো? হোয়াই?
অগ্নি এসে শীতলের হাত ধরে। মেয়েটার সাহস অবাক করে দিচ্ছে তাকে আজ। সত্যিই মনে হচ্ছে এবার সিংহ প্রেমিকের সিংহী প্রেমিকা।
“মতিন, যা ওদের যেতে দে এবার।”
“যেতে দিবো? কিন্তু শীত….”
রুস্তম রাগী চোখে তাকিয়ে বললো,”তোকে কি বললাম?”
মতিন ভোঁতা মুখে বললো,”ওইযে ওদিকে দরজা, খুলে দিচ্ছি বেরিয়ে যান মা জননীরা। আর এমুখো হবেন না।”
শীতল কোমরে হাত বেঁধে বললো,”কেনো রে? আমরা কি এভাবে এসেছিলাম? তাছাড়া শুনলি না প্রত্যাশা আপা প্রাডো ছাড়া কোথাও যেতে পারেনা। আমাদের প্রাডো করে কলেজ গেটের সামনে রেখে আয়। নাহলে…”
“নাহলে কি?”
শীতল ফিসফিস করে বললো,”রসুন রসুন…”
মতিন কাঁদো কাঁদো হয়ে তাকায় রুস্তমের দিকে। কি হলো কি তার ভাইয়ের আজকে? কতো প্লান ছিলো, সব শেষ করে দিলো।
রুস্তম তখনও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রত্যাশার দিকে।
মতিন কালো নতুন প্রাডোটা তৈরি করে রেখেছে। ক্ষোভে তাকিয়ে আছে। প্রথম উঠলো অগ্নি, এরপর শীতল।
প্রত্যাশা উঠতে গেলে রুস্তম ডাকে তাকে পিছন থেকে।
“ম্যাডাম।”
“বলুন।”
“আবার কি দেখা হওয়ার সম্ভাবনা আছে?”
প্রত্যাশা লাজুক হেসে বললো,”যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো, চলে এসো এক বরষায়।”
রুস্তম হতভম্ব হয়ে বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যাশা উঠে যায় গাড়িতে।
ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয়।
গাড়ি চলে যাওয়ার পরও রুস্তম তাকিয়ে থাকে অপলক।
মতিন এসে রুস্তমের পাশে দাঁড়ায়।
“ভাই ও ভাই। কাহিনী কি?”
রুস্তম মতিনের মুখ টিপে দিয়ে গুণগুণ করে গান করে ওঠে।
“যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো, তুমি চলে এসো, এক বরষায়।”
মতিন হাঁ করে তাকিয়ে থাকে রুস্তমের দিকে।
দূর থেকে সিগারেটের একবিন্দু আলো দেখে শীতল ভয়ে ভয়ে সেদিকে আগায়। বাড়ি ফেরার পর থেকে উৎস একবারও তাকায়নি তার দিকে, কোনো কথাও বলেনি। শীতল জানে সে ভুল করেছে। প্রত্যাশার কথা শুনে কলেজ গেট থেকে কোথাও যাওয়াও উচিত হয়নি তার। কিন্তু এতো বড় একটা ঘটনা ঘটে যাবে কে জানতো? সে ঠিক করেছিলো রুস্তমের ব্যাপারে উৎসকে কিছু জানাবে না সে। রুস্তম তো ছেড়েই দিয়েছে তাদের। তাছাড়া উৎস এটা জানতে পারলে আবারও ঝামেলা করবে সে। রুস্তম আবার কাউন্টার করবে। এভাবে আর কতো?
কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। প্রাডো কলেজ গেটে আসতেই দেখে উৎস আজাদের সাথে কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই। হয়তো সে ভেবেছে শীতলের ক্লাস তখনও চলছে। কিন্তু শীতলকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে যারপরনাই অবাক হয়ে যায় সে। বাধ্য হয়ে শীতলকে সব স্বীকার করতে হয়। উৎস তৎক্ষনাৎ কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। শীতল ভেবেছিলো উৎস ভীষণ রেগে তখনই রওনা দিবে রুস্তমের বাড়ির দিকে। কিন্তু উৎস নির্বিকার, যেনো কিছুই হয়নি। শীতলকে বাড়িতে এনেই ঘরের দরজা দিয়েছে সে। দরজা খোলেনি, খায়নি রাতে।
“উৎস ভাই।”
শীতলের ডাকে উৎস ফিরে তাকায়ও না তার দিকে। খুব কষ্ট হয় শীতলের।
“আমার সাথে কথা বলবেন না আপনি?”
উৎস চুপ।
শীতল ক্ষোভের সাথে উৎসের হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে ফেলে দেয়। উৎস ভ্রু কুঁচকে তাকায় তার দিকে।
“কি সমস্যা?”
“আপনি আমার সাথে কথা বলছেন না কেনো?”
“প্রয়োজন মনে করছি না। ঘরে যাও তুমি।”
শীতল অসহিষ্ণু হয়ে উৎসের হাত চেপে ধরে। উৎস সর্বশক্তি দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নেয় নিজের।
গটগট করে পা ফেলে ঘরে যেতে গেলেই শীতল পিছন থেকে টেনে ধরে তাকে।
আচমকা উৎসের বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ওঠে সে। উৎস ঠান্ডা হয়ে যায়। তবুও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে।
“আপনি আমাকে মারুন, বকুন। যা ইচ্ছা করুন। তবুও এভাবে রাগ করে থাকবেন না আমার উপর। আমার ভিতরটা পুড়ে যায়।”
“তোমাকে মারা বা বকার কোনোটার অধিকার আমার নেই। ওটা তোমার বাবার দায়িত্ব। আর মেয়েদের গায়ে হাত তোলে কাপুরুষেরা। আমি কাপুরষ নই। তুমি শত অন্যায় করে এলেও আমি তোমার শরীরে একটা ফুলের টোকা দিতে পারবো না।”
“তাহলে আমার সাথে কথা বলুন। আমি জানি আমি ভুল করেছি, অন্যায় করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন কি থেকে কি হয়ে গেলো আমি বুঝতেই পারলাম না….”
উৎস শীতলকে সরিয়ে দেয় নিজের বুকের উপর থেকে।
“তোমার উপর আমার কোনো রাগ নেই শীতল। আমি চিন্তিত, আমাকে একা থাকতে দাও।”
“কি নিয়ে চিন্তিত আপনি?”
উৎস চুপ করে থাকে।
“বলুন না, কি নিয়ে চিন্তিত আপনি? আমাকে বলুন।”
উৎস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,”ওকে হয়তো তোমাদের বোকা মনে হতে পারে, মনে হতে পারে ওর মতো একটা লোক কীভাবে কারো ক্ষতি করতে পারে। তবে আমি জানি ও কি। ও আমার সাথে একটা গেম খেলার চেষ্টা করছে।”
“গেম?”
“হ্যা গেম। জীবন মরণের গেম। হয় আমি বাঁচবো বা ও। এতোদিন ও আর যা করেছে সব গেমেরই অংশ। ও একটা কিছু করে আমি কাউন্টার দিই, আবার ও করে। এভাবেই চলছে। ও যখন রণ ভাইকে তুলে নিয়ে গেলো ও কি পারতো না তাকে সরিয়ে ফেলতে? ও তা করেনি। ওর বোনকে দিয়ে গেমটা খেলিয়েছে যাতে আমি বিশ্বাস করে ফেলি।”
“লাভলী আপা?”
