#মৃগাঙ্ক
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ২
জেনারেল আশফাক আহমেদের দুই সন্তান।এক ছেলে আশরাফ আহমেদ যে পড়াশোনা শেষ করে বিদেশে কর্মরত আর এক মেয়ে আশা আহমেদ।আশফাক আহমেদের স্ত্রী মারা যায় আশা আহমেদের পনেরো বছর বয়সে তখন আশরাফ মাত্র তিন বছরের বাচ্চা ছিলো।সেই থেকেই দুই ভাই বোন বাবার কাছে বড় হয়।সাইফ ঢাকাতে বেড়ে উঠেছে।আশফাক আহমেদ তখন জেনারেল পদে ছিলেন ঢাকা সেনানিবাসের।সাইফ তখন সবেমাত্র ক্যারিয়ারের সোপান গড়ছিলো মেজর পদে আরোহন করে।সেখানে কর্মরত থাকাকালীন সাইফের সাথে আশার সাক্ষাত হয়।সেই সাক্ষাত প্রনয়ে রুপ নেয় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই।টানা দুই বছর চুটিয়ে প্রেম করে তারা জেনারেল আশফাক আহমেদের অগোচরে।আশফাক আহমেদ কখনোই চায়নি তার পরিবারের আর কেউ এই পেশার সাথে জড়িত হোক।এর জন্যই সে কোনমতেই রাজি ছিলো না সাইফ এবং আশার ভালোবাসা মানতে।সে পুরোপুরি নাকোচ করে দেয় সাইফকে।পরে তাই তারা পালিয়ে বিবাহ করে।মূলত এই কারনেই আশফাক আহমেদ ও সাইফ চৌধুরীর মধ্যে নিরব দ্বন্দ এখনো চলে।আশা আহমেদ এবং সাইফ চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে সিয়াশা চৌধুরী।সিয়াশার ছয় বছর বয়সে আশা মারা যায়।তার মারা যাওয়ার পরে সাইফ বিনা অযুহাতে তার চাকরি থেকে অবসর নেয়।বান্দরবানে থাকাকালীন আশা মারা যায় তাই সেখানেই নিজের বসতি গড়ে তোলে সাইফ ও আশফাক।আশফাক আহমেদ তার চাকরি যথাসময়ে শেষ করেই অবসর নেয়।সেই থেকে আশফাক ও সাইফ দু’জন মিলেই সিয়াশাকে বড় করে। বান্দরবান সেনানিবাসের পাশেই বিশাল এড়িয়া জুড়ে চৌধুরী নিবাস।তার পাশে আশা ফাউন্ডেশন নামে এক বিশাল অনাথ আশ্রম রয়েছে যেখানে পথশিশু,আর্থিক ভাবে অসচ্ছল শিশু,পিতা মাতাহীন শিশু সকলে সাচ্ছ্যন্দে বসবাস করে পড়াশোনা করে।বাবা,নানাভাই,নিজের কর্মব্যাস্ততা এবং আশ্রমের এই শিশুদের নিয়েই সিয়াশার জীবন।
একটা ঘরের সৌন্দর্য হলো সেই ঘরের কর্ত্রী বা গিন্নি যার ভাষায় যেটা।একজন গৃহিণীর তত্তাবধায়নে সংসার থেকে শুরু করে একটা পরিবারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অহেতুক জিনিসগুলোও একটা নিয়ম শৃঙ্খলের মধ্যে থাকে।তেমনি একজন গৃহিণীর অনুপস্থিতিতে ঘরটা যেনো নির্জীব দালানে পরিনত হয়ে যায়।তেমনি মায়ের অনুপস্থিতিতে সিয়াশা নিজের পরিবার আর সংসারটার হাল ধরতে পারলেও নিজের ব্যাপারে একদমই লাগাম ছাড়া।একটা মেয়ের বাচন ভঙ্গি চলাফেরার ধরন ঠিক যেনো তার মায়ের’ই প্রতিফলন।মা যেভাবে চলাফেরা করে সন্তানটাও মায়ের দেখাদেখি নিজেকে সেভাবে গড়ে তোলে।সিয়াশার এই শূন্যতা পূরণ করার জন্য কেউ নেই।তাই তার চলাফেরার ধরন ও লাগামছাড়া।যখন যেভাবে ইচ্ছা হয় তখন সেভাবে চলাফেরা করে।শাসন করার মতো কেউ নেই।সাইফ ও এর জন্য কখনো কিছু বলেনা মেয়ের মাঝে সে তার স্ত্রীকে খুঁজে পায় যে।
