#মায়াকুমারী ❤️
#আনজারা_চৌধুরী
#পর্বসংখ্যা-(২৬)
_________________
যুক্তরাষ্ট্রে সময় তখন ভোর ছয়টা। হাড়কাঁপানো শীত পড়েছে! বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো বুশরা। ব্যালকনিতে যেতেই একপশলা হীম হাওয়া এসে ছুঁইয়ে দিতেই নড়েচড়ে উঠলো শীতে। স্নোফল হচ্ছে! হাত বাড়িয়ে স্নো নিলো। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে স্নোফলের সৌন্দর্য দেখলো। একটি মগ এনে বরফকুচি নিলো। কিচেনে গিয়ে স্টোভ অন করে সসপ্যানে ঢেলে দিলো। বরফকুচি দিয়ে চা-কফি পান করতে পছন্দ করে বুশরা! একমগ কফি বানিয়ে বেডরুমে গিয়ে বেডের উপর বসলো। কফিতে চুমুক দিয়ে ফোন হাতে নিলো। ধূসর তাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে রেখেছে! অজান্তেই জলে টইটম্বুর হলো চোখজোড়া! বুশরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে মেয়েদের চাইতে ছেলেরা বেশি ভালোবাসতে পারে না। অবশ্যই এর যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। এই যেমন নিশু ধ্রুবকে এত্ত এত্ত ভালোবাসে কিন্তু মানুষটা তার মুখও দেখতে চায় না। মানুষটাকে ভালোবেসে পাগল পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিল। এদিকে দ্যুতিও অনিককে পছন্দ করে,সম্ভবত ভালোবাসে যদিও প্রকাশ করে না কিন্তু তার ভাই ব্যপারটি বুঝেও ইগনোর করে। তদ্রূপ তার বেলায়ও। সে ধূসরকে পাগলের মতো ভালোবাসে মানুষটা জানে অথচ তাকে সবটা সময় ইগনোর করে। এই যে তাকে প্রতিটি জায়গা থেকে ব্লক দিয়ে রেখেছে। বুশরার মনে হচ্ছে তার শ্বাস আঁটকে রয়েছে! হাড়কাঁপানো শীত পড়েছে অথচ সারা রাত তার নির্ঘুম পার হয়েছে। মাথা ঝাপসা হয়ে ভারী হয়ে আছে। যন্ত্রণায় টনটন করছে! ছেলেরা যখন বুঝতে পারে মেয়েরা তাদের প্রতি উইক আর তখন থেকেই শুরু হয় যতশত অবহেলা। নিশু যখন প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিল তখন ওর কাজিনরা পাশে থাকায় সে আবারও সুস্থ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এটাকে কোনো সুস্থতা বলে! এই যে এত কষ্ট পেলো,ইভেন পাচ্ছে অথচ অপর মানুষটি জানেও না কিছু! নিশুর ভয়াবহ পিটিএসডি-এর সিমটম হচ্ছে এখনও। কিছু পিটিএসডি চিকিৎসা করা খুব কঠিন। সারা জীবন এর রেশ থেকে যায়। দুঃস্বপ্ন দেখে,ফ্ল্যাশব্যাক হয়। বলা যায় নিঃসন্দেহে ধ্রুব একজন সাইকোপ্যাথ। তা না হলে এভাবে নিশুকে কষ্ট দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হতো না। এত নৃশংসভাবে জ্যান্ত মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রেখে হ’ত্যা করতে পারতো না। সত্যি বলতে,এত কিছুর পরেও বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই মানুষটার মধ্যে। এরপরেও মানুষটাকে অন্ধের মতো ভালোবাসে নিশু। কেন বাসে তা বুশরার জানা নেই। দোয়া করলো,আর কারো যেন এরকম কষ্টের মাঝ দিয়ে যেতে না হয় যেমনটা নিশুর হয়েছিল। দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সৃষ্টিকর্তাকে ভীষণ করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় তার। পুরুষ মানুষ এমন কেন?এত পাষাণ এবং শক্ত হৃদয়ের কেন? তারা তিনটা নারীই তিনজন পুরুষের কাছে অবহেলিত হচ্ছে! নিশ্চয়ই এই পৃথিবীতে তাদের মতো আরো অসংখ্য নারী রয়েছে অভাগা,অবহেলিত! জলপ্রপাতের ন্যায় অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে দু-গাল বেয়ে।
__
শাওয়ার নিয়ে বেরুলো দ্যুতি। রুমে ঢুকলো নিশু।
“উনারা কেন এসেছেন?”
