#মায়াকুমারী ❤️
#মেহেরিন_আনজারা
#পর্বসংখ্যা-(৩৩)
___________________
সন্ধ্যা সাতটার সময় দ্যুতিদের বাসায় এলেন আদনীন ফেরদৌস। উনাকে প্রথমে চিনতে না পারলেও পরে চিনতে পারলেন দিলরুবা খাতুন। হাসি মুখে আদর-আপ্যায়নের ব্যবস্থা করলেন। এক-দুই কথায় জানতে পারলেন নিশুকে উনার পছন্দ! ইনিয়ে-বিনিয়ে জানিয়ে দিলেন পুত্রবধূ করতে চান। তখনি মুখটা পাংশুটে বর্ণ ধারণ করলো উনার। আগ বাড়িয়ে তেমন কিছু বললেন না। নিশুর আসার অপেক্ষায় রইলেন এবং নানান গল্পগুজব করতে লাগলেন। ঠিক তখুনি উনাদেরকে অবাক করে এলেন তাহিয়া বেগম। উনাকে দেখতেই চমকালেও স্থির রইলেন। তাহিয়া বেগম ভণিতা না করে সোজাসুজি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। নড়েচড়ে বসলেন দিলরুবা খাতুন। কীভাবে যে সামলাবেন বুঝতে পারছেন না। তবুও মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। আজ হাঁটে হাঁড়ি ভাঙ্গবেন বলে পণ করলেন তিনি।
__
অনিকের বাড়িতে খবর দেওয়া হলো। আপসেট হয়ে পড়লো দ্যুতি। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে এমন জঘন্য কিছু করে ফেলবে ভাবতে পারেনি! ভারসাম্য হারিয়ে নুইয়ে পড়তেই ঘাবড়ায় ওরা। পাঁজাকোলে তুলে গাড়িতে উঠিয়ে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরালো। সারা পথ ভাইয়ের বুকে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে কান্না করলো। দ্যুতি কেমন কাঁপছে স্পষ্ট টের পাচ্ছে ধ্রুব। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলো না ওকে। আসলেই কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। অনিককে ওইভাবে আহত করে সে নিজেই ঘাবড়ে রয়েছে। বাসার সামনে গাড়ি থামলো। এক এক করে বেরুলো সবাই। তখন পিঠে আঘাত পেতেই চিনচিন করছে পেটের ভিতর। কিছুটা কুঁজো হয়ে হাঁটতে লাগলো নিশু। অসহ্য ব্যথা হচ্ছে তবুও দাঁতে দাঁত চেপে রইলো। দ্যুতিকে ধরে নামালো। ধ্রুবকে ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাসায় প্রবেশ করতেই উনাদেরকে দেখতেই চমকালো। আদনীন ফেরদৌসকে আশা করেনি নিশু। অনিকের অবস্থা জানে তো! জানলে নিশ্চয়ই এভাবে বসে থাকতে পারতেন না। ভীতসন্ত্রস্ত হয় নিশু। ঢিপঢিপ করতে লাগলো বুকের ভিতর। ভদ্রমহিলা জানতে পারলে কেমন রিয়েক্ট করবেন ঠিক বুঝতে পারলো না। ওদের দিকে তাকালো সবাই। মলিন মুখে তাকায় দ্যুতি। মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে এগিয়ে গিয়ে সালাম দিলো নিশু। দ্যুতি দাঁড়ালো না তাকে রুমের দিকে নিয়ে গেল ধ্রুব।
“তোমার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম নিশু।”
মৃদু হাসলো সে।
“আসলেই আমাদের একটা প্রোগাম ছিল আন্টি। আপনি কেমন আছেন?”
“ভালো। ওর কী হয়েছে?”
“আসলেই গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ঠিক হয়ে যাবে।”
চিন্তিত হলেও নীরব রইলেন দিলরুবা খাতুন। টেনশন হচ্ছে দ্যুতির জন্য। হাসিখুশি মেয়েটা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ফিরলো নিতে পারলেন না তিনি। মনটা কেমন খা খা করছে!
