মাতাল প্রেমসন্ধি পর্ব-৩৮+৩৯

0
36

#মাতাল_প্রেমসন্ধি

পর্ব: ৩৮

“নশু? আপনি আমাকে নশু নামে ডাকছেন কেনো?”
মওদুদ হালকা হেসে বললো,”কেনো? আপনাকে কেউ নশু নামে ডাকতো না বুঝি?”
নওশাদ ঢোপ চেপে বললো,”হ্যা ডাকতো, আমার খুব কাছের একজন। যাকে আমি অসম্ভব কষ্ট দিয়েছি এক সময়। ক্ষমা চাওয়ার জন্য বারংবার খুঁজেছি তাকে। কিন্তু কোথাও তাকে কোনোদিন খুঁজে পাইনি। নিজের মধ্যে নিজেই ঘৃণায় কুঁকড়ে যেতাম তার কথা মনে পড়লে। কীভাবে পারলাম আমি এতো ঘৃণ্য একটা কাজ করতে তার সাথে?”
মওদুদ ঠোঁট কামড়ে হাসে। উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে দুইজনকে দেখছে, কারো মুখে কোনো কথা নেই। কি হচ্ছে এসব?

“তা কে সে মশাই? কাকে খুঁজছেন আপনি এতো?”
“মধু, আমার মধুকে। এক মিনিট……”
নওশাদ চিৎকার করে ওঠে সাথে সাথে। মওদুদ শান্ত চোখে তাকায় তার দিকে। সে জানতো নওশাদ অবাক হবে, ভীষণ ভাবে অবাক হবে। আর তাকে এই অবাকটুকু করে দেওয়ার ইচ্ছা মওদুদের অনেকদিনের।

নওশাদের কণ্ঠ কাঁপছে, কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে তার। বহ্নি বাবার কাছে এসে তার হাত ধরে শক্ত করে।
“বাবা তুমি ঠিক আছো?”
নওশাদ উত্তর দেয়না, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে সে মওদুদের দিকে।

“বাবা তুমি কি এই চাচাজানকে চিনো কোনোভাবে? আবিরের বাবাকে তুমি কীভাবে চিনবে?”
মওদুদ বহ্নির হাত ধরে নিজের কাছে টেনে আনে। বহ্নির মাথায় হাত রাখে। মিষ্টি জর্দার একটা সুন্দর ঘ্রাণ বহ্নির মনটা ভালো করে দেয়। তার অদ্ভুত একটা স্বভাব আছে ছোট থেকে। সে ভালোমানুষের ঘ্রাণ পায়। যারা অসম্ভব ভালো মানুষ, তাদের শরীর থেকে অদ্ভুত মিষ্টি একটা ঘ্রাণ আসে। তার বাবার শরীর থেকে আসে, রণের শরীর থেকে আসে আর এই মানুষটার…..

“মা গো, তুমি বুঝি নশুর বড় মেয়ে?”
বহ্নি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে যায়। তার বাবাকে নশু ডাকছে কেনো এই মানুষটা? তবে যাই হোক, সফেদ পাঞ্জাবি, সাদা লুঙ্গি পরা, ঠোঁট চুইয়ে যার পানের রস পড়ছে, ফর্সা গালে মুক্তো দানার মতো ঘাম চকচক করছে এই মানুষটাকে ভীষণ ভালো লাগে তার।

“অনেক শুনেছি তোমাদের কথা। তোমরা তোমাদের বাবার, আমার এই নশু পাগলাটার তিন রাজকন্যা। সামনাসামনি না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না, তোমরা আসলেই রাজকন্যা গো মা।”
“কিন্তু আপনি…..”
“মা রে, সবাই ভাবে আমি আমার ছেলের কোনো খোঁজ রাখিনা। টাকাপয়সা পাঠিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হই। সবার দোষ দিয়ে কি হবে? আমার এই স্বাস্থ্যবান, নাদুসনুদুস গাধাটাও তাই মনে করে। কিন্তু গাধাটা এটা জানেনা যে বাপ হওয়া এতো সহজ কাজ না। বাপ হওয়ার আগে যেমন কষ্ট করতে হয়, বাপ হওয়ার পরেও তেমন কষ্ট করতে হয়।”
মওদুদের কথায় সবাই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি হয় স্বয়ং আবির।

“আহ বাবা, দয়া করে তোমার মুখটা সামলাও। হচ্ছে কি এসব?”
“তুই জাস্ট চুপ কর। তোর কথা শুনলে আমার শরীর ঘিনঘিন করছে। মনে হচ্ছে একটা সাদা তেলাপোকা শরীরের উপর কিলবিল করছে। তাই না ম্যাডাম বলুন?”
মওদুদ আবার তাকায় সায়েরার দিকে, সায়েরা অগ্নিদৃষ্টি ফেলে তার দিকে। আবির ভোঁতা মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।

“এই বলদের বাচ্চাটা কই যায় না যায় সবই আমি জানি। আজকাল আবার রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছে তা-ও জানি। কিছু বলিনা শুধু এই উৎসের জন্য। আমি জানি উৎস যতদিন আছে আমার ছেলেকে নিয়ে ভয় নেই। এই বেটা আসলেই একটা মাল।”
উৎস অবাক হয়ে আবিরের দিকে তাকায়। আবির লজ্জায় কারো দিকে তাকাতে পারছে না। সেই স্কুল জীবন থেকে বাবাকে কোথাও নিয়ে যেতে পারেনা সে। কোনো গার্ডিয়ান মিটিং-এও না। একবার স্কুলের এক ম্যাডামকে বলেছিলো, ‘ম্যাডাম আপনার নাকের নিচে হালকা গোঁফ আছে। আপনি কি আমার বউ হবেন?’
মানে কিসের সাথে কি! কোনো যুক্তি আছে কথার? পরে আবিরকে স্কুল পাল্টাতে হয়েছিলো। তবে ও-ই শেষ। এরপর বাবাকে নিয়ে আর কোথাও সে যায়নি। তার বাবাও ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছে। দূরত্ব তৈরি হয়েছে বাপ-বেটার।
আবির বিড়বিড় করে শুধু বললো,”হে ধরণী, তুমি ফাঁকা হয়ে যাও আমি ভিতরে ঢুকে যাই।”

“তা যা বলছিলাম, আবির যখন এ বাড়িয়ে যাতায়াত শুরু করলো তখনই আমি খোঁজ নিয়েছিলাম। পরে যখন দেখলাম….”
মওদুদ কথা শেষ না করে নওশাদের কাছে এগিয়ে আসে। নওশাদ এতোক্ষণ শ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিলো। তবে কি সে যা ভাবছে তাই? তা কীভাবে সম্ভব?

“নশু এখনো কি আমাকে চিনতে পারছিস না তুই?”
নওশাদ হতভম্ব হয়ে বললো,”মধু?”
মওদুদের মুখে চওড়া হাসি ফুটে ওঠে।

“যাক বেটা চিনতে পেরেছিস। আমি তো ভেবেছিলাম সুন্দরী বউ পেয়ে স্মৃতিশক্তি গেছে বুঝি তোর। ভাবী স্লামালাইকুম, ভালো আছেন?”
শাহানা অপ্রস্তুত হয়ে সায়েরার হাত ধরে। এটা আবার কে? তার স্বামী কীভাবে চিনে এই চিজকে?

নওশাদ আচমকা মওদুদকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। সবাই হতভম্ব হয়ে তাকায় তাদের দিকে। আবির তাকায় আভার দিকে আভাও আবিরের দিকে। এসব কি হচ্ছে আজ রাতে? শুধু আলেয়ার মুখটা হাঁ হয়ে যায়। কি ভেবেছিলো সে আর কি হচ্ছে? এমনটা তো হওয়ার কথা ছিলোনা।

“মধু তুই এতোদিন কোথায় ছিলি? জানিস আমি তোকে কতো খুঁজেছি? পাগলের মতো খুঁজেছি। কোথাও পাইনি। অপরাধবোধে জর্জরিত হয়েছি আমি। মনে হয়েছিলো আমি তোর জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছি। কতো রাত যে তোর কথা ভেবে কাটিয়েছি ঠিক নেই। সত্যি তুই আমার সেই মধু?”
মওদুদ চোখ মুছে একগাল হেসে বললো,”না আমি তোর মধু নই, আমি যদু। এখন এই যদুর ছেলে কদুর সাথে তোর মেয়ের বিয়ে হবে। তুই না বললেও আমি শুনবো না। মেয়ে আমার পছন্দ হয়েছে। তুই বারণ করলে তুলে নিয়ে যাবো। আমার ছোটখাটো একটা রাজপ্রাসাদ আছে। ওখানে রানী বানিয়ে রাখবো। বহু বছর রানী ছাড়া রয়েছে রাজ্য। আর কতোদিন?”
নওশাদের কান্না থামে না। কান্নার মধ্যে কি কি বুএ যায় বোঝা যায়না।
আভা শব্দ করে কেঁদে দেয়। তার দুই বোন যেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে। বাকি কারো মুখে কোনো কথা নেই। এতোটা অবাক এই জনমে তারা হয়নি বোধহয়। সবচেয়ে অবাক আবির।

আবির বাবার কাছে এসে ফিসফিস করে বললো,”বাবা তুমি নওশাদ মামাকে কীভাবে চিনো?”
মওদুদ বিরক্ত হয়ে বললো,”তোকে আমি শুধু শুধু গাধা বলি? শ্বশুর আব্বা বল হারামজাদা। মামা আবার কি?”
“বাবা গালাগালি করছো কেনো? তাছাড়া শ্বশুর তো এখনো হয়নি। এখনই কেনো ডাকবো? হয় কি না হয়…”
“না হয় মানে? তোর বাপ আসছে না এখন? মেয়ে তো বিয়ে করবেই, দরকার হয় মেয়ের দাদীও করবে। এইযে খালাম্মা করবেন না বিয়ে?”
আলেয়া চিৎকার করে বললো,”এ কি সৃষ্টিছাড়া কথাবার্তা? নওশাদ, তুই এই অসভ্যটাকে এক্ষুনি বাড়ি থেকে বের করে দে। যেমন অসভ্য বাপ তেমন ছেলে। আম গাছে তো আমই হবে, জাম হবে না।”

মওদুদ ঠোঁট কামড়ে হেসে আলেয়ার দিকে এগিয়ে যায়, আলেয়া মুখ ঝামটা দিয়ে ঘরে চলে যায়। এসব নোংরামি সে আর দেখতে পারছে না। এরচেয়ে বুঝি মরণও ভালো!