“কী জানি!”
“মনে হয় তোকে দেখতে এসেছে।”
“হতে পারে।”
“এজন্যই আমি বাসা থেকে কম বের হই। বাইরে গেলেও মাস্ক ছাড়া বের হই না। যেই দেখবে বিয়ের জন্য প্রস্তাব নিয়ে আসবে।”
শাওয়ার নিতে গেল নিশু। ভেজা টাওয়াল ব্যালকনিতে মেলে বিছানার উপর বসলো দ্যুতি। ফোন অন করে নিউজফিড স্ক্রোল করতেই দেখলো স্ট্যাটাস দিয়েছে অনিক।
“সিঙ্গেল লাইফ আর ভালো লাগে না। কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি প্রেম করতে চাইলে ইনবক্স করুন।”
এত নির্লজ্জ আর ছ্যাঁছড়া অনিক হতে পারে তা জানা ছিল না। ভেবেছিল আজকের ইন্সাল্টের পর সিরিয়াস হবে লাইফ নিয়ে কিন্তু যেই লাউ সেই কদু! দ্যুতিকে অনলাইনে এক্টিভ দেখে ট্যাগ দিয়ে পোস্ট করলো,”ভিতর থেকে বলছে হৃদয় তুমি আমার প্রিয় ট্রমা! ও ও প্রিয় ট্রমা!”
মেজাজ খারাপ হলো দ্যুতির। দ্রুত ট্যাগ রিমুভ করে টেক্স করলো,”লজ্জা-শরম বলতে কিছু নেই আপনার?”
“না। কুত্তা খাইয়া ফালাইছে!”
“এত কথা তখন কাকে বললাম? কাকে ইন্সাল্ট করলাম? গায়ে কি গন্ডারের চামড়া?”
“এখন আর কারো কথা গায়ে মাখি না নতুন একটা সাবান আর পারফিউম কিনছি ওটাই মাখি!”
“আপনি আমাকে আর টেক্স কিংবা ট্যাগ দিবেন না লাস্ট ওয়ার্নিং!”
“ছাইড়া যাইবা?”
“তো কী করবো?”
“ছাইড়া যাবা তো যাও! তোমারে বিয়া করলে বাচ্চাকাচ্চাগুলা তারছিঁড়া হইবো!”
“দু-একটা লম্পট গেলে আরো হাজারটা ভালো ছেলে আসবে।”
“আল্লাহ তোমার ব্যবসা বাড়াইয়া দিক!”
“ননসেন্স!”
সোজা মেসেঞ্জার থেকে ব্লক দিলো। হোয়াটসঅ্যাপ থেকে দ্রুত টেক্স পাঠালো,”ব্লক দিয়া লাভ নাই হাশরের ময়দানে ঠিকই দেখা হবে।”
দাঁতে দাঁত চেপে এখান থেকেও ব্লক করলো। হঠাৎ কল এলো বুশরার। পিক করলো দ্যুতি।
“কী হয়েছে?”
“তোর ভাই আমাকে ব্লক দিয়েছে। ব্লক খুলছে না।”
“কেন?”
“জানি না।”
“তোর ভাইকেও এখন আমি ব্লক দিয়েছি।”
“কেন?”
“ও পিএইচডি কমপ্লিট করে এসেছে ভালো কথা! চাকরি-বাকরি কিছু করে না উল্টা ঝুঁটি একটা করে পিছন দিয়ে। দেখলেই মেজাজ খারাপ হয় আর বমি আসে।”
“ওতো এমনই!”
“ওর কি সিরিয়াস হওয়ার দরকার নেই?”
“কিছু বলিসনি?”
“আজ ইন্সাল্ট করেছি এখন আমাকে ট্যাগ দিয়ে কী পোস্ট করেছে দেখ!”
সোজা ফেইসবুকে ঢুকে তাই দেখলো।
“আচ্ছা ওয়েট।”
সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফোন করলো অনিককে। পিক করে বলল,”কীরে গিতা আম্বানি কয়দিন পর কল দিছোস?”
“ফাজলামো বন্ধ করো!”
“হোয়াট?”
“চাকরি-বাকরি করবে না?”
