#মাতাল_প্রেমসন্ধি
অন্তিম পর্ব (প্রথম খণ্ড)
আচ্ছা সময় পরিবর্তন হয় কিন্তু মানুষের স্বভাব কি পরিবর্তন হয়? হয়না মনে হয়। তেমনই চার বছরে এতোটুকুও পরিবর্তন হয়নি ‘খাঁ’ বাড়ির মানুষগুলোর স্বভাব। নওশাদ এখনো অফিসে যাওয়ার আগে মিনমিন করে ‘একটু কি চা পাবে এই অধম?’ বলে, এখনো সকাল হতে না হতেই শাহানা সায়েরার সাথে একটু ঝগড়া করে নেয়, অনেকটা প্রাতঃরাশের মতো। বরাবরের মতো সায়েরা নির্বিকার।
তবে হ্যা, চার বছরে সব কিছু যে অপরিবর্তিত থেকে গেছে এমনটাও নয় কিন্তু। বেশ কিছু পরিবর্তনও এসেছে। রণ-বহ্নির ঘরে এসেছে মিষ্টি পরী নীলু, পুরো নাম নীলাঞ্জনা। নামটা নওশাদ খাঁ এরই রাখা। তবে সে লুকিয়ে লুকিয়ে তার ছোট্ট বছর দুইয়ের নাতনিকে দোয়েল পাখি বলেও ডাকে। ছোট্ট নীলু তখন দুই পাটি দাঁত বের করে খিলখিল করে হাসে। নওশাদের বড় ভালো লাগে সেই দৃশ্য। চোখ ভরে দেখতে ইচ্ছা করে। ছোট্ট নীলু যেনো বহ্নিরই আরেক রূপ। কি যে মায়া!
রণেরও এসেছে আমূল পরিবর্তন। পিতৃবিয়োগের মাস চারেক পরেই ব্যাংকের উঁচু পদে পদোন্নতি হয়। শোনা যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি লোন নিয়ে ফ্লাটও কিনে ফেলবে। বহ্নির শ্বাস ফেলার সময় কই? স্কুলে চাকরি নিয়েছে। ছাত্র পড়িয়ে, দুষ্টু কন্যা আর কন্যার বাপকে সামলে তার ত্রাহিত্রাহি অবস্থা। নওশাদ একটু ফুরসৎ পায়না মেয়েটাকে পাশে বসিয়ে দু’দণ্ড গল্প করার। অগত্যা নীলুকে নিয়েই কাটে তার অবসর সময়। খাঁ বাড়ির পাশেই আপাতত বাসা ভাড়া নিয়েছে বহ্নি। বাচ্চাটাকে মা আর ফুপুর কাছে রেখেই তার স্বস্তি। বাড়ি এখন নীলুর আধো আধো বুলিতে মুখর থাকে সবসময়।
পড়াশোনা শেষ করে আর চাকরির চেষ্টা করা হয়নি আবিরের। মওদুদ দুম করে মারা গেলো। বড় শখ করে অপেক্ষা করে ছিলো সে মৃত্যুর জন্য। মারা গেলেই তার রেশমার সাথে দেখা হবে এই অপেক্ষা তাকে শেষের দিকে ঘুমাতে দিতো না। মৃত্যু খুব যন্ত্রণাদায়ক, তবে সেই যন্ত্রণার জন্য মওদুদ খুব আগ্রহভরে অপেক্ষা করতো। তাই তো কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে হঠাৎ একদিন মারা গেলো। এতো বড় ব্যবসা, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো আবিরের। আস্তে আস্তে তাকে সব গুছিয়ে নিতে হলো। চাকরি খোঁজার সময় কোথায়? যদিও তার ইচ্ছা ছিলো চাকরি করবে। ওসব ব্যবসা বাণিজ্য তাকে দিয়ে হবে না। কিন্তু ভাগ্যের লিখন কি মোছা যায়? গ্রাম থেকে সব ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে শহরের থিতু হয়েছে। না হয়েও উপায় ছিলো না। আভার পড়াশোনা এদিকে। সে শহরে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে আর আবির নিজে গ্রামে পড়ে থাকবে তাতো হয়না। বউকে ছাড়া তার দমবন্ধ হয়ে যায়। গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে ছোট্ট একটা ফ্লাট কিনে সাজিয়েছে টোনাটুনির সংসার। যেখানে টোনার প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙে টুনির মিষ্টি কিচিরমিচির আওয়াজে।
তবে আমূল পরিবর্তন এসেছে আরো দু’টো মানুষের। শীতল আর উৎস।
সেই শীতল আর ছিঁচকাঁদুনে নেই। কলেজের গন্ডি পার করেছে সেই কতো আগে, দেখতে দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পার হওয়ার সময় এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্রী সে। তার বিষয় পদার্থবিজ্ঞান। পদার্থবিজ্ঞানের মতো কঠিন বিষয়ের ছাত্রী হওয়ার সুবাদে তার মধ্যেও এসেছে কাঠিন্য। ভারী চশমা নিয়েছে বছর তিনেক হলো। কালো ফ্রেমের ভারী চশমাটা চোখে নিয়ে সে যখন রাত জেগে মোটা বইটা হাতে ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে পড়তে বসে, নওশাদের খুব মায়া হয়। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে সে তার সেই ছোট্ট ছিঁচকাঁদুনে মেয়েটাকে। চোখেমুখে কাঠিন্য এলেও, হৃদয় স্পষ্ট করতে পারেনি তা। হৃদয়টা এখনো সরল, এখনো শান্ত। শুধু রূপটা কয়েকগুণে বেড়েছে। সন্ধ্যায় ভার্সিটি থেকে ফেরার পর গোসল করে ক্লান্তশ্রান্ত শরীরে যখন বারান্দায় বসে চুল শোকায় আর গুণগুণ করে গান করে তখন শাহানার মনে হয় কোথায় সবকিছু পাল্টেছে? কিছু পাল্টায়নি তো। সব তো আগের মতোই আছে। শুধু চুলে পাকটা নাহয় ধরেছে তার আর মেয়েদের বাবার। তাই বলে সব কি পালটে যেতে পারে? হাজার বছর ধরে এ সংসার তো একই রকম থাকবে। শুধু বদলাবে মানুষগুলো। অনুভূতি থাকবে একইভাবে, অপরিবর্তিত হয়ে।
আর উৎস? আচ্ছা থাক, উৎসের কথা কিছুক্ষণ পরেই বলি।
তবে আরো কিছু মানুষের কি পরিবর্তন আসেনি তা নয়। সেই মানুষের মধ্যে অন্যতম হলো স্বয়ং রুস্তম। ওই ঘটনার পর আকস্মিকভাবে তার পরিবর্তন হয়েছে। তার ধারণা তার দূষিত রক্ত এক মহাপুরুষের শরীরে প্রবাহিত হওয়ায় সে আচমকা ভালো হয়ে গেছে। এটা সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু কেউ বোঝেনি, সবাই হেসেছে বরং। এজন্য সে আর কাউকে বোঝাতে যায়না। যেটুকু বুঝেছে নিজের মধ্যেই থাকুক। সে যে এখন চাইলেও খারাপ কাজে জড়াতে পারেনা, এটা কেউ বিশ্বাস কেনো করেনা? না করুক, একজন বিশ্বাস করলেই হবে। তার ভালোবাসা, তার প্রিয়তমা স্ত্রী প্রত্যাশা, তার প্রত্যু। হ্যা, বছর দুয়েক হয় রুস্তম আর প্রত্যাশার বিয়ে হয়েছে। বেশ সুখেই আছে তারা। শুধু মতিন একটু চাপে আছে। তাকে কঠিন ডায়েট চার্ট ফলো করায় প্রত্যাশা। তার সামনে ইয়া মোটা কেউ ঘোরাঘুরি করবে এটা তার পছন্দ না। সকাল বিকাল দৌড়ের উপর রাখে মতিনকে। বেচারা না পারে কাউকে কিছু বলতে না পারে সইতে। তবে ইদানীং লাভলী কেনো যেনো মতিনের এই কষ্ট চোখে দেখতে পারেনা। এ নিয়ে শীতলযুদ্ধ চলছে ননদ-ভাবীতে। ভাবী চায় মতিন শুকায় পাটকাঠি হয়ে যাক, ননদ চায় সে যেমন আছে তেমন থাকুক। এই যুদ্ধে এখনো বোঝা যাচ্ছে না কে জিতবে। দেখতে হলে অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। শুধু মতিন বুঝতে পারেনা, লাভলী কেনো তার হয়ে এই যুদ্ধটুকু করছে? মাঝে মাঝে মতিনের চোখে পানি চলে আসে। সে ঠিক করেছে সেই সামান্য যুদ্ধটুকুর বিনিময়ে সে লাভলীর জন্য পুরো দুনিয়ার সাথে লড়াই করতে পারবে। যদিও এ কথা সে কাউকে জানাতে পারেনি এখনো, খুব লজ্জা লাগে যে!
প্রতিদিনকার মতো আজকেও খাঁ বাড়িয়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড। যদিও আজকের দিনটা সব দিনের চেয়ে আলাদা, একদম আলাদা, একদম অন্যরকম। আজকের দিনের সবকিছু সুন্দর। ভোরবেলা যে পত্রিকাওয়ালা বাড়ির ভিতর পত্রিকা ছুড়ে দিয়ে গেলো সে সুন্দর, শীতের আগাম বার্তা বয়ে আনা গাছের পাতাগুলো সুন্দর, কুয়াশার চাদরে মোড়া সূর্যটা উঁকি দিলো আস্তে আস্তে, সেই রশ্মি সুন্দর। সব সুন্দর, সব। যে সৌন্দর্যের কোনো সীমানা নেই। প্রকৃতি আসলে সবসময়ই সুন্দর তবে যেদিন প্রকৃতির বুকে বেড়ে ওঠা মানুষগুলোর জানে শান্তির হাওয়া বয়ে যায় সেদিন তারা নতুন করে প্রকৃতির সৌন্দর্য খুঁজে পায়।
আজ নওশাদ অফিসে যায়নি, রণও যায়নি। গতকাল রাত থেকেই রণ তার পরিবার নিয়ে এখানেই আছে। বহ্নি যেনো ফুলে ফুলে ওড়া প্রজাপতির মতো উড়ছে। কষ্ট বোঝানোর মাধ্যম আছে, অশ্রু। কাঁদলেই মানুষ বোঝে সে কষ্টে আছে। কিন্তু অতিরিক্ত আনন্দ বোঝানোর মাধ্যম কি? ওরা জানেনা। আর জানেনা বলেই এভাবে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। তবুও যেনো আনন্দের কমতি নেই।
আভাও আজ ক্লাসে যায়নি। আবিরকে নিয়ে সোজা চলে এসেছে এখানে। খুশি উপচে পড়ছে চোখমুখ থেকে। আবির নিজেও একটু পর পর চোখ মুছছে। হঠাৎ কেনো যে চোখটা এমন পানিতে ভরে আসছে সে বুঝতে পারছে না। অতিরিক্ত আনন্দে বুঝি বুক ভরে শ্বাসও নেওয়া যায়না, বুকে ব্যথা করে।
“ব্যাপার কি সায়েরা? তুমি এটাই প্রমাণ করতে চাইছো যে ও তোমার একার ছেলে? আমরা কেউ নই তার?”
শাহানার কথায় সায়েরা মুখ ভোঁতা করে বললো,”এমন কথা মনে আনাও যে পাপ ভাবী। আমি কখন এ কথা বললাম?”
“যদি তা-ই হয়, আমাকে আমার কাজ করতে দাও। একদম বিরক্ত করোনা। ভাই-বোন বিরক্ত করার মেশিন একেবারে।”
সায়েরা তবুও মিনমিন করে বললো,”বলছিলাম ভাবী, ও কি একদিনেই এতো কিছু খাবে নাকি? আছেই তো এখানে বেশ কিছুদিন। আস্তে আস্তে নাহয় খাওয়াবে আরো। কিন্তু বাড়িতে তো আরো দু’টো জামাই আছে, তাদেরকে অল্পস্বল্প দিয়ে সব তুলে রাখছো ওর জন্য।”
শাহানা সরু চোখে তাকায় সায়েরার দিকে। সায়েরা ভয়ে ঢোক চাপে।
“তুমি আমার সামনে থেকে যাও সায়েরা, দয়া করে যাও। তোমাকে দেখলেও বিরক্ত লাগছে। নাকি ছেলে মস্ত বড় পুলিশ অফিসার হচ্ছে বলে ধরাকে সরা জ্ঞান করছো না?”
সায়েরা অবাক হয়ে বললো,”এ কি বলছো ভাবী? এমন কথা আমি স্বপ্নেও…”
শাহানা তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় সায়েরার দিকে, সায়েরা চুপ করে যায়। জোর করে হাসার চেষ্টা করে। সাথে সাথে রান্নাঘর ছাড়ে সে। সেই একটা বছর থেকে বাড়ির সবাই দিন গুণছে। ট্রেনিং শেষে এএসপি হয়ে উৎস ফিরবে বাড়ি। শাহানা নিজেও কি দিন গোণেনি? গুণেছে। সায়েরা জানে তার মতো করেই আরেকজন মায়ের পরম মমতা দিয়ে অপেক্ষায় দিন গুণেছে এই একটা বছর। যে অপেক্ষায় কোনো মেকিভাব নেই, লোভ নেই, চাহিদা নেই। শুধু একরাশ ভালোবাসা আছে। এই ভালোবাসাটুকু সায়েরা নষ্ট করতে চায়না। শাহানাকে রান্নাঘর ছেড়ে দিয়ে সে নিজের ঘরে আসে। আসার আগে শীতলের ঘরের দিকে একবার উঁকি দেয়। মেয়েটাকে আজকাল অতিরিক্ত রূপবতী লাগছে। কারণ কি? মনটা অনেক ভালো তাই? হতে পারে। কেউ যখন অতিরিক্ত সুখে থাকে, ভালো লাগায় মুড়ে থাকে তখন চেহারার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। সায়েরা ছোট্ট করে হেসে সেখান থেকে চলে যায়। থাকুক মেয়েটা একা কিছুক্ষণ। শেষ সময়ের অপেক্ষাটা একা একা উপভোগ করুক। এই অপেক্ষায় অদ্ভুত একটা শান্তি আছে।
শীতলের ঘুম হয়নি গত দুই রাত। কেমন একটা অস্থিরতায় কেটেছে। নিজেকে নতুন বউ বউ মনে হয়েছে তার। লজ্জায় মাঝে মাঝেই লাল, নীল, বেগুনী হয়ে যাচ্ছে। খেতেও পারছে না ভালো করে। খাবার সামনে নিয়ে নাড়াচাড়া করছে কিন্তু গলা দিয়ে কিচ্ছু নামছে না। নওশাদ চিন্তিত, মেয়ে কেনো কিছু খাচ্ছে না। শুধু শাহানা ভ্রু কুঁচকে বলে,”না খেলে উঠে যা, খাবার নষ্ট করছিস কেনো?”
মা হয়ে মেয়ের মনের নাগাল পাবে না, তাই কি হয়? এই মেয়েকেই তো ন’মাস গর্ভে ধারণ করেছে সে।
শীতলের আগামীকাল পরীক্ষা, শ্রোডিঙ্গারের ইকোয়েশনটা কোনোভাবেই মাথায় ঢুকছে না তার। শ্রোডিঙ্গারের বিড়ালটা মনে হচ্ছে তার বুকের মধ্যে এসে ড্রাম বাজাচ্ছে। এমন অদ্ভুত অনুভূতি আগে কখনো হয়নি তার। মনে হচ্ছে নিজের বুকের মধ্যে একটু একটু করে জমানো ভালোবাসার মানুষটাকে সে প্রথমবার দেখবে, একদম নতুন করে। বারবার গলা শুকিয়ে আসছে কিন্তু পানি খেতে ইচ্ছা করছে না। পানি খেলেই কেমন বমি আসছে। এমন কেনো হচ্ছে তার?
কতোশত রাত জাগা মুহুর্তগুলো চোখের সামনে ভাসছে তার। চিলেকোঠার ঘরটায় কালো টি শার্ট আর ধূসর ট্রাউজার পরা অসম্ভব সুদর্শন যুবকটা কাঠের চেয়ারে বসে পড়তো একমনে। শীতল দরজার ফাঁকা দিয়ে তাকিয়ে থাকতো তার দিকে। সে নিজেও ঘুমাতো না৷ মানুষটা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে আর সে কিনা স্বার্থপরের মতো ঘুমিয়ে যাবে? না তা হয়না। সে নিজে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। উৎস সদ্য পাশ করে বিসিএসের জন্য উন্মাদের মতো লেগে গেছে। কোনোদিকে নজর নেই তার, কারো সাথে তেমন কথা বলতো না। শুধু সকালে শীতলের চোখের নিচে কালি দেখে ঠান্ডা গলায় বলতো,”আর কতো রাত জেগে থেকে নিজেকে কষ্ট দিবে?”
