মাতাল প্রেমসন্ধি পর্ব-৪০+৪১

0
33

#মাতাল_প্রেমসন্ধি

পর্ব: ৪০

হাসপাতালের করিডোরের মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে আছে উৎস। তার পাশে সায়েরা বসে তার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদছে। কান্নার দমকে শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে তার একেকবার। অদূরেই শাহানা বসে আছে একটা চেয়ারে। সে কাঁদছে না। তবে তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে নিজের মধ্যে নেই। নির্লিপ্ত চোখজোড়া শুন্যের দিকে নিবদ্ধ। মুখমণ্ডল লাল হয়ে আছে। প্রচন্ড ঝড়ের আগে পরিবেশ হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে যায়। তারপরই প্রকৃতি উলোটপালোট হয়ে যায় ঝড়ো হাওয়ায়। শাহানা সম্ভবত সেই সময়টুকু পার করছে।
আভা কাঁদছে, তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে আবির। মওদুদও এতোক্ষণ উৎসের সাথে দৌড়াদৌড়ি করছিলো ডাক্তারদের পিছন পিছন। এখন কিছুটা শান্ত হয়ে বসে আছে আভার পাশে।

বহ্নি কাঁদছে না, শক্ত হয়ে বসে আছে। সেই তুলনায় রণ অশান্ত, একটু পর পর হাহাকার করে উঠছে। বহ্নি নিশ্চুপ বসে আছে তার পাশে।
শুধু শীতল কি করবে বুঝতে পারছে না। অন্য সময় অল্প কিছুতেই কেঁদে বুক ভাসায়। সামান্য পায়ে চোট লাগলেই সে চোখমুখ উলটে এমন কাঁদতে থাকে যেনো আকাশ ভেঙে পড়েছে তার মাথায়। কিন্তু আশ্চর্য, আজ সে কাঁদতে পারছে না।
ভিতরটা মনে হচ্ছে কেউ করাত দিয়ে কাটছে। জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে হৃদয়টা, কিন্তু সে কাঁদতে পারছে না। উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক করছে। চোখজোড়া ভীষণ জ্বালা করছে তার। এতোটাই জ্বালা করছে যে সে কাউকেই যেনো দেখতে পারছে না। সবাইকে কেমন ঝাপসা লাগছে তার, ঘোলা ঘোলা। এই মুহুর্তে বাবার মুখটা ছাড়া কারো মুখই তার মনে পড়ছে না। না মায়ের, না দুই বোনের, না উৎস ভাইয়ের। কারো না, কারো না।

ঘটনা মোটেই সামান্য নয়। প্রতিদিনের মতো নওশাদ হাঁটতে বের হয়েছিলো। দুই জামাই বাড়িতে, অনেকদিন পর প্রিয় বন্ধু মওদুদকে পাওয়া তাও আবার আত্মীয় করে। ভেবেছিলো হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে এলাকার বিখ্যাত মিষ্টি নিয়ে যাবে সবার জন্য। বড় রাস্তার পাশে দোকানটা। মিষ্টির নামডাক হওয়ায় অনেক সকালেই দোকান খুলে যায় আর বিক্রিও হয়ে যায় তাড়াতাড়ি। এজন্যই আর দেরি করতে চায়নি নওশাদ।
হৃষ্টচিত্তে হাতভর্তি মিষ্টি কিনে কেবলই রাস্তা পার হচ্ছিলো সে। সকালের এই সময়টায় মালবাহী ট্রাকগুলো শহর থেকে ফেরে। প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা হয় এই সময়টায়। নওশাদ যদিও খুব সচেতন। রাস্তা পার হওয়ার সময় অনেক সাবধান থাকে। কিন্তু আজ হয়তো তার ভাগ্যই তাকে অসাবধান করে ফেলেছিলো। এ দুর্ঘটনা যে তার কপালেই ছিলো।
অতিরিক্ত খুশিতে দৌড়ে রাস্তা পার হতে যায় সে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কালচে লাল ছোপ ছোপ রক্তে ভেসে যায় পিচের রাস্তা, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান, মাত্র কয়েকটা সেকেন্ড।

“নওশাদ খাঁ এর বাড়ির লোক কারা আছেন?”
উৎস ছুটে যায় সবার আগে। পিছন পিছন মওদুদ, আবির আর রণ। শাহানা উঠতে যেয়ে উঠতে পারেনা। মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে ওঠে। মাথায় হাত ঠেকিয়ে বসে পড়ে আবার। কেমন যেনো নিয়ন্ত্রণহীন লাগছে তার। মনে হচ্ছে নিজেই নিজের মধ্যে নেই, আর কেউ ভর করেছে তার শরীরে।

“আমি আছি আমাকে বলুন।”
ডাক্তার উৎসের দিকে তাকিয়ে বললো,”আপনি উনার ছেলে?”
“না, আমি উনার ভাগ্নে। আমাকে বলতে পারেন। এখানে আমরা সবাই উনার বাড়ির লোক।”
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। উৎস অসহিষ্ণু হয়ে ডাক্তারের কাঁধে ঝাঁকি দিয়ে বললো,”চুপ করে আছেন কেনো এভাবে? এগুলো নাটক পরে করবেন। আগে বলুন আমার মামা কেমন আছে।”
উৎসের লাল চোখের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার ভেবাচেকা খেয়ে যায়। মওদুদ আর রণ উৎসকে টেনে পিছিয়ে নিয়ে আসে।

“উৎস এগুলো কি করছো? বুঝতে পারছি তোমার মনের অবস্থা। তাই বলে উনার সাথে এরকম ব্যবহার কেনো করছো?”
উৎস হতাশ গলায় বললো,”উনি চুপ করে আছে কেনো? আমার মামা কি বেঁচে আছে আদৌ?”
উৎসের কথায় চমকে ওঠে সবাই। শাহানা কাঁপা কাঁপা চোখে তাকায় উৎসের দিকে।

“দেখুন আমাকে বলার সময়টা তো দিন। এমন অস্থির হলে হবে কীভাবে? আপনার রোগী বেঁচে আছে তবে কন্ডিশন ক্রিটিকাল। প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে, আইসিউতে নেওয়া হচ্ছে। তবে রক্ত লাগবে। উনার রক্তের গ্রুপ এবি নেগেটিভ। আমাদের কাছে এই মুহুর্তে এই গ্রুপের রক্ত অ্যাভাইলেভেল নেই। আমরা ব্লাড ব্যাংকে খবর পাঠিয়েছি। তবে সবচেয়ে ভালো হয় তার নিজের লোকের মধ্যে কারো থাকলে, সন্তান হ্যা সন্তান হলে সবচেয়ে ভালো হয়। উনার সন্তান আছে?”
উৎস মাথা নেড়ে বললো,”হ্যা আছে, তিন মেয়ে উনার।”
“তাহলে তো ভালো। তিন মেয়ের মধ্যে কার রক্তের গ্রুপ এবি নেগেটিভ?”
বহ্নি, শীতল আর আভা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। সাধারণত ছেলেমেয়েদের রক্ত বাবার গ্রুপের সাথেই মেলে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার ওদের তিন বোনের কারো রক্তের গ্রুপই এবি নেগেটিভ নয়। তাদের শাহানার রক্তের গ্রুপের সাথে মেলে। তাদের বাড়ির কারোই এই গ্রুপের রক্ত নেই।

