মেঘফুল পর্ব-১+২

0
1070

উপন্যাস – “মেঘফুল”
পরিচ্ছেদ – ০১
লেখক – মিশু মনি

ভেজা চুল, লাল ব্লাউজ, ছাই রঙা শাড়ি, ঝড়ো হাওয়া, ঝুম বৃষ্টি আর একটা পুরুষ মানুষ। জীবনে সবই আছে শুধু এই পুরুষ মানুষটা ছাড়া। তাতেই সবকিছু এমন অর্থহীন লাগে কেন জাহ্নবীর? পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে এসে এই এক শূন্যতা চারপাশ থেকে গলা চেপে ধরে রাখছে সর্বক্ষণ।

বাইরে ধূলোঝড়। নামবে বৃষ্টি। খুব কী ক্ষতি হয়ে যেত যদি তার একটা পুরুষ মানুষ থাকতো? আর দোতলায় একটা খোলা বারান্দা, যেখানে দুহাত মেলে বৃষ্টিতে ভেজা যায়? পাশেই থাকতো একটা আরাম কেদারা। বারান্দার টবে ঝুলে থাকা গাছের টবগুলোও ওর সঙ্গে ভিজতো। ভিজতো একটা মানুষ, মানুষটার পাঞ্জাবি, ভিজতো চেয়ারের হাতলে রাখা সিগারেটের অ্যাস্ট্রে। আজকাল এই অভাবগুলোই ওকে সারাক্ষণ অসুখী করে রাখে।

পাশের ঘর থেকে পারভীনের গলা শোনা যায়, ‘জানলা গুলা আটকায় নাই নাকি? ওই জাহ্নবী? ধুপধুপ শব্দ হইতেছে কিসের?’

জাহ্নবী স্থির বসে থাকে। অন্ধকার ঘরে বিদ্যুৎ চমকানির ঝিলিক ওর ভালো লাগছে। ঘরের দুই জানালা দিয়ে দমকা হাওয়া দ্বিধাহীনভাবে প্রবেশ করে ওকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। ধুলোয় ঘর ভরে যাক, জানালা বন্ধ করবে না জাহ্নবী।
আবারও পারভীনের গলার আওয়াজ ভেসে এলো, ‘ওই জাহ্নবী, দরজা খোল তো দেখি। জানলা লাগাস নাই? ঘুমাইছস তুই?’
জাহ্নবী উত্তর দেয় না। সে ঘুমাচ্ছে। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে ঘুমাচ্ছে। তার ঘুম ভাংছে না। ঘুম ভাঙার জন্য জীবনে অর্থবহ কিছুর প্রয়োজন হয়। তার জীবনে অর্থবহ কিছু নেই। চারপাশ মরুভূমির মতো শূন্য। উড়ছে ধুলো। ঝড়ো হাওয়ার সাথে ধুলো এসে মেঝে ভারী করে তুলছে। শোনা যায় দরজার ওপাশে পারভীনের ঠকঠক শব্দ।

জানালা বন্ধ করে দিয়ে ঘরে দম মেরে বসে রইল জাহ্নবী। পরিবেশ যখন অস্থির হয়ে ওঠে, ওর খুব চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে তখন। ভীষণ একাকীত্ব ওকে ব্যকুল করে তোলে। মায়ের গলা আর শোনা যাচ্ছে না। বৃষ্টি ও বাতাসের শব্দ মিলেমিশে চারপাশ মুখরিত করে তুলেছে। জাহ্নবী অন্ধকারে বসে থাকতে থাকতে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। মা আজকাল ওর সঙ্গ পছন্দ করছেন না। মেয়েরা বিয়ের উপযুক্ত হয়ে গেলেই প্রত্যেক মা চান মেয়ের এবার নিজের সংসার হোক। তার সংসারে আরেকজন মেয়ের উপস্থিতি বেশিরভাগ মায়েরাই সহ্য করতে পারেন না, হোক না সেটা নিজের পেটের মেয়ে। আর সেই মেয়েই যখন পয়ত্রিশ বছর বয়স নিয়ে ঘরে বসে থাকে, স্বাভাবিক ভাবেই মায়ের কাছে সেটা অপছন্দের হয়ে উঠবে।

জাহ্নবী কান্নার ফাঁকে একবার পাশের ঘরে শব্দ শুনতে পেলো। গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। একবার মায়ের গলা, একবার বাবার। অন্য একটা কণ্ঠস্বর ওর অপরিচিত। এই ঝড়বৃষ্টির রাতে কে এসেছে তাতে ওর কিছুই যায় আসে না। বালিশে মুখ গুঁজে দিলো জাহ্নবী।

সামার দরজায় শব্দ করে বলল, ‘আপু, দরজা খোল।’
‘কেন?’
‘তুই আজকে আমাদের রুমে ঘুমাবি।’ সামার উত্তর দিলো।

‘কিসের দুঃখে?” জাহ্নবী প্রশ্ন করে।
সামার বলল, ‘দরজা খোল, তারপর বলছি।’

জাহ্নবী বিরক্ত হয়ে উঠে পড়লো। নিশ্চয়ই বাড়িতে মেহমান এসেছে। মাঝেমাঝে এই বাড়িতে মেহমান আসে আর তখন জাহ্নবীকে নিজের রুম ছেড়ে দিয়ে ছোটবোনদের সাথে ঘুমাতে হয়। তাই বলে এই ঝড়ের রাতে? আজ মনটা চরম বিক্ষিপ্ত। এরমধ্যে নিজের রুম ছেড়ে যেতে একদমই ইচ্ছে করছে না।

