মেঘফুল পর্ব-১৭+১৮+১৯

0
338

উপন্যাসঃ মেঘফুল
পরিচ্ছেদঃ ১৭
লেখকঃ মিশু মনি

সন্ধ্যার পর হলুদ আলোয় রাঙা একটা রেঁস্তোরায় বসে আছে জাহ্নবী ও ভায়োলেট। লোকটার সঙ্গে এখানেই দেখা করার কথা। এখনো আসছেন না তিনি। এই সময়ে রাস্তায় খুব জ্যাম থাকে, জাহ্নবীর অপেক্ষা করতে খারাপ লাগছে না। সে তার সময়মতই আসুক।

পুরো রেঁস্তোরায় মাত্র চারজন ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ নেই। দরজা ঠেলে একজন ব্লেজার পরা লোককে আসতে দেখে জাহ্নবী নিশ্চিত হল ইনিই সেই! লোকটার দিকে তাকালে সবার আগে যে জিনিসটার দিকে চোখ যায় সেটা হচ্ছে ওনার মেদ। বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে যেটা। জাহ্নবীর এসব নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। মানুষটা কেমন সেটাই আসল কথা।

মানুষটার সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল তিনি লোক ভালো। ক্লিন সেভ করার কারণে ওনাকে বেশ ভদ্রলোক মনে হচ্ছে।
জাহ্নবীর সামনে বসেই তিনি বললেন, ‘আপনারা কিছু খান নি?’
জাহ্নবী মনেমনে ভাবল, ‘এখানে এসেছি আপনাকে দেখতে। এসেই খাওয়াদাওয়া শুরু করবো? কী অদ্ভুত!’
তিনি বললেন, ‘আমি অবশ্য খেয়েই বের হয়েছি। আমার এখন কিছু খাওয়ার দরকার নেই। আপনাদের জন্য অর্ডার দেই। কী খাবেন বলেন?’

ভায়োলেট দুষ্টুমি করে বলল, ‘আপনার খাবার কী এখনো পেটে আছে?’
‘মানে!’
‘না, কিছু না।’
মুচকি হাসল ভায়োলেট। লোকটা তার মশকরা বুঝতে পারে নি। সিরিয়াস মুখ করে রেখেছে এখনও। বললেন, ‘আমি আবার কম খাবার খাই। আর ফাস্টফুড এভোয়েড করার চেষ্টা করছি এখন।’
‘মেদ বাড়ছে বলে?’
‘ঠিক তা নয়, ফাস্টফুড জাতীয় খাবার কম খাওয়াই ভালো।’
‘ওহ আচ্ছা।’

জাহ্নবী চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইল। লোকটা কী পরিচয় জানতে চাইবে না নাকি? অনেক্ষণ নিরবে কেটে যাওয়ার পর জাহ্নবী বলল, ‘আপনার সঙ্গে পরিচিত হওয়া দরকার।’
‘অবশ্যই। আমি মোস্তফা কামাল। মালয়েশিয়ায় একটা ব্যবসা আছে আমার। নতুন ব্যবসা। আগে অবশ্য চাকরি করতাম। এখন ব্যবসা শুরু করেছি। অন্যের আন্ডারে কাজ করতে আর ভালো লাগে না। অনেক কষ্টই তো করলাম জীবনে। আপনাদের নাম কি? আচ্ছা, আপনাদের মধ্যে জাহ্নবী কে?’

জাহ্নবী ও ভায়োলেট একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। ভায়োলেট মুখ থমথমে করে তাকিয়ে আছে। জাহ্নবী বলল, ‘আমি।’
লোকটা এতক্ষণ দুজনের দিকেই তাকিয়ে কথা চালিয়ে যাচ্ছিল। এবার সে জাহ্নবীর দিকে মনযোগ দিলো। জানতে চাইলো,
‘আপনি পড়াশোনা শেষ করেছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘অনার্স না মাস্টার্স?’
‘মাস্টার্স।’

লোকটা বলল, ‘ওহ, ভালো তো। আমি মাস্টার্স করতে পারিনি। অনার্স সেকেন্ড ইয়ার পর্যন্ত পড়ে বিদেশে দৌড় দিছি। লাইফটা অনেক কমপ্লেক্স। পড়াশোনা সবার জন্য না।’
জাহ্নবী চুপ করে রইল। এই কথার উত্তরে কিছু বলার মতো খুঁজে পাচ্ছে না সে। লোকটা বারবার এক আঙুল দিয়ে কান চুলকাচ্ছে। আঙুল কানের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে নাড়াচ্ছে। বিব্রতবোধ করছে জাহ্নবী।

মোস্তফা কামাল বললেন, ‘আমি অনেক স্ট্রাগল করে মানুষ হইছি বুঝছেন। আমি যখন ইন্টারে পড়ি, তখন আমার আব্বা মারা যান। এরপর থেকে আর পড়াশোনা চালানোর মতো সুযোগ ছিল না। তবুও অনেক কষ্টে অনার্সে ভর্তি হই। দুই ভাই, চারবোনের সংসার আমাদের। আমার মা একদম গৃহিণী ছিলেন। কিছুই করতেন না। ওনার পক্ষে এত বড় সংসার টানা সম্ভব ছিল না। আমি ছিলাম সবার বড়। আমার চারবোন তখন ধীরেধীরে বিয়ের উপযুক্ত হয়ে উঠতেছে। মাথার ওপর অনেক চাপ ছিল। তো ভাবলাম আমাকে দেশের বাইরেই যাইতে হবে। জায়গা জমি যা ছিল সব বিক্রি করে বাইরে চলে যাই। ধার দেনাও হইছিল অনেক। প্রথম একটা বছর অনেক কষ্ট হইছে। যা কাজ পাইছি, সেটাই করছি। এমন কোনো কাজ নাই যেটা আমি করিনাই। দেশে টাকা পাঠাইতে হবে তো! এরপর আস্তে আস্তে কাজ করতে করতে দেশে টাকা পাঠানো শুরু করি। নিজে কিছুই খাইতাম না। বলতে গেলে তিনবেলা ভালোমতো ভাতও খাই নাই। সব দেশে পাঠাইছি। আমার ভাই পড়াশোনা করছে, বোনদেরকে খরচ দিছি। পাঁচ ছয় বছরের মধ্যেই বোনদেরকে বিয়ে দিয়ে দিছি। সবার ভালো ঘরেই বিয়ে হইছে। ওরা সবাই ভালো আছে। বড় বোনের মেয়ে ক্লাস এইটে উঠলো এইবার। হা হা। আমি এখনো বিয়েই করি নাই।’

মোস্তফা কামাল থামলেন। একটা নিশ্বাস নিলেন। ওনার চেহারায় এক ধরনের প্রশান্তির ছাপ ফুটে উঠল। সবার পাশে দাঁড়াতে পেরে তিনি গর্বিত, আনন্দিত। জাহ্নবী তাকিয়ে রইল ওনার দিকে।
তিনি কিছুক্ষণ পর আবারও বলতে শুরু করলেন, ‘এখন আমার গ্রামে ভালো অবস্থা। জায়গা জমি কিনছি, বাড়ি করছি। তিনতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে বাড়ি করছি কিন্তু শুধু নীচতলার কাজ হইছে। ওটা আস্তেধীরে করা যাবে। আমার ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী আর মা থাকে ওই বাড়িতে। মাঝেমাঝে বোনেরা বেড়াতে আসে। মা নিজের মতো থাকে।’

ভায়োলেট জানতে চাইলো, ‘আপনি বিয়ের কতদিন পর মালয়েশিয়া চলে যাবেন?’
‘এইতো আড়াই মাস পর।’
‘স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়ার প্লান আছে?’