উৎস আহত গলায় বললো,”এ বাড়ির কারোই এই রক্ত নেই।”
ডাক্তার অবাক হয়ে বললো,”স্ট্রেঞ্জ! সন্তানদের মধ্যেও কারো রক্ত বাবার সাথে একই গ্রুপের নেই? এমন কেস যথেষ্ট রেয়ার।”
উৎস মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। পর্বতের ন্যায় শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। কোনোভাবেই ভেঙে পড়া যাবেনা। ভেঙে পড়লেই এই পরিবারটা দিকবিদিকশুন্য হয়ে যাবে। কেউ ঠেকাতে পারবে না ওদের। বহ্নি যতোই উপরে শক্ত হোক, ও ভিতর ভিতর শীতল আর আভার চেয়েও নরম তা ও জানে। কঠিন সময়গুলোতে ও ছোট বাচ্চাদের মতো শিশুসুলভ হয়ে যায়। বাকিদের কথা তো ছেড়েই দেওয়া যাক।

মওদুদ এগিয়ে আসে উৎসকে চুপ করে থাকতে দেখে। খপ করে ডাক্তারের হাত চেপে ধরে সে।
“ডাক্তার ভাই, যতো টাকা লাগে নেন। আমি দিবো সব। আমার বন্ধুটারে বাঁচান আপনি। ও এই পরিবারটার প্রাণ। ও না বাঁচলে এরা কেউ বাঁচবে না। কতো টাকা লাগবে আপনার বলেন?”
ডাক্তার বিরক্ত হয়ে বললো,”টাকা তো আর বন্ধুর শরীরে ঢোকাতে পারবেন না। শরীরে ঢোকাতে হবে রক্ত। বুঝতে পারছেন আমি কি বলছি? প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে, প্রচুর। এই মুহুর্তে রক্ত না পেলে পৃথিবীর সব টাকা এনে দিলেও উনাকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। ব্লাড ব্যাংকে জানানো হয়েছে। তবুও আপনাদের বলতে আসলাম একটাই কারণে, পরিবারের কারো রক্ত পাওয়া গেলে এই মুহুর্তে সবচেয়ে ভালো হতো। কিন্তু আজব ব্যাপার, একটা পরিবারের কারোই রক্ত উনার সাথে মিলছে না।”
উৎস চোখ বন্ধ করে বড় একটা শ্বাস ফেলে। দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে গাঢ় গলায় বলে,”স্যার রক্তের ব্যবস্থা আমি করছি। আপনি এদিকটা দেখুন। দরকার হয় নিজের শরীরের সব রক্ত ফেলে দিবো।যে রক্ত আমার মামার সাথে মেলে না, সেই রক্ত আমি আমার শরীরে রেখে কি করবো?”
ডাক্তার মহাবিরক্ত হয়। পরিবারের সবাই কেমন পাগল। এমন কেউ কি নেই এই পরিবারের যে একটু সুস্থ মস্তিষ্কের?

বহ্নি উঠে এসে উৎসের হাত ধরে।

“উৎস এখন এসব পাগলামি করার সময় নয়। উনারা উনাদের মতো চেষ্টা করুক। এরমধ্যে তোর রক্ত ফেলে দেওয়ার কথা আসছে কোথা থেকে?”
“উনারা চেষ্টা করুক, আমিও চেষ্টা করি। কম মানুষের উপকার তো আল্লাহ এই দুই হাত দিয়ে করায়নি। আজ আমার ক্রান্তিলগ্নে কি কাউকে পাবো না?”
উৎস বহ্নির হাত ছাড়িয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়, আবির ডাকে তাকে পিছন থেকে।

“উৎস।”
বিয়ের পর থেকে উৎস আর আবিরের এখনো কোনো কথা হয়নি। উৎস অপরাধবোধে ভুগে কথা বলতে পারেনি আবিরের সাথে আর আবির লজ্জায়। এই প্রথম দুইজনের মধ্যে কথোপকথন হয়।

“বল।”
“আমিও যাবো তোর সাথে।”
উৎস আবিরের দিকে তাকায়। এই মুহুর্তে তার মনে হচ্ছে আবির তার ভাই, শুধুই ভাই। কেনো মনে হচ্ছে সে জানেনা, কিন্তু আর কিছু ভাবতে পারছে না সে।

উৎস ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে বললো,”এখানে থাক তুই, কখন কি দরকার হয়। আমি একাই যেতে পারবো।”
আবির এগিয়ে আসে উৎসের কাছে। হাসির বিনিময়ে সে-ও হাসি দেয় মৃদু।
“এতোগুলো বছর তোর পাশে আছি, কোথাও একা যেতে দিইনি তোকে। বিপদ আসন্ন জেনেও তোর পাশ থেকে একবিন্দু নড়িনি। আর আজ ভেবেছিস তোকে যেতে দিবো? কখনো না। তুই আমার উপর রাগ করে থাকিস বা যা-ই করিস, আমি তোকে এখন একা যেতে দিবো না। মান অভিমান পরে দেখালেও চলবে, এখন আমি কোনো কথাই শুনবো না। তাছাড়া এখানে মেয়েদের পাশে বাবা আছেন, রণ ভাই আছেন। উনারা বাকিটা দেখে নিবে। আর উনি এখন শুধুই তোর মামা নয়, আমার শ্বশুর। তাই এতোটুকু অধিকার মনে হয় আমার আছে। চিন্তা করিস না, তুই-ই তার কাছে মহাপুরুষ থাকবি, আমি সেই জায়গা নিবো না।”
উৎস ম্লান হেসে হাত বাড়িয়ে দেয়। আবির প্রথমে একটু অবাক হলেও পরবর্তীতে সে হেসে হাতে হাত রাখে।
আবির যাওয়ার সময় আভার দিকে তাকায়। লালাভ হয়ে আছে মেয়েটার মুখ। আবির উৎসের কাছ থেকে কিছুটা সময় নিয়ে আভার কাছে যায়। আভার হেঁচকি উঠে যাচ্ছে কাঁদতে কাঁদতে।

“আভা, আমার সাহসী বউসোনা। একদম কেঁদো না এখন। তোমার হাত থেকে এখনো মেহেদীর দাগ শোকায়নি। তোমার অনাবিল আনন্দ ভরা সংসার না দেখে তোমার বীরপুরুষ বাবা কোথাও যাবেন না, কোথাও না।”
আভা হতবিহ্বল হয়ে সবার সামনেই আবিরকে জড়িয়ে ধরে। আবির এক হাত দিয়ে তাকে হালকা জড়িয়ে ধরে। ফুলের মতো কোমল মেয়েটা যেনো হঠাৎ করেই কেমন ঝড়ে পড়া পাখির মতো হয়ে গেছে। এই মুহুর্তে স্বামী হিসেবে তার পাশে থাকা আবিরের কর্তব্য।

“উৎস ভাই।”
উৎস সিঁড়ির গোড়ায় আবিরের জন্য অপেক্ষা করছিলো। শীতলের ডাক শুনে চমকে উঠে পিছনে তাকায়। কুসুম হলুদ রঙা জামায় মেয়েটাকে ভোরের পাখির মতো স্নিগ্ধ লাগছে। কিন্তু অবাক কাণ্ড, সামান্য কারণেই যে মেয়েটা কেঁদেকেটে একাকার হয়ে যায়, আজ সেই মেয়েটা নিশ্চুপ। নামের মতোই যেনো শীতল হয়ে আছে সে। তবে তার চেহারায় চাপা কষ্ট স্পষ্ট। যেনো সে একটা আশ্রয় খুঁজছে। পেলেই হাউমাউ করে কেঁদে নিজের যন্ত্রণাটা বের করে দিবে যৎসামান্য।

“শীতল, কিছু বলবে?”
শীতল ঠোঁট কামড়ে ধরে বললো,”উৎস ভাই, বাবা বাঁচবে তো?”
উৎস থমকে যায় সহসাই, শীতল এমন কথা বলছে কেনো?

