মায়াকুমারী পর্ব-২৮

0
142

#মায়াকুমারী ❤️
#পর্বসংখ্যা-(২৮)
_______________

শক্ত করে হাত দুটো চেপে ধরলো বিছানার সঙ্গে। ব্যথা পেতেই ককিয়ে উঠলো নিশু।

“কী করছো! ছাড়ো! খবরদার আমাকে বাজেভাবে ছোঁবে না!”

“বাজেভাবে আর কী ছোঁবো অর্ধেক বাসর তো সেরে ফেলেছি। এখন আয় বাকিটাও সেরে ফেলি!”

“ছাড়ো বলছি!”

“তুই খুব বেড়েছিস! এই ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না। তোকে ছেড়ে রাখলেই বিপদ! কখন আবার কার না কার ঘাড়ে গিয়ে উঠিস!”

“ছাড়বে!”

বিরক্ত লাগছে নিশুর। ধ্রুবর কর্মকাণ্ডে সত্যিই সে বিরক্ত। গলায় মুখ ডুবাতেই চোখ বুজে ফেললো। কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,”বাসরটা সেরে ফেলি কেমন! অপেক্ষা আর সয় না!”

কান গরম হয়ে গেল নিশুর।

“ইতিপূর্বে তোমার সাথে আমার কোনো কনসেন্ট কিংবা আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়নি।”

“লাগবে না।”

“থামো!”

“পরেরটা পরে দেখা যাবে।”

ফের ঘাড়ে,গলায় মুখ ডুবাতেই দু-হাতে খামছে ধরলো ধ্রুবর মাথার পিছনের চুলগুলো। ঠোঁটে ঠোঁট ডুবাতেই আকস্মিক একের পর এক করাঘাত পড়তে লাগলো দরজায়। চমকায় দু’জন।

“ছাড়ো বলছি!”

ভীষণ রাগ হলো নিশুর।

“বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে তার কনসেন্ট ছাড়া জোর করে ইন্টিমেন্ট হওয়াকে ম্যাটেরিয়াল রেপ বলে। আমি ম্যাটেরিয়াল রেপের বিপক্ষে! পারমিশন ছাড়া পার্টনারের সঙ্গে জোর করে ইন্টিমেন্ট হওয়া উচিত নয়! কন্ট্রোল ইওর সেল্ফ! তুমি এখন তোমার মধ্যে নেই। ক্ষুধার্ত হিংস্র হয়ে উঠেছো।”

মস্তিষ্ক টগবগ করতে লাগলো ধ্রুবর। হুট করে ছেড়ে দিলো নিশুকে। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ঘৃণিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো নিশু।

“সাড়ে এগারো বছর আমার মুখ দেখতে চাওনি! এক মিনিট ফোন দিয়ে আমার খোঁজখবর নাওনি,কথা বলোনি,আমার লাইফের বারোটা বাজিয়ে চলে গেলে। এখন দেখা হওয়া মাত্রই বিছানায় নেওয়ার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছো! আবার বলছো,বাসরটা সেরে ফেলি কেমন! অপেক্ষা সহ্য হয় না! তোমার প্রতি আরো ঘৃণা বেড়ে গেল। তুমি জাস্ট আমার শরীর চাচ্ছ মন না। তুমি ফিজিক্যাল রিলেশনকে প্রায়োরিটি দিচ্ছ আমার মেন্টালিটি না। আমি শারিরীক-মানসিক উভয় রকম কেমন আছি,ফিট আছি কি-না একবারও জিজ্ঞেস করোনি। আমি বুঝতে পারছি এটা কেমন সম্পর্ক!”

বিছানা থেকে নেমে গেল ধ্রুব। রাগে-জিদে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বেরুতেই মুখোমুখি হলো রিনা খালার। চোয়াল শক্ত করলো। সন্ধ্যার আযান হচ্ছে চারদিকে। শাড়ি ঠিক করে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে ঢুকলো। রুমে ঢুকলো দ্যুতি। হাত-মুখ ধুয়ে এলো নিশু।

“নিশু তোদের মধ্যে কিছু-মিছু হয়েছে?”

“না।”

“আবার ফিরিয়ে দিলি?”

“তো কী করবো!”