জাহ্নবী দরজা খুলে দিলো। সামার বলল, ‘বাসায় গেস্ট এসেছে।’
‘জানতাম। তোরা দুজন আমার রুমে চলে আয় না। আমার তোর রুমে থাকতে ইচ্ছে করছে না।’ অসহায় শোনালো জাহ্নবীর গলা।

‘তোর বিছানাটা ছোট। এখানে তিনজন ঘুমানো সম্ভব না।’

জাহ্নবী একটা নিশ্বাস ফেললো। ওর ঘরের বিছানায় আরামের সহিত দুজন ঘুমানো যাবে। তিনজন ভালোমতো ঘুমানো মুশকিল। তার ওপর সামারের ঘুমানোর স্বভাব ভালো না। হাত পা ছড়িয়ে ঘুমায় সামার। ওকে আজ ঘর ছেড়ে দিতেই হবে, অন্য উপায় নেই।

সামার মোবাইলের টর্চের আলোতেও বুঝতে পারলো জাহ্নবী কান্না করেছে। ওর কষ্ট হয় জাহ্নবীর জন্য। আজকের রাতটা জাহ্নবীকে একা ঘুমাতে দেয়াটা সত্যিই দরকার ছিল। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। বাবার পরিচিত একজন লোক মেহমান হয়ে এসেছে।

জাহ্নবীর বাবা জাভেদ আলী বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। স্ত্রী পারভীন ও তিন মেয়েকে নিয়ে ওনার সংসার। বড় মেয়ে জাহ্নবী পড়াশোনা শেষ করে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতো, চাকরি ছেড়েছে মাস চারেক হলো। বর্তমানে বাসাতেই থাকে। বেশিরভাগ সময় কাটায় ছাদে আর নিজের ঘরে। ওর ঘরে আলো কম আসে, আর সে কারণেই ঘরটা ওর বেশি পছন্দ। অন্ধকারেই যার জীবন, তার আবার প্রকৃতির আলো দিয়ে কী হবে! এমন কথা মাঝেমাঝেই বলে জাহ্নবী।
জাভেদ সাহেবের মেজো মেয়ের নাম সামার ও ছোট মেয়ে ভায়োলেট। সামার ও ভায়োলেট সারাক্ষণ মেতে থাকে খুনসুটিতে। ওরা বয়সে কাছাকাছি হওয়ায় দুই বোনের সম্পর্কটা দারুণ বন্ধুত্বপূর্ণ। তবে দুই বোনের সাথে জাহ্নবীর খুনসুটিতে তেমন মেতে ওঠা হয় না। জাহ্নবী পরিবারের সবার থেকে যেন বহু ক্রোশ দূরে সরে গেছে।

নিজের বালিশ নিয়ে ছোটবোনের ঘরে চলে এলো জাহ্নবী। বিদ্যুৎ নেই, বিছানার শিয়রে মোবাইলের আলো জ্বলছে। একপাশে কাৎ হয়ে ঘুমাচ্ছে ভায়োলেট। জাহ্নবীর ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। চুপচাপ বিছানার অন্যপাশে শুয়ে পড়লো সে।
সামার দরজা বন্ধ করে দিলো। ওর মেজাজ খারাপ হচ্ছে। চমৎকার ঝড় বৃষ্টির রাত। ভেবেছিল আজ সারা রাত দারুণ আনন্দে ফোনে কথা বলা যাবে। বৃষ্টির রাতে শব্দ করে হাসলেও বাবার ঘর থেকে শোনা যায় না। এত সুখের রাতটা নিমেষেই নষ্ট হয়ে গেল, ধেৎ।

বিরক্ত হয়ে সামার চেয়ারে বসে রইল। জাহ্নবী বলল, ‘ভায়োলেটকে মাঝখানে দিয়ে দিস। মোবাইলের আলোটা নিভালাম।’
‘আচ্ছা।’
‘তুই শুবি না? চেয়ারে বসলি কেন?’
‘তাহলে কি তোর মাথার ওপর বসতাম? আব্বুর কাজ কারবার এমন কেন? এই রাত্রিবেলা বাসায় গেস্ট নিয়ে আসার কি দরকার?’
‘তোর তাতে সমস্যা কি? আমি তোর বিছানায় শুলে গন্ধ লাগে নাকি?’
‘আপু, প্লিজ মাইন্ড করিস না। আমি আসলে বলতে চাইছি, আব্বু দিনের বেলা গেস্ট আনতে পারে। রাত্রিবেলা..’