মোস্তফা কামাল কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। ওনাকে চিন্তিত মনে হল। মাথা চুলকালেন তিনি। তারপর মুচকি হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ সেটা তো আছেই। আমার ব্যবসাটা আরেকটু বাড়ুক। একটু সময় লাগবে আরকি। এখন বিয়ে করে স্ত্রীকে গ্রামে রেখে যাবো। মা’র সাথে থাকবে। এরপর আমি সব গুছিয়ে নিয়ে তারপর…’

ভায়োলেট জাহ্নবীর দিকে তাকালো। জাহ্নবী কিছু জানতে চাইলে জিজ্ঞেস করতে পারে। কিন্তু জাহ্নবী কী জিজ্ঞেস করবে বুঝতেই পারছে না। ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে ওনার কথাগুলো শুনছে সে। এই লোকটা কী তার মেঘের মানুষ? হয়তোবা, হয়তো না। লোকটাকে দেখে স্বপ্নের সেই মেঘের মানুষ মনে হচ্ছে না কেন!

মোস্তফা কামাল বললেন, ‘শুনেছি আপনি চাকরি করেন? কিসের চাকরি?’
ভায়োলেট বলল, ‘চাকরি করলে আপুকে গ্রামে রেখে যাবেন কীভাবে? ওকে তো ঢাকাতেই থাকতে হবে।’

মোস্তফা কামাল মুচকি হাসলেন। উত্তর দিলেন না। খাবারের মেনু এগিয়ে দিলেন জাহ্নবীর দিকে। জাহ্নবী ভায়োলেটকে অনুরোধ করল। অবশেষে খাবার অর্ডার করল ভায়োলেট।
খাবার খেতে খেতে মোস্তফা কামাল জাহ্নবীকে বললেন, ‘আপনি প্রবাসী ছেলে পছন্দ করেন? অনেকেই তো প্রবাসীদের বিয়ে করতে চায় না।’
জাহ্নবী ম্লান হাসল। এর উত্তর হতে পারে, হ্যাঁ অথবা ‘না। মোস্তফা কামাল কী ভাবলেন সেটা স্পষ্ট হলো না। জাহ্নবীর জানতে ইচ্ছে করছিল, লোকটা কী বৃষ্টিতে ভিজতে পছন্দ করে? খোলা বারান্দায় ভিজতে ভিজতে জাহ্নবীর হাত ধরে থাকতে ভালো লাগবে ওনার? কিন্তু জাহ্নবী জিজ্ঞেস করতে পারল না। মাথা নিচু করে রইল। সামার হলে ঠিকই মুখ ফুটে বলতে পারত, কিন্তু সে এটা কখনোই পারবে না!

মোস্তফা কামাল চলে যাওয়ার আগে জাহ্নবী ও ভায়োলেটকে রিকশায় তুলে দিলেন। রিকশা ভাড়া দিয়ে দিলেন জোর করে। জাহ্নবী দ্বিধাগ্রস্ত মনে বাড়ি ফিরল। এই দ্বিধা হচ্ছে মোস্তফা কামালকে তার ভালো লেগেছে নাকি লাগেনি সেটা নিয়ে। মাঝেমাঝে মনটাও মন্তব্য জানাতে ভুল করে। ভুল সিগন্যাল দেয়!

গোসল সেরে ভেজা চুলে বিছানার ওপর বসল জাহ্নবী। এক কাপ কফি নিয়ে এলো ভায়োলেট। জাহ্নবী আশা করেছিল ভায়োলেট ছেলেটার ব্যাপারে তার সঙ্গে আলোচনা করবে। কিন্তু কিছুই বলল না ভায়োলেট। কফিটা রেখে নিভৃতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

রাত্রিবেলা পারভীন একবার জানতে চেয়েছিলেন, ‘ছেলেকে কেমন দেখলি?’ জাহ্নবী উত্তর দিয়েছে, ‘ভালো। ছেলে কিছু জানায় নি?’
পারভীন উত্তর দিলেন, ‘না।’

জাহ্নবী ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আশা করছিল ভায়োলেট তার রুমে শুতে আসবে। গত কয়েকদিন তার সঙ্গেই ঘুমিয়েছে ভায়োলেট। কিন্তু আজ সে এলো না। হয়তো আপুকে একা থাকতে দেয়া উচিৎ বলেই এলো না। জাহ্নবী বিছানায় শুয়ে অনেক্ষণ এপাশ ওপাশ করল। দোলন চাচা আগামীকাল চলে যাবেন। তিনি নিশ্চয়ই চলে যাওয়ার আগে ভালো বা মন্দ কিছু একটা জানিয়ে যাবেন। জাহ্নবীর আর এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করছে না। মৃদু শব্দে রবীন্দ্র সংগীত শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ল সে।

সকালের নাস্তা খেয়ে অফিসে রওনা দিলো জাহ্নবী। মোস্তফা কামালের ব্যাপারটা বারবার মনের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। লোকটা যদি তাকে পছন্দ করে ফেলে, তাহলে কী জাহ্নবী বিয়েটা করবে? ওর পরিবার খুশি হবে এই মুহুর্তে সে বিয়ে করলে। কিন্তু দোটানায় ভুগছে জাহ্নবী। কোনোরকম সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। মোস্তফা কামালকে তার ভালো লেগেছে কী না, এই প্রশ্নে দ্বিধান্বিত হয়ে আছে।
নাদির সাহেব এসে বললেন, ‘হ্যালো মিস জাহ্নবী, হোয়াট এবাউট ইউ?’
‘ফাইন, স্যার।’
‘গতকাল আপনাকে যে মেইলটা পাঠিয়েছিলাম সেটা দেখেছেন?’
‘সরি স্যার। আমি আসলে দেখতে পারিনি। গতকাল আমার ব্যক্তিগত কিছু কাজ ছিল। আই এম রিয়েলি সরি।’
‘ইটস ওকে। মেইলটা চেক করুন। ফ্রেশ থেকে কোনো রেসপন্স আসলে আমাকে জানাবেন।’
‘জি, স্যার।’

নাদির সাহেব দ্রুত চলে গেলেন। লোকটা এক ধরনের মৃদু অথচ দৃঢ় পারফিউম ব্যবহার করে। উনি কাছে এলেও খুব একটা ঘ্রাণ নাকে আসে না। অথচ চলে গেলেও মনে হয় কোথাও একটা ঘ্রাণ ফেলে গেছেন। যেটা এখনো ওনার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

জাহ্নবী কাজে মন দিতে পারল না। মোস্তফা কামাল এখনো তার মগজে কিলবিল করছে। লোকটার সবকিছু ঠিক আছে, তারপরও কী যেন নাই! জাহ্নবী অস্থির হয়ে উঠে হাঁটা শুরু করল।
তার রুমের পাশেই বিশাল জানালা। কাঁচের স্বচ্ছ এই জানালা প্রতি একদিন পরপর পরিষ্কার করা হয় বলেই সারাক্ষণ ঝকঝক করতে থাকে। এই জানালায় দাঁড়ালে বাইরের পৃথিবীকে অনেক নিস্তব্ধ মনে হয়। আজ আকাশটা মেঘলা। বৃষ্টি হলে জাহ্নবী সব কাজ ফেলে বৃষ্টি দেখতে পারত।
‘আমরা কেউই ব্যক্তিগত সমস্যার বাইরে নই।’

