#সূচনা_পর্ব
#মৃগাঙ্ক
#তোনিমা_খান
•অলস ভঙ্গিতে হাঁটতে থাকা পা জোড়া হঠাৎ করেই সতর্ক ভঙ্গিতে পা ফেলতে লাগলো।ফুল গ্রেন লেদারের আর্মি বুট জোড়ার কারনে এতোক্ষন হাঁটার তালে ঠক ঠক শব্দ হলেও এখন একদমই শব্দহীন পা ফেলছে। বসন্ত কালের হিম করা সকালের পরিবেশ। হালকা শীতল বাতাস গায়ে শিরশির জাগাচ্ছে। প্রভাতের সোনালী আভা এখনো ছড়ায়নি ধরনীতে। শুধুমাত্র তমসায় আচ্ছাদিত সামিয়ানা সরে হালকা হালকা আলো ফুটেছে। সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বান্দরবান সেনানিবাসের সৈন্যদের রান ওয়ের পাশে থাকা চা বাগান থেকে নুপুরের রিনিঝিনি শব্দ পাওয়া যচ্ছে।মাঝেমধ্যে বাচ্চাদের খিলখিলিয়ে হাসির শব্দ ও শোনা যাচ্ছে। নিষিদ্ধ জায়গায় এমন অপ্রত্যাশিত শব্দ শুনতে পাওয়ায় যুবকটি সচকিত হলো। পড়নে তার খাকি পোশাক। সাথেই সেই শব্দ অনুসরন করে শব্দহীন পায়ে এগিয়ে চলেছে সে। দুহাতের তালুতে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা ধাতব অস্ত্রটি সামনের দিকে তাক করা।
“হেই স্টপ দেয়ার আদার ওয়াইজ আই উইল শ্যুট ইউ।” ,যুবকটির গমগমে কন্ঠে চা বাগানের ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি তটস্থ হলো। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে একহাত উপরে তুললো।
মেয়েটি ভয়ার্ত দৃষ্টিতে একবার যুবকটি আরেকবার নিজের আশেপাশে তাকাচ্ছে। কেননা ইতিমধ্যেই বাচ্চাদের আওয়াজ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। মেয়েটি যেনো এতে আরো অসহায় বোধ করলো।
যুবকটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়েটিকে পরখ করছে।রঙচটা নজরকাড়া তাঁতের পোশাকে আবৃত ছিমছাম গড়নের দেহটা। গোড়ালির উপর পর্যন্ত পোশাক পায়ে জমকালো এন্টিকের নুপুর। সাথে দেহেও বাহারি এন্টিকের অলংকার মাথায় গোল করে কাপড় পেঁচিয়ে রাখা তার উপরেও অলংকার। থুতনিতে চোখের দুই কোনাতে কালো তিনটা সুতরাং এর মতো চিহ্ন আঁকা। দুহাতে হাতে তার আঁকড়ে ধরা একটা ছোটখাটো সাদা রঙের ছাগল।একটু আউট নলেজ কাজে লাগালে মস্তিষ্কে উপজাতি ব্যাতীত অন্য কোন শব্দই আসছে না।তাই যুবকটি নির্দিধায় মেয়েটিকে উপজাতি হিসেবে ধরে নিলো। নয়তো কোন বাঙালি এই কাক ডাকা ভোরে সঙ সেজে বসে থাকবে না।
“কে আপনি? এখানে কি করছেন?”
যুবকটি এক পা দু’পা এগোতে এগোতে বললো।মেয়েটি ভ্রু কুঁচকে যুবকটির পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলাচ্ছে। যুবকটির চলনের ধরন দেখে তার মুখ বিকৃত হয়ে গেলো। যেনো কোন সিরিয়াস মিশনে রনক্ষেত্রে রয়েছে যুবকটি ভাবসাব একদমই তেমন।
মেয়েটি একহাত উপরে রেখেই মুখ খুললো,“সরকার ওটা আপনাকে আত্মরক্ষা ও দেশ রক্ষার জন্য ব্যাবহার করতে দিয়েছে। নিরপরাধ মানুষদেরকে ভয় দেখানোর জন্য নয়।”
যুবকটির মুখে শ্লেষাত্মক হাসি ফুটে উঠলো।আরেকটু এগিয়ে গমগমে সুরে বললো,,
“ক্রিমিনালরা কখনোই নিজেদের অপরাধী বলে দাবি করে না। দুনিয়ার সবচেয়ে নিরপরাধ নিষ্পাপ মানুষ হয় তারা। আপনার বক্তব্যের সারাংশটাও কি আমি তেমনই কিছু ভেবে নেবো?”