“হ্যা তোমার ওই কাবলি আপা। তবে ও এখনো জানেনা ও কার সাথে কি করছে। এতোদিন পর্যন্ত সব ঠিক ছিলো। কিন্তু আজ ও আমার কলিজায় হাত দিয়েছে। ও ফাঁদ পেতেই রেখেছিলো আমার জন্য। ও জানতো আমি যাবো তোমার জন্য প্রতিশোধ নিতে। এভাবেই ও আমার সাথে মেন্টাল গেমটা খেলছে।”
শীতল অবাক হয়ে বললো,”এতে ওর লাভ?”
“লাভ আছে শীতল, লাভ আছে। আমার থেকে শক্তি হয়তো ওর বেশি। ওর প্রচুর লোক, অস্ত্রশস্ত্র এসব আছে। তবে আমার যা আছে ওর তা নেই। তা হলো আমার সাহস। ও আমার সাহসটাই ভাঙতে চাচ্ছে আমার সাথে এই মেন্টাল গেমগুলো খেলে। তবে না, যথেষ্ট হয়েছে। এবার চাল দিবো আমি। গেমটা উল্টোদিকে খেলা হবে এবার। ও আমার জানকে আজ তুলে নিয়েছে। আমি চাইলে ওর কলিজা বের করে আনতে পারতাম। কিন্তু আর আমি এভাবে কাউন্টার দিবো না। আমি খেলবো এবার অন্যভাবে।”
“তবে আপনাকে আমি একটা কথা বলতে চাই।”
“বলো।”
শীতল প্রত্যাশার সাথে রুস্তমের সবকিছু শুরু থেকে শেষ উৎসকে বলে। উৎস স্তম্ভিত হয়ে যায় শুনে।
“তুমি নিশ্চিত?”
“নিশ্চিত না হলেও সন্দেহ তো হয়েছেই। আপনি চাইলে অগ্নির কাছেও শুনতে পারেন। ও নিজেও সন্দেহ করেছে।”
উৎস হঠাৎ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আনন্দ প্রকাশ করে। তার সারামুখে হাসি ছড়িয়ে যায়।
“পেয়েছি, পেয়েছি।”
“কি পেলেন?”
“আমার তুরুপের তাস।”
“তার মানে?”
“অতো বুঝে তোমার কাজ নেই। ঘরে যাও। আমিও যাই। এখন আমাকে আমার প্লান সাজাতে হবে। আমার গেম শুরু হবে এবার।”
শীতল মুখ ভোঁতা করে বললো,”আমি যে আরো কিছুক্ষণ গল্প করতে চাই।”
উৎস দুই হাত বুকে বেঁধে বললো,”বেশ, বাবাকে যেয়ে বলো।”
“বাবাকে কি বলবো?”
“বলবে তোমার গল্প করতে ইচ্ছা করছে খুব আমার সাথে। তবে হ্যা, এরপর তোমাকে পাওয়া হয়ে গেলে কিছুদিন গল্প করতেই দিবো না তোমাকে।”
“কেনো?”
উৎস শীতলের কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললো,”গল্প করার মতো সময়ই তো দিবো না। ঘরের দরজা খুলবো না সাতদিন। বাইরের কেউ যেনো বিরক্ত না করে।”
শীতল ধাক্কা দিয়ে উৎসকে সরিয়ে দেয়। উৎস হাসে, শীতল দৌড়ে চলে যায় সেখান থেকে।
শীতল চলে যেতেই উৎসের মনটা খারাপ হয়ে যায়। শীতলের সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও ভিতরটা জ্বলছে তার। মনে হচ্ছে ভয়ংকর কিছুর সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে সে। এখনো ঠিক ধরতে পারছে না পুরোটা। যদি সে হেরে যায়? কি হবে এই পরিবারটার? উৎস আরেকটা সিগারেট ধরায়। মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ছে তার ভীষণ।
খাওয়াদাওয়ার পর নওশাদের ঘরেই বসে আছে আলেয়া। পান খাচ্ছে আর গল্প করছে নওশাদের সাথে। শাহানা রাগ করে শীতলের ঘরে যেয়ে বসে আছে। বুড়িটা তাকে পছন্দ করে না, খুব ঠেস দিয়ে কথা বলে তাকে। তার সামনে যতো কম থাকা যায় ততই ভালো।
নওশাদ নিশপিশ করছে, কতোক্ষণ তার দোয়েল পাখিটাকে দেখেনা। ফুপুর মুখের উপর কিছু বলতেও পারছে না।
“ফুপু বলছি কি, আজ তো অনেক রাত হলো। বাকি কথা কাল শুনি?”
“তুই থাম তো বাপু। সকালেই তো সেই অফিস ছুটবি। কথা বলার সময় কই তোর সাথে আমার?”
নওশাদ ম্লান হাসে আর বারবার দরজার দিকে তাকায়।
আলেয়া ইতিউতি তাকিয়ে চাপা গলায় বললো,”হ্যা রে তোর আক্কেল কি কোনোদিন হবে না? আজীবন বোকা-ই রয়ে যাবি?”
“এ কথা বলছেন কেনো ফুপু? আমি কি করেছি?”
“কি করিসনি তাই বল। হয়েছে তো তিনটা মেয়ে, ছেলে হলো না একটাও। তা মেয়েগুলোকে তো আগলে রাখবি।”
নওশাদ গম্ভীর গলায় বললো,”এসবের মানে? আমি কি আমার মেয়েদের আগলে রাখিনা?”
“এই তোর আগলে রাখার নমুনা? ঘরে সোমর্থ মেয়ে আর তুই রাজ্যের বাইরের ছোকরা এনে ঘরে তুলিস। একটা অঘটন ঘটে গেলে কি হবে রে?”
নওশাদ অবাক হয়ে বললো,”বাইরের ছোকরা কাকে বলছেন ফুপু?”
আলেয়া আরো আস্তে আস্তে বললো,”কেনো? সায়েরার ছেলে উৎস? আবার ওর কোন বন্ধুকেও এনে তুলেছে আজ। আর তুই কিচ্ছুটি বললি না? উলটে তাকে রাতে থাকতে বললি?”
“ফুপু আপনি এসব কি বলছেন? আমার বোনের ছেলে বাইরের কেনো হবে? ও আমার কলিজার এক অংশ। আর ওরা এখন যাবে কোথায় এ বাড়ি ছেড়ে? আর আবিরও খুব ভালো ছেলে। আপনি শুধু শুধুই দুশ্চিন্তা করছেন ওদের নিয়ে।”
আলেয়া মুখ বাঁকিয়ে বললো,”খুব জানা আছে ওসব ভালো ছেলে। সূঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বের হয় ওরা। আর ওই উৎস, আমাকে দেখে কিনা বলে কূটনী বুড়িটা আবার এসেছে? এ কেমন অসভ্যতা? সায়েরা কি ওকে কিচ্ছু শেখায়নি?”
নওশাদ হাহা করে হেসে দেয় আলেয়ার কথা শুনে।
“হাসির কি বললাম?”
“ওহ ফুপু, ও মজা করেছে আপনার সাথে। আপনি ওটা নিয়েও রাগ করেছেন?”