“কাজটা ঠিক হয়নি!”

“কোনো কনসেন্ট ছাড়াই সে বারবার পাগলামি করছে বিষয়টি আমার কাছে খুবই বিরক্তকর। আমি এখন এইসবের জন্য প্রস্তুত না।”

“কী আশ্চর্য কথাবার্তা!”

“তার সাথে আমার কোনো কথাবার্তাই হয়নি,আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়নি; এখানে ইনভলভ হওয়ার কথাটা কীভাবে এলো?”

“আজীবন এই রকম থাকবি তোরা?এই রকম টম এন্ড জেরির মতো দ্বন্দ্বে দ্বন্দ্বে কাটবে তোদের দিন? মানুষ হবি না তোরা?”

“বাসর রাত নিয়ে প্রতিটি মেয়েরই কমবেশ স্বপ্ন থাকে। আমি চাই আমার বাসর সুগন্ধিময় পুষ্পসজ্জিত বিছানায় হোক! কুকুর-বিড়ালের মতো চিপায়-চাপায়,অলিতে-গলিতে না। কারণ আমার ইজ্জ্বতেরও আত্মসম্মান আছে। তাকে ভালোবাসি ঠিক কিন্তু তার মানে এই না যে সে চাইলো আর আমিও আমার সম্ভ্রম তুলে দিবো! এতটাও সহজলভ্য আমি নই। বললাম তো,আমার সম্ভ্রমেরও আত্মমর্যাদাবোধ আছে। আমার শ্রেষ্ঠ জিনিসটা আমি তাকেই উপহার দিতে চাই যে আমার যোগ্য! উলু বনে মুক্তো ছড়ানোর মতো মেয়ে আমি নই! আমার আত্মারও আত্মসম্মান আছে। আমার ভালোবাসারও আত্মসম্মান আছে। আর আত্মসম্মানবোধ আমার কাছে প্রেম-ভালোবাসার চাইতেও ভীষণ প্রিয়! রাগ-তেজ,জেদ,সাহস এবং সততা এগুলো আমার অলংকার,গর্ব! একজন নারীর অলংকার। আমি সহজে কারও কাছের হই না আবার নিজেকে সহজও বানাই না। মানুষকে যত্ন করি ঠিক কিন্তু বন্ধনে জড়াতে দ্বিধাবোধ করি; একশোবার ভাবি।”

“বউ সাজতে চাইছিস?”

“কেন বউ সাজবো না! মেয়েরা নিজের সর্বস্ব দিয়ে সাজেই তো ওই বিয়ের দিন। প্রতিদিন মেয়েদের ওতো বউ সাজার সার্মথ্য কই! আর প্রতিটি মেয়েরই স্বপ্ন সে বেনারসি পরে লাল টুকটুকে বউ সাজবে,সানাই বাজবে,ফুলে ফুলে ভরা বাসর ঘরে মাথায় ঘোমটা টেনে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করবে। শেরওয়ানী পরে স্বামী আসবে,তারপর বউয়ের ঘোমটা তুলে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকবে,তাকে দেখবে,প্রশংসায় ভাসাবে,টুকটাক কথা হবে। এরপর পুষ্পসজ্জিত বিছানায় দুজনের প্রথম মিলন হবে। এটা তো প্রতিদিন হবে না একদিনই।”

“বুঝতে পারলাম বাসর নিয়ে তোর অনেক প্ল্যান।”

“আর সে ডিভোর্সের বিষয়টি ক্লিয়ার করেনি। আমি মানসিক রোগী হতে পারি কিন্তু বিবেকহীন নই। সে যতক্ষণ না নিজ মুখে ক্লিয়ার না করছে ততক্ষণ অব্ধি আমি ধরা দিচ্ছি না। আর আমাকে সরি বলতে হবে। সাড়ে এগারো হাজারবার সরি বলতে বলেছি। ওতবার বলতে না পারলে তিনবার বললেই হবে।”

“তুইও তো দেখি কম না!”