কথাটা শুনে চমকে উঠে পাশ ফিরে জাহ্নবী দেখল নাদির সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। এই জানালার মতোই স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর স্পষ্ট তাকিয়ে আছে ওনার দুটো শীতল চোখ। জাহ্নবী ওনার দিকে তাকানো মাত্রই তিনি আরেকটা লাইন যুক্ত করলেন।
‘কিন্তু আমাদের উচিৎ কর্মস্থলে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের ব্যক্তিগত জীবনকে দরজার বাইরে রেখে আসা। অফিস ছুটি হলে আপনি আবার ব্যক্তিগত সমস্যাকে দরজা থেকে ধরে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারেন।’

জাহ্নবীর ভীষণ ভালো লেগে গেল কথাটা। ম্যাজিকের মতো কাজ করল ওর জীবনে। যদি সত্যিই এমন হতো, কতই না মজা হতো! সমস্যাকে দরজার বাইরে রেখে আসা যেত যদি..
নাদির সাহেব বলল, ‘কী ভাবছেন? সমস্যাকে বাইরে রাখতে যাবেন?’
জাহ্নবী মুচকি হেসে বলল, ‘হুম।’
‘যান। অনুমতি দিলাম।’

অভিভূত হল জাহ্নবী। মুখে প্রসন্ন হাসি ফুটে উঠল তার। নাদির সাহেবকে ধন্যবাদ জানিয়ে অফিসের প্রধান দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। পিছন ফিরে এক পলক নাদিরকে দেখার ইচ্ছে হল। ইচ্ছেটাকেও সঙ্গে নিয়ে চলল জাহ্নবী।
অফিসের প্রধান দরজার বাইরে আসতেই এক রাশ দমকা হাওয়া এসে গায়ে লাগল। নিজেকে সতেজ লাগল অনেকটা। জাহ্নবী কয়েক পা হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘মোস্তফা কামাল, আপনি আমাকে আর অশান্তি দেবেন না প্লিজ। আপনাকে নিয়ে আমি এখন একদমই ভাবতে চাই না। আমাকে মন দিয়ে আমার কাজ করতে দিন। আমি একটা সুখী মেয়ে হতে চাই, অনেক সুখী মেয়ে। আপনি এখন আমার অফিসের ভেতরে যাবেন না। এখানেই থাকুন।’

কথাটা বলে জাহ্নবী দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। নিজেকে হালকা লাগছে তার। মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি মোস্তফা কামালকে নিয়ে হওয়া টেনশন সহ তার সমস্ত দুশ্চিন্তাকে বাইরে রেখে আসতে পেরেছে। একদম নির্ভার হৃদয় নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল জাহ্নবী।
নিজের ডেস্কে এসে নাদির সাহেবকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য খুঁজছিল সে। ওনাকে কোথাও দেখা গেল না। জাহ্নবী মুচকি হেসে কাজে মন দিলো।

বাড়ি ফিরে দেখল মা ঘরের দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছেন। আবারও ওনার চিরচেনা ডিপ্রেশনের জগতে প্রবেশ করেছেন কী না কে জানে! সামার ও ভায়োলেট কেউই বাসায় নেই। জাহ্নবী এক কাপ চা খেয়েই শুয়ে পড়ল। মাথা ব্যথা করছে তার।
জাহ্নবীর ঘুম ভাংল ভায়োলেটের ডাকে। রাত দশটা বাজে। ভাত খেতে ডাকছে ভায়োলেট। জাহ্নবী ভায়োলেটকে বলল, ‘কোথায় গিয়েছিলি?’
‘তোর জন্য বাসা দেখতে।’
‘কেন!’
‘তুই নতুন বাসায় উঠবি না?’
‘আমার আসলে তোদের সবাইকে রেখে একা একা থাকার কোনো ইচ্ছেই নেই।’

ভায়োলেট খানিক্ষণ জাহ্নবীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘সত্যি?’
‘হুম।’
‘ঠিক আছে। তাহলে আর বাসা খুঁজবো না।’
‘ভায়োলেট, ছেলেটা কিছু জানিয়েছে?’
‘কোন ছেলে?’
‘মোস্তফা কামাল?’
‘উনি ছেলে না আপু, উনি একটা লোক। ওনার সঙ্গে তোমাকে একদমই মানাবে না। ওনার কথা বাদ দাও।’

জাহ্নবী বলল, ‘মানাবে না মানে কি? সবাই আল্লাহ’র সৃষ্টি। এভাবে বলিস না। আমি নিজেও দেখতে আহামরি কিছু না।’
‘আমি ওনার সঙ্গে চেহারা নিয়ে মানানোর কথা বলিনি। আমি বলতে চাচ্ছি মাইন্ড সেটআপের কথা। একটা মানুষের মাইন্ডসেট টাই আসল। ওনার মাইন্ডসেটআপ আর তোমার মাইন্ডসেটআপ কখনো মিলবে না। কাজেই ওনার কথা ভাবা বাদ দাও।’
‘আচ্ছা। বাদ দিলাম। এরপর বাসায় কী বলবো?’

ভায়োলেট চলে যেতে যেতে বলল, ‘সেটা আমি দেখছি।’

ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ভায়োলেট। জাহ্নবীর মন ফুরফুরে হয়ে উঠল। মনে হচ্ছে এইমুহুর্তে সে একটা বিশাল ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়েছে। মোস্তফা কামালের ব্যাপারটা তাকে ভীষণ যন্ত্রণায় ফেলে দিয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে ভায়োলেট ঠিকই বলেছে। দুজনের মানসিকতা এক হবে না।

জাহ্নবী হাতমুখ ধুয়ে ভাত খেতে আসল।
খাওয়া শেষে সবাই টেবিল ছেড়ে চলে গেলে পারভীন জাহ্নবীকে বললেন, ‘তোর অফিস কেমন চলে রে?’
‘ভালো।’
‘তোকে একটা কথা বলবো, রাখবি?’
‘হ্যাঁ। বলো মা?’
পারভীন একটা নিশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ জাহ্নবীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘অর্ণবকে তোর ভালো লাগে?’

জাহ্নবী অবাক হল। মোস্তফা কামালকে বাদ দিয়ে মা এখন অর্ণবকে নিয়ে লেগেছে কেন! বিস্মিত চোখে মা’র দিকে তাকিয়ে রইল জাহ্নবী।
পারভীন বললেন, ‘আমার একটা অনুরোধ রাখ। অর্ণব অনেক ভালো একটা ছেলে। ওকে আমার খুব পছন্দ। আমি আগামীকাল ওকে বাসায় আসতে বলবো। তুই সেজেগুজে থাকবি। সামার ও ভায়োলেটকে ওর সামনে যেতে মানা করবি। তুই একা ওর সঙ্গে গল্পগুজব করবি।’
জাহ্নবী পারভীনের মুখ থেকে দৃষ্টি সরাতে পারল না। হা করে চেয়ে রইল সে।

পারভীন বললেন, ‘পারবি না? এই কাজটা অন্তত কর। আমাকে এবার তোরা একটু শান্তি দে। তোর বাপকে বলছিলাম অর্ণবের ফ্যামিলির সঙ্গে কথা বলতে। সে একটা মাথামোটা। এসবের কিছু পারবে না। তার নাকি লজ্জা লাগে। তুই এখন যেভাবে পারিস কাজটা কর। অর্ণবকে আমি তোর সঙ্গে বিয়ে দিতে চাই।’

