#মায়াকুমারী ❤️
#মেহেরিন_আনজারা
#পর্বসংখ্যা-(৩১)
___________________
চিন্তিত হয়ে আরামকেদারায় বসলেন আসাদ সাহেব। এক খিলি পান বানিয়ে দিলেন দিলরুবা খাতুন।
“মনখারাপ কেন?”
“খারাপ নয়। নিশুর কিছু বুঝতে পারছি না!”
“কেন?”
“আজকের ঘটনাগুলো দেখোনি?”
“দুষ্টুমি করেছে হয়তো!”
“দুষ্টুমি নয় আমার মনে হচ্ছে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়েছে।”
“আরে না।”
“স্বামীকে কেউ স্বজ্ঞানে ভাই বলে ডাকে?”
“এমনিতেই ওরা হয়তো দুষ্টুমি করেছে! দেখেন না আপনার ছেলে কেমন মুড নিয়ে থাকে কিছুই তো মুখ দিয়ে বেরুয় না।”
“ধূসরকে বলিও তো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে।”
“আপনার বড় ছেলেকে বললেই তো পারেন। ধূসর আর কত করবে! কিছুই হলেই ধূসর! সব জায়গায় ধূসরকে টেনে আনেন কেন?এই বয়সেই ছেলেটা হাঁফিয়ে গেছে হয়তো প্রকাশ করে না। কিন্তু বাধ্য হয়েই করতে হচ্ছে তাকে। এবার ওর বিরতির দরকার আমি মনে করি।”
“ওর যে ঘাড়ত্যাঁড়া স্বভাব কিছুই তো শোনে না। হাজারটা কথা জিজ্ঞেস করলেও তো বলে না।”
“আপনি কড়া কণ্ঠে কয়েকটা কথা শোনালেই তো পারেন দেখবেন ঠিক হয়ে গেছে।”
“তোমার এই ছেলেটা আমাকে জ্বালাযন্ত্রণা দিয়েই আমার পুরো জীবনটা শেষ করলো। ওর এই জিদের কাছেই আমি বারবার হেরে যাই।”
“ও এমনই। তাই বলে সব হজম করতে হবে নাকি! ওর কি কোনো দায়দায়িত্ব নেই?”
“ছেলেটাকে মানুষ করতে পারলে না দিলরুবা।”
“ঘুমাবেন নাকি বসে বসে আফসোস করবেন? নিজেও তো কম আস্কারা দেননি তখন। যখন যা চেয়েছে সব হাজির! ও দুঃখ-কষ্টের কী বুঝবে! আছে ওর মধ্যে কোনো মায়া-মানসিকতা আর না মানবিকতা!”
___
প্রায় বিকেল তিনটা। লাঞ্চ সেরে রেডি হলেন আসাদ সাহেব। নিশুকে ডেকে পাঠালেন।
“আব্বু ডেকেছো?”
“হুম। পান খাব।”
বিছানার উপর বসে মন দিয়ে পান বানাতে লাগলো নিশু।
“তোর ফুপি কী পান বানায় একটুও মজা লাগে না।”
“ফুপি শুনলে তোমার খবর আছে আর বানিয়েই দিবে না।”
চা নিয়ে এলেন দিলরুবা খাতুন। চায়ে চুমুক দিলেন। কয়েক চুমুক পান করে কাপ রেখে দিলেন।
“পান নাও আব্বু।”
মুখের মধ্যে পান পুরলেন। আয়েশ করে চিবুতে লাগলেন। উনার কেন জানি মনে হয় নিশুর হাতের পানটা খুব মজা হয়। খেতে মিষ্টি মিষ্টি লাগে।
“আমি বেরুচ্ছি। তোরা পাঁচটার মধ্যে উপস্থিত থাকিস কেমন!”
“আচ্ছা।”
“আলমারিতে টাকা আছে নিশু দে তো।”
মৃদু হাসলো নিশু। আলমারি খুলে টাকার ব্যান্ডেল নিয়ে উনার পকেটে তুলে দিলেন। এটা আজ-কালকার ঘটনা নয় আজ থেকে প্রায় সাড়ে এগারো বছর ধরে এমনটাই চলছে। আসাদ সাহেব মনে করেন নিশু সৌভাগ্যবতী। নিশু পকেটে যেই টাকা তুলে দেয় সেটা আল্লাহর রহমতে দশগুণ হয়ে ফিরে। তাই সবসময়ই ব্যবসায়িক কোনো শুভকাজে যাওয়ার সময় এমনটা করেন যদিও রিযিকের মালিক আল্লাহ। নিশু হয়তো একটা উছিলা। বেরিয়ে গেলেন তিনি।
___
বিকেল সাড়ে তিনটা বাজতেই পার্লারের দিকে রওনা হলো নিশু-দ্যুতি। পার্টির সাজটা ওরা বেশির ভাগ পার্লারেই করে থাকে। গাড়ি থেকে নামলো ওরা।
“ভারী মেক-আপের দরকার নেই হালকা করিস। তোর আবার মেক-আপে এলার্জি রয়েছে।”
ধূসরের দিকে তাকায় নিশু। তার এই বিষয়টিও মনে রেখেছে ধূসর। অবশ্য প্রতিবারই এভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়।
“আচ্ছা।”
“গাজরা পাঠিয়ে দিবো কিছুক্ষণ পর।”
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে লিফটে করে উপরে চলে গেল ওরা।
“আমার একটা ইমার্জেন্সি কল এসেছে তুই ফুলের দোকানে গিয়ে দ্রুত চারটা গাজরা নিয়ে আয় যায়।”
সায় দিয়ে গাজরার জন্য পা বাড়ালো ধীরাজ। বেশ কিছুক্ষণ পর তাকে খালি হাতে ফিরতে দেখে মেজাজ খারাপ হলো ধূসরের।
“কীরে খালি হাতে এলি যে?”
“এদিকে কোথাও গাঞ্জা পেলাম না।”
“কী বললি?”
“গাঞ্জা এদিকে নেই। উল্টা আরো লজ্জা দিয়েছে। বলছে ফুলের দোকানে গাঞ্জা পাওয়া যায় না। আরো নানান কথাবার্তা।”
আচমকা কোমড়ের মধ্যে একটা লাথি মা’রলো।
“গাঞ্জা নয় গাজরা। বেলি ফুলের মালা চিনিস?”
মাথা নাড়ায়।
“ওইটাই।”
চুপসে গেল ধীরাজ। ধূসর নিজেই চারটা গাজরা কিনে এনে পাঠিয়ে দিলো উপরে। সাজগোছ করতে করতে প্রায় দু’জনের দেড় ঘন্টার মতো লেগে গেল। এই দেড় ঘন্টা দাঁড়িয়ে রইলো ওরা দু’জন। দ্রুত বেরিয়ে এলো ওরা এবং বাসায় ফিরে গেল। রুমে ঢুকে দ্রুত তিনটি পাঞ্জাবি বের করলো নিশু। পাঞ্জাবিগুলোর বুকের দিকটায় সুতো দিয়ে কাজ করেছে সে। একটায় অপরাজিতা,আরেকটায় বাগানবিলাস এবং অন্যটায় গাঁদাফুল। প্রথমে ধীরাজকে গাঁদাফুলেরটা দিয়ে এলো এবং দ্রুত রেডি হতে বললো। এরপর ধূসরের ডোরে নক করলো।
“ভাইয়া কী করছো?”
“রেডি হচ্ছি।”
“এটা তোমার জন্য। পরলে খুশি হবো।”
নির্লিপ্তে হাতে নিলো ধূসর। হোয়াইট কালারের উপর মেজেন্টা কালারের ফুল-পাতা সহ বাগানবিলাস করা। চোখ আঁটকে গেল ধূসরের। প্রতিটি ফোঁড় কি সুক্ষ্ম!
“ভাইয়ার গায়ের রঙ শ্যামলা ওকে হোয়াইট কালারটায় দারুণ মানাবে। এটা ভাইয়াকে দিস।”
“এটা তোমার জন্য করেছি ভাইয়া। কারণ হোয়াইট কালারটায় তোমায় বোল্ড লাগে।”
“সমস্যা নেই আজ ভাইয়া পরুক।”
“না এটা তোমার জন্যই।”
“ভাইয়াকে দে ভালো লাগবে। আমাকে অন্যটা দে।”
মুখটা মলিন হয়ে গেল নিশুর।
“ঠিক আছে নাও।”
মলিন মুখে ধ্রুবর ডোরে নক করলো। বেশ সময় নিয়ে ডোর খুলতেই নিশুকে দেখতেই চমকালো। অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করলো নিশু।
“কী হয়েছে?”
“কী করছো?”
“কেন?”
অপ্রস্তুত হয় নিশু।
“রেডি হওনি?”
“কেন?”
“এটা তোমার জন্য?”
“কী?”
“পাঞ্জাবি।”
“কেন?”
“এটা পরে রেডি হয়ে নাও।”
“কেন?”
“যাবে না?”
“কোথায়?”
“তুমি জানো না?”
“না।”
“আচ্ছা জানা লাগবে না তুমি বরং এটা পরে রেডি হয়ে নাও। তারপর আমাদের সঙ্গে গেলেই দেখতে পাবে।”
“প্রয়োজন নেই।”
মুখটা মলিন হয়ে গেল নিশুর।
“রিভেঞ্জ নিচ্ছ?”
“প্রয়োজন মনে করি না।”
“তুমি আমাকে প্রতিবারই অসম্মান করেছো আমি তোমাকে সম্মান দিয়ে গিফট দিলাম তুমি রিজেক্ট করলে!”
চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।
“যেতে পারো।”
মুখের উপর ঠাস করে ডোর অফ করতেই চোখজোড়া ছলছল করে উঠলো। নাক টানলো নিশু। ঠোঁট চেপে কান্না আঁটকানোর চেষ্টা করলো। তবুও কেন জানি বুক ঠেলে কান্না আসছে। টিস্যু দিয়ে খুব সাবধানে জল মুছে নিলো। জোরে জোরে শ্বাস ফেলে ধাতস্থ করলো নিজেকে। ধূসর-ধীরাজ রেডি হয়ে বেরুতেই ফুপিকে বলে দোয়া নিয়ে ওরা দু’জন একসঙ্গে নিচে নেমে গেল। নিচে গিয়ে ধূসর দেখলো ধ্রুব নেই। নিশুর দিকে দৃষ্টি পড়তেই লক্ষ্য করলো মুখখানি কেমন বিষন্ন!
“ভাইয়া কই দ্যুতি?”
“জানি না।”
“যাবে না?”
“কিছু বলেনি তো!”
ধূসর ভেবেছিল ধ্রুব রেডি হয়ে হয়তো নিচে অপেক্ষা করছে কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। নিচে দাঁড়িয়ে দশ মিনিট অপেক্ষা করলো ওরা। বারবার হাতঘড়িতে সময় দেখতে লাগলো তবুও আসার নামগন্ধ পেলো না।
“তোরা দাঁড়া আমি আসছি।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো ওরা। লম্বা লম্বা কদম ফেলে দ্রুত বাসায় ঢুকলো। একটি বাগানবিলাস ফুল ছিঁড়তেই,”আপনার কাজ কি শুধু ফুল ছেঁড়া?”
চমকায় দ্যুতি। পিছু ফিরতেই দেখলো সেদিনের সেই ছেলেটি। ছেলেটিকে দেখতেই চমকায় নিশুও। ঠিক তাহমিদের মতো। কিন্তু কোথাও একটা ডিফরেন্ট রয়েছে। দ্যুতির দিকে তাকিয়ে রইলো তানজিল। অপ্রস্তুত হয় দ্যুতি।
“তাতে আপনার কি সমস্যা?”
“ফুল ছেঁড়ায় কোনো মহানুভবতা নেই।”
প্রতিত্তোর করলো না দ্যুতি। নিশুর দিকে দৃষ্টি পড়তেই বুঝতে পারলো তার ভাইয়ের জন্য দেখা সেই পাত্রী। তার মা যেমনটা বলেছে মনে হচ্ছে কমই বলেছে! দৃষ্টি সরিয়ে দ্রুত কারে উঠে চলে গেল।
“কোথ থেকে যে আসে যত্তসব ফাউল!”
“সর্বনাশ দ্যুতি!”
“কী?”
“ছেলেটার মনের মধ্যে কিছু একটা চলছে!”
“ধূৎ! বাদ দে! ছেলেদের কাজই এমন। সুন্দরী মেয়ে দেখলেই সেধে সেধে গায়ে পড়া স্বভাব।”
ধ্রুবর ডোরে নক করলো ধূসর। বিরক্ত হয়ে ডোর খুলতেই ধূসরকে দেখতেই কপালে ভাঁজ ফেললো।
“কী হয়েছে?”
“কী করছো?”
“কেন?”
“এখনও রেডি হওনি যে?”
“রেডি হবো মানে?”
“বুঝতে পারছো না কিছু?”
“কী বুঝবো?”
“রেডি হওনি কেন?”
“রেডি হয়ে কী করবো? আমার কি কোথাও যাওয়ার কথা ছিল?”
“কাল সকালে আব্বা কী বলেছিল?”
“তোরা যা।”
“তুমি যাবে না?”
“ইচ্ছে করছে না।”
“আর কত নিজেকে এভাবে একঘরে করে রাখবে বলো তো?”
শক্ত কণ্ঠস্বর ধূসরের।
“কী বললি?”
“আমরা সবাই যাচ্ছি অথচ তুমি বাসায় শুয়ে-বসে রয়েছো এটা কেমন কথা?”
নীরব রইলো ধ্রুব।
“যাবে তুমি?”
“যা তোরা।”
আগুন চোখে তাকালো ধূসর।
“আর কত নিজেকে এভাবে দূরে দূরে রাখবে সবার থেকে? আর কত এই রকম চলতে থাকবে বুঝো না কিছু?”
প্রতিত্তোর করলো না।
“ছোট থেকে এই অব্ধি তোমার অবহেলা পেতে পেতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছি আমরা। আর কত অবহেলা করবে আমাদেরকে,তোমার বউকে?”
নীরব রইলো ধ্রুব।
“সব ভুলে পরিবারের সঙ্গে মিলেমিশে এক্টিভ হও। দায়িত্ব নিতে শিখো। এবনরমালের মতো নিজেকে ঘরবন্দী করো না। নিশুর সঙ্গে ডিভোর্স না হলে সংসার শুরু করো,ওর দায়িত্ব নিতে শিখো আর যদি তা না করো তাহলে ক্লিয়ার করো। এভাবে তো হয় না। নিশুর ফিউচার আছে। সবার যেই রকম ভালো থাকার রাইট আছে তেমনি তোমারও তদ্রূপ নিশুরও,আমার-আমাদেরও। তোমার এইসব অবহেলা থেকে এইবার মুক্তি দাও আমাদেরকে। আমরা জাস্ট বিরক্ত!”
“ভাষণ দেওয়া শেষ হয়েছে তোর?”
“যাবে কিনা সেটা বলো?”
“না।”
“দাম দেখাচ্ছ?”
চোয়াল শক্ত করলো ধ্রুব।
“দশ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে আসো। আজকে যদি তুমি না আসো তাহলে আমরা সবাই বুঝে নিবো তুমি আমাদেরকে জেলাশ করো,তুমি আমার বোনকে জেলাশ করো,তুমি নিশুকেও জেলাশ করো।”
আগুন চোখে তাকালো ধ্রুব।
“যদি তা না হতো তাহলে আমরা সবাই যাচ্ছি তুমি কেন বাসায় একা থাকবে? তুমি কেন আমাদের আনন্দের সঙ্গী হতে চাইছো না?”
হাত মুষ্টিবদ্ধ করলো।
“নিশ্চয়ই তুমি আমার বোনের ভালো চাও না। নিশ্চয়ই ওকে প্রোপার্টি দেওয়ায় তোমার জেলাশ হচ্ছে তদ্রূপ নিশুর প্রতিও।”
ওদের বাকবিতণ্ডা শুনে ঘাবড়ে গিয়ে দ্রুত এগিয়ে এলেন দিলরুবা খাতুন।
“কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
“চেঁচামেচি করছিস কেন তোরা?”
“কিছু হয়নি তুমি যাও।”
“ধ্রুব তুই যাবি না?রেডি হোসনি কেন?”
“ওর সহ্য হচ্ছে না আমার বোনকে..”
“আর একবার বলবি তোর..”
“থাম কী শুরু করলি তোরা?”
চলে গেল ধূসর।
“এত বড় একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে আর তুই বাসায় কেন?”
নীরব রইলো ধ্রুব।
“তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে যা আমার মেয়ের মনখারাপ হবে।”
ঠাস করে ডোর অফ করলো ধ্রুব। বিব্রতবোধ করলেন দিলরুবা খাতুন। ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো ধ্রুব। সিগারেট ধরিয়ে লম্বা একটা টান দিয়ে নিচের দিকে দৃষ্টি পড়তেই দেখলো দাঁড়িয়ে রয়েছে ওরা। ধূসরকে দেখতেই দ্যুতি জিজ্ঞেস করলো,”ভাইয়া আসবে না?”
“জানি না।”
মুখটা মলিন হয়ে গেল দ্যুতির।
“ভাইয়া এমন কেন?”
কান্না পেলো দ্যুতির। খারাপ লাগলো ওদের। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্না আঁটকানোর চেষ্টা করলো। টিস্যু দিয়ে সাবধানে চোখ মুছে ভেজা ঢোক গিললো। নিজেকে ধাতস্থ করে পার্স থেকে ফোন বের কল করলো ধ্রুবকে। বার কয়েক কল করলো কিন্তু পিক করলো না ধ্রুব। টেক্সট পাঠালো কয়েকবার সিন করলো না। রিংটোন,নোটিফিকেশন টোন সবই শুনলো ধ্রুব দেখার ইচ্ছে পোষণ করলো না। হঠাৎ একটি প্রাইভেট কার এসে থামলো গেইটের মুখে। সরে দাঁড়ালো ওরা। গাড়ি পার্ক করতেই বেরুলো তাহমিদ। আচমকা দৃষ্টি পড়লো নিশুর দিকে। সানগ্লাস খুলতেই আর দৃষ্টি সরাতে পারলো না। কেন জানি তাহমিদের মনে এ যেন হঠাৎ তাসের দেশে এলো অবাধ্যতার ঢেউ! গোল্ডেন এবং লাল কালারের মিশ্রণে শাড়ি,চুলে বেলি ফুলের মালা,চোখে মোটা করে কাজল,হাত ভর্তি স্টোনের চুড়ি,ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক,হালকা-পাতলা মেক-আপের সঙ্গে ম্যাচিং স্টোনের হালকা অর্নামেন্টস। উফ! ভাবা যায়! গলা শুকিয়ে এলো তাহমিদের। বুকটা কেমন কাঁপছে! অন্য মনস্ক হয়ে কথা বলছে দ্যুতির সঙ্গে আর মাঝেমধ্যে হাত নাড়ছে! চুড়িগুলো ঝুনঝুন করে উঠছে! দৃশ্যটি সত্যিই মনোমুগ্ধকর! ফোন চাপছে ধূসর কিন্তু মনোযোগ তাহমিদের দিকে। ধীরাজ চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখতে লাগলো। ভীষণ মেজাজ খারাপ হলো ধূসরের। হঠাৎ কী বুঝে এদিকে তাকাতেই তাহমিদকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অপ্রস্তুত হলো নিশু। অপ্রস্তুত হয়ে বাসার দিকে পা বাড়ালো তাহমিদ।
“এরা বোধহয় দু’ভাই নিশু?”
“হুম।”
“একই রকম চেহারা।”
“হ্যাঁ।”
উপর থেকে তাহমিদের দৃশ্যটি দেখলো ধ্রুব। কেন জানি মেজাজ খারাপ হলো। এভাবে সেজেগুজে অন্য পুরুষকে দেখাতে নিশ্চয়ই ভালো লাগছে মেয়েটার! দাঁতে দাঁত চেপে একটি ব্ল্যাক কালারের টি-শার্ট পরে দ্রুত বেরিয়ে এলো।
“এতক্ষণ লাগলো কেন ভাইয়া?”
“কিছু হয়নি।”
ধ্রুবর দিকে তাকালো না নিশু। সে পাঞ্জাবি দিয়েছিল নেয়নি। কতটা শখ আর ভালোবাসা মিশিয়ে সে পাঞ্জাবিটায় কারুকার্য করেছে জানে মানুষটা! অভিমানী হয় নিশু। ওরা দু’জন পিছনে বসলো। ধূসর ড্রাইভারের সঙ্গে বসলো। আর ধ্রুব-ধীরাজ মাঝে বসলো। চলতে শুরু করলো গাড়ি। মাঝপথে যেতেই হঠাৎ গ্যাস শেষ হয়ে গেল। বিরক্ত হয় ধূসর। গ্যাস স্টেশনে গ্যাস দেওয়ার জন্য গাড়ি পার্ক করলো। বিরক্ত হয়ে সবাই বেরুলো। নিশু বসে রইলো। শেষ বিকেলের রোদ কেমন উত্তাপ ছড়াচ্ছে। গাড়ির মধ্যে বসে রইলো নিশু। মাথাটা হঠাৎ কেমন ঘুরছে। কপালে হাত দিয়ে বসে রইলো।
“নিশু ঠিক আছিস?”
“ভাইয়া গলা শুকিয়ে গেছে। একটা পানি কিংবা স্প্রাইট আনো তো!”
“আচ্ছা বস।”
আশেপাশে ওরা কেউ নেই। হঠাৎ গাড়ির ভিতর ঢুকে ডোর লাগাতেই চমকে উঠলো নিশু।
“আপনি!”
প্রতিত্তোর করলো না। আচমকা এক ঝটকায় কাছে টেনে এনে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিতেই হতভম্ব হলো নিশু। পর পর ঘনিষ্ঠ স্পর্শ পেতেই ছটফট করতে লাগলো নিশু। আহা! কি প্রবল তৃষ্ণা দুজনের বুকের ভেতর! কেউ কাউকে ছাড়লো না! বৃষ্টিস্নাত সেই প্রথম দিনের মতো প্রবল ভালোবাসায় ধ্রুবর ঠোঁট শুষে নিতে লাগলো,নিতেই লাগলো তদ্রূপ ধ্রুবও। নিশুর ওমন আচরণে ধ্রুবর মনে হলো যেন এমন কিছুই কামনা করেছিল সে আর প্রস্তুতও ছিল। কিছুক্ষণ পর নিশুকে ছেড়ে বেরিয়ে গেল ধ্রুব। ঝিম মেরে বসে রইলো নিশু। ঘোরের মধ্যে রয়েছে সে। সব মাথার উপর দিয়ে গেল। ততক্ষণে গ্যাস নেওয়া হলো। ধূসর ছাড়া বাকিরা গাড়িতে বসলো। একপলক তাকালো নিশুর দিকে। বলতে ইচ্ছে করলো,”খুব তো ভাইয়া ভাইয়া ডাকিস! আবার আমার ছোঁয়াগুলোও উপেক্ষা করতে পারিস না। কাছে এলেই পাগল হয়ে যাস।”
গম্ভীর হয়ে বসে রইলো। কিছুক্ষণ পর ধূসর এলো হাতে পানি আর স্প্রাইট।
“নিশু নে খা।”
“খেয়েছে এখন আর কিছু খাবে না।”
চমকায় ধূসর।
“কী খেয়েছে?”
“রসগোল্লা।”
মাথা নুয়ে বসে রইলো নিশু। হাত-পা সহ পুরো শরীর কাঁপছে।
“আচ্ছা রসগোল্লা না হয় খেয়েছিস ধর পানিটা খা।”
মাথা তুলে পানির বোতল হাতে নিতেই চমকালো ধূসর।
“কীরে তোর লিপস্টিক কই? সারা মুখে লিপস্টিক ছড়ালো কীভাবে?”
দ্রুত মাথা নুয়ে শ্বাস আঁটকে রইলো নিশু। দ্যুতি বলল,”তাই তো! নিশু তোর লিপস্টিক কই? মনে হচ্ছে তোর লিপস্টিকের উপর সাইক্লোন বয়ে গেছে।”
মাথা তুলতে পারলো না নিশু। একপলক ধ্রুবর দিকে তাকালো ধীরাজ। দেখলো ওর মুখেও লিপস্টিক। মুখে হাত দিয়ে হাসতে লাগলো। ভ্রু কুঁচকায় ধ্রুব।
“হাসিস কেন?”
“তোমার ঠোঁটেও লিপস্টিক।”
কান গরম হয়ে গেল। টিস্যু বাড়িয়ে ধরলো।
“নাও মুছো।”
পেছন থেকে হা-হুতাশ করে দ্যুতি বলল,”আর কিছুর উপর সাইক্লোন আসতে পারেনি তোর লিপস্টিকের উপর কেন আসলো বলতো নিশু? আহারে এখন এই কালারের লিপস্টিক কই পাবো?”
শ্বাস আঁটকে বসে রইলো নিশু।
“হায় আল্লাহ! এখন এই কালারের লিপস্টিক কই পাবো?”
_______
চলবে~
কেমন হচ্ছে জানাবেন। বড়সড় পার্ট দিলাম মশার কামড় খেয়ে।