“সে বুনো ওল হলে আমিও বাঘা তেঁতুল। সে পুরুষ বলে তার জিদ,ইচ্ছে বেশি প্রাধান্য পাবে তা তো হবে না। আমরা নারীরাও মানুষ।”

“এমন জিদ ধরে তুই না আবার হারিয়ে ফেলিস। পুরুষ মানুষ যেখানে সুখের সন্ধান পায় সেখানেই ছুটে যায়। তোর কপালে কী আছে আল্লাহ জানে।”

“আমি কি নিজেকে সামলে নিইনি সে-যে একবার আমাকে ভেঙে দিয়ে গেল?”

“আমি আর তোদের মধ্যে নেই বাপু! তোমরা দু’জন টম এন্ড জেরি খেলো। অনেকদিন কার্টুন আর টিভি দেখা হয় না মোবাইলের চক্করে। তোদের দু’জনের টম এন্ড জেরির খেলা দেখবো এখন থেকে। বাই দ্যা ওয়ে,যা করার ভেতরে ভেতরে কর। আব্বু-আম্মু যেন টের না পায়। হাসিখুশি থাকবি উনাদের সামনে। আর তোকে একটা আইডিয়া দিই।”

“কীসের?”

“এতদিন আড়ালে থাকতি। এখন তো প্রয়োজন নেই। তুই বরং এখন ওর সামনে বেশি বেশি থাকবি আর ভাইয়াকে জব্দ করার একটা টিকস শিখিয়ে দিই।”

“কীসের?”

“ভাইয়া ডাকবি। বেশি বেশি করে ভাইয়া ডাকবি। দেখিস তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবে। এরপর নিজেই স্বীকার হবে ডিভোর্স হয়েছে কি-না!”

“আমাদের ধর্মে স্বামীকে ভাই ডাকা নিষেধ।”

“তুই তো নিজেও শিওর না যে আদোও ডিভোর্স হয়েছে কি-না। তুই তো ধরেই নিয়েছিস ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। সবাইও এমনটা জানে। তাই তুই শিওর হওয়া অব্ধি ভাইয়া বলে ডাকবি। তারপর তার মুখের এক্সপেশন দেখবো দু’জন।”

“যদি ডিভোর্স না হয় তাহলে স্বামীকে ভাই ডাকার অপরাধে পাপ হবে।”

“তওবা করে মাফ চেয়ে নিস।”

দোনোমোনো করলো নিশু।

“আরে দু-তিনদিন টিকসটা ফলো কর। শীঘ্রই এরমধ্যে আমরা কিছু আবিষ্কার করে ফেলবো।”

সায় দিলো নিশু।

“চল নামাজ আদায় করি।”

“আমি অসুস্থ।”

“ও আচ্ছা,তাহলে আমি পড়ি।”

অযু করে দ্যুতি নামাজে দাঁড়ালো। রুম থেকে বেরিয়ে সবার জন্য চা-নাস্তা তৈরি করলো। ট্রের মধ্যে পায়েস,সেমাই,পিঠা,ড্রাই কেক,চকলেট প্রাইন্ড কেক,কুকিজ,দু-তিন রকমের ফলের টুকরো এবং চা নিয়ে ফুপির রুমে গেল। উনারা স্বামী-স্ত্রী নামাজ আদায় করে উঠেছেন সবে। নিশুকে দেখতেই খুশি হোন দিলরুবা খাতুন। কখন কী লাগবে সব বুঝে যায় মেয়েটা কিন্তু নিজের বেলায় একটু বেশিই অবুঝপনা আর পাগলামি করে এই আরকি! আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিলেন আসাদ সাহেব। নিশুর হাতের লেবুপাতা,লেবু,লবঙ্গের চা ভীষণ প্রিয় উনার। এই চা-টুকু পান করলে মন চাঙা থাকে।

“নিশু!”

“জ্বী।”

“সবাইকে লিভিং স্পেসে যেতে বল।”

“কেন আব্বু?”

“গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”

“আচ্ছা।”

রুমে ঢুকে দ্যুতিকে বললো ধ্রুবকে বলে দিতে। আপাতত লোকটার সঙ্গে এখন দেখা করার ইচ্ছে নেই। ধূসরের রুমের দিকে এগিয়ে গেল। ডোর খোলা।

“ভাইয়া! ভাইয়া শুনছো!”

দেখলো রুমে নেই। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে ধূসর। সরল মনে এগিয়ে গেল নিশু।

“ভাইয়া আব্বু ডাকছে!”