জাহ্নবী এখনো ফ্যালফ্যাল করে পারভীনের দিকে তাকিয়ে আছে। অসহ্য লাগছে ওর। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে মনে হচ্ছে। অনেক কষ্টে সে বলল, ‘মোস্তফা কামাল আমাকে পছন্দ করে নাই, তাই না?’
পারভীন উত্তর দিলেন, ‘ তা আর করবে কেন? এই বয়সের মেয়েকে কেউ পছন্দ করে? চেহারা হইছে বুড়ির মতোন। বুড়িকে কে বিয়ে করতে চায়? সে ভায়োলেটকে পছন্দ করছে। দোলন ভাই এখন চাইতেছে ভায়োলেটের সঙ্গে বিয়ে দিতে। আমি কেন দিবো? আমার মেয়ে রাজকন্যার মতোন। ওর মতো বুড়া লোকের সঙ্গে আমি ভায়োলেটকে বিয়ে দিবো? আমার মাথা খারাপ? মুখের ওপর না করে দিছি।’

জাহ্নবী অবাক হল। মাকে মাঝেমাঝে বুঝতে পারে না সে। রেগে গেলে মানুষ অদ্ভুত আচরণ করে। আর বাংলাদেশী সমাজে মানুষ সবসময়ই অদ্ভুত আচরণ করে। মোস্তফা কামালের বয়স আটত্রিশ। অথচ পঁয়ত্রিশ বছরের একটা মেয়েকে বিয়ে করতে তার সমস্যা! সে বাইশ বছরের মেয়েকে বিয়ে করতে চায়! আর পারভীন আটত্রিশ বছরের একটা ছেলেকে বুড়া ভাবছে। যার সঙ্গে ভায়োলেটকে বিয়ে দিতে চান না, অথচ জাহ্নবীর সঙ্গে এই লোকটাকেই বিয়ে দিতে চান তিনি। কারণ তিনি নিজেও জাহ্নবীকে বুড়ি বলেই সম্বোধন করছেন। পঁয়ত্রিশে কি কোনো মেয়ে বুড়ি হয়ে যায়?

জাহ্নবী নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে বসে রইল। এত বিরক্ত লাগছে সবকিছু! ইচ্ছে করছে বাড়ির বাইরে গিয়ে সব সমস্যা দরজার বাইরে রেখে আসতে। জাহ্নবী বিরক্তমুখে অনেক্ষণ হাঁটাহাঁটি করল। অসহ্য লাগছে।
দরজা খুলে ভায়োলেটের ঘরে এলো সে। ভায়োলেট কিছুক্ষণ আগেই ঘুমিয়েছে। রাত এগারোটার পর সে আর জেগে থাকতে পারে না। জাহ্নবী ভায়োলেটকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিলো। চোখ পিটপিট করে তাকালো ভায়োলেট।

জাহ্নবী বলল, ‘তুই আমার জন্য বাসা খুঁজে দে। আমি কালকেই এই বাড়ি থেকে চলে যাবো। আমার কালকের মধ্যেই বাসা লাগবে।’
ভায়োলেট এখনও চোখ কচলাচ্ছে। কিছুই বুঝতে পারছে না সে। জাহ্নবী কিছুক্ষণ আগেও তাকে বলেছে, সে এই বাড়ির সবাইকে ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না। এই অল্প সময়ের মধ্যে আবার কী হল! নিশ্চয়ই আপু শুনে ফেলেছে মোস্তফা কামাল তাকে নয়, ভায়োলেটকে পছন্দ করেছে। তাই এত রাগ!

জাহ্নবী বলল, ‘তুই কী শুনতে পাচ্ছিস আমার কথা? আমাকে কিন্তু কালকের মধ্যেই বাসা খুঁজে দিবি।’

সামার অবাক হয়ে ওদের কাণ্ড দেখছে। জাহ্নবীর রাগত মুখ লাল হয়ে উঠেছে ইতিমধ্যেই। নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিলো সে। কিচ্ছু ভালো লাগছে না।
জাহ্নবী ফোন হাতে নিয়ে দেখল নাদির সাহেবের কল! এত রাতে স্যার কল দেয়ার মানুষ নন। তবে?

চলবে..

উপন্যাসঃ মেঘফুল
পরিচ্ছেদঃ ১৮
লেখকঃ মিশু মনি

নাদির স্যার এত রাতে ফোন করেছেন, বিষয়টা ভাবিয়ে তুলল জাহ্নবীকে। ভয়ে ভয়ে ফোন কানে ধরল জাহ্নবী। ওপাশ থেকে নাদির সাহেবের গলা শোনা গেল, ‘মিস জাহ্নবী?’
‘জি স্যার।’
‘অনেক রাত আসলে, আমি সরি অনেক রাতে ফোন করেছি।’
‘সমস্যা নেই স্যার। বলুন?’
‘We have an emergency meeting tomorrow.আজ রাতের মধ্যেই কিছু কাগজপত্র রেডি করতে হবে। Can you do the job?’
‘জি স্যার। কী কী রেডি করতে হবে আমাকে বলুন?’
‘আমি ফাইলগুলোর ছবি আপনাকে পাঠাতে পারি। সবগুলো এলোমেলো অবস্থায় আছে। সাজিয়ে গুছিয়ে একটার পর একটা এভাবে টাইপ করে ডকুমেন্টস ফাইলে সাজাতে হবে।’
‘জি স্যার। পারবো। আপনি ছবিগুলো আমাকে পাঠিয়ে দিন।’
‘থ্যাংক ইউ মিস জাহ্নবী। আমি যাকে কাজটা দিয়েছিলাম, একচুয়েলি তিনি সবকিছু আরও গুবলেট বানিয়ে ফেলেছেন। And I think you can only do that.
‘ধন্যবাদ স্যার। আমাকে যোগ্য মনে করার জন্য।’

নাদির সাহেব কল কেটে দিলেন। জাহ্নবী মেইলে প্রবেশ করে দেখল স্যার বেশ কিছু ছবি পাঠিয়েছেন। সবগুলো ছবি ফোনের গ্যালারিতে সেভ করে ল্যাপটপে কাজ শুরু করল জাহ্নবী। কাজে মন দেয়ার পর ধীরেধীরে মাথা থেকে অর্ণবের ব্যাপারটা দূর হয়ে যেতে শুরু করেছে।

কাজের ফাঁকে জাহ্নবী এক মগ কফি বানিয়ে আনলো। কফি খেতে খেতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত দুইটা বাজে। ভীষণ অবাক হল জাহ্নবী। কাজ করতে গিয়ে কখন এত রাত হয়ে গেছে টেরই পায়নি সে! বাকি কাজটা শেষ করতে করতে সারে তিনটা বেজে গেল। ভোরবেলা ঘুমাতে গেল জাহ্নবী। এই প্রথম কোনো রাত জাগাটাকে সে আনন্দ নিয়ে উপভোগ করেছে। সবসময় রাত জেগে ভোরে ঘুমাতে যাওয়াটা হত ডিপ্রেশন। আর আজকে কাজ করতে করতে ভোর হওয়াটা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা একটা রাত্রি।
সকাল সাতটায় ফোনের এলার্ম বাজতে শুরু করেছে। তাড়াহুড়ো করে জাহ্নবী গোসল সেরে অফিসের জন্য তৈরি হল। আজকে মা এখনো ঘুম থেকে ওঠেননি। কিংবা ঘুম থেকে উঠেছেন, ঘরের বাইরে আসেননি। এইমুহুর্তে নাস্তা বানানোর সময় নেই একদমই। জাহ্নবী এক গ্লাস পানি খেয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