বিছানা থেকে উঠে দ্রুতপদে বারান্দায় চলে গেলো জাহ্নবী। সামার হতভম্ব হয়ে গেল। নিশ্চয়ই এখন মনেমনে প্রচণ্ড অভিমানী হয়ে থাকবে জাহ্নবী। সামার ধীরপায়ে বারান্দার দরজায় এসে বলল, ‘আপু, আই এম সরি। আমি তোকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলিনি। আমি আব্বুর কাজটাতে বিরক্ত সেটা বুঝাইছি। প্লিজ আপু।’
জাহ্নবী বলল, ‘তুই যা এখান থেকে।’

সামার একটা নিশ্বাস ফেলে ঘরে চলে এলো। আজকের রাতটাই খারাপ, ভয়ংকর খারাপ। বাসায় কোন মেহমান এসে এত সুন্দর রাতটাকে নষ্ট করে দিলো, দেখতে ইচ্ছে করছে সামারের। বিরক্ত হয়ে সামার ফোন হাতে নিয়ে ডায়াল চাপলো। কানে ধরে বলল, ‘হ্যালো। আমার খুব মন খারাপ, মেজাজও খারাপ। আমার মন ভালো করে দাও।’

জাহ্নবীর ঘরে বসে আছেন আগন্তুক। পারভীন তরকারি গরম করতে গেছেন। এত রাতে বাড়ির লোকজনকে বিরক্ত করায় বেশ অস্বস্তি বোধ করছেন অতিথি। আগন্তুকের নাম অর্ণব। জাভেদ সাহেবের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল বাসে। একসাথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বাস যাত্রা। সেই সূত্রেই পরিচয়। এত অল্প পরিচয়ে কারও বাসায় হুট করে হাজির হওয়াটা লজ্জাজনক। অবশ্য অর্ণবের উপায় ছিল না। নিতান্তই অসহায় পরিস্থিতিতে পড়ে এখানে আসা। জাভেদ সাহেব যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখাচ্ছেন। তবুও অস্বস্তিতে ভেঙে পড়ছে অর্ণব।

খাবার টেবিলে ডাকলেন জাভেদ আলী। অর্ণব হাত ধুয়ে খেতে বসলো। প্লেটের অর্ধেক জুরে তরকারি, আর এক চামচ ভাত। অর্ণব হাসিমুখে খাওয়া শুরু করলো। ইতস্তত বোধ হচ্ছিল, তবে বেশ বুঝতে পারলো বাসায় আর ভাত ছিল না।
পারভীন মুখ কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। জাভেদ আলী বললেন, ‘কিছু মনে কোরো না। আসলে সবার খাওয়াদাওয়া শেষ তো। তরকারি ফ্রিজে রেখে দিয়েছে কিন্তু ভাত আসলে.. আমি তোমার আন্টিকে এত রাতে আর ভাত রাঁধতে বললাম না। ওর আবার হাইপ্রেশার তো। আজ শরীরটা তেমন ভালো না ওর। এ জন্য ভাত একটু অল্প। আমার আসলে লজ্জাও লাগছে।’

অর্ণব বলল, ‘আরে আংকেল কী যে বলেন না। আমি একটা রেস্টুরেন্টে খেয়ে নিয়েছি। আমার আসলে খাবার দরকার ছিল না। আপনি জোর করলেন তাই খেতে বসলাম। আপনি এভাবে বললে আমার লজ্জা লাগবে। প্লিজ।
‘আচ্ছা বাবা তুমি খাও। লজ্জা পাবার দরকার নেই। জাহ্নবীর মা, তুমি শুতে যাও। আমি এখানে আছি।’

পারভীন একটা নিশ্বাস ফেলে ঘরে চলে গেলেন। এত রাতে অতিথি আসায় তিনি বেশ বিরক্ত। সন্ধ্যা থেকে ওনার ঘাড়ের রগ কুঁচকে আসার মতো বোধ হচ্ছিল। বেশ কিছুদিন যাবত শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। সবমিলিয়ে আজকাল অল্পতেই বিরক্ত হয়ে যান তিনি। অর্ণবকে দেখেও ওনার ভালো লাগে নি। বড় বড় চুল, দাড়ি গোঁফে বোধহয় দীর্ঘদিন কাঁচি লাগায় নি। এরকম ছেলেকে ওনার একদমই ভালো লাগে না।

অর্ণব ভাত খেতে খেতে বলল, ‘আমি দুঃখিত অনেক রাতে আপনাদেরকে বিরক্ত করছি।’
‘সমস্যা নেই। তা বাবা, তোমার আব্বা আম্মা ভালো আছেন?’
‘জি আংকেল। ওনারা ভালো আছেন। বাড়িতে একটা ফোনও করতে পারিনি। যা বিপদে পড়েছি।’
‘কিসের বিপদ যেন? শোনাই তো হলো না।’

অর্ণব বলল, ‘আমি একটা চাকরির পরীক্ষা দিতে এসেছিলাম। সকালেই আমার একটা ফ্রেন্ডের মেসে ওঠার কথা। সকালে নেমে ওকে কল দেই, ও বললো ধানমণ্ডি সাতাশে আসতে। আমি সেখানে গিয়ে ওর সঙ্গে বসে রইলাম আটটা পর্যন্ত। নাস্তা করলাম, ওখানে বসে পড়াশোনা করলাম। ও বললো আমার পরীক্ষা শেষ হলে একসঙ্গে মেসে যাবো। ও আমার পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে অপেক্ষা করবে। ওর কাছে আমার মোবাইল, জামাকাপড়ের ব্যাগ এসব রেখে আমি পরীক্ষা দিতে ঢুকি। বের হয়ে এসে ওর যেখানে থাকার কথা ছিল, সেখানে পাইনি। তারপর আমি একজনের ফোন চেয়ে নিয়ে ওকে কল করি। ওর নাম্বারে রিং হচ্ছে, রিসিভ করছে না। আর আমার নাম্বার সুইচড অফ। রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। আসলে কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। আপনার বাসার ঠিকানা আমাকে দিয়েছিলেন মনে আছে? অনেক সহজ ঠিকানা তাই ভুলে যাইনি। ভাগ্যক্রমে আপনি বাসাতেই ছিলেন। নয়তো আজ রাতে রাস্তায় কাটাতে হতো।’