শীতল মৃদু হেসে বলতো,”যতোদিন আপনি ভালোবেসে ঘুম পাড়িয়ে না দিবেন।”
কথাটা বলে শীতল দাঁড়াতো না, উৎসকে হতভম্ব অবস্থায় রেখে চলে যেতো। উৎস পকেট হাতড়াতো একটা সিগারেটের আশায়। কিন্তু না, সিগারেট আর ধরেনি সে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতটাকে সোনালী চাদরে মুড়ে দিতে, এক আকাশ সমান সৌন্দর্য আর মায়া নিয়ে পৃথিবীতে আসা রমনীটির জন্য এটুকু স্যাক্রিফাইস করাই যায়।
প্রথমবার যখন বিসিএসে সে টিকতে পারলো না তখন একরাশ হতাশা ঘিরে ধরে উৎসকে। সবকিছু ছেড়েছুড়ে পুনরায় সিগারেটকে টেনে নিবে যখন সেই হাত খপ করে ধরে ফেলে শীতল। হাতটা নিজের মুখে চেপে ধরে। কিচ্ছু বলেনা মুখে, শুধু চোখ দিয়ে এমন কিছু বলে উৎস নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। যা কিছু হয়ে যাক, সফলতা না আসা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতেই হবে।
পরের বছর যে দিনটায় উৎসের চূড়ান্ত ফলাফল দেওয়া হয় সেই দিনটাও এই দিনের মতোই সুন্দর ছিলো। স্মৃতির পাতায় এখনো সেই দিনটা জ্বলজ্বল করে শীতলের। উৎস দিকবিদিকশুন্য হয়ে সবার মধ্যে যখন তাকে জড়িয়ে ধরে, শীতলের মনে হচ্ছিলো স্বর্গ থেকে এক খন্ড সুখ টুপ করে পৃথিবীতে এসে পড়েছে। বাকিরা সবাই খুশির চোটে কে কাকে জড়িয়ে ধরছে খেয়ালই করেনি। রণ তো আরেকটু হলে রুস্তমকে জড়িয়ে চুমু খেতে যাচ্ছিলো, শেষমেশ বহ্নি এসে তাকে আটকাতে সক্ষম হয়। এই লোকটাকে নিয়ে তার লজ্জার শেষ নেই।
হ্যা সেই দিনটা এই দিনটার মতোই সুন্দর ছিলো। পুলিশ ক্যাডারে সরাসরি এএসপি হিসেবে যোগদান, তার আগে এক বছরের ট্রেনিং। সেই ট্রেনিং শেষে আজ উৎস ফিরবে বাড়ি। এজন্যই তো এতো আয়োজন আর এতো খুশি বাড়িতে। ঠিক যেনো উৎসব লেগেছে।
শীতল পা টিপে টিপে সেই জামগাছটার নিচে এসে দাঁড়ায়। দোতলা করা শেষ হয়ে গেলেও শীতল উঠোনে বাবাকে কোনো কাজ করতে দেয়নি। তাদের তিন বোনেরই ভীষণ পছন্দের জায়গা এই উঠোন, এই জামগাছের নিচের শান বাঁধানো বেদীটা। এখানে হাজারটা স্মৃতি আছে তিন বোনের প্রেমের। কীভাবে সেই স্মৃতি মুছে ফেলবে তারা? নওশাদও মেয়েদের কথা ফেলে দেয়নি। জামগাছ তার বেদী নিহে বহাল তবিয়তে টিকে আছে খাঁ বাড়ির উঠোনে।
গাছটার নিচে এসে বড় করে একটা শ্বাস নেয় শীতল। ঠিক এই গাছটার নিচে এক বছর আগে কেউ একজন তার হাত ধরে প্রতিজ্ঞা করেছিলো।
“শীতল ফিরে এসে তোমার নির্ঘুম রাতগুলোর বিনিময়ে ভালোবাসা ফিরিয়ে দিবো। একেকটা রাতের বিপরীতে এক সমুদ্র সমান ভালোবাসা। চলবে তোমার?”
শীতল সেদিন কাঁদেনি, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো ওই চোখজোড়ার দিকে। যে চোখজোড়া মহাকাশের মতো গভীর আর মহাসমুদ্রের মতো কখনো উত্তাল, কখনো শান্ত। একটা বছরের প্রতীক্ষা এতোটা কঠিন হবে শীতল ভাবতে পারেনি।
হাতের মুঠো থেকে একটা ছোট্ট চিরকুট বের করে। এই এক বছরে কতো সহস্র বার যে এই লেখাগুলো পড়েছে সে নিজেই জানেনা। মাত্র কয়েকটা লাইন কিন্তু এই কয়েকটা লাইনে কতো লক্ষ কোটি অনুভূতি আর আবেগ মিশে আছে তা শুধু শীতল জানে। যাওয়ার আগে উৎস তার হাতের মধ্যে চিরকুটটা দিয়ে বলেছিলো, আমি না ফেরা পর্যন্ত এখানেই নাক ডুবিয়ে রেখো।
তুমি ওখানেই আমার এই প্রশস্ত বুকের গন্ধটুকু পাবে। শীতল প্রথমে ভেবেছিলো সবই মানুষটার দেওয়া স্বান্তনা। কিন্তু না, প্রথম রাতেই সে প্রমাণ পেয়েছিলো মানুষটা তাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়নি। সে অনেকক্ষণ নাক ডুবিয়ে রেখেছিলো কাগজটায়। না কোনো পারফিউমের আর না তো সিগারেটের ধোঁয়ার। একদম বিশুদ্ধ একটা গন্ধ, সেই বিশুদ্ধ মহাপুরুষের। আজ এতোগুলো দিন পরেও সেই গন্ধ অমলিন যেনো।
‘নিজেকে সামলে চলেছি,
তোমার নেশা ধরানো চোখ দু’টো দেখে।
চোখ নয় যেনো দু’টো শুকতারা।
পলকে পলকে হয়ে যাই দিশাহারা।
ভ্রু দু’টি যেনো কৃষ্ণ গোলাপের পাপড়ি।
মন কেড়ে নেয় দিবা শর্বরী।’
শীতল শেষবারের মতো কাগজটা হাতে চেপে ধরে নাক ডোবায় তাতে। সাথে সাথে দু’ফোঁটা পানি এসে চশমার ভারী কাঁচটা ভিজিয়ে দেয় তার। ঝাপসা হয়ে আসে সামনের দৃশ্য।
“এবার তো কাগজের টুকরোতে নয়, মানুষটার বুকে নাক ডোবানোর পালা।”
শীতল বরফের মতো জমে যায় পিছন থেকে ভেসে আসা কথাটুকু শুনে। সে নিশ্চিত তার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। সে যাকে ভাবছে তার এতো তাড়াতাড়ি আসার চান্স নেই কোনোভাবেই। আসতে আসতে বিকাল কিংবা সন্ধ্যা হয়ে যাবে। এখন মাত্র দুপুর তিনটা বাজে। যদিও নওশাদ সেই দু’টোর সময়ই বাসস্ট্যান্ডের দিকে ছুটেছে। সায়েরা শুধু বলতে গিয়েছিলো, ভাইজান এতো তাড়াতাড়ি যেয়ে কি হবে? ওর আসার তো অনেক দেরি….
সায়েরা কথা শেষ করতে পারেনি। নওশাদ এমনভাবে তার দিকে তাকিয়েছে যেনো সে দৃষ্টিতেই ভস্ম হয়ে যাবে। সায়েরা আর কিছু বলার সাহস পায়নি। আজ কেউ-ই তাকে পাত্তা দিচ্ছে না। তবে এই পাত্তা না দেওয়াতে যে শান্তি আছে তা এই প্রথম বুঝতে পারছে সায়েরা। একটু পর পর বুকটা কেমন করে উঠছে তার আনন্দে।
শীতল পেছনে ঘোরেনা। তার পা দু’টো অনড় হয়ে আছে। খুঁটির মতো যেনো আটকে আছে মাটির সাথে। আর সে ঘুরতেও চায়না। কারণ সে জানে তাত হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। সে ঘুরে দেখবে কেউ কোথাও নেই। কষ্টে বুকটা ভার হয়ে উঠবে। এতোটুকু সময়ও যেনো কাটছে না তার।
“শ্বেতশুভ্র ওড়না খানা অগ্রহায়ণের হিমেল হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে বুঝি স্নিগ্ধ পরীর আঁচল….”
শীতল সহসাই ঝট করে পিছনে তাকায়। এক ঝলক মানুষটাকে দেখে সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেলে। বুকটা কাঁপছে তার ভীষণভাবে, এ কাকে দেখে ফেললো সে? সত্যি? নাকি হ্যালুসিনেশন?
“এটা হ্যালুসিনেশন নয় অনুপমা, সত্যিই আমি আপনার সামনে। চোখ মেলুন, দেখুন আপনার সিংহকে।”
শীতল চোখ তো মেললোই না, উলটে দুই হাত চোখের সামনে নিয়ে ঢেকে দিলো।
উৎস মৃদু হেসে কাঁধের ভারী ব্যাগটা নামিয়ে রাখে নিচে, পুলিশ হ্যাটটা মাথা থেকে নামিয়ে হাতের সাথে চেপে ধরে এগিয়ে আসে শীতলের দিকে। দূর থেকে শীতলের কাঁপুনি টের পাচ্ছে সে। ইশ! মেয়েটা বড় হলো না।
উৎস শীতলের দুই বাহু চেপে ধরে। শীতল ঝড়ে পড়া পাখির মতো মুহুর্তের মধ্যে ঠান্ডা হয়ে যায়। এটা তবে ভ্রম নয়? সে সত্যি চলে এসেছে? এই মুহুর্তে গলা ফাটিয়ে একটা তীব্র চিৎকার করতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু পারছে না। চিৎকার দূরে থাক, চোখ মেলবে কীভাবে সেই চিন্তায় আছে সে।
উৎস শীতলের থুতনিতে হাত ঠেকায়, বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে হালকা ঘষে দেয়। শীতল আস্তে আস্তে চোখ মেলে। সদ্য ফোঁটা পদ্মের মতো পাপড়ি মেলে যেনো সে।
উৎস পুলিশ হ্যাটটা শীতলের মাথায় পরিয়ে দেয়। শীতল স্তম্ভিত হয়ে তাকায় উৎসের মুখের দিকে। রোদে পুড়ে কিছুটা কালো হয়ে গেছে, দাড়িগোঁফের জঙ্গল কেটে ফেলতে হয়েছে। কিন্তু কিন্তু কিন্তু…
“আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আপনি আমার সামনে।”
“তাহলে বিশ্বাস করার জন্য কি করতে হবে? প্রমাণ চাই বিশ্বাসের?”
শীতল আচমকা উৎসকে শক্ত করে চেপে ধরে। উৎসের ইউনিফর্ম পিছন থেকে খামচে ধরে শক্ত করে। আকুল হয়ে তার বুকের গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করে। ক্ষুদার্থ সিংহী খাবার পেলে যেমন উন্মাদ হয়ে যায় শীতল যেনো তাই। নিজের নিয়ন্ত্রণেই যেনো নেই নিজে এখন। অন্য কেউ তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
“উৎস ভাই, উৎস ভাই, উৎস ভাই….”
উৎস শীতলের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো,”ভাই টা কবে বাদ হবে?”
শীতলের কানে যেনো কিছুই যায়না।
“শুনলাম সকালের বাসটা নাকি আজকে তাড়াতাড়ি চলে এসেছে, কতোক্ষণ বসে থাকলাম ওখানে। উৎসকে তো দেখলাম না….”
কথাটা বলতে বলতে গেট দিয়েই ঢুকছিলো নওশাদ। আচমকা উঠোনের দক্ষিণ দিকে চোখ পড়তেই থতমত খেয়ে যায় সে।
শীতল উৎসকে ছেড়ে দিয়ে এক দৌড়ে ঘরে চলে যায়। আজ সারাদিন সে দরজা বন্ধ করে ঘরে থাকবে। একদম বের হবে না। যাওয়ার সময় বহ্নির সাথে ধাক্কা খায় আচমকাই। তাল সামলাতে না পেরে বহ্নি ছুটে যেয়ে আরেক পাশে পড়ে। শীতল কিয়ৎক্ষণ সেদিকে একবার তাকিয়ে আবার একই শক্তিতে ছুটে যেয়ে দরজা দেয়। বহ্নি হতভম্ব হয়ে সেদিকে তাকিয়ে বললো,”পাগল নাকি!”
উৎস নওশাদের দিকে এগিয়ে আসে। নওশাদের চিৎকার করে সবাইকে ডাকার কথা। কিন্তু তারও যেনো শীতলের মতো রোগ হয়েছে। চিৎকার করবে কি, একটা কথাও বের হয়না মুখ থেকে তার। কম্পিত ঠোঁট দু’টো শুধু একবার বলে নড়ে ওঠে।
“উৎস, বাপ আমার।”
উৎস হ্যাটটা বগলের নিচে চেপে নওশাদের সামনে দাঁড়িয়ে আচমকা স্যালুট করে তাকে। নওশাদের মাথাটা ঘুরে ওঠে। উৎস এক হাত দিয়ে তাকে চেপে ধরে।
“মামা, আমি আপনার উৎস। আপনার সেই ছোট্ট উৎস আজ এএসপি উৎস শাহরিয়ার।”
নওশাদ গগণবিদারী চিৎকার করে ওঠে হঠাৎই।
“ওরে তোরা কে কোথায় আছিস? আমার বাপ ফিরে এসেছে, আমার বাপ এসেছে আমার গরীব আঙিনায়।”
#মাতাল_প্রেমসন্ধি
অন্তিম পর্ব (দ্বিতীয় খন্ড)
রাত এগারোটা বেজে চল্লিশ মিনিট, স্থান ‘খাঁ’ বাড়ির উঠোন। চাঁদের হাঁট বসেছে যেনো সেখানে। বিরানভূমিতে যেমন কপোত-কপোতীরা এলোমেলোভাবে উড়ে বেড়ায়, উঠোন জুড়ে বিচরণ করছে তেমনই মানুষরূপী কিছু পক্ষী। লাল পক্ষী, নীল পক্ষী কিংবা শ্বেতশুভ্র পক্ষী।
তাদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নওশাদ, কিছুটা দূরে বসেই। উৎস ফিরে আসা উপলক্ষে ছোটখাটো একটা পিকনিকের আয়োজন করা হয়েছে সন্ধ্যাবেলায়। সব যোগাড়যন্ত্র করতে করতে কিছুটা রাতই হয়ে গেছে। আজীবনের স্বভাব নওশাদের, একটু আনন্দ হলেই ভালোমন্দ খাওয়া দাওয়া সেই সাথে তার মহাপুরুষেরা। সেই সাথে রাতটা তার গরীবখানায় সবাইকে থেকে যাওয়া। মাঝে মাঝেই চোখ দু’টো ঝাপসা হয়ে আসছে তার। এতো শান্তি কেনো লাগছে তার বুঝতে পারছে না। মনে হচ্ছে এই রাতে যদি তার মরণও আসে তবুও তার এতোটুকু কষ্ট হবে না। পৃথিবীর বুক থেকে একরাশ পূর্ণতা নিয়েই সে যেতে পারবে মহাশূণ্যে, কোনো অপ্রাপ্তি নেই, থাকবে না।
শাহানা রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলো। আবির আপাতত কোমরে গামছা পেঁচিয়ে খুন্তি নাড়ছে সেখানে। তাই শাহানা সেদিক থেকে অবসর নিয়ে স্বামীর পাশে এসে বসে। নওশাদ মোড়া পেতে বসে ছিলো, শাহানা তার পাশেই পিঁড়ি টেনে বসে। হালকা শীতের শুরু, রাতের দিকটায় একটু ঠান্ডা পড়ে যায়। নওশাদের গায়ে কালো চাদর পেঁচানো। শাহানা শুধু শাড়ি পরা। এতোক্ষণ চুলার কাছে থাকায় শীতটা বোঝা না গেলেও এখন বেশ শীত শীতই করছে তার। একটা হাত রাখে সে স্বামীর হাতের উপর। কোমল হাতের স্পর্শে নওশাদ সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে।
“শাহানা।”
“বলো।”
“হঠাৎ সবাইকে ছেড়ে এই বুড়োটার পাশে এসে বসতে ইচ্ছা হলো?”