অর্ণবের ব্যাপারে জাহ্নবী কিছুই ভাবতে চায় না। মোস্তফা কামালকে বিয়ে করা যেতেই পারে, কিন্তু অর্ণবকে বিয়ে করা একদমই অসম্ভব। মা’র নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়েছে। অর্ণবের কথা না ভাবতে চাইলেও মোস্তফা কামাল জাহ্নবীকে ফিরিয়ে দিয়েছে, এটা ভাবলেই রাগে ও কষ্টে জাহ্নবীর চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে।

অফিসের দরজায় এসে জাহ্নবী বলল, ‘অর্ণব টর্ণব কাউকে আমি চিনিনা। আমি কোনো মোস্তফা কামালকেও চিনিনা। আমি জাহ্নবী। আমি একটা সুখী মেয়ে।’
কথাটা বলে অফিসে প্রবেশ করল জাহ্নবী। বেশ হালকা লাগছে। তারান্নুম নামে একজন সহকর্মী জাহ্নবীকে বলল, ‘কী অবস্থা?’
‘এইতো ভাল। আপনার?’
‘ভালোই। নাদির স্যারকে দেখলাম আপনার খোঁজ করতে।’
জাহ্নবী চমকে উঠল। স্যার এত দ্রুত অফিসে চলে আসেন! সে নিজেও এর আগে কখনো অফিসে আসতে পারে না।
তারান্নুম বলল, ‘আপনার জন্য হয়তো খারাপ খবর আছে। মেন্টাল প্রস্তুতি নিয়ে রাখেন।’

জাহ্নবী চিন্তায় পড়ে গেল। রাতে কাজ শেষ হওয়া মাত্রই সব ফাইল স্যারকে মেইলে পাঠিয়েছে জাহ্নবী। স্যার নিশ্চয়ই ওর কাজ পছন্দ করেননি। অনেক আশা নিয়ে স্যার ওকে কাজ করতে দিয়েছিলেন। অথচ সেটাও গুবলেট করে বসে আছে সে! জাহ্নবীর পা কাঁপতে লাগল। অস্বস্তিতে ভরে গেল মন।
এই অস্বস্তি নিয়েই দুপুর বারোটা বেজে গেল। জাহ্নবীর কষ্ট হচ্ছে। সারা রাত জেগে কাজ করেও সে ব্যর্থ। তারচেয়েও বড় কথা, স্যার জাহ্নবীর ওপর ভরসা করেছিলেন। নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না জাহ্নবী। মন খারাপ হয়ে আছে। অন্যদিকে বারবার শুধু মনে হচ্ছে, মোস্তফা কামাল আমাকে পছন্দ করেনি। অপমানিত বোধ করছে জাহ্নবী। নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগে ওর কাঁদতে ইচ্ছে করছে।
হঠাৎ পিয়ন এসে জানাল, নাদির স্যার জাহ্নবীকে ডাকছেন। জাহ্নবী ভয়ে ভয়ে উঠে এলো। স্যারের রুমের কাছাকাছি এসে দেখল দূরে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। জাহ্নবীকে ইশারায় সেখানে ডাকলেন। জাহ্নবী কাছে যেতেই স্যার হাঁটতে শুরু করলেন। লিফটের ভেতরে প্রবেশ করলেন তিনি।
বুক দুরুদুরু করছে জাহ্নবীর। স্যার কী ওর কাজটা একেবারেই অপছন্দ করেছেন? এখনো কথা বলছেন না কেন!
লিফটে প্রবেশ করল জাহ্নবী। চকচকে সিলভারের দেয়াল আয়নার কাজ করছে। দুরত্ব বজায় রেখে তারা দাঁড়িয়ে রইলো।

নাদির সাহেব বললেন, ‘আপনার কাজের জন্য আজকে আমি অনেক প্রশংসিত হয়েছি। থ্যাংকস এ লট।’
জাহ্নবী চমকে উঠলো। ওর শরীরে এক ধরনের রিনঝিন বাজনা খেলা করে গেল। সে সফল হয়েছে, সে একটা কাজ ভালভাবে করতে পেরেছে! এই আনন্দের কোনো তুলনাই হয় না।
স্যার লিফট থেকে বের হতে হতে বললেন, ‘এত রাত পর্যন্ত কাজ করেছেন আপনি। নিশ্চয়ই এখন ঘুমে মাথাব্যথা করছে। আপনাকে এক কাপ কফি খাওয়ানোটা আমার কর্তব্য।’
জাহ্নবীর মন আনন্দে ভরে উঠল। নাদির স্যার স্বয়ং তাকে কফি খাওয়াতে নিয়ে যাচ্ছে! এ কী আনন্দ..
স্যার ক্যান্টিনের মাঝামাঝি একটা টেবিলে এসে বসলেন। জাহ্নবী বসল স্যারের মুখোমুখি। আজকে তিনি সাদা রঙের একটা শার্ট পরেছেন। শুভ্রতায় মাখামাখি হয়ে আছেন তিনি।

জাহ্নবী মাথা নিচু করে বসে রইল। নাদির সাহেব দুই কাপ কফি নিয়ে এসে বসলেন। জাহ্নবীকে বললেন, ‘অফিস ভালো লাগছে?’
‘জি স্যার।’
‘আর কফি?’
জাহ্নবী এখনো কফির কাপে চুমুক দেয় নি। লজ্জিত ভঙ্গীতে হেসে কফিতে ঠোঁট ছোঁয়ালো সে। এত গরম কফি খাওয়ার অভ্যাস নেই ওর। আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াতে গিয়েও ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল।
নাদির সাহেব হেসে বললেন, ‘আপনি সময় নিয়ে খান।’

তিন মিনিট জাহ্নবীর সামনে বসে রইলেন নাদির স্যার। এই তিন মিনিটে ওনার ফোনে পাঁচবার কল এসেছে। ভীষণ ব্যস্ত ভঙ্গীতে জাহ্নবীকে রেখে উঠে গেলেন তিনি।
জাহ্নবী কফি শেষ করে নিজের ডেস্কে ফিরে এলো। এখন বেশ ফুরফুরে লাগছে। কাজে মন দিলো সে। কিছুক্ষণ পর পিয়ন এসে জাহ্নবীকে জানালো, ‘নাদির স্যার বলেছেন আপনার ইচ্ছে হলে আজকে বাসায় চলে যেতে পারেন। আজকে আপনার ছুটি।’
জাহ্নবী বিস্মিত হল। এত ব্যস্ততার ভেতরেও স্যার সবদিকে খেয়াল রাখছেন! আজ আর বাসায় যেতে ইচ্ছে হল না। বাসায় গেলেই দম বন্ধ লাগে। তারচেয়ে ভালো লাগে এখানে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে।
বাইরের প্রকৃতি আজ ভীষণ ব্যস্ত। বড় বড় বিল্ডিংগুলো নির্দ্বিধায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। জাহ্নবীরও ইচ্ছে করে এরকম মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে।

বিকেলবেলা ভায়োলেটের নাম্বার থেকে কল এলো। সে জাহ্নবীর জন্য একটা বাসা পছন্দ করে ফেলেছে। জাহ্নবী অফিসের পর বাসাটা দেখতে যেতে পারে।
জাহ্নবী ফোনে ভায়োলেটকে বলল, ‘তোর পছন্দেই আমার পছন্দ। আমার আর দেখতে হবে না।’

আজ অফিস শেষ করেও জাহ্নবীর বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করল না। সন্ধ্যার শহরে হেঁটে বেড়াতে লাগল সে। মাঝেমাঝে গায়ে বাতাসের দোলা লাগে। রিকশার ক্রিং ক্রিং শব্দে নিজেকে অনেকটা জীবন্ত মনে হয়।
অনেক্ষণ বাইরে হেঁটে, আইসক্রিম খেয়ে জাহ্নবী বাসায় ফিরল রাত আট টায়। দরজা খুলে দিলো সামার। লিভিং রুমে অর্ণব বসে আছে। সামার ওর সঙ্গে বসে গল্প করছে। জাহ্নবীকে দেখে অর্ণব বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম আপু। ভালো আছেন?’
জাহ্নবী মৃদু স্বরে ‘হুম’ উচ্চারণ করে নিজের ঘরে চলে এলো। মা সত্যি সত্যি অর্ণবকে আসতে বলে দিয়েছেন। মা’র মাথার গণ্ডগোল কী কখনো সারবে না?