“নিজের বুদ্ধিদীপ্ততা ও সাহসীকতা সঠিক জায়গায় ব্যাবহার করুন। আমরা এখানে ফুল তুলতে এসেছি কোন ক্রাইম করার জন্য নয়। অযথা যোদ্ধাদের ন্যায় আচরন করে নিজেকে বোকা প্রমান করবেন না।”,,মেয়েটি কঠোর গলায় বললো। কিন্তু লাভ হলো কি কোন? না হলোনা বরং খট করে আওয়াজ হলো। যুবকটি ব’ন্দু’ক লোড করেছে তার শব্দ। বিরক্তিতে মুখ থেকে ‘চ’ বর্গীয় শব্দ বেরিয়ে গেলো মেয়েটির।
যুবকটি একদম তার সন্নিকটে বন্দুকটা তার কপাল থেকে এক হাত দূরে অবস্থান করছে। মেয়েটি সরাসরি এবার যুবকটি চোখে চোখ রাখলো।যুবকটির ঠোঁট খানিক বেঁকে গেলো।
“সেনানিবাসের এই জায়গাটায় বহিরাগত কেউ প্রবেশ করলে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হয়।এই কথাটি আপনি কখনো শোনেননি? তাহলে আমি কিভাবে বিশ্বাস করবো আপনি কোন অপকর্ম করতে এখানে আসেননি?”
মেয়েটি তখনো তার চোখের দিকে তাকিয়ে চোখে মুখে তার বিরক্তি ভাব স্পষ্ট।
“এখন আমায় নিজেকে নির্দোষ প্রমান করতে কি করতে হবে?”
“সেটা তো আপনার চিন্তা আমার নয়। পাঁচ মিনিট সময় এর মধ্যে নিজের সত্যতা প্রমান না করতে পারলে আই উইল শ্যুট ইউ।”,,যুবকটির কন্ঠে রুঢ়তা। মেয়েটি ডানে বামে মাথা নাড়লো।জাগিয়ে রাখা হাতটা নামিয়ে যুবকটির কোমড়ের দিকে ইশারা করে বললো,,
“আপনার ওয়াকিটকিটা একটু ব্যাবহার করতে পারি?”
যুবকটি ভ্রু কুঞ্চিত করে তার দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকালো।
“খালি হাতে আমি কিভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমান করবো?”,,মেয়েটি বললো।
“বহিরাগত কেউ ওয়াকিটকি ব্যাবহার করতে পারবে না। এর কোড নাম্বার কেউ জানেনা।”,যুবকটি বললো।
“ঠিক আছে নিন শ্যুট করুন।”,,মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো। যুবকটি এবার দ্বিধায় পড়লো।মেয়েটিকে তার আক্রমণাত্মক কেউ মনে হচ্ছে না।তবুও সতর্কতা তো তাদের শিরায় শিরায় মিশে আছে তাই একদম ছেড়ে দিতেও পারছে না। আবার নিরপরাধ কাউকে সে কখনোই আঘাত করবে না। কিন্তু প্রমান ব্যাতীত সে ছেড়েও দেবে না। তাই দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে ওয়াকিটকিটা বের করে মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিলো। দেখার পালা সেটা দিয়ে কি করে! যুবকটি ওয়াকিটকি বাড়িয়ে দিতেই মেয়েটি নাকের পাটা ফুলিয়ে আড়চোখে তাকাতে তাকাতে এক প্রকার ছিনিয়ে নিয়ে নিল ওয়াকিটকিটি।
“হ্যালো! হ্যালো! কান্ট্রোল রুম 3 2*****। আমাকে কি শোনা যাচ্ছে?”,,যুবকটি খানিক অবাকপানে দেখছে মেয়েটিকে। তাদের অভ্যন্তরীন কোড নাম্বার মেয়েটি কিভাবে জানে? ওপাশ থেকে সংকেত পেতেই মেয়েটি কারো কাছে রেগে কিছু বললো।