“হ্যা তুমি বুড়ো আর আমি বুঝি সেই ছোট্ট কিশোরীটি রয়ে গিয়েছি তাইনা?”
“হ্যা তাই, অন্তত আমার কাছে তো তাই।”
শাহানা মৃদু হাসে। এই মানুষটা আর বদলাবে না, আজীবনই এমন থেকে যাবে।
শাহানার হালকা কাঁপুনি টের পায় নওশাদ। চুলার দিকেই নজর তার, সেদিকে তাকিয়েই গায়ের চাদরটার এক পাশ খুলে শাহানাকেও জড়িয়ে শরীরের কাছাকাছি আনে সে। তারপর আবার পেঁচিয়ে দেয় চাদরটা। স্বামীর শরীরের ওমে আদুরে বিড়ালের মতো গুটিসুটি মেরে যায় শাহানা। কিছুটা লজ্জাও ঘিরে ধরে তাকে। সব ছেলেমেয়েরা সামনে আর এখানেই লোকটা যা করছে!
তার লাজুক, লালাভ মুখ চোখ এড়ায় না নওশাদের। সে আলতো করে চাপ দেয় শাহানার হাতের উপর। শাহানা মাথা নিচু করে কুটকুট করে হাসে।
“বিষাদ বৃক্ষের যতো শত ফুল,
তোমারে দেখিবার লাগি হইলো ব্যাকুল।”
নওশাদের গম্ভীর গলার আওয়াজে শাহানা চমকে ওঠে। তার চোখজোড়া হঠাৎ জ্বালা করে ওঠে। তার জীবনটা এতো সুখের কেনো? এতো শান্তি ছেড়ে কীভাবে সে অন্ধকার কবরে যেয়ে শুয়ে থাকবে? তবে যা-ই হোক, এই মানুষটার পরে সে কোনোভাবেই কবরে যেতে চায়না, আগেই যেতে চায়।
“এতো স্বার্থপর কবে হলে তুমি শাহানা?”
শাহানা চমকে উঠে বললো,”তার মানে?”
“আমাকে এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় একা রেখেই তুমি চলে যেতে চাও একা কবরে।”
“কি আশ্চর্য! তুমি কীভাবে…?”
নওশাদ হালকা হাসে।
“শাহানা বিয়ের কতো বছর হলো আমাদের? এই এতোগুলো বছরে তুমি কখন কি চিন্তা করতে পারো আমি কি বুঝবো না? এতো বোকা মনে হয় আমাকে?”
শাহানা মাথা নিচু করে রাখে। সে ঠিক করেছে আজ সে কাঁদবে না। এই সুন্দর রাতে চোখের পানির সাথে বিরোধীতা করবে সে, যা-ই হয়ে যাক। কিন্তু এই লোক যে নাছোড়বান্দা, তার চোখে পানি না এনে তার শান্তি নেই।
“শাহানা।”
“হু।”
“তোমার কি শান্তি হচ্ছে না? অনাবিল খুশি তোমাকে ঘিরে ধরেছে না?”
শাহানা হালকা মাথা নেড়ে বললো,”হ্যা হচ্ছে। ঠিক যেমন হয়েছিলো তোমার বউ হয়ে এ বাড়িতে আসার পর। তখন তো আর বিয়ে, সংসার, স্বামী এসব বুঝতাম না। বাপ ভাইদের অবস্থা ভালো ছিলোনা। নুন আনতে পান্তা ফুরাতো। টিনের চালের ফুটো দিয়ে বৃষ্টি এসে পড়তো ঘরে। এ বাড়ি আসার পর দেখেছি পাকা ঘর, খাওয়া দাওয়াতেও ভরপুর। তাই ভীষণ আনন্দ হয়েছিলো।”
নওশাদের বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে শাহানার কথায়। সবাই মানুষটাকে কঠিন আর ঝগড়ুটে মানুষ হিসেবেই জানে। শুধু সে জানে এই মানুষটা কতোটা কোমল হৃদয়ের অধিকারিণী।
“শাহানা এ সংসার কি তোমাকে পাকা ঘর ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনি?”
“কেনো পারবে না? আস্তে আস্তে বুঝেছি পাকা ঘর আসলে কিছু না। মনে শান্তি থাকলে ফুটো চালের টিনের ঘরও সুন্দর। সেই শান্তি আমি পেয়েছি তোমার সংসারে এসে। তিন তিনটা রাজকন্যা পেয়েছি, তোমাকে পেয়েছি। আমার আর কি চাওয়ার ছিলো এই দুনিয়ায়? এই দুনিয়ার বুকে আমি সবচেয়ে ভাগ্যবতী আর সবচেয়ে সুখী একজন মানুষ, এটা কি তুমি জানো?”
“জানি শাহানা, জানি। আর তুমি সুখী বলেই আমাকে সুখী করতে পেরেছো তুমি।”
শাহানা ম্লান হাসে, কিছু বলেনা।
“শুধু কি মেয়েদের পেয়েছো? রণ, আবিরের মতো দু’টো হীরার টুকরো কি তুমি পাওনি?”
শাহানা মাথা নেড়ে বললো,”পেয়েছি। ছেলে সন্তান না হওয়ায় কিছুটা মন খারাপ হতো। সৃষ্টিকর্তা আমার সেই আক্ষেপটুকু করার জায়গাও আর রাখলেন না। রণ, আবির তো আমার ছেলে। আমি আর কিছু ভাবতেই পারিনা। আর দেখো, দু’জনই এতীম, দু’জনই মা হারা। আমি-ই যেনো ওদের মা হয়ে উঠেছি।”
নওশাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে বললো,”আর উৎস?”
শাহানা সাথে সাথে চুপ করে যায়। অদূরেই উৎস মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে আছে। কে বলবে সে এতো বড় এএসপি? সবার সাথে কেমন জড়িয়ে বসে আছে। কিন্তু সন্ধ্যা থেকে শীতলকে দেখা যায়নি এখানে। উৎস তো একবারও তার খোঁজ করলো না। শাহানার বুকটা কেমন করে ওঠে।
“উৎস কি এখন আর এই ভাঙা ঘরের রাজপুত্রটি আছে গো? সে এখন কতো বড় পুলিশ অফিসার৷ সে যদি অস্বীকৃতি জানায়? তাছাড়া সায়েরাও তো এখন চাইতে পারে তার ছেলে কোটিপতির মেয়েকে বিয়ে করুক। উৎস একবার চাইলেই ধনীরা লাইন দিবে ওর কাছে মেয়েকে দেওয়ার জন্য। সেখানে বামন হয়ে কীভাবে চাঁদে হাত বাড়াই বলো তো?”
নওশাদ আপন মনে হাসতে হাসতে বললো,”উৎসকে তবে এতো বছরে এই চিনলে তুমি? তোমার কাছেই তো মানুষ ও বলতে গেলে, সেই ছোট্টবেলা থেকে। ওকে তুমি এখনো ঠিকভাবে চিনতে পারলে না? আর সায়েরা? আমি নিজেকে অবিশ্বাস করতে পারি কিন্তু আমার বোনকে নয়। এতোটা লোভী ভাবলে ওদের? এতোটা নীচ ভাবতে পারলে?”
শাহানা তাড়াতাড়ি করে বললো,”ভুল ভাবছো তুমি। এসব কি বলছো? আমি ওভাবে বলিনি।”
“তাহলে?”
“তুমি দেখো উৎস সেই কোন বিকেলে এসেছে। শীতল তখন থেকে ঘরের মধ্যে দরজা লাগিয়ে বসে আছে। উৎস বা সায়েরা একটাবারও তো তাকে ডাকলো না। তবে কি উৎসের আর মায়া নেই ওর প্রতি?”
বিকালের কথা মনে পড়তেই নওশাদের হাসি পায় ভীষণ। শাহানা তো আর জানেনা শীতল কেনো দরজা লাগিয়ে বসে আছে। থাক, ওর জানা লাগবে না। কিছু জিনিস না জানাই ভালো।
ভিড়ভাট্টা থেকে দূরে, জামগাছের নিচের শান বাঁধানো বেদীতে বসে আছে অগ্নি। তারও দাওয়াত আজ এখানে। কিন্তু এখানে এসে আজাদকে দেখতে পাবে সে বুঝতে পারেনি। ওদিকে শীতলটাও ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে আছে। তাই চুপচাপ এখানেজ এসেই বসে আছে সে, কারো সাথে তেমন কথা বলেনি আসার পর থেকে।
কারো গলা খাঁকারির আওয়াজ পেয়ে চমকে ওঠে অগ্নি। পিছন ঘুরে দেখে আজাদ, হালকা চাঁদের আলোয় তাকে অসম্ভব রূপবান এক যুবক মনে হচ্ছে। অগ্নি, শীতল যে কলেজে পড়তো সেই কলেজেরই শিক্ষক হয়েছে আজাদ বছর খানিক।
“এইযে মিস ছোলা বেগম ঘুগনি, সবাই ওদিকে আর আপনি এখানে একা যে, কি ব্যাপার? মন খারাপ?”
অগ্নি অন্যদিকে ফিরে বললো,”তাতে আপনার কি? আপনি যেয়ে মজা করুন সবার সাথে।”
আজাদ স্মিত হেসে অগ্নির পাশে এসে বসে, কিছুটা দূরত্ব নিয়েই। তবুও অগ্নি আরো কিছুটা দূরে সরে যায়।
“কি হয়েছে ম্যাডাম? আপনি কি আমার উপর রাগ করেছেন?”
“কেনো আপনি আমার কে? আপনার উপর রাগ হতে যাবো কেনো?”
“হুম ঠিক ঠিক, কোটি টাকার প্রশ্ন। আমি আপনার কে? আমার উপর রাগ করতে যাবেন কেনোম আচ্ছা যদি তা-ই হবে, আমি আপনার ভার্সিটির সামনে যাই, আপনি আমার সামনে থেকে হেঁটে চলে যান। আমাকে দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন। আমি ডাকলেও ডাক শুনেন না। এমন কেনো করেন?”
অগ্নি কিছুটা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো,”আপনার সাথে আমার কোনো কথা নেই তাই।”
“কিন্তু আমার তো থাকতে পারে।”
অগ্নি ভ্রু কুঁচকে তাকায় তার দিকে, সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নেয়। চাঁদের আলো অদ্ভুত রহস্যময়, প্রিয় মানুষটাকে রূপবান/রূপবতী করে তোলে আরো। প্রিয় মানুষ? নিজের ভাবনায় নিজেই কেঁপে ওঠে অগ্নি সহসাই।
“আপনার আমার সাথে কি কথা? আপনি যান, ওই লম্বা চুলের, ডাগর আঁখির সুন্দরীর সাথে কথা বলেন।”
আজাদ ভ্রু কুঁচকে তাকায় অগ্নির দিকে।
“লম্বা চুলের, ডাগর আঁখির সুন্দরী মানে? সে কে?”
“এখন বুঝতে পারছেন না তাইনা? কলেজ গেটের বাইরে যে কিছুদিন আগেই তার সাথে খুব হেসে হেসে গল্প করছিলেন, আমি দেখিনি? এখন আমার সাথে কিসের কথা? ওই সুন্দরীর সাথেই কথা বলুন না।”
আজাদ কিছুক্ষণ কি যেনো ভাবে, এরপর ঠোঁড় কামড়ে ধরে হেসে দেয়। প্রথমে আস্তে, এরপর জোরে চিৎকার করে। বাকিরা এদিকে তাকায়। উৎস খুব অদ্ভুত চোখে তাকায়, কি হচ্ছে এখানে? পরে আবার সে নিজের কাজে মন দেয়। আগের দিন আর নেই, সবাই বড় হয়ে গেছে। সবাইকেই প্রাইভেসি দেওয়া উচিত।
অগ্নি রাগে লাল হয়ে বললো,”হাসছেন কেনো এভাবে? সবাই কীভাবে তাকাচ্ছে।”
আজাদ সাথে সাথেই হাসি মুছে গম্ভীর গলায় বললো,”আর ইউ জেলাস বেবি গার্ল?”
অগ্নি ঝট করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। আজাদ তাকে চোখের ইশারায় আবার বসতে বলে।
অগ্নি কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে বললো,”আমি কি মজা করছি আপনার সাথে? আমি কোনো জেলাস টেলাস না, বুঝতে পারছেন আপনি? আমি জেলাস না।”
আজাদ শান্ত গলায় বললো,”আচ্ছা আপনি জেলাস না, এখন তো একটু বসুন আমার পাশে।”
অগ্নি তাকায় আজাদের দিকে, আজাদ ক্ষীণ গলায় বললো,”প্লিজ?”
অগ্নি বসে পড়ে। রাগে কাঁপছে সে। আজাদ তাকে শান্ত হতে সময় দেয়। ততক্ষণ একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। ধবধবে সাদা জামায় একটা অতসী ফুলের মতো সুন্দর লাগছে অগ্নিকে। আজাদ চোখ সরাতে পারে না।
আচমকা হু হু করে অগ্নি কেঁদে দেয়, এতোগুলো বছরে এই লৌহমানবীর চোখে আজাদ কোনো পানি দেখেনি। আজ হঠাৎ কি হলো তার? কান্নার দমকে সরু, পাতলা কায়াটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। ওড়নাটা দিয়ে মুখটা ঢাকার চেষ্টা করে সে।
আজাদ হতভম্ব হয়ে বললো,”অগ্নি, অগ্নি কি হয়েছে? কাঁদছো কেনো? প্লিজ শান্ত হও।”
“আপনি দয়া করে এখান থেকে চলে যান, আমাকে একা থাকতে দিন।”
“অগ্নি….”
“প্লিজ….”
আজাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। অগ্নি তখনো ফোঁপাচ্ছে। অনুভূতি প্রকাশে তার বরাবরই আপত্তি। তবু আজ তার কি হলো সে নিজেই বুঝতে পারছে না। কেনো এমন কান্না পাচ্ছে তার বুক ভেঙেচুরে? কেনো এতো অসহায় লাগছে তার?
“অগ্নি যাওয়ার আগে একটা কথা বলার অনুমতি কি পাবো? জাস্ট একটা।”
অগ্নি চোখ মুছে ঠান্ডা গলায় বললো,”বলুন।”
“অগ্নি মেয়েটা, মানে যার সাথে আমাকে কথা বলতে দেখেছো ও আমার ছাত্রী ছিলো। ক্লাসে একটা জিনিস বুঝতে পারেনি তাই পরেরদিন আমি কোন সময়ে বুঝিয়ে দিতে পারি ওটাই জানতে এসেছিলো। এ ছাড়া আর কোনো কথাই হয়নি আমাদের মধ্যে। সেদিন যদি তুমি আরেকটু ভালো করে দেখতে তবে দেখতে পারতে আমার চোখ তার দিকে ছিলো না, আমি অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলছিলাম তার সাথে। আফসোস তুমি তা খেয়াল করোনি।”
সজল চোখে অগ্নি তাকায় আজাদের দিকে। আজাদের কপাল বেয়ে ঘাম পড়ছে। এমন ঠান্ডা আবহাওয়ায় কেনো তার ঘাম ঝরছে অগ্নি বুঝতে পারে না।
“অগ্নি আমি একটা মহিলা কলেজের শিক্ষক, আমার তো ছাত্রীদেরই পড়াতে হয়। আর এটা তো খুব স্বাভাবিক আমি নিশ্চয়ই আমার কাজের জায়গার মেইন গেটে দাঁড়িয়ে আমার প্রেমিকার সাথে গল্প করবো না। তোমাকে আমি বুদ্ধিমতী মনে করেছিলেন, এটুকু চিন্তা কি তুমি করতে পারলে না?”
অগ্নি লজ্জায় এদিক ওদিক তাকায়। আসলেই তো, এমনটা কেনো ভাবেনি সে আগে? ইশ কি লজ্জাই না পাচ্ছে এখন সে।
“অগ্নি।”
অগ্নি অস্ফুট আওয়াজে সাড়া দেয়।
“এই কারণে তুমি আমাকে এতোগুলো দিন কষ্ট দিচ্ছো, আগে বলোনি কেনো?”
অগ্নি ঝট করে তাকায় আজাদের দিকে। তার শান্ত মুখ জুড়ে অশান্ত রেখাগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে। অগ্নির বড় মায়া লাগে, সে কি বেশি জুলুম করে ফেললো মানুষটার উপর?