পাহাড় ঘেঁষে রাস্তা দিয়ে দূরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে বাস।বাসের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্রের তালে সুর তুলছে কয়েকজন উপজাতি তাদের নিজ ভাষায়।সিয়াশা খুব একটা বুঝতে পারছে না তবুও সে উপভোগ করছে।বাসে অবস্থানরত সকলের সাথে মাঝেমধ্যেই হাততালি দিয়ে হৈচৈ করে উঠছে।ঠিক এই কারনেই সে কখনো গাড়ি ব্যাবহার করে না।বাসে অনেক ভিন্নধর্মী মানুষের ভিড়ে তার সময়টা সুন্দর কাঁটে।
“এই যে ভাই একটু ভদ্রতা বজায় রেখে সিটে বসুন।”
কারোর দ্বারা ভাই সম্মোধন পেয়ে সিয়াশা অবাকপানে নিজের দিকে একবার চোখ বুলালো।একটা ধূসর রঙা ওভার সাইজ টি শার্টের সাথে কালো প্যান্ট পড়া সে।চুল খোলারাখা তার অপছন্দ তাই সেগুলো মিনি প্রতিদিন হাত খোঁপা করে দেয়।হাতে এপ্রোন বেশভুষা বলতে এতোটুকুই তাতে যে কেউ তাকে ভাই ডাকবে এটা তার কল্পনাতীত ছিলো।বাসের সিট থেকে পা বের করে কিছুটা উশৃঙ্খল হয়ে বসে সে গানের সাথে তাল দিচ্ছিলো।ভ্রু কুঁচকে সে নিজের পেছনে তাকালো।তার পাশের জানালার সিটে একটা ছেলে বসা।উক্ত ব্যাক্তি যে এমন সম্মোধন করেছে তাকে।
“কি বললেন আপনি?”,,সিয়াশা আরেকটু নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিজ্ঞাসা করলো।
ছেলেটা জানালার দিকে মুখ করে ছিলো সেভাবেই শক্ত কন্ঠে শুধালো,,
“ভদ্রতা বজায় রেখে সিটে বসতে বলেছি।আপনার পিঠ বারবার আমার গায়ে ধাক্কা লাগছিলো।আমার অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল।“
“ওকে, সেটার জন্য দুঃখিত।কিন্তু আপনি আমায় কি বলে সম্বোধন করলেন মাত্র সেটা শুনতে চাইছি।”,,সিয়াশা গম্ভীর মুখে বললো।
ছেলেটা এবার মুখ ঘুরিয়ে তাকালো সিয়াশার দিকে।মুখের দিকে নয় দেহের দিকে।তার মা বলে তার মতো চরিত্রবান ছেলে নাকি পুরো চার এলাকাতে একটা খুঁজে পাওয়া যাবে না।মায়ের কথা সে মনে প্রানে বিশ্বাস করে।এটা নিয়ে খানিক অহমিকাও কাজ করে নিজের মধ্যে।মায়ের কথা আরো জোরদার করতে সে কখনো কারোর মুখের দিকে তাকায় না।সৎচরিত্রবান কিনা!নিজের পাশে আড়চোখে তাকালে দেখেছে শুধু ধূসর রঙা একটা গেঞ্জি আর কালো প্যান্ট পড়া কোন ব্যক্তির পেছনের দিকটা।তাই তো সে ভাই বলে সম্বোধন করেছিলো।মায়ের ছেলে এটা ভুলেই বসেছিলো যুগ বদলেছে।তাই এখন আওয়াজ শুনে বুঝতে পারলো ওটা কোন মেয়ে।
“আগে নিজের পোশাক আশাক মেয়েদের মতো করুন তারপর অন্যদের থেকে মেয়ে সম্বোধন আশা করবেন।এখানে আমার কোন দোষ নেই।”
সিয়শা রেগে গেলো এহেন কথায় খলবলিয়ে উঠে বললো,“আমি কি ধরনের পোশাক পড়বো তা নিশ্চয়ই আপনি বলে দিবেন না?কিন্তু একজন পথচারী হিসেবে আপনার উচিত যাচ বিচার করে কথা বলা।বুদ্ধি প্রতিবন্ধী লোক! চোখ দুটো বাড়িতে খুলে রেখে এসেছেন?কাকে কিভাবে সম্বোধন করতে হয় সেটুকু সেন্স ও নেই আপনার।আর আপনি এসেছেন আমাকে ড্রেসিং সেন্স শেখাতে!”