জাভেদ আলী দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, ‘ আহারে! তোমার বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক কেমন তোমার? ফেসবুকে পরিচয়?’
‘না। ও আমার এলাকার ছেলে। একসঙ্গে পড়েছি। তেমন যোগাযোগ ছিল না তবে ছোটবেলার বন্ধু। কী করবো বুঝতে পারছি না।’

জাভেদ আলী বললেন, ‘তুমি এক কাজ করো। কালকে থানায় একটা জিডি করে দাও৷ হয় তোমার বন্ধু জেনেশুনে ফোন নিয়ে উধাও হয়েছে আর নয়তো সে কোনো বিপদে পড়েছে। থানায় জিডি করে অপেক্ষা করো।’
‘জি আংকেল। কালকে সেটাই করবো। আপনাকে বিরক্ত করায় কিছু মনে করেননি তো?’
‘আরে না না। বিরক্ত করার জন্যই তো ঠিকানা দিয়েছিলাম। তুমি সেদিন আমাকে সময়মত জাগিয়ে না দিলে আমি হয়তো ফেনীতে নামতেই পারতাম না। হা হা হা।’
হেসে উঠলেন জাভেদ আলী। অর্ণবের কিছুটা স্বস্তি বোধ হলো। খাবার শেষ করে দ্রুত ঘরে চলে এলো সে।

জাহ্নবী বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির জল ছুঁয়ে দেখছে। নিশ্চয়ই এতক্ষণে সামারও ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘরে ঢুকে বিছানার কাছে আসতেই বুঝতে পারলো ফোনে কথা বলছে সামার। জাহ্নবী বিছানার কাছাকাছি আসতেই সামার বিছানা ছেড়ে কথা বলতে বলতেই বারান্দায় চলে গেলো। জাহ্নবী একটা নিশ্বাস ফেলে শুয়ে পড়লো। একপাশে কাৎ হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলো সে। কিন্তু ঘুম আসছে না। মনটা হঠাৎ করে তোলপাড় করছে। সামারকে ফোনে কথা বলতে দেখে এক ধরণের যন্ত্রণা হচ্ছে ওর ভেতর।

অনেক্ষণ এপাশ ওপাশ করেও ঘুম এলো না। সামার এখনো বারান্দায়। এত কথা বলে মেয়েটা! জাহ্নবী মনেমনে বলল, ‘আমার কেন কেউ নেই? আমারও কি ইচ্ছে করে না এভাবে রাত জেগে ফোনে কথা বলতে? খুব ইচ্ছে করে। সামারের মতো হাসিখুশি থাকতে, দুষ্টুমি করতে, কাউকে ভালবাসতে।’ কিন্তু তার জীবনে ভালবাসার সৌরভ নিয়ে কেউ আসে না। কেন আসে না, জানা নেই জাহ্নবীর।
সামার ঘরে প্রবেশ করলো। বিছানার কাছে এসে মৃদু স্বরে বললো, ‘আপু তুই ঘুমিয়ে পড়েছিস?’
‘না।’
‘রেগে আছিস আমার ওপর?’
‘না।’
সামার ইতস্তত করে বলল, ‘আপু তোর বিকাশে টাকা আছে?’
জাহ্নবী বুঝতে পারলো ঘটনাটা কী। বলল, ‘ আছে। কেন?’
সামার বিছানায় বসে খপ করে জাহ্নবীর গায়ে হাত রেখে বলল, ‘আপু প্লিজ আমাকে একশো টাকা রিচার্জ করে দে। আমি তোকে নগদ দিয়ে দিচ্ছি। প্লিজ দে না, আমার লক্ষী আপু।’

জাহ্নবী নরম গলায় বলল, ‘কিন্তু আমার বিকাশ তো ছোট মোবাইলে খোলা। ওটা তো আমার রুমে।’
‘ওহ। ধেৎ।’
উঠে গেল সামার। ফোনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। বিদ্যুৎ নেই, ওয়াইফাই সংযোগ বিচ্ছিন্ন। ফোনে একটা পয়সাও নেই ওর। কিন্তু কথা তো এখনও শেষ হয় নি। বৃষ্টিতে কখনো বিদ্যুৎ চলে যায় না। নিশ্চয়ই আজকে আশেপাশে কোথাও ট্রান্সমিটার নষ্ট হয়ে গেছে। সামার রাগ করে বসে রইল অন্ধকারের মাঝে।

জাহ্নবী বলল, ‘এতক্ষণ কথা বলেও হয়নি তোর? আজকে ঘুমা। কাল কথা বলিস।’
‘কথা শেষ না করে আমার ঘুমই আসবে না।’
‘ওহ।’
সামার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘আপু, তুই আব্বুকে ডেকে বলবি তোর ফোনটা এনে দিতে? প্লিজ।’
‘মাথা খারাপ? এত রাতে আমি আব্বুকে বলবো আমার ফোন এনে দিতে?’