“অগ্নি উত্তর দাও।”
“আমি আপনাকে কষ্ট দিতে যাবো কেনো? এখানে কষ্ট পাওয়ারই বা কি হলো?”
আজাদ ম্লান হেসে বললো,”তুমি এখনো বুঝতে পারোনি কীভাবে আমাকে কষ্ট দিয়েছো?”
অগ্নি অস্বস্তিতে জোরে জোরে শ্বাস ফেলে। আজাদ তখনও একইভাবে তার দিকে তাকানো।
“অগ্নি ভালোবাসি না বললে কি ভালোবাসা হয়না? যদি তাই হয় বোবারা কি ভালোবাসে না?”
“তার মানে?”
“মানে না বোঝার মতো বোকা বা শিশু তো তুমি নও। আমার অনুভূতি বোঝার মতো অনুভব কি তুমি করতে পারোনা?”
অগ্নি কাঁপা কাঁপা পায়ে উঠে আসে, আজাদের মুখোমুখি দাঁড়ায়। চাঁদের আলো এসে পড়েছে দু’জনের মুখেই। দুই রহস্যময়ী মানব-মানবী একে অন্যের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, প্রকৃতিও চাচ্ছে তাদের মিলন। তবে কেনো আর প্রতীক্ষা? কিসের জন্য এতো অপেক্ষা?
“অগ্নি ভালোবাসার জন্য সহস্র যুগ চাইনা, শত আলোকবর্ষ পাড়ি দিতেও চাইনা। ভালোবাসাবাসির জন্য লাগেও না এতো সময়। কিছু মুহুর্তই যথেষ্ট। এই সময়টুকু কি আমাকে দেওয়া যায়? হৃদয়ের চার প্রকোষ্ঠ তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে। তুমি কি পারো না তৃষ্ণাটুকু মেটাতে? এতো কেনো অবহেলা তোমার?”
অগ্নি বরফের মতো জমে যায়, কিন্তু হৃদয়ের বরফ গলা শুরু করেছে। তরল হয়ে চোখে ভাসার আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যেনো।
আজাদ ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে বললো,”শুনেছি বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়াতে নেই। তবে আমি মনে করি বামন বা লম্বা কেউ-ই চাঁদ ছুঁতে পারেনা যতক্ষণ চাঁদ নিজে এসে ধরা না দেয় কারো আঙিনায়। এইযে দেখো আজ উঠোনে কেমন উথালপাতাল জ্যোৎস্না। চাঁদ নিজে এসে ধরা দিয়েছে বলেই তো। আমি অপেক্ষা করবো সেই সময়টার জন্য, যেদিন আমার চন্দ্র নিজে এসে আমার কাছে ধরা দিবে। অনুভূতিটুকু ছাড়া আমার যে দেওয়ার আর কিছুই ছিলোনা, আজ তা-ও দিয়ে দিলাম। আমি এবার শুণ্য।”
আজাদ ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। অগ্নি নিজের কাঠিন্য উগড়ে ফেলে তার কবর রচনা করে দেয়। ভালোবাসায়, প্রেমে কাঠিন্য চলে না। তার ভিতর থেকেই যেনো কেউ বলছে,’এইদার নাও অর নেভার।’
ঝট করে আজাদের হাত চেপে ধরে অগ্নি পিছন থেকে। একটা উষ্ণ, কোমল হাতের স্পর্শে আজাদ স্তম্ভিত হয়ে তাকায় পিছনে। স্তব্ধ হয়ে যায় সে। অগ্নিকে সাক্ষাৎ পরীর মতো লাগছে। আজাদ যেনো দূর্বল হতে শুরু করে। এই অনুভূতির নাম কি? জানেনা সে, এ যে প্রথম!
“শূণ্য হাতটা কি এবার পূর্ণ করা যায়না সাবেক নেতামশাই? যদি আমি পূর্ণ করে দিই? ফিরিয়ে দিবেন?”
আজাদ কিছুটা কেঁপে ওঠে। তার মনে হচ্ছে জীবনের সব চাইতে সুন্দর কোনো স্বপ্ন দেখছে। এই স্বপ্ন যেনো কোনোদিন না ভাঙে।
“কি হলো বলুন, ফিরিয়ে দিবেন আমাকে?”
“সেই সাধ্য কি এই অধমের আছে? সেই ক্ষমতা যে সৃষ্টিকর্তা আমাকে দেননি।”
অগ্নি হাসে, আজাদ হাসতে পারেনা। শুধু ঠোঁট দু’টো নড়ে তার।
বিড়বিড় করে বলতে থাকে সে,”প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস, তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।’
নিজের সর্বনাশ সামনাসামনি দেখার পরেও কেউ হাসতে পারে?
পিকনিকে দাওয়াত পেতে বাদ যায়নি রুস্তম, প্রত্যাশা, মতিন আর লাভলী। নওশাদের এখন রুস্তম বলতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। যে কোনো কিছুতে রুস্তমের পরামর্শ নিতে তার ভালো লাগছে ইদানীং। ছেলেটা বুদ্ধিমান, করিৎকর্মা। প্রত্যাশা তাকে বাকি সব খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে। যদিও রুস্তম সেসব বাদ দিয়েছে অনেক আগেই, এখন সে ব্যবসা করছে। আগের কৃতকর্মের জন্য সে লজ্জিত।
রুস্তমকে এ বাড়ির আরো একজন ভীষণভাবে পছন্দ করে, সে হলো রণ-বহ্নির ছোট্ট কন্যা নীলু। রুস্তম মামা তার প্রাণ। রুস্তম আসলেই তার মাথা খারাপ যায়। এই মুহুর্তে সে রুস্তমের মাথায় উঠে বসে আছে। আশ্চর্য, কেউ নামানোর চেষ্টাও করছে না তাকে। সবাই যেনো মনে করে রেখেছে ওটাই তার স্থান, ওখানেই নীলুর থাকার কথা।
“সোনা আমার, পাখি আমার এবার নেমে আয় মা। ওটা আমার মাথা, তোর খেলার মাঠ না।”
নীলুর মধ্যে নামার কোনো লক্ষণ দেখা যায়না, সে খুশিমনে সেখানে বসে থাকে, রুস্তমের দুই কাঁধের দিকে পা ঝুলিয়ে। গলদঘর্ম অবস্থা রুস্তমের তাকে সামলাতে যেয়ে। প্রত্যাশা হেসেই শেষ এই দৃশ্য দেখে।
“পাজি পোকাটা আমাকে জ্বালাচ্ছে আর তুমি তা দেখে হাসছো প্রত্যু?”
“আরে রুস্তম, রাগ করছো কেনো? এটাকে ভালোভাবে নাও না। মনে করো তোমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে।”
“অভিজ্ঞতা মানে? কিসের অভিজ্ঞতা আবার?”
“এইযে এরপর তোমার যখন বাবু হবে তখন তো এভাবেই সামলাতে হবে তাকে।”
রুস্তমের চোখ চকচক করে ওঠে।
“কি বললে প্রত্যু? আবার বলো তো।”
“কি আবাদ বলবো? ওইতো…..”
সহসাই কিছু একটা ভেবে প্রত্যাশার মুখ লাল হয়ে যায়। লজ্জায় চুপসে যায় সে।
“কি গো, বলো আবার।”
“কিছু বলিনি, কিচ্ছু না।”
“না বললে হবে না, বলো।”
প্রত্যাশা মাথা নিচু করে হাসে, রুস্তম মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। কি যে মায়া এই মুখ খানায়। রুস্তম দেখে আর ভাবে, তার মতো পাপী একটা লোকের কপালে এমন শুদ্ধতম এক পরী কীভাবে এলো? এই ভাবনা তাকে দিন দিন আরো শুদ্ধতম পুরুষ বানিয়ে দিচ্ছে। সে প্রতিজ্ঞা করেছে জীবন গেলেও আর কোনো পাপের কাজে নিজেকে জড়াবে না। এই অপ্সরাকে বিন্দুমাত্র কষ্ট দেওয়ার অধিকার তার নেই, কখনো হবে না।
মন খারাপ করে এক পাশে বসে আছে লাভলী। বিষন্ন মুখটা আরো কালো লাগছে তার। রুস্তম তার বিয়ে ঠিক করেছে এক ধনী ব্যবসায়ীর সাথে। এই শহরেই তার তিনটা বাড়ি, গাড়ি। তারা দেখে গেছে, পছন্দও হয়েছে লাভলীকে। সব কিছু ঠিক থাকলে এই মাসেই কাবিন হয়ে যাবে। লাভলীর হয়তো খুশি হওয়ার কথা, কিন্তু এই মুহুর্তে তার খুশি হতে ইচ্ছা করছে না। বরং খুব কান্না পাচ্ছে। কিছুটা দূরেই আবিরের পাশে মতিন বসে আছে। প্রত্যাশা তাকে কঠিন ডায়েট করাচ্ছে তাই ভালোমন্দ খাওয়া বন্ধ আপাতত। আজ অনেকদিন পর ভালো কিছু খাওয়া হবে। তার শিশুসুলভ, মায়াভরা মুখটা দেখে লাভলীর ভিতর থেকে কান্না ঠেলে আসে। জীবন এতো কঠিন কেনো? মানুষ যা চায় তা কেনো পায়না সবসময়?
হঠাৎ মতিনের চোখ যায় লাভলীর দিকে। লাভলী তার দিকেই তাকিয়ে আছে। মতিন থতমত খেয়ে যায়। কি করবে বুঝতে পারে না।
আচমকা লাভলীর কি হয় সে জানেনা। উঠে দাঁড়ায় বসা থেকে। সবার সামনেই গটগট করে হেঁটে মতিনের পাশে যেয়ে দাঁড়ায়। সবাই হতবাক হয়ে তাকায় তার দিকে। মতিন নিজেও ভড়কে যায়। লাভলীর মনের কথা সে বুঝতে পারে। কিন্তু তার কিছুই করার নেই। রুস্তম কখনোই এটা মেনে নিবে না, নেওয়ার কথাও না। লাভের মধ্যে লাভ হবে রুস্তন তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিবে, মতিন হারাবে তার আশ্রয়টুকু।
ভয়ে ভয়ে মতিন উঠে দাঁড়ায় লাভলীর সামনে। লাভলী নিজেও জানেনা কি করছে সে। শুধু শ্বাস ফেলছে দ্রুত।
মতিন কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,”লাভলী আপা…..”
লাভলী আচমকা চড় বসিয়ে দেয় মতিনের গালে। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব সবাই। রুস্তম উঠে দাঁড়িয়ে বললো,”লাভলী এসব কি হচ্ছে?”
লাভলীর কোনোদিকে মন নেই, সেই রাগী লাল চোখে তাকিয়ে আছে মতিনের দিকে। শুধু মতিন চড় খেয়েও ভাবলেশহীন।
“এই শালা, যাকে ভালোবাসিস তাকে আপা ডাকতে লজ্জা হয়না? অসভ্য, শয়তান।”
রুস্তম সহ বাকিদের মাথায় যেনো বজ্রপাত হয়। এসব কি বলছে লাভলী? ভালোবাসা মানে?
রুস্তম ছুটে এসে লাভলীর দুই বাহু চেপে ধরে। মতিন মাথা নিচু করে কাঁপছে একনাগাড়ে। সে নিশ্চিত এই আশ্রয়টুকু হারাবে সে। পথে বসতে হবে তাকে, এ কি হয়ে গেলো তার সাথে?
“লাভলী তোর মাথা ঠিক আছে? এসব কি বলছিস তুই? তা-ও আবার এতো মানুষের সামনে? ভুলে যাস না এটা আমাদের বাড়ি না।”
“আমি কিচ্ছু ভুলিনি ভাইজান। কিন্তু আমি আর এই অভিনয় করে যেতে পারছি না। আমি অভিনয়টুকু থেকে মুক্তি চাই।”
‘অভিনয় মানে? কিসের অভিনয়?”
লাভলী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে বললো,”ভাইজান আমি মতিনকে ভালোবাসি, আর এটাই ধ্রুব সত্য। এরপর যদি তুমি আমাকে অন্য কোথাও বিয়ে দাও আমি হয়তো বিয়েটা করবো কিন্তু আমি সুখী হতে পারবো না।”
“লাভলী….”
রুস্তমের চিৎকারে গমগম করে ওঠে খাঁ বাড়ি। মতিন বসে পড়ে রুস্তমের পায়ের কাছে। চিৎকার করে কেঁদে ওঠে সে।
“ভাই উনি মজা করছেন, এমন কিছুই না। আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। আপনি দয়া করে উনাকে কিছু বলবেন না।”
নওশাদ উঠতে গেলে শাহানা তাকে আটকায়। যতোই হোক ওরা বাইরের, কেনো ওদের ঝামেলাতে নিজেদের জড়াবে?
রুস্তম বাম হাত দিয়ে মতিনের কলার চেপে ধরে তাকে উঠায়। উৎস বাঁধা দিতে আসলে রুস্তম তাকে হাত দিয়ে আটকায়।
“মতিন আমার দিকে তাকা।”
মতিন তাকায় না, শুধু হাতজোড় করে কাঁপতে থাকে সে।
“তাকাতে বলেছি না? তাকা।”
প্রত্যাশা রুস্তমের কাছে আসতে গেলে তাকেও দূরে সরিয়ে দেয় রুস্তম।
“তুই লাভলীকে ভালোবাসিস? কোনো ভণিতা করবি না, হ্যা বা না তে উত্তর দিবি।”
মতিন সজল চোখে তাকায় লাভলীর দিকে, রাগে ফুঁসছে লাভলী। সত্যটা বলার সাহস নেই মতিনের, হবেও না কোনোদিন।
“না ভাই, আমি উনাকে ভালোবাসিনা।”
লাভলী দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ে।
রুস্তম লাভলীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো,”দেখ কেমন কাপুরুষকে ভালোবেসেছিস। সবার সামনে তোকে ভালোবাসার কথা অস্বীকার করলো। এই কাপুরুষকে ভালোবেসেছিস তুই? এরচেয়ে একটা ভেড়াকে পছন্দ করলেও তার সাথে তোকে বিয়ে দিয়ে দিতাম। কিন্তু এই মেরুদণ্ডহীন প্রাণিটাকে ভালোবাসতে গেলি তুই এতো মানুষের ভিড়ে? ছিহ!”
পরিবেশ শান্ত, পিনপতন নীরবতা। কেউ কোনো কথা বলছে না। শুধু লাভলীর কান্নার আওয়াজ আসছে। অগ্নি, বহ্নি আর আভা তাকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে।
হঠাৎ মতিন রুস্তমের চোখে চোখ রেখে তাকায়, যে সাহস এতোগুলো বছরে সে করেনি। লাভলীর কান্নার আওয়াজ তার শরীরে সুঁইয়ের মতো বিঁধছে। এ আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীর কোনো পুরুষকে দেয়নি, মতিন কোন ছার! বীর পুরুষেরা যুদ্ধ করে মহাদেশ স্বাধীন করার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু প্রিয়তমার চোখের এতোটুকু পানি তারা দেখতে পারেনা। এ এক অদ্ভুত নিয়ম দুনিয়ার।
“রুস্তম ভাই, আমি কাপুরুষ নই। আমি হারানোর ভয় করি। আপনাকে হারিয়ে ফেলার ভয় করি আমি। সেই কিশোর বয়স থেকে আপনার সাথেই আমি রয়েছি। আপনি যা বলেছেন করেছি। আপনার কোনো কথার অবাধ্য আমি হইনি। তার মানে এই নয় যে আমি কাপুরুষ। আমি আপনাকে সম্মান করি, আমার বড় ভাইয়ের মতো ভালোবাসি। আপনাকে কষ্ট দিয়ে নিজের সুখের ঘর সাজাবো আমি? কখনো না রুস্তম ভাই। হ্যা, আমি আজ চিৎকার করে, সবার সামনে স্বীকার করছি আমি লাভলীকে ভালোবাসি। ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি। কিন্তু আমি চাই ও সুখী হোক, আপনি খুশি থাকুন। টাকার চেয়ে বড় সুখ আর কিছুতে নেই ভাই এই দুনিয়ায়, কিচ্ছুতে না। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে বুঝেছি এই শহরটা কতো নিষ্ঠুর। এক বেলা ভাত খেতে পারতাম না। ভাতের জন্য উন্মাদ হয়ে যেতাম, কেউ দিতো না দু’মুঠো ভাত। তখন থেকেই আমি জানি, সুখের মূল হলো টাকা, অর্থ। যা আমার নেই, রোজগার করার যোগ্যতাও নেই। লাভলী যেমন আমাকে ভালোবাসে আমিও তাকে তেমন ভালোবাসি, বরং আরো বেশি। কিন্তু কি করবো রুস্তম ভাই? আমি যে হারানোর ভয় করি। যদি ভাগ্যগুণে তাকে পেয়েও যাই আমি যে তাকে ধরে রাখতে পারবো না। কারণ সেই যোগ্যতা আমার নেই তাকে সুখী করার। না পাওয়ার চেয়ে পেয়ে হারানোর কষ্ট যে আরো বেশি। এখন বলুন রুস্তম ভাই, আমি কাপুরুষ? সবাই বলুন আমি কাপুরুষ? লাভলী, তুমি বলো। যদি তাই বলো, তবে আমি তাই। আমি মাথা পেতে মেনে নিবো সেই সম্বোধন।”
মতিনের কথায় স্তব্ধ হয়ে যায় সবাই। কারো মুখেই কোনো কথা নেই। প্রত্যাশা এসে রুস্তমের হাত জড়িয়ে ধরে।
মতিন কথা শেষ করে চোখ মুছতে মুছতে গেটের দিকে পা বাড়ায়। হঠাৎ রুস্তম তার হাত ধরে ফেলে।
“আমাকে ছাড়ুন ভাই, আজকের পর থেকে আমার ছায়া আপনি আর দেখবেন না। যে অন্যায় আমি করেছি, বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়িয়েছি সেই অন্যায়ের শাস্তি আমি নিজে নিজেকে দিবো।”
“তুই নিজেকে কি শাস্তি দিবি? আমি তোকে শাস্তি দিবো। কতো বড় সাহস, আমার বোনের দিকে নজর দিস।”
রুস্তমের কথায় ভয় পেয়ে যায় সবাই।
লাভলী ভাইয়ের পা ধরে চিৎকার করে ওঠে।
“ভাইজান ওকে ছেড়ে দাও, কোনো শাস্তি দিও না। আমি আর ওর কথা ভাববো না। তোমার পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করবো। ওর কোনো দোষ নেই, ওকে শাস্তি দিও না।”
“কিচ্ছু করার নেই লাভলী, অন্যায় যখন করেছে শাস্তি পেতে হবে। মতিন তুই প্রস্তুত শাস্তি নেওয়ার জন্য?”