“শীতল, উপরে যাও।”
“বলুন না উৎস ভাই, আমার বাবা বাঁচবে তো? বাবাকে না আমার অনেক কথা বলার আছে। অনেক অনেক কথা জমিয়ে রেখেছি বাবার জন্য, বলা হয়নি। সেবার ঈদে লাল একটা ফ্রক খুব পছন্দ হয়েছিলো। বাবার কাছে অতো টাকা ছিলোনা। ছোট্ট আমি তো বুঝতাম না এতোকিছু। খুব বায়না ধরলাম, ওটাই দিতে হবে আমাকে। রাগে মা মার্কেটের মধ্যেই আমাকে চড়থাপ্পড় দিয়ে বসলো। বাবা আমাকে কোলে তুলে নিলো, রাগী চোখে মায়ের দিকে তাকালো। কাঁদতে কাঁদতে বাবার কোলেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙলো মাঝরাতে, মনে হলো একটা ব্যাগ খসখস করছে পাশেই। আমি লাফ দিয়ে উঠলাম। দূর থেকে আসা সোডিয়ামের হলুদ আলোতে লাল জামাটা কেমন কালচে দেখায়। তবুও আমি বুঝে ফেলি ওটাই সেই লাল জামা। তখন অতো কিছু মাথায় আসেনি, জামা পেয়েই খুশি আমি। পরে বড় হয়ে শুনেছিলাম মায়ের কাছে, বাবা তার এক কলিগের কাছে তার খুব পছন্দের হাতঘড়িটা বন্ধক রেখে আমার জন্য ওইদিনই ওই জামাটা এনে দিয়েছিলো। মা আমাকে মারার অপরাধে বাবা তার সাথে ঈদের দিন পর্যন্ত কথা বলেনি।”
উৎস মাথা নিচু করে নিজের কান্না আটকানোর চেষ্টা করে। কোনোভাবেই এখন কাঁদা যাবে না, কোনোভাবেই না।

“উৎস ভাই, ও উৎস ভাই এরকম আরো অনেক অনেক ঘটনা আছে। আমি যে বাবার কাছে অনেক অনেক ঋণী। আমি যে বাবার জন্য কিচ্ছুটি করতে পারলাম না এখনো। আমার শরীরের চামড়া দিয়ে বাবার পায়ের জুতা বানিয়ে দিলেও যে এ ঋণ শোধ হবে না। আমাকে এভাবে ঋণী করে দিয়ে বাবা এভাবে চলে যাবে? বাবা এতোটা স্বার্থপর হবে উৎস ভাই? সারাজীবন নিজেই সবার জন্য করে যাবে আর কাউকে তার জন্য কিছু করার সুযোগ দিবে না? তার আগেই সবাইকে ছেড়ে এভাবে চলে যাবে? কেনো উৎস ভাই? বলতে পারেন বাবা এমন কেনো?”
শীতলের মাথাটা ঘুরে ওঠে। সে সিঁড়ির রেলিঙ ধরে নিজেকে সামলায়। উৎস তখনও মাথা নিচু করে দাঁড়ানো। কি উত্তর দিবে সে? সে নিজেও যে সমানভাবে ঋণী মানুষটার কাছে। যে ঋণ সে জন্মজন্মান্তরেও শেষ করতে পারবে না।

“উৎস ভাই, এটা ধরুন।”
উৎস চোখ মেলে তাকায়। শীতল এক জোড়া ছোট্ট কানের দুল ধরে রেখেছে উৎসের সামনে।
“এগুলো কি? এগুলো দিয়ে আমি কি করবো?”
শীতল ম্লান হেসে বললো,”বাবার ঋণ তো কোনোদিন শোধ করতে পারবো না। নিজের উপরই রাগ হচ্ছে। কেনো আমার রক্ত বাবার সাথে মিললো না? নিজের শরীরের সবটুকু রক্ত তাকে দিয়ে দিতাম। একটু শান্তি হতো মনে হয় তাতে। তা যখন হলো না, কিছু একটা তো করি বাবার জন্য। মনকে তো বোঝাতে পারবো কিছু অন্তত করেছি আমি ওই মানুষটার জন্য।”
“সবই বুঝলাম শীতল, কিন্তু এটা দিয়ে কি করবো আমি? আমাকে দিচ্ছো কেনো?”
“বৃত্তির টাকা জমিয়ে এটা কিনেছিলাম। এটা একান্তই আমার। বিক্রি করে দিন এটা আপনি। যা পাওয়া যাবে তাই দিয়ে রক্ত কিনে আনুন বাবার জন্য।”
উৎস শীতলের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মেয়েটা কি আজীবন এমনই থাকবে? কোনো বুদ্ধি হবে না তার?

“শীতল তোমার কি মনে হয়, রক্ত দোকানে দোকানে সাজানো থাকে? কিনতে পাওয়া যায়? গেলেই টাকা দিয়ে কিনে আনতে পারবো? এমন বোকা কেনো তুমি?”
“আমি বোকা উৎস ভাই। সত্যিই আমি বোকা। কিন্তু বোকারা কি ভালোবাসতে পারবে না? নিষেধ আছে?”
উৎস শীতলের কথায় কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। হাত রাখে শীতলের মাথায়। শীতল কেঁপে ওঠে কিছুটা।

“ওটা তোমার কাছেই রাখো। যদি কিছু করতেই চাও দোয়া করতে থাকো। যেনো একটা ব্যবস্থা হয়ে যায়। এ ছাড়া আপাতত আর কিছুই লাগবে না।”
শীতল মাথা নিচু করে রাখে। ধারালো ছুরি দিয়ে কেউ মস্তিষ্কের ভিতরের শিরাগুলো কাটছে যেনো তার ক্রমাগত। মাথার তীব্র যন্ত্রণায় শরীর নুইয়ে আসে যেনো তার।

“শোনো শীতল একটা কথা বলি, ওই মানুষটা সারাজীবন তার পছন্দের পুরুষদের মহাপুরুষ নামে আখ্যায়িত করেছে। অথচ সে নিজেই জানেনা আমার চোখে পৃথিবীতে যদি মহাপুরুষ বলে কেউ থাকে, তাহলে সে হলো আমার মামা, নওশাদ উদ্দিন খাঁ। মহাপুরুষদের মৃত্যু এভাবে হতে পারেনা। তাদের যে দুনিয়া থেকে আরো অনেক কিছু দেখে যেতে হয়, অনেক কিছুর সাক্ষী হতে হয়। এভাবে আমাদের ফেলে উনি যেতে পারেন না।”
“উৎস ভাই….”
শীতল ছলছল চোখ তাকায় উৎসের দিকে।

“কাঁদো শীতল কাঁদো। আজ প্রথমবারের মতো তোমার চোখে কান্না দেখতে চাই আমি। তবে এখানে না, জায়নামাজে বসে কাঁদো। মূল্যবান অশ্রুটুকু অযথা নষ্ট করোনা।”
শীতল কিছু বলতে যাবে তার আগেই আবির এসে দাঁড়ায় সেখানে।

“চল উৎস।”
উৎস মাথা নাড়ে। শীতলের হাতটা একবার শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরে ছেড়ে দেয় উৎস। আবিরকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে যায় সে। সিঁড়ির গোড়ায় চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে সে। অমাবস্যার অন্ধকার এসে ভীড় করে রাজকন্যার মুখে। রাজা শুয়ে আছে জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝিতে। রাজকন্যা কীভাবে স্বস্তি পায়?
শীতল ঠিক করে বাকিটা সময় সে জায়নামাজেই কাটাবে, উৎস রক্ত নিয়ে না ফেরা পর্যন্ত। এরমধ্যে আর এক মুহুর্তের জন্যেও সে উঠবে না। এক অসহায় কন্যার আহাজারি কি তিনি শুনবেন না? যিনি তাদের পরম যত্নে সৃষ্টি করে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন?

