মায়াকুমারী পর্ব-২৯/ক

0
108

#মায়াকুমারী ❤️
#মেহেরিন_আনজারা
#পর্বসংখ্যা-(২৯/ক)
___________________

ব্রেকফাস্ট করতে বসেছে সবাই। গম্ভীর হয়ে মুখে পরোটার টুকরো পুরছে তাহমিদ। কেমন বিমর্ষ দেখাচ্ছে তাকে। অবশ্য লক্ষ্য করলেন না তাহিয়া বেগম। আজ তিনি ভীষণ খুশি! পাঁচমিশালী সবজি ভাজি তুলে দিলেন সবার প্লেটে। স্বামীর উদ্দেশ্যে বললেন,”তাহমিদের জন্য পাত্রী দেখেছিলাম কাল।”

“কোথায়?”

“আরে আসাদ সাহেবের বড় মেয়েকে।”

চমকালেন কামরুল সাহেব।

“ওহ।”

“জানেন মেয়েটাকে আমার এত্ত পছন্দ হয়েছে মানে কী বলবো!”

স্ত্রীর দিকে তাকালেন।

“কেমন?”

“ঠিক কেমন তা জানি না। তবে মেয়েটাকে দেখলেই চোখের দৃষ্টি শান্ত হয়ে আসে। আছে না এমন কোনো জিনিস যেটা দেখলে মস্তিষ্ক আর চোখে শীতলতা নেমে আসে।”

অবাক হলেন তিনি।

“তোমার পছন্দ হয়েছে?”

“অবশ্যই!”

“এই পর্যন্ত দুনিয়ার মেয়ে দেখা শেষ। আমার তো মনে হচ্ছে আরেকবার দেখলেই তুমি বলবে পছন্দ হয়নি। কারণ এমনটা অসংখ্যবার হয়ে আসছে।”

“বিশ্বাস করুন এটাই লাস্ট। সত্যি মেয়েটাকে আমার পছন্দ হয়েছে।”

তাসফিয়া বলল,”মারাত্মক সুন্দরী আম্মু?”

“সুন্দর কি না জানি না তবে মেয়েটাই এমন যে দেখলেই চোখের দৃষ্টি শীতল হয়ে আসে।”

উনার দিকে তাকিয়ে রইলেন কামরুল সাহেব। স্ত্রীকে ঢের চিনেন। কোনো সুন্দরী মেয়েকে দেখলেই জেলাশফিল করেন। কতশত খুঁত ধরে আর ছেলের বিয়ের জন্য রাজি হয় না। সেই মানুষ কিনা এমন বর্ননা দিলো! তবে খুশি হলেন এই ভেবে যাক ছেলের বিয়ে এখানেই নিশ্চিত। তাহিয়া বেগম টক্সিস স্বভাবের। পছন্দ হয়েছে মানে এখানে বিয়ে দিয়েই ছাড়বেন আর সেটা যেভাবেই হোক। শেষমেশ বড় ছেলে ছাঁদনাতলায় বসতে যাচ্ছে!

“কাল দেখতে গিয়েছিলাম তখন বাইরে থেকে এসেছিল। ডাকা লাগেনি নিজ থেকেই এসে হাসিমুখে সালাম দিলো। পরনে খুব সুন্দর একটি শাড়ি ছিল। মেয়েটাকে নতুন বউ বউ লাগছিল। মেয়েটার শরীরে শাড়িটা ফুটেছিল। ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। সত্যি বলতে আমার কেন জানি পছন্দ হয়ে গেছে। এরপর অন্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদেরকেও জিজ্ঞেস করেছিলাম খারাপ কোনো মন্তব্য পাইনি। সে যাইহোক,তোমরা সবাই এভাবে তাকিয়ে রইলে কেন?”