নওশাদ, রণ, উৎস, আবির, প্রত্যাশা সবাই রুস্তমকে বোঝায়, কিন্তু সে তার সিদ্ধান্তে অনড়।
মতিন লাভলীর দিকে তাকায়, এরপর চোখ সরিয়ে বড় একটা শ্বাস নেয় সে।
“প্রস্তুত ভাইজান, আমি সব শাস্তি মাথা পেতে নিবো। যে অন্যায় করেছি শাস্তি তো আমার প্রাপ্য। শাস্তি দিন আপনি আমাকে।”
“শুধু তোকে না, অন্যায় তো তুই একা করিস নি। আমার বোনও করেছে। তাই সমান শাস্তি দু’জনই পাবি।”
লাভলীকে দাঁড় করায় রুস্তম। একপাশে লাভলী আরেক পাশে মতিন।
“তোদের শাস্তি, বাকি জীবন তোরা একসাথে থাকবি। লাভলীর মতো একটা ঝগড়ুটে বউ পাওয়া মতিনের জন্য শাস্তি আর মতিনের মতো একটা ভেড়াকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়া লাভলীর জন্য শাস্তি। বল রাজি তোরা?”
কেউ যেনো নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনা। স্তম্ভিত হয়ে সবাই তাকায় রুস্তমের দিকে। ধাতস্থ হতেই মতিন রুস্তমের পায়ের কাছে যেয়ে চিৎকার করে ওঠে। রুস্তম তাকে টেনে এনে বুকে জড়িয়ে ধরে।
“এই ভেড়া, আমার বোনটাকে সুখী রাখতে পারবি?”
লাভলী কাঁপতে থাকে খুশিতে, তার নিজের কানকে বিশ্বাস হয়না। সবার মধ্যেই খুশি ছড়িয়ে পড়ে। আবির কোমর থেকে গামছা খুলে নাচতে থাকে। সামনে যে তার শ্বশুর শ্বাশুড়ি উপস্থিত, সেদিকে যেনো কোনো খেয়াল নেই তার।
উৎস আচমকা রুস্তমকে উঁচু করে চিৎকার করে বললো,”থ্রি চিয়ার্স ফর রুস্তম, হিপ হিপ হুররে।”
রণ, আবির আর আজাদও এসে উৎসের সাথে গলা মেলায়, সবাই মিলে রুস্তমকে চ্যাং-দোলা করে উঁচু করে আর নাচতে থাকে ঘুরে ঘুরে। মুহুর্তের মধ্যে পরিবেশ পাল্টে যায়। নওশাদের তো ইচ্ছা করে নিজেরই নাচতে, শাহানার চোখ রাঙানির সামনে চুপসে যায়। শাহানা বিড়বিড় করে বলে,”বুড়ো বয়সে ভীমরতি।”
খাঁ বাড়ির উঠোনে যেনো আজই বিয়ে লেগেছে। মেয়েরা লাভলীকে মাঝে দাঁড় করিয়ে তাকে ঘিরে নাচতে থাকে।
শুধু মতিন মোহগ্রস্তের মতো একদৃষ্টিতে শুধু লাভলীর দিকে তাকিয়ে থাকে। সে নিশ্চিত সে স্বপ্ন দেখছে। এটা স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু হতেই পারেনা, সম্ভবই না। তবুও এটা যদি স্বপ্ন হয় এ স্বপ্ন যেনো তার কোনোদিন না ভাঙে। আমৃত্যু এই স্বপ্ন দেখতে চায় সে।
লাভলীর চোখে চোখ পড়ে মতিনের। নাহ, এই মেয়ে ঝগড়ুটে হোক যা হোক একেই সে চায়। তাকে পাওয়া যদি শাস্তি হয় এই শাস্তি সে জনম জনম ধরে পেতে চায়।
তার মতো একটা চালচুলোহীন ছেলের জন্য যে মেয়ে অশ্রুবিসর্জন দিয়েছে, এতোটা মায়া দেখিয়েছে সেই মায়া তার জীবনে কয়েক কোটি গুণে ফিরিয়ে দিতে বদ্ধ পরিকর সে। দরকার হয় জীবন দিয়ে দিবে, তবুও এই মেয়েকে হারালে চলবে না। এই মায়া তাকে একাল, ওকাল দুইকালেই পেতে হবে, হবেই।
“আশ্চর্য, মেজো আপার হয়েছে কি? এতোকিছু হয়ে যাচ্ছে, ও এখনো ঘরে বসে আছে কেনো?”
আভার কথায় বহ্নি এদিক ওদিক তাকায়। উৎসের দিকে তাকাতেই দেখে সে শান্ত হয়ে বসে আছে। অদ্ভুত, শীতল এখানে নেই তা উৎসের মনেও পড়েনি? কি হয়েছে ওদের মধ্যে?
বহ্নি উঠে দাঁড়ায়।
“আমি ওকে নিয়ে আসছি।”
বহ্নি বারান্দা পর্যন্ত যেতেই দেখে সায়েরা ঘর থেকেই বের হচ্ছে।
“কোথায় যাচ্ছিস বহ্নি?”
“শীতলকে ডেকে নিয়ে আসি ফুপু, ও কতোক্ষণ ঘরে বসে থাকবে?”
সায়েরা গম্ভীর গলায় বললো,”এখনই না, আরেকটু পর যা।”
“ফুপু….”
“আমার সাথে আয়।”
বহ্নির হাত ধরে টানতে টানতে সায়েরা তাকে উঠোনে নিয়ে আসে। উৎসের দিকে একবার তাকায় সায়েরা এরপর শান্তভাবে হেঁটে নওশাদ আর শাহানার পাশে এসে দাঁড়ায়।
“ভাইজান, ভাবী আমি তোমাদের কিছু বলতে চাই। যদি তোমাদের আপত্তি না থাকে।”
নওশাদ শাহানার দিকে একবার তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
“সায়েরা তোকে অসুস্থ মনে হচ্ছে, পরে বলিস কি বলবি। বিশ্রাম কর ঘরে যেয়ে।”
“না ভাইজান, আমাকে এখনই বলতে হবে। এই জ্যোৎস্না রাতই মোক্ষম সময় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করার জন্য। তুমি বাঁধা দিও না।”
“সায়েরা কি বলছিস এসব?”
শাহানাও ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। নওশাদের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে করে সে বললো,”শুনি সায়েরা কি বলতে চায়। অনেক কিছুর সাক্ষী তো হলাম এই রাতে, কিছু ইতিহাসের সাক্ষীও হতে চাই। বলো সায়েরা, আমরা শুনছি।”
সায়েরা লম্বা একটা নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে প্রস্তুত করে। রাজকন্যাকে চাওয়া যে যেনো তেনো কাজ নয়, তার জন্য যে অনেক প্রস্তুতির প্রয়োজন।
#মাতাল_প্রেমসন্ধি
অন্তিম পর্ব (তৃতীয় ও শেষ খন্ড)
“ভাইজান, ভাবী খুব কম বয়সে বিধবা হয়ে সিন্দাবাদের ভূতের মতো তোমাদের ঘাড়ে এসে উঠেছিলাম। ভাবীর জন্য মেনে নেওয়াটা একটু কঠিনই ছিলো যা একদম স্বাভাবিক। নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসার, যেখানে আমার অতি সৎ ভাইজানের খুব সামান্যই রোজগার ছিলো। সেখানে বোঝার উপর শাকের আঁটির মতো আমি আর আমার সেই ছোট্ট ছেলে উৎস। আমি জানতাম তোমরা হয়তো আমাকে ফেলে দিবে না। কিন্তু আমার এই বাপহারা বাচ্চাটা হয়তো এখানে ছোট হয়ে, মাথা নিচু করে রাখবে আজীবন। সে অন্যের ঘরের আশ্রিত, এই যন্ত্রণা তাকে স্বস্তি দিবে না এক ফোঁটাও। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। ভাইজানের যেনো তিন মেয়ে না, আরো একটা ছেলে আছে। উৎসকে ভাইজান কোনোদিন নিজের সন্তান ব্যতীত আর কেউ ভাবেনি। নিজের মেয়েদের যতোটা ভালোবাসা, সুযোগ, সুবিধা দিয়েছে আমার ছেলেটার জন্য বরং তার চেয়ে আরো বেশি করেছে। উৎস ভীষণ দুষ্টু ছোট থেকেই, অন্যায়ও দেখতে পারতো না। মারামারি করে বাড়ি ফিরতো, সবাই বিচার নিয়ে আসতো ভাইজানের কাছে। ভাইজান কখনোই উৎসকে কটু কথা বলেনি, বরং খুব ভালোভাবে বুঝিয়েছে। আমি যদি আমার শরীরের চামড়া কেটে জুতা বানিয়ে ভাইজানের পায়ে পরিয়ে দিই তবুও তা কম হবে। আমি হয়তো আল্লাহর অনেক প্রিয় একজন বান্দা তাই আল্লাহ আমাকে ফেরেশতার মতো বড় ভাই দিয়েছিলেন।”
সায়েরা একটু থামে। শাহানা মুচকি হেসে বলে,”হ্যা ঠিক তাই, তোমার ভাইজানই তোমাদের জন্য করেছে। আমি তো শুধু ঝগড়াই করেছি তোমার সাথে।”
“এমন কথা ভাবলেও যে পাপ হবে ভাবী। তোমার মাথাটা গরম, আর আমি তো ভুলের কারখানা। একসাথে থাকতে গেলে তো বোনে বোনেও ঝগড়া হয়, মায়ে-মেয়েতেও কথা কাটাকাটি হয়। তোমার ভালোবাসার প্রকাশটা অন্যরকম হয়তো, সে আর কেউ না বুঝলেও আমি আর আমার ছেলে ঠিকই বুঝেছি। আলেয়া ফুপু সেবার আমার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলো, তখন আমি মাত্রই বিধবা হয়ে এ বাড়িতে এসে উঠেছি। সত্য বলতে নতুন করে সংসারের কোনো ইচ্ছাই আমার ছিলো না। যে মানুষটাকে নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেছি, তার জায়গায় অন্য কাউকে ভাবি কীভাবে? তার উপর আমার ছেলের বয়স তখন একদমই কম। ওকে নতুন সংসারে নিয়েও যেতে পারবো না। এখানে হয়তো ওর যত্ন কম হতো না, কিন্তু মা কে তো ও পেতো না। তাই খুব ভয়ে ছিলাম জানো? তুমি যদি জোর করতে আমাকে বিয়েটা করেই নিতে হতো বুকে পাথর চাপা দিয়ে। দিনরাত কাঁদতাম আমি ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে। তুমি সেবার আমাকে বাঁচিয়েছিলে। বলেছিলে ও বিয়ে করতে না চাইলে ওকে যেনো জোর না করা হয়। ভাবী তুমি কি জানো? সেদিন থেকে আমি তোমার আমার বড় বোনের স্থানে বসিয়েছি? আমি যে তোমাকে কতোটা ভালোবাসি সে আমি কোনোদিন বোঝাতে পারবো না।”
শাহানা চোখ মুছে জোর করে হাসার চেষ্টা করে বললো,”এখন কি ঋণ শোধ করতে চাও? চলে যাবে আমাদের ছেড়ে ছেলের সাথে?”
হাসির বিপরীতে সায়েরাও হাসে একটু।
“কিছু কিছু ঋণ শোধ করা যায়না ভাবী, তাহলে যে পৃথিবীর নিয়ম পালটে যাবে। প্রকৃতি বক্রতা পছন্দ করে না, সরল পথেই চলতে চায়। আমি তোমাদের ঋণ শোধ করতেও চাইনা। থাক না ছোট্ট জীবনে কিছু ঋণ। এই ঋণের বিনিময়েও যদি পরকালে তোমাদের এতোটুকু সান্নিধ্য পাই, ক্ষতি কি?”
নওশাদ দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ে। আজকের রাতটা এতো সুন্দর কেনো? আচ্ছা এমন কি হতে পারে এটা আসলে দুনিয়া না? এটা হলো বেহেশত, যেখানে অতিরিক্ত সুখের জন্য বুকে ব্যথা হয়।
“তোমরা আমাকে তাড়িয়ে দিলেও আমি এখান থেকে কোথাও যাবো না। মাটি কামড়ে এখানেই পড়ে থাকবো বেহায়ার মতো। এই মায়াভরা সংসার ছেড়ে যাবো কোথায় আমি? এমন মায়া পৃথিবীর আর কোথাও যেয়ে যে পাবো না আমি। এখানে যে আমার শিকড়। আমি বাকি জীবনটা তোমার সাথে ঝগড়া করে এখানেই থাকবো। উৎস যেখানে খুশি যাক। ওর পোস্টিং যেখানে হবে ও চলে যাবে। সংসার সাজাবে সুন্দর করে। খাঁ বাড়ির রাজকন্যা সে সংসারে রানী হয়ে থাকবে। আমি দূর থেকে ওদের দেখে যাবো। এক জীবনে এটুকু সুখের চেয়ে বেশি আর কি চাই?”
নওশাদ, শাহানা সহ বাকিরা চমকে উঠে সায়েরার দিকে তাকায়। শুধু উৎস মাথা নিচু করে রাখে। তার চোখেমুখে তৃপ্তির হাসি।
শাহানা কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,”সায়েরা….”