“এতোকিছু আমি বুঝিনা নওশাদ। আগুন আর বারুদ পাশাপাশি রাখতে নেই জানিস তো? বিস্ফোরণ অনিবার্য। কমবয়সী মেয়েগুলো হলো আগুন। সামনে সুপুরুষ দেখলে ছোঁকছোঁকানি করবেই। আর ছেলেগুলোকেও তো ভালো ঠেকলো না আমার। তোর ওই বহ্নির বরটাকেও ভালো লাগেনি আমার। বেটা ফাজিল, আমাকে কিনা বলে দাদী আপনি তো ভারী সুন্দরী। কত্তোবড় বেয়াদব।”
নওশাদ আবারও হাসে, ভীষণ হাসি পাচ্ছে তার। ছেলেগুলো এতো মজার কেনো?
“হাসিস না তো। তোর হাসি দেখে আমার পিত্তি জ্বলে যায়। ওই ছোকরাকেও শুনেছিলাম ঘরে তুলে এনেছিস এক সময়। ঘটিয়েছে তো বড় মেয়েটার সাথে? তাই বলছি সময় থাকতে সাবধান হয়ে যা। নাহলে পরে পস্তাবি।”
“ফুপু আপনি একটু শান্ত হোন তো। এরকম কিছুই হবে না। ওরা আমার সোনা ছেলে।”
ঝাঁঝের সাথে উঠে দাঁড়ায় আলেয়া।
“আমি এখানে আছি যতোদিন, ছোকরাগুলোকে সোজা করে দিবো। আমার নামও আলেয়া বানু।”
“দেখবেন আবার ওদের সোজা করতে যেয়ে নিজেই সোজা হয়ে যাবেন না যেনো। ওরা একেকটা যে ক্ষুরধার। আরো একজন আছে, আজাদ। ভুলেও তার পাল্লায় পড়বেন না।”
“ওরে এটা কি বাড়ি নাকি ছোকরাদের হোস্টেল?”
“যাহ বাবা! সাবধান করে দিলাম তাতেও আমার দোষ হলো। যা পারেন করেন। এখন আপনার বৌমাকে ডেকে দিয়ে আপনি ঘুমাতে যান। ওদের সোজা করতে তো শক্তি দরকার। না ঘুমালে শক্তি হারিয়ে যাবে না?”
আলেয়া রাগে গজগজ করতে করতে বললো,”বউ পাগলা মিনসে একটা। গা পিত্তি জ্বলে যায় একেবারে আধবুড়ো বয়সে প্রেম দেখে।”
আলেয়া চলে যায়, নওশাদ হাসতে থাকে আপনমনে।
মাঝরাতে পানি খেতে উঠে আভা দেখলো বারান্দার লাইট জ্বালানো। এই সময় কে এই লাইট জ্বালাবে? উৎকণ্ঠিত হয়ে সেখানে যেতেই আভা দেখলো আবির ছটফট করছে আর পায়চারি করছে। আভা ভয় পেয়ে যায় তাকে দেখে।
“আবির ভাই।”
আবির চমকে উঠে তাকায় আভার দিকে। আভা দেখলো আবিরের বাম চোখ রক্ত লাল।
“কি হয়েছে আপনার? কোনো সমস্যা?”
আবির মাথায়া নেড়ে বললো,”না না তুমি যাও। অনেক রাত এখন। আমার সাথে একা কথা বলতে দেখে ফেলবে কেউ তোমাকে। ঘরে যাও।”
আভা যায়না, এগিয়ে আসে আবিরের দিকে।
“আমাকে বলবেন তো কি হয়েছে?”
“বললাম তো কিছু হয়নি, তুমি যাও।”
আভা আবিরের কোনো কথা না শুনে তাকে নিজের দিকে ফেরায়। টপটপ করে পানি পড়ছে তার বাম চোখ থেকে। আভা হতবিহ্বল হয়ে যায়।
“চোখে কি হয়েছে?”
“কি যেনো পড়েছে চোখে। পোকা বোধহয়। চোখ মেলতেই পারছি না। অনেকবার পানির ঝাপটা দিয়েছি, কোনো লাভ হচ্ছে না। উৎস একটু আগেই ঘুমাতে গেছে, তাকে ডাকতেও পারছি না। তাই নিজেই নিচে চলে এসেছি যাতে ওর ঘুমের ব্যাঘাত না হয়।”
“অদ্ভুত, কাউকে ডাকবেন না আপনি?”
“কি দরকার আভা? তুমিও যাও, এটা ঠিক হয়ে যাবে।”
“চুপ থাকুন তো, বড্ড বেশি কথা বলেন আপনি।”
আবিরের কোনো আপত্তি না শুনে আভা পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে লম্বা হওয়ার চেষ্টা করে, আবিরের চোখ টেনে ধরে।
আস্তে আস্তে ফুঁ দিতে থাকে সে চোখে। আবির যেনো হঠাৎ শান্ত হয়ে যায়। হাজারটা যন্ত্রণার পরও যদি এমন ছোঁয় পাওয়া যায়, তবে সেই যন্ত্রণা পেতেও সে রাজি। এ কি অপার্থিব সুখ?
মিষ্টি একটা গন্ধ আসছে আভার শরীর থেকে। আবির হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। কোনো ভুল হতে দেওয়া যাবেনা, কোনো
ভুল না।
“এ কি সর্বনেশে কাণ্ড রে! এই তোরা কোথায় কে আছিস? জলদি আয়। খাঁ বাড়ির মানসম্মান সব ধূলোয় মিশে গেলো, হায় হায় রে! আল্লাহ, এই নষ্টামি দেখার জন্যই কি তুমি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলে? এ আমি কি দেখলাম গো।”
আলেয়ার আহাজারিতে ভয়ংকরভাবে কেঁপে ওঠে আভা, সাথে সাথে ছেড়ে দেয় সে আবিরকে। আবিরও হতভম্ব হয়ে যায়।
“নওশাদ রে, তোর মুখে চুনকালি পড়লো রে। এবার কি হবে?”
উৎসের ঘুম ভেঙে যায় সাথে সাথে, বাকিদেরও।
উৎস পাশে হাত দিয়ে দেখে আবির নেই। কেমন একটা ভয় কাজ করে তার। দ্রুত পায়ে ছুটতে থাকে সে।
নওশাদ, শাহানা, সায়েরা, শীতল আর দোতলা থেকে বহ্নি আর রণও নিচে আসতে থাকে। অজানা আতঙ্কে সবার বুক কাঁপতে থাকে।
(চলবে…..)
#মাতাল_প্রেমসন্ধি
পর্ব: ৩৭
উঠোনের এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে আছে নওশাদ। তার দৃষ্টি মাটির দিকে নিবদ্ধ। কোনোদিকে তাকাচ্ছে না সে। জবুথবু হয়ে বসে আছে সদ্য ঘুমভাঙা ছোট্ট শিশুর মতো। মাঝে মাঝে বুকটা হাহাকার করে উঠছে তার, কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে দিচ্ছে না সে।
রাগে যেনো জ্বলন্ত কাষ্ঠের মতো ফুঁসছে শাহানা। এক পত্তন মার হয়েছে ইতোমধ্যে আভাকে। কোনোরকমে বহ্নি, শীতল আর সায়েরা বাঁচিয়েছে তাকে। এক কোণায় আভাকে দুই পাশ দিয়ে জড়িয়ে ধরে রেখেছে বহ্নি আর শীতল। আভা কাঁপছে একনাগাড়ে। তার ফর্সা গালে শাহানার চার আঙ্গুলের কালচে দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে। কপালের কাছ থেকে চুলগুলো ছেঁড়া, ক্লিপটা চোখের সামনে এসে দোল খাচ্ছে। সেদিকে হুঁশ নেই আভার। শরীরের যন্ত্রণার চেয়ে মানসিক যন্ত্রণা তাকে হতবিহ্বল করে দিচ্ছে। এই মুখ কীভাবে সে বাবার সামনে দেখাবে বুঝতে পারছে না। কিন্তু সে তো কোনো অন্যায় করেনি, তার বাবার শিক্ষাকে ভুলে যায়নি। কিন্তু সবাই যে তাকে ভুল বুঝলো, সত্যটা এখন কীভাবে প্রমাণ করবে সে সবার সামনে?