উৎস এতোক্ষণ চুপ করে ছিলো, কাহিনী দেখছিলো শুধু। এতোক্ষণ পর কিছুটা ইতস্তত করে এগিয়ে আসে মামার দিকে। নওশাদ নিজেও হতবাক।

“মামা দয়া করে বলবেন কি হচ্ছে এসব? আপনি উনাকে চিনেন? কীভাবে চিনেন?”
নওশাদ কিছু বলার আগে মওদুদ এগিয়ে আসে, কাঁধে হাত রাখে উৎসের।

“উৎস বাবা, তোমরা নিজেদের বড় খেলোয়াড় মনে করো। কিন্তু কি জানো, আমরা তোমাদের চেয়ে আরাও অনেক বড় খেলোয়াড়। ব্যাপারটা বুদ্ধির না অভিজ্ঞতার। আমি অনেক আগে থেকে জানি তুমি কে, কি তোমার পরিচয়। একটা ছেলে আমার, সে কার সাথে মিশছে, কই যাচ্ছে এটা জানা আমার কর্তব্য ছিলো, আমি সেই কর্তব্য পালন করেছি। গাধাটা ভাবতো তার বাপ তার খোঁজ নেয়না। এই সুযোগে সে পাখনা মেলেছিলো। আমি খোঁজ নিয়ে যখন জানতে পারি তুমি আর কেউ না, আমার কৈশোরের বন্ধু নশু মানে নওশাদের ভাগ্নে তখন আমি প্রথমে ভীষণ অবাক হয়েছি। এই বেটা আমাকে যেমন খুঁজেছে, আমিও এটাকে খুঁজেছি অনেক। এভাবে পেয়ে যাবো ভাবিনি। বাস্তব জীবন আসলে নাটকের চেয়েও অধিক নাটকীয়। আমি অপেক্ষায় ছিলাম একটা মোক্ষম সময়ের তার মুখোমুখি হওয়ার। কিন্তু সেইটা যে এভাবে হবে, কোনোদিন ভাবিনি। আজ নাকি এটাকে আমার বেয়াই বানাতে হবে ভাবা যায়?”
উৎস অবাক হয়ে এদিক ওদিক তাকায়।

“কিন্তু মামা যে বলছে কি এক অপরাধবোধ জেঁকে ধরেছে তাকে। আর আপনারা যদি এতো ভালো বন্ধু হন তবে এতোদিন কেনো কোনো যোগাযোগ ছিলো না আপনাদের?”
“কি রে নশু তুই বলবি নাকি আমি বলবো?”
নওশাদ মাথা নিচু করে বললো,”তুই বল।”

“বেশ বলছি তবে। শোনো উৎস তোমার মামা আমার জান ছিলো, জানের দোস্ত বলে যাকে। আমরা তখন কলেজে আর তোমার মা, সায়েরা পঞ্চম শ্রেণীতে। একদিন সে স্কুলে যাওয়ার সময় তাকে দেখি, পছন্দ হয়ে যায়।”
সায়েরা বিস্ফারিত চোখে তাকায় মওদুদের দিকে। মওদুদ নির্লিপ্ত। উৎসের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
আবির লজ্জায় মাথা তুলতে পারেনা। বাবার জন্য আজীবন তাকে লজ্জা পেতে হবে মনে হচ্ছে।

“সেসব বহু পুরোনো কথা, এসব নিয়ে লজ্জায় পড়ার কিছু নেই। পিচ্চি মেয়েকে দেখে পছন্দ করেছি আমি, লজ্জায় পড়লে আমার পড়ার কথা। তোরা পড়ছিস কেনো? তো যাই হোক, নশুকে জানাই আমি এ কথা। সে রেগে আগুন। আমাকে এই মারে কি সেই মারে অবস্থা। বন্ধুত্বে ভাটা পড়লো। আমি চেষ্টা করেছি ক্ষমা চাইতে, বেটা আমারে ক্ষমা করবেই না। এ কি জ্বালা! ভালো লাগতে পারেনা কাউরে? এরপর দিন যাইতে থাকে। আমাদের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা এগিয়ে আসে। আমার আর নশুর সিট পরপর। বেটা আজীবন পড়াশোনায় ভালো, আমি ডাব্বা খাওয়া মাল। সারাজীবন নকল করে পাশ করছি। তো পরীক্ষার আগের দিন আমি একটা ভয়াবহ কাজ করে ফেলি। সায়েরার জন্য একটা চিঠি লিখে ফেলি। প্রেমপত্র যাকে বলো তোমরা। পড়বি না পড়বি সেই চিঠি পড়ে এই নশুর কাছে। নশু রেগে আমাকে মারে, আমি কিছু মনে করিনা। কিন্তু পরের দিন পরীক্ষার সময় আমি বুঝতে পারি আসলেই বেটা ভীষণ রেগে গেছে আমার উপর।”
মওদুদ থামে, নওশাদ মাথা নিচু করে বললো,”এগুলো আর না বললে হয়না? আমার সন্তানদের সামনে আমার মাথানিচু হয়ে যাবে আজীবনের জন্য। যে পাপ আমি করেছি….”

“তুই কোনো পাপ করিস নি, তুই ঠিক করেছিস। আমি ভুল ছিলাম শাস্তি পেয়েছি।”
শীতল ক্ষীণ গলায় বললো,”কি করেছিলো বাবা আপনার সাথে চাচা?”
মওদুদ হেসে শীতলের মাথায় হাত রাখে।

“ভাই তোর ঘরে দেখি তিনটা হীরার টুকরো জন্মেছে রে। এমন সুন্দর তিনটা পুতুল পয়দা দিলি কীভাবে? আমার এখন আফসোস হচ্ছে। আমার তিনটা ছেলে নেই কেনো?”
রণ আর উৎস অস্বস্তিতে নড়েচড়ে দাঁড়ায়।

“হ্যা মা শোন কি করেছিলো তোর বাপ! প্রশ্ন হাতে পেয়ে তো আমার মাথায় হাত। একটা অক্ষর বুঝিনা, পারিনা। পড়লে তো পারবো। ওদিকে দেখি তোর বাপ ধুমচে লিখছে। বেটা তো আমাকে কিছু দেখাবে না, রেগে আছে। অগত্যা নকল বের করে লেখা শুরু করলাম। বেশ অনেকক্ষণ লিখছিলাম। কিন্তু হঠাৎ দেখি স্যার ধরে ফেলেছে। আমি তো অবাক। আমি ছিলাম নকলের মাস্টার। আমি ধরা খাইনি কোনোদিন। আজ কীভাবে কি? পরে দেখলাম এই মহৎ বজ্জাতটা আমাকে ধরিয়ে দিয়েছে স্যারের কাছে। বোঝো ঠেলা….”

বহ্নি আর শীতল একসাথে চিৎকার করে বললো,”বাবা…..?”
নওশাদ লজ্জায় কুঁকড়ে যায়।

“থাক থাক তোরা আর তোদের বাপকে এ নিয়ে কিছু বলিস না। ওর জায়গায় যে কেউ থাকলেই তা করতো হয়তো। আমাকে এক্সপেলড করা হলো, আমি আর পরীক্ষা দিতে পারলাম না।”
নওশাদ মওদুদের হাত চেপে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে দেয়।

“আমি সেদিন অনেক বড় একটা পাপ করে ফেলেছি মধু। আমাকে তুই ক্ষমা করে দে। শুধু তোর ক্ষমাটুকু পাওয়ার জন্য আমি তোকে হন্যে হয়ে খুঁজছি। কোথাও পাইনি।”
“ধুর বেটা! সেদিন তুই যা করেছিস তাতে আমার শাপে বড় হয়েছে। পড়াশোনার উপর মন উঠে গিয়েছিলো। ব্যবসায় মন দিলাম। ভাগ্য আমার সহায় ছিলো হয়তো। কোনোদিন আর পিছনে ঘুরে তাকাতে হয়নি। শুধু লাভ আর লাভ। বিশ্বাস করবি না আজ আমার আটটা ব্যবসা, আঠারোটা দোকান, তিনটা বাড়ি, দু’টো গাড়ি। প্রচুর লোক রেখেছি। হারামজাদাকে বললাম, ব্যবসা দেখ। বেটা বললো পড়াশোনা করবে, বিদ্বান হবে। কি আর করা! একমাত্র ছেলে, তার উপর মা মরা। কোনোদিন কিছুতে না করতে পারিনি। যা মন চায় কর। আমারে শান্তি দে। শান্তি তো বেটা দিলোই না, উলটে প্রেম করে আমার শান্তির ঘুমটা নষ্ট করলো। কিছুর অভাব নেই, শুধু আমার মহলে একটা রানীর অভাব। হারামজাদাটা সেই ব্যবস্থা করে দিলো, আমার আর চিন্তা নেই।”

মওদুদ থামে। সবাই খেয়াল করলো তাদের চোখে পানি। অদ্ভুত, এতো কান্নার কি হয়েছে? সবাই কেনো কাঁদছে? কান্না কি সংক্রামক নাকি?