সায়েরা মৃদু হেসে বললো,”তোমাদের কাছে আমি আরেকবার ঋণী হতে চাই ভাবী। ভাইজান, তোমার সবচেয়ে শীতল রাজকন্যাটাকে আমাকে দিবে? আমি পুতুলের মতো করে সাজিয়ে ওকে আমার পুত্রবধূ করতে চাই। কথা দিচ্ছি ওর বিন্দুমাত্র অযত্ন হবে না। আমার ছেলে যদি ওকে কোনোদিন এতোটুকু কষ্ট দেয়, আমি মা হয়ে ওকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে দুইবার ভাববো না। তোমাদের রাজকন্যাকে আমি রানী বানিয়ে রাখার প্রতিজ্ঞা করলাম এই রাতে।”
আচমকা আবির খুশিতে চিৎকার করে ওঠে, হাততালি দেয় জোরে। আজাদও তাল মেলায় ওর সাথে। শুধু রণ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার একমাত্র স্ত্রী বহ্নিকে জড়িয়ে ধরে, আজ সে আর ভুল করেনি। বহ্নি লাজুক মুখে তাকে ঈষৎ ধাক্কা দেয়।
রুস্তম আর মতিন তো আরো এক কাঠি সরেস। তারা দুইজন দুই পাশ থেকে উৎসকে কাঁধে তুলে নেয়। উৎস বহু কষ্টে নেমে আসে সেখান থেকে।
শাহানা নওশাদের দিকে তাকায় আড়চোখে। নওশাদ এখনো সেভাবেই বসে আছে। তার বদ্ধ ধারণা সে সত্যিই পৃথিবীতে নেই, বেহেশতে চলে এসেছে।
“সায়েরা এ তো তোমার চাওয়া, কিন্তু যার জন্য শীতলকে তুমি চাচ্ছো সে যদি রাজি না হয়? আবেগের বয়সে তো মানুষ কতো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। আজ সে কতো বড় পুলিশ অফিসার। কতো মেয়েরাই তো উদগ্রীব থাকবে তার জন্য। সেখানে আমার শীতলের আছে কি? একজন সাধারণ বাবার অতি সাধারণ মেয়ে। সে রাজকন্যা নয়, আমাদের গরীব ঘরের অতি আদরের একটা মেয়ে। উৎস কি ওকে মেনে নিবে?”
সায়েরা কিছু বলতে যাবে তার আগেই উৎস এসে দাঁড়ায় শাহানার সামনে। দুই হাত বুকে বেঁধে দাঁড়ায়। শাহানা তার মুখ থেকে কথা শোনার জন্য এ কথাগুলো বললো।
“মামি বেশি কিছু বলবো না, শুধু বলবো এই একটা বছর যার চোখের স্নিগ্ধতা আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে, আমাকে স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি যাকে দেখার নেশা তার অতিরিক্ত আর কি থাকতে হবে? আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না? আর হ্যা আবেগের বয়সে ভুল করার ছেলে আমি নই। আমি তো আপনাদেরই ছেলে, এতোটুকু কি চিনতে পারেননি আমাকে?”
সায়েরার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। শাহানা হাসতে যেয়েও হাসে না। এই মুহুর্তে এই ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছে পরম মমতায়। হাত-পা কাঁপছে তার খুশিতে।
নওশাদ সহসাই উঠে এসে উৎসের পাশে দাঁড়ায়, উৎসের কাঁধে হাত রাখে আলতো করে।
“মামা…”
নওশাদ নিজের কান্নাটুকু গিলে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো,”আমার মেয়েটাকে ভালো রাখিস বাবা। ওকে কোনো কষ্ট দিস না। আমার বড় আদরের মেয়ে ওরা।”
চোখের কোণা থেকে ছিটকে আসা পানিটুকু মুছে ফেলে সে সাথে সাথে।
“ঝিনুক যেমন মুক্তোকে আগলে রাখে, আমি সেভাবেই আপনার রাজকন্যাকে আগলে রাখবো কথা দিলাম। মুক্তোকে পেতে হলে আগে ঝিনুককে কাটতে হয়। শীতলকে কোনো আঁচ স্পর্শ করার আগে আমাকে অতিক্রম করতে হবে। মামা, ও মামা আপনি কাঁদছেন কেনো? আপনি না বলেন, মহাপুরুষদের চোখে পানি মানায় না? আমার চোকে আপনার চেয়ে মহাপুরুষ যে কেউ নেই।”
উৎস খুব যত্ন করে মামার চোখের পানি মুছে দেয়।
শাহানা বসে পড়ে মোড়াতে, তার শরীরে কোনো শক্তি নেই যেনো। এতোগুলো দিন একটা ভারী পাথর চাপা ছিলো শরীরে, আজ তা সরে গেলো। পাখির মতো ফুরফুরে লাগছে শরীরটা।
উৎস হাটু গেড়ে বসে শাহানার সামনে। শাহানা ঘোলাটে চোখে তাকায় তার দিকে।
“মামি কোনো ইচ্ছা অপূর্ণ রাখতে নেই। আমার মায়ের মতো করে আপনি আমাকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছেন না? দেরি করছেন যে?”
সায়েরা হাসে, শাহানা মাথা নিচু করে ঝরঝর করে কেঁদে দেয়। সায়েরা তাকে বসা থেকে ওঠায়। উৎস দুই হাতে দুইজনকে জড়িয়ে ধরে। উৎসের প্রশস্ত বুকের সামনে দুইজন যেনো শিশু হয়ে যায়। আজ তারা মা আর উৎস ছেলে নয়, আজ তারা কন্যা আর উৎস তাদের বাবা। উপস্থিত সবার চোখেই পানি চলে আসে।
মিনিট পাঁচেক পর সায়েরা মাথা তুলে চোখ মুছে বহ্নির দিকে তাকিয়ে বললো,”বহ্নি এবার যা, শীতলকে ডেকে নিয়ে আয়। বিয়ের সময় উৎসের বাবার আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিলোনা। স্বর্ণের মধ্যে এই আংটিটাই দিয়েছিলো আমাকে। বাসর রাতে নিজে আমাকে এটা পরিয়ে দিয়ে বলেছিলো একদিন তোমাকে সব দিবো। সে যাই হোক, আজ এক আংটি আমি আমার পুত্রবধূকে পরিয়ে দিবো। আমার ছেলেটার সুখের চাবি তুলে দিবো ওর হাতে এটা পরিয়ে।”
বহ্নি আঁচল কোমরে গুঁজে হেসে বললো,”এক্ষুনি যাচ্ছি ফুপু।”
বহ্নি তাড়াহুড়ো করে এগোতে গেলে উৎস তাকে আটকায় হঠাৎ।
“বহ্নি দাঁড়া।”
“কি হয়েছে?”
উৎস ঠোঁট কামড়ে হাসে মায়ের দিকে তাকিয়ে।
সায়েরা কঠিন গলায় বললো,”উৎস আর কোনো দুষ্টুমি করবি না কিন্তু। অনেক কষ্ট দিয়েছিস আমার মেয়েটাকে, আর না।”
“মা কি যে বলো, আমি কি দুষ্টুমি করি নাকি?”
সায়েরা ভ্রু কুঁচকে বললো,”তাহলে বহ্নিকে আটকাচ্ছিস কেনো?”
“মা তুমিই তো বললে এই আংটি বাবা তোমাকে পরিয়ে দিয়েছে। তাহলে আমার বউকে তুমি কেনো পরাবে? আমাকে দাও, আমি পরাই।”
সবাই হেসে দেয় জোরে। সায়েরা কপট রাগ করে ছেলের পিঠে থাপ্পড় মারে একটা।
“আসতে না আসতেই ভন্ডামি শুরু করে দিয়েছিস? হ্যা রে তুই কি একটুও শোধরাবি না?”
“মা আমি যদি শুধরে যাই তাহলে দুনিয়াটাই পালটে যাবে। কি দরকার বলো শুধু শুধু দুনিয়াটা পালটে ফেলার? এরচেয়ে আংটিটা দাও, আমি নিজে পরিয়ে দিই মহারানীকে।”
সায়েরা মুখ টিপে হেসে আংটিটা উৎসের হাতে তুলে দেয়। ভীষণ সুন্দর মীনা কাজ করা সোনার একটা পাতলা আংটি। উৎস বেশ কিছুক্ষণ দেখে মুগ্ধ হয়ে ওটা।
“যাচ্ছিস যা, কিন্তু ওকে যেনো একদম জ্বালাবি না।”
উৎস চোখ টিপে দেয় মায়ের দিকে তাকিয়ে। যার অর্থ জ্বালানো তো মাত্র শুরু।
কিন্তু উৎস শীতলের ঘরের দিকে না যেয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে গেলে আভা পিছন থেকে বলে,”উৎস ভাই মেজো আপা তো ঘরে, আপনি দোতলায় উঠছেন যে?”
উৎস মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকায় আভার দিকে।
“তোর মেজো আপা কোথায় থাকতে পারে আমি খুব ভালো করে জানি। সে ঘরে নেই।”
“তাহলে….?”
উৎস ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়। উঠোনে বাকি মানুষগুলো এক অনাবিল শান্তি উপভোগ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
সেই চিলেকোঠার ছোট্ট ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে উৎস, ভিতর থেকে দরজাটা চাপা দেওয়া। ঈষৎ ফাঁকা আছে। সেই ফাঁকা দিয়ে উৎস স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে শীতল তার খাটের উপর দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে, তার হাতে উৎসের একটা শার্ট। একটু পর পর সে শার্টটা মুখের সাথে চেপে ধরছে। উৎসের গলাটা ধরে আসে। মামা বলে মহাপুরুষদের কাঁদতে নেই। কিন্তু সে তো মহাপুরুষ নয়। মহাপুরুষ হলে হয়তো এই মায়া ভুলতে পারতো সে। কিন্তু সে পারেনি, বরং এই এক বছরে তাকে দেখতে না পেয়ে তার মায়ায় আরো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গেছে সে। সে মহাপুরুষ নয়, তার কাঁদতে বারণ নেই।
“শীতল।”
শীতল ভয়াবহ ভাবে চমকে ওঠে। হাতের শার্টটা ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় তৎক্ষনাৎ। তার চোখমুখ লাল কিছুটা।
“আমি আসছি।”
“পালাচ্ছো?”
যেতে যেতে শীতল পিছন ঘুরে তাকায়। উৎস খুব শান্ত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
“পালাবো কেনো?”
“তাহলে আমাকে দেখেই যে চলে যাচ্ছো।”
শীতল ম্লান হেসে বললো,”এখন আপনার কতো কাছের মানুষ আছে। তাদের নিয়েই ব্যস্ত আছেন। সেই গন্ডিতে আমি না থাকলেও চলে।”
“আর আমার তৃষ্ণার যে গন্ডি, তা মেটাবে কে?”
ঝট করে শীতল তাকায় উৎসের দিকে। উৎস মুহুর্তের মধ্যে শীতলের বাম হাতটা টেনে ধরে নিজের অনেকটা কাছে নিয়ে চলে আসে, যতোটা কাছে আসলে দু’জনের শ্বাস মিশে একাকার হয়ে যায় ততটা কাছে।
উৎসের বুকের কাছে মাথাটা পড়ে শীতলের। সে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে কিন্তু উৎস এক হাত দিয়েই শক্ত করে চেপে ধরে রাখে তাকে, ছুটি মেলার সাধ্য কই সরু কায়ার শীতলের?
“ছাড়ুন আমাকে।”
“একটা বছর তো ছেড়েই রেখেছি, মন ভরেনি?”
“ঢং করবেন না। সেই সন্ধ্যা থেকে সবার সাথে বসে হাহা হিহি করছেন। আমি যে সেখানে উপস্থিত নেই সে খেয়াল আছে? নেই, নেই, নেই। আর থাকবে কেনো? এখন তো আপনার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী আছে, ভালোবাসার মানুষ আছে। সেখানে আমার স্থানটা কোথায়? আমি কে? আমাকে তো আপনি….”
শীতল কথা শেষ করতে পারেনা, উৎস তার বাহু জোড়া চেপে আরো কাছে টেনে আনে। শীতল এখন নিয়ন্ত্রণহীন, তা ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছে তার কথায়। কণ্ঠ কেঁপে কেঁপে উঠছে। ঠোঁটও কাঁপছে তিরতির করে।
“কি হলো? কি বলছিলে বলো, কথা শেষ করো। আমি শুনছি তো।”
শীতল কঠিন গলায় বললো,”আর কিছু বলবো না, আমাকে ছাড়ুন।”
উৎস ঘোরলাগা নেশাক্ত গলায় বললো,”এতো রাগ হলো কেনো এই অধমের উপর? আমার অন্যায় কি শুধু মহারানীর খোঁজ না নেওয়া?”
“খোঁজ নিতেও হবে না আমার।”
শীতলের গলা ধরে আসে। সে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে।
“তোমাকে একটু বিশ্রাম দিলাম শেষ বারের মতো। তুমি আর বিশ্রাম পাবে না তো, তাই।”
শীতল ভ্রু কুঁচকে তাকায় উৎসের দিকে।
“তার মানে?”
“মানেটা খুব সাধারণ। খুব তাড়াতাড়ি, সম্ভব হলে কালই আপনাকে মিস থেকে মিসেস বানাতে চলেছি ম্যাডাম। যতো দেরি তত লস।”
শীতলের কান লাল হয়ে যায় লজ্জায়। তাকে লজ্জা পেলে একটা সদ্য ফোঁটা লাল জবাফুলের মতো লাগে। উৎসের মাতাল মাতাল লাগে সেই রূপ দেখলে।
শীতল লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে বললো,”লস কিসের?”
“বাহ রে! বাচ্চাকাচ্চার পড়াশোনার দেরি হয়ে যাচ্ছে না? দেখা যাবে আমরা বুড়ো হয়ে গেলাম, বাচ্চা নার্সারিতে পড়ে। বাপ যাবে স্কুলে বাচ্চাকে আনতে, সবাই বলবে ওই দেখ বাচ্চার নানা। ব্যাপারটা কেমন না?”
“উফফ অসহ্য, আপনি কি মানুষ হবেন না?”
“তোমার ভালোবাসার অভাবে অমানুষ হয়ে যাচ্ছি। তুমি মানুষ বানিয়ে ফেলো আবার।”
উৎস আরেকটু কাছাকাছি চলে আসে শীতলের। শীতল আবারও তাকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করে।
“ছাড়ুন তো, কে কখন চলে আসবে।”
“কেউ আসবে না অনুপমা, কেউ-ই আসবে না।”
“কেনো? সবাইকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে এসেছেন নাকি?”
“হ্যা তা বলতে পারো। সবাই আমাদের বিয়ের আলোচনা করছে নিচে, কার সময় আছে এখন আমাদের বিরক্ত করার?”
শীতলের মুখ হাঁ হয়ে যায়।
“অ্যাঁ?”
“জ্বি হ্যা। শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল মারবো এবার, কি মজা!”
শীতল হাসবে না হাসবে না করেও ফিক করে হেসে দেয়। প্রথমে আস্তে এরপর জোরে শব্দ করে। হাসি ছড়িয়ে পড়ে তার শরীর জুড়ে। কেঁপে কেঁপে হাসে মেয়েটা, উৎস মুগ্ধ হয়ে দেখে।
হঠাৎ উৎস শীতলের চুলগুলো সামনে ছড়িয়ে দেয়, এরপর ওড়নাটা খুলে নিয়ে আলতো করে শীতলের চোখটা বেঁধে দেয়।
“কি করছেন?”
“এসো আমার সাথে।”
উৎস শীতলের হাতটা চেপে ধরে তাকে ঘরের বাইরে নিয়ে আসে। এরপর আচমকাই শীতলকে পাঁজকোলা করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে, দোতলার ছাদে। এই ছাদটা ভীষণ সুন্দর। শীতল খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখে ছাদটা। ছাদের কিনারা ঘেঁষে চারপাশে গোলাপ গাছ লাগিয়েছে। চন্দ্রের তীর্যক আলো পড়েছে গোলাপগুলোর উপর। মৃদু, মিষ্টি সুগন্ধের সাথে অপার্থিব দৃশ্য উৎসকে দূর্বল করে দেয়। থইথই জ্যোৎস্না চারপাশে। আর মধ্যখানে তার পরমা সুন্দরী প্রেয়সী, তার চন্দ্রকন্যা। সময়টা এখানে থমকে গেলেও খুব একটা মন্দ হয়না। এরচেয়ে সুন্দর, এরচেয়ে অমলিন দৃশ্য এই পৃথিবীতে আর কোথায়?
ছাদের মাঝামাঝি এনে উৎস শীতলকে নামায়। শীতল বড় বড় শ্বাস নিতে থাকে। এতোক্ষণ ভয়েই ছিলো লোকটা ফেলে দেয় কিনা সিঁড়ি থেকে তাল সামলাতে না পেরে।
শীতল কিছু বলার আগেই উৎস হাটু মুড়ে বসে পড়ে শীতলের সামনে। শীতলের হাতটা নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে চেপে ধরে সে। আস্তে আস্তে অনামিকা আঙ্গুলে পরিয়ে দেয় সেই আংটিটা। রূপোলী চাঁদের আলোয় সোনালী আংটিটা চিকচিক করে ওঠে। মেহেদী দেওয়া হাতটা যেনো হাতছানি দিয়ে ডাকছে উৎসের সুপ্ত অনুভূতিগুলোকে।
“চোখটা খুলো শীতল।”
শীতল আলগোছে ওড়নাটা খুলে তাকায়। নিজের আঙ্গুলে চকচক করা আংটিটা দেখেই চোখ বড় বড় হয়ে যায় শীতলের।
“এটা তো ফুপুর….”