শাহানা কখনোই তিন মেয়ের গায়ে হাত তোলার সাহস পায়না, নওশাদ খুব রাগ করে। তার কথা মেয়েদের শাসন করো, বকা দাও ভালো কথা। কিন্তু কখনো গায়ে হাত তোলা যাবেনা। শাহানা এ কথা শুনে রাগ করতো, বলতো তাতে নাকি মেয়েরা অসভ্য হয়ে যাবে। নওশাদ হাসতো সেসব শুনে। তার বিশ্বাস ছিলো তার মেয়েরা তার দেওয়া শিক্ষা কোনোদিন ভুলবে না। কোনো অন্যায় তারা করবে না। কিন্তু আজ সে সবার সামনে ভুল প্রমাণিত হলো। শাহানার বেদম প্রহারের মুখেও সে একটা বারের জন্য আভাকে বাঁচাতে যেতে পারেনি। বহ্নি, শীতল আর সায়েরাই আটকেছে শুধু।
উৎস আহত মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তার দৃষ্টিও মাটির দিকে। দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে। তার মিশ্র অনুভূতি এখনো বুঝতে পারছে না কেউ। রণ মাথা নিচু করে পাশেই দাঁড়ানো। শুধু আলেয়া দূর থেকে মিটমিট করে হাসছে। তার হাসির কারণ সে যা সন্দেহ করেছিলো তা সত্য প্রমাণিত হয়েছে, তার চোখের সামনেই। অসভ্য মেয়েগুলোকে সে মোটেই পছন্দ করতো না। আজ হাতেনাতে ধরতে পেরে ভীষণ আনন্দ হচ্ছে তার।
শুধু আবির কারো দিকে তাকাতে পারছে না। লজ্জায়, অনুশোচনায় মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে আছে তার। তার সামনেই, তার কারণেই আভাকে যখন উন্মাদের মতো প্রহার করলো তার মা, তার হৃদয়টা ভেঙেচুরে যাচ্ছিলো। ইচ্ছা করছিলো সব বাঁধা অতিক্রম করে হলেও মেয়েটার হাত ধরে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে। তার জন্য যখন এতোকিছু সে সবকিছুর দায় মাথা পেতে নিবে। কিন্তু তাতে তো প্রমাণ হবে এই অন্যায় তারা করেছে। যে অন্যায় তারা করেনি সে শাস্তি কেনো পাবে তারা? আভা অনেকবার বলার চেষ্টা করেছে, কেউ শোনেনি তার কথা।
আচমকা শব্দ করে ডুকরে কেঁদে ওঠে নওশাদ। উপস্থিত সবাই কিছুটা চমকে ওঠে। তার কান্নার সাথে বুকের মধ্যে জমে থাকা একরাশ হাহাকার যেনো বেরিয়ে আসছে। বহ্নি আর শীতল আভাকে ছেড়ে দিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। আভা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে একই জায়গায়।
“বাবা তুমি কেনো কাঁদছো এভাবে? দয়া করে কেঁদো না বাবা। তুমি আমাদের বটবৃক্ষ, তুমি আমাদের শক্তি। তুমি এভাবে কাঁদলে আমাদের মনোবলও যে ভেঙে যাবে।”
শীতল কথা শেষ করে বাবার কোলের উপর মাথা রাখে, নিজেও কাঁদে।
বহ্নি নওশাদের হাত শক্ত করে চেপে ধরে বললো,”বাবা আমরা আভার পুরো কথাটা না শুনেই ওকে ভুল বুঝে চলেছি তখন থেকে। এটা কি ঠিক হচ্ছে? আভা এমন মেয়ে আমাদের? তাছাড়া আবিরও তো তেমন ছেলে নয়।”
বহ্নি কথা শেষ করতে পারেনা। তার আগেই খেঁকিয়ে ওঠে আলেয়া।
“তবে কি আমি মিথ্যা বলছি রে মেয়ে? আমার কি লাভ মিথ্যা বলে? আমি নিজের চোখে দেখেছি সব। কি নষ্টামি করছিলো দু’টো মিলে, ছিহ!”
আভা আরো কুঁকড়ে যায় নিজের মধ্যে লজ্জায়। ইচ্ছা করছে হাউমাউ করে কাঁদতে কিন্তু কোনোভাবেই কাঁদতে পারেনা সে। কান্নাটা গলার কাছে দলা হয়ে আটকে আছে। একবিন্দু স্বস্তি দিচ্ছে না তাকে।
বহ্নি মুচকি হেসে উঠে দাঁড়ায়, আলেয়ার মুখোমুখি হয় সে।
“আমাদের চোখের দেখারও অনেক সময় ভুল হতে পারে আলেয়া দাদী। আপনার বয়স হয়েছে, চোখের সমস্যা হতেই পারে। তাছাড়া বারান্দাতে আলো খুব কম। খুব স্বাভাবিক ভুল দেখা।”
আলেয়া দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”তুই তো বুদ্ধির ঢেঁকি। তাহলে তুই বল এতো রাতে একটা কম বয়সী মেয়ে আরেকটা ছেলের সাথে এতো কাছাকাছি হয়ে কি করছিলো? নষ্টামিটা নাহয় ভুল দেখেছি কম আলোতে কিন্তু আলো তো এতোটাও কম না যে, ওটাও ভুল দেখবো।”
বহ্নি কিছু বলতে যাবে তার আগেই শীতল এসে দাঁড়ায় তার পাশে। আভা এসব সহ্য করতে না পেরে দুই হাতে জামা চেপে দাঁড়ায়। তার মনে হচ্ছে তার জ্ঞান কেনো হারাচ্ছে না এখনো। এ যে সহ্য করতে পারছে না সে।
“আলেয়া দাদী, আপনি ভুল করছেন। আমাদের বোনের শিক্ষা মোটেই এমন নয়। আমাদের বাবা আমাদের হয়তো অনেক প্রাচুর্যতায় বড় করেননি। কিন্তু আমাদের শিক্ষায় কোনো ত্রুটি রাখেনি তিনি। আর কেউ না হলেও আমরা দুই বোন নিশ্চিত এমন নোংরা কাজ আমাদের আভা করতে পারেনা। ওর পুরো কথাটা আমাদের আগে শুনতে হবে।”
আলেয়া মুখ ভেংচি দিয়ে বললো,”যৌবনের পোকা কুটকুট করে কামড়ালে সবাই সব নোংরামি করতে পারে।”
হতভম্ব হয়ে যায় উপস্থিত সবাই। এমন নোংরা, বাজে কথা তাদের বাড়িতে কেউ বলেনা। শীতল বাঁকা চোখে আভার দিকে তাকায়, আভা ফুঁপিয়ে ওঠে সাথে সাথে।
“চুপ করুন দাদী, এসব কি বলছেন আপনি?”