“নশু, আমার নওশাদ বন্ধু। তুই আমার কাছে ক্ষমা চাস না? আমি তোকে ক্ষমা করবো একটা শর্তে।”
নওশাদ ঠান্ডা গলায় বললো,”বল কি চাস তুই। আজ তুই যা চাবি তোকে তাই দিবো। তবুও আমাকে ক্ষমা কর তুই।”
“ভেবে বল নশু, মানুষের কথা আর বন্ধুকের গুলি খুব ভয়ানক। একবার বেরিয়ে গেলে তা আর ফেরত নেওয়া যায়না।”
“আমি প্রস্তুত, বল তুই কি চাস?”
মওদুদ আভার দিকে এক পলক তাকায়। মেয়েটা কেমন ঝড়ে পড়া পাখির মতো কেঁপে কেঁপে উঠছে। বেচারী নিজেও ভাবতে পারেনি বোধহয় এমন কিছু হবে। আহা রে, মেয়েটাকে দেখতে হুবহু আবিরের মায়ের মতো লাগছে কেনো? মনে হচ্ছে এতো বছর পরে বুঝি রেশমা আভার রূপ ধরে এসেছে আবার। পার্থক্য একটাই, রেশমা এসেছিলো তার প্রেয়সী হয়ে আর আভা আসবে তার গাধা ছেলেটার প্রেয়সী হয়ে। প্রকৃতি কি অদ্ভুত, তাইনা?

“তোর মেয়েটাকে দে আমারে। আমার এই বদমাশটার বউ করে নিয়ে যাই। বিশ্বাস কর, এই বেয়াদবটা বলদ হলেও মানুষ ভালো। আমি মানুষটা খারাপ হতে পারি কিন্তু আমার ছেলেটা ভালো। ওর মায়ের মতো হয়েছে। মহিলা বেশি ভালো ছিলো, অসহ্য রকম ভালো। ছেলেটাও হয়েছে ওরকম। এতো ভালো বিরক্ত লাগে আমার। কি করবো, বিরক্ত লাগলেও গাধাটা তো আমারই ছেলে। ও যদি একটা পুতুল কিনতে চাইতো আমি যতো দাম হোক তা বাজার থেকে কিনে ওকে দিতাম। কিন্তু ও যে তা চায়নি, ও যে রাজকন্যা চেয়ে বসেছে। আমার যতো টাকাই থাকুক না কেনো, রাজা যদি তার রাজকন্যাকে আমার হাতে তুলে না দেয় আমার যে ক্ষমতা নেই তাকে নিয়ে যাওয়ার। তাই হাতজোড় করে তোর কাছে মেয়েটাকে ভিক্ষা চাচ্ছি। বিশ্বাস কর ওর চোখে একবিন্দু পানি আনার অপরাধে আমি আমার ছেলেকে শূলে চড়াতে দুইবার ভাববো না।”
নওশাদ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কি বলবে বুঝে উঠতে পারেনা। শাহানার দিকে তাকায় বাঁকা চোখে। শাহানাও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আবিরকে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তার বাবাকে নিয়েও থাকার প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু এ যে একদমই অদ্ভুত ঘটনা, এভাবে কি হয়?

“মধু আমার মেয়েটা যে অনেক ছোট। ও এসব কিছুই বোঝেনা। ভুল একটা করে ফেলেছে, কিন্তু তাই বলে এখন বিয়ে…..”
“ওকে কিছু বুঝতে হবে না। ওকে আমি জোর করে আমার বাড়িতে নিয়েও যাবোনা। ও এখানে যেমন আছে তেমন থাকবে। শুধু একটাই পার্থক্য, এতোদিন এখানে শুধু তোর মেয়ে হয়ে ছিলো, এখন তার পাশাপাশি আমার মেয়ে হয়েও থাকবে। যখন ইচ্ছা আমার বাড়িতে যাবে, ধুর আমার বাড়ি বলছি কেনো? ওর নিজের বাড়িতে যাবে। আবার মন চাইলে এখানে চলে আসবে। এখানেও বাড়ি করার ইচ্ছা আছে আরেকটা। ওটাতে গাধাটা আমার পরীটাকে নিয়ে থাকবে। আমি তখন নিশ্চিন্তে আমার রেশমার কাছে চলে যেতে পারবো।”
নওশাদ কম্পিত গলায় বললো,”এসব বলছিস কেনো? তাছাড়া এতো ব্যস্ততার বা কি আছে?”
মওদুদ তাকায় আবিরের দিকে, আবির নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। সে দিব্বি বুঝতে পারছে তার গাধাটার চোখে পানি। একদম মায়ের মতো নরম মনের হয়েছে গাধাটা, খালি কাঁদে।

“কি বলবো বল, রেশমা আমাকে বেশিদিন সময় দিলো না। বললো যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ছেলের একটা গতি করে আমার কাছে চলে এসো। বছর দুই আগে ধরা পড়লো মরণঘাতী ক্যান্সার, লিভারে। আস্তে আস্তে পুরো পেটেই নাকি ছড়িয়ে পড়ছে বদখত রোগটা। বিদেশ গেলাম, চিকিৎসা করালাম। লাভ নাই নাকি! আমার এসব ঝামেলা ভালোও লাগেনা। মরে গেলে সমস্যা কি? শুধু এই গাধাটার জন্য মরতে ভয় পেতাম এতোদিন। কিন্তু না, আজ আর ভয় নেই। আমার মনে হচ্ছে আভা ওকে ওভাবেই আগলে রাখবে যেভাবে রেশমা বেঁচে থাকলে রাখতো।”
স্তম্ভিত হয়ে যায় উপস্থিত সবাই। এমন কিছু শুনতে হবে তারা ভাবেনি কোনোদিন। তিন বোন হাপুস নয়নে কাঁদছে। বাকি নেই শাহানা, সায়েরা, নওশাদ। শুধু উৎস আর রণ ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে।

“মধু….”
“বেশি বকিস না তো। এখন আবার প্যানপ্যানানি শুরু করিস না। যাই হোক, আমি বরযাত্রী সাথে নিয়েই এসেছি, জীপে বসে আছে। আমার বউমাকে আমি একত্রিশ ভরি গহনা দিয়ে নিয়ে যাবো, আনার ব্যবস্থা করবো তুই রাজি হলে। বাদবাকি যা চিন্তা সব আমার।”
নওশাদ কি বলবে ভেবে পায়না, শাহানাও তাই।
মওদুদ এগিয়ে যায় আভার কাছে। আভার চোখে পানি। মওদুদ কোমল হাতে মুছে দেয় পানিটুকু।

“মুক্তোদানা গুলো যত্ন করে তুলে রাখ মা, এভাবে ফেলে দিস না চোখ থেকে। আমি না থাকলে পারবি না আমার এই গাধাটাকে ভালো রাখতে?”
আভা উত্তর দেয়না, তার কেমন ভয় করছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে তাকে কখনো পড়তে হবে সে ভাবতে পারেনি।

“রাজি হয়ে যা মা। যদি রাজি হোস তাহলে জানবি পৃথিবীর সেরা তৃতীয় পুরুষকে স্বামী হিসেবে পেয়েছিস। প্রথম হলো তোর বাবা, দ্বিতীয় হলো উৎস। উৎসের মতো ছেলে যে মেয়ে পাবে সে-ও পৃথিবীর সেরা ভাগ্যবতীর একজন, আমি জানি। আমার নিজের ছেলের আগে আমি তাকে স্থান দিয়েছি।”
শীতল আড়চোখে তাকায় উৎসের দিকে। উৎস এখনো সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কোনোদিকে দৃষ্টি নেই তার।

“আমি আজ আছি কাল নেই, এই জীবনের কোনো গ্যারান্টিও নেই। চেয়েছিলাম আমার ছেলেটাকে একটা ঠান্ডা ছায়ায় আশ্রয় দিতে। সেই সুযোগ কি আমাকে দেওয়া যায়না? আমি মরে শান্তি পেতাম।”

আভা ভীত চোখে মায়ের দিকে তাকায়। শাহানা নির্লিপ্ত চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বোঝে মেয়ে কি চায়। শাহানা ধীর পায়ে হেঁটে আবিরের সামনে যেয়ে দাঁড়ায়। আবির কিছুটা ইতস্তত করে তার দিকে তাকাতে।

“আমার দিকে তাকাও আবির, পুরুষ মানুষকে মাথা নিচু অবস্থায় মানায় না। তাদের মাথা থাকবে সমুন্নত, পর্বতের মতো।”
“বলুন মামি, শুনছি।”
শাহানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”তুমি কি আভাকে ভালোবাসো? সোজাসাপটা বলো, সত্য বলো।”
আবির একবার তাকায় আভার দিকে আরেকবার নিজের বাবার দিকে।

“হ্যা বাসি, ভালোবাসা বলতে কার কাছে কি সংজ্ঞা আমি জানিনা। আমার কাছে ভালোবাসার সংজ্ঞা মানে শান্তি, স্বস্তি। যার কাছে স্বস্তি মেলে তার কাছে আশ্রয় চাওয়া। আমি আভার কাছে সেই স্বস্তিটুকু পাই। তাই আমার সারাজীবনের আশ্রয়টুকু চাই। বাকিটা আভা যা চাইবে…”
শাহানা মৃদু হেসে বললো,”যাকে ভালোবাসো তার মনের খবরই রাখো না?”