“আমার মা-বাপের এত টাকা কেডা খাইবো?”
“পারলে নিজের যোগ্যতায় কিছু করো। ফকিরের মতো বাবা-মায়ের টাকার দিকে তাকিয়ে থেকো না।”
“ফিতা আম্বানির মতো কথা বলতাছোস?”
“এইসব বাজে কথা বলা বন্ধ করো!”
“কানের নিচে এমন থাপ্পড় দিমু বিটিভির মতো ঝিরঝির করবি।”
“তুমি আজীবন এমন থাকবে?”
“তো কী করবো?”
“দ্যুতির সঙ্গে তোমার কীসের সম্পর্ক?”
“কোনো সম্পর্ক নেই?”
“তো ডিস্টার্ব করো কেন?”
“কই করলাম?”
“হয়তো প্রেম করো নয়তো বিয়ে করো।”
“বিয়ের আগে প্রেম করা মানে অযথা অন্যের বউকে ফ্রীতে পাহারা দেওয়া! এইসব আমার দ্বারা ইম্পসিবল!”
“তো বিয়ে করো।”
“অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ করতে গেলেও ভয় লাগে। পরে দেখা যাবে কার না কার সূর্যের আলো,চাঁদের আলো,তারার আলো নিয়া টান দিচি।”
“ফাইজলামি পাইছো?”
“না তো! তবে ভাবছিলাম ধুতিকে নিয়ে ঘর বাঁধবো কিন্তু যা শুরু করছে তাতে বারান্দাও হবে না!”
“মেন্টাল!”
“পাগল!”
“দ্যুতিকে বলবো বিয়ে করে নিতে। লম্পটের জন্য বিয়ে ভেঙে লাভ নেই। ডিজগাস্টিং!”
“আমি নিষেধ করছি তারে বিয়ে করতে না?”
“ও তো এমন কিছু বলেনি!”
“তুই বললি ক্যান?”
“বাঁদরের গলায় মুক্তার মালা।”
“গীতা!”
সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলো বুশরা। পাগল একটা। মাথা শূন্য করে ফেলবে! ভীষণ বিরক্ত হয়।
“হ্লার অতি শোকে বাপ্পারাজের মতো পাথর হইতে চাইছিলাম অথচ দিলদারের মতোন কমেডিয়ান হয়ে গেছি! আসলেই আমাদের লাইফটাই এমন বাপ্পারাজের মতো! হেনাকে কেউ পায় না। ধূৎ জীবনটা দুঃখে দুঃখে গেল বাপ্পারাজের মতো,ছরি চ্যাকা খাইতে খাইতে গেল।”
ডাক পড়লো অনিকের।
“অনিক ভাত খাবি না?”
“ইচ্ছা নাই।”
“তাড়াতাড়ি আসো।”
দুপুরে ভাত খায়নি অনিক। বেদনাবিধুর হৃদয় নিয়ে রুমের ভিতর ছিল। দলীয় লোকজন আসায় লিভিং স্পেসের দিকে যাচ্ছিলেন অনিকের বাবা।
“সারাদিন কোথায় ছিলে?”
“কেন?”
“যেটা বলেছি উত্তর দাও।”
“যেখানে ইচ্ছে সেখানে।”
“ওয়াক! ওয়াক! কী বিশ্রী গন্ধ! এই দাঁত ব্রাশ করো না?”
“যেখানে চুম্মা খাওয়ার কোনো মানুষ নাই,সেখানে ব্রাশ করাটা বিলাসিতা!”
“জুতাটা কই!”
“পৃথিবীতে এত মানুষ থাকতে আমার শুধু সাপের সাথেই দেখা হয়।”
“কী বললে?”
“সাপ!”
__
ধূসরের রুমের দিকে পা বাড়ালো দ্যুতি। ধ্রুবকে দেখতেই দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। ধ্রুবর মনে হলো দ্যুতি তাকে ইগনোর করছে এবং ওই চোখে ঘৃণা ছিল। বিছানায় বসে ল্যাপটপ অন করলো। ধূসরের ডোর নক করলো। খুলতেই দেখলো শাওয়ার নিয়েছে। টাওয়াল দিয়ে মাথা মুছছে।
“কী হয়েছে?”
“কথা ছিল?”
“ওই গাধাটার বোনের সাফাই গাইতে আসছিস?”
“তুমি ঠিক কী করতে চাও?”
“কী বললি?”