ছেলেটা এবার না চাইতেও নিজের রাগি মুখটা তুলে তাকালো।
“আপনি তো ভারি বেয়াদব মেয়ে! গালিগালাজ করছেন কেনো?দেখতে তো ভদ্র ঘরের মেয়ে মনে হয়।”
“চোখের সাথে সাথে দেখছি কানদুটোও নেই আপনার সাথে। গালিগালাজ কোথায় শুনলেন আপনি?আপনার মস্তিষ্কে সমস্যা রয়েছে দেখতে তো স্বাভাবিক মনে হয়েছিলো।”
ছেলেটা যেনো এবার রাগে লাল হয়ে উঠলো।যেখানে তার মায়ের কাছে সে ভদ্র সভ্যের মূর্ত প্রতীক সেখানে এই মেয়ে কিনা তাকে পাগল বলে আ্যাখ্যায়িত করছে?
“অভদ্র মেয়ে আপনি।কোথায় নিজেকে শুধরে নিবেন তা না আমার সাথে পায়ে পায়ে ঝগড়া করছেন। নেহাৎই আমি ভদ্র ঘরের ছেলে দেখে এখনো কিছু বলিনি নয়তো এতক্ষনে আপনার গাল লাল করে দিতো।”,,ছেলেটি রাগি কন্ঠে বললো।
সিয়াশা আরো কিছু বলার জন্য উদ্বত হলো।কিন্তু তার আগেই কন্ডাক্টার তাকে তার স্টপে নামার জন্য তাড়া দিতে লাগলো।সে ছেলেটির দিকে রাগি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজের ব্যাগ তুলে নিলো।
“সময় থাকলে দেখিয়ে দিতাম অভদ্রতা কাকে বলে।”,,বলেই হে গটগট পায়ে নেমে গেলো বাস থেকে।
*****
শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে এক সারিতে আছে কয়েকজন সৈন্য নথিপত্র হাতে।শ্বাস নেওয়ার শব্দ ব্যাতীত অন্য কোন শব্দ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।বিগত দশমিনিট আগে শক্ত চোয়ালদ্বয় একবার আলাদা হয়েছিলো এরপরে আর হয়নি।তীক্ষ্ণ নজর দুটি নথিপত্র ঘাটছে নিজের কাজ বুঝে নিচ্ছে। নথিপত্র থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দর্পন গমগমে স্বরে জিজ্ঞাসা করলো,,
“আরো একজন সৈন্যের আজকে জয়েন করার কথা ছিল।সে এখনো পৌঁছায়নি কেনো?”