জাহ্নবী গোসল সেরে বের হয়ে দেখল অর্ণব একা বসে আছে। মায়া লাগল ওর। নিশ্চয়ই পারভীন সামারকে জোরপূর্বক ঘরে যেতে আদেশ করে দিয়েছেন। এইমুহুর্তে বাবাও বাসায় নেই। বেচারা অর্ণব!

জাহ্নবী পারভীনের ঘরের দরজায় এসে বলল, ‘মা, আসবো?’
‘আয়।’
‘মা আমি অর্ণবকে নিয়ে বাইরে যাই?’
পারভীন ভীষণ অবাক হলেন। এতটাই আশ্চর্য হলেন যে, অনেক্ষণ চোখের পলক ফেলতে পারলেন না। তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘যা।’
‘মা, সামার ভায়োলেটকেও নিয়ে যাই?’
‘ওরা কেন আবার? একা যা।’
‘আমি একা যাবো না।’
পারভীন বিরক্ত হলেন। বিরক্তমুখে অনেক্ষণ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললেন, ‘ঠিক আছে। ওদেরকেও নিয়ে যা।’

তিনবোন অর্ণবকে নিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। কেউই জানেনা কোথায় যাচ্ছে তারা। দুইটা রিকশা ডাকা হলো। তিনবোন মিলে উঠতে যাচ্ছিল এক রিকশায়। অর্ণব বিব্রত হয়ে বলল, ‘একি! আপনাদের কষ্ট হবেনা যেতে?’
সামার ঝটপট উত্তর দিলো, ‘আমি আপনার রিকশায় আসি?’
‘আচ্ছা।’

ভায়োলেট ও জাহ্নবী এক রিকশায় বসল। অন্য রিকশাটিতে সামার ও অর্ণব। ক্রিংক্রিং শব্দ তুলে রিকশা এগিয়ে চলল। সামারের গা থেকে ভেসে আসা সুবাসে অর্ণব মুখরিত। ফুরফুরে লাগছে তার। জানতে চাইলো, ‘আচ্ছা, আপনি সেদিন আমাকে যে কথাটা বলতে চেয়েছিলেন, সেটা কী এখন বলবেন?’
সামার হো হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, ‘না, বলবো না। কারণ ওটার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।’
‘মানে!’
‘মানে মেয়াদ শেষ।’
‘মেয়াদ শেষ মানে?’
‘মেয়াদন শেষ মানে মেয়াদ শেষ। ডেট এক্সপায়ার্ড।’

আবারও হো হো করে হেসে উঠল সামার। অর্ণবের ভালো লাগছে ওর হাসির শব্দ শুনতে। রিনিঝিনি রিনিঝিনি হাসি। মেয়েরা খুব সুন্দর করে হাসে। তাদের হাসির শব্দেও একটা দ্যোতনা আছে।
সামার বলল, ‘আপনি অনেক বোকা একটা লোক। আমার আম্মুর চাইতেও বোকা।’
‘আপনার আম্মু কী বোকা?’
‘ হ্যাঁ। দুনিয়ার সবচাইতে বোকা মহিলা আমার আম্মু। আর আপনি তার চাইতেও বোকা।’
অর্ণব চুপ করে রইল। রেগে গেল নাকি আনন্দ পেয়ে হাসল ঠিক বোঝা গেল না। রিকশা চলছে তো চলছেই। কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে জানেনা স্বয়ং রিকশাওয়ালাও।
ভায়োলেট পাশের রিকশা থেকে জানতে চাইল, ‘এই আপু আমরা কোথায় দাঁড়াবো?’
‘যেখানে ইচ্ছে যা। যমুনা সেতুতে চলে যা।’

জাহ্নবীদের রিকশা দ্রুত চলতে শুরু করল। যেন সত্যি সত্যি তারা যমুনা সেতুতে যাচ্ছে। সামার আবারও হো হো করে হেসে উঠল। কিছুক্ষণ বাদেই রিকশা একটা সিগন্যালে এসে দাঁড়াল। অর্ণব মনেমনে ভাবছে, আজকের রাতটা অসম্ভব সুন্দর। যদি কখনো এ রাত্রি শেষ না হতো!
সামার বলল, ‘অর্ণব ভাইয়া। আমাকে একটা ফুলের মালা কিনে দেন।’
‘ফুলের মালা কোথায়?’
‘ফুলওয়ালীর কাছে।’
‘ফুলওয়ালী কোথায়?’
‘আপনি জানেন কোথায়। আমিতো জানিনা।’
‘আমিও তো জানিনা।’
‘না জানলেও কিনে দেন।’
‘আচ্ছা ঠিকাছে।’

সামার হাসতে হাসতে বলল, ‘এজন্যই বললাম আপনি একটা বোকা। আপনাকে কে চাকরি দিলো বলুন তো? আচ্ছা, তার আগে বলুন আপনার সঙ্গে প্রেম করছে কোন মেয়ে? সেও কী আমার মায়ের মতো বোকা?’
‘আমার কোনো প্রেমিকা নেই।’
‘আহা রে। অবশ্য না থাকারই কথা। আপনার মতো বোকা লোকের সঙ্গে কার প্রেম করার সময় আছে?’
‘আপনার মায়ের মতো বোকা কোনো মেয়ের।’
‘হা হা হা। আপনি যতটা ভেবেছি ততটা বোকা নন। একটু চালাকও আছেন।’

সামারের হাসি থামলো না। রিকশা থেমে গেল। একটা রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়েছে। রিকশা থেকে নেমে জাহ্নবী ও ভায়োলেট অপেক্ষা করছে। একসঙ্গে ভেতরে এসে বসল ওরা।
রেস্টুরেন্টের টিভিতে গান চলছে। ‘তুমি আকাশের বুকে বিশালতার উপমা..’
অর্ণব চুপচাপ বসে আছে। লজ্জা পাচ্ছে সে। সবচাইতে বেশি কথা বলছে সামার। ভায়োলেট খাবারের মেন্যু থেকে কে কী খাবে সেটা ঠিক করছে।

অর্ণব বলল, ‘জাহ্নবী আপুর জব কেমন চলছে?’
‘ভাল।’
‘অফিস ভালো লাগছে?’
‘হুম। আপনার?’
অর্ণব লজ্জা পেয়ে হাসল। ঘাড় চুলকে বলল, ‘আমার ভালো লাগে না। বাসায় থাকতে ভালো লাগে।’
সামার হাসতে হাসতে বলল, ‘বাসায় কি বউ আছে নাকি?’
‘আমার রুমমেটরা অনেক ভালো। ওদের সঙ্গে এনজয় করতেই ভালো লাগে।’