সামার স্তব্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘কিন্তু আমার রিচার্জ করতেই হবে। কথা না বললে ঘুমাতে পারবো না। চল আমরা বরং গিয়ে ফোনটা নিয়ে আসি।’
‘আব্বু জানতে পারলে অনেক খারাপ হয়ে যাবে বিষয়টা।’
‘আমি আব্বুর রুমের দিকে খেয়াল রাখবো। তুই তোর রুমে গিয়ে ফোনটা নিয়ে আসবি। আমিও নাহয় যাবো। আপু, প্লিজ চল না।’

সামারের কণ্ঠে আকুতি। কী এমন কথা, যা শেষ না হলে সামার ঘুমাতে পারবে না- জানতে ইচ্ছে করছে জাহ্নবীর৷ ওর বুকে ব্যথা হচ্ছে। তবুও মনেমনে বলল, ‘ ছোটবোনের জন্য এটুকু করতে না পারলে কেমন বোন আমি?’
জাহ্নবী বলল, ‘আচ্ছা চল। তুই আব্বুর রুমের দিকে খেয়াল রাখিস। আচ্ছা, মেহমানকে দেখেছিস তুই? বয়স্ক লোক নাকি মধ্যবয়সী?’
‘ ইয়াং।’

থমকে দাঁড়াল জাহ্নবী। ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়েছে সামার। জাহ্নবী দ্বিধায় ভুগছে, সে ফোনটা আনতে যাবে নাকি যাবে না? তার কী সামারকে সহায়তা করা উচিৎ? কাজটা কী ঠিক হচ্ছে? বেশ কিছু প্রশ্ন নিয়ে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল জাহ্নবী। সামার পেছন ফিরে বলল, ‘কী রে আপু, আসবি না?’

চলবে..

উপন্যাস – “মেঘফুল”
পরিচ্ছেদ – ০২
লেখক- মিশু মনি

অর্ণব বিছানায় এপাশ ওপাশ করছে। মোবাইল ছাড়া এক মুহুর্ত ভালো লাগে না ওর। দরজায় ঠকঠক শব্দ শুনে কান খাড়া করলো অর্ণব। অন্ধকারে সে ভুলে গেছে দরজাটা কোন স্থানে। হাতড়ে হাতড়ে দরজা খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হলো তাকে।

আলো হাতে দাঁড়িয়ে আছে জাহ্নবী ও সামার। অর্ণব খানিকটা ভড়কে গেলো। টর্চের আলো সরাসরি অর্ণবের মুখে তাক করে সামার বলল, ‘হ্যালো মিস্টার গেস্ট, আশা করছি আমরা বিরক্ত করায় আপনি কষ্ট পান নি।’

অর্ণব আলোর দাপটে চোখ মেলতে পারছে না। পিটপিট করছে চোখ দুটো। জাহ্নবী সামারের হাত টেনে ধরে বলল, ‘সমস্যা কি তোর? প্লিজ আপনি কিছু মনে করবেন না। এক মিনিট আপনাকে একটু বিরক্ত করবো।’

অর্ণব ভদ্রতার সঙ্গে বলল, ‘সমস্যা নেই। আমি কিছু মনে করিনি। আপনারা ভেতরে যান।’

অর্ণব দরজা থেকে সরে বাইরে এসে দাঁড়াল। জাহ্নবী ও সামার আলো হাতে প্রবেশ করলো ঘরে। মাঝেমাঝে দমকা খাওয়ার শব্দ কানে আসছে। অর্ণব বুকে হাত বেঁধে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। দ্রুত বেরিয়ে এলো মেয়ে দুটো। সামার অর্ণবকে বলল, ‘আপনি আর আসার সময় পাননি? এমন মধ্যরাতে কেউ কারও বাসায় বেড়াতে আসে?’

জাহ্নবী সামারের হাত টেনে ধরে ওকে নিয়ে দ্রুতপদে প্রস্থান করলো। অর্ণবের মুখে হাসি ফুটল এবার। অন্ধকারে ওকে ফেলে মেয়েগুলো চলে গেলেও, রেখে গেলো তাদের নিজস্ব রেশ।

জাহ্নবী সামারের ফোনে রিচার্জ করে দিলো। সামার ফোন নিয়ে চলে গেলো বারান্দায়। বিমর্ষ মনে বিছানায় শুয়ে পড়ল জাহ্নবী। ভায়োলেট নিষ্পাপ ঘুমে বিভোর। ওর মতো সহজেই যদি ঘুমাতে পারতো সে! চোখে তন্দ্রা লেগে এসে আবারও কেটে যাচ্ছে। এখনও বিছানায় আসেনি সামার। জাহ্নবী বারবার এপাশ ওপাশ করে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগল।

সকালবেলা পারভীন বিছানা ছেড়ে উঠলেন না। জাভেদ আলী অনেকটা বাধ্য হয়েই জাহ্নবীকে ডেকে তুলে বললেন, ‘মা, একটু দেখো নাস্তা টাস্তা কিছু করা যায় কিনা। ছেলেটা মনেহয় উঠে পড়েছে।’