“আপা তখন তো বললাম নিশুকে আমার খুব পছন্দ আপনার ভাইয়েরও। আমাদের পরিবারের কারো কোনো আপত্তি নেই। আমরা নিশুকে পুত্রবধূ করতে চাই। আর অনিক তো নিশুকে পছন্দ করেই! দু’বার বাসায় নিয়েও গেল। আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো।”
চমকালো নিশু এবং তাহিয়া বেগম। আদনীন ফেরদৌস সঠিকটা জানেন না। অনিক তাকে নয় দ্যুতিকে পছন্দ করে। আর তাকে শালা বউ হিসেবে যথেষ্ট সম্মান করে। তাকে বাসায় নেওয়ায় উনারা বোধহয় উল্টো ভেবেছেন।
“এইসব কী বলছেন আপা? আমি সেদিন ভাবীর কাছে প্রস্তাব রেখে গিয়েছিলাম।”
“আজকে তিন-চার বছর আগ থেকে ওকে আমাদের পছন্দ। ভাবলাম ছেলে বিদেশ থেকে ফিরলে প্রস্তাব দিবো।”
চুপসে গেলেন তাহিয়া বেগম।
“এটা হয় না আপা! মেয়েটাকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। দয়া করে আপনি অন্য পাত্রী দেখুন।”
তাহিয়া বেগমের কথা পছন্দ হলো না আদনীন ফেরদৌসের। দিলরুবা খাতুনের ভালো লাগছে না কিছু। টেনশনে অস্থির হয়ে গেলেন। ভাবলেন আর কত মুখ বুজে রইবেন তাই মুখ খোলার প্রস্তুতি নিলেন।
“আপনারা থামুন আপা। নিশু আমার বড় পুত্রবধূ।”
চমকালেন উনারা।
“কী বলছেন?”
“যা সত্যি তাই। ও আমার ভাইজি। আর খুব ছোট থাকতেই আমার ছেলের সঙ্গে ওর বিয়ে দিই। নিশু আমাদের মেয়ের চেয়েও কম নয় তবে ওর আরেকটা পরিচয় ও আমাদের পুত্রবধূ। আশা করি বুঝতে পেরেছেন।”
মলিন মুখে বিদেয় নিয়ে বেরিয়ে গেলেন উনারা। হাফ ছেড়ে বাঁচলেন দিলরুবা খাতুন। দ্রুত দ্যুতিকে দেখতে গেলেন। চোখ বুজে শুয়ে রয়েছে সে। তাই কিছু জিজ্ঞেস করতে নিয়েও চুপ হয়ে গেলেন।
“নিশু,দ্যুতির কী হয়েছে?”
“কিছু হয়নি ফুপি। আসলেই..”
“থামলি কেন বল?”
উৎকণ্ঠা হলেন তিনি।
“মানে খুব গরম পড়ছিল তো তাই শরীর খারাপ করেছে।”
বিশ্বাস হলো না উনার। তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালেন।
“সত্যি কথা বল!”
