#মায়াকুমারী ❤️
#মেহেরিন_আনজারা
#পর্বসংখ্যা-(৩২)
___________________
যুক্তরাষ্ট্রে তখন সকাল প্রায় সাতটা। বরফকুচি দিয়ে এক মগ স্ট্রং ব্ল্যাক কফি বানিয়ে আয়েশ করে তাতে চুমুক দিলো বুশরা। বেড সাইড টেবিলের উপর মগ রেখে লম্বা একটা শ্বাস ফেলে ফোন তুলে কল করলো অনিককে। বার কয়েক রিং হতেই ঘুম ভেঙে গেল তার। বিগড়ানো মেজাজ নিয়ে পিক করলো।
“হ্যালো!”
“কী করছো?”
“গীতা আম্বানি তুই জানিস না এই সময়টায় আমি ঘুমাই?”
“পড়ে পড়ে সারাদিন কীসের ঘুম তোমার? কাজকর্ম নেই?”
“আমার আবার কীসের কাজকর্ম! বাপের হোটেলে খাই মায়ের হোটেলে ঘুমাই।”
“এভাবে তোমার দিন যাবে তাই না?”
“তো কী করবো?”
“চাকরি-বাকরি করে বিয়েশাদি করো। আর কত বাউণ্ডুলিপনা করবে?”
“প্রেম করে বিয়ে অথবা অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ দুইটার একটাও আমার কাছে সুবিধা মনে হয় না। তৃতীয় কোনো অপশন থাকলে ভালো হতো।”
“তোমাকে চাকরি-বাকরি করতে বলেছি তারপর বিয়ে।”
“ধূৎ!”
“তোমার মতো পাগলকে বউ দিবেটা কে শুনি! দেখতে ঠিক সাদা বিড়ালের মতো লাগে,হুলো বিড়ালের মতো লাগে,নায়িকার মতো লাগে,বিটিএসদের মতো লাগে। মুখে দাড়ি-টাড়ি কিছু নেই।”
মেজাজ খারাপ হলো অনিকের।
“তুই আমারে অপমান করলি নাকি মানসিক নির্যাতন?”
“ডিজগাস্টিং!”
সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলো। মেজাজ খারাপ হলো অনিকের। সবসময়ই তার বোন তাকে এইভাবেই মানসিক নির্যাতন করে।
“শ্লার শুনছি মহিলারা শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতন হয়। এদিকে আমি বাবার বাড়িত ছেলে হয়ে বোনের কাছে মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছি! হ্লার আখেরি যুগ আইসা পড়ছে! সব উল্টা হইতাছে!”
বালিশে মুখ গুঁজে ঘুমানোর চেষ্টা করলো। চোখ লেগে আসতেই ফের রিং বেজে উঠলো। ভীষণ বিরক্ত হলো অনিক।
“কোন হ্লারে!”
“দোস্ত কই তুই?”
“রেস্ট নিতাছি।”
“তোর রেস্টের মাইরি! তাড়াতাড়ি আয়।”
“কী হইছে?”
“আম্বানি পরিবার কোথায় যাইতেছে।”
“আইতাছি ফলো কর।”
দ্রুত শোয়া থেকে উঠে ওয়াশরুমে ঢুকলো।
“হ্লার আম্বানির পরিবার শান্তিতে রেস্ট করতে দিলো না।”
হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে টি-শার্ট পরে রেডি হয়ে বেরিয়ে গেল।
__
“নিশু তুই লিপস্টিক এনেছিস?”
“না।”
“আমি শুধু পিংক কালারটা এনেছি। এখন কী হবে?”
অস্বস্তিতে হাত-পা কাঁপছে নিশুর। এমনটা কেন করলো ধ্রুব বুঝতে পারলো না। সেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। নিজের উপরই প্রচন্ড জিদ হলো।
“ভাইয়া,ড্রাইভার আংকেলকে বলো কোনো একটা শপিংমলের সামনে দাঁড়াতে। একটা লিপস্টিক কেনা লাগবে। মেকআপও নষ্ট হয়েছে। এগুলো ঠিক না করলে পিকচার ভালো হবে না।”
শপিংমলের সামনে ব্রেক কষলো ড্রাইভার আংকেল। ওরা দু’জন শপিংমলে ঢুকে লিপস্টিক ট্রাই করতে লাগলো।
“নিশু এই কালারটা দারুণ,ট্রাই করে দেখতো!”