“ইজ ইট সিয়াশা? ওহ্, আম সরি সিয়া। আজকে আমি ডিউটিরত নেই। মে বি ইউ আর ইন ডেঞ্জার।”,,মেজর ওয়ালিউল্লাহ’র ব্যাতিব্যাস্ত কন্ঠস্বর।
“ইয়েস আই এম। আপনার থেকে এতোটা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা আশা করিনি মেজর। বিগত দশ মিনিট যাবৎ আমাকে জবাবদিহিতা করতে হচ্ছে।প্লিজ, লেট মি গো।”,,মেয়েটি কপাল কুঁচকে বললো। যুবকটি এখনো বোঝার চেষ্টা করছে কি হচ্ছে।
“আম রিয়েলি ভেরি সরি সিয়া। গতকাল নতুন মেজর জয়েন করেছে আজ সেই ভিজিটে থাকবে কিন্তু এখনো তো ছয়টা বাজে নি। ওকে আমি দেখছি বিষয়টা জাস্ট টু মিনিট।”
দুই মিনিটের মাঝেই সব পরিষ্কার হয়ে গেলো।মেয়েটি এখানে ঢোকার জন্য অনুমতি প্রাপ্ত। এটা আগে বললেই হতো এতো আর্গুমেন্টে যাওয়ার প্রয়োজন ছিলো না। সবটা পরিষ্কার হতেই যুবকটি কোনরুপ প্রতিক্রিয়া ছাড়া গটগট পায়ে সেখান থেকে চলে গেলো। সে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বেরিয়েছিল পাহাড়ি এলাকার বসন্তের সকালের পরিবেশটা উপভোগ করতে।
যুবকটি যেতেই চা বাগানের ভেতর থেকে ছয়টা বাচ্চার মাথা জেগে উঠলো চোখে মুখে তাদের এখনো ভয়ের দেখা মিলছে। চার জন ছেলে ও দুইজন মেয়ে প্রত্যেকের বয়স সাত আট এর মধ্যে।মেয়েটি রাগি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সেদিকে।বিপদের মুখে তাকে কিভাবে একা ফেলে গিয়েছিলো। বাচ্চাগুলো কাঁদো কাঁদো চেহারায় কান ধরে বাইরে বেরিয়ে আসলো।
“সরি সিয়া, তুমি তো দেখেছো আয়রন ম্যান কি রাগ করে ছিলো আমাদের উপর।আমরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”,একটি বাচ্চা কান ধরা অবস্থায় কৈফিয়তের সুরে বললো।
সিয়া নাকের পাটা ফুলালো। আসলেই আয়রন ম্যান!কি কঠোর মুখাভঙ্গিতে তার সাথে কথা বললো। যেনো সে কোন দুস্কৃতিকারী! দেখে নিবে সে এই উটকো মেজরকে। নিজের ভাবনাকে পাশ কাটিয়ে বাচ্চাগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করলো সে। দাঁত কিড়মিড় করে বললো,
“তোমরা এক একটা মীরজাফরের বংশধর।”
“হোয়াট ইজ মীরজাফর,সিয়া?”,,তন্মধ্যে একটা সাত বছরের বাচ্চা কৌতুহলী কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল। সিয়াশা যেনো এবার রাগে ফেটে পড়লো।কাকে কটু বললো সে! কটু কথা বললে যদি কটু কথার মানেই না বোঝে তবে এই কটু কথা বলে কি লাভ হলো! তার তো কোন সম্মান’ই রইলো না।
রাগে গজগজ করতে করতে সিয়াশা চা বাগান পেরিয়ে লাগোয়া ছোট পাহাড়টি বেয়ে উপড়ে চলে গেলো। বাচ্চাগুলো ও তার পিছন পিছন ছুটলো প্রত্যেকের হাতে বেতের ছোট ঝুড়ি।
