মুগ্ধতায় তুমি আমি পর্ব-০১

0
422

#মুগ্ধতায়_তুমি_আমি
লেখিকা: #ইয়ানূর_মাশিয়াত
#সূচনা_পর্ব

প্রেগন্যান্সি কীটটাতে এবারও একটা দাগ আসলো। সেটা দেখে রা’গে অন্তর আমাকে এক থা’প্পড় বসিয়ে দিলো। আমি ফ্লোরে ছিটকে পড়লাম। ঠোঁট কে’টে র’ক্ত বের হয়ে আসলো আমার। গালিগালাজ করতে করতে বললো, ‘তুই একটা অপ’য়া। তুই বন্ধ্যা। তুই জীবনেও আমাকে সন্তানের মুখ দেখাতে পারবি না। আমি তোকে তালাক দিবো। আজই আমার বাসা থেকে চলে যাবি তুই।’

ওর চিল্লাচিল্লি শুনে আমার শাশুড়ি আমাদের রুমে চলে আসলো। এসেই বললো, কি হয়েছে বাবা? এভাবে চিল্লাচিল্লি করছিস কেন? শরীর খারাপ করবে তো।

অন্তর তীব্র রা’গে গজগজ করতে করতে বললো, কি হবে আবার? ও একটা বন্ধ্যা মা। ও বাচ্চা জন্ম দিতে পারবে না। বিয়ের ছয় বছর হয়ে গেলো একটা বাচ্চা জন্ম দিতে পারলো না। ওকে নিয়ে ঘর করা যায় না মা।

আমি তাকে বললাম, বাচ্চা হচ্ছে না সেই দোষ আমাকে দিচ্ছেন কেন? সমস্যা তো আপনারও থাকতে পারে। আমার মা আমাকে ডাক্তার দেখিয়েছেন। ডাক্তার বলেছে আমার মা হওয়ার সম্পূর্ণ ক্ষমতা আছে। আপনি ডাক্তার দেখান। এরপর বোঝা যাবে দোষটা কার!

আমার কথা শুনে অন্তর এসে আমার চুলের মুঠি ধরে বললো, তোর মা তোকে ভুয়া ডাক্তার দেখিয়েছে, বুঝেছিস? ভালো ডাক্তার দেখালে তোর সমস্যা ঠিকই ধরা পড়তো। আমার কোন সমস্যা নাই বুঝলি? আমার দিকে ভুলেও আঙ্গুল তুলবি না। আর কখনো যদি তুলিস তাহলে তোর আঙ্গুল সহ এই মুখটা একদম ভে’ঙে ফেলবো আমি। কথাটা মনে থাকে যেন।

খুব শক্ত করে চুলে ধরার কারণে বেশ ব্য’থা পাচ্ছিলাম আমি। ওনাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললাম, আমি তো আঙ্গুল তুলি নি। শুধু আপনাকে ডাক্তার দেখাতে বলেছি। তাছাড়া এমনও তো হতে পারে আল্লাহ্ আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছেন। দেরি করে কি কারো বাচ্চা হয় না? আমাদের হয়তো দেরি করে দিবেন। একটু ধৈর্য ধরুন।

অন্তর দাঁতে দাঁত চেপে বললো, তোর মুখে তো কথার খই ফুটেছে। ধৈর্য ধরুন বলছিস ? এতো কথা কোথায় শিখেছিস তুই? তুই আমাকে এসব কথা বলার কে? তোর কথা শুনতে হবে এখন আমার? সাহস কোথায় পেলি তুই এসব বলার?

বলেই আমার চুলের মুঠি আরো শক্ত করে ধরলো অন্তর। আমি ব্য’থায় কুঁকড়ে উঠলাম। মুখ দিয়ে আহ্ শব্দ বেরিয়ে আসলো। অন্তর আমাকে সেভাবে ধরে রেখেই বললো, ‘তোর প্রমাণ লাগবে তাই না? দাঁড়া তোকে প্রমাণ আমি দেব। তোকে এবার এমন প্রমাণ দেবো তুই কল্পনাও করতে পারবি না। খুব তো বেড়েছিস তাই না ? পাখা গজিয়েছে তোর! তোর পাখা কে’টে ফেলার ব্যবস্থা করছি।’

বলে আমাকে ছেড়ে দিলো। এরপর বাসা থেকে বের হয়ে গেলো। আমি সেভাবেই বসে রইলাম। এতো কিছুর পরও আমার শাশুড়ি একটা কথাও বললেন না। বরং ছেলে যাওয়ার পর একটা মুখ ভেঙচি দিয়ে আমার ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়েই বসে রইলাম। এরপর আমি আস্তে আস্তে উঠে বাথরুমে গিয়ে চোখ মুখে পানি দিয়ে পরিষ্কার করে নিলাম। এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে নিলাম। বিছানায় বসে নিজের এলোমেলো হাওয়া জীবনটার পিছনের স্মৃতিগুলো স্মরণ করতে লাগলাম। অন্তরের সাথে বিয়ে হয়েছে আমার ছয় বছর হলো। আমাদের কোন সন্তান নেই। চেষ্টা করেছি বহুবার কিন্তু কাজ হয় নি। বিয়ের ছয় মাস যাওয়ার পর থেকেই অন্তর আর তার মা বাচ্চার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল। বার বার চেষ্টা করার পরও যখন আমি কনসিভ করতে পারছিলাম না তখন অন্তর আর তার মা আমাকেই দোষারোপ করতে থাকলো। তাদের ভাষ্যমতে আমার সমস্যা তাই বাচ্চা হচ্ছে না। আমি কখনো মা হতে পারবো না। এরপর আমি আমার মায়ের কাছে গিয়ে সবটা বলেছিলাম। মা আমাকে ডাক্তার দেখিয়ে ছিলেন। আমার কোন সমস্যা ধরা পড়ে নি। এরপর আমি অন্তরকেও ডাক্তার দেখাতে বলেছিলাম। সে ডাক্তার তো দেখায়ই নি বরং আমাকে গালমন্দ করেছে। আর আজ তো সে সীমাই অতিক্রম করে ফেলেছে।এসব ভাবতেই আমার চোখ থেকে নোনাজল বইতে শুরু করলো। আমি চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পড়েই আমার শাশুড়ি আমার রুমে আসলো। এসেই উনি বললেন, ‘ন্যাকা যত্তসব। এতো ঢং করছো কেন বলো তো? একে তো বাচ্চা হয় না তারউপর যা তা বললে আমার ছেলেকে। তোমাকে যে আমার ছেলে এখনো ঘরে রেখেছে এইতো ঢের বেশি। তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে আসো। রান্নাবান্না করতে হবে। অন্তর এসে খাওয়া দাওয়া করবে না?’