জাহ্নবী’র দিকে একপলক তাকিয়ে মুচকি হাসল অর্ণব। হাসির কারণ ধরতে পারল না জাহ্নবী। সে ভায়োলেটকে বলল, ‘চল আমরা বাসাটা দেখে আসি?’
‘এই রাত্রিবেলা?’
‘তাহলে থাক।’

জাহ্নবী মাথা নিচু করে বসে রইল। খাবার অর্ডার দেয়ার পরও মেন্যুতে চোখ বুলাচ্ছে ভায়োলেট। সামার মোবাইল টিপছে। অর্ণবের চোখও মোবাইলে। জাহ্নবীর অস্বস্তি হচ্ছে। সে কিছুই পাচ্ছে না করার মতো। এ যুগের সবাই ফেসবুকে সময় কাটাতে আসক্ত। তার আসক্তির ইচ্ছে নেই, তবে ফেসবুক চালানো শুরু করবে সে। তার একটা একাউন্ট আছে ফেসবুকে। কিন্তু অযথা পড়ে আছে, খুব একটা চালানো হয় না। আজকে ফেসবুকে ঢুকে অফিসের কলিগদেরকে এড করে ফেলবে ভাবছে।

অর্ণব বলল, ‘আমার রুমমেট রাতুল ভাই খুবই ভালো একটা ছেলে।’
‘আপনি ভালো ছেলে নন?’ জিজ্ঞেস করল সামার।
অর্ণব হেসে বলল, ‘কী মনে হয় তোমার?’
‘একটা বোকার হদ্দ।’
জাহ্নবী সামারের দিকে শাসনের সুরে তাকাল, ‘কী হচ্ছে সামার?’
সামার বলল, ‘বোকার হদ্দকে চালাকের হদ্দ বলবো? এইযে চালাকের হদ্দ, আপনার ফোনটা দিন তো।’

জাহ্নবী তাকিয়ে রইল। চোখে শাসনের ইঙ্গিত। সামার অর্ণবের ফোন নিজের হাতে নিয়ে বলল, ‘আপনার ফোনের ক্যামেরা অনেক ভালো।’
অর্ণব ও সামার ফোন নিয়ে কথা চালিয়ে গেল। জাহ্নবী অস্বস্তিবোধ করছে। সে কেন আড্ডা দেয়ার মতো বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারে না? অনেক ভেবে জাহ্নবী ভায়োলেটকে বলল, ‘তুই কি খাবার অর্ডার দিয়েছিস? এখনো আসছে না।’
ভায়োলেট বলল, ‘আজকের ট্রিট তো অর্ণব ভাইয়া দিচ্ছে। এজন্য মন খুলে অর্ডার দিয়েছি।’
‘তাই নাকি? কিসের ট্রিট?’
‘চাকরি পেয়েছে তাই।’
অর্ণব বলল, ‘আপু, আপনার ট্রিটটা কিন্তু পাওনা রইলো।’
হাসল জাহ্নবী। অর্ণবের তাকানো ও কথা বলার ভঙ্গীতে মনে হচ্ছে জাহ্নবী অর্ণবের কাছের কোনো বড় বোন। জাহ্নবীর ভালো লাগছে। সে বড় বোন হওয়াতেই স্বস্তি পাবে।
জাহ্নবী জানতে চাইলো, ‘আপনার বাসার কাছেই তো লাইব্রেরি। আপনি বই পড়তে যান না?’
‘যাইনি একবারও। ভাবছি যাবো।’
ভায়োলেট জানতে চাইলো, ‘কোন লাইব্রেরি?’
‘বেঙ্গল বই।’ উত্তর দিলো জাহ্নবী।

সামার বলে উঠল, ‘আমি যাবো। আমি বহুদিন আগে একবার গিয়েছিলাম। আরেকদিন যেতে হবে। অর্ণব ভাইয়া আপনি সিঙারা খাওয়ালে যাবো। ওখানে কলিজা সিঙারা পাওয়া যায়।’
অর্ণব হেসে বলল, ‘আচ্ছা।’
‘তাহলে নেক্সট সানডে। আমাকে ফেসবুকে এড দিন তো। অফিস শেষ হয় কয়টায় আপনার?’
‘বিকেল পাঁচটায়।’

খাবার চলে এলো। সবাই মিলে আরও অনেক্ষণ আড্ডা দিলো তারা। যেন অর্ণব তাদেরই বন্ধুদলের একজন হয়ে উঠেছে। খাওয়াদাওয়া শেষে অর্ণব বিল দিতে গেলেও জাহ্নবী জোরপূর্বক বিল দিয়ে বলল, ‘আমি এখানে সবার চেয়ে সিনিয়র। কাজেই আমি বিল দিবো। অর্ণব আপনি ট্রিটের প্রস্তুতি আরেকদিন নিয়ে রাখুন। সেদিন নিজে দাওয়াত দিয়ে আমাদেরকে নিয়ে আসবেন।’

অর্ণব আর কথা বাড়াল না। হাসল সে৷ রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে জাহ্নবী রিকশা ডাকল। এবার অর্ণব নিজের বাসার দিকে রওনা দেবে৷ তাই একই রিকশাতে তিনবোন উঠতে হবে। রিকশায় ওঠার আগ মুহুর্তে অর্ণব সামারকে বলল, ‘আজকের সন্ধ্যাটা সুন্দর ছিল।’
‘আমার জন্যও।’ বলল সামার।

অর্ণবের হৃদয়ে দোলা লাগল সামারের কথা শুনে। সামার রিকশায় গিয়ে বসল। ভায়োলেট বসেছে রিকশার ওপরে, অর্থাৎ মাঝখানে। এভাবে একটা রিকশায় তিনজন ওঠা যায়।
জাহ্নবী বলল, ‘অর্ণব আমাদের ফ্যামিলির একজন হয়ে উঠছে তাইনা?’

কেউই কোনো উত্তর দিলো না। জাহ্নবী একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। দিনগুলো মন্দ কাটছে না। যদিও এইমুহুর্তে বাসায় গিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকালে ওর কষ্ট হতে শুরু করবে। তবে মনে হচ্ছে, আজকে মায়ের মুখটাও হাসিহাসি থাকবে।

চলবে..

উপন্যাসঃ মেঘফুল
পরিচ্ছেদঃ ১৯
লেখকঃ মিশু মনি

খাবার টেবিলে একসঙ্গে খেতে বসেছে সবাই। জাভেদ আলী সবসময়ই মেয়েদেরকে বলেন, ‘সুখে দুঃখে যাই থাকি, সবাই একসঙ্গে খাবার খাবো, এটাই শান্তি।’ আজকে খেতে বসে বরাবরের মতোই তিনি চাকরি জীবনের গল্প করছেন। গল্পের ফাঁকে ভায়োলেট বলল, ‘আব্বু, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।’
‘হ্যাঁ মা, বল? কিসের ব্যাপারে?’
‘আব্বু, বড় আপুর ব্যাপারে। তুমি রাগ করতে পারবে না।’

জাভেদ আলী পারভীনের দিকে তাকালেন। খাওয়া বন্ধ করে জাহ্নবীর মুখপানে একপলক দৃষ্টি রাখলেন পারভীন। মেয়ে নিশ্চয়ই বলবে সে অর্ণবকে বিয়ে করতে পারবে না। এ ছাড়া আর কিইবা বলার আছে তার। পারভীন মুখ নিচু করে খাবার খেতে লাগলেন।
ভায়োলেট বলল, ‘বড় আপু প্রতিদিন খুব ভোরে বের হয়। তারপরও অফিসে পৌঁছাতে লেট হয়। আর এতদূর থেকে যাতায়াত কষ্টকর, ভাড়াও বেশী পড়ে যায়। এজন্য আপু চাইছিল ওর অফিসের কাছাকাছি একটা বাসা নিয়ে থাকতে।’