বিশাল এড়িয়া নিয়ে বান্দরবান সেনানিবাস। এর ভেতরে এই চা বাগান ঘেঁষে ছোট পাহাড়টির চূড়ায় বসন্ত কালে ডেইজি ফুল ফোটে। এগ্রেসিভলি ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পাহাড় জুড়ে। একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলেও সত্যি। সিয়াশা শুনেছে কোন এক সৈন্য বিদেশে মিশনে গিয়েছিলো সেখান থেকে এর বীজ এনেছিলো। সেই থেকে প্রতিটা বছর বসন্ত কালে এখানে ডেইজি ফুল ফোটে।পাহাড়ি এলাকা হীম পরিবেশে সাথে সরাসরি সূর্যের কিরনে কোন যত্ন ছাড়াই এটি ছোট পাহাড়টিকে সাদা হলুদের সংমিশ্রনে রাঙিয়ে তুলেছে। ডেইজি ফুল সিয়াশার পছন্দের তালিকায় উর্ধ্বে থাকায় সে প্রতিদিন সকালে এগুলো তুলে নিয়ে ঘরে সাজিয়ে রাখে।
বান্দরবান সেনানিবাসের চারিপাশ কমান্ডের ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই। ঘড়িতে সকাল ছয়টা এক মিনিট অথচ বিশাল প্রাঙ্গনে সৈনিকরা এতোটা সুশৃঙ্খল ভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেনো তারা বিগত আধাঘণ্টা ধরে এখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো। এতোটাই সুনিপুণ সুশৃঙ্খল,দক্ষ ভাবে সিনা চওড়া করে বীরের ন্যায় তারা দাঁড়ানো। বহিরাগত যে কেউ তাদের শৃঙ্খলা,কঠোরতা দেখলে হয়তো বিমুগ্ধ তাকিয়ে থাকবে।
ঢাকার প্রধান সেনানিবাসে কর্মরত মেজর দর্পন এহসান গতকাল’ই বদলি হয়ে বান্দরবান সেনানিবাসে এসেছে।
আজকে সেনানিবাসের সকল কিছু সে পরিদর্শন করবে। শুরুটা হয় সৈনিকদের দৈনন্দিন শারীরিক চর্চা দিয়ে ও প্রত্যাহিক অনুশীলন দিয়ে। পরিদর্শন কালেই দর্পন একবার বেখেয়ালি মনে অদূরে সমতল ঘেঁষা পাহাড়টির দিকে তাকালো যেখানে একটা ছাগলের পেছনে ছুটছে বাচ্চারা। তাদের মাঝে লাল রঙা পোশাকে একটি মেয়ে হাসতে হাসতে মাঝেমধ্যেই হেলেদুলে পড়ছে। কোমড়ে তার ফুল ভরতি ঝুড়ি ঠেকানো একহাতে ধরে আছে সে।নিয়ম শৃঙ্খলের ধ্বনিতে,কাঠিন্যতায় মুখোরিত পরিবেশটাতে এই দৃশ্যটিকে সুন্দর দৃশ্য বলে আ্যখ্যায়িত করলে খুব একটা অপরাধ হবে না। তবে মনে অযাচিত কৌতুহল একটা থেকেই যায় মেয়েটি কে? সেনানিবাসের মধ্যে এমন অবাধে চলাফেরা করার অনুমতি বা তার কাছে কেনো?অযাচিত কৌতুহলকেও দমাতে পারলো না দর্পন। গম্ভীর মুখে কাঠখোট্টা গলায় তার পাশে দাঁড়ানো এক সৈন্যকে জিজ্ঞাসা করলো মেয়েটি কে? সৈনিকটি পেশাগত স্ট্রেটকাট গলায় বললো,,
“ম্যামের নাম সিয়াশা চৌধুরী। অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আশফাক আহমেদের নাতনি। অবসরপ্রাপ্ত মেজর সাইফ চৌধুরীর মেয়ে।”