“ফুপি,আমি খুব ক্লান্ত। শাড়ি চেঞ্জ করতে হবে।”
রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। হাফ ছেড়ে বাঁচলো নিশু। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না! শুনলে খুব চিন্তা করবে আর অসুস্থ হয়ে পড়বে। দ্রুত শাড়ি চেঞ্জ করে,মেক-আপ রিমুভ করে,হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো। দ্যুতির শরীর থেকে শাড়িটা খুলে একটা ড্রেস পরিয়ে দিলো। স্পঞ্জ টিস্যু দিয়ে মেক-আপ রিমুভ করে হাত-মুখ মুছে দিলো। শ্বাস আঁটকে আঁটকে আসছে দ্যুতির। হঠাৎ কী করে ফেললো বুঝে উঠতে পারছে না! অনিকের রক্তাক্ত মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই ডুকরে কেঁদে উঠলো। চুলের ভেতর আঙ্গুল গুঁজে মাথায় বিলি কাটতে লাগলো নিশু।
“কাঁদিস না ঠিক হয়ে যাবে।”
ভীষণ কষ্ট হচ্ছে দ্যুতির। তার রূপের বর্ননা দিলে বলা যায় এক দেখায় পছন্দ করার মতো মেয়ে। তার চোখ-মুখ যেন হাসে,কথা বলে,ঝিলিক দেয়। হাসলেও যেন দাঁতগুলো ঝিলিক দেয়। এক কথায় তাকে দেখলেই যে-কারো পছন্দ হবেই! আর সেই মেয়ে কিনা এক ইমম্যাচিওর ছেলের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে! অগুনিত বিয়ের প্রপোজাল রিজেক্ট করছে! অভিমানে বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। কখনোই অনিক তাকে বুঝলো না। কখন কীভাবে যেন ভালো লাগতে শুরু করছিল তা ঠিক দ্যুতিও জানে না। হয়তো মাঝেমধ্যে করা পাগলামোগুলো,অধিকারবোধ দেখানো,তাদেরকে যখন-তখন প্রটেক্ট করা,খেয়াল রাখা ইত্যাদি। আর এইসবের জন্যই হয়তো পাগলাটে মানুষটা তার মনের অজান্তেই খুব গোপনে আসন গেঁড়ে নিয়েছিল। ভেবেছিল ভালোবেসে পাগলাটে,বাউণ্ডুলে মানুষটাকে সে গুছিয়ে নিবে সেই আত্মবিশ্বাস ছিল তার মধ্যে। কিন্তু মানুষটার মধ্যে তিলার্ধ পরিমাণও পরিবর্তন নেই। প্রতিটি জিনিসকেই হালকাভাবে নেয়। ধৈর্য-সহ্যের লিমিটেশন ক্রস করে ফেলেছিল এবার তাই তো আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এলোপাতাড়ি আঘাত করেছিল। দু-হাতে নিশুকে ঝাঁপটে ধরে পেটের মধ্যে মুখ গুঁজলো। বেডের সাথে হেলান দিয়ে বসলো নিশু।
“চিন্তা করিস না ঠিক হয়ে যাবে আল্লাহ ভরসা।”
“আমি যখন ওকে আঘাত করছিলাম ও তখন কেন দাঁড়িয়ে রইলো?”
“তোকে যে আমি বারবার থামানোর চেষ্টা করেছিলাম তুই শুনেছিস আমার কথা?”
“এমন একটা সিরিয়াস মুহূর্তেও ওর ডোন্ট কেয়ার ভাবটা আমার কাছে উত্তপ্ত গলিত শিসার মতো ছিল। ও কেন তখন নিজেকে প্রটেক্ট করলো না?কেন ওভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছিল?”
“কী বলবো তোরা দু’জনই এক।”
“নিশু! নিশুরে! ও যদি মরে যায়?”
বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠলো।
“এমন কথা বলিস না। এমনটা না করুক আল্লাহ।”
চোখের জল মুছে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। এক হাতে মাথার মধ্যে বিলি কাটতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর চোখ ভেঙে এলো। ওইরকম বসাবস্থায় কখন চোখ লেগে এলো বুঝতে পারলো না নিশু। একসময় ঘুমিয়ে পড়লো দ্যুতিও।
__
লেট করে বাসায় ফিরলেন আসাদ সাহেব। ব্যবসায়িক কাজ। কত ঝুট-ঝামেলা! শ্বাস ফেলার সময়টুকুও পান না তিনি। চতুর্দিকে দৌঁড়াতে হয় এই বয়সেও। উনি জানতে পারলেন না এত বড় ঘটনা ঘটেছে কিংবা দ্যুতি ঘটিয়ে বসে আছে। শুনতে পেলেও হয়তো অবিশ্বাস্য বলে মনে হবে। সর্বদা হাসিখুশি থাকা সাদা মনের মেয়েটা কখনো এমন মারাত্মক কাজ করে বসবে এটা অবিশ্বাস্যই বটে! বিশ্বাস করতে হয়তো বেগ পোহাতে হবে। কিছুক্ষণ পূর্বে আবারও হসপিটালে এলো ধ্রুব। অনিকের বাবাকে দেখলো এখানে-ওখানে ফোন করে চিৎকার চেঁচামেচি করছেন। হঠাৎ হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে পাগলের মতো ছুটে এলেন আদনীন ফেরদৌস। তিন ভাই নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। অনিকের গ্যাংদের পাওয়া গেল না। পাওয়া গেলে জিজ্ঞাসাবাদ করবে তাই ওরা আত্মগোপন করেছে। অনিক দ্যুতিকে ভালোবাসে এটা ওরা জানে। তাই ওর পারমিশন ছাড়া দ্যুতির কথা বলতে পারবে না। বললে নিশ্চয়ই থানা-পুলিশ-কেইস করবে অনিকের বাবা। পরে দ্যুতিকে জেলে নিলে আর সুস্থ হয়ে অনিক জানতে পারলে মনঃক্ষুণ্ন হবে। বিনা কারণে তাকে হাজতে ঢুকানোর কারণে আবিরকে দু-চক্ষেও দেখতে পারে না অনিক। আবিরকে দেখলেই যেন সাপের সাথে বেঁজির দেখা! সেখানে দ্যুতিকে জেলে নিলে কী অবস্থা করবে অনিক ঢের জানে ওরা তাই আত্মগোপন করে রয়েছে। চটুল মেজাজে পায়চারি করতে লাগলেন তিনি। ওর গ্যাংদের খোঁজ চালাচ্ছেন বিস্তারিত জানার জন্য। তানজিলকে জিজ্ঞেস করলে এই ব্যপারে সে নীরব রইলো। অনেক রাত হলেও সেন্স ফিরলো না অনিকের। দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল সবাই। এদিকে দ্যুতির কথা চিন্তা করে বাসায় ফিরে এলো ওরা। অনিকের বাবা-মা থাকলো। দ্যুতিকে একপলক দেখে রুমে ফিরে গেল ওরা। নিশু ওইভাবেই বসে রইলো। ঠিক করতে নিয়েও হাত গুটিয়ে ফেললো ধ্রুব এই না জেগে যায়। কি সুন্দর করে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে রয়েছে। এমন বিরল দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য সবার হয় না।
__
মাঝরাতের দিকে হঠাৎ ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখতেই চিৎকার করে উঠলো দ্যুতি। ভড়কে উঠে জেগে গেল নিশু।
“দ্যুতি কী হয়েছে?”
উঠে বসলো দ্যুতি।
“অনিক! অনিক বেঁচে আছে তো?”
“ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”
আতঙ্কিত চোখে তাকায় দ্যুতি। গলা শুকিয়ে গেল। কী করবে ভেবে পেলো না। দু’হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো।
“এ আমি কী করে ফেললাম! আমি বোধহয় ওকে মেরে ফেলেছি!”
বিষন্ন চোখে তাকায় নিশু।
“এখন ওর কী হবে নিশু?”
নীরব রইলো সে। আসলেই অনিক কেমন আছে সেও জানে না। চোখ লেগে এসেছিল।
“আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে নিশু।”
“এমন কথা বলতে নেই। শান্ত হো কিচ্ছু হয়নি। আমার বিশ্বাস নিশ্চয়ই অনিক ভালো আছে।”
মাথার চুলগুলো খামচে ধরে বিকট শব্দে চিৎকার করে উঠলো।
“আমি বাঁচতে চাই না!”