বহ্নির ঝাঁঝালো কণ্ঠে আলেয়া কিছুটা থেমে গেলেও দমে যায়না।
“কি বলেছি? এখন এই কথা যদি বাড়ির বাইরে যায়, তাহলে তোর বাবার মান সম্মান কোথায় যাবে একবার ভেবেছিস?”
বহ্নি অবাক হয়ে বললো,”বাইরে কেনো যাবে এই কথা? কে জানাবে? এখানে তো সব বাড়ির লোক।”
“তবুও দেওয়ালের কান বলে তো কিছু আছে। আর বিয়ে দিতে পারবি তোরা এই মেয়েকে?”
সায়েরা এতোক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে সবার কথা শুনছিলো। বরাবরই সে তাই-ই করে। কিন্তু এই মুহুর্তে সে কথা না বলে পারলো না।
বাঁকা ঠোঁটে সামান্য হেসে সায়েরা আলেয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,”দেওয়ালের কান বলতে কি তবে আপনি নিজেকেই বোঝালেন ফুপু? আপনি সবাইকে রসিয়ে রসিয়ে এই গল্প করবেন?”
“তুই থাম তো সায়েরা। একে তো এতো বড় ছেলে নিয়ে ভাইয়ের বাড়ি পড়ে আছিস। তুই আবার এতো কথা বলিস কোন মুখে?”
উৎস হঠাৎ রক্তলাল চোখে একবার আলেয়ার দিকে তাকায়। আলেয়া কিছুটা দমে যেয়ে চুপ করে যায়। উৎসকে তার স্বাভাবিক ছেলে মনে হয় না, ওর চেহারাটাই নাকি কেমন গুন্ডা গুন্ডা। তার কাছে এমনটাই মনে হয়।
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই উৎস ছুটে যেয়ে আবিরের সামনে দাঁড়ায়। এরপর আচমকা তার গালে সশব্দে একটা চড় বসিয়ে দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে যায় সবাই। আবির তাল সামলাতে না পেরে কিছুটা দূরে ছিটকে যেয়ে পড়ে। আভা আর্তনাদ করে ওঠে ক্ষীণ গলায়। শীতল ভীতু চোখে তাকায় উৎসের দিকে। এই উৎস তার অপরিচিত। এই উৎসকে সে চিনেনা। ক্ষীপ্র চিতার মতো ফোঁসফোঁস করছে সে।
বহ্নি আর রণ যেয়ে উৎসকে সামলানোর চেষ্টা করে। উৎস তখনও রাগী চোখে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবিরের চোখ ছলছল করে ওঠে। শেষ পর্যন্ত উৎসও তাকে ভুল বুঝলো? এ কি সেই উৎস, যে কিনা আবিরের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলো?
“উৎস….”
“আর একটা কথা বলবি না তুই বেঈমানের বাচ্চা।”
“উৎস তুইও আমাকে ভুল বুঝলি?”
“ঠিক বোঝার মতো কোনো কাজ তো তুই করিস নি। তোকে আমি বন্ধু না রে, ভাই ভেবেছিলাম। এই মূল্য দিলি তুই? এই মানুষটা তোকে নিজের ছেলের মতো ভালোবেসেছিলো। এতো বড় বেঈমানী করলি তুই তার সাথে? আজ যদি এই মানুষটা আমার সামনে না থাকতো, খোদার কসম তোকে খু’ন করতাম আমি আজ, এক্ষুনি।”
আবির মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। এই জীবনে এতোটা অপমানিত তাকে কোনোদিন হতে হয়নি। কারো দিকে তাকাতে পারছে না সে। সবচেয়ে কষ্ট হচ্ছে আভার জন্য। তাকে যা বলার বলুক সবাই, কিন্তু ওর বয়সটা তো কম। ও কীভাবে সহ্য করবে এতোকিছু?
আলুথালু পায়ে শাহানা এসে দাঁড়ায় আবিরের সামনে। আবির তাকাতে পারেনা তার দিকে। শাহানার শরীর থেকে মিষ্টি একটা গন্ধ আসছে, কেমন মা মা গন্ধ। আবিরের অসহ্য কষ্ট হতে থাকে।
“এই ছেলে, মাথা নিচু করে রেখেছো কেনো? তাকাও আমার দিকে, তাকাও।”
আবির তাকায় না। শাহানার কণ্ঠ কেমন অপ্রকৃতস্থের মতো শোনায়। কেউ-ই কিছু বলার সাহস পায়না। শুধু আভা একবার মায়ের দিকে তাকায়। মায়ের সরল মুখটা কেমন শিলার মতো কঠিন হয়ে আছে। বুকটা কেঁপে ওঠে তার সহসাই।
“এমন কাজ করো কেনো যাতে মাথা নিচু করে রাখতে হয়? বলো, কেনো করো?”
আবির কম্পিত গলায় বললো,”বিশ্বাস করুন, আমি এমন কিচ্ছু করিনি। আমাদের কিছু বলার সুযোগটা তো দিন। আমার চোখে পোকা পড়েছিলো। দেখুন এখনো কেমন লাল হয়ে আছে। আর আভা ঠিক ওই সময়….”
“কি বলো? ওই সময় কি? আভা কি চোখের ডাক্তার?”
আবির কিছু বলতে যেয়েও থেমে যায়। শাহানার কথা স্বাভাবিক মনে হয় না। এই অবস্থায় তাকে কিছু বললেও সে বিশ্বাস করবে না।
“তোমার মা নেই, মায়ের ভালোবাসা পাওনি কোনোদিন। আমি পরম যত্নে তোমাকে বুকে টেনে নিয়েছি। একটু হলেও মায়ের ভালোবাসা দিতে চেয়েছি। কুমারী মেয়ে ঘরে আছে জেনেও তোমাকে ঘরে আশ্রয় দিয়েছি। কারণ কি জানো? আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম। আজ তুমি সেই বিশ্বাস ভেঙেছো আমার। তোমার মুখ কোনোদিন দেখতে চাইনা আমি।”
“মামি আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন। আপনারা সবাই আমাকে ভুল বুঝছেন। আমি আপনাদের বিশ্বাস ভাঙ্গিনি।”
শাহানা উন্মাদের মতো হাসে।
“মেয়েদের জীবনটা মুরগির মতো আর ছেলেদের হাঁসের মতো। হাঁস যতোই শরীরে কাঁদা মাখুক না কেনো, ঝাড়া দিলেই পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু মুরগির গায়ে কাঁদা মাখলে এতো সহজে তা পরিষ্কার হয়না। যেভাবেই হোক এই কথা জানাজানি হবে। এলাকায় আমাদের যে সম্মানটুকু ছিলো তা নষ্ট হবে। আর এই যে এই মানুষটাকে দেখছো না? যে কিনা তোমাদের মহাপুরুষ মনে করে, সে মানুষটা আর কোনোদিন মাথা উঁচু করে চলতে পারবে না। সারাজীবন সততার সাথে চলেছে সে দারিদ্র্যতার সাথে লড়াই করেও। মান সম্মানের সাথে কোনো আপোষ করেনি। সেই মানুষটাও আজ তোমার জন্য, তোমাদের জন্য সমাজের কাছে হেয় হয়ে থাকবে। তার মেয়ে কিনা রাত-বিরেতে একটা পরপুরুষের সাথে, ছিহ!”