দর্পন মৃদু চমকালো মেয়েটির পরিচয়ে।পরমুহূর্তেই আবার নিজের কাঠখোট্টা স্বভাবে ফিরে আসলো।সে জেনারেল আশফাক আহমেদের আন্ডারে কাজ করেছে মেজর সাইফের সাহসিকতা ও প্রশংসাও সে কম শোনেনি যখন থেকে সে এই পেশায় রয়েছে। সাহসীকতা, বুদ্ধিদীপ্ততা ও দায়িত্বপরায়নতায় সকল সেনানিবাসেই এই নাম দুটি চিরপরিচিত। মেজর সাইফ কোন এক অজানা কারনে ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্টে চাকরি থেকে অবসর নেয়।
“উপজাতি?” দর্পন আবার জিজ্ঞেস করলো।
“নো স্যার,পিওর বেঙ্গলি। সি লাইকস টু ক্যারি ডিফারেন্ট কালচারস। যখন যেটা ইচ্ছা হয় তখন সেটাই করে। খুব আমোদপ্রমোদ প্রিয়।”
“তাই বলে ছাগল, বাচ্চা এদের নিয়ে চা বাগানে কি করছে? এখানকার কতৃপক্ষ এটা মেনে কিভাবে নিচ্ছে। এগুলো তো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।”,,দর্পনের কথায় দৃষ্টিকটু ভাব স্পষ্ট।
“ছাগলটিকে পেছনের মাঠে চড়িয়ে দেয়া হবে স্যার।আশা ফাউন্ডেশনে নতুন একটি বাচ্চা এসেছে। সেই বাচ্চাটার আকিকা করানোর জন্য ছাগলটি আনা হয়েছে। আর বাচ্চাগুলো ও ঐ আশ্রমের’ই।সেনানিবাসের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে এমন কোন কাজ ম্যাম করে না।”,সৈনিকটি বললো।এর পরিপ্রেক্ষিতে দর্পন আর কিছু বলার মতো পেলো না। আশা ফাউন্ডেশন একটি অনাথ আশ্রম যার প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল আশফাক আহমেদ। যার সামনে তারা সকলে শ্রদ্ধাবনত।
*****
কাঁচের ফুলদানিটির ভেতরে টলতে থাকা শুকনো মড়মড়ে ফুলগুলো সরিয়ে উগ্র চিত্তে সাদা ফুলগুলো রেখে স্বশব্দে নারীটি ফুলদানিটা টেবিলে রাখলো। বসার ঘরের সোফায় মুখোমুখি বসে থাকা দুই বৃদ্ধা কেঁপে উঠলো সেই শব্দে। দুজনেই সংবাদ পত্রের দ্বারা মুখ আড়াল করে বসে আছে। মাঝেমধ্যে আবার সংবাদ পত্রের অড়ালে উঁকি দিয়ে দেখছে নারীটির রাগন্বিত কর্মকাণ্ড।
তবে যেই না গরম হয়ে থাকা চোখে চোখ পড়ে সাথে সাথে আবার মুখ লুকায় সংবাদ পত্রের আড়ালে।
“শুধু হাতে পায়ে বড় হয়েছে। এছাড়া আর কোন বুদ্ধি নেই। পারে শুধু আমাকে জ্বালাতে। এতো বয়স হয়েছে তবুও একটা বিয়ে করতে পারছে না কেউ। তাদের কি! তাদের তো কিছু না যতোসব কষ্ট তো আমার হয়। সকাল সকাল ঘুম বাদ দিয়ে তাদের জন্য পছন্দনীয় হেলদি ফুড রান্না করো। ঘর গুছাও। সময় মতো ওষুধ খাইয়ে দাও। তাদের শরীরের খেয়ালটাও আমাকে রাখতে হয়। তার উপর হাসপাতালে যাও রোগিদের চিকিৎসা করো।আমার তো কোন জীবন না। আবার বাহিরে গেলে কৈফিয়ত দাও।”,,বলতে বলতেই ঠাস করে খাবার টেবিলে পানির জগটা রাখলো নারীটি। ফের বৃদ্ধা দুজন জড়োসড়ো হয়ে বসলো মুখে তাদের কুলুপ এঁটে আছে। এই মুহূর্তে কথা বলা মানে রনক্ষেত্রে ঝাঁপ দেওয়া। তাই চুপ করে বসাই শ্রেয়। তাদের মাঝে আরো একটি মেয়ে যে কিনা বসার ঘরের এক কোনায় সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝাড়ু হাতে।যেনো নড়লেই বিস্ফোরন ঘটবে।