“ওকে নাকি ব্লক করে রেখেছো?”
“তোকে চামচামি করার জন্য পাঠিয়েছে?”
“তোমরা ছেলেরা এমন কেন?মেয়েদের ইমোশন নিয়ে কেন খেলো?”
“সর সামনে থেকে!”
“ব্লক করে রাখলে কেন?”
“তোকে এক্সপ্লেনেশন দিতে হবে?”
“ও তোমাকে ভালোবাসে।”
“আই ডোন্ট কেয়ার।”
“ভাইয়া প্লিজ এতটা নির্দয় হয়ো না।”
“ওর সাথে আমাদের যাবে না।”
“কেন যাবে না?”
“তাদের ফ্যামিলি আমাদের থেকেও উচ্চবিত্ত।”
“তো কী হয়েছে?”
“আমি বেকার মানুষ। তাকে চালানোর সামর্থ্য আমার নেই। তার প্রতিমাসে হাতখরচ ৫০/৬০ হাজার কিংবা ১ লাখ অথবা আরো বেশি। যেখানে আমার ১টাকাও ইনকাম নেই।”
“আশ্চর্য আব্বুর টাকাপয়সা কম আছে নাকি! পরিবারে না হয় আরেকজন সদস্য বাড়লো। আর সেটা তো আমাদের মানুষই তাই না!”
“আমি যাকে বিয়ে করবো সে আমার ইনকামই খাবে আমার বাবার না। আমার বাবা তার দায়দায়িত্ব নিতে বাধ্য না।”
“এটা কেমন কথা?”
“আমার বউকে আমি কারো ঘাড়ের উপর চাপিয়ে দিয়ে অবহেলা করবো না। একটাকা ইনকাম হলেও বউকে নিজের বাহুডোরে রাখবো। যাতে কোনো পরপুরুষ তার ছায়া মাড়াতে না পারে। পুরুষ হলে এমনই হবো স্বামী হলে এমনই হবো! বউ আদরের জিনিস,ভালোবাসার জিনিস,সোহাগের জিনিস। তাই স্বার্থপরের মতো তাকে একেকবার একেক জনের ঘাড়ে ফেলে যাব না। কারণ আত্মসম্মান আমার যেমন আছে তদ্রূপ আমার বউয়েরও।”
“এটা তো ভালো ডিসিশন।”
“আমার বউকে রানি বানিয়ে আমি হবো রাজা। বিবেকহীন,সেলফিসের মতো বোজা মনে করে,অ্যাটিটিউড দেখিয়ে বউকে চাকরানি বানিয়ে নিজে চাকর হয়ে আত্মসম্মানহীনের মতো আরেকজনের কাঁধে ফেলে যাব না। যারা বউকে সম্মান করতে জানে না তারা হচ্ছে কাপুরুষ! চাকর!রূপগুণস্বাস্থ্য কয়দিনের আসল হচ্ছে মন,বিবেক। টাকা গেলে টাকা পাওয়া যায় কিন্তু মানুষ হারিয়ে গেলে পাওয়া যায় না।”
হাত মুষ্টিবদ্ধ করলো ধ্রুব।
“বারো নারীর পিছনে ঘুরা আমার স্বভাবে নেই! কারণ আমি বীরপুরুষ! বারো নারীর পিছনে কাপুরুষেরা চাকরের মতো ঘুরে।”
চোয়াল শক্ত করলো ধ্রুব।
“বুঝতে পারলাম প্রিয় মানুষ নিয়ে তুমি খুব সেন্সেটিভ! এখন ওকে মেনে নাও।”
“আমি বেকার। আমার কোনো টাকাপয়সা নেই বড়লোকের মেয়েকে পালার।”
কথাগুলো জোরে জোরে এবং শুনিয়ে শুনিয়েই বললো ধূসর। শুনতে পায় ধ্রুব।
“বিয়ে করে নাও রিযিকের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। যার যার রিযিক সে নিয়ে আসে। আর বউদের সঙ্গে সৌভাগ্য আসে। বিয়ে করলে দেখিও ভালো কিছু হবে। তোমার ভাগ্য খুলে যাবে। নারীরা কোমলমতী এবং সৌভাগ্যবতী হয়। তাদেরকে অবহেলা নয় কদর করতে হয়।”
“অসম্ভব!”