“মানে?”
“মানে আবার কি? কিছু না।”

শাহানা আর কথা না বাড়িয়ে নওশাদের কাছে এসে দাঁড়ায়। নওশাদের ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। সে আর কিছু নিতে পারছে না।

“বহ্নির বাবা।”
“বলো শাহানা।”
“তুমি বিয়ের ব্যবস্থা করো, ওদের আপত্তি না থাকলে নতুন দিনের আলো ফুটলেই আমার আভার বিয়ে, আবিরের সাথে।”
“কি বলছো? শীতলের আগেই?”
শাহানা চোখ বুলায় একবার শীতলের দিকে পরক্ষণে উৎসের দিকে। শীতল ঢোক চাপে।

শাহানা এরপর সায়েরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো,”আমার শীতলকে নিয়ে ভেবো না বহ্নির বাবা। আমার শীতলের জন্য মহাপুরুষ আছে, তুমি না বলো মহাপুরুষ আছে? হ্যা আছে, মহাপুরুষ সত্যিই আছে।”
নওশাদ কিছু একটা বুঝতে পারে। তাকায় একবার মওদুদের দিকে। সে নওশাদের উত্তরের অপেক্ষাতেই আছে।

“শাহানা।”
“বলো।”
“বাজারের লিস্ট করো, উৎসকে নিয়ে সকালেই বাজারে যেতে হবে।”
বহ্নি আর শীতল চিৎকার করে ওঠে আভাকে জড়িয়ে ধরে। আবির কাঁপা কাঁপা পায়ে বসে পড়ে মাটিতে। দুই পা ছড়িয়ে দেয়। সায়েরা শাহানাকে ধরে কেঁদে দেয়। মওদুদের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে, অন্তরটা ভরে যায় প্রশান্তিতে সহসাই।

নওশাদ আস্তে আস্তে হেঁটে আভার পাশে দাঁড়ায়। আভা লজ্জায় মিইয়ে আছে যেনো। নওশাদ আভার মাথায় হাত রাখতেই আভা ঈষৎ কেঁপে ওঠে।

“পরকাল আছে কিন্তু পরজন্ম বলে কিছু হয়না, যদি হতো তবে আমি চাইতাম আমি তোর ছেলে হয়ে জন্মাই যেনো। সন্তানের গায়ে আঘাত লাগার কষ্ট তুই বুঝতে পারতিস। ক্ষমা করে দিস না। তোর শরীরের ক্ষত শুকিয়ে গেলেও আমার মনের ক্ষত শুকাবে না। আমার সামনে আমার মা টা আঘাত পেয়েছে, আমি বাবা হয়ে চুপচাপ দেখেছি। এই যন্ত্রণা আমাকে আজীবন কষ্ট দিবে।”
নওশাদ শব্দ করে কাঁদে, আভা জড়িয়ে ধরে বাবাকে। বাতাস ভারী হয়ে ওঠে ‘খাঁ’ বাড়ির।

কিছুক্ষণ পর ফজরের আজান কানে আসে। আজানের সুর যেনো সব কষ্টকে ধুয়েমুছে দেয় ওদের। খাঁ বাড়ির আঙিনা জুড়ে আনন্দ কলকল করে ওঠে। এ কি নির্মল শান্তি উঠোনজুড়ে? এ শান্তির উৎস কোথায়?

“উৎস ভাই…”
উৎস পিছনে ঘুরে দেখে শীতল দাঁড়িয়ে আছে। নিজের ঘরে বিশ্রাম করছিলো উৎস। রাতে অনেকটা ধকল গেছে সবার আরো বড় ধকল অপেক্ষা করছে সামনে। তাই সবাই একটু বিশ্রাম নিচ্ছে।

“শীতল তুমি এতো সকালে? ঘুমাও নি?”
শীতলের নির্ঘুম চোখটা দেখে হঠাৎ বুকে ধাক্কা লাগে উৎসের। বিভিন্ন ব্যস্ততায়, ঝামেলায় বেশ কিছু দিন যাবৎ মেয়েটার দিকে ঠিকমতো খেয়াল করছে না সে। শীতলের পরীক্ষা সামনেই, আর বেশি দেরি নেই। ওকে এমন কেনো লাগছে? ও কি নিজের যত্ন নিচ্ছে না?

উৎস বিছানা থেকে উঠে যেয়ে শীতলের সামনে দাঁড়ায়। শীতল কিছুটা কম্পিত চোখে তাকায় উৎসের দিকে। উৎসের বুকটা খচখচ করে ওঠে।

“কি হয়েছে শীতল? সব ঠিক আছে তো?”
শীতল কিছুক্ষণ ঠোঁট কামড়ে রাখে। এরপর আচমকা উৎসের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে, তার কান্নায় ভিজে যায় উৎসের বুকের কাছের শার্টের অংশটুকু।
স্থাণুর মতো জমে যায় উৎস। সে যতোই শক্ত থাকুক না কেনো, এই একটা জিনিসের সামনে সে দূর্বল, শান্ত। তা হলো এই মানবীর চোখের জল।

“শীতল, কি হয়েছে বলো? সব ঠিক আছে তো?”
শীতল আরো জোরে শব্দ করে কাঁদে।
“শীতল দয়া করে কান্না থামাও, আমার কষ্ট হচ্ছে তুমি বুঝতে পারছো না? ইচ্ছা করে আমাকে কষ্ট দিতে চাচ্ছো?”
“কেনো কষ্ট হচ্ছে আপনার?”
“অদ্ভুত কথা বলছো শীতল। চলে যাও এখান থেকে।”
“না যাবো না, আগে বলুন আমার কান্না দেখে আপনার কেনো কষ্ট হবে? আমি কে আপনার?”
উৎস শীতলের দুই বাহু চেপে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

“তুমি কে আমার? তোমাকে জানাতে হবে সেইটা?”
“না জানাতে হবে না, আমি জানি তো।”
“তাই জানো?”
“হ্যা জানি।”
“তাহলে বলো কে তুমি আমার।”
শীতল উৎসের হাতের বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে বললো,”আমি আপনার কেউ না।”
উৎস মুচকি হেসে বললো,”এইতো ঠিক জানো। তাহলে আবার কি?”
শীতল ক্রোধের সাথে দরজায় লাথি দেয়, উৎস শান্ত হয়ে শীতলকে দেখে। ও কেনো এমন করছে হঠাৎ? কিসের কষ্ট পাচ্ছে ও?

উৎসের শান্ত চেহারা শীতলের রাগ বাড়িয়ে দেয়। সে কিছু না বলে রাগে কাঁপতে কাঁপতে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে গেলেই উৎস পিছন থেকে তার হাত চেপে ধরে।

“ছাড়ুন আমাকে, যেতে দিন।”
“না দিবো না। আগে বলো কি হয়েছে? এমন করছো কেনো?”
“কিছু করছি না। আমার কপালটাই খারাপ।”
“কপাল খারাপ বলছো কেনো? যে কপালে আমি আছি তা খারাপ হবে কেনো?”
“ফাজলামি করছেন আমার সাথে?”
“ফাজলামি করার মতো মন, শরীর কোনোটাই এখন আমার নেই।”
“তাহলে কীভাবে বুঝলেন আমার কপালে আপনি আছেন?”
উৎস শীতলকে নিজের দিকে আরো একটু টেনে আনে, নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে দিতে পারলেই যেনো শান্তি।

“কি হচ্ছে কি? ছাড়ুন।”
“এসেছো নিজের ইচ্ছায়, আমি ডাকিনি। এখন তোমাকে ছাড়বো না। চিৎকার করতে চাইলে করতে পারো।”
শীতল কিছুটা ঠান্ডা হয়ে যায়, কিন্তু ফোঁপানোর জন্য মাঝে মাঝে কোমল শরীরটা কেঁপে ওঠে।

উৎস কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে বললো,”শীতল তুমি কি আভার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বলে রেগে আছো আমার উপর? আমি যদি তোমার জীবনে না থাকতাম তাহলে তোমারও ভালো কোথাও….”
শীতল উৎসকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দেয়। হতভম্ব হয়ে যায় উৎস।

“শীতল….”
“কি ধরণের নোংরা কথা আপনি বলছেন? আপনি কি বলতে চাচ্ছেন আমি আমার বোনকে হিংসা করি?”
“শীতল আমি এমন কিছুই বলিনি। শান্ত হও।”
“আমি শান্তই আছি। আমার কিছু ভালো লাগছিলো না বলে একটু স্বস্তির খোঁজে আপনার কাছে এসেছিলাম। আপনি এমন কীভাবে ভাবতে পারলেন আমাকে?”
শীতলের চিৎকারে ঘরটা কেমন কেঁপে ওঠে উৎসের। উৎস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শীতলের হাত চেপে ধরে।

“চলো।”
“কোথায়?”
“আগে চলো, পরে বলছি।”

শীতলকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উৎস তাকে টানতে টানতে ছাদের কোণায় নিয়ে যায়।

ছাদের শেষ প্রান্তে আসতেই শীতলের মন হু হু করে ভালো হয়ে যায়। হতবাক হয়ে যায় সে সামনের দিকে তাকিয়ে। এগুলো কবে হলো? কে করলো?

শীতলের সামনে প্রায় সাত/আটটা গোলাপ গাছ। প্রতিটা গাছেই ফুল এসেছে, একদম ফুটন্ত গোলাপ। সকালের নরম আলোয় ফুলগুলো যেনো স্বর্গীয় দৃশ্য উপস্থাপন করে চলেছে। তবে সবগুলো গোলাপই লাল শুধু মাঝের দিকের একটা গাছ ছাড়া। ওতে অদ্ভুত সুন্দর একটা হলুদ গোলাপ ফুটে আছে। অন্য গাছ গুলোতে লাল গোলাপের সংখ্যা চারটা/পাঁচটা করে হলেও হলুদ গোলাপটা একটাই ফুটে আছে। বলাই বাহুল্য, শীতলের নজর ওদিকেই আটকে আছে।

“এগুলো…..”
“এগুলো আমার শীতল। আমি যত্ন করে করে গোলাপ গাছগুলোকে তরতাজা রেখেছি। রোজ সকালে ওদের খুব করে যত্ন করি আমি। আগাছা পরিষ্কার করি, সার দিই, পানি দিই। দেখো কেমন ফুটে আছে সুন্দর। আচ্ছা তুমি কি বলতে পারবে সবচেয়ে বেশি যত্ন আমাকে কোন গাছটার জন্য করতে হয়েছে?”
শীতল মৃদু গলায় বললো,”হলুদটার জন্য?”
“হ্যা ঠিক ধরেছো। তোমার নজর কি শুরুতেই ওদিকে যায়নি?”
“হ্যা গেছে, কিন্তু কেনো?”
“কারণ ওটা সবচেয়ে সুন্দর, আলাদা। দেখো অন্য গাছগুলোতে কতোগুলো করে ফুল ফুটেছে কিন্তু হলুদ গোলাপ একটাই। আর এই ফুলটা ফুটেছে গাছটা কেনার প্রায় দুই মাস পর। বাকিগুলো অল্পদিনেই ফুটেছে। শুধুমাত্র এই সুন্দর দৃশ্যটা দেখার জন্য আমি অপেক্ষা করেছি দুই মাস। তাতে দিয়েছি আমার সর্বোচ্চ যত্ন। দেখো সে কি আমার অপেক্ষা আর যত্নের ফল দেয়নি? মেলে ধরেনি প্রকৃতির বুকে তার সর্বোচ্চ সৌন্দর্য?”
শীতল কিছু একটা বুঝে মাথা নামিয়ে হালকা করে নাড়ায়।