জাহ্নবী মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে প্রবেশ করলো। সূর্যের মিষ্টি আলোয় রান্নাঘর ঝলমল করছে। মন ভালো হয়ে গেল জাহ্নবীর। সোনালী রোদ্দুর গায়ে মেখে নাস্তা তৈরি করে নিলো সে। বেশ কয়েকবার মায়ের কথা মনে পড়ল তার। জাহ্নবী জানে পারভীন সুস্থ। শরীর একটু খারাপ হলেও রান্নাঘরে না আসার মতো খারাপ নয়। পারভীন ইচ্ছে করেই বিছানা ছাড়ছেন না। এই বয়সে এসে মা কেন এমন আচরণ করছেন জাহ্নবী বোঝে। কিন্তু চুপচাপ দেখা ছাড়া সত্যিই ওর কিছুই করার নেই।

খাবার টেবিলে অর্ণব ও জাভেদ আলী বসে আছেন। নাস্তা পরিবেশন করছে জাহ্নবী। সামার মুখ ধুয়ে নাস্তার টেবিলে বসে পড়ল। জাহ্নবী এক পলক সামারের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট নিশ্বাস ফেলল। ওর মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সামার চাইলেই পারতো বড় বোনকে সহায়তা করতে। অথচ কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে উলটে পালটে ঘুমাচ্ছিল এতক্ষণ। নাস্তা তৈরি হওয়ামাত্রই মুখ ধুয়ে টেবিলে বসে পড়ল।

জাহ্নবী নাস্তা পরিবেশন শেষে রান্নাঘরে এলো চা বানাতে। জাভেদ আলী খাবার খেতে খেতে অর্ণবের সঙ্গে গল্প করছেন। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে সামার। ওদের হাসাহাসির শব্দে জাহ্নবীর বুক ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। এই অর্থহীন জীবনকে আর এগিয়ে নিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়না ওর। মিছে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয়!

চায়ের দুধ উথলে চুলার আগুন নিভিয়ে দিলো। এমন সময় রান্নাঘরে প্রবেশ করলেন পারভীন। বিরক্তির সঙ্গে বললেন, ‘মন কোনদিকে যে থাকে মানুষের.. ‘

জাহ্নবী বলল, ‘মা তুমি এই শরীর নিয়ে রান্নাঘরে এসেছো কেন? তুমিও নাস্তা করে নাও।’
‘আর নাস্তা..’

একটা গভীর নিশ্বাস ফেললেন পারভীন। আজকাল মাকে দেখতেও দুঃখী দুঃখী লাগে। জাহ্নবী কয়েক সেকেন্ড মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। এরপর চা নিয়ে গেল খাবার টেবিলে।
জাভেদ আলী তখন জাহ্নবীকে নিয়েই কথা বলছিলেন, ‘ও তো সবসময় ফার্স্ট হতো। ম্যাট্রিকে তো আমাদের বোর্ডে নয় নাম্বার হয়েছিল। স্কুলের সব বাচ্চাকে মিষ্টি খাইয়েছি আমি। আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতেও মিষ্টির কার্টুন পাঠিয়েছি।’

জাহ্নবী নিঃশব্দে টেবিলে চা রেখে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। সামার বলল, ‘আপু তুই নাস্তা খাবি না?’
‘পরে খাবো।’
‘এখানে বস তো। সকাল থেকে এইগুলাই করলি। এখন আর কি কাজ আছে? নাস্তা খেয়ে নে।’

জাহ্নবী একবার জাভেদ আলীর দিকে তাকালো। চোখাচোখি হলো দুজনের। জাভেদ আলীর দৃষ্টি ভাষাহীন। সামারের জোরাজোরিতে জাহ্নবীও একটা চেয়ারে বসে পড়ল। অর্ণব দ্রুত চা শেষ করে বলল, ‘আংকেল আমি তাহলে উঠি?’
‘আরে না। কথাই তো শেষ হলো না। বসো গল্প করি।’

ইতস্তত বোধ করছে অর্ণব। জাহ্নবী বিষয়টা বুঝতে পেরে প্লেট হাতে নিয়ে সামারের ঘরে চলে গেলো। অর্ণব লজ্জায় মাটিতে দৃষ্টি নামিয়ে রাখলো। জাভেদ আলী সহজ গলাতেই বললেন, ‘তোমার বাবার ব্যাপারে কি যেন বলছিলে?’

সামার বলল, ‘আপনার বাবা সাঁতার কাটতে কাটতে মাঝপুকুরে গিয়ে ডুবে গেলেন। তারপর কী হলো?’
অর্ণব বলতে শুরু করলো। সামার বারবার হেসে উঠছিল অর্ণবের গল্প শুনে। জাভেদ আলীও দারুণ মজা পাচ্ছেন। রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে এই কাণ্ড দেখে বিরক্তবোধ করছেন পারভীন। ওনার অকারণেই মেজাজ বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। মেজাজ ঝাড়ার মতো সুযোগ পাচ্ছেন না। অবশেষে ভায়োলেটকে ডাকতে চলে এলেন তিনি।

লক্ষী মেয়ের মতো ঘুমাচ্ছে ভায়োলেট। বিছানার এক কোণায় বসে নাস্তা খাচ্ছে জাহ্নবী। পারভীন তিক্ত সুরে বললেন, ‘ও এখনও ঘুমাচ্ছে না? তাছাড়া আর করবে কি। কাম নেই কাজ নেই, সারাক্ষণ ঘুম। ডেকে তোল ওকে। আমার জীবনটা ছাড়খার করে দিলো এই মেয়েগুলো। এ জীবনে একবেলা শান্তিতে খাইতে পারলাম না ওদের জন্য।’