“ইন ফিউচারে হয়তো তুমি জব করবে,অনেক টাকা ইনকাম করবে বাট জীবনে কোথাও ওই মানুষটাকে পাবে যে তোমাকে ভালোবাসে। জীবনে টাকাপয়সা হয়তো একটা সময়ে ঠিকই আসে কিন্তু যে মানুষটাকে তুমি হারাবে তাকে কি আর কোনো কিছুর বিনিময়ে পাবে?এমন ভালোবাসা ক’জন পায় বলো আর তুমি পেয়েও পায়ে ঠেলে দিচ্ছ! তুমি চাইলে ভাগ্য পরিবর্তন হতে পারে,চেষ্টা থেকেই সবকিছুর পরিবর্তন হয়।”
“ওকে বল ওর ক্যারিয়ারে মনোযোগ দিতে। তার সাথে আমাদের যাবে না। আমার সাথে থাকলে হলে তাকে ৫০০টাকা দামের শাড়ি অথবা থ্রি-পিস,দু’বেলা ভাত আর নিজের কাজ নিজেকেই করতে হবে কোনো কাজের লোক রাখা যাবে না।”
“আমি রাজি!”
চমকায় ধূসর। দেখল ভিডিও কলে রয়েছে বুশরা। তার মানে সব শুনেছে। চোয়াল শক্ত করলো।
“আপনার সিদ্ধান্তে আমি রাজি। আপনার টাকা লাগবে না আমি আমার বাবার টাকাও নিবো না। দরকার পড়লে আপনার সঙ্গে জব করে মানিয়ে নিবো।”
“আমার বউকে তো আমি কোনো কর্পোরেট অফিসের চাকরানি বানাব না দরকার পড়লে নিজে চাকর হবো।”
মুগ্ধ হয় বুশরা।
“আমি রাজি।”
“তোমাদের মতো মেয়েরা প্রথম প্রথম এইসব বলে পরে ঠিকই ঝামেলা সৃষ্টি করে।”
“আমি করবো আপনি আমার কথা রেকর্ড করুন অথবা লিখিত নিন। অমান্য করলে ডিভোর্স দিয়ে দিয়েন।”
“পসিবল না। তোমার রাস্তা মাপো।”
“ধূসর প্লিজ!”
বের করে দিলো দ্যুতিকে। মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলো। ব্যালকনিতে গিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে লম্বা করে সুখটান দিলো।
_
গোসল সেরে শুয়ে রইলো নিশু। শরীরটা কেমন ভেঙ্গেচুরে মুষড়ে আসছে।
“নিশু শুনছিস?”
“জ্বী ফুপি।”
“এদিকে আয় তো!”
ব্যালকনিতে টাওয়াল মেলে দিয়ে কিচেনের দিকে এগিয়ে গেল।
“জ্বী ফুপি!”
“একটু পায়েস রান্না করতো!”
“আচ্ছা।”
এক স্টোভে উড়িষ্যার বিখ্যাত নরম তুলতুলে মণ্ডা পিঠা বানাতে লাগলেন তিনি। ধ্রুবর পছন্দের এটা। বাকি স্টোভে পায়েস বসালো নিশু। স্টোভের আগুনে পায়েস হচ্ছে। নতুন গুড়ের গন্ধ ম ম করছে পুরো বাড়িতে। একটা সাদা তরল মিষ্টি গোলা থেকে দিলরুবা খাতুন কী সুন্দর করে পিঠে বানিয়ে ফেলছেন। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো নিশু। শব্দহীন দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তিনি একজন মা। আর মায়েরা অত কম আয় থেকেও ব্যাংকে টাকা রাখতে পারেন। মায়েরা সব পারেন সবার জন্য সন্তানের জন্য। নারকেলের পুরের মতো মানুষের জীবন। নরম চাদরে ঢেকে রাখে সব ক্ষত। সুতির শাড়ি জড়ানো মায়েদের হাত ধরে বাড়িতে আসে সুখ-শান্তি! হঠাৎই নিজের মায়ের কথা মনে পড়তেই বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। বর্ষার ভরা বিলের মতো টইটম্বুর হয়ে গেল টানাটানা নয়নজোড়া! খুব গোপনে মুছে নিলো অশ্রুটুকু। প্রলম্বিত পাপড়িগুলো ভিজে জবুথবু। দু-তিন রকমের পিঠা বানিয়ে বেরিয়ে গেলেন দিলরুবা খাতুন। ঘেমে গিয়েছেন তিনি। হঠাৎ পায়েসের ঘ্রাণে বেরিয়ে এলো ধূসর। দেখলো বেগুনী রঙের শাড়ি পরে কোমড়ে আঁচল গুঁজে রান্না করছে নিশু। শাড়িটা এত্ত সুন্দর যে চোখ লেগে গেল। ডুয়েল টোনের বেগুনি কালারের সেমি মসলিন শাড়ি পরনে নিশুর। পুরো শাড়িজুড়ে এমব্রয়ডারি করা ময়ূরের পালক। রংটা এত বেশি সুন্দর যে এক্সট্রা প্রশংসা যুক্ত হয়।
“কিচেনে কী করছিস?”