“না মানে তোমার কথা শুনছিলাম।”

“খুব শিঘ্রই কথা পাকাপাকি করে ফেলবো।”

“তাও ঠিক তোমার মত আবার কখন ঘুরে যায়।”

“এবার আর ঘুরবে না। সত্যি পছন্দ হয়েছে।”

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কামরুল সাহেব।

“মেয়েটাকে তো দেখতেই হয় আম্মু।”

“ওদের মেয়ে দুইটা। ছোটটা ভারি অহংকারী।”

“কী করেছে?”

“আমাদের দেখে সালাম না নিয়ে ট্যাং ট্যাং করে উপরে চলে গেল।”

“সে দেখতে কেমন?”

“মুখে মাস্ক ছিল।”

“হয়তো কোনো প্রবলেম ছিল।”

“কীসের প্রবলেম দেমাকি!”

খাবার অসমাপ্ত করে উঠে গেল তাহমিদ। কালকের সেই দৃশ্যটি দেখার পর থেকেই তার হৃদয়ে উত্তাল-পাত্তাল ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মানতেই পারছে না নিশুকে কেউ ওইভাবে ঘনিষ্ঠভাবে ছুঁয়েছে,চেপে ধরে দেয়ালের সঙ্গে চুমু খেয়েছিল। নিশুও তখন চোখ বুজে ফিল করেছিল। দৃশ্যটি চোখের সামনে ভাসতেই কেমন শ্বাস আঁটকে আসছে। ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। শুকনো ঢোক গিলে সিগারেট ধরালো। তার মায়ের কথাগুলো মিথ্যে নয়। আসলেই মেয়েটা গর্জিয়াস সুন্দরী নয় তবে সুন্দর! যতটা সুন্দরী হলে চোখ নামানো যায় না। মেয়েটাকে দেখলে অদ্ভুত একটা মায়া এবং শান্তি লাগে আর এটা খুবই ভিন্ন রকমের এক অনুভূতি। যেই অনুভূতিটা দুনিয়ার আর কারো চেহারায় আজ পর্যন্ত খুঁজে পায়নি সে। প্রথম যখন দেখেছিল তখন মনে হয়েছিল কোনো পৃথিবীর মানবী না স্বর্গ থেকে ভুল করে চলে এসেছে পৃথিবীতে। পিঠভরা ভেজা চুল,টানা টানা চোখ,ভীত চাহনি! নুপুরটি ধরে কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়াতেই একটা মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে এসেছিল। কেমন যেন অনেকটা কমলালেবুর মতো অথবা কোথাও দূরে বাতাবিলেবুর ফুল ফুটেছে বাতাসে ভেসে আসা তার আগমনী সুগন্ধি! দ্বিতীয়বার নিচে দেখা হওয়ার পর নুপুরটি হাতে নিয়ে একটু মলিন হেসেছিল। রুগ্ন দেখালেও তার কাছে নিশুর সেই হাসি যেন কোনো বিলে শত শত কচুরীপানার ফুল আর পাপড়িতে ময়ূরকণ্ঠী রঙ নিয়ে ফুটে আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বুঝতে পারছে না ওই ছেলেটা কে আর ওইভাবে চুমু কেন খেয়েছিল? আর নিশু কেন কান্না করেছিল? ঝট পাকাতে লাগলো প্রশ্নগুলো।
__

ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসলো সবাই। দিলরুবা খাতুনকে কিচেনে ঢুকতে দিলো না। ডাইনিংয়ে এসে চেয়ারে বসলেন। আনন্দিত হলেন এই ভেবে যে মেয়ে দুটো সাংসারিক হচ্ছে। নিশুর সঙ্গে থেকে দ্যুতিও। তিনি কখনোই নিষেধ করেন না তাদেরকে। দু’জনেই পছন্দমতো রান্নাবান্না করে,সার্ভ করে। এমন বউ-ঝি-ই তো সবাই কামনা করে। কোমরে আঁচল গুঁজে পরোটা সেঁকছে আর ডিম পোচ করছে নিশু। দেখতে ঠিক বউ বউ লাগছে! টেবিলে এনে সাজিয়ে রাখছে দ্যুতি। কাটা-বেচা,ধোয়া রিনা খালা আর জোছনা করে। একে একে ডাইনিংয়ে এলো সবাই। চেয়ার পেতে বসলো। কোমর থেকে শাড়ির আঁচল খুলে ঘাম মুছে টেবিলের দিকে পা বাড়ালো নিশু। কেমন মায়াবী লাগলো ওমন ঘর্মাক্ত মুখ। চোখ তুলে তাকাতেই দেখলো নিশু আসছে। চোখে চোখ পড়তেই অপ্রস্তুত হয়ে আড়ষ্ট হলো নিশু। চোখ দিয়ে ইশারা দিলো দ্যুতি। অস্বস্তি হলেও মনোবল রাখলো।