“এখন তো কারো মুখে কোন কথা নেই। তারা একদম ভদ্র কিছু বোঝে না। আমারো একটা জীবন। আমারো ঘুরতে ইচ্ছা করে। সারাদিন তোমাদের মতো এই বুড়োদের পেছনে সময় দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। নয় নিজেদের জীবন গুছিয়ে নাও নয় আমাকে আমার জীবন গুছিয়ে নিতে দাও।”,,নারীটি বৃদ্ধাদের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো।
মুখ লুকিয়ে থাকা ব্যাক্তিদের মধ্যে এক মাঝবয়সী লোক সংবাদ পত্রের থেকে হালকা মুখ বের করলো। ইশারায় দরজার কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে কাছে ডাকলো। মেয়েটি কচ্ছপের গতিতে হেঁটে তার কাছে আসলো। লোকটি ফিসফিস করে বললো,,
“এই মিনি কি হয়েছে এতো ক্ষেপে আছে কেনো?আজকে তো নাস্তাটাও আমারা বানিয়ে রেখেছি।তাহলে? ক্ষেপার কথা তো আমার সকাল সকাল না বলে কোথায় বেরিয়ে গিয়েছিলো?”
“জানিনা, কিন্তু আফায় আইজগো অনেক চেতছে আফনেগো খবর আছে।”,মেয়েটি ও ফিসফিস করে বললো। মেয়েটি এই বাড়ির কাজের লোক।
“এই তুই আবারো অশুদ্ধ ভাষায় কথা বলছিস মিনি? তোকে আমি স্কুলে পাঠাই কি এভাবে কথা বলার জন্য?”,সাইফ চৌধুরী চোখ রাঙিয়ে বললো।মেয়েটি সাথে সাথে কান ধরে মাফ চাইলো। এর মধ্যেই আবারো ঠাস করে শব্দ হলো। সাইফ চৌধুরী তাড়াতাড়ি আবারো মুখ লুকালো সংবাদ পত্রের পেছনে।
“এগুলো কি? কি রান্না করেছো? এগুলো মুখে তোলা যায়? এতো লবন কেনো? রুটি এরকম পোড়া কেনো? আর রান্নাঘরের এই কি অবস্থা করেছো দুজনে? এটা রান্নাঘর নাকি আঁস্তাকুড়?”,,সিয়াশা রাগন্বিত গলায় বললো। আশফাক আহমেদ এবার সংবাদ পত্র থেকে মুখ বের করলো বোকা বোকা হেসে বললো,,
“হয়েছে কি গিন্নি আমারা পরিষ্কার করতেই গিয়েছিলাম কিন্তু তার আগেই তুমি এসে পড়েছো।তাই বলে এতো রাগ করে না। সকাল সকাল এতো রাগ করতে নেই।”
“রাগ করবো না বলছো? কি করেছো তোমরা আমার চুলে এতো তেল কেনো? আমি হাসপাতালে যাবো কিভাবে এই মাথা নিয়ে? রাতে ঘুমাও না কেনো তোমরা? শরীর খারাপ হলে তো সেই আমাকেই দেখতে হবে।”,,সিয়াশা দক্ষ হাতে ছুড়ি চালাতে চালাতে বললো। সে সবজি কাটছে বসার ঘরের সাথে লাগোয়া রান্নাঘরে বসে।
“চুল গুলো রুক্ষ শুষ্ক হয়ে গিয়েছিলো তাই তো তেল দিয়ে দিয়েছি। ঐরকম রুক্ষ চুল নিয়ে তুমি হাসপাতালে যেতে কি করে?”,,সাইফ চৌধুরী মিনমিন করে বললো।