তন্মধ্যেই কেউ কক্ষের সামনে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে সেলুট দিয়ে সটান হয়ে দাঁড়ালো “গুড মর্নিং স্যার।মে আই কাম ইন স্যার।”
দর্পন ঘড়ির দিকে ইশারা করলো,,“এখন কয়টা বাজে? আপনার কয়টায় পৌঁছানোর কথা ছিলো।”
“দুঃখিত স্যার,রাস্তায় একটা আপদ রাস্তা কেটেছিলো তাই একটু লেইট…..।”,,আর বলতে পারলো না ছেলেটি তার আগেই দর্পনের বজ্রকণ্ঠের ধমকে কক্ষের সকলে কেঁপে উঠলো খানিক।
“স্টপ গিভিং দিজ লেইম এক্সকিউজ।এই পেশায় থাকতে হলে এইসব লেইম এক্সকিউজেকে পিছে ফেলে চলতে হবে।এটা কোন কিন্ডারগার্টেন স্কুল নয় যে আপনি ক্লাস টিচারের কাছে এমন অযুহাত দিবেন আর আমি আপনাকে মাফ করে দেবো।আরেকবার এমন ভুল হলে বিনা নোটিশে আপনাকে ফায়ার করা হবে। রিমেমবার দিজ ওয়ান থিং।”
ছেলেটা সহ উপস্থিত সকলে নত মস্তকে মাথা নাড়লো।
আশফাক আহমেদ দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে এগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলো।মুখে তার প্রসন্নতার দেখা মিলছে। পেশাগত জীবনে সেও এমন দূর্দম্য,তেজি,কর্মপরায়ন ছিলো।নিজের পেশাগত জীবনের কর্মব্যস্ততা এখন অনেক মনে পড়ে।প্রিয় মানুষগুলোকে হারিয়ে ফেলার বেদনা তো এই কর্মব্যস্ততার মাধ্যমেই সে ভুলে থাকতো।সৈনিকরা কক্ষ থেকে বেরিয়ে আশফাক আহমেদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে সাথে সাথে সেলুট প্রদর্শন করলো।আশফাক আহমেদ ইশারায় তাদের যাওয়ার অনুমতি দিলো।চাকরি জীবনের শেষ অধ্যায়টা সে এই সেনানিবাসেই কাটিয়েছে।এখানকার জড়িত সবকিছু এখনো তার কাছে শ্রদ্ধাবনত।
“মে আই কাম ইন মেজর দর্পন এহসান।”,,আশফাক আহমেদের মুখদর্শন পেতেই দর্পন তৎক্ষণাৎ সেলুট দিয়ে মূর্তীর ন্যায় দাঁড়িয়ে গেলো।গমগমে স্বরে বললো,,
“অনুমতি নিয়ে আমাকে ছোট করবেন না স্যার।”
আশফাক সাহেব মৃদু হেসে কক্ষে ঢুকলো।দর্পন নিজের চেয়ার আগেই ছেড়ে দিয়েছিলো।সম্মানের সহিত সেটা এগিয়ে দিলো আশফাক আহমেদের দিকে।তবে আশফাক চেয়ারে বসলো না।সে দর্পনের ডেস্কের সামনে রাখা কমন মানুষের চেয়ারে বসলো।
“ওটা আপনার অবস্থান আপনাকেই মানায়।বসুন ইয়াং ম্যান।আপনার তাড়া না থাকলে দুই মিনিট আলাপ করা যাবে কি!”
“আমার সকল ব্যাস্ততার উর্ধ্বে আপনি স্যার।আমার সাথে আলাপ করার জন্য আপনার সময়ের হিসাব করতে হবে না।আর আমাকে তুমি করে বললে বেশি খুশি হবো স্যার।”,,আশফাক হেসে মাথা দুলালো।
“তোমার ক্যারিয়ারের শুরু থেকে তোমাকে এই দুইবার আমি দেখছি।দুইবার ই আমি মুগ্ধ তোমার শিষ্ঠাচার,কর্মপরায়নতায়।এগিয়ে যাও আমাদেরকেও ছাড়িয়ে।”,,গম্ভীর মুখটায় খানিক শ্রদ্ধার প্রলেপ পড়ে গেলো দর্পনের।
“তো এখন বলো তো আমার গিন্নি কি এমন অপরাধ করেছিলো যে তুমি তার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়েছো?”