উৎস হঠাৎ শীতলের ডান হাতটা দিয়ে নিজের বুকের বাম পাশে রাখে। তার হৃৎপিণ্ডের আস্ফালন শীতলকে অস্থির করে তোলে।

“বিশ্বাস করো শীতল, আমাদের আগামীর দিনগুলো এভাবে সুন্দর করার জন্য আমি দিনরাত পরিশ্রম করছি। আজকাল ক্লাস শেষে অযথাই আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট করিনা, সময় পেলেই পড়তে বসি। মিছিল মিটিং থেকে নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছি, পুরোটা না পারলেও। জানো তো, সবাই আমার দিকেই চেয়ে থাকে কোনো ন্যায় বিচার চাওয়ার হলে। আমাকে যেতেই হয়। বিশ্বাস করবে শীতল? আমি সিগারেট খাওয়া কমিয়ে দিয়েছি। পুরোটা ছাড়তে পারিনি এখনো, ছেড়ে দিবো আস্তে আস্তে। আমি আজকাল খুব গুছিয়ে রাখছি নিজেকে। হয়তো আমার উপর বিশ্বাস হারাচ্ছো তুমি। এজন্য আমাকে খেয়ালও করোনি ভালো করে। খেয়াল করলে দেখতে আমি তোমার বিশ্বাসের শেষ প্রান্ত থেকে নতুন করে নিজেকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছি৷ দেখো আমি দাড়ি কেটেছি সুন্দর করে, আমার চুল আর এলোমেলো নেই। খুব পরিপাটি করে চলতে শুরু করেছি আজকাল। তুমি হয়তো খেয়াল করোনি বা করতে চাওনি। আর এগুলো আমি কেনো করছি জানো?”

শীতল ক্ষীণ গলায় বললো,”কেনো?”
“কারণ আমি তোমাকে ওই হলুদ গোলাপের মতো সুন্দর করে রাখতে চাই। সবার চেয়ে আলাদা, সবার চেয়ে সুন্দর, পরিস্ফুটিত।”
শীতলের ঠোঁট কেঁপে ওঠে তিরতির করে। তার মনে হচ্ছে উৎস ভাইকে অনেক বড় একটা কষ্ট দিয়ে ফেলেছে সে। সে চায়নি, ভুলে করে ফেলেছে। সে এখন কীভাবে বিশ্বাস করাবে তাকে যে উৎসের এই পরিবর্তন সে দেখেছে, অপার মুগ্ধতা নিয়েই দেখেছে। সে কিছু বলেনি কারণ বললে হয়তো উৎস এসব ছেড়ে আবার আগের মতো হয়ে যাবে। তার স্বভাবটাই তো এমন।

উৎস একবুক ভরে সকালের নির্মল বাতাসটুকু নিতে চায়, পারেনা। বুকটা কেমন ভার হয়ে আছে তার।

“নিচে যাও শীতল। যদি মনে হয় আমার উপর বিশ্বাসটুকু রাখতে পারছো না তবে চলে যাও আমাকে ছেড়ে। আমি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে যেয়ে আবার ফিরে আসার ক্ষমতা রাখি। আমার নিজের প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস আছে। তবে হ্যা, তোমাকে না পেলে পৃথিবীর বুকে দাবানল সৃষ্টি করার তীব্র ইচ্ছা আমার আছে। সৃষ্টিকর্তা সে ক্ষমতা সাধারণ মানুষের হাতে দেয়নি হয়তো, কিন্তু সত্যিই আমি শেষ হয়ে যাবো তোমাকে না পেলে।”

শীতল কোনো কথা না বলে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে।
“কি হলো? যাও। আমাকে কিছুক্ষণ একা থাকতে দাও।”
“আমাকে একটু আদর করবেন উৎস ভাই?”
উৎস ভয়াবহ ভাবে চমকে শীতলের দিকে তাকায়। শীতলের কোমল, লাল ওষ্ঠদ্বয় তাকে টানছে চুম্বকের মতো।

“শীতল….”
“আমাকে না পেলে যে দাবানল সৃষ্টি করার তীব্র ইচ্ছা আপনার আছে, আপনাকে না পেলে সেই আগুনে পুড়ে মরার তীব্র ইচ্ছা আমারও আছে। আমার পৃথিবী বলতে শুধু আপনি। আপনি আমার জীবনের প্রথম ও শেষ পুরুষ। আর কেউ আমাকে ছোঁয়ার আগে আমি নিজেকে শেষ করে দিতে দুইবার ভাববো না। আপনি কীভাবে ভাবলেন আপনাকে আমি বিশ্বাস করবো না? গ্রীষ্ম যেমন বিশ্বাস করে তীব্র তাপদাহের পর কাল বৈশাখী ঝড় প্রকৃতিতে শান্তি বইয়ে দিবে, ঠিক একইভাবে আমি আপনাকে বিশ্বাস করি। আমার এই তপ্ত মরুভূমির মতো হৃদয়টা আপনি শীতল করে দিবেন, এই বিশ্বাস না থাকলে জীবনেরসংখ্যারেখার বিপরীতে যেয়ে আপনাকে ভালোবাসতাম না। আপনি আমার জীবনের একমাত্র পুরুষ, আমার মহাপুরুষ। আপনি আছেন, আপনি-ই থাকবেন। আর কেউ এই জীবনে এলে সে থাকবে, শীতল থাকবে না।”

উৎস হতভম্ব হয়ে যায় শীতলের কথা শুনে। ও কীভাবে এতোগুলো কথা বলতে পারলো? কোথা থেকে শিখলো ও?

শীতল যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই উৎস ডাকে তাকে পিছন থেকে।

“শীতল একটু আগে বোধহয় তুমি কিছু চেয়েছিলে।”
শীতল অর্ধেক ঘুরে আড়চোখে তাকিয়ে দেখে উৎসের চোখেমুখে দুষ্টু হাসি। শীতল লাজুক হেসে বললো,”জমিয়ে রেখে দিন, একসাথে সব উশুল করে নিবো।”
“সুদে-আসলে?”
“উহু, উৎস-শীতলে।”
উৎসকে স্তম্ভিত অবস্থায় রেখে নুপুরের রুনঝুন আওয়াজ তুলতে তুলতে শীতল ছুটে পালায়।
উৎস ঘোরের মধ্যে চলে যায় অন্য এক জগতে। যে জগতে সে আর তার অনুপমা ছাড়া আর কেউ নেই, কিচ্ছু নেই।

‘ভালোবাসতে এক জনম না, একটা মুহুর্তই যথেষ্ট। যে মুহুর্তের প্রতিটা সেকেন্ড আদর দিয়ে উশুল করতে চাই, হবে না একটা মিলিসেকেন্ডও নষ্ট।’

(চলবে…..)

#মাতাল_প্রেমসন্ধি

পর্ব: ৩৯

যোহরের নামাজের পর আবির আর আভার বিয়ে হয়ে যায়। কেমন যেনো স্বপ্নের মতো করেই সবটা শেষ হয়ে যায়। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই। সবাই যেনো কেমন ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। আভার জন্য আবিরের মা রেশমার গহনা আর মওদুদ নিজে পছন্দ করে খয়েরি কাতান এনেছিলো। চন্দ্রাবতীর মতো সুন্দর লাগছিলো আভাকে। আবির চোখ ফেরাতে পারছিলো না। বাবার ভয়ে বাধ্য হয়ে চোখ সরাতে হয়। বাবার উপর তার বিশ্বাস নেই। কখন কি বলে সবার সামনে তাকে অপদস্ত করবে কোনো ঠিক নেই। তারচেয়ে যাকে সারাজীবন পলক না ফেলেও দেখা যাবে, যাকে মনের মধ্যে পুতুল সাজিয়ে রাখা যাবে তাকে দেখার তৃষ্ণা জোর করে আটকে রাখাটা তেমন কঠিন কিছু না।

আলেয়া ভেবেছিলো একটা ঝামেলা বাঁধবেই শেষমেশ। এভাবে বিয়ে হয় নাকি? সিনেমা চলছে নাকি এ বাড়িতে? নির্ঘাৎ কিছু বাঁধবে। কিন্তু তাকে মওদুদ ঝামেলা বাঁধানোর একটা চান্সও দেয়নি। একদম তার নাকের ডগা থেকে তুড়ি মেরে যেনো আভাকে নিয়ে গেলো সে পুত্রবধূ করে। নির্বিঘ্নে সব সমাধা হয়ে গেলো। না না, একেবারে নির্বিঘ্নে বলা যাবে না। বিয়ে পড়ানোর সময় বিঘ্ন কিছুটা ঘটেছে বৈকি। তা-ও আবার মওদুদের মানব সদৃশ গাধা পুত্রের জন্য।

“দেনমোহর কতো ধার্য করবো?”
মওদুদ কিছু বলতে যাবে তার আগেই আবির লাফ দিয়ে বললো,”দেনমোরের জায়গায় আমার নাম লিখেন কাজী সাহেব।”
কাজী সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকায় আবিরের দিকে, পাত্র কি পাগল? এমন পরীর মতো ফুটফুটে মেয়েটার কিনা শেষ পর্যন্ত একটা পাগলের সাথে বিয়ে হবে?
মওদুদ দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”উৎস তোমার বন্ধুকে চুপ করতে বলো কিন্তু। গাধাটাকে মেরে কিন্তু বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলে দিবো। বিয়ে শখ ঘুচে যাবে আজীবনের মতো।”
আবির মুখ ভোঁতা করে বললো,”বাবা সব তুমি বলছো, এটা আমি বলবো। তুমি কোনো কথা বলবে না।”
কাজী সাহেব রাগান্বিত হয়ে বললো,”এই পাজি ছোকরা, দেনমোহর হয় টাকার পরিমাণ। সেখানে তোমার নাম লিখতে বলো কোন হিসাবে? বেক্কল ছেলে।”
“সে আপনি যা-ই বলেন, দেনমোহরে আমার নামই থাকবে। যদি আভা কোনোদিন আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চায়, দেনমোহর পেতে যেয়ে যেনো আমাকেই আবার পায়।”
আবিরের কথায় হতভম্ব হয়ে যায় সবাই। নওশাদ বিকট শব্দে হেসে দেয়। তার মহাপুরুষ গুলো আসলেই ভীষণ মজার। শাহানার নওশাদের হাসি দেখে গা জ্বলে যায়। এটা নাকি বাবা। সে পিছন থেকে নওশাদের পিঠে চিমটি কাটে।