“আমি টায়ার্ড। নিশু সার্ভ করতো!”

“তুই বস আমি দিচ্ছি।”

এক এক করে সবার হাফ প্লেটে পরোটা তুলে দিলো নিশু। ডিম পোচ দিয়ে ভাজি তুলে দিলো। খাওয়ায় মনোযোগ দিলো সবাই। আমতা আমতা করলো নিশু। ইশারা দিলো দ্যুতি।

“ভাইয়া আপনি কি সবজি ভাজি নিবেন নাকি সুজির হালুয়া? ডালও আছে কিন্তু!”

চমকিত নয়নে তাকালো সবাই। বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো ধ্রুব। মুহূর্তেই কান গরম হয়ে গেল। বুকের ভিতর ঢিপঢিপ করছে নিশুর। এই না রাগে-জিদে ধ্রুব তাকে থাপ্পড় মা’রে! কিছু বলতে নিবেন দিলরুবা খাতুন চিমটি কাটলো দ্যুতি। স্ত্রীর দিকে তাকালেন আসাদ সাহেব।

“থাক ভাইয়া সবজি দিয়েই খান। এটা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো।”

গলায় খাবার আঁটকালো ধূসরের। পানি এগিয়ে দিলো নিশু।

“তোমার আবার কী হলো ভাইয়া?”

“কিছু না।”

“ভাইয়া আপনাকে কি আরেকটা পরোটা দিবো?”

শ্বাস আঁটকে আস্তে আস্তে চিবুতে লাগলো ধ্রুব। মেয়েটা কি ইসলামিক বইপুস্তক পড়ে না স্বামীকে কীভাবে ভাই ডাকে ছিঃ!

“নিন ভাইয়া আরেকটা পরোটা নিন। এই বয়সটাই তো খাওয়া-দাওয়ার বয়স।”

নীরব রইলো ধ্রুব। নিশু তাকে ইচ্ছে করে জব্দ করছে! কিছুই বুঝতে পারছেন না আসাদ সাহেব।

“নিশুর মনে হয় আবার ডিমেনশিয়া হয়েছে ধূসর?”

“না আব্বু আমি একদম ফিট।”

তবুও উনার বিশ্বাস হলো না।

“ভাইয়া আপনি কি ব্ল্যাক কফি পছন্দ করেন নাকি চা?”

চোয়াল শক্ত করে চিবুতে লাগলো।

“ভাইয়া আপনি কি রাগ করেছেন?”

ঠোঁট টিপে হাসতে লাগলো দ্যুতি। এতদিন শুনেছিল মেয়েদের বুক ফাটে মুখ ফাটে না কিন্তু আখেরি যুগ চলায় কথাটা উল্টো হচ্ছে। তার ভাইয়ের বুক ফাটছে কিন্তু মুখ ফাটছে না।

“ছাপড়ি ভাইয়া তোমার মুড অফ কেন? নিশু তো খারাপ কিছু বলছে না!”

শক্ত চোখে তাকালো। আরেকটু জ্বালানোর জন্য নিশু বলল,”এতদিন মেজ ভাইয়া বাজার করতো আজ থেকে আপনি বাজার করবেন কেমন ভাইয়া। নাস্তা সেরে দ্রুত বাজার করে আনুন। এই নিন লিস্ট!”