উঠোনজুড়ে পিনপতন নীরবতা। নওশাদ হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়েছে মাটিতেই।
একটা কথা বলছে না সে। একদৃষ্টিতে শূন্যের দিকে তাকিয়ে আছে সে।
“কি হলো, উত্তর দাও। কি পরিকল্পনা এখন তোমার? সর্বনাশ যা করার করেছো নাকি আরো বাকি আছে? আমার এক মেয়ের সর্বনাশ করেছো, এখন তো শান্তি হয়েছে তাইনা? আমার আরেকটা কুমারী মেয়ে আছে ঘরে। এখন কি ওর বিয়েটাও হতে দিবে না তুমি?”
শীতল আড়চোখে তাকায় উৎসের দিকে। উৎসের চোখ ছলছল করছে, যে কোনো সময় হয়তো চিৎকার করে কাঁদবে সে। তার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছে শীতল ভালো করে।
আবির শাহানার কথার উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে চুপ করে। এরপর পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করে কিছুটা দূরে যেয়ে দাঁড়ায়। খুব নিচুস্বরে কারো সাথে কথা বলে আবার ফিরে আসে। সবাই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সবার দৃষ্টি উপেক্ষা করে আবির নওশাদের সামনে যেয়ে দাঁড়ায়। এরপর হাটু গেড়ে বসে তার সামনে। নওশাদ ঘোলাটে চোখে তাকায় তার দিকে।
“মামা।”
নওশাদ উত্তর দেয়না।
আবির হঠাৎ করে নওশাদের হাতের উপর হাত রাখে, নওশাদ কিছুই বলেনা।
“মামা আপনি আমাকে মারুন, কাটুন যা ইচ্ছা করুন। কিন্তু দয়া করে এভাবে চুপ করে থাকবেন না। সবাই তো সব কিছু বললো, আপনি কিছু বলবেন না?”
নওশাদ দীর্ঘক্ষণ পর মুখ খোলে। ফ্যাসফ্যাসে গলায় নিচু স্বরে বললো,”যেখানে বিশ্বাস ভেঙে যায়, সেখানে যে কণ্ঠ নীরব হয়ে যায় বাবা।”
“মামা….”
“আমার এই তিনটা মেয়ে আমার তিনটা রত্ন রে বাবা। আমি ওদের গায়ে কখনো একটা ফুলের আঁচড়ও পড়তে দিইনি। হ্যা মানুষ মাত্র ভুল হয়। হয়তো দু’জনই ভুল করেছো। আমার কষ্টটা কোথায় জানো? আজ আমার অহংকার ধূলোয় মিশে গেছে। আমার অহংকার ছিলো আমার তিন মেয়ে। তারা কোনোদিন কোনো অন্যায় করতে পারেনা এই বিশ্বাস ছিলো। আর বিশ্বাস ছিলো তোমার উপর। উৎসের থেকে আলাদা করে দেখিনি তোমাকে কখনো। এজন্যই তোমাকে বাড়ি এনে রেখেছি। কি বোকা ছিলাম আমি, তাইনা? মহাপুরুষ ভাবতাম তোমাদেরকে। আজ তোমরা প্রমাণ করলে মহাপুরুষ বলে আসলেই কিছু হয়না, কিচ্ছু না।”
“আপনি আমাকে অবিশ্বাস করছেন মামা?”
“অবিশ্বাস করছি না বাবা, তোমাকে আমি ঘৃণা করছি। সত্যিই করছি। আমি চাচ্ছিনা তুমি আর এক মুহুর্তও এখানে থাকো।”
আবির ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে।
“মামা আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখানে উপস্থিত সবার সামনে সেই সিদ্ধান্ত আমি জানাবো আজকে, এক্ষুনি। আশা করছি সবাই রাজি হবে।”
সবাই বেশ অবাক হয়ে আবিরের দিকে তাকায়।
উৎস ছুটে এসে আবিরকে একটা ধাক্কা দিয়ে বললো,”তোর আর কোনো সিদ্ধান্ত আমরা শুনতে চাইনা। দয়া করে এখান থেকে চলে যা তুই, আর কোনোদিন আসিস না। এটা ভাবতেই আমার লজ্জা লাগছে আমি তোকে এই বাড়িতে এনেছিলাম। এই লজ্জা আমাকে সারাটা জীবন এই মানুষটার সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে দিবে না।”
রণ এতোক্ষণ চুপ করে সবার কথা শুনছিলো। কিন্তু আবিরের নিষ্পাপ চেহারার দিকে তাকিয়ে সে আর চুপ থাকতে পারলো না। উৎসের কাছে এসে তার কাঁধে হাত রাখে রণ।
“উৎস এতোটা কঠোর হয়ো না। তোমরা সবাই সব বলেছো, এবার ওকে বলতে দাও কিছু। শোনো উৎস, বিশ্বাস আছে বলেই দুনিয়া এখনো টিকে আছে এটা মনে রেখো। যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানে প্রাণ নেই। তোমার এতোদিনের বন্ধুত্ব যার সাথে, তাকে কি এতোটুকুও বিশ্বাস করা যায়না? শোনা যায়না শেষ বারের মতো সে কি বলতে চায়?”
উৎস কোনো কথা বলেনা, বহ্নি মিষ্টি করে হেসে রণের দিকে তাকায়। রণের কথায় সবাই কিছুটা শান্ত হলেও আলেয়া মুখ বাঁকায় বার বার।
“বলো ভাই আবির, কি বলতে চাও তুমি, আমরা সবাই শুনবো।”
আবির পূর্ণ দৃষ্টি মেলে আভার দিকে তাকায়। আভা এতোক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকলেও সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে নেয় সে আবির তাকালে। অসম্ভব মায়াবী লাগছে আভাকে, ঠিক যেনো গ্রীক দেবী আফ্রোদিতি। না না, এই মেয়েকে সে কোনোভাবেই হারাতে পারবে না। দুনিয়া লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলেও না। এই মেয়ের মায়ায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গেছে সে।
“আমি আভাকে বিয়ে করতে চাই।”
“তার মানে?”
সবাই স্তম্ভিত হয়ে যায় আবিরের কথায়। আবির এতোটুকুও বিচলিত হয়না। সুঠাম দেহে দাঁড়িয়ে থাকে। আভা ঈষৎ কেঁপে ওঠে তার কথায়।
“আবির এটা মজা করার সময় না, কি বলছো তুমি?”