জাহ্নবী পরোটা মুখে দিয়ে স্তব্ধ হয়ে পারভীনের দিকে তাকিয়ে রইল। মা কী বলছেন সেটা কি উনি নিজেই বুঝতে পারছেন? এমন উলটা পালটা কথা কেন বলছেন তিনি! বাসায় মেহমান আছে। জাহ্নবী গম্ভীর হয়ে গেল। খাবার গলা দিয়ে নামছে না ওর।

ভায়োলেট চোখ কচলে বলল, ‘কী হয়েছে মা? এত চেঁচাচ্ছো কেন?’
পারভীন বললেন, ‘আমি চেঁচাচ্ছি? তাই তো মনে হবে। মাকে এখন ভালো লাগে না কারও।’

পারভীন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে ভায়োলেট বিছানা থেকে নামলো। জাহ্নবীকে ওর বিছানায় নাস্তা করতে দেখে বেশ অবাক হয়েছে ও। জাহ্নবী সচরাচর ওদের রুমে আসে না। হাই তুলতে তুলতে নির্বিকার ভঙ্গীতে বাথরুমে চলে গেলো ভায়োলেট।

জাভেদ আলী পারভীনকে শান্ত করার জন্য নিজের ঘরে গেছেন। টেবিলে মুখোমুখি বসে আছে অর্ণব ও সামার। অর্ণব বুঝতে পারছে না তার এখন উঠে রুমে যাওয়া উচিৎ হবে কী না? আবার এটাও বুঝতে পারছে না, এখানে সামারের মুখোমুখি বসে থাকাটা সঙ্গত কী না? দোটানায় ভুগছিল বেশ। সামার বলল, ‘আপনার চাকরি হবে বলে মনে হচ্ছে?’

অর্ণব ঠোঁট কামড়ে ধরে কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল, ‘মনে হয়, না। পরীক্ষা ভালো দেইনি।’
‘যদি চাকরি হয়ে যায়?’
‘হলেই তো ভালো।’
‘আপনার চাকরি হলে তখন কোথায় থাকবেন?’
‘জানি না। আগে তো হোক।’
‘জানেন না ভালো কথা। আমি জানিয়ে দিচ্ছি। আমাদের বাসায় আসবেন, খাবেন, রেস্ট নেবেন, গল্প গুজব করবেন। চাইলে ক্রিকেট খেলাও দেখতে পারেন। আমাদের টিভিটা অনেক বড়। বড় না?’
অর্ণব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, ‘জি।’
‘কিন্তু..’
‘কিন্তু কী?’
‘এটা এখন বলবো না। চাকরি হলে বলবো।’

অর্ণব অবাক হয়েছে ভীষণ। সামার খুব চনমনে একটা মেয়ে। এ ধরনের মেয়েগুলোকে ওর বেশ ভালোই লাগে। অর্ণব মুখে হাসি ধরে রেখে মাথা নিচু করে রইল। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘যদি চাকরিটা না হয়, তাহলে তো আমার আর কখনো এই কথাটা শোনা হবে না।’

সামার টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। অদ্ভুত হেসে বলল, ‘চাকরি না হলে এই কথাটা আপনার কোনোদিনো শোনার প্রয়োজন নেই।’

চলে গেল সামার। কিন্তু অর্ণবের বড্ড মন উশখুশ করতে লাগল। সামার কী কথা বলতে চাইছে সেটা শোনার জন্যই ওর চাকরি হওয়াটা ভীষণ জরুরি।

ভায়োলেট হাতমুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে এসে দেখল টেবিলে অপরিষ্কার থালাবাসন পড়ে আছে। নাস্তা না খেয়ে আগে সেগুলো রান্নাঘরে নিয়ে এলো সে। সব বাসন পরিষ্কার করে তারপর নাস্তা করার জন্য টেবিলে এসে বসলো। আম্মুর মেজাজ খারাপ মানে অনেক্ষণ সে রুম থেকে বের হবে না। ভায়োলেট খাবার খাওয়ার সময় জাহ্নবীর ঘর থেকে অর্ণবকে বেরিয়ে আসতে দেখে প্রথমে ভড়কে গেল ভায়োলেট। পরক্ষণেই বুঝতে পারলো নিশ্চয়ই ইনি কোনো মেহমান, যার কারণে জাহ্নবী আজ ওদের রুমে বসে নাস্তা খাচ্ছিল।

ভায়োলেট বলল, ‘আপনি কে? চিনতে পারলাম না তো?’
‘আমি অর্ণব।’
‘ও আচ্ছা। বাবার গেস্ট?’
‘জি।’
‘ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে চলে যাচ্ছেন নাকি?’
‘জি।’
‘ওহ আচ্ছা।’

ভায়োলেট খাবারের দিকে মনোযোগ দিলো। অর্ণব বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভায়োলেটের খাবার খাওয়া দেখছিল। ভায়োলেট মুখ তুলে ওর দিকে তাকাতেই অর্ণব বলল, ‘আংকেল কোথায়? ওনাকে বলে যেতাম।’
‘আপনি সোফায় বসুন। আমি ডাকছি।’