শক্ত চোখে তাকালো ধ্রুব। নিশু তাকালো না।

“বাসি পঁচা সবজি একদমই আনবেন না। অল্প হলেও ফ্রেশ সবজি আনবেন। নয়তো আবার ফেরত পাঠাবো।”

দাঁতে দাঁত চাপলো ধ্রুব। মনে মনে বলল,”চান্দু তোমারে পাইছি এবার বুঝামু আমি কী!”

আসাদ সাহেব বললেন,”ঠিক বলেছিস নিশু। এখন থেকে তোর বড় ভাইয়া বাজারের দায়িত্বটা নিলে ভালো হয়।”

“জ্বী আব্বু। আমিও তো তাই বলি। কিন্তু দেখেন ভাইয়ার মুড কেমন অফ।”

“মুড অফের কিছু নেই বাজারটা মন দিয়ে করিও। নিশু আবার খুঁতখুঁতে স্বভাবের।”

নীরব রইলো ধ্রুব।

“নিশু-দ্যুতি তোদের দু’জনকে একটা প্রোগ্রামে যেতে হবে।”

“কোথায়?”

“আমাদের মেডিসিন শপটি উদ্বোধন করবো। সেখানের মেইন গেস্ট তোরা দু’জন।”

“সত্যি!”

“হুম।”

“কখন যেতে হবে?”

“আজ করার কথা থাকলে কাল করছি। কিছু জরুরি কাজ ছিল।”

“আচ্ছা।”

ছেলেদের উদ্দেশ্য বললেন,”ধ্রুব-ধূসর তোমরা বরং ওদের শপিংয়ে নিয়ে যাও। ভালো কাপড়চোপড় পরে যেতে হবে।”

পকেট থেকে একটি কার্ড বের করে ওদের সামনে রেখে উঠে গেলেন। ব্ল্যাক কফি তৈরী করে ধ্রুবর দিকে হাত বাড়িয়ে ধরলো।

“আপনি বরং আমাদেরকে শপিংয়ে নিয়ে যাবেন কেমন ভাইয়া!”

শক্ত চোখে তাকায় ধ্রুব।

“ভাইয়া আপনার কফি নিন।”

ভাইয়া ডাকতে ডাকতে কানটা জ্বালাপোড়া করে ফেললো এই মাথামোটা গাধী মেয়েটা।

“কী হলো ভাইয়া কফি নিন।”

চোয়াল শক্ত করে কফি নিতেই অসতর্কাবশত ধ্রুবর তলপেটের উপর পড়তেই আর্তনাদ করলো না বরং ঠোঁট চেপে রাখলো। চেঁচিয়ে উঠলো দ্যুতি।

“দিলি তো ভাইয়ার ফিউচার নষ্ট করে!”

হতভম্ব চোখে তাকায় সবাই। দাঁতে দাঁত চাপলো ধ্রুব।

“হায় হায়! ভাইয়া তো আর বাবা ডাক শুনতে পারবে না। ভাইয়ার বাবার হওয়ার ফিউচার শেষ!”

কান গরম হয়ে গেল দুজনের।

“এবার আমার ভাইয়া বাবা হবে কীভাবে আফসোস!”

“সরি ভাইয়া আসলেই আমি বুঝতে পারিনি এভাবে আপনার ফিউচার নষ্ট করে ফেলবো!”

হাত মুষ্টিবদ্ধ করলো ধ্রুব।

“ডিজগাস্টিং!”

“বললাম তো ভাইয়া সরি।”

উঠে লম্বা লম্বা কদম ফেলে চলে গেল। চেয়ারে বসলো নিশু।

“একদম দারুণ দিয়েছিস নিশু। কিন্তু ফিউচারটা অন্ধকার না করলেও পারতি! বেচারা এখনও বাসরটাও করতে পারলো না।”
____

চলবে~
রেসপন্স করবেন সবাই।