দ্যুতি কেমন জানি অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করলো। ভীত হয়ে ঘাবড়ে গেল নিশু। ঠিক কী করবে বুঝে উঠতে পারলো না। ফুপা-ফুপিকেও কীভাবে ডাকবে! উনারা বয়স্ক মানুষ এমন কিছু শুনলে ঘাবড়ে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। ধ্রুবর রুমের সামনে গেল দরজা-লাইট অফ। ডাকতে গিয়েও কেমন অস্বস্তি হলো। হাত গুটিয়ে ধূসরের রুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে নক করলো।
“ভাইয়া শুনছো!”
জেগেই ছিল ধূসর,অবশ্য ঘুম আসছিল না তার।
“হ্যাঁ কী হয়েছে?”
যেন প্রস্তুত ছিল।
“ভাইয়া দ্যুতি কেমন জানি করছে! ওকে একটু দেখবে?”
কেমন অসহায় চাহনি আর কণ্ঠস্বর। একপ্রকার ছুটে এলো। সজাগ ছিল ধ্রুব। টেনশনে ঘুম আসছিল না তারও। নিশুর কণ্ঠস্বর শুনে দরজা খুলে বেরুয়।
“কী হয়েছে?”
হকচকায় নিশু। কেন জানি আশার আলো দেখতে পায়।
“দ্যুতি আপসেট হয়ে পড়েছে।”
লম্বা লম্বা কদম ফেলে ছুটে গেল। রুমে ঢুকতেই হতভম্ব হলো তিনজন। ফ্যানের সঙ্গে ওড়না বেঁধে গলায় ফাঁস দিয়েছে দ্যুতি। চেঁচিয়ে উঠে ওকে নামালো।
“এটা কী করছিস পাগল হয়ে গিয়েছিস!”
আষ্টেপৃষ্টে শক্ত করে ভাইকে জড়িয়ে ধরলো দ্যুতি। মুখ গুঁজলো বুকে।
“আমি খু’নি! আমি অনিককে খু’ন করেছি! আমি বাঁচতে চাই না!”
“কে বলেছে এমন কথা! অনিক বেঁচে আছে। পাগলামো করিস না।”
অনেকক্ষণ কাঁদলো। চুলের ভাঁজে আঙ্গুল গুঁজে বিলি কাটতে লাগলো।
“ভালোবাসিস ওকে?”
হাঁ করে বুক কাঁপিয়ে শ্বাস ফেললো দ্যুতি।
“তোমাদের ভয়ে কখনো প্রকাশ করিনি। আসলেই কীভাবে যেন ভালোবেসে ফেলেছিলাম!”
বুকটা আদ্র হয় দু-ভাইয়ের। কেমন ভেঙ্গেচুরে মুষড়ে এলো। তারা তো বাঁধা দেয়নি! অনিকের পরিবারের স্টাটাস আছে। কিন্তু ও যদি নিজেকে একটু পরিবর্তন করে তাহলে সব ঠিক। আর কারো মেয়ে-বোন কেউ কাউকে সেধে সেধে দিতে পারে নাকি! অনিকের সবকিছু ঠিক থাকার পরেও কেয়ার করছে না। সে প্রস্তাবও আনেনি কখনো তাহলে কীভাবে কী!