ভায়োলেট খাবারের মাঝখানে উঠে বাবাকে ডাকতে গেল। বসে রইল অর্ণব। জাভেদ আলী বলেছিলেন ওনার তিনজন মেয়ে। কিন্তু তিনটা মেয়েই এত বড় হয়ে গেছে সেটা ভাবে নি অর্ণব। যার বাসায় এমন বড় বড় মেয়ে থাকে, সেখানে মেহমান হয়ে যেতেও লজ্জা লাগে।
জাভেদ আলী এসে বললেন, ‘সে কী, তুমি এখনই চলে যাচ্ছো নাকি? দুপুরে খেয়ে বের হইয়ো।’

‘না আংকেল। আমি এখন থানায় গিয়ে একটা জিডি করবো। তারপর চলে যাবো। এখানে থেকে আসলেই আমার কোনো লাভ নেই।’
‘তাই বলে এখনই তোমাকে যেতে দিবো নাকি? তুমি বিশ্রাম করো। তোমার সঙ্গে গল্প গুজব করি।’

অর্ণব ইতস্ততবোধ করছে। ভায়োলেট আবারও এসে বাকি খাবারটা খাওয়া শেষ করলো। অর্ণবের ব্যাপারে কোনো আগ্রহই নেই ওর। খাবারটা মজা হয়েছে, সেটাই আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছে ভায়োলেট। বড় আপুর হাতের রান্না খেলেই বুঝতে পারে ও।

অর্ণবকে বাবা ধরে রাখলেন। প্রায় এক ঘন্টা বসে গল্প করলেন ওনারা। পারভীন নিজের রুমে শুয়ে রইলেন। অর্ণবকে একবার দেখেই দেখার ইচ্ছে মরে গেছে ওনার। চলে যাওয়ার সময় জাভেদ আলী এসে বললেন, ‘ ছেলেটা বিদায় নেয়ার জন্য ডাকছে তোমাকে।’
পারভীন বললেন, ‘ডাকুক। বলো আন্টির শরীর খারাপ।’
‘সে কি! যাও গিয়ে বিদায় টা দিয়ে আসো।’
‘সে কি আমার ঘরের জামাই নাকি? না আমার ছেলে? উঠতে পারবো না। তোমার গেস্ট, তুমি বিদায় দিয়ে আসো।’

জাভেদ আলীর মন খারাপ হলো। তথাপি মুখে হাসি নিয়ে তিনি অর্ণবের কাছে গিয়ে বললেন, ‘তোমার নান্টির শরীর খারাপ, শুয়ে আছে।’
‘ সমস্যা নেই। আন্টিকে আমার সালাম দিবেন।’
‘অবশ্যই।’

জাভেদ আলী অর্ণবকে বাসার সামনে রাস্তায় এসে রিকশায় তুলে দিলেন। রিকশা ছেড়ে দিলে পেছন থেকে ডেকে তিনি নিজেও উঠে পড়লেন রিকশায়। থানায় যাবেন জিডি করাতে। আসলে এই মুহুর্তে ওনার কোনো কাজ নেই। বাসায় ফিরে পারভীনের সামনে বসে থাকতে একদমই ইচ্ছে করছে না।

জাহ্নবী ঘরে এসে বিছানা গুছিয়ে নিলো। মাত্র একরাত্রি অতিথি ঘুমিয়েছে এখানে, অথচ ওর মনে হচ্ছে চাদরটা ধুয়ে দেয়া উচিৎ। কিন্তু এইমুহুর্তে চাদর ধোয়ারও ইচ্ছে নেই। বিছানা থেকে চাদর সরিয়ে তোষকের ওপর শুয়ে রইল সে। সামার এসে ওর টেবিলের ওপর একটা একশো টাকার নোট রেখে বলল, ‘আপু এই যে তোর টাকা।’

জাহ্নবী উত্তর দিলো না। মাথা তুলে তাকালো না অব্দি। সামার বলল, ‘আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। আম্মুকে বলিস।’

দরজা আটকে দিয়ে সামার বেরিয়ে গেল। জাহ্নবী চোখ মেলে একটা নিশ্বাস ফেলল। সামার প্রায় প্রতিদিনই বাইরে যায়। পড়াশোনা শেষ করার পরও ওর যাওয়ার জায়গার অভাব নেই। বন্ধু বান্ধবীদের নিয়ে আড্ডা দেয়া, মার্কেটে ঘোরাঘুরি করা আবার কখনো লম্বা ট্রিপে ঢাকার বাইরে চলে যায় ও। ভীষণ আনন্দে আছে মেয়েটা। জাহ্নবীর মাঝেমাঝেই মনে হয়, এই শহরের সবচেয়ে আনন্দিত মেয়েটা সামার। ওর নাম আসলে আনন্দিতা হওয়া উচিৎ ছিল। জাহ্নবী চাইলেও কখনো ওর মতো হতে পারবে না। কোনো মেয়েই পারবে না।

এমন সময় ফোনে ভাইব্রেশনের আওয়াজ হলো। জাহ্নবী নোটিফিকেশন চেক করে দেখলো একটা নতুন ইমেইল এসেছে। কিছুদিন আগে চাকরির জন্য আবেদন করেছিল সে। সেখানে ইন্টারভিউয়ের তারিখ জানিয়েছে তারা। খুশিতে টগবগ করে উঠলো জাহ্নবীর মন। চাকরিটা হলে সে ব্যস্ত থাকার একটা কারণ পেয়ে যেতো।

চলবে..