“উহু, ফুপু নয়, মা। আমার মা মানে তোমারও মা। হ্যা এটা মায়ের। বাবা তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে বাসর রাতে এটা উপহার দিয়েছিলেন। আমিও দিবো সেই মধুক্ষণে। কিন্তু আমার মায়ের অনেক শখ সে তার পুত্রবধূকে এই আংটিটা উপহার দিবেন। উনি পরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি চাইনা মা এটা তোমাকে পরিয়ে দিক। তোমাকে পরানোর সময় তার পুরোনো স্মৃতি মনে পড়বে, সে কষ্ট পাবে। আমি তাকে এই কষ্টটা দিতে চাইনা। আমি আমার মা’কে স্বর্ণের দোকানে নিয়ে যাবো। বলবো যা ইচ্ছা কিনতে। সে তার পুত্রবধূকে উপহার দিবে। কিন্তু এটা আমি তোমাকে পরিয়ে দিলাম। তোমার পছন্দ হয়েছে?”
শীতলের চোখের কোণা চিকচিক করে ওঠে।
গাঢ় গলায় সে বললো,”খুব পছন্দ হয়েছে খুব। বিশ্বাস করুন, আমার কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে সবকিছু। বিশ্বাস হচ্ছে না কোনোকিছুই। এই জ্যোৎস্নাস্নাত রাত, এতো সুন্দর উপহার আর সামনে…”
“সামনে?”
শীতল লাজুক হেসে মাথা নিচু করে বললো,”সামনে আমার ভালোবাসা, আমার প্রেম, আমার ভবিষ্যৎ।”
উৎস মুচকি হেসে শীতলের হাতটা নিজের গালে ঠেকায়। মিষ্টি একটা গন্ধ পায় সে। কোনো পারফিউমের না। প্রতিটা মানুষের শরীরেই একটা গন্ধ থাকে। ব্যক্তিত্বের উপর নির্ভর করে সেই গন্ধ। হাসনাহেনার মতো স্নিগ্ধ মেয়েটার শরীরের গন্ধ যেনো ফুলের সুঘ্রাণকেও হার মানায়।
“শীতল আমি কখনো ভাবিনি আমার জীবনটা এতো সুন্দর হবে। এতো সুখ আমার ভাগ্যে ছিলো। আজ বলতে বাধা নেই, সেই কিশোর বয়স থেকেই তোমাকে ভালোবেসেছি আমি, হ্যা বেসেছি। আমার অনুভূতি গুলো একটু একটু করে জাগ্রত হলো। তুমি কৈশোরে পা দিলে। আমি বুঝলাম তুমিও আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছো। কিন্তু আমি ভয় পেতাম, খুব। কি আছে আমার? কিছুই নেই। যে আমাদের আশ্রয় দিলো, বাবার স্নেহ দিয়ে বুকে টেনে নিলো তাকে কষ্ট দিই কীভাবে? কিন্তু মানব মন কি কোনো বাধানিষেধ মানে? শোনে কোনো বারণ? আমি একটু একটু করে ডুবে গেলাম তোমার মায়ায়, তোমার ভালোবাসায় নিজের অজান্তেই। একজন বুঝেছিলো, আমার মা। মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকতো। কি বলবে ভেবে পেতো না। অনেকক্ষণ নীরবে বসে থাকতাম আমরা। কিন্তু না, আজ আর কোনো নীরবতা না, আজ আর কোনো লুকোচুরি না। আজ সারা পৃথিবীর সামনে আমি উৎস শাহরিয়ার চিৎকার করে বলতে পারি, আমার মনের মধ্যে থাকা রাজকুমারীটা আজ থেকে শুধুই আমার, শুধুই আমার। এই ভালোবাসার চিহ্নটুকু তার শরীরে ছুঁইয়ে তাকে দলিল করে নিলাম নিজের নামে। শুধু তোমার কাছে আমার একটাই জিজ্ঞাসা, যে মোহমায়ায় এতোগুলো বছর বেঁধে রেখেছো আমায়, জীবনের শেষ মুহূর্তটা পর্যন্ত রাখবে? যে তৃষ্ণায় উন্মাদ বানিয়েছো আমায়, সেই তৃষ্ণা কি মেটাবে? যে ভালোবাসায় চোরবালির মতো ডুবতে হয়েছে আমাকে প্রতিনিয়ত, সেই ভালোবাসা পাওয়ার সৌভাগ্য কি আমার হবে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত? অনুপমা তুমি কি আমার সঙ্গী হবে?”
উৎস থামে, আকুল দৃষ্টিতে শীতলের দিকে তাকিয়ে আছে সে। এই মুহুর্তে মেয়েটাকে গ্রীক দেবী আফ্রোদিতির মতো লাগছে। তার লাবণ্যের কাছে যেনো জ্যোৎস্না ম্লান হয়ে আসছে। পুরুষের কাছে শখের নারী বুঝি এতোটাই রূপবতী হয়?
শীতলও হাটু গেড়ে উৎসের সামনে বসে পড়ে। দুই হাতে উৎসের মুখটা আঁকড়ে ধরে। চোখে চোখ রাখে তার প্রেমিক, তার ভালোবাসার মানুষটার।
“এই জ্যোৎস্নাকে সাক্ষী রেখে আপনাকে কথা দিলাম, আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আপনাকে ভালোবেসে যাবো। যদি কখনো ঝড় আসে আমার নিঃশ্বাসের সাথে জড়িয়ে নিবো, আপনাকে ছুঁতে দিবো না। দুনিয়ার সর্বোচ্চ ভালোবাসা আপনাকে দিবো। যদি কখনো ব্যর্থ হই, আপনি নিজ হাতে আমাকে যে শাস্তি দিবেন তা মাথা পেতে নিবো।”
উৎস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুটা হাসে। নিজের উরুটা মেলে সেখানে বসায় শীতলকে। শীতলের চুলগুলো এলোমেলো করে দেয়। হালকা বাতাসে লম্বা চুলগুলো উড়তে থাকে। কিছু এসে ভীড় করে তার চোখে, মুখে। উৎস আলতো করে সেগুলো সরিয়ে দেয়।
“শীতল।”
“বলুন।”
“তুমি আমার কাছে কি চাও? আজ তুমি যা চাইবে তোমাকে আমি তাই দিবো।”
“সত্যি বলছেন?”
“আমাকে মিথ্যা বলতে দেখেছো?”
শীতল কিছুক্ষণ ভেবে আস্তে আস্তে বললো,”আজ রাতটা জ্যোৎস্না বিলাশ করি আমরা? শুধু আমি আর আপনি। এইখানে, এই ছাদে। আজ সারাটা রাত উথালপাতাল জ্যোৎস্নায় নিজেদের অঙ্গ ভেজাবো। রূপোর মতো আলো যখন মোমের মতো গলে আমাদের ভিজিয়ে যাবে, তখন আমাদের প্রেম প্রতিধ্বনিত হবে। আজ এই আকাশ, এই চাঁদ, এই প্রকৃতি সবাই দেখবে উৎসের শীতল ভালোবাসা আর শীতলের হৃদয় নিংড়ানো প্রেমের উৎস। দিবেন এই রাতটা আমাকে আপনার সাথে জ্যোৎস্না বিলাশ করতে?”
উৎস শীতলের চোখের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে বললো,”ব্যস এটুকুই?”
“হু এটুকুই।”
“বেশ আজকের মতো এটুকুই। তবে যেদিন আমার ঘরে আনবো তোমায় বউ করে। সেদিন এটুকুতে হবে না। লাল জামদানী পরা পরীটাকে সেদিন ঘর্মাক্ত ভালোবাসা দিবো।”
“ঘর্মাক্ত ভালোবাস মানে?”
“যে ভালোবাসায় শরীর ঘামে ভিজে যায়।”
শীতল রাগে ফোঁসফোঁস করে শ্বাস ফেলে। উৎস শব্দ করে হেসে দেয়।
“আচ্ছা বেশ, মহারানীর আদেশ শিরোধার্য। তবে আমার একটা শর্ত আছে।”
“কি শর্ত?”
“আমাকে গান শোনাতে হবে। নাহকে দেখা যাবে পাশে বসে থাকা চন্দ্রের কোলের মাথা রেখে ঘুমে তলিয়ে গেলাম।”
“শোনাতে পারি, তবে আপনাকেও গাইতে হবে সাথে। নাহকে হবে না।”
উৎস একরাশ মায়া নিয়ে তাকায় শীতলের দিকে, শীতলও ফিরিয়ে দেয় মিষ্টি ভালোবাসার দৃষ্টি।
পাশাপাশি শুয়ে আছে রণ আর বহ্নি। মাঝে তাদের ছোট্ট রাজকন্যা নীলু। জানালাটা খোলাই রেখেছে। সেই জানালা থেকে চান্দের আলো এসে পড়েছে তাদের ঘরে। রণ বহ্নির দিকে তাকায়। তার গালটা ঈষৎ ভেজা, চাঁদের নরম আলোয় কি ভীষণ রহস্যময়ী লাগছে মেয়েটাকে।
রণ আধশোয়া হয়ে বসে সাথে সাথে।
“এ কি বহ্নি, কাঁদছো কেনো তুমি?”
বহ্নি তাড়াতাড়ি করে চোখ মুছে বললো,”কোথায় কাঁদছি? কাঁদছি না তো।”
“স্পষ্ট দেখছি তুমি কাঁদছো। কি হয়েছে আমাকে বলো। আমি কোনো অন্যায় করেছি?”
“ধুর তুমি আবার কি অন্যায় করবে? ওসব কিছু না।”
“তাহলে কি হয়েছে?”
বহ্নি পাশ ফিরে নীলুর দিকে তাকায়। মেয়েটা একদম বাবার মতো হয়েছে। ঘুমিয়ে গেলে একদম কাদার মতো ঘুমিয়ে থাকে শরীরের সাথে লেপ্টে। বহ্নি মেয়ের কপালে একটা চুমু এঁকে দেয়। রণ শান্ত হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
“ভাবছি শুধু, এই সাধের জীবন রেখে কীভাবে অন্ধকার কবরে যেয়ে শুয়ে থাকবো? এতো মায়া, এতো ভালোবাসা আর এতো শান্তির নীড় ফেলে কীভাবে থাকবো ওই অন্ধকার কুঠুরিতে? এতো মায়া কেনো দিলো আল্লাহ আমাদের?”
রণ নীলুকে আরেক পাশে শুইয়ে দিয়ে বহ্নির কাছাকাছি চলে আসে। এক বাহুর নিচে বহ্নির মাথাটা রেখে তাকে জড়িয়ে ধরে।
বহ্নির নীরব কান্না টের পায় সে। চোখের উষ্ণ পানি রণের হাতে পড়ে।
“কেঁদো না বহ্নি, কেঁদো না। আজ যে খাঁ বাড়িতে খুশির দিন। এমন দিনে কাঁদতে নেই।”
বহ্নির চোখটা মুছে দেয় রণ কোমল হাতে।
“আমাদের জীবন অসম্ভব সুন্দর রণ। কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে আছে আমাদের প্রশান্তি। খুব ভয় হয় মাঝে মাঝে, এ সুখ স্থায়ী হবে তো?”
“হবে বহ্নি, হবে। কেনো ভয় পাও তুমি?”
“সেই পুরোনো দিনের কথা মনে পড়লে শিউরে উঠি। সেই যে সজীব আমার সাথে….”
রণ এক হাত বহ্নির মুখের উপর রাখে সহসাই।
“বহ্নি….”
বহ্নি চুপ করে যায়।
“তোমাকে আমি কতোদিন বলেছি এসব কথা মনে ঠাঁই না দিতে। তুমি আবার এসব শুরু করলে?”
“রণ আমি ওভাবে বলতে চাইনি….”
রণ বহ্নিকে ছেড়ে শুয়ে পড়ে আবার। বহ্নি অপরাধী মুখে রণের কাছে এগিয়ে যায় আবার। জোর করে রণের বাহুর মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে দেয়।
“রাগ করলে?”
“রাগ করার মতো কথা বললে রাগ করবো না?”
“তাহলে কীভাবে মশাইয়ের রাগ ভাঙাই?”
“যা বলবো তাই করবে?”
“করতে তো হবে। কত্তামশাই রাগ করে থাকলে কি গিন্নীর মন ভালো থাকে?”
“ভেবে বলছো?”
“বলছি।”
রণ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বহ্নির কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললো,”আমাদের নীলুটা একদম একা না? একা একা খেলাধুলা করে সারাদিন।”
বহ্নি চোখ বড় বড় করে বললো,”হ্যা তো?”
“তো বলছিলাম, ওর একটা ভাই বোন আনলে কেমন হয়? এই না না আমার নিজের জন্য বলছি না। আমার মেয়েটার জন্য….”
“ধুর।” বলে বহ্নি সরে যায়। অন্যপাশে ফিরে ঠোঁট টিপে হাসে সে।
রণ মন খারাপ করে বললো,”থাক রে নীলু মা আমার, মন খারাপ করে কি করবি? তোর মা চায়না তোর আরেকটা ভাইবোন আসুক। সব তোর মায়ের দোষ।”
“তাই না? এখন সব দোষ আমার হয়ে গেলো? আমার যে নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই তা খেয়াল আছে? স্কুল সামলে, সংসার সামলে, বাচ্চা সামলে আমার ত্রাহিত্রাহি অবস্থা। এরমধ্যে আবার?”
“আমি আর নীলু সামলে নিবো, কি রে বেটি পারবো না আমরা?”
বহ্নি খিলখিল করে হেসে দেয়। মেয়েটা ঘুমাচ্ছে, তার সাথে তার বাপ কথা বলছে। এই লোকটা ভালো হলো না আর। আর ওটুকু বাচ্চার সাথে তার বাপ খুব সামলাবে কিনা!
রণ মুগ্ধ হয়ে তাকায় বহ্নির দিকে। চাঁদের আলো চোখেমুখে এসে পড়েছে তার। কি ভীষণ সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে। শ্যামবর্ণের মেয়েদের জন্য চোখে কাজল আর রূপোলী জ্যোৎস্নার চেয়ে সুন্দর আর কোনো প্রসাধনী হতে পারেনা।
“ওভাবে হেসো না আমার ব্যক্তিগত চাঁদ, আমি সেই শুরুর দিনের মতো প্রেমে পড়ে যাই।”
বহ্নি হাসি থামিয়ে বললো,”কি হবে পড়লে?”
“কি হবে জানতে চাও?”
“চাই।”
“বেশ তবে তাই হোক।”
“এই এই কি করছো?”
ঘন শ্বাসের শব্দ ছাড়া পরবর্তী মুহুর্ত গুলো আর কিছু শোনা যায়না ও ঘর থেকে। প্রকৃতি যেনো আজ এ বাড়ির প্রতিটা ঘরে সমুদ্রের মতো প্রেম ছড়িয়ে দিয়েছে। এ সমুদ্রের বাঁধ নিয়ন্ত্রণ করার সাধ্য কার?
ক্যালকুলেটর আর একগাদা হিসাব নিকাশ নিয়ে এই রাতে কাজে বসেছে আবির। এজন্যই ব্যবসা বাণিজ্য তার পছন্দ না। জোয়ারের মতো টাকা আসছে ঠিকই, কিন্তু গলদঘর্ম অবস্থা তার। প্রতি রাতেই কাজ করতে হয় জেগে থেকে। আভা জাগতে পারেনা, তার সকালে ক্লাস থাকে। তাই তার যেনো অসুবিধা না হয়, আবির সব কাজ বারান্দায় বসে করে। আভার খুব খারাপ লাগে, মানুষটা খাটতে খাটতেই অর্ধেক হয়ে যাচ্ছে। এখন তার একটু বিশ্রাম তো দরকার।
“আপনার চা।”
আবির কিছুটা চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখে আভা চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাত বাজে আড়াইটা, এখনো আভা ঘুমায়নি?
“আভা, তুমি এখনো ঘুমাও নি?”
আভা আবিরের গা ঘেঁষে বসে পাশেই। আবির চা’টা হাতে নিয়ে তাতে ছোট্ট করে চুমুক দেয়।
“চা টা খুব সুন্দর হয়েছে আভা।”
আভা কিছু বলেনা, চুপ করে বসে থাকে।
আবির লক্ষ্য করে তাকে, আভা তো এতো চুপচাপ থাকার মেয়ে নয়। কি হয়েছে তার?