“কি হয়েছে? খোঁচাখুঁচি করছো কেনো?”
“দেখো কেমন বেক্কল দিয়ে ঘর ভরেছো। দেনমোহরের জায়গায় নাকি পাত্রের নাম। এমন সৃষ্টিছাড়া কথা শুনেছো বাপের জন্মে?”
নওশাদ শাহানার দিকে ঘুরে মুচকি হেসে বললো,”সত্যি করে বলো তো শাহানা, আবিরের এই কথায় তোমার শান্তি হয়নি? মনে হয়নি আমাদের এই মেয়েটাও একটা দারুণ মানুষের জীবনসঙ্গী হতে যাচ্ছে?”
শাহানা অপ্রস্তুত হয়ে বললো,”আমি ওদিকটায় গেলাম।”
শাহানা চলে যায়, নওশাদ তার দোয়েল পাখির দিকে তাকিয়ে হেসে দেয়।
শুধু আলেয়া মুখ ভেংচি দিয়ে বললো,”এসব আদিখ্যেতা আর চোখে সয়না বাপু।”

মওদুদ আবিরের কাঁধে হাত রেখে বললো,”এই প্রথম তোকে রেশমার ছেলে না আমার ছেলে মনে হচ্ছে। দারুণ একটা কথা বলেছিস বেটা। এই কাজী, লিখে ফেলো তাড়াতাড়ি। দেনমোহরের জায়গায় আমার ছেলের নাম।”
কাজী সাহেব রাগে গজগজ করতে করতে উঠে দাঁড়ায়। সে কোনোভাবেই এই বিয়ে পড়াবে না। এমন পুতুলের মতো মেয়েটা এমন বেক্কল বাপ-বেটার ঘরে যাবে সে ভাবতেই পারছে না। ছেলেটা শুধু না, বাপটাও উন্মাদ। ওদিকে আবির আর তার বাবাও গোঁ ধরে বসে আছে দেনমোহরের জায়গায় আবিরের নামই দিতে হবে।

শেষমেশ রণ আর উৎস মধ্যস্থতা করে। দুপুর দুইটা বিশ মিনিটে সারাজীবনের জন্য এক মায়াভরা সম্পর্কে বাঁধা পড়ে যায় আবির আর আভা। যে সম্পর্ক অতি পবিত্র, সমুদ্র ফেনার মতো সফেদ, সুন্দর আর অমলিন।

বিয়ে পড়ানো শেষে আভা হঠাৎ ডুকরে কেঁদে ওঠে। কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হতে থাকে তার। সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারেনা। নওশাদের বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে মেয়ের কান্না দেখে। তার পৃথিবী একদিকে আর তার তিন মেয়ের চোখের পানি আরেকদিকে। সেই মেয়েদের চোখে পানি দেখলে পৃথিবী লণ্ডভণ্ড করে দিতে ইচ্ছা হয় তার।

নওশাদ উঠে মেয়ের কাছে যাবে, তার আগেই দেখে মওদুদ ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে আভার কাছে। নওশাদ কিছুটা শান্ত হয়ে দাঁড়ায়। দেখা যাক মওদুদ কি করতে পারে।

মওদুদ আভার মাথায় হাত রাখে। আভা ফোঁপাচ্ছে তখনও। বহ্নি, শীতল, অগ্নি আভার কাছেই ছিলো। মওদুদ আসায় তারা সরে যায়।

“মা রে কাঁদিস কেনো? আমার ছেলেরে ভালো লাগে নাই? ওর কি ভালো লাগে নাই বল একবার। নাক বাঁক? এক্ষুনি হাতুড়ি দিয়ে একটা বাড়ি মেরে নাক সোজা বানিয়ে দিচ্ছি। একবার বল ওর কি সমস্যা?”
আভা মাথা নিচু করে কাঁদতে থাকে, উত্তর দেয়না।

“কি যন্ত্রণা, এই নশু। তোর মেয়েগুলো এমন ছিঁচকাঁদুনে কেনো বল তো? কাল রাত থেকে দেখছি সমানে কেঁদে যাচ্ছে মেয়েগুলো। এই বহ্নি মেয়েটাকে একটু কঠিন ভেবেছিলাম। ওটা দেখি কাঁদতে কাঁদতে দিঘী বানিয়ে ফেলবে এবার।”
নওশাদ উত্তর দেয়না, তার নিজেরও কান্না পাচ্ছে। মেয়েদের আর কি দোষ?

“মা রে, মনে কর আমি তোর ছেলে, তুই আমার মা। এখন মা হয়ে ছেলেরে বল তোর কোথায় কষ্ট হয়? কান্না তো আর সহ্য হয়না। পেট ব্যথা করে?”
আভা কান্নার মধ্যে হঠাৎ ফিক করে হেসে দেয়।
মওদুদ্রর মুখের হাসি প্রশস্ত হয়।

“এই তোমরা দেখছো? আমার মেয়ে হাসছে, দেখছো সবাই? আমার আর কিচ্ছু চাওয়ার নেই। আমার মেয়ের এই হাসির মূল্য কোটি টাকা।”
আভা মওদুদের দিকে তাকায়। একদম যেনো নিজের বাবাকে দেখতে পায়, এমন কেনো? কীভাবে সম্ভব?

মওদুদ আবার মাথাটা বুকে চেপে ধরে। মিষ্টি একটা জর্দার গন্ধ পায় আভা, কি সুন্দর!
নওশাদ আর এক মুহুর্ত দাঁড়ায় না সেখানে। চোখ মুছে হাসিমুখে চলে যায়। তার মেয়ের চোখের পানি মোছাতে অন্য কেউ এসেছে এখন। এইতো মেয়ের বাবা! এইতো মেয়ের বাবাদের ত্যাগ। তার যে আর কিছু করার ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা নেই প্রকৃতির নিয়মের বাইরে যাওয়ার।

নওশাদ চলে যেতে গেলে মওদুদ আবিরকে ইশারা করে তাকে আটকাতে। আবির নওশাদের হাত টেনে ধরে। মওদুদ আভাকে ছেড়ে নওশাদের মুখোমুখি দাঁড়ায়।

“নশু, আমার সব আছে জানিস তো। বাড়ি, গাড়ি, টাকাপয়সা কিছুর অভাব নেই। শুধু আমার বাড়িতে একটা মেয়ের অভাব ছিলো। তা পুরণ হলো আজ। এছাড়া আর কিছু না। তোর মেয়ে তোরই আছে। আর আমি তো পৃথিবীতে অল্প কিছুদিনের অতিথি। আজ আছি কাল নেই। তখন শুধু নিজের মেয়েটার না আমার এই গাধা পুত্রের অভিভাবক হতে হবে তোকে। পারবি না? কথা দে আমাকে, তুই পারবি। আমার ছেলেটা বোকা, ভীষণ বোকা। ওর যে একটা আশ্রয়ের খুব দরকার। আমার শরীরের যে অবস্থা, কোনো গ্যারান্টি নেই। আজও আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে উপরে চলে যেতে পারি। এজন্যই আবির যখন বিয়ের কথা বললো, আর জানতে পারলাম মেয়ে আর কেউ না আমার নশুর মেয়ে তখন যেনো আমি অমাবস্যা রাতে চাঁদ হাতে পেলাম। যাক এবার আমার ছেলেটা বোধহয় একটা আশ্রয় পেলো। এই মেয়েও তোর থাকবে, এই আমার ছেলেটাও তোরই থাকবে। কাঁদিস কেনো তাহলে?”
নওশাদ মওদুদের কথাগুলো শোনে ঠোঁট কামড়ে। তারপর হঠাৎ-ই মওদুদকে জড়িয়ে ধরে সে। মওদুদও ধরে। এ যেনো এক অদ্ভুত মিলনমেলা তৈরি হয় খাঁ বাড়ির উঠোনে। অনুভূতিটা বোধহয় শুধু উপস্থিত মানুষগুলোই বলতে পারবে, আর কেউ না, কেউ-ই না।

গভীর রাত, বরযাত্রী সবাই চলে গেছে। শুধু মওদুদ আর আবিরকে বউ নিয়ে যেতে দেয়নি নওশাদ। আজকের রাতটা এই গরীবখানায় থেকে যেতে অনুরোধ করে। মওদুদ রাজি হয়ে যায়। নতুন বর-বউকে বহ্নির নতুন ঘরে থাকতে দেওয়া হয়েছে, দোতলায়। বহ্নি আর রণ শীতলের ঘরে। তারা নিজেদের বাসায় চলে যেতে চেয়েছিলো, তাতেও নওশাদের আপত্তি। আজ কেউ যাবে না বাড়ি ছেড়ে। তার ইচ্ছা করে মনের ঠান্ডা ঘরটায় তিন মেয়েকে আজীবনের জন্য আটকে রাখতে।