জাভেদ আলী জাহ্নবীর দিকে তাকালেন। চুপচাপ বাবার দিকে চেয়ে আছে জাহ্নবী। তিনি বললেন, ‘জাহ্নবী বড় হয়েছে। নিজের ভালোমন্দ সিদ্ধান্ত নেয়ার উপযোগী হয়েছে। ও যদি অফিসের কাছে বাসা নিয়ে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে তাহলে থাকুক। আমি বাঁধা দেবো কেন বল। জাহ্নবী, মা তুমি কি বাসা দেখেছ?’
জাহ্নবী মাথা ঝাঁকালো, ‘একটা বাসার ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছি।’

পারভীন তৎক্ষনাৎ অভিমানী গলায় উত্তর দিলেন, ‘সব যখন ঠিক করেই ফেলছিস আর জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। কেন বাসা নিচ্ছিস আমি জানিনা নাকি। এখন তো মা বুড়ি হইছি। মা’র চেচামেচি আর ভালো লাগে না। বিয়ে করতে বলি, কত কী বলি। সেসব আর শোনা লাগবে না। একা বাসায় থাকলে আত্মীয় স্বজনদের কথাও আর শোনা লাগবে না। সব তো শুনি আমি। বুঝবে কি তোমরা।’
জাহ্নবী কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হল না।

সামার বলল, ‘এত কথা কেন বলছ মা? আপুর ব্যক্তি স্বাধীনতা আছে। সে যেখানে ইচ্ছে থাকুক না। আমরা এখানে কথা বলবো না। আমি তো অনার্সে প্রথম দুই বছর হোস্টেলে ছিলাম, সাবলেট ছিলাম। আমাকে তো এত কথা বলো নি।’
পারভীন রাগত স্বরে বললেন, ‘আমি কাউকে কিছু বলবো না। যার যা ইচ্ছে করো। বিয়েশাদি করার কোনো নাম নাই কারও। যেন জন্ম দিয়া ভুল করছি। পড়াশোনা করতে চাইছো, করাইছি। অনার্স পাশ করে মাস্টার্সে ভর্তি হবা বলছ, ভর্তি করে দিছি। অপরাধ করছি আমরা? জাহ্নবীর এত ভালো ভালো বিয়ের প্রস্তাব আসল, সে বিয়ে করবে না। আত্মীয় স্বজনের কাছে কথা শুনতে শুনতে আমার জান যায়। বিয়ে করবি না সন্ন্যাসে যা। তোর এই সমাজে থাকার দরকার কি?’
সামার হাত ধুয়ে উঠে যেতে যেতে বলল, ‘সন্ন্যাসেই যাচ্ছে। খুশি হও এবার। খুব শীঘ্রই আমি বিয়ে করবো। এবার অন্তত শান্তিতে থাকো। একা একা বিয়ে করবো না। ধুমধাম করেই করবো।’

পারভীন কিছু বললেন না। কয়েক মুহুর্ত বসে থেকে ধরা গলায় বললেন, ‘আমার মেয়েরা আজকে আমার মুখের ওপর কথা বলে। কী মানুষ করলাম..’

কেঁদে ফেললেন তিনি। খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে নিজের ঘরে চলে গেলেন। জাভেদ আলী পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেন।
‘তোর মায়ের কথা বাদ দে। ও এখনও বাচ্চাদের মতো গাল ফুলায় থাকে। জাহ্নবী মা, তোমার কোনোকিছু দরকার হলে আমাকে বলবে আমি কিনে দেবো। নতুন বাসায় কি এই মাসেই উঠবে?’

জাহ্নবীর মন খারাপ হয়ে গেছে। মৃদু স্বরে বলল, ‘আমার জন্য পাত্র দেখো আব্বু। আমাকে তোমরা সবাই মাফ করে দিও।’

কাঁদতে কাঁদতে নিজের ঘরে গেল জাহ্নবী। জাভেদ আলী বিব্রতবোধ করছেন। ভায়োলেট হাসিমুখে বলল, ‘আব্বু, এই বাড়িতে আমরা দুইজন ছাড়া সবারই মাথা গরম। তুমি কষ্ট পেও না। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
জাভেদ আলী হেসে ফেললেন, ‘তুই সবার চাইতে ভালো বুঝিস। ওরা বড় হয়েও বাচ্চাদের মতো আচরণ করে। কী আর করবো আমি বল।’
‘আব্বু তুমি খাও। খাবারটা শেষ করো।’
জাভেদ আলী খাওয়া শুরু করলেন। সবাই নিজ নিজ ঘরে চলে গেছে। টেবিলে বসে নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে খাবার খাচ্ছে ভায়োলেট ও তার বাবা। জাগতিক বিষয় নিয়ে তাদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই।

খুব সকালেই অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল জাহ্নবী। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। মাথাব্যথা করছে। আজকে গরমের তীব্রতাও অনেক। ঘামতে অফিসে এসে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। এখন অফিসটাই ওর সবচেয়ে শান্তির জায়গা। আগামীকাল শুক্রবার। দুদিন অফিস বন্ধ থাকবে। এই সময়টা কাটাবে কীভাবে সে!

অফিস শেষ করে বাসায় এসে দেখল জাভেদ আলী ভায়োলেটকে নিয়ে বাসার ছোট ছোট পাতিল, একটা গ্লাস, চামচ, প্লেট সবকিছু বস্তায় তুলে রেখেছেন। জাহ্নবীকে দেখে তিনি বললেন, ‘তোর নতুন জীবনের জন্য আমরা এগুলো গোছাচ্ছি। তুই তো ব্যস্ত মানুষ। গোছানোর সময় আছে?’ হাসলেন তিনি।
জাহ্নবীর ইচ্ছে করল বাবাকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভায়োলেট একটা একটা করে বিভিন্ন জিনিস এনে জড়ো করছে আর জাভেদ আলী নিজের হাতে সবকিছু গুছিয়ে দিচ্ছেন, যেন এরচেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর হয় না।
জাহ্নবী বলল, ‘আব্বু, আমি যাবো না নতুন বাসায়। এখানেই থাকবো।’
জাভেদ আলী থতমত খেয়ে গেলেন। এত উৎসাহ নিয়ে তিনি সবকিছু গোছগাছ করছেন, আর মেয়ে নাকি যাবে না!
নিজের ঘরে এসে জামাকাপড় বদলে নিলো জাহ্নবী। ভায়োলেট চা নিয়ে এসেছে। জাহ্নবী বলল, ‘বস এখানে।’
বসল ভায়োলেট। ফ্যানের বাতাসের শো শো শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ করেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে উঠেছে।
ভায়োলেট নিস্তব্ধতা ভেঙে বলল, ‘আপু আমি তো ওই বাসায় এডভান্স দিয়ে এসেছি আজ সকালে। আব্বু বলল কাল যেহেতু শুক্রবার। তাই কালকেই তোমার ওই বাসায় ওঠা ভালো হবে। এ কারণেই আর তোমাকে জিজ্ঞেস করিনি। তুমি কি আসলেই উঠতে চাচ্ছ না?’

জাহ্নবী নিরুত্তর তাকিয়ে রইল। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মুখ থেকে, ‘জানিনা রে