মায়াকুমারী পর্ব-৩৪

0
39

#মায়াকুমারী ❤️
#মেহেরিন_আনজারা
#পর্বসংখ্যা-(৩৪)
___________________

পুরো নিউজফিডময় ভেসে বেড়াচ্ছে ধ্রুব-নিশু,ধূসর-দ্যুতির হাস্যজ্জ্বল পিকচার। নিশুর হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো তাহমিদ। ধ্রুবর সঙ্গে গা ঘেঁষে দাঁড়ানো। দু’জনের খুব ক্লোজ পিকচারও পাওয়া গেল। সেদিন চুমু খেয়েছিল চিনতে ভুল হয়নি ধ্রুবকে। সবটা সময় দু’জন একসঙ্গে ছিল সেটাও দেখেছিল তাহমিদ। আজ তাদের সেখানে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তার বাবা থাকলেও তারা দু’জন আর এগুয়োনি। শপিংমলটির পাঁচজন পার্টনারশিপের মধ্যে তার বাবাও একজন। তিনি থাকলেও ওরা দু’জন দূরেই ছিল। সারা রাত ঘুমাতে পারলো না তাহমিদ। কেমন জানি লাগছে! ক্যারিয়ার গড়তে গিয়ে কখনো প্রেমে পড়া হয়নি। এই প্রথম কাউকে পছন্দ হলো তাও কেন জানি সব ধোঁয়াশা। মাকে বলতে শুনেছিল প্রস্তাব নিয়ে যাবে। কিন্তু কীভাবে কী! তার পছন্দের মানুষকে কেউ ওমনভাবে চুমু খেয়েছে নিতে পারছে না তাহমিদ! শ্বাস আঁটকে এলো। উঠে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। সিগারেট ধরালো। ভেসে এলো বাতাবিলেবু ফুলের সুবাস! তাহমিদের মনে হলো নিশুর গায়ে নিজস্ব সুবাস ভেসে আসছে! মেয়েটা তাকে প্রবলভাবে টানে!
__

চোখের সামনে ফোন ধরে রাখলো তানজিল। দ্যুতির হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। যেন সারা চোখ-মুখ,দাঁত ঝিলিক দিয়ে মুক্তো ঝরাচ্ছে! হাসিখুশি মেয়েটাকে হঠাৎ ওইভাবে রণচণ্ডী রূপ ধারণ করার মানে বুঝতে পারলো না। তানজিল ভাবলো,অনিক হয়তো বেফাঁস কথাবার্তা বলেছিল তাই ওমন করেছিল। আসলেই কথাবার্তার যে অবস্থা বখাটেই মনে হলো! অহেতুক তাকে কতগুলো কথা শুনিয়ে দিলো। মুখের ভাষার কথা আর কী বলবে! কী সব আজগুবি নাম যেন হ্লা,বয়রা আম্বানি কী কী ডিজগাস্টিং নাম বলেছিল ছিঃ! জীবনে ফাস্ট তাকে কেউ ওমনভাবে কথা বলার দুঃসাহস দেখিয়েছে। নেহাৎই সে ভদ্র ছেলে নয়তো উচিত শিক্ষা দিতো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেডসাইড টেবিলের উপর মোবাইল রেখে চোখ থেকে চশমা খুলে রাখলো। চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করলো। ভেসে উঠলো দ্যুতির অশ্রুসিক্ত মুখখানি! যেন একটা ভেজা গোলাপ! কেন যে মেয়েটাকে তার এত্ত ভালো লাগে সে জানে না। যদিও তাদের সেইরকম কোনো কথাই হয়নি। দ্যুতি তাকে পাত্তাই দেয়নি বরং যতবার দেখা হয়েছিল বিরক্তবোধ করেছিল যেন। সেই মুখখানি মনে পড়তেই আনমনেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। কিন্তু হঠাৎ বুঝতে পারলো না,অনিককে আঘাত করার পর ওইরকম পাগলের ন্যায় আচরণ করেছিল কেন? মনে হচ্ছিল মেয়েটা এমন কিছু করবে ভাবতে পারেনি! যা ছিল আনএক্সপেকডেট। হ্যাঁ এরপর তেজস্বী মেয়েটা আকস্মিক আপসেট হয়ে পড়েছিল। ছেলেটাও কেমন যেন রয়েছিল। তখন বলেছিল হবু বউ কথাটি। বারবার বলেছিল। ব্যপারটি বোধগম্য হলো না তানজিলের। সত্যি বলতে মেয়েটাকে তার পছন্দ হয়েছে। কিন্তু কীভাবে বলবে মাকে বুঝতে পারছে না! এটাই একটা সমস্যা। স্টাবলিশ হওয়ার পরেও বাবা-মায়ের অনুগত হওয়াটাই যেন একটা দেয়াল। চাইলেই অনুগত ছেলেটা বাবা-মায়ের অনিচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করতে পারে না! বাবা-মাকে প্রায়োরিটি দিতে গিয়ে পছন্দের প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে ফেলে।
__