শীতল ফুপুর কাছে থাকবে আজ, আর উৎসের ঘরে মওদুদ। উৎস সেই বারান্দায় বিছানা করে। নওশাদের খুব খারাপ লেগেছে এতে। সে ঠিক করেছে এবার বিশাল বড় একটা ঘর করবে উঠোনে, তাতে শুধু উৎস থাকবে। তাকে আর এখানে ওখানে রাত কাটাতে হবে না মেহমান এলে। উৎসের চিন্তায় সে নিজেও ঘরে আরাম করতে পারছে না। উৎস কিনা মেঝেতে ঘুমাবে, মশার কামড় খাবে? আর সে আরামে খাটে ঘুমাবে? অসম্ভব। শাহানা ঘুমিয়ে গেলে সে চুপিসারে মেঝেতে বিছানা করে শুয়ে পড়েছে। অন্তত মনকে এটুকু তো বোঝানো যাবে, তার বাচ্চাটা একা কষ্ট করছে না।

কিন্তু আদৌ কি উৎস ঘুমিয়েছে? না ঘুমিয়েছে শীতল? দুইজন জাম গাছের নিচের শান বাঁধানো বেদীটার উপর বসে আছে। আকাশে রূপোর থালার মতো বিশাল বড় একটা চাঁদ উঠেছে। শীতলের মাথা উৎসের কাঁধে, হাত প্রেমিকের হাতে। শীতলের মনে হচ্ছে সে বুঝি স্বর্গের কাছাকাছি কোনো জায়গায় চলে এসেছে। প্রেমিকের শার্টের গন্ধও কেনো মাতাল করা হয়? এ যে মাতাল এক প্রেমসন্ধি।

“শীতল।”
“হু।”
“ঘুমাবে না?”
“হু।”
“হু হু করছো কেনো? কখন যাবে?”
“আর একটু থাকি?”
উৎস কিছু বলতে যেয়েও বলতে পারেনা। এতো মায়াভরা গলায় যদি প্রেয়সী কলিজা কেটেও দিতে বলে, তবে প্রেমিকের সাধ্য কি অনুরোধ ফেলার? সে যে হাসতে হাসতে নিজের কলিজা কেটে দিতে পারে। আর সামান্য সময়-ই তো চেয়েছে সে।

উৎস আড়চোখে তাকায় শীতলের দিকে। মনে হচ্ছে তার পাশে শীতল নামের সাধারণের মধ্যে অসাধারণ মেয়েটি নয় বরং গ্রীক দেবী আফ্রোদিতি বসে আছে। যে কিনা সৌন্দর্যের দেবী, সৌন্দর্য যার বসন। গাঢ় সবুজ শাড়িটা বিয়ের সময়ই পরেছিলো সে, এখনো খোলেনি। কিছুটা আলুথালু হয়ে আছে শাড়িটা কুচির কাছে। হালকা বাতাসে জর্জেট শাড়ির আঁচল উড়ছে। উৎসের ঘোর লাগে সেদিকে তাকিয়ে। এই নেশা পাশে থাকলে সিগারেটের মতো হাজারটা নেশা সে কাটিয়ে ফেলতে পারে। অদ্ভুত, এতোক্ষণে একটা সিগারেটের তেষ্টা পায়নি তার? কারণ কি শুধু পাশে বসে থাকা এই মানবরূপী আফ্রোদিতি?

“শীতল, তোমার কি মন খারাপ?”
শীতল উত্তর দেয়না।
উৎস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”আভা তো এখানেই থাকবে কলেজ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত। তাছাড়া আবিরের পড়াও শেষ হয়নি এখনো। মাঝে মাঝে যাবে শ্বশুরবাড়ি, আবার তো চলে আসবে। মন খারাপ করোনা।”
শীতল গুণগুণ করে গান করে ওঠে হঠাৎ। সুরটা সুক্ষ্ম কিন্তু তীক্ষ্ণ। উৎস মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনে। নিঃশ্বাস গাঢ় হতে থাকে তার। বেশিক্ষণ নিজেকে সামলাতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।

“আচ্ছা উৎস ভাই একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
“করো।”
“স্বর্গ বুঝি অনেক সুন্দর? সেখানে যে যা চায় তাই পায়? অনেক সুখ সেখানে?”
“এমনটাই তো হওয়ার কথা। তবে সৃষ্টিকর্তা প্রতিটা মানব-মানবীর জন্য দুনিয়াতেই খুব সামান্য কিছু সময় ধার্য করে দিয়েছে স্বর্গসুখ পাওয়ার জন্য। যাতে তারা অতি সামান্য সেই সময়ে একটু হলেও বুঝতে পারে স্বর্গের সুখটা কেমন।”
শীতল তৎক্ষনাৎ মাথা তোলে উৎসের কাঁধ থেকে।

“সত্য বলছেন?”
“হুম বলছি।”
“কীভাবে? কখন?”
উৎস নেশাক্ত চোখে তাকায় শীতলের দিকে। চাঁদের নরম আলো শীতলের কপাল, গাল, গলা বেয়ে বুকে এসে পড়েছে। জ্যোৎস্না যেনো ম্লান হয়ে যাচ্ছে তার শিওরে এসে। তার সৌন্দর্যের কাছে জ্যোৎস্নাকেও ফিকে লাগে উৎসের। উৎস চোখ ফিরিয়ে নেয়।

“কি হলো বলুন?”
“ঘুমাতে যাও, অনেক রাত হয়েছে।”
শীতল অসহিষ্ণু হয়ে বললো,”না আগে আপনি বলুন, কি সেই স্বর্গের মতো শান্তির সময়?”
উৎস শীতলের দিকে তাকিয়ে কিছুটা হাসে। শীতলের থুতনিতে হাত রেখে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে বুলিয়ে দেয় থুতনিটা। শীতল চোখ বন্ধ করে ফেলে।

“এইযে যে শান্তিটুকুর জন্য তুমি চোখ বুজলে, তার চেয়েও হাজার গুণ শান্তি তোমাকে সেই সময়টা দিবে যে সময় তুমি আমার প্রেমিকা না আমার রাজবধূ হয়ে আমার কাছে আসবে। আমার বুকপিঞ্জর উন্মুক্ত করে দিবো তোমার জন্য। আমার প্রতিটা রন্ধ্রের প্রেম তোমাকে উৎসর্গ করবো। আমার প্রতিটা ধমনী, শিরা-উপশিরার মধ্যে যে রক্ত প্রবাহিত হয় তাতে যে ভালোবাসাটুকু বয়ে যাচ্ছে নিরন্তর রক্তের সাথে সেই ভালোবাসাটুকু তোমার মধ্যে এসে বিলীন হয়ে যাবে, একাকার হয়ে মিশে যাবে তোমার তপ্ত ঘন শ্বাসের সাথে। সেদিন তুমি বুঝবে কীভাবে সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীতেও স্বর্গসুখ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।”
উৎস থামে, শীতলের শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে থাকে। এক মুহুর্তের জন্য তার মনে হয় এখনই সরে না গেলে বড় ভুল হয়ে যাবে। আর মাতা তুলে দাঁড়াতে পারবে না সে। তবুও এক আদিম নেশা পেয়ে বসে থাকে। পাপ করার ইচ্ছা জাগায়। মনে হয়, মানুষ হয়ে জন্মিয়ে দু’একটা ভুল করা কি খুব বেশি পাপের?

শেষ মুহুর্তে উৎস তার হাত সরিয়ে নেয়। পকেট থেকে সিগারেট বের করে শীতলের সামনেই ধরায়, ধোঁয়া ছাড়ে।
শীতল এলোমেলো আঁচলটা শরীরের সাথে ভালো করে পেঁচিয়ে উঠে দাঁড়ায়।

“আমি আসছি।”
ছুটে পালানোর ঠিক আগ মুহুর্তে উৎস তাকে পিছন থেকে ডাকে আবার।

“একটু দাঁড়াও।”
শীতলের পা কাঁপতে থাকে। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে উল্টোদিক ঘুরেই দাঁড়িয়ে পড়ে সে।
উৎস শীতলের হাত ধরে টেনে তার দিকে ফেরায়। শীতলের আঁচলটা নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে তাতে নাক ডুবায় সহসাই। বড় করে একটা শ্বাস নেয়। ইচ্ছা করছে হৃদয়ের সমস্ত অনুভূতি উপচে দিতে এই আঁচলে, চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু সে যে পুরুষ মানুষ। অলিখিত নিয়ম আছে যে, পুরুষদের কাঁদতে নেই। ওটা শুধু মেয়েদের জন্যই গচ্ছিত এই পৃথিবীতে।

শীতল হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর উৎস মাথা তুলে আঁচলটা শীতলের মাথায় তুলে দেয়।
গাঢ় গলায় বলে,”যাও।”
শীতল আর এক মুহুর্ত দাঁড়ায় না। নুপুরের রুনঝুন আওয়াজ করতে করতে ছুটে পালায় সেখান থেকে। উৎস বেদীর উপরই শুয়ে পড়ে মাথার নিচে দুই হাত দিয়ে। চাঁদটা সাক্ষী থাকে, মহাপুরুষেরা কোনো পাপ করতে পারেনা।

গভীর রাতে বারান্দায় ছেলেটাকে দেখতে এসেছে সায়েরা। মায়ের মন তো, ছেলেটা কি অবস্থায় আছে দেখতে ইচ্ছা করছিলো। অঘোরে ঘুমাচ্ছে ছেলেটা সেখানে শুয়ে। শীতল মশারী টাঙিয়ে দিয়ে গেছে। মেয়েটা তার চেয়েও বেশি যত্ন করে তার ছেলের। শান্তিতে বুকটা ভরে ওঠে তার।

হঠাৎ বারান্দার দরজা খোলা দেখে অবাক হয় সে। ছেলেটা কি দরজা না আটকিয়েই ঘুমিয়ে গেছে? এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন তো নয় তার ছেলে। তবে কি বেশি ক্লান্ত ছিলো তাই দিতে মনে নেই?