“ও খারাপ নয় ভাইয়া কিন্তু ইমম্যাচিওর।”
তা ঠিক। চরিত্র খারাপ নয়। মুখ চলে আরকি। বেফাঁস কথাবার্তা বলে আর চিল মুডে থাকে এটাই। পড়াশোনায়ও যথেষ্ট মেধাবী। এছাড়াও বাবা-মায়ের অঢেল ধনসম্পদ আছে তাই ও জীবনের মানে বুঝে না,অভাব-অনটন,দুঃখ-কষ্ট জিনিসটা বুঝে না! মন্ত্রীর একমাত্র ছেলে কিন্তু তার মধ্যে তেমন ভাব নেই। আছে না অনেক নেতার ছেলেরা বাবার ক্ষমতা দেখিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে,বুক ফুলিয়ে দাপট দেখিয়ে বেড়ায়,চাঁদাবাজি করে,সুন্দরী মেয়েদের তুলে রেপ করে কিংবা অনৈতিক কর্মকান্ড অথবা চোরাচালান ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত এমন কিছুই অনিকের মধ্যে নেই। সমস্যা একটাই ম্যাচিওরিটি নেই। ক্যারিয়ার নিয়ে সিরিয়াস নয়। বাবা-মায়ের অঢেল ধনসম্পদ আছে তাই ইনকাম করার প্রয়োজন মনে করে না। তার বাবা মানুষ খারাপ নয় ভালোই তবে মেজাজী। রাজনৈতিক মানুষ তাই মেজাজ সবসময়ই খারাপ থাকে। আর ছেলে তো বাউণ্ডুলে তাই আরো বেশি টেনশনে থাকেন। আর তার মা একজন উচ্চ পরিবারের,উচ্চশিক্ষিতা ভদ্রমহিলা এবং গাইনী ডক্টর। আজেবাজে আস্কারা কখনোই দেননি। তবে দাদী এবং বাবার আস্কারায় কিছুটা বখে গিয়েছে এটাই।
“অনিক ঠিক আছে। সকালে গিয়ে দেখে আসিস। এখন চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়।”
বুক ঠেলে কান্না আসছে দ্যুতির। ভীষণ মায়া হয় দু-ভাইয়ের। স্লিপিং মেডিসিন খাইয়ে দিলো ধূসর। এই ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। নয়তো সারা রাত বাজে অবস্থায় পার হবে। তার বাবা-মা জানতে পারলে টেনশনে সম্ভবত হার্ট-অ্যাটার্ক করে বসবেন। চোখ ভেঙ্গে এলো দ্যুতির। ঝাপসা হয়ে এলো দৃষ্টি। হাতগুলো ঢিলে হয়ে এলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লো। ভারী শ্বাস পড়তেই কপালে ঠোঁট চেপে রাখলো ধ্রুব। তার অতীব আদরের বোনটার জন্য তারা পুরো দুনিয়া এলোমেলো করে দিতে পারে। আর সেই বোনটাকে নাকি কেউ একজন খুব যত্ন করে কাঁদায়,কষ্ট দেয়,ইগনোর করে। তার ছোট্ট বোনটা নাকি কারো একজনের বিরহে পুড়ে গুমরে গুমরে কাঁদে! কখনো কোনো মেয়েকে পাত্তা না দেওয়া সেই তার বোনটাকে নাকি কোনো এক ছেলে অবহেলা করে ভাবা যায় এইসব! চট করে নিশুর কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটায় কেমন খা খা করে উঠলো শূন্য ধূধূ সমুদ্র তীরের মতো। রিভেঞ্জ অফ ন্যাচার বলে কোনো বাক্য নেই! এটা নেহাৎই শিরকী বাক্য! তবে হ্যাঁ,আল্লাহ প্রকৃতির মাধ্যমে বিচার করেন,শাস্তি দেন। যার যা প্রাপ্য তিনি সেটা প্রকৃতির মাধ্যমেই ফিরিয়ে দেন। প্রকৃতি কখনো রিভেঞ্জ নিতে পারে না। সেই শক্তি আল্লাহ প্রকৃতিকে দেননি। বরং আল্লাহই তাঁর সৃষ্ট প্রকৃতির মাধ্যমেই তার বান্দার রিভেঞ্জ নিয়ে থাকেন। সে যাইহোক,তাই বলে তাদের অন্যায়-অপরাধ আর পাপের শাস্তি আল্লাহ তার আদরের বোনের উপর দিয়ে এইভাবে দিবে? নিশুকে অবহেলা করায় আল্লাহ কি তার বোনের মাধ্যমে শাস্তি দিচ্ছেন? বুকটা তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো ধ্রুবর। কেমন জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। বুকের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরলো দ্যুতিকে। নিশুকে এতগুলো বছর অবহেলা করার শাস্তি এখন তার বোনের মধ্যে এর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে। মনে মনে বলল,”আমি আর কখনো নিশুকে কষ্ট দিবো না,অবহেলা করবো না। আমার ভুল আমি বুঝতে পেরেছি। আজ আল্লাহ আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। নিশু,আমি তোকে আর কষ্ট পেতে দিবো না প্রমিজ।”
চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে এলো ধ্রুবর। দ্যুতির মতো নিশুও বোধহয় এমন কষ্ট পেয়েছে। হয়তো এভাবে তার জন্য কেঁদেছে! কিন্তু ধ্রুব তো জানেই না নিশু ঠিক কতটা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল,পাগল হয়ে গিয়েছিল। নিশুর অসুস্থতার কাছে দ্যুতির কষ্টটা হয়তো অল্প। তবুও যার যার কষ্ট তার তার কাছে তো পাহাড়সম। ধ্রুবর বুকের ভেতর যেন কেউ কলিজাটা ভোঁতা ছোরা দিয়ে এলোপাতাড়িভাবে ক্ষতবিক্ষত করে আঘাত করছে। শ্বাস আঁটকে রইলো। দ্যুতির মধ্যে নিশুকে দেখতে পাচ্ছে। থমকে রইলো ধ্রুব। অনেক পাপ,অন্যায়,অপরাধ করেছে সে; আজ তার বোনের মাধ্যমে আল্লাহ চোখ খুলে দিয়েছেন। ভেজা ঢোক গিললো। তার বোনের কষ্টে তার কেন কষ্ট হচ্ছে? তার কেন বুক জ্বলছে? কলিজাটা কেন এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে ব্যথা করছে? হাঁ করে নিঃশব্দে শ্বাস ফেলে চোখ বুজে ঠোঁট দুটো চেপে ধরলো মাথায়। নিশুর কান্নার শব্দ টের পাচ্ছে! তার বোনের কষ্টে সেও জর্জরিত হয়ে কাঁদছে!
মলিন মুখে বোনের অশ্রুসিক্ত ভেজা মুখের দিকে তাকালো ধূসর। যেন একটা ফুটন্ত ভেজা গোলাপ। গোলাপফুল থেকেও তার বোন কম সুন্দর নয়! গোলাপ হলো ফুলের রানি,আর তার বোন তাদের রাজকুমারী! হুট করে মনে পড়লো বুশরার কথা। শুকনো ঢোক গিললো। মাথা নোয়ায়। বুশরা আজ অনেকগুলো বছর যাবৎ তাকে পছন্দ করে। এবার ইনিয়ে-বিনিয়ে জানিয়েছে পছন্দের কথা। সেদিন ব্লক করায় স্লিপিং মেডিসিন খেয়ে সু’ইসাইড এটেম্প করেছে। ধূসরের মনে হলো সে বুশরার সঙ্গে অন্যায় করেছে। নিশুকে ভালোবাসতে গিয়ে বুশরাকে সহ্যই করতে পারতো না। সবসময়ই ইগনোর এবং অপমান-অপদস্ত করেছিল। বুশরারও হয়তো এমন কষ্ট হতো যেমনটা তার বোনের হচ্ছে! অস্থির অস্থির লাগছে! ধূসর বুঝতে পারলো সেও অনিকের মতো এতগুলো বছর বুশরাকে কষ্ট দিয়ে আসছে। অথচ সেও অনিকের মতো বুঝতেই পারেনি। ভালোবাসা