“আমি কোনোরকম মজা করছি না রণ ভাই, আমি যা বলছি ভেবে বলছি, পূর্ণ জ্ঞানে বলছি। আশা করছি তাতে কোনো অসুবিধা হবে না। আমার জন্য যদি ও কলঙ্কিত হয়ে থাকে তবে সেই কলঙ্কে ভরা চাঁদকে আমি পরিপূর্ণ মর্যাদা দিয়ে আমার স্ত্রী করে নিয়ে যেতে চাই। যদি কারো আপত্তি না থাকে।”
কেউ কোনো কথা বলতে পারেনা। নওশাদ কাঁপা চোখে তাকায় আবিরের দিকে। কিছু বলতে যেয়েও বলতে পারেনা সে।
আবির মৃদু হেসে শাহানার সামনে যেয়ে দাঁড়ায়। শাহানা অবিশ্বাসী চোখে তাকায় তার দিকে।
“ভয় পাবেন না মামি। আপনার রাজকন্যাকে রানী বানিয়ে রাখার মতো সামর্থ্য সৃষ্টিকর্তা বোধহয় দিয়েছেন আমাকে। হ্যা ওর বয়স কম, অনেক আইনী ঝামেলার মধ্যে পড়তে হতে পারে। তাছাড়া ও মেধাবী, সামনে ওর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। এই মুহুর্তে ওকে বিয়ের বাঁধনে জড়াতে আপনাদের আপত্তি থাকতেই পারে। ও এখনো বিয়ে, সংসার এসব বোঝে না। বোঝার কথাও না। তবে আমি ওকে সে সময়টুকু দিবো। কাগজে কলমে ও আমার বৈধ স্ত্রী হয়ে থাকবে। ও পরিপূর্ণ বয়সী না হওয়া পর্যন্ত আমি ওকে স্পর্শ পর্যন্ত করবো না, ওর সামনেও আসবো না। ওর ভরণপোষণ থেকে শুরু করে যা যা দরকার স্বামী হিসেবে সে দায়িত্ব আমি পালন করবো। এরপর ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর, ওকে সম্পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে আমার বাড়িতে নিয়ে যাবো।”
আবির কথা শেষ করে থামে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবাই যেনো একসাথে স্তম্ভিত হয়ে গেছে। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে সবাই।
উৎস আবিরের কলার চেপে ধরে ক্ষিপ্র গতিতে। রণ ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তাকে।
“উৎস এসব কি করছো তুমি তখন থেকে? এখানে বড়রা আছে, তাদের বুঝতে দাও।”
“ও কি সবকিছু ইয়ার্কি ভেবেছে নাকি? সবকিছু এতো সস্তা? আভা এতোটা সস্তা?”
আবির উৎসের চিৎকারে দমে যায়না।
“উৎস আমি যে আভাকে সস্তা মনে করিনা সে তুইও ভালোভাবেই বুঝতে পারছিস। সস্তা মনে করলে সব পাপের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে এখান থেকে কাপুরুষের মতো চলে যেতাম, পিছনে ঘুরে তাকাতাম না আর। তুই তো বলিস৷ রাজকন্যাকে রানী বানানোর জন্য বুকের পাঁটা লাগে। এখন অন্য কথা বলছিস যে?”
উৎস আবিরের কলার ছেড়ে দেয়। ধীর পায়ে হেঁটে কিছুটা দূরে যেয়ে বসে পড়ে মাটিতেই। সে কীভাবে অবিশ্বাস করবে আবিরকে? এই আবির যে তার প্রাণের বন্ধু, তার ভাই। তার বিপদে আপদে নিজের বুক পেতে দাঁড়িয়েছে সে সবসময়ই। এই মানুষটাকে যে সে অবিশ্বাস করতে পারবে না, কোনোভাবেই না।
আবির এগিয়ে এসে শাহানার মুখোমুখি দাঁড়ায়। কিছুটা ইতস্তত করে হাতটা শাহানার হাতের উপর রাখে আলতো করে। শাহানা সরিয়ে নিতে যেয়েও সরায় না কি মনে করে।
“মামি এই হাত দিয়ে আপনি আমাকে খাইয়ে দিয়েছেন, এই হাত আমার মাথার উপর রাখলে আমি মায়ের ছোঁয়া পাই। সেই হাত ধরে যদি আমি প্রতিজ্ঞা করি আপনার রাজকন্যাকে আমি রানী বানিয়ে রাখবো, তবে কি তখনো আপনি আমাকে অবিশ্বাস করবেন?”
শাহানা কিছু বলার আগেই পিছন থেকে আলেয়া চিৎকার করে বললো,”এরকম অসভ্য, বেয়াদব ছোকরা অনেক দেখেছি। বিয়ের নাটক সাজাচ্ছে এখন আবার। তোকে আমি বলে রাখলাম নওশাদ, এই নাটক করে তোদের আরো বড় ভোগান্তিতে ফেলবে ও। এরপর খোঁজও নিবে না আর তোর মেয়ের কোনোদিন।”
আলেয়া কথা শেষ করতেই আবির তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। আলেয়ার কিছুটা হকচকিয়ে যায়। এই ছেলে আমার হাসে কেনো তার দিকে তাকিয়ে? কত্তবড় বেয়াদব!
“সে চিন্তা আপনাকে করতে হবে না আলেয়া দাদী। তখন থেকে তো অনেক কিছুই দেখলেন, আমি যে ওরকম অসভ্য, বেয়াদব ছোকরা নই তার প্রমাণ কিছুক্ষণের মধ্যেই দিবো আমি। তবে হ্যা, বাইরে যেয়ে আভার নামে যে বদনামগুলো করতে চেয়েছিলেন, সেগুলো না করে আভার বিয়েটা খেয়ে তারপর যান। এরপর নাহয় আরো বেশি করে গল্প দিতে পারবেন।”
“দেখেছো কেমন বেয়াদব ছেলে….”
আবির হঠাৎ কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে পিছনে ঘুরে তাকাতেই দেখে নওশাদ দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে না আছে হাসি, না রাগ না কোনো অভিমান। কেমন নির্লিপ্ত হয়ে আছে সে।
“মামা….”
“আবির তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি এই বিয়েতে রাজি নই। আমি আমার মেয়েকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে পারবো না।”
আভা সহসাই থমকে যায় বাবার কথায়, যেটুকু আশার আলো দেখেছিলো তা-ও হয়তো নিভে গেলো। এবার যে তাকে মেরেই ফেলবে মা আর উৎস ভাই।
“কিন্তু কেনো মামা? আমি কি আপনার মেয়ের যোগ্য নই?”
“তুমি আমার মেয়ে যোগ্য কিনা তার চেয়ে বড় কথা আমার মেয়ে তোমার যোগ্য নয়। উৎসের কাছে শুনেছি তোমার বাবা অনেক বড়লোক, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। আমি যদি এই বিয়েতে রাজি হয়ে যাই, সবাই বলবে তোমাদের টাকাপয়সা, সম্পত্তির লোভে আমার এই একরত্তি মেয়েটাকে তোমার পেছনে উষ্কে দিয়েছি। সারাজীবন মানসম্মান নিয়ে বাঁচার জন্য কম লড়াই তো করলাম না। সেই মানসম্মান যদি না বাঁচে তবে আর কি হলো বলো? তুমি চিন্তা করোনা। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি, এখানে উপস্থিত সবাই দিবে চিন্তা নেই। উৎসকে বলে দিবো এ নিয়ে যেনো কোনোদিন তোমাকে কিছু না বলে। তুমি আর এ নিয়ে কথা বলোনা। চলে যাও তুমি, আর কোনোদিন এসোনা এখানে।”
আবির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে বললো,”আর যদি বলি আমি আপনার মেয়েকে ভালোবাসি, তবেও কি আপনি একই কথা বলবেন মামা?”
“আবির….”
“হ্যা মামা, আমি আভাকে ভালোবাসি। আর এটাই সত্যি। হয়তো কিছুদিন পর জানাতাম। তবে আজ এতো বড় একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর এটুকু সত্যি সবার সামনে আমাকে স্বীকার করতেই হলো।”
আভা শব্দ করে কেঁদে দেয়, শীতল যেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে। তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে ওঠে। সে এতোদিন ঠিক কথাই ধারণা করেছিলো।
উপস্থিত সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে আবিরের দিকে। কেউ কোনো কথা বলতে পারেনা।
প্রায় ঘণ্টা দুই এভাবেই যাওয়ার পর দুইটা গাড়ির শব্দ শোনা যায় বাড়ির বাইরে। আবির মুচকি হাসে। সবাই ভ্রু কুঁচকে তাকায় তার দিকে। এখন আবার কে?