সায়েরা দরজা দিতে এসে উঠোনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে ভীষণ অবাক হয়ে যায়। এতো রাতে উঠোনে কে? চোর নয় তো? ইদানীং এদিকে চোরের উপদ্রব বেড়েছে ভীষণ।

“কে? কে ওখানে?”
সায়েরার কর্কশ গলার আওয়াজে ধাতস্থ হয় মওদুদ। ঘুম না আসায় ছাদে পায়চারি করছিলো সে। ছাদে থেকে উঠোনটা দেখে লোভ হলো। এতো রাতে একা বাগানে হাঁটাহাঁটি করলে ভালোই হবে। তার উপর আজ আবার পূর্ণচন্দ্র। শুক্লপক্ষ নাকি কৃষ্ণপক্ষ কে জানে। সে এসবের খেয়াল রাখেনা। রেশমা রাখতো, তার আবার এসব জ্যোৎস্না বিলাশ খুব পছন্দের ছিলো। মওদুদ ছিলো ব্যবসায়ী মানুষ, তার এসব সময় কোথায়? মেয়েটা একবুক অভিমান নিয়ে নিজেই জ্যোৎস্নায় গা ভাসাতো। তবে আজকাল মওদুদের মনে হয় কি এমন দোষ হতো যদি মেয়েটাকে একটু সময় দেওয়া যেতো? খুব কি ক্ষতি হতো? সে আজকাল খুব আগ্রহ ভরে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে। যদি দু’জন একসাথে বেহেশতে যেতে পারে, নিশ্চয়ই একসাথে জ্যোৎস্না দেখবে দু’জন। আচ্ছা, বেহেশতের জ্যোৎস্না বুঝি আরো সুন্দর? কে সুন্দর হবে বেশি? জ্যোৎস্না নাকি রেশমা? এসব মধুর চিন্তাতে কাটে মওদুদের রাত।

“আরে ম্যাডাম আপনি? ঘুমাননি?”
সায়েরা ভ্রু কুঁচকে বললো,”আপনি এখানে? কিছু লাগবে?”
মওদুদ হেসে বললো,”যাকে লাগবে সে আকাশের তারা হয়ে গেছে। তাকে পেতে হলে আমাকেও আকাশের তারা হতে হবে।”
হাসির বিনিময়ে সায়েরাও হাসে। মওদুদ বেশ অবাক হয়। ক্লাস ফাইভে পড়া সায়েরা আর পড়ন্ত বয়সের সায়েরার কোনো মিল নেই। প্রাণবন্ত, উচ্ছল কিশোরী এখন মধ্যবয়সী রমনী। কিন্তু হাসিটা সেই একই আছে যেনো।

“আপনার আর আমার কিন্তু খুব মিল আছে মওদুদ সাহেব।”
“তাই? কোনদিক থেকে?”
“এইযে আপনিও এক তারাকে পাওয়ার জন্য নিজে তারা হয়ে যেতে চান, আমিও ঠিক তাই। এক সুপুরুষের মায়ায় সেই যে পড়েছিলাম আষ্টেপৃষ্টে, এখনো সেই মায়া কাটাতে পারলাম না। খুব করে চাই তার কাছে চলে যেতে। আমিও যে আপনার মতো তারা হয়ে যেতে চাই প্রিয় মানুষটার জন্য।”
মওদুদ মাথা নিচু করে হাসে।

“আপনি তো খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারেন ম্যাডাম।”
“ওই টুকটাক গল্পের বই পড়ার বদঅভ্যাস ছিলো, তাই হয়তো ওভাবেই….”
“বদ অভ্যাস বলছেন কেনো? জানেন রেশমারও এই শখ ছিলো। আমি সময় দিতে পারতাম না ওকে। তখন কেবল ব্যবসাটা দাঁড় করাচ্ছি, আমার সময় কোথায়? বই কিনে আনতে হতো রোজ রাতে আসার সময়। একদিন ভুলে গেলে গোস্বা করে কথাই বলতো না আমার সাথে। রোজই আনতে হতো। আর সে সারাটা দিন বইতে বুঁদ হয়ে বসে থাকতো। যদি জানতাম আর অল্প কিছুদিন পরই সে আমাকে চিরতরে একা করে চলে যাবে এই পৃথিবী থেকে তাহলে হয়তো গল্পের বইয়ের পরিবর্তে নিজেকে মেলে ধরতাম, বলতাম নাও আমাকে পড়ো।”
“আপনিও তো ভীষণ গুছিয়ে কথা বলেন। আপনিও কি গল্পের বই পড়েন?”
“মাফ চাই ম্যাডাম, ওসব আমার কম্ম নয়। ব্যবসায়ী মানুষ, সারাদিন মাথায় ব্যবসা ঘোরে।”
সায়েরা আর কি বলবে ভেবে পায়না। এখানে উনার সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলাটা শোভন নয়। আবার অতিথি মানুষকে একা রেখে যেতেও পারছে না, অস্বস্তিতে পড়ে যায় সে।

অস্বস্তি থেকে উদ্ধার করে স্বয়ং মওদুদই।
“আপনার উপর দিয়ে সারাদিনে অনেক ধকল গেছে ম্যাডাম, যান ঘুমিয়ে পড়ুন।”
“আপনি ঘুমাতে যাবেন না?”
“যাবো কিছুক্ষণ বাদেই। রেশমা যখন মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে যাবে কিছু সময়ের জন্য, আমাকে মুক্তি দিবে তখনই যাবো।”
সায়েরা মাথা নিচু করে বললো,”আপনি বুঝি উনাকে ভীষণ ভালোবাসতেন?”
“উহু বাসতাম না, এখনো বাসি। ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি। একটা সময়ে মনে হয়েছিলো আপনাকে পেলে জীবনটা মন্দ হতো না। যখন দেখলাম সে পথ বন্ধ করে ফেলেছে আপনার ভাইজান তখন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। আর কোনোদিন সংসারই করতে ইচ্ছা হয়নি। পরে জীবনে রেশমা এলো, ভাবলাম এই তো সুখ, এইতো শান্তি।”
সায়েরার গলা শুকিয়ে যায়, কথা এদিক আসবে সে ভাবতেও পারেনি।

শব্দ করে হেসে দেয় মওদুদ।

“না না আপনাকে অস্বস্তি পেতে দিবো না। আমি যেমন রেশমাকে নিয়ে সুখী ছিলাম আপনিও তেমন এক ভাগ্যবান পুরুষকে নিয়ে সুখী ছিলেন। আমাদের দু’জনের জীবন ছিলো সমান্তরাল। আমরা কখনো এক হতে পারতাম না, কারণ ভাগ্যে এমনটাই ছিলো। ভাগ্যিস আপনি আমাকে বিয়ে করেননি, তাহলে উৎসের মতো অসাধারণ এক পুরুষের মা হওয়ার মতো সৌভাগ্যবতী হতে পারতেন না।”
সায়েরা অনড় দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ, কি বলবে ভেবে পায়না। হাত-পায়ের তলা কেমন জ্বালা করতে থাকে তার।

“অনেক রাত হয়েছে ম্যাডাম, ঘুমাতে যান। আমিও যাই।”
“রেশমা কি মস্তিষ্ক থেকে বের হয়েছে?”
মওদুদ তাকায় সায়েরার দিকে, সায়েরা জড়োসড়ো হয়ে যায়। প্রশ্নটা করা একদমই উচিত হয়নি।

“সে বের হতে চায়, ফাঁকি দিতে চায়। আমি চাইনা বের করতে। সে থাক আমার মস্তিষ্ক জুড়ে। আমাকে আরো নির্ঘুম রাত উপহার দিক মৃত্যু পর্যন্ত।”
কথা শেষ করে মওদুদ সায়েরার পাশ কাটিয়ে চলে যায়। সায়েরা বলতে যেয়েও বলতে পারেনা, সৌভাগ্যবতী শুধু আমি একা নই, ওই মানুষটাও। যার বিয়োগের এতো বছর পরেও তার স্বামী উন্মাদের মতো ভালোবাসে তাকে, তার অনুপস্থিতিতে যাতনা দেয় তাকে। আবিরের মতো মহাপুরুষকে গর্ভে ধারণ করাও নেহাৎ কম সৌভাগ্যের কথা নয়।

কিন্তু বলা হয়না। কিছু কথা অনুক্তই থেকে যায় মানুষের মনে, এটাই বুঝি নিয়ম প্রকৃতির।

ভোরবেলা বাড়ির গেটের বাইরে চিৎকার চেচামেচি শুনে ঘুম ভাঙে সবার। প্রথমে ঘুম ভাঙে উৎসের, কারণ সে বারান্দায় ছিলো, পরে শাহানার। পাশ ফিরতেই দেখে নওশাদ নেই। সে জানে এই সময় নওশাদ হাঁটতে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বুকটা কেমন কেঁপে ওঠে তার। অজানা এক আশঙ্কায় বুক ছেয়ে যায় তার। ধড়ফড় করে উঠে বসে সে বিছানায়। গেট পর্যন্ত যাওয়ার শক্তি পায়না, কেনো সবাই চিৎকার করছে বাইরে?

শাড়ির আঁচল মাথায় চাপাতে চাপাতে শাহানা এসে দেখে উৎস ততক্ষণে উঠে গেছে, গেটের দিকেই যাচ্ছে সে। রণও উঠে এসেছে, পিছন পিছন বহ্নি। শীতল আর সায়েরা ভিতরের ঘরে থাকায় তারা এখনো শুনতে পায়নি। বাকিরা তো দোতলায়।

“মামি আপনি ভিতরে যান, আমি দেখছি।”
শাহানা হাউমাউ করে উঠে বললো,”আমি যাবো, আমি দেখবো।”
উৎস বহ্নিকে চোখের ইশারা করে, বহ্নি এসে মায়ের হাত চেপে ধরে। উৎসের পিছু পিছু রণও এগিয়ে যায় গেটের দিকে।

“কি হয়েছে আসলাম মামা, চিৎকার করছেন যে এভাবে আপনারা? সব ঠিক আছে তো?”
আসলাম নামক লোকটা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে। বিস্ফারিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে উৎস, রণ, শাহানা আর বহ্নি।

“কিচ্ছু ঠিক নেই উৎস, অনেক বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে তোমাদের।”
উৎস গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বললো,”কি হয়েছে? দয়া করে বলবেন?”
আসলাম জবাব না দিয়ে একইভাবে কাঁদতে থাকে।

(চলবে……)