তখন প্রায় চারটা বাজে যুক্তরাষ্ট্রে। শরীর খারাপ লাগায় রেস্তোরাঁয় যায়নি বুশরা। আনাড়িহাতে বাসায় রান্না করেছিল। ভাত-ডাল কিংবা মাছ-মাংস রান্না করতে জানে না তবে পাস্তা,নুডলস এগুলো মোটামুটি পারে। ইউটিউব দেখে শিখেছিল। আর তিন বেলায় রেস্তোরাঁয় খাওয়া হয়। অনিক থাকতে সমস্যা ছিল না। দু’জনেই খুব সুন্দর দিন পার করেছিল। যদিও একটু পাগলাটে তবে তার প্রতি পসেসিভ। সেও ভাইকে দুষ্ট-মিষ্ট কথা বলে খুঁচিয়ে ভীষণ মজা পেতো। মিস করছে ভাইকে। তখন রেগেমেগে একগাদা কথা শুনিয়েছিল। ঠিক তো,কেন কিছু একটা করছে না! বাউণ্ডুলিপনা আর কতদিন! সমাজে তাদের স্টাটাস আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেললো। লাঞ্চ করার জন্য লবস্টার দিয়ে স্পেগেটি কুক করে নিয়েছিল। শাওয়ার নিয়ে লাঞ্চ করতে বসলো। অবশ্য শাওয়ারে যাবার পূর্বে লাঞ্চের জন্য কয়লায় পোড়ানো পুরো আস্ত গ্রিলড চিকেনের সাথে ফ্রাইড রাইস,মাসালা গ্রেভি,ওয়েজেস ও সালাদের দুর্দান্ত কম্বিনেশনের একটি প্লেটার সেট এবং জাংক ফুড অর্ডার করেছিল। এই তো মাত্রই ডেলিভারি পেয়ে গেল। অবশ্য এখানের ডেলিভারি সিস্টেমটা বেশ ভালোই লাগে ওর। আনপ্যাক করে হাফ প্লেটে এক চামচ স্পেগেটি বেড়ে,কিছু ফ্রেঞ্চ ফ্রাই নিয়ে এক পিস চিকেন ফ্রাই নিয়ে তাতে কামড় দিয়ে নিউজফিড স্ক্রোল করতে লাগলো। নিশুদের পিকচার দেখতেই মনটা পুলকিত হলো। এখন বাংলাদেশে ভোররাত। নিশ্চিত ওরা ঘুমাচ্ছে তাই ফোন করলো না। অবশ্য রাতে-দিনে অসংখ্যবার ফোনে কথা হয় তাদের। দূরে আসায় এখন আরো মায়া বেড়েছে। এক চামচ স্পেগেটি মুখে পুড়তেই হঠাৎ তার বাবার কল আসতেই চমকে উঠলো বুশরা। এইসময় তো কল করার কথা নয়! ধীরে ধীরে চিবুতে লাগলো। পিক করে লাউডস্পিকার দিলো।

“হ্যালো পাপা!”