সকাল পেরিয়ে দুপুর। মানুষগুলো এখনো ঠাঁয় বসা। রক্তের যোগাড় হয়নি সেভাবে। এক ব্যাগ এসেছিলো ব্লাড ব্যাংক থেকে। তবে এতোটুকু যথেষ্ট নয়, আরো দরকার। মফস্বল শহর, এখানে খুব কমই পাওয়া যায়, পেলেও এক থেকে দুই ব্যাগ। বড় শহর থেকে আনার মতো সময় হাতে নেই। তবুও হাসপাতাল থেকে খবর দেওয়া হয়েছে। আসলেও দেরি হবে। উৎসও এখনো ফেরেনি। ডাক্তাররা ছুটোছুটি করছে, নওশাদ এখনো আইসিউতে। অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, তবে তা উন্নতির দিকে নয় অবনতির দিকে।

“রক্তের যোগাড় কি হয়েছে?”
সায়েরা আর বহ্নি শাহানাকে চেপে ধরে বসেছিলো। হঠাৎ করেই কেমন যেনো অদ্ভুত আচরণ করছিলো সে কিছুক্ষণ আগে। মস্তিষ্কের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় কেমন উন্মাদের মতো করছে সে। তার এখন মনে হচ্ছে সে সেই বালিকা বধূটি। মাত্রই বিয়ে হয়ে খাঁ বাড়িতে পা দেওয়া কিশোরী বধূ। যাকে ভালোবাসা দিয়ে সিক্ত করে রেখেছিলো ওই মানুষটা। রোজ রাতে বাড়ি ফেরার পথে হাতে থাকতো সন্দেশ বা বাতাসা। মিষ্টি বউটা যে মিষ্টি পছন্দ করতো অনেক। শাহানার মনে হচ্ছে সেই দিন বুঝি এখন। এলোমেলো চিন্তাগুলো ভর করেছে মাথায়।

মওদুদ এগিয়ে যায় ডাক্তারের কাছে। রণ বেরিয়ে গেছে, সে-ও চেষ্টা করছে রক্তের জন্য। মওদুদ যেতে পারছে না। মেয়েদের একা রেখে কীভাবে যাবে সে? আভা সমানে কেঁদে যাচ্ছে, বাকিদের অবস্থাও ভালো না। এই অবস্থায় কোথাও যেতে না পারলেও অনেক জায়গায় খবর পাঠিয়েছে সে বসে থেকেই। এতো চেনাজানা তার, কোথাও কি একটা ব্যবস্থা হবে না?

“ডাক্তার ভাইজান, আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। সব জায়গায় লোক পাঠানো হয়েছে। আমাদের একটু সময় দিন।”
“দেখুন আমরা সময় দেওয়ার তো কেউ না। রক্ত না পেলে রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হবে। উনার ফিজিকাল কন্ডিশন যদি সময় না দেয়, আমরা সময় দেওয়ার কে?”
মওদুদ কিছু বলতে যাবে তার আগেই শাহানা এসে দাঁড়ায় সেখানে। তার মুখটা কেমন লাজুক লাজুক। মওদুদ অবাক হয়ে তাকায়। কিছু তো একটা গন্ডগোল আছেই। শাহানার মস্তিষ্কে কোনো অসুবিধা হয়েছে?

“ডাক্তার, ও ডাক্তার।”
“হ্যা বলুন।”
“আমার শরীরে অনেক রক্ত, আমার রক্ত নেওয়া যায়না? রক্ত পেলেই তো মানুষটা ভালো হয়ে যাবে তাইনা? আমার রক্ত নেন। আমার স্বামীটারে বাঁচান।”
বহ্নি এতোক্ষণ পাথরের মতো চুপ করে থাকলেও আর পারেনা। মা’কে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দেয়।

“মা ও মা, তুমি এমন করছো কেনো?”
“ছি ছি বহ্নি কাঁদছিস কেনো এভাবে? তোর বাবা কি মরে গেছে? একদম কাঁদিস না। তোর বাবা ফিরে এসে যদি দেখে তোরা এভাবে কাঁদছিস, আমাকেই খুব বকবে। চোখের পানি মুছে ফেল বলছি, এক্ষুনি।”
বহ্নি ফোঁপাতে থাকে।
শাহানা আবার ডাক্তারের দিকে তাকায়।
“ডাক্তার ভাই নিন না, নিবেন না?”
ডাক্তার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে যায়, তারাও মানুষ, তাদেরও অনুভূতি আছে।

শাহানা এদিক ওদিক তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো,”শীতল কোথায়? নিশ্চয়ই কেঁদে ভাসাচ্ছে মেয়েটা। এমন ছিঁচকাঁদুনে হয়েছে মেয়েটা আমার। উনি ফিরে এসে বকবে আমাকে, তাই দেখে তিন বোন খুশি হবি।”
শাহানার গলায় কিশোরী অভিমান, মোটেই স্বাভাবিক মনে হয় না কারো।
বহ্নি চাপা গলায় বললো,”শীতল জায়নামাজে বসেছে মা। বাবার জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত সে উঠবে না।”
“তাহলে তোরা দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? তোরাও যা। আমার এই হাবা মেয়েটাকেও নিয়ে যা তো। তোদের কান্না দেখে রাগ লাগছে আমার, যা বলছি।”
বহ্নি বুঝতে পারে না কি করবে। অসহায় লাগে তার। রণও চলে গেলো এই মুহুর্তে। বাবার এই অবস্থা, মা এমন করছে। ছোট বোনটার অজ্ঞান হওয়ার দশা। কি করবে সে? কার কাছে যাবে? কোথায় গেলে একবিন্দু স্বস্তি মিলবে?

“চাচী, সালাম নিবেন।”
ভ্রু কুঁচকে সবাই তাকায়। অবাক হয়ে যায় সবাই। সায়েরা উঠে এসে বহ্নির পাশে দাঁড়ায়। এ কি আশ্চর্য কথা!

রুস্তম হাসিমুখে এগিয়ে আসে সবার দিকে। বহ্নি আভাকে আড়াল করে সামনে দাঁড়ায়। সেদিকে তাকিয়ে আবার হাসে রুস্তম।
“আপা।”
বহ্নি অবাক হয়ে তাকায় রুস্তমের দিকে।

“আপনি এখানে? কি চান?”
“আপা এমন একটা বিপদের দিনে আমারে একটা খবর দিবেন না আপনারা? মরে গেছি নাকি আমরা?”
বহ্নি কঠিন গলায় বললো,”আপনাকে কেনো খবর দিতে যাবো? আপনি কে?”
রুস্তমের উৎসাহে ভাটা পড়েনা, ওভাবেই হাসতে থাকে। রাগে বহ্নি মারমুখো হয়ে দাঁড়ায়।

মওদুদ বহ্নির দিকে তাকিয়ে বললো,”কি রে মা? ও কে? চিনো ওকে তোমরা?”
বহ্নি কিছু বলার আগেই রুস্তম বললো,”আবিরের বাবা আপনি তাইনা? বাপ রে, কি এক পোলা পয়দা দিয়েছেন। শান্তিই দিলো না জীবনটায়।”
“কে আপনি বলুন তো।”
“এইযে বললাম, আপনার ছেলের শত্রু। শুধু আপনার ছেলের নয়, এই উৎস বেটারও শত্রু। তা তারা কোথায়? দেখিনা তো।”
বহ্নির মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে যায়, সায়েরারও। উৎস আর আবিরকে কেনো খুঁজছে রুস্তম? কোনো ক্ষতি করতে চায় সে?
রুস্তমের পিছন পিছন ভোঁতা মুখে মতিন এসে দাঁড়ায়। তার মুখ দেখেই মনে হচ্ছে আসার আগে রুস্তমের মালিশ খেয়ে এসেছে সে ভালোমতো।

মতিনকে দেখেই সায়েরা চিনে ফেলে, ও-ই তো সেদিন রাতে উৎসকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। সায়েরার বুক কেঁপে ওঠে। আবার কি ঝামেলা পাকাতে এসেছে ওরা এখানে?

বহ্নি রুস্তমের কিছুটা কাছে এসে ফিসফিস করে বললো,”দেখুন ভাই, আমি হাতজোড় করছি আপনার কাছে। আপনি এখন চলে যান। উৎসের সাথে যদি কোনো বোঝাপড়া থাকে, ওর সাথে পরে করে নিবেন। আমরা কিসের মধ্যে আছি আপনি বুঝতে পারছেন না। রক্ত না পেলে কি হতে পারে আমরা জানিনা, জানতে বা ভাবতে চাইও না। যে মানুষটা আমাদের পরিবারের খুঁটি, সে মানুষটা না থাকলে পরিবারটা কীভাবে সোজা হয়ে থাকবে? আমরা সবাই ভেঙে পড়বো। আমি অনুরোধ করছি আপনার কাছে, এখন চলে যান।”
রুস্তম চোখের কালো সানগ্লাস খুলে মতিনের দিকে তাকায়, মতিন একটু হাসার চেষ্টা করে। হাসিটা ফোটে না ঠিকমতো।

“আপা আমি মানুষটা খারাপ, এটা আমি মানি। গর্ববোধও করি তার জন্য। নামকাম দুই কারণে হয়। ভালো নাম আর খারাপ নাম। আমি খারাপ নামে বিখ্যাত। আমারে সবাই ভয় পায় এটা আমার ভালো লাগে। কিন্তু আমি মানুষটা খারাপ হলেও আমার রক্ত খারাপ না, নষ্ট না, পচা না৷ এইটা আমি বলতে পারি। আমি অমানবিক হতে পারি কিন্তু রক্ত তো সবার সমান তাইনা? আমার রক্ত তো নীল না।”
বহ্নি হতবাক হয়ে বললো,”তার মানে?”

“মানেটা আমি বলছি বহ্নি আপা।”
বহ্নি পরিচিত কণ্ঠ শুনে ঘুরে তাকায়। প্রত্যাশা মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে। অন্যদিনের মতো বাজে জামাকাপড়ের পরিবর্তে আকাশী রঙা একটা চুড়িদার পরেছে আজ সে। কি যে স্নিগ্ধ লাগছে তাকে। মনে হচ্ছে এই রঙটা বুঝি তার জন্যই বানানো হয়েছে। ঝড়ের পরের রোদ ঝলমলে দিন যেনো মেয়েটার শরীরে খেলে যাচ্ছে। এতো সুন্দর কেনো লাগছে তাকে আজ? কেনো এতো সুন্দর হতে হবে কাউকে?

আভা এসে দাঁড়ায় ততক্ষণে বড় আপার পাশে। তার কেনো যেনো মনে হচ্ছে আঁধার কেটে যাবে, কাটতে শুরু করেছে। কেনো মনে হচ্ছে সে জানেনা, কিন্তু মনে হচ্ছে। মানুষের মন তো বড় অদ্ভুত তাইনা? কখন কি মনে হয় তারা নিজেরাও জানেনা, উৎস খুঁজে পায়না তার।

(চলবে….)

#মাতাল_প্রেমসন্ধি

পর্ব: ৪১

হাসপাতালের বারান্দায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে রুস্তম আর উৎস। ঠিক সেই আগের মতো। শুধু পার্থক্য আগে রুস্তম পাংশু মুখে দাঁড়িয়ে থাকতো আর উৎসের মুখে থাকতো হাসি। আজ তা উলটো। আজ রুস্তমের মুখে হাসি, উৎস চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। তপ্ত শ্বাস পড়ছে তার। বাকিরা তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। ডাক্তার এসে একটু পর পর তাগাদা দিচ্ছে।

“আজাদ, এই আজাদ।”
আজাদ মাথা নিচু করে উৎসের পাশে এসে দাঁড়ায়।
“বলুন উৎস ভাই।”
“তুই আমাকে বলেছিস ডোনার পাওয়া গেছে। আমি তাই শুনে চলে এসেছি। ডোনার কোথায়? আর এই ভোটকা দুইটা এখানে কেনো?”
রুস্তম অন্যদিনের মতো রাগ হয়না। আজ যেনো তার সবকিছুতে আনন্দ হচ্ছে। মুখ থেকে হাসি যাচ্ছেই না।

আজাদ মাথা নিচু করে বললো,”ভাই একটু এদিকে আসেন, আমি বুঝিয়ে বলছি।”
“ওসব কিছু বুঝাবুঝি হবে না। আমার মাথা কিন্তু গরম হয়ে আছে আজাদ। খু’ন করে ফেলবো তোকে।”
আজাদ কিছু বলতে যাবে তার আগেই একটা হাতের স্পর্শ টের পায় উৎস তার কাঁধে। উৎস ঝট করে তাকিয়ে দেখে রুস্তমের হাত। সে ঝাঁকি দিয়ে সরিয়ে দেয় হাতটা। রুস্তমের মধ্যে তেমন কোনো ভাবান্তর হয়না।

“দেখো রুস্তম, আমার মাথা এখন গরম আছে। আমার কাউকে সহ্য হচ্ছে না। দয়া করে বিরক্ত করোনা। চলে যাও এখান থেকে। আর আজাদকে আমি পরে দেখছি। আবির তুই কি যাবি আবার?”
“আরে উৎস দাঁড়াও দাঁড়াও। এতো তাড়া কিসের বলো তো? আমার একটা কথা তো শুনে যাও।”
“আমার পিতৃতুল্য মামা আইসিউয়ের বেডে জীবন মৃত্যুর মাঝে শুয়ে আছে। আর আমি এখন তোমার সাথে পিরীতের আলাপ করবো? আমার প্রেমিকা তুমি?”