“একটু পায়েস রান্না করছি!”
“তুই না অসুস্থ?”
“একটুই তো! আস্তে বলো ফুপি শুনবে।”
“দ্রুত বের হয়ে রেস্ট কর।”
“ভাইয়া শোনো না!”
আবদারী-আহ্লাদী স্বর নিশুর। উপেক্ষা করতে পারলো না ধূসর।
“কী?”
“ভাইয়া বাসায় মাল্টা শেষ হয়ে গিয়েছে। এককেজি মাল্টা আর এক প্যাকেট কুলশন ভার্মিছিলি সেমাই নিয়ে আসো তো যাও! আর সঙ্গে ঘি এনো।”
“এত কিছুর দরকার নেই এখন।”
“যাবে!”
“যাচ্ছি! এবার তো তোর জামাইকে খাটাতে পারিস তা না করে সারাক্ষণ আমাকে খাটাস! পেয়েছিস ও তোরা আমাকে বোকাসোকা।”
“ঘ্যানঘ্যান না করে তাড়াতাড়ি যাও।”
বেরিয়ে গেল ধূসর। তিন-চার রকমের বাদাম,কিশমিশ বের করে ভিজিয়ে রাখলো নিশু। ধ্রুবর জন্য পায়েস,ধূসর-ধীরাজ ওরা বাদ যাবে কেন? ওদের জন্য কিছু করা প্রয়োজন। প্রায়োরিটি দিলে সবাইকে দেওয়া উচিৎ! ধূসর-ধীরাজ,দ্যুতি এদের জন্য বেশি করা উচিৎ! নিঃস্বার্থভাবে ওরা তার জন্য করে। সে-তো কিছু করতে পারে না। বুকটা আদ্র হয়ে চোখজোড়া ফের টইটম্বুর হয়ে গেল। জল মুছে নিলো।
“খালা চিংড়ি,ব্রকলি,তিনটে ডিম আর কাঁচা ভুট্টাগুলো নিয়ে আসো তো!”
তাই করেন তিনি। ডিমগুলো সিদ্ধ বসিয়ে চিংড়িগুলোর খোসা ছাড়িয়ে,ব্রকলি কেটে,ভুট্টাগুলো ছাড়িয়ে সব মিক্সড করে সাদা তিল ছড়িয়ে রান্না করে নিলো। খুব খিদে পেয়েছে তার। ঘ্রাণ পেতেই রুম থেকে বেরিয়ে এলো দ্যুতি।
“খিদে পেয়েছে নিশু। কী রান্না করছিস?”
“টেবিলে নিয়ে খা।”
সদাইগুলো নিয়ে এলো ধূসর। সব হাতে নিলো নিশু।
“দ্যুতি,দুইটা মাল্টার রস নিয়ে দে তো!”
“জর্দা করবি?”
“হুম।”
“ভাইয়া তো আনারসও আনলো।”
“কাল না হয় আনারসের ফ্লেভার দিয়ে করবো।”
সেমাইগুলো ঘি দিয়ে ভেজে রান্না বসালো নিশু। মাল্টার রস নিয়ে দিয়ে খেতে বসলো দ্যুতি। দ্যুতি জানে নিশুর হাতের মাল্টার ফ্লেভারের ভার্মিছিলি সেমাইয়ের এই জর্দাটা ধূসরের ভীষণ প্রিয়! সেমাই রান্না শেষে হালকা নেড়েছেড়ে লোহার তাওয়ার উপর তাপে দিয়ে ভাত খেতে বসলো নিশু।
“কান্না করেছিস কেন?”
“কই না তো!”
“তোর মুখ ফোলা!”