নীরব রইলো ধূসর। হঠাৎ নাকে-মুখে ধোঁয়া ঢুকতেই কেশে উঠলো নিশু। সিগারেটটা ফেলে দিলো বাইরে।

“তুমি সিগারেট খাও?”

প্রতিত্তোর করলো না। কাশতে কাশতে চোখ জ্বালাপোড়া করে পানি বের হলো। পিছু ফিরে তাকাতেই আঁতকে উঠলো নিশু। নিশুর দিকে দৃষ্টি পড়তেই তাকিয়ে রইলো। খোলা চুল আর সুন্দর মুখটা একটা স্বপ্নিল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে!

“ভাইয়া কী হয়েছে তোমার?চোখগুলো এত লাল কেন? জ্বর এসেছে? তুমি কি অসুস্থ হয়ে পড়েছো?”

নীরব রইলো ধূসর। আতঙ্কিত হয় নিশু।

“এমন দেখাচ্ছে কেন তোমাকে?তোমাকে তো সুস্থ দেখলাম!”

“কিছু হয়নি।”

“তুমি কি কেঁদেছো?”

“না।”

ধূসরের চোখ-মুখ কেমন শক্ত,লাল। মনে হচ্ছে কেঁদেছে! কেমন বিষন্ন,বিমর্ষ এবং বাউণ্ডুলে দেখাচ্ছে। বুঝতে পারলো না নিশু। এমনটা কখনো দেখেনি।

“আচ্ছা ডাকছে চলো।”

পা বাড়ালো ধূসর। পিছু পিছু যেতেই চোখ পড়লো টেবিলের উপর মেলে রাখা ডায়েরির উপর।

“এইভাবে কেউ বইখাতা খুলে রাখে নাকি! মায়েরা বলে শয়তানে পড়াশোনা করে।”

বন্ধ করতে নিতেই চোখ পড়লো গোটা গোটা অক্ষরে নয়নতারার মতো সুন্দর করে লেখা একটি উক্তির উপর।

“তোমায় না পাওয়ার এই যন্ত্রণা নিয়ে আমি কীভাবে বাঁচবো বিষাক্ত ফুল? আমি তোমাকে ভালোবাসি!”

চমকিত নয়নে তাকিয়ে রইলো নিশু। আচমকা কম্পন শুরু হলো শরীরের মধ্যে। এই বিষাক্ত ফুলটা আবার কে? আর সেই বিষাক্ত ফুলটা ধূসর ভালোবাসে! কে হতে পারে? আচ্ছা,ধূসর তো তাকেই বিষাক্ত ফুল অর্থাৎ ধুতরাফুলের সঙ্গে তুলনা করে। ডায়েরি হাতে থমকে রইলো নিশু। পিছু ফিরতেই চমকালো ধূসর। কয়েক কদম এগিয়ে আচমকা কেঁড়ে নিলো ডায়েরিটি। দাঁতে দাঁত চাপলো। ভড়কায় নিশু।

“ডায়েরি ধরলি কেন?”

আমতা আমতা করলো নিশু।

“পারমিশন ছাড়া কেন ধরলি?”

“আসলেই..”

“বল কেন ধরলি?”

অপ্রস্তুত হয় নিশু। অভিমানে বর্ষার ভরা বিলের মতো জলে টইটম্বুর হয়ে গেল চোখজোড়া। ধূসর কখনো তার সঙ্গে এইভাবে কথা বলে না। ভীষণ খারাপ লাগলো নিশুর। মলিন মুখে তাকালো।

“ডায়েরি ধরার রাইট তোর নেই!”

আমতা আমতা করলো নিশু।

“তোমাকে নরকের এই যন্ত্রণা কে দিলো ভাইয়া?”

“জানতে হবে না তোর।”

“বলছি,তাহলে এই দায়ভার থেকে তার মুক্তি মিলবে কীভাবে?”

“আমি চাই তার মুক্তি না মিলুক! আজীবন এমন থাকুক!”

বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে রইলো নিশু। নিশুর চোখ দুটি যেন ঝকঝকে তারা। যেন ইতিহাসের হারানো সভ্যতার মায়া জাগায়। ক্রোধান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ধূসর।
________

চলবে~