“এখন এই তেলতেলে চুল নিয়ে আমি হাসপাতালে কিভাবে যাবো?”,,সিয়াশা উচ্চস্বরে বললো। সাইফ আর কোন কথা বললো না। কথা বললেই আরো ক্ষেপে যাবে। সিয়াশাও রাগে গজগজ করতে করতে বাঁধাকপি, গাজর, শসা, ক্যাপসিকাম কুচি কুচি করে কেটে তাতে মেয়োনিজ আর গোলমরিচ মিশিয়ে দিয়ে সালাদ বানিয়ে ফেললো। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হওয়ায় তার বাবা আর নানাভাই খাবারের ব্যাপারে খুবই সচেতন। সাথে প্রত্যেকের পছন্দসই খাবার বানিয়ে ফেললো।
দশটা বাজতেই সিয়াশা তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বের হলো তৈরি হয়ে হাসপাতালে যাবে। বান্দরবান সদরের স্বনামধন্য হাসপাতালে সে ইন্টার্নি করছে।আর দুই মাস বাকি তার পরেই একজন ডাক্তার হিসেবে পরিচিতি পাবে। রাগের প্রকোপ কমেছে বুঝতে পেরে সাইফ ধীরে ধীরে মেয়ের দিকে এগিয়ে গেলো।
“নাস্তাটা করে যাও, বাচ্চা”,,সাইফ মুখ ছোট করে বললো। ভেবছিলো মেয়ের রাগ কমেছে কিন্তু না মেয়েটা আবারো খেকিয়ে উঠলো,,
“খাবোনা আমি। ক্যান্টিনে খেয়ে নেবো।”জুতো পড়তে পড়তে বললো সে।
“এই যে বুড়ো শোন,আজ যদি কলিগদের সাথে আড্ডা দিয়ে চা খেয়েছো, তো তোমায় আমি দেখে নেবো। সারারাত বসে বসে আমি তোমার বোরিং প্রেমকাহিনী শুনতে পারবো না। আমার ঘুম নষ্ট করে। টু ইয়ার’স অফ রিলেশনশিপ এন্ড নো কিসেস! এইট ইয়ার’স অফ ম্যারেজ লাইফ অনলি ওয়ান কিড! ও মাই গড! হাউ বোরিং!”,
সিয়াশা হতাশা মিশ্রিত কন্ঠে আবারো বললো বাবাকে।
“সব যোগ্যতা সবার থাকে না বুঝলে গিন্নি।”,,আশফাক আহমেদ বিদ্রুপ করে বললেন।সাইফ ঠোঁটে ঠোঁট চাপলো মেয়ে আর শশুরের কথায়। সকলে পেয়েছে কি তাকে? গটগট পায়ে হেঁটে নিজের ঘরে নির্দিষ্ট ফটোফ্রেমের সামনে চলে গেলো। হাস্যজ্জল মুখে এক নারী তাকিয়ে আছে সেথায়।
“দেখলে আশা তোমার মেয়ে আর তোমার বাবা কিভাবে ছোট করছে আমায়? আমি নাকি দু বছরে তোমায় একটা চুমু ও খাইনি। তুমি বলো আমি যে তোমায় কথায় কথায় চুমু খেতাম এই কথাটা কি আমি আমার মেয়ে আর শশুরের সামনে বলতে পারি? আমি তো এগুলো উহ্য রেখে আমাদের কাহিনী শোনাই। এগুলো বলতে আমার কি একটুও লজ্জা করে না বলো? তুমি তো জানো আমি কতো লাজুক।”,,সাইফ বিচারের সুরে বললো স্ত্রীর ফটোফ্রেমের সামনে দাঁড়িয়ে। স্ত্রীর থেকে কোন আস্কারা পেলো না সাইফ। পাবে কি করে? সে তো অযৌক্তিক কথা বলেছে কথায় কথায় চুমু খাওয়া লোক লাজুক হয় কি করে! তাই তো স্ত্রী কোন পাত্তা দেয় নি তাকে। আবারো শুকনো মুখে ড্রইং রুমে চলে আসলো। নানা নাতনি তর্ক করছে।
সিয়াশা নানাভাইকেও ছাড়লো না সে নানাভাইয়ের উপরেও তেতে উঠলো,“তুমি কি করেছো?বিশ বছরের বিবাহিত জীবনে মাত্র দুটো সন্তান?”