বলেই উনি চলে গেলেন। আমি চোখ মুখ মুছে নিলাম। মন চাচ্ছে এই সংসার ছেড়ে এই মুহূর্তে বেরিয়ে যাই কিন্তু নিয়তি আমার বড্ড নি’ষ্ঠুর। ছোট থাকতেই বাবা মা’রা গেছে। মাই আমাকে একা বড় করেছে। মা আমার জন্য কত কষ্ট করেছে তা তো নিজের চোখেই দেখছি। এরপর অন্তরের সাথে বিয়ে দিয়েছে। অন্তর ভালো ছেলে। ভালো একটা চাকরি করে তাই বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কে জানতো ভিতরে ভিতরে মানুষটা এমন? এমন পরিস্থিতি হবে জানলে মা কখনো আমায় বিয়ে দিতো না। এখন না পারছি আর সহ্য করতে না পারছি ছেড়ে দিতে। গলার কাঁ’টা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। এখন ফিরে গিয়ে আবার মায়ের টেনশন বাড়াতে আমি একদম চাচ্ছিলাম না। ভাগ্যে এমন দুরবস্থা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এবার রুম থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলাম। শাশুড়ি গিয়ে নিজের রুমে শুয়েছে। আমি একার হাতেই রান্না করি সবসময়। সে ধারেকাছেও আসে না। ছয় বছর ধরে এমনই চলে। আমি যেন তাদের কাজের বুয়া। আজও রান্না বান্না করে সব গুছিয়ে গোসল সেরে নিলাম। দুপুর হয়ে গেছে। শাশুড়ির জন্য খাবার বেড়ে তাকে ডাকলাম। এরপর অন্তরকে ফোন করলাম তার ফোন বন্ধ। শাশুড়ি খেতে বসে বললেন, ছেলেটা আমার কোথায় গিয়েছে খবর কিছু রেখেছো নাকি? ছেলের আয়ের টাকা তো শুধু গিলতেই পারো। তার খেয়াল তো আর রাখতে পারো না। ও কোন সকাল বেলা বেরিয়েছে। এখনো ফিরছে না সেই খেয়াল আছে তোমার? ফোন করেছো?

আমি ছোট আওয়াজে বললাম, কল করেছি। ফোন বন্ধ।

শাশুড়ি বললেন, বন্ধ তো থাকবেই। যা কথা শুনিয়েছো তুমি ওকে। আচ্ছা তোমার এমন মুখ আসলো কোথা থেকে বলোতো? তোমার মা গতবার এগুলো শিখিয়ে পাঠিয়েছে তাই না? নাহলে ওমন ভাবে তো কথা বলতে না কখনো তুমি। ছেলেটাকে একদম রাগিয়ে দিয়েছো। আল্লাহ্ জানে আজ বাড়ি ফিরে কিনা!

শাশুড়ির কথায় কিছু বললাম না। জবাব দিলে কথা বাড়বে ঝ’গড়া হবে। তাই চুপ করে রইলাম। সে খাওয়া শুরু করলো। আমি রান্না ঘরে গেলাম ডালের বাটিটা আনতে। ওই সময়েই কলিংবেল বেজে উঠল। আমার শাশুড়ি চেঁচিয়ে বললেন, ‘কলিং বাজছে দরজাটা খুলবে তো নাকি? কোথায় গেলে? মৌ!

আমি ডালের বাতি হাতে করেই দরজা খুলতে গেলাম। দরজা খুলতেই আমার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। অন্তর বরের বেশে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সাথেই বধূ বেশে একটা মেয়ে!

অন্তর আমাকে দেখে বললো, তোর না প্রমাণ লাগবে? এই দেখ বিয়ে করে এনেছি। তোকে এক মাসের মধ্যে প্রমাণ দিচ্ছি আমি। ওয়েট এন্ড ওয়াচ। মিট আমি নিউ ওয়াইফ ফিজা।

ওনার কথা শুনে আমার হাত থেকে ডালের বাটিটা পড়ে গেলো। গরম ডাল ছিটকে পড়ল আমার পায়ের উপর। ওদের পায়ের কাছেও পড়লো কিছুটা। অন্তর নতুন বউকে নিয়ে দূরে ছিটকে গেল। আমি সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম। পায়ে যে গরম ডাল পড়েছে তার কোন অনুভূতিই হচ্ছে না। নিজেকে অনুভূতি শূন্য মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে!

চলবে…