মলিন হাসলো।
“আমি চেয়েছিলাম আমাদের মাঝে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি না আসুক পরে দেখি আমিই তাদের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি! কান্না আসবে না তো হাসি আসবে বল?”
নীরব রইলো দ্যুতি।
“সে আমাকে কোনোদিন পাওয়ার আশাই করেনি! আর আমি তাকে হারানোর ভয়ে পাগলের মতো কান্না করেছিলাম,তার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। সবই নিছকই ছিল!”
তা শুনে তাচ্ছিল্যের স্বরে ধূসর বলল,”খোঁজ নেয়নি,ফোন করেনি,মনে রাখেনি একটু ফিরে তাকায়নি,সব ভুলে গেছে। বাদ দে এইসব! তাই বলে কি নিজেকে বিষন্নতার সমুদ্দুরে ডুবিয়ে ফেলতে হবে? হাসতে ভুলে যেতে হবে? আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে মিনতি করতে হবে? বারবার বিতাড়িত হওয়ার পরেও অপেক্ষা করতে হবে? পায়ে পড়তে হবে? নিজের ভালো থাকাকে এতটা সস্তা বানিয়ে ফেলতে হবে যা অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে? বিষয়টা নিয়ে একটু ভাব। তোর মূল্য যদি তুমি নিজেই না বুঝিস তবে একটা ভুল লোক তোকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে এটাই তো স্বাভাবিক তাই না। স্ট্রং হওয়ার চেষ্টা কর। সে তোর সামনে দিয়ে একশোটা মেয়েকে নিয়ে ঘুরাঘুরি করলেও তুই হাসিমুখে থাকবি। বুঝতে দিবি না তোর কষ্ট। নয়তো মজা পেয়ে তোকে আরো কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করবে। তাই বলবো,নিজের ক্যারিয়ারের প্রতি ফোকাস কর। শুধু ক্যারিয়ারের প্রতি ফোকাস আর কিচ্ছু না। অনেকের পরিবর্তন দেখতে পাবি মিলিয়ে নিস।”
“আমিও চাই ক্যারিয়ার ব্রাইট করতে!”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। খেয়েদেয়ে প্লেটগুলো ধুয়ে ফেললো দ্যুতি। অবশ্য ওরা দু’জন খালার দিকে তাকিয়ে থাকে না। নিজেরাই কাজ করতে পছন্দ করে। খালা তো কত কিছু করে। মানুষটারও তো একটু রেস্টের দরকার। দিলরুবা খাতুন অবশ্য কিছু বলেন না। করুক,শিখুক উনার কথা। মেয়েদের সব জানতে হয়,শিখতে হয় যতই বড়লোকের কন্যা হোক না কেন! ছোট্ট ছোট্ট বাটিতে বেড়ে ধূসর-ধীরাজ দুজনকে ডাকলো। সোফায় খেতে বসলো ওরা।
“ভাইয়া কেমন হয়েছে?”
“ভালো!”
মৃদু হাসলো নিশু। দিলরুবা খাতুন এগিয়ে এসে বললেন,”ধ্রুবর জন্য পাঠিয়েছিস?”
“না এখনি পাঠাবো।”
সব বেড়ে নিলো। ট্রে সাজালো দু’জন।
“খালা একটু দিয়ে আসুন।”
“রিনা কেন যাবে তুই দিয়ে আয়!”
অপ্রস্তুত হলো নিশু।
“লজ্জার কী আছে যা।”
“ফুপি আসলেই..”
“তোর লজ্জা এখনও ভাঙ্গেনি?”
“আসলেই তুমি যা ভাবছো..”
“বেশি কথা বলে মেয়ে! নিজের স্বামীই তো! যা দিয়ে আয়।”
“ফুপি..”
“নিশু একদম ন্যাকামো করিস না। কাছে কাছে না থাকলে কীভাবে কী হবে বোকা মেয়ে! কাছে কাছে থাকবি! এখন যা।”
মলিন মুখে ট্রে নিয়ে এগিয়ে গেল নিশু। বেহায়ার মতো আবারও যেতে হবে লোকটার সামনে! শ্বাস আঁটকে রইলো।
_______
চলবে~
অগোছালো হতে পারে রিচেইক করিনি। সামনের পর্বে ওদের একসাথে পেতে পারেন। সবটা একসঙ্গে লিখতে গেলে সময় লাগে।