আশফাক আহমেদ তীব্র প্রতিবাদ জানালো নাতনির কথায়,
“এটা কিন্তু তুমি ঠিক বললে না গিন্নি। একজন ডাক্তারের কাছ থেকে এটা আমি আশা করিনি।তুমি কি জানো না আমাদের দেশের স্লোগান “মেয়ে হোক বা ছেলে দুটি সন্তানই যথেষ্ঠ” আমরা সরকারি কর্মকর্তা হয়ে এগুলোর অমান্য করলে সাধারন জনগন কি করবে?”
“ওহ্, আচ্ছা! তো কোথায় তোমার দুটি সন্তান? সেই তো মাথা খাচ্ছো আমার।যতো চিন্তা সব আমার মাথায়। দুই বুড়োর দেখাশোনা তো আমায় করতে হয়।তুমি এসেছো স্লোগান শুনাতে আমাকে। ঠিক কয়টা আদেশ মেনেছো সরকারের?”,,সহসা আশফাক সাহেব চুপসে গেলো।
“এতো রেগে আছো কেনো, গিন্নি?”,,আশফাক সাহেব কথা ঘুরিয়ে বললো।
“রেগে থাকবো না? এইখানে আমার কপাল বরাবর বন্দুক ঠেকিয়ে ধরেছিলো ঐ উটকো মেজর। ভয়ে আমার হাঁটু কেঁপেছিলো তবুও আমি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তোমাদের কথা খুব মনে পড়েছিলো তখন। দেখেছো? অমন সাংঘাতিক সময়েও আমার তোমাদের কথা মনে পড়েছিলো।কি পরিমানে বিরক্ত করো তোমরা আমাকে! মৃত্যুর আগেও তোমাদের কথা আমার মনে পড়ে।”,,নিজের কপাল দেখিয়ে বললো সিয়াশা।সাইফ আশফাক আত’ঙ্কিত হয়ে গেলো সিয়াশার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়েছে কে? তবে প্রকাশ করলো না। সিয়াশার সামনে তারা বরাবরই ভদ্রলোক।
“ওটা বিরক্ত হবে না গিন্নি ওটা ভালোবাসা হবে।তুমি আমাদের অনেক ভালোবাসো তাই ঐ মুহুর্তে ও তোমার আমাদের কথা মনে পড়েছে।”,,আশফাক সাহেব হাসিমুখে বললো।সিয়াশা এই কথায় ও রেগে গেলো সে মোটেই ভালোবাসে না এই বুড়োদের। সকাল থেকেই তার মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। রেগে ধপাধপ পায়ে বেরিয়ে গেলো।
“গাড়ি নিয়ে যাও গিন্নি”,,আশফাক সাহেব চেঁচিয়ে বললো।
“না নেবোনা। আমি বাসে করে যাবো।”,,সিয়াশাও চেঁচিয়ে বললো। আশফাক দীর্ঘশ্বাস ফেললো এমন রাগের সম্মুখিন তারা প্রায় প্রায়ই হয়। তাদের গিন্নি কিনা! পেছনে ফিরতেই দেখা মিললো সাইফের যে কিনা নাক মুখ কুঁচকে কিছু খাচ্ছে।
“সালাদে একটুও লবন হয়নি মিনি তাড়াতাড়ি লবন মিশিয়ে দে।”,,সাইফ চৌধুরী বললো কাজের মেয়ে মিনির উদ্দেশ্যে।
“আমার গিন্নি বানিয়েছে ওটা যেরকম বানিয়েছে সেরকম খেতে হবে। কেউ কখনো খারাপ বলতে পারবে না। খেতে ইচ্ছে হলে খাবে নয়তো না খেয়ে থাকুক।”,,আশফাক সাহেব খাবার টেবিলে বসতে বসতে বললো। সাইফের কপাল কুঁচকে গেলো। একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সিনিয়র জুনিয়র হোক, শশুর জামাই হোক কিংবা একই ঘরে বসবাসরত পরিবারের অংশ হোক না কেনো দুজনের সম্পর্কের ভিত্তি কিছুটা নড়বড়ে। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। পায়ে পায়ে ঝগড়া বাঁধে দুজনের। যদিও এর পেছনে যুৎসই কারন রয়েছে।
চলবে…