দর্পন প্রচুর বিব্রত,লজ্জিত বোধ করলো আশফাকের কথায়।একটু বেশিই সিরিয়াস হয়ে গিয়েছিলো সে।লজ্জিত ভঙ্গিতে সে আশফাকের কাছে ক্ষমা চাইলো।
আশফাক আহমেদ হো হো করে হেসে উঠলো দর্পনের লজ্জিত মুখ দেখে।
“ডোন্ট বি সরি মেজর।তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করেছো। দায়িত্বের সামনে সবকিছু মূল্যহীন।আম রিয়েলি প্রাউড অফ ইউ। কিন্তু তোমার রাগ তো গিন্নি আমাদের উপর ঝেড়েছে।এরপর থেকে একটু দেখেশুনে নিও।আমার নানুভাই এমন কোন কাজ করে না যাতে অন্য কারোর সমস্যা হয়।”,,দর্পন ফের লজ্জিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো।মনোস্পটে সকালের কিছু আবছা দৃশ্য তৈরি হতে লাগলো অযথাই।
*****
সিয়াশা ক্লান্ত অবসন্ন দেহে হাসপাতাল থেকে বের হলো।রাত আটটা বাজে।জমজমাট পথঘাট।সকলে নিজ নিজ তাগিদে ছোটাছুটি করছে।বের হতেই দেখা মিললো দুই চেনা পরিচিত পাংশুটে মুখ।মেজাজটা অনতিবিলম্বে তার খারাপ হয়ে গেলো।দুই বুড়ো গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দুই দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।এদের কি আর কোন কাজ নেই তার পেছনে ঘোরা ছাড়া!জীবন নিয়ে বড্ডো উদাসীন দুইজন।সিয়াশা চায়না তার জন্য কারোর জীবন থেমে থাকুক।তার বাবা নানা দুজনেই জীবনের অর্ধেকটা সময় থেকে একাকিত্বকে সঙ্গি করে কাটিয়ে দিয়েছে।বিবাহের আট বছরের মাথায় তার মা মারা যায় সেই থেকে বাবা একা একা নিজের জীবন কাটাচ্ছে এটা তার ভালোলাগেনা।বাবা নানাভাইয়ের যথেষ্ট খেয়াল সে রাখতে পারেনা।সেও চায় তার বাবাকেও কেউ ভালোবাসুক সেবা করুক।বাবা অসুস্থ হলে তার পাশে থাকুক।তার নানাভাই তো এখন প্রায়ই অসুস্থতায় ভোগে।সে কম চেষ্টা করেনি দুজনের জীবন গুছিয়ে দিতে। কিন্তু দুই জামাই শশুর প্রত্যেকবার কোন না কোন গন্ডগোল বাঁধিয়ে তার পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ধপাধপ শব্দ করে গাড়িতে উঠে গেলো। উচ্চশব্দে দরজা লাগানোর শব্দে সাইফ আর আশফাক নিজ নিজ দুনিয়া থেকে বের হলো।এই দুনিয়ায় শুধু একটা চিন্তাই ঘোরাফেরা করে কিভাবে শশুরকে জ্বালানো যায়।আর আশফাকের দুনিয়ায় চলে কিভাবে সাইফকে সায়েস্তা করা যায়।সাইফ উৎফুল্ল মনে হাসি হাসি মুখে গাড়ির পেছনে ঢুকে গেলো।পকেট থেকে রুমাল বের করে পানিসহ সেটি এগিয়ে দিলো।তার আগেই আশফাক আহমেদ আরো একটি পানির বোতল এগিয়ে দিলো।সাইফের কপাল কুঁচকে গেলো থমথমে কন্ঠে বললো,,
“দেখছেন না আমি দিয়েছি?ওটা আপনার কাছেই রাখুন সিয়া এটা খাবে।”
আশফাক মোটেই পাত্তা দিলো না সাইফকে।সে চমৎকার হেসে সিয়াশার উদ্দেশ্যে বললো,,“গিন্নি এটা খাও।ঠান্ডা পানি এটা ভালো লাগবে।”