তো পাপ নয়। ভালোবাসা যায়,ভালোলাগা যায়। বোনকে কষ্ট পেতে দেখে বুঝতে পারলো বুশরারও হয়তো এমন কষ্ট হয়। তার বোনের মতো লুকিয়ে রাখে কষ্টগুলো। এই যে আজ তার বোন তো অনিককে আঘাত করে কষ্টগুলো প্রকাশ করেছিল কিন্তু নিশু-বুশরা তো সেটা পারে না। নিশু তো একবার পাগল হয়ে গিয়েছিল,বুশরা সু’ইসাইড এটেম্প করেছিল; আর তার বোন মনের ক্ষোভে প্রিয় মানুষটাকে আঘাত করে এখন সে নিজেই কষ্ট পাচ্ছে! পুরুষরা বলে নারীরা স্বার্থপর,তারা স্বার্থের পাগল,তারা লোভী ভালোবাসতে জানে না! কে বলে নারী ভালোবাসতে জানে না! নারীর ভালোবাসা জানতে হলে আরো একশোবার জন্ম নিতে হবে। এই যে তিনজন নারী নিঃস্বার্থভাবে তাদের ভালোবেসে শুধু কষ্টই পেলো। আদ্র হয়ে ভারী হয়ে গেল বুকটা। কাঁপতে লাগলো সারা শরীর। খুব যত্ন করে তারা দু-ভাই দুটি মেয়েকে কষ্ট দিয়েছে,অবহেলা করেছে,অপমান-অপদস্ত এবং অসম্মান করেছে। আর তাদের পাপের শাস্তি আল্লাহ হয়তো তাদের বোনকে এভাবে দিচ্ছে। শ্বাস আঁটকে এলো ধূসরের। দ্যুতির আজকের এই অবস্থা না দেখলে হয়তো কখনোই জানতেই পারতো না কিংবা ভুল ভাঙ্গতো না যে তারা দু-ভাই ঠিক কতটা ভুল করে দিনের পর পর দিন অন্যায় করছে! শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো দু’ভাইয়ের মনের ভেতর। অনুতাপে,অনুশোচনার অনলে জ্বলেপুড়ে দগ্ধ হতে লাগলো।
“ওকে শুইয়ে দাও।”
ধূসরের গলা কেমন অস্বাভাবিক ভেজা শোনালো। সম্বিৎ ফিরলো ধ্রুবর। আস্তে করে শুইয়ে বুক অব্ধি নকশীকাঁথা টেনে দিলো। ধূসরের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। অন্যদিকে ফিরে বলল,”তোমাদের সম্পর্ক শুদ্ধ থাকলে নিশুকে নিয়ে তোমার রুমে যাও। আমি এখানে থাকবো।”
“তুই যা আমি আছি।”
ধ্রুবর গলাও কেমন অস্বাভাবিক এবং ভেজা শোনালো। বাড়াবাড়ি করলো না ধূসর। সে-তো আজীবন ছিল আজ না হয় তার ভাই থাকুক,দায়িত্ব নিক,ইজি হোক তাদের সঙ্গে। মাথা নুইয়ে ঝাপসা চোখে বেরিয়ে গেল। দরজা ভিড়িয়ে ফোন হাতে নিয়ে বুশরাকে আনব্লক করলো। সে কি স্যরি বলবে বুশরাকে?কোথাও কেউ একজন বলেছিল,তুমি যাকে ভালোবাসো তাকে নয় বরং তোমাকে যে ভালোবাসে তাকেই ভালোবাসো। ধূসর জানে,নিশুর সঙ্গে তার মিলন হওয়া অসম্ভব! কারণ এটা একতরফা আর নিশু তার ভাইয়ের বিবাহিত স্ত্রী। এছাড়াও নিশু শুধু তাকে ভাই ভাবে। তার প্রতি নিশুর কোনো অনুভূতি নেই। তবে হ্যাঁ,সে নিশু-দ্যুতির কম্ফোর্টজোন। এছাড়াও সত্যি কথা হলো,নিশু তার ভাইকে পাগলের মতো ভালোবাসে এবং ভালোবেসে পাগলও হয়ে গিয়েছিল। সেখানে তার ভালোবাসা ফিকে! নস্যি! তাকে বুশরা ভালোবাসে। সীমাহীন ভালোবাসে। আচ্ছা সে কি বুশরার ভালোবাসা একসেপ্ট করবে?
__________
চলবে~
ঈদ মোবারক প্রিয় পাঠক! পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা সবাইকে। ❤️🌙