“উৎস, তুমি কি যুদ্ধবিরতি মানে বোঝো?”
উৎস ভ্রু কুঁচকে তাকায় রুস্তমের দিকে।

“কি বললে? যুদ্ধবিরতি?”
“হ্যা যুদ্ধবিরতি। যুদ্ধবিরতি কিন্তু সবসময় যুদ্ধের ইস্তফা ঘোষণা করে এমন না। যখন দুই প্রতিপক্ষেরই প্রচুর ক্ষতি হয়, হতাহত হয় তখন নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয় ময়দানে। মাঝে মাঝে যুদ্ধবিরতিতেই যুদ্ধের অবসান ঘটে। আবার কখনো কখনো বিরতিকালের পরেই আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।”
“এগুলো এখন আমাকে বলার কারণ?”
“কারণটা খুব সাধারণ। আমি এখন যুদ্ধবিরতি চাচ্ছি। তোমার আর আমার। যুদ্ধ এখানেই ইস্তফা দিবে কিনা তোমার ব্যাপার। তবে আমি কিছুটা বিরতিকাল চাচ্ছি তোমার কাছে, তুমি দিবে না?”
উৎস দুই হাত বুকে বেঁধে বললো,”এটা কোনো যুদ্ধের ময়দান না আর আমি তোমার সাথে কোনো যুদ্ধ করছি না যে তুমি যুদ্ধবিরতি চাইবে। তুমি আমার অনেক ক্ষতি করার চেষ্টা করেছো। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করিনি কখনো। শুধু তোমার অন্যায় কাজে বাঁধা দিয়েছি। তাহলে আমাদের মধ্যে যুদ্ধ হলো কীভাবে?”
“তুমি যে খুব সূক্ষ্মভাবে আমার সাথে মেন্টাল গেম খেলার চেষ্টা করেছো আমি বুঝতে পেরেছি। তুমি মেধাবী, তোমার বুদ্ধি বেশি কিন্তু আমি যে নিতান্তই বোকা এমনটাও নয়। এই শহরে নিজের একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছি মুখের কথায় নয়। হ্যা খারাপ কাজ করেই করেছি কিন্তু কিছুটা বুদ্ধি তো আমারও আছে তাইনা?”
উৎস দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”কি বলতে চাচ্ছো পরিষ্কার করে বলো। আমার মাথা কিন্তু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এতো ঘোরানো পেঁচানো কথা শুনতে চাচ্ছিনা।”
রুস্তম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। সবার দিকে চোখ বুলায়। সবাই ইতোমধ্যে জেনে গেছে রুস্তম এখানে কেনো এসেছে। উৎস দেরি করে আসায় সে এখনো জানেনা।

“উৎস নওশাদ চাচার জন্য আমি রক্ত দিবো। আমার রক্তের গ্রুপ এবি নেগেটিভ। রক্ত পরীক্ষা করতে দিয়েছিলাম, ডাক্তার বলেছে কোনো অসুবিধা নেই। তার যতোটা রক্ত লাগে আমি দিবো।”
উৎস হতভম্ব হয়ে তাকায় রুস্তমের দিকে, আবিরও তাই। সে এসে উৎসের কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়ায়। এমন তাজ্জব তারা মনে হয় কোনোদিনও হয়নি।

উৎস চোখ বড় বড় করে রুস্তমের দিকে তাকিয়ে বললো,”তুমি রক্ত দিবে আমার মামাকে? তুমি?”
“কেনো উৎস? আমার রক্ত কি দূষিত? হ্যা মানছি আমি মানুষটা ভালো না। কিন্তু আমার রক্ত তো কোনো দোষ করেনি। মহাপুরুষের শরীরে পাপী পুরুষের রক্ত গেলে কি রক্ত পাপী হয়ে যাবে? রক্তের যে কোনো পাপপুণ্য নেই।”
উৎস নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। শাহানা শান্ত হয়ে বসে আছে, তার দৃশ্য যদিও এলোমেলো। বহ্নি শাড়ির আঁচল মুখে চেপে ধরে আছে। আভা এখনো কেঁদে যাচ্ছে। শীতল আশেপাশে কোথাও নেই।

আজাদ এতোক্ষণ চুপ করে ছিলো। রুস্তমের কথা শেষ হতেই সে উৎসের আরেকটু কাছে এসে দাঁড়ায়। অপরাধীমুখে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়ায় সে।

“উৎস ভাই, আমি জানিনা আপনি কোনোদিন আমাকে ক্ষমা করতে পারবেন কিনা। আমার সে মুখ নেই। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার আর কিছুই করার ছিলোনা। পাগলের মতো ক্যাম্পাস চষে বেড়াচ্ছিলাম রক্ত খুঁজতে। তখনই প্রত্যাশার সাথে আমার দেখা হয়। ও আমার কাছ থেকে সবটা শুনে বললো দুশ্চিন্তা না করতে। ডোনার পাওয়া যাবে। আর তারপর….”

উৎস আজাদকে কথা শেষ করতে না দিয়েই রুস্তমের কাছে সরে আসে।
“তুমি আমার মামাকে রক্ত দিতে চাও কেনো? কি উদ্দেশ্য তোমার? ঠিক বলো।”
রুস্তম মুচকি হেসে বললো,”উদ্দেশ্য? সবকিছুতে কি উদ্দেশ্য থাকতে হবে ছোট ভাই? মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছি, দু’একটা উদ্দেশ্যহীন কাজ কি করতে পারিনা?”
উৎস কি বলবে ভেবে পায়না। সে চাচ্ছে সামনে দাঁড়ানো এই লোকটার প্রতি প্রচন্ড রাগ করতে। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তা করতে পারছে না। এজন্য নিজের উপরই রাগ হচ্ছে তার ভীষণ।

“উৎস ভাই।”
উৎস পুনরায় চমকায়। প্রত্যাশা সবসময় তাকে নাম ধরে ডাকতো। তাকে অনেক রাগ করেছে উৎস এটা নিয়ে। তবুও ফলাফল শুন্য। কিন্তু আজ সে নিজে থেকে উৎস ভাই বলে ডাকছে। হচ্ছেটা কি এসব?

“উৎস ভাই, ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে শুনেছেন নিশ্চয়ই, এভ্রিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়্যার। ভালোবাসা আর যুদ্ধের ময়দানে যেটা করবেন আপনি, সবই ঠিক। রুস্তম একটা খারাপ লোক, বাজে লোক আপনাদের কাছে। সবার কাছেই। কিন্তু এই বাজে লোকটাকেই আমি ভালোবেসেছি। হ্যা এটাই সত্য। তাই যখন আমি তাকে বললাম রক্তের ব্যাপারে, সে একবারেই রাজি হয়ে গেলো। আপনার শত্রু আজ আপনাকে সাহায্য করতে আপনার দুয়ারে এসেছে, আপনি তাকে ফিরিয়ে দিবেন উৎস ভাই?”

উৎস থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। কি করবে বুঝে উঠতে পারেনা। অসহায় চোখে তাকায় বহ্নির দিকে। বহ্নি নির্লিপ্ত মুখে বসে থাকে।

রুস্তম প্রত্যাশার দিকে তাকিয়ে হাসে।
“উৎস, আমার সাথে তোমার বাকি যা বোঝাপড়া তা নাহয় পরে করবে। অসুস্থ মানুষটাকে আগে বাঁচাও। ভেবে দেখো, মানুষটা চলে গেলে তুমি সারাজীবন নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।”
এতোক্ষণে সায়েরা এসে উৎসের হাত ধরে বললো,”বাবা রে, তোর বাবাকে আমি বাঁচাতে পারিনি। তোকে এতীম করে দিয়ে মানুষটা চলে গিয়েছিলো। সেই থেকে এই মানুষটাই তোর সব। এই খাঁ বাড়ি টিকে আছে একটা মানুষের ভরসায়। সে ছাড়া আমরা স্রোতে ভেসে যাওয়া কচুরিপানার মতো। সে যে আমাদের শিকড়। তুই শিকড় ছাড়া হয়ে যাস না বাপ। রাজি হয়ে যা। যে নিজে থেকে সাহায্য করতে চায়, তাকে ফিরিয়ে দিস না।”
উৎস কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কি মনে করে শাহানার কাছে যায়। শাহানা এখনো সেভাবেই বসে আছে। উৎস হাটু গেড়ে বসে শাহানার সামনে।

“মামি, মামি শুনছেন আমার কথা?”
“বলো শুনছি।”
“আপনি কি চান? সবই তো শুনলেন।”
শাহানা উৎসের চোখের দিকে তাকায়। আচমকা উৎসের মাথায় হাত রেখে ঝরঝর করে কেঁদে দেয়। উৎস ঢোক চেপে অন্যদিকে তাকায়।