কাপটা রেখে আবির আভার মুখটা নিজের দিকে ফেরায়।
“আভা তোমার মুখটা এমন লাগছে কেনো?”
“কেমন লাগছে?”
“কেমন অন্ধকার হয়ে আছে। কি হয়েছে আমাকে বলো? শাড়ি পছন্দ হয়েছে? টাকা লাগবে? নিয়ে নাও মানিব্যাগ থেকে যতোটা লাগবে।”
আভা আবিরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চিৎকার করে বললো,”টাকা ছাড়া কি আর কিছুই চাওয়ার থাকতে পারেনা? কিছু হলেই টাকা, টাকা, টাকা। কেনো? আমি কি একটা মেশিন? আমি যে একটা মানুষ, আপনি তো ভুলেই গিয়েছেন।”
আভা হাঁপাতে থাকে কথা শেষ করে। আবির হতভম্ব হয়ে যায়। আভার দিকে হতবাক হয়ে তাকায় সে।
“আভা কি বলছো এসব? আমি কি তোমার কোনো চাহিদা অপূর্ণ রেখেছি? তুমি বলো তোমাকে কি দিই নি আমি? তবুও এভাবে বলতে পারলে তুমি?”
“হ্যা দিয়েছেন, অনেক অনেক কিছু দিয়েছেন। যা পাওয়া আমাদের মতো নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের কাছে স্বপ্ন ছিলো তা সবই দিয়েছেন আপনি। তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ আপনার কাছে।”
আবির সব কাজ ফেলে আভার সামনে হাটু মুড়ে বসে। আভার হাত দু’টো জোর করে নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে চেপে ধরে।
“আভা আমার দিকে তাকাও লক্ষীটি, আমাকে না বললে কীভাবে বুঝবো যে তোমার কি হয়েছে?”
আভা রাগী চোখে তাকায় আবিরের দিকে।
“আভা বলো কি চাই তোমার? তুমি বললে তো আমি চাঁদটাও এনে দিতে পারি। তবুও তোমার মুখে গ্রহণ লাগুক তা আমি চাইনা।”
“যদি তাই হয় সব কাজ দশ দিনের জন্য বন্ধ রাখুন। আমাকে সমুদ্রে বেড়াতে নিয়ে চলুন, পাহাড়ে ঘুরতে নিয়ে চলুন। আমি আপনার হাতে হাত রেখে, নীল শাড়ি পরে সমুদ্রবিলাশ করতে চাই, আমি মেঘেদের দেশে হারিয়ে যেতে চাই, আমি পাহাড়ের রাজ্য চষে বেড়াতে চাই আপনার সাথে। যেতে চাই সেখানে, যেখানে আকাশ আর প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আর আপনার সাথেই যেতে চাই। বিয়ের পর থেকে আপনাকে নিজের করে পেতে পারিনি। আপনার পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর পরই এই বিশাল ব্যবসায়ের বোঝা এসে পড়লো আপনার উপর। দুইজন দুইজনকে আবিষ্কারটুকু করতে পারিনি এখনো। বাইরে আমরা কতো হাসিখুশি একটা দম্পতি। আর এই বদ্ধ ঘরের ভিতর? আমরাই শুধু জানি আমরা কতোটা অসুখী। আপনি রাত জেগে কাজ করেন আর আমি ঘরে একাই ঘুমাই। সকালে আমি ক্লাসে চলে যাই আর আপনি আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। আচ্ছা আপনি বলুন তো শেষ কবে আপনি আমাকে আদর করেছেন?”
আবির স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকে আভার কথায়। আভার একটা কথাও মিথ্যা না। সে যা বলছে শতভাগ সত্য। কাজের চাপে তার মাথা খারাপ অবস্থা। কিন্তু আভা যে এতোটা অসুখী সে আসলেই বুঝতে পারেনি। এখন মনে হচ্ছে আভার সাথে আসলেই সে বড্ড বেশি জুলুম করে ফেলেছে। নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয় তার।
“উত্তর নেই আপনার কাছে। থাকার কথাও না। আপনার কাছে তো কাজই সব।”
“তাহলে তুমি কি চাও এখন? যা তোমাকে আবার হাসিখুশি করবে?”
“এখনো বুঝতে পারছেন না? আমি কমপক্ষে দশদিনের জন্য ঘুরতে যেতে চাই। আমার ক্লাস বন্ধ, এখনই সুযোগ।”
আবির মাথা নিচু করে বললো,”কাজের চাপটা একটু কমুক, তারপর নাহয়…..”
চেয়ারে লাথি দিয়ে আভা উঠে দাঁড়ায়। রাগে শরীর কাঁপছে তার।
“সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে থাকে না মিস্টার আবির। আপনি থাকুন আপনার কাজ নিয়ে। আমার খোঁজ নিতে হবে না আপনাকে।”
আভা ঘরে চলে যায় সাথে সাথে, শুয়ে পড়ে বিছানায়। বালিশ ভিজে যায় তার চোখের পানিতে।
এভাবে বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর হঠাৎ ঘরের আলো জ্বেলে দেয় আবির, আভা বিরক্ত হয়ে তাকায়।
“কি সমস্যা? দেখতে পারছেন না ঘুমাচ্ছি?”
“তুমি ঘুমাচ্ছো না আভা, জেগেই আছো। জেগে যখম আছো, এসো একটা কাজ করো।”
“কি কাজ?”
“জামাকাপড় গুছিয়ে নাও। তোমাদের মেয়েদের তো আবার কোথাও যাওয়ার কথা থাকলে ইয়া বড় পেট মোটা লাগেজ লাগে কয়েকটা। কাল রাতের মধ্যে গোছাতে হবে তো।”
আভা ধড়ফড় করে উঠে বসে শোয়া থেকে, বুক কাঁপতে থাকে তার।
“তার মানে? আমরা কোথায় যাবো কাল?”
“এইযে এতোক্ষণ সব গুছিয়ে নিলাম। কাজের ভার ম্যানেজারকে বুঝিয়ে দিলাম মেইল করে। এরপর এক ছোট ভাইকে দিয়ে টিকিট কেটে ফেললাম, হোটেলও ও-ই ম্যানেজ করবে। আগামীকাল রাতে আমরা প্রথমে যাবো সাজেক এরপর তোমার সাথে সমুদ্রবিলাশ করতে যাবো ছেঁড়াদ্বীপে। সেখানে নীল পানির সাথে একাকার হয়ে যাবে আমার নীলপরী নিলামে ওঠা হাবা। আমার হাতে হাত রেখে যে সমুদ্র দেখবে, পাহাড় দেখবে, মেঘেদের দেশে হারাবে।”
আভা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সত্যিই এমন কিছু হবে? নাকি সে মজা করছে?
“আর আপনার কাজ?”
আবির হেঁটে এসে বসে আভার পাশে। আভার কপালে ছোট্ট করে চুমু এঁকে দেয়।
“কাজ তো আজীবনই করতে পারবো, কিন্তু রূপবতী বউ একবার অভিমান করলে, আমার থেকে দূরে চলে গেলে সে দূরত্ব ঘোচাবো কি দিয়ে?”
আভা ঝাপিয়ে এসে পড়ে আবিরের বুকের উপর। ফুঁপিয়ে ওঠে সাথে সাথে।
“আভা আমাকে ক্ষমা করে দাও তুমি। আমি যে এতো বড় অন্যায় তোমার সাথে করেছি, আমি নিজেই যে বুঝতে পারিনি। কাজে এতোটা ডুবে ছিলাম যে অন্য কিছু ভাবতেই পারিনি। আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি দুই হাত জোড় করে।”
আভা উত্তর দেয়না। অনাবিল শান্তি তার শরীরে বয়ে যায়। মানুষটা তাকে এতো ভালোবাসে?
“আজ রাতে তোমার সব অভিযোগ মিটিয়ে দিবো।”
আভা মাথা উঠিয়ে বললো,”আমার আর কোনো অভিযোগ নেই।”
“আছে।”
আবির উঠে যায়, লাইটটা বন্ধ করে দেয় ঘরের। হালকা চাঁদের আলো তাদের ঘরেও ঢুকেছে জানালা গলে। সে নরম আলোয় দুইজন দুইজনকে ভালোভাবেই দেখতে পারে। আবিরের চোখ গুলো জ্বলজ্বল করছে। সেই জ্বলজ্বলে চোখের উন্মত্ততায় আভা খুব ভালো করে বুঝতে পারে সে আজ আসলেই তার সব অভিযোগ মিটিয়ে দিবে।
“শাহানা, ও শাহানা।”
শাহানা উত্তর দেয়না। নওশাদ জানে সে ঘুমায়নি, ইচ্ছা করে ডাক শুনছে না।
“দোয়েল পাখি, ও দোয়েল পাখি।”
শাহানা সাড়া দিবে না দিবে না করেও এই পর্যায়ে হেসে দেয়। এই মানুষটার সাথে কোনো ভান চলে না তার।
“এইতো আমার দোয়েল পাখি। ডাক শুনছো না যে।”
“কি হয়েছে বলো।”
“তোমার মনে আছে অনেক অনেক বছর আগে, এমনই এক জ্যোৎস্না ভরা রাতে তুমি আমার কাছে কিছু একটা চেয়েছিলে।”
“কি চেয়েছিলাম?”
“একটু অপেক্ষা করো, বলছি।”
নওশাদ উঠে যায়, আলমারি খুলে একটা বাক্স বের করে। আবার খাটে এসে বসে শাহানার পাশে।
শাহানা সেদিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,”কি এটা?”
“চোখ বন্ধ করো আগে।”
“আরে এসব কি শুরু করেছো তুমি?”
“করো তো।”
অগত্যা বাধ্য হয়ে শাহানা চোখ বন্ধ করে। হঠাৎ গলায় একটা সরু, ঠান্ডা স্পর্শ পড়তেই চমকে ওঠে সে। সাথে সাথে চোখ খোলে। হালকা আলোয় গলায় চিকচিক করে ওঠা চেইনটা দেখেই সে বুঝতে পারে এটা স্বর্ণের।
“এটা….?”
নওশাদ নিজের দিকে ঘোরায় শাহানাকে। হাসি হাসি মুখে তাকায় স্ত্রীর দিকে।
“কি সুন্দর লাগছে তোমাকে শাহানা, একদম সেই কিশোরী বউটি আমার।”
“কিন্তু তুমি এটা, মানে আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
শাহানা হতভম্ব হয়ে একবার নওশাদের দিকে তাকায় আরেকবার গলার চেইনটার দিকে। ঘোর কাটছে না যেনো তার।
“তোমার পছন্দ হয়েছে শাহানা?”
শাহানার চোখ বেয়ে মুক্তোর মতো দানা গড়িয়ে পড়তে থাকে, নওশাদ এক হাতে সেই মুক্তোদানা তুলে নেয়।
“তোমার খুব শখ ছিলো এটার আমি জানি। টানাটানির সংসারে দিতে পারিনি হয়তো তখন। আমার খুব খারাপ লাগতো এজন্য। তাই অনেক আগে থেকেই একটু একটু করে টাকা জমাচ্ছিলাম এটার জন্য। ভেবেছিলাম আমাদের বিবাহবার্ষিকী আসছে সামনে, তখন দিবো। কিন্তু আজ রাতটা এতো মায়াবী, যে আর লোভ সামলাতে পারলাম না এই মায়াবী রাতে আমার মায়াবতীটাকে এতো সুন্দর একটা জিনিসে কেমন লাগে তা দেখার জন্য। দোয়েল পাখি আমার, তোমার পছন্দ হয়নি?”
শাহানা গাঢ় গলায় বললো,”খুব পছন্দ হয়েছে, খুব।”
নওশাদ হৃষ্টচিত্তে হাসে।
“আয়নায় দেখবে না কেমন লাগছে?”
“না তার প্রয়োজন নেই। তুমি-ই আমার আয়না। তোমার চোখের মুগ্ধতা দেখেই আমি বুঝতে পারছি আমাকে কতোটা সুন্দর লাগছে।”
নওশাদ শাহানার মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে। শাহানার চোখের পানিতে তার সাদা ফতুয়ার বাম পাশটা ভিজে যায়। নওশাদ তাকে আটকায় না। সারাদিন কঠিন রূপ দেখাতে দেখাতে মানুষটা ক্লান্ত, একটু কাঁদুক এখন, ক্ষতি নেই তো!
“এইযে এতো এতো মহাপুরুষ তোমার বাড়িতে আজ। তবে আমি বলবো এই মহাপুরুষদের শিক্ষক হলো তুমি। আমি আগে ভাবতাম মহাপুরুষ বলে কিছু হয়না, তোমার কথা হেসেই উড়িয়ে দিতাম। কিন্তু আমি নিজেই যে এক মহাপুরুষের ঘর করে গেলাম, তা বুঝতে পারিনি এতোদিন।
নওশাদ কিছু বলতে যাবে তার আগেই এক ভূবনভুলানো গমগমে গলার আওয়াজে চমকে ওঠে দু’জন। একে অন্যের দিকে তাকায়।
নওশাদ তাড়াতাড়ি করে উঠে দরজার কপাট খুলে দেয়। দোতলার ছাদ থেকে উৎসের মায়াভরা কণ্ঠের গানের সুর ভেসে আসছে। পুরো পরিবেশ যেনো আবেশিত হয়ে যায় সেই সুরে।
“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়….
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়….”
শাহানা এসে নওশাদের হাত ধরে। অপার্থিব সুরের মূর্ছনায় খাঁ বাড়ি ভেসে যায় যেনো।
ছাদের ঠিক মাঝখানটায় বসে আছে শীতল। চট করে জামা পালটে শাড়ি পরে এসেছে সে। গাঢ় নীল রঙের শাড়ি, সাথে সাদা ব্লাউজ। অপ্সরার মতো সুন্দর লাগছে তাকে। উৎস চোখ ফেরাতে পারেনা।তার কোলে মাথা রেখে ছাদের উপরই পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে উৎস। শীতল তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। তার উষ্ণ হাতের ছোঁয়া লাগে উৎসের কপালে। পাগল পাগল লাগে তার।
চাঁদটা হেলে পড়ছে পূবের দিকে, রাত এখনো অনেকটাই বাকি। সেই মোহময়ী আলো ভরা রাতে স্বপ্নসুধা পানে ব্যস্ত ওরা সবাই। এ কি মায়া, এ কি আবেশ, এ কি শান্তি। যার অনুভূতি নেই তার চেয়ে অভাগা আর কে আছে?
শীতলের চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে উৎসের গালে। সে তখনও গেয়ে চলছে,
“তারে ধরতে পারলে মনো বেড়ি
ধরতে পারলে মনো বেড়ি,
দিতাম পাখির পায়ে….
ক্যামনে আসে যায়।
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়,
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়।
আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাঁটা।
তার উপরে সদর কোঠা
আয়নামহল তায়।।
কপালের ফ্যার নইলে কি আর
পাখিটির এমন ব্যবহার।
খাঁচা ভেঙ্গে পাখি আমার
কোন বনে পালায়।।
মন তুই রইলি খাঁচার আশে
খাঁচা যে তোর কাঁচা বাঁশে।
কোন দিন খাঁচা পড়বে খসে
ফকির লালন কেঁদে কয়।।
ক্যামনে আসে যায়….”
নিজের ঘরে অতি শান্ত হয়ে বিছানার উপর বসে আছে সায়েরা। উৎসের পাগল করা সুর তার ঘরেও এসে পৌঁছিয়েছে। তার মাথা কাজ করছে না। এটা কীভাবে সম্ভব? সব কীভাবে মিলে যাচ্ছে? বিয়ের রাতে ছেলের বাবা যে একই গান তাকে শুনিয়েছিলো। সেই সুরের আবেশে আবিষ্ট হয়ে গিয়েছিলো তার মন।
এ যে সেই একই সুর, একই কণ্ঠ!
সায়েরার শরীর ছেড়ে দেয়। খাট থেকে নেমে মেঝেতে এসে বসে, হেলান দেয় খাটের সাথে। হাজার বছরের পুরোনো সেই রাত যেনো ফিরে এসেছে। হ্যা, ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হয়, হতেই হয়। কিছুটা বিবর্ধিত বাকিটা অপরিবর্তিত।
ভালো থাক ‘খাঁ’ বাড়ির প্রতিটা মানুষ। তাদের হৃদয় ভরে উঠুক অপার সুখে। যে সুখের ঠিকানা স্বর্গ থেকে আগত। এভাবেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হোক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। সকল অপ্রাপ্তি ভুলে প্রাপ্তির খাতা পূর্ণ হোক প্রতিটা প্রাণের।
(সমাপ্ত)