সুন্দর করে নিশুর ঠোঁটে লাগিয়ে দিলো।
“ম্যাচিং হয়েছে।”
ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে সোজা হাঁটতে লাগলো ওরা।
“ওই হ্যালো আপু,লিপস্টিক নিবেন না?”
“না এগুলো ভালো ব্র্যান্ডের নয়।”
চুপসে গেল সেলসম্যান।
“কী বলছেন আপা?”
“ঠিক বলেছি।”
“আরো ভালো ব্র্যান্ডের আছে।”
“লাগবে না।”
বেরিয়ে গেল ওরা। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো সেলসম্যানগুলো।
“এইটা কী হলো আমাদের দোকান থেকে লিপস্টিক ইউজ করে রেখে দিয়ে চলে গেছে!”
পিছু ফিরে ভেংচি কাটলো দ্যুতি। মুচকি হেসে উঠলো সেলসম্যান।
__
জোরে বাইক কষলো অনিক।
“আম্বানি পরিবার কই?”
“শপিংমলে।”
চতুর্দিকে তাকালো।
“দোস্ত তোর কি মনখারাপ?”
“হুম।”
“কী হয়েছে?”
“আর বলিস না দীর্ঘদিন যাবৎ প্রতিনিয়ত নিজের বোনের কাছে মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছি।”
“কস কি! কেমনে কীভাবে?”
“ঝগড়া লাগলেই ও আমাকে নায়িকা বলে,বিটিএস বলে চ্যাতায়। আর এগুলো শুনলেই আমার মাথা গরম হয়ে যায়। এখন আমি নিজেকে সিগমা টাইপ বানাতে চাই। কঠিন মনের মানুষ হতে চাই। দেখতে যেন রাগী পুরুষের মতো লাগে।”
“ধূৎ বাদ দে! কত আর মানসিক নির্যাতন করবো!”
ওদের কথার বলার ফাঁকেই গাড়িতে উঠতেই চলতে শুরু করলো। গাড়ির মধ্যেই নিশুর মেকআপ ঠিক করে দিলো দ্যুতি।
“তোরা দু’জন যে কী! সারাদিন বাসায় কী করিস! গাড়ির মধ্যেই কেন এইসব করতে গেলি! মেকআপ জিনিসটা খুবই সেন্সেটিভ! একটু নষ্ট হলেই পুরোটাই বাদ দিতে হয়।”
নীরব রইলো নিশু।
“বাসরটা বাদ রাখলি কেন করে ফেলতি গাড়ির মধ্যে! আগে যদি জানতাম তাহলে গাড়িটা ফুল দিয়ে সাজিয়ে আনতাম। তোদের তো আবার সেখানে সেখানে বাসর পায়।”
মাথা তুলতে পারলো না নিশু। বেশ কিছুক্ষণ পর মেইন শপিংমলের সামনে গাড়ি ব্রেক কষতেই আকস্মিক কোথ থেকে বেশ কিছু মানুষ,সাংবাদিক,ব্লগার ছুটে এলো। ভিডিও করতে লাগলো। এক এক করে গাড়ি থেকে বের হতে লাগলো ওরা। দ্যুতি নামার ওর নিশু নামলো। বেশ কয়েকজন পুরুষ এবং মহিলা ওদের ফুলেল শুভেচছা জানিয়ে ফ্লাওয়ার বুকে তুলে দিলো হাতে। আনন্দিত এবং উল্লসিৎ হলো দু’জন। এগারো তলা বিশিষ্ট উঁচু ভবন অর্থাৎ শপিংমলটির দিকে তাকায় ওরা দু’জন। এই সম্পূর্ণ ভবনটির মালিক নিশু-দ্যুতিসহ পাঁচজন। অর্থাৎ পার্টনার আসাদ সাহেব থাকলেও তিনি দুজনের নামে লিখে দিলেন। যেহেতু