“উৎস মনে করো তোমার কলিজার একটা অংশ কেউ কেটে নিয়ে চলে যাচ্ছে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাটছে সে। সেই কলিজার টুকরোটুকু বাঁচানোর জন্য তুমি কি পৃথিবী উল্টেপাল্টে দিতে চাইবে না? বলো তো।”
উৎস আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে ক্ষীণ গলায় বললো,”চাইবো মামি।”
“তাহলে দেরি করোনা আব্বাজান। মেনে নাও সবটা। রক্ত কখনো পাপী হয়না, পাপী হয় মানুষটা।”
উৎস চমকে ওঠে। উৎস অনেক ছোট থাকতে শাহানা তাকে আব্বাজান বলে ডাকতো, তখন উৎসের বাবা বেঁচে ছিলো। একটা পুত্র সন্তানের খুব শখ ছিলো শাহানার। এজন্যই উৎসকে সে তখন পছন্দ করতো। আজ এতোগুলো বছর পর আবার সেই ডাক শুনে কলিজাটা ঠান্ডা হয়ে যায় উৎসের।
সে আর এক মুহুর্তও দেরি না করে উঠে দাঁড়ায়। রুস্তমের সামনে এসে দাঁড়ায়। রুস্তমের মুখে এখনো হাসি।

“তবে উৎস তুমি কি যুদ্ধবিরতিতে রাজি?”
উৎস ম্লান হেসে বললো,”আর যদি যুদ্ধের ইস্তফা দিতে চাই?”
“চাইতে দোষ নেই, তবে আমার একটা শর্ত আছে।”
“কি শর্ত?”
“আমাকেও ওই মহাপুরুষ বানানোর ট্রেনিং স্কুলে ভর্তি করে দিতে হবে। পাপ তো করলাম অনেক, পাপমোচন করা দরকার এখন। বিউটি অ্যান্ড বিস্ট গল্পেই সম্ভব। বাস্তবে একটা পরীর সাথে দানবের নয় বরং শুদ্ধতম মানুষের মিল হওয়া উচিত।”
রুস্তম আড়চোখে তাকায় প্রত্যাশার দিকে। প্রত্যাশা শব্দ করে কেঁদে দেয়। কি যে একটা শান্তি হচ্ছে তার। না সে মানুষ চিনতে ভুল করেনি তবে। জীবনে করা হাজারটা ভুলের মধ্যে রুস্তমকে বেছে নেওয়া তার একটা সঠিক সিদ্ধান্ত।

উৎস হঠাৎ করে রুস্তমকে বুকে টেনে নেয়। এতোক্ষণ একটুও কাঁদতে পারেনি সে। রুস্তমকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দেয় সে। রুস্তম হাসতে হাসতে প্রত্যাশার দিকে তাকিয়ে বললো,”ধুর বাবা, চোখে কি পড়লো দেখো তো? পানি পড়ে ক্যান? কি বিরক্তিকর। এই মতিন হারামজাদা, হাসিস কেনো? মেরে ঠ্যাং ভেঙে দিবো বদমাশ।”
মতিন মাথা চুলকাতে চুলকাতে হাসে। তার নিজেরও কান্না পাচ্ছে। আচ্ছা কান্না কি ছোঁয়াচে কোনো রোগ নাকি? ধুর!

“শীতল, এই শীতল।”
শীতল ধড়ফড় করে জায়নামাজ থেকে উঠে দাঁড়ায়। হাসপাতালের প্রাঙ্গনেই ছোট্ট একটা জায়গা বাচ্চার মায়েদের জন্য আলাদা করে ঘিরে রাখা। শীতল ওখানেই তখন থেকে ঠাঁয় বসা জায়নামাজে। শরীরে একবিন্দু শক্তি নেই তার। উঠতে গেলেই মাথা ঘুরে যায় তার। বহ্নি দুই হাতে জাপটে ধরে তাকে।

“শীতল ঠিক আছিস তুই?”
“আপা আমার কথা ছাড়। কি বলতে এসেছিস?”
বহ্নি কিছু বলতে যাবে তার আগেই শীতল আবার কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,”আপা আগে থেকে বলছি ভালো খবর হলে দিবি। আর যদি, আর যদি….”
শীতল কথা শেষ করতে পারেনা। আর যদি.. অন্য কিছু ভাবতে পারেনা সে। আভাও এসে দাঁড়িয়েছে বহ্নির পিছনে ততক্ষণে।

“শীতল ডোনার পাওয়া গেছে। বাবাকে রক্ত দেওয়া হয়েছে। এখনো আইসিউ থেকে বের করা হয়নি। তবে মনে হচ্ছে আঁধার কেটে যাচ্ছে শীতল। আঁধার কেটে আলো ফুটছে বোন আমার….”
বহ্নি কথা শেষ করতে পারেনা। ঠোঁট কামড়ে ধরে হু হু করে কেঁদে দেয়।
শীতল চিৎকার করে ওঠে, জড়িয়ে ধরে আপা শক্ত করে। আভাও দুই বোনকে জড়িয়ে ধরে একসাথে। সবাই যেতে যেতে অবাক হয়ে দেখে। বাগানে সদ্য ফোটা তিনটা গোলাপ যেনো জড়াজড়ি করে কাঁদছে। বিষাদের নয়, আনন্দের কান্না। এই সুন্দর দৃশ্য বেশিক্ষণ চোখে দেখা যায়না, বুকের মধ্যে চিলিক দিয়ে ব্যথা করে ওঠে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এই দৃশ্যের চেয়ে জ্যোৎস্নাস্নাত রাত সুন্দর না, এই দৃশ্যের চেয়ে রোদ ঝলমলে দিন সুন্দর না, এই দৃশ্যের চেয়ে ভোরে রাস্তায় পড়ে থাকা অগণিত বকুল সুন্দর না। এই দৃশ্যই শুধু সুন্দর। যে অবলোকন করতে পারে সে-ই বোঝে। এই কান্নার একটা বৈশিষ্ট্য আছে। এই কান্না সবাইকে কিশোরী বানিয়ে দেয়, উচ্ছল কিশোরী।

পরের দিন ভোর পাঁচটার দিকে নওশাদের জ্ঞান ফেরে। খবরটা যখন ডাক্তার বাইরে বসে থাকা রোগীর আপনজনদের দিতে আসে তখন সে অবাক হয়ে যায়। এমন দৃশ্য সচারাচর দেখা যায়না। তারা ডাক্তার, অনেক রকম মানুষের সাথে তাদের দেখা হয়। কোনো কোনো রোগীর তেমন কোনো আত্মীয় স্বজন আসেনা। মারা গেলেও না। দুই/চারজন এসে লা’শ ডিসচার্জ করে নিয়ে যায়। আবার কারো কারো সাথে অনেকে আসে, হইহট্টগোল করে কেবিনের বাইরে। এতে অন্য রোগী বিরক্ত হয়। বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষকে ঠেকাতে হয় রোগীর আত্মীয়স্বজনের কোন্দল। কিন্তু এই রোগীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যরকম। অনেক মানুষ এসেছে তার জন্য। কেউ গতকাল থেকে নড়েনি। সবচেয়ে মজার বিষয় ডোনার পর্যন্ত যায়নি এখান থেকে। এখানেই সবার সাথে বসে আছে মেঝেতে। তার সাথে আসা একটা রূপবতী মেয়ে, সে-ও সারারাত এখানেই ঠাঁয় বসা। রোগীর সন্তানদের কথা তো বাদই দেওয়া যাক। এমন সন্তান যে ঘরে থাকে, তার চাঁদ দেখতে পূর্ণিমা তিথির জন্য অপেক্ষা করতে হয়না। সত্যিই লোকটা ভাগ্যবান। তাদের এই ডাক্তারি পেশায় এতোটা অবাক হলে চলে না, কিন্তু মাঝে মাঝে না চাইতেও অবাক হতে হয়। নাহলে যে প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ হয়ে যায়।