নওশাদ দেখতে গেলেই রণ তাকে আটকায়। রণ আর উৎস এগিয়ে যায় গেটের দিকে। একটা প্রাইভেট গাড়ি আর একটা জীপগাড়ি এসে থেমেছে বাড়ির বাইরে। জীপগাড়ি থেকে কেউ নামলো না, শুধু প্রাইভেট গাড়ি থেকে সাদা লুঙ্গি, পাঞ্জাবি পরিহিত মাঝবয়েসী এক পুরুষ নামে। তার চোখেমুখে একরাশ রাগ, বিরক্তি।
উৎস মানুষটাকে দেখে সাথে সাথে চিনতে পারে। এ যে আবিরের বাবা, মওদুদ আহমেদ। উনি এখানে কীভাবে? আবির ডেকেছে তাকে? তাহলে জীপগাড়িতে কারা?
“চাচা আপনি?”
মওদুদ উৎসের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
“উৎস না তোমার নাম? হ্যা তাই তো, দেখেছিলাম তো একবার। তা কই, গাধাটা কই? রাতে একটু শান্তিতে ঘুমাতেও দিলো না আমাকে মাল’টা। জ্বালিয়ে মেরে ফেললো আমাকে ছোট থেকে। ভদ্রমহিলার বদলে আমি উপরে চলে গেলেই ভালো হতো। মহিলা বুঝতো একা একা এমন একটা গাধা মানুষ করার কষ্ট কি।”
উৎসকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মওদুদ ভিতরে চলে যায়। উৎস হতবাক হয়ে যায়। কোনো বাবা তার ছেলেকে ‘মাল’ বলে সম্বোধন করতে পারে তার জানা ছিলোনা। মানুষটা মজার তো বেশ! উৎস আর রণ তার পিছন পিছন বাড়ির ভিতরে ঢোকে।
“কই কই, গাধাটা কই? আজ ওকে গুলি করে মারবো আমি, হারামজাদা। আমার এতো শখের ঘুমটা ভাঙিয়ে কিনা বলে আমি বিয়ে করবো। কত্তবড় বেয়াদব একবার ভাবেন সবাই। বিয়ে করলে কর তুই, আমার ঘুম ভাঙ্গাবি কেনো?”
নওশাদ সহ সবাই ভীষণ অবাক হয়ে গেলেও আবির অবাক হয়না। সে শান্ত চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে।
“এইতো আমার সুন্দর, স্বাস্থ্যবান, নাদুসনুদুস হারামজাদাটা। এখন চুপ করে আছিস কেনো এভাবে? বল কোন মেয়েকে বিয়ে করতে চাস? আমিও একটু দেখি পৃথিবীতে কোন মেয়ের রুচি এতো জঘন্য যে তোর মতো একটা অপদার্থ, গাধা, মিচকা শয়তানকে বিয়ে করতে চায়? দুনিয়ায় কি ছেলে পায়নি? এমন বিশ্রী রুচির কোনো মেয়েকে পুত্রবধূ করতে হবে ভেবেই কান্না পাচ্ছে আমার। কি ম্যাডাম আপনার কান্না পাচ্ছে না?”
মওদুদ সায়েরার দিকে তাকাতেই সায়েরা ঝাঁঝিয়ে উঠে বললো,”জ্বি না, পাচ্ছে না।”
“কি জানি কেমন মানুষ আপনারা। তা কই সেই মহান বালিকাকে দেখছি না কেনো? কই সে?”
আবির ইশারা করে আভার দিকে। আভা আর শীতল পাশাপাশি-ই দাঁড়িয়ে ছিলো।
মওদুদ প্রথমে ভাবে শীতল বুঝি।
“এই মেয়ে তুমি? তোমার রুচি এতো খারাপ?”
শীতল তড়িঘড়ি করে ভয়ে ভয়ে বললো,”না না আমি না আমি না, এই যে ও, আমার বোন আভা।”
মওদুদ আভার দিকে তাকাতেই কিছুটা শান্ত হয়ে যায়৷ মেয়ে কোথায়? এ যে সাক্ষাৎ পরী দাঁড়িয়ে তার সামনে। এমন মিষ্টি পরীকে তার গাধাটা কীভাবে পটালো এটাই মাথায় আসছে না তার।
“মা জননী তুমি আভা? তোমার রুচি কিনা এতো খারাপ?”
আভা কি মনে করে ফিক করে হেসে দেয়। কেনো যেনো ভীষণ মজা লাগছে তার মানুষটাকে। কিন্তু পরক্ষণেই বাবার দিকে তাকিয়ে হাসি মুছে ফেলে সে। নওশাদ ভীষণ শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“এই আমার মা জননীর গাল লাল কেনো? কে মেরেছে তাকে? হু হ্যাজ বিটেন হার? চাবকে সিধে করে দিবো তাকে।”
পরিস্থিতি সামলাতে আবির বাবার কাছে যেয়ে ফিসফিস করে বললো,”বেশি কথা বলোনা তো। যা বলতে ডেকেছি তাই বলো।”
“তুই চুপ কর গাধা। আমার ঘুম ভাঙানোর অপরাধে তোর শাস্তি পেতে হবে।”
“আবার কি শাস্তি?”
মওদুর কিছুক্ষণ ভেবে বললো,”বর না সেজেই বিয়ে করতে হবে তোকে।”
আবির চোখ বড় বড় করে বললো,”মানে বিয়েতে তুমি রাজি? সত্যি?”
“তোর মতো একতা গাধাকে যে এমন পরীর মতো একটা মেয়ে বিয়ে করতে চেয়েছে এটাই আমার জন্য অনেক। এবার আমার বেয়াই-বেয়াইন রাজি হলেই হয়। কই তারা? আলাপ করা গাধা।”
“বাবা বারবার গাধা গাধা করোনা, প্লিজ।”
“চুপ থাক, গাধা।”
আবির মুখ ভোঁতা করে দাঁড়ায়।
নওশাদ এতোক্ষণ চুপ করেই ছিলো। হঠাৎ সে মওদুদের মুখোমুখি দাঁড়ায়। তার কেনো যেনো ভীষণ চেনা চেনা লাগে এই মুখটাকে, কোথায় যেনো দেখেছে….
“আপনি?”
“আমি আভার বাবা, নওশাদ উদ্দিন খাঁ। আমার বাড়িতে প্রথমবারের মতো এসেছেন আপনি। বিশ্রাম করুন, খাওয়াদাওয়া করুন। এরপর ছেলেকে নিয়ে চলে যান। অনেক পাগলামি হয়েছে, আমি এখন ক্লান্ত।”
মওদুদ দুই হাত বুকে বেঁধে নওশাদের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললো,”এতো তাড়াতাড়ি তো আমি এখান থেকে যাবো না নওশাদ উদ্দিন খাঁ। তাও আবার খালি হাতে। এসেছি যখন, তোমার মেয়েটাকে নিয়েই ফিরবো নশু।”
নওশাদ চমকে উঠে তাকায় মওদুদের দিকে। এই নামে তো একজনই ডাকতো তাকে। কে এই মওদুদ?
(চলবে…..)