“সিয়া ঠান্ডা পানি খাবে না।টন্সিল বেড়ে যাবে বাচ্চা।”,,সাইফ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বললো।
“গিন্নির কোন ঠান্ডার সমস্যা নেই।তুমি কোন হাতুড়ে ডাক্তারি শুরু করেছো এখানে বসে?”,,আশফাক আহমেদ রাগি কন্ঠে বললো।
সিয়া দাঁতে দাঁত চেপে দুজনের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করছিলো।সেভাবেই বললো,,
“তোমাদের আমার আর সহ্য হচ্ছে না।কালকে ঘটক আসবে দুজনে ভদ্র সভ্য হয়ে থাকবে।যা যা জিজ্ঞাসা করবে তার সঠিক সঠিক উত্তর দেবে।বিয়ে করে দুজনে বউয়ের পিছে ঘুরবে আমার পেছনে যেনো আর তোমাদের না দেখি।”
সহসা চুপসে গেলো আশফাক।হাতের বোতল নিয়ে ধপ করে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়লো।এই সাইফ একটা আলসে,অকর্মন্য ছেলে।সবসময় তাকে দিয়ে গাড়ি চালবে আর নিজে আরাম করবে।মেয়ের কথায় সাইফ আরো উৎফুল্ল হয়ে উঠলো।
“সত্যি?তাহলে তো আমাদের স্যালনে যেতে হবে কি বলেন শশুর আব্বা?”,,সাইফ আশফাককে উদ্দেশ্যে করে বললো।আশফাক চোখ রাঙিয়ে তাকালো সাইফের দিকে।বিরবির করে বললো,,
“চরিত্রহীন ছেলে একটা!দেখো কিভাবে নাচছে বিয়ের জন্য।”
সিয়াশা দাঁত কিড়মিড় করলো বাবার কথায়।এই সব নাটক।প্রত্যেকবার এমন করে।একজন ঘটক আসবে শুনলে হয়েছে দুজনে স্যালনে গিয়ে বসে থাকবে সুন্দর জামাকাপড় পড়ে।
“দেখো পাপা”
“হ্যা বাচ্চা বলো”
“ওহ্ পাপা পুরো কথা বলতে দাও।“
“হ্যা হ্যা বলো।”
“দেখো পাপা,নানুভাই আমি তোমাদের লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি।এবার যদি তোমরা কোন গন্ডগোল করো তবে আমি তোমাদের বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবো।”
“কিন্তু বৃদ্ধাশ্রম তো বৃদ্ধাদের জন্য আমারা তো ইয়াং,হ্যান্ডসাম ড্যাশিং বিবাহ যোগ্য পাত্র।আমাদের তো বৃদ্ধাশ্রমে রাখবে না বাচ্চা!”,,সাইফ চিন্তিত ভঙ্গিতে গম্ভীর মুখে বললো।সিয়াশা ডানে বামে অতিষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো।আশফাক আহমেদ ঢের খুশি হয়ে গেলো সাইফের কথায়।আনন্দে খেই হারা হয়ে সে একটা ভুল করে বসলো।উল্লাসিত চিত্তে সাইফের সাথে হাই ফাইভ করলো।হাত মিলতেই দু’জনের সুদবোধ ফিরলো।তারা তো একে অপরের শত্রু তবে তারা হাত কেনো মিলাচ্ছে?থমথমে মুখে আবার দুজনে দুই দিকে ফিরে গেলো।সিয়াশা হাল ছেড়ে দিলো। ক্লান্ত ভঙ্গিতে জানালায় মাথা ঠেকিয়ে দিলো।এদের সোজা পথে আনা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
খানিক বাদেই তাকে টেনে কেউ বুকে জড়িয়ে নিলো।সাইফ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো।সিয়াশাও নিশ্চিন্তে বাবার বুকে পড়ে রইলো।
চলবে..