বহ্নি, শীতল আর আভা তিনজন জড়াজড়ি করে বসে ছিলো। সায়েরার কোলে মাথা দিয়ে শাহানা শুয়েছে। সায়েরাই জোর করেছে, নাহলে তার শরীরের অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছিলো। সায়েরা শাহানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। উৎস আর আবির বারান্দার এক কোণায় পা ছড়িয়ে দিয়ে বসা। উৎসের কাঁধে আবিরের মাথা। রণ আর মওদুদ অন্যপাশে। মতিনের তুলার বালিশের মতো পেটের উপর মাথা দিয়ে আজাদ শুয়ে আছে।
প্রত্যাশা শান্তভাবে পা নাড়ছে চেয়ারের উপর বসে, রুস্তম তার পায়ের কাছে মাটিতে বসা। তার শরীর ভীষণ দূর্বল। অনেকটা রক্ত গেলো শরীর থেকে। রণ তাকে ডাব, ডিম এগুলো খাইয়েছে। প্রত্যাশা অনেক জোর করেছিলো তাকে চলে যাওয়ার জন্য। সে যায়নি। যতোক্ষণ মায়াবতীটার পাশে থাকা যায়, ততক্ষণই শ্রেষ্ঠ সময়। এটুকু দূর্বলতা কিছুই না।

কেউ কোনো কথা বলছে না, কোন্দল, কান্নাকাটি করছে না। অতি শান্তভাবেও যে এমন ঝড়ো পরিস্থিতি সামলানো যায় এই সাধারণ পরিবারটাকে না দেখলে বোধহয় ডাক্তার বুঝতো না।

“শুনছেন?”
একযোগে সবাই ডাক্তারের দিকে তাকায়। ডাক্তারের হাসিমুখ দেখে সবাই যা বোঝার বুঝে যায়। এতোক্ষণে যেনো খরা কাটে এই সাধারণ পরিবারের অসাধারণ মানুষগুলো। কে যে কাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে কেউ বুঝতে পারছে না। ও হ্যা, বাড়িতে থাকতে না পেরে আলেয়াও চলে এসেছিলো একাই হাসপাতালে। দুশ্চিন্তা আর নিতে পারছিলো না সে বাড়িতে থেকে। রণ তো বহ্নি ভেবে তাকেই জড়িয়ে ধরে খুশিতে। রাগে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে আলেয়া। তার ধারণা সে রূপবতী বলে এই পাজি ছোকরা ইচ্ছা তাকে জড়িয়ে ধরেছে। রণকে এক ধাক্কা দিয়ে দূরে চলে যায় সে।

মুহুর্তের মধ্যে একটা উৎসব শুরু হয়ে যায় জায়গাটায়। প্রত্যাশার মনে হলো এমন সুন্দর সময় তার জীবনে কোনোদিন আসেনি। মনে হচ্ছে ওই মানুষটা তার নিজের কেউ আর এই বাড়িটা তার নিজের বাড়ি। একদিন এই পুতুল পুতুল মেয়েগুলোকে সে অপমান করার চেষ্টা করেছিলো। তাদের ছোট্ট ঘরে সবাই কীভাবে থাকে এটা বলে। আজ তার মনে হচ্ছে তাদের ছোট্ট ঘরটায় যে অনাবিল সুখ আছে, তার বিশাল আর প্রকান্ড ঘরে সে সুখের কানাকড়িও নেই। এই সুখ বুঝতে গেলে তাকে সে আসতেই হতো এদের কাছে।
খপ করে রুস্তমের হাত চেপে ধরে প্রত্যাশা। হতবাক হয়ে যায় রুস্তম।

“কিছু কইবা প্রত্যু?”
“থ্যাংক ইউ রুস্তম, থ্যাংক ইউ সো মাচ। আমাকে এই খুশিটুকু দেখানোর জন্য। আমি জানিনা আমার এতো খুশি কেনো লাগছে। মনে হচ্ছে আমি ওদেরই কেউ।”
রুস্তম উত্তরে কিছু বলেনা। কিছু কথার কোনো উত্তর হয়না। সে শুধু প্রত্যাশার হাতে পালটা আলতো চাপ দিয়ে ছোট্ট করে হাসে। যে হাসির মানে অনেক কিছু।

ঠিক তখনই প্রত্যাশার বাবা মোসাদ্দেক হোসেন ওখানে আসে। তার কাছে খবর এসেছে তার মেয়ে সারারাত বাড়িতে না যেয়ে একটা হাসপাতালে বসে আছে, মেয়ের ড্রাইভার জানিয়েছে। মোসাদ্দেক ব্যবসার কাজে বাইরে ছিলো। এই কথা জানতে পেরে বাড়িতে না ঢুকে সোজা এখানে চলে এসেছে। তার মেয়ে কিনা সারারাত একটা হাসপাতালের বারান্দায়? এটাও বিশ্বাস করার ছিলো? নিজের চোখে না দেখলে যে বিশ্বাস করা অসম্ভব।

বাবাকে দেখে দৌড়ে ছুটে আসে প্রত্যাশা। বাবার বুকে মাথা নেড়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে সে। রুস্তম মাথা নিচু করে দাঁড়ায়।

“মামণি হোয়াট হ্যাপেনড? কাঁদছো কেনো এভাবে?”
প্রত্যাশা ফোঁপাতে থাকে, কিছু বলতে পারেনা। এতোটা আনন্দ কোনোদিন হয়নি তার।
“মামণি বলবে তো কি হয়েছে?”
“বাবা, ও বাবা উনি বেঁচে গেছেন বাবা। আমার এতো খুশি কেনো লাগছে? আমি যে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছি না।”
“ঠিক আছে, সবই বুঝলাম, কিন্তু এরা কারা? কীভাবে পরিচয় তোমার এদের সাথে?”
“ওরা আমার কেউ না বাবা, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ওরা আমার সব। ওরা আমার অনেক কিছু।”
মোসাদ্দেক কিছু না বুঝে মেয়ের মাথাটা বুকে চেপে সবার দিকে একবার চোখ বোলায়। কি আশ্চর্য, মানুষগুলোকে তার নিজেরই এতো ভালো লাগছে কেনো?

শাহানা আলুথালু পায়ে এগিয়ে যায় ডাক্তারের কাছে। হাত জোড় করে দাঁড়ায় তার সামনে।
“আমি কি আমার সোনাপাখিটাকে একটু দেখতে পারবো ডাক্তার?”
ডাক্তার মৃদু হেসে বললো,”সোনাপাখিকে একটু পরেই কেবিনে দেওয়া হবে। মন ভরে দেখবেন, আজীবন দেখবেন। কেউ বারণ করবে না।”
ডাক্তার চলে যায়। এখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। মানুষগুলো মাত্রাতিরিক্ত ভালো। এতো ভালো মানুষের সংস্পর্শে বেশিক্ষণ থাকলে নিজেকে তুচ্ছ মনে হয়।

পবিত্র মুখগুলোর চোখের পানি ছাপিয়ে যায়। ভোরের পবিত্র আলোয় যেনো আরো সুন্দর দেখায় সেই মুখগুলো। ধারেকাছেই মসজিদ। মসজিদের মাইক থেকে তখন মুয়াজ্জিনের দরদমাখা সুরেলা কণ্ঠে ভেসে আসছে আজানের সুর।
“আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম।”

(চলবে.…..)

[পরবর্তী পর্বেই অন্তিম পর্ব।]