“তোমার বান্ধবী আমার ছেলেকে শেষ করে দিয়েছে!”

বিস্ফোরিত হলো বুশরা।

“মানে!”

“মাথায় আঘাত করে আইসিসিইউতে পাঠিয়েছে।”

শ্বাস নিতে ভুলে গেল। রক্তশূণ্য হয়ে গেল মুখশ্রী। টুপ করে চামচটা পড়ে গেল হাত থেকে। থমকে রইলো বুশরা।

“ক..কী বলছো পাপা!”

“আমার ছেলে মৃত্যুর মুখে।”

সব মাথার উপর দিয়ে গেল।

“বাঁচবে কিনা জানি না! দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছি!”

“মানে?”

“রক্তবমি করেছে!”

থমকে রইলো বুশরা। মানে ঠিক কী হলো বোধগম্য হলো না! মানে কীভাবে কী! সারাক্ষণই কথা হয়েছিল আর কখন কীভাবে কী হলো আর কেনইবা! দ্যুতি তো এমন না! নিশু তো পুরোই ভিতুর ডিম। কাউকে দেখলেই ওর কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়। প্রশ্নগুলো যন্ত্রণার পোকার ন্যায় সার্কেল হয়ে ঘুরতে লাগলো মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে! কম্পিত হাতে ফোন তুলে কল দিলো দ্যুতিকে কিন্তু সুইচড অফ বলছে! কান্না পায় বুশরার। বার কয়েক কল করলো একই কথা বলছে! ধূসর তাকে আদেও আনব্লক করেছে কিনা কে জানে! তবুও হোয়াটসঅ্যাপে গিয়ে কল দিতেই রিং হলো। চমকায় বুশরা। ধূসর তাকে আনব্লক করেছে! এই মুহূর্তে বুশরার কল পাবে ধূসরের জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত! পিক করলো।

“হ্যালো! হ্যালো! শুনতে পাচ্ছেন?”

নীরব রইলো ধূসর।

“হ্যালো শুনতে পাচ্ছেন?”

প্রতিত্তোর করলো না।

“আমার ভাইয়ের কী হয়েছিল? মানে কীভাবে কী?”

ধূসর নিরুত্তর। উৎকণ্ঠা দেখালো বুশরাকে।
__

মাথা তুলে মলিন মুখে নিশুর দিকে তাকায় ধ্রুব। দ্যুতির দিকে তাকিয়ে নিশু কাঁদছে। কিছু বলতে নিতেই হঠাৎ আযান হলো। থেমে গেল ধ্রুব। নিশুর হাত ধরে বিছানায় শোয়ার জন্য ইঙ্গিত করলো। একপলক তাকিয়ে নিশু শুয়ে পড়তেই ধ্রুব বসলো। মাথা রাখলো তার কোলে। দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো নিশু। ভ্যানিলা গাছটা থেকে দারুণ সুগন্ধি আসছে। বসে থাকা দায় হয়ে পড়েছে! এত তীব্র ঘ্রাণ! থাকে কীভাবে এরা বুঝে পায় না ধ্রুব। নিশুর সঙ্গে তার অনেক কথা বলার বাকি! অনেক কথা জানানোর,শোনানোর,শেয়ার করার বাকি! হ্যাঁ সে নিশুকে সব বলবে আর কোনো লুকোচুরি নয়! আনন্দের মধ্যেই হঠাৎ যেন কালবৈশাখীর ঝড় নেমে এসে সব লণ্ডভণ্ড করে দিলো। সে গুছিয়ে নিবে সব। মাথার চুলে আঙ্গুল ডুবালো। তপ্তজল পড়ছে টের পাচ্ছে ধ্রুব। হেলান দিয়ে চোখ বুজলো। আবেশে চোখ লেগে এলো নিশুর। যেন সে এমন একটা রাতের জন্য শতসহস্র দিন অপেক্ষা করেছিল।
_______

চলবে~