এতবড় শপিংমল একাকী পরিচালনা করা উনার পক্ষে অসম্ভব ব্যপার। সেহেতু পাঁচজন পার্টনার মিলেই এই বহুতল ভবনটি নির্মান করা হয়েছে। তবে এরপরেও গ্রাউন্ড ফ্লোর আসাদ সাহেব নিজের দখলে নিয়েছেন। আর গ্রাউন্ড ফ্লোর জুড়েই মেডিসিন শপ দিয়েছেন। অবশ্য মেডিসিন শপ দেওয়ার কারণ এই ভবনটির চতুর্দিকেই হসপিটাল রয়েছে। তাই এটাই করা। আজ সম্পূর্ণ ভবনটি উদ্ভোদনের পাশাপাশি গ্রাউন্ড ফ্লোরের শপটিও উদ্ভোদন করা হবে। উদ্ভোদন অনুষ্ঠানে বাকি চারজন পার্টনার ছাড়াও ওরা দু’জন মেইন গেস্ট হয়ে এসেছে। আর তাতেই দু’জন ভীষণ খুশি! নিশু-দ্যুতি যদি কখনো জানতে পারে এত বড় ভবনটির পার্টনার তারা দু’জনও। তাহলে না জানি ঠিক কতটা খুশি হবে। ততক্ষণে অনেক মানুষ জড়ো হলো। ওদের চারপাশে মানুষ ঘিরে ধরলো। ফিতা দেওয়া হলো কাটার জন্য। আনন্দে হাত কাঁপতে লাগলো দু’জনের। বাকি পার্টনাররা ওদের পাশেই দাঁড়িয়ে রইলেন। নারী বলে সম্মান দিয়ে ওদেরকে ফিতা কাটতে আহ্বান করলেন। ইমোশনাল হয়ে পড়লো নিশু এত সম্মান দেওয়ায়। অতঃপর সবাই মিলে কেঁচি ধরলো নিশু-দ্যুতির সঙ্গে। একসঙ্গে ফিতা কাটতে লাগলো।
“এই সর সর! ফিতা আম্বানি ফিতা কাটছে! হ্লার ঘরের হ্লারা সর কইতাছি!”
এমন একটা মুহূর্তে অনিককে আশা করেনি কেউ। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো আসাদ সাহেব,ধ্রুব-ধূসরের। ভড়কায় নিশু-দ্যুতি।
“লাইট! ক্যামেরা! অ্যাকশন! ফিতা আম্বানি দ্রুত ফিতা কাটো!”
মেজাজ খারাপ হলো দ্যুতির। এটা এখন মজা করার সময়? ভীতসন্ত্রস্ত হয় নিশুও। মানইজ্জত সব শেষ!
“এই তোরা কেউ হাসবি না পাপির দল! এটা বাংলাদেশের সেরা আম্বানি বংশের ভিডিও! চুপ! চুপ! একদম চুপ! ডোন্ট ডিস্টার্ব মি।”
দাঁতে দাঁত চাপলো ধ্রুব। ভিডিও করতে লাগলো অনিক। সেকি মুড! দ্যুতিকে ইশারা দিলো নিশু ফিতা কাটতে।
“ফিতা আম্বানি তাড়াতাড়ি ফিতা কাটো!”
শ্বাস আঁটকে রইলো দ্যুতি। সেদিকে মন নিয়ে ফিতা কাটতেই ফুলবর্ষণ,আতশবাজি এবং বেলুন ফুটাতে লাগলো। ফিতা কেটে ভিতরে ঢুকে গেল ওরা। চোয়াল শক্ত করে অনিকের সামনে দাঁড়ালো ধ্রুব।
“ওরেম্মা! এটা কি স্বপ্ন দেখতেছি! স্বয়ং ইগো আম্বানি,সরি মাইকা বোবা আম্বানি,সরি মুডিবয় আম্বানি ধূৎ! দোস্ত কী নাম রাখতাম বলতো?”
“প্রথমটাই রাখ।”
“ওকে।”
“এই তোর লজ্জা নেই?”
“না।”
“তোর ভেতর নম্রতা,ভদ্রতা,সভ্যতা কিছুই নেই?”
“একদম নাই পাপির দল সরি ইগো আম্বানি।”
“ফাজলামো করছিস?”
“চেতিস না ইগো আম্বানি!”
চোয়াল শক্ত করলো ধ্রুব। আচমকা কলার চেপে ধরলো অনিকের।
“সিনক্রিয়েট করতে এসেছিস?”
“ইগো আম্বানি শোন,ভাবতাছি তোর বোনটাকে বিয়ে করবো।”
“সাট আপ!”
“এখন তোর বোনটাকে দিবি নাকি বউটাকে?”
“মুখ সামলে।”
আরো জোরে কলার চেপে ধরলো।
“আমার কিন্তু দুজনকেই খুব পছন্দ! ইশরে! কইতে শরম লাগে তো! বাই দ্যা ওয়ে,এবার তোর ইগো কমিয়ে হয় বোনটাকে আর না হয় বউটাকে বিয়ে দিয়ে আমার সম্মন্ধি হয়ে যা। তাহলে আমিও নম্র-ভদ্র-সভ্য চরিত্রে মণ্ডিত হয়ে তোকে দেখিয়ে দিবো ওখে!”
ভিতর থেকে দৃশ্যটি দেখলো দ্যুতি। এই না মারপিট লেগে যায়। অস্থির অস্থির লাগছে! কম্পিত হাতে পার্স থেকে ফোন বের কল দিতে লাগলো ধ্রুবকে। পিক করলো না। ওদের বাকবিতণ্ডা শোনা যাচ্ছে। মরে যেতে ইচ্ছে করছে দ্যুতির। ব্লক খুলে লাগাতার কল দিলো অনিককে,সেও পিক করলো না। অসহ্য লাগছে দ্যুতির। ভয়ে ভয়ে কল দিলো ধূসর। ধূসর নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওদের সামনে। পিক করলো।
“ভাইয়া দাঁড়িয়ে রইলে কেন? বড় ভাইয়াকে থামিয়ে নিয়ে আসো। নয়তো আমি যেদিকে ইচ্ছে সেদিকে চলে যাবো এখন।”
সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলো। এগিয়ে এলো ধূসর।
“ভাইয়া ওকে ছাড়ো,সিনক্রিয়েট করো না। ও হচ্ছে একটা পাগল।”
ছাড়িয়ে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। ততক্ষণে ভাইরাল হয়ে গেল পিকচার এবং ভিডিওগুলো। দেখতেই বাইক নিয়ে ছুটে এলো আবির। আবিরকে দেখতেই মেজাজ খারাপ হলো অনিকের।
“এই তুই ছ্যাঁছড়া আম্বানি না?”
চোয়াল শক্ত করলো আবির।
“মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ।”
“হ্লা তোর কী কাজ এখানে?”
“খুব বেড়েছো তুমি!”
হঠাৎ কল এলো। পিক করতেই চেচিয়ে উঠলো বুশরা।
“কী শুরু করলে তুমি?”
“কী করলাম গীতা?”
“ফাজলামো করছো কেন? মানসম্মান নেই তোমার?”
“চুপ কর গাধী!”
“পাগল-ছাগল!”
ঠিক সে-সময় চেম্বার থেকে বেরিয়ে মোবাইলে কথা বলতে বলতে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল তানজিল। একটি দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে উঠে একটা গাছের পাতা ছিঁড়তেই,”প্রেম করেন ভালা কথা কিন্তু গাছের পাতা ছিঁড়েন এটা কোন ধরনের রোমান্স ভাই?”
চমকায় তানজিল।
“এক্সকিউজ মি কী বলছেন?”
“বয়রা আম্বানি!”
“কী বললেন?”
“বয়রা আম্বানি।”
_____
চলবে~
রিচেইক করিনি। রেসপন্স করবেন আপুরা। আসলেই খুব ক্লান্ত লাগছে,নয়তো আরেকটু বড় করে দিতাম। পরের পর্বে সাংঘাতিক কিছু ঘটাবে দ্যুতি। অপেক্ষায় থাকুন। ধ্রুবও জেলাশ হয়ে নিশুকে নিয়ে এক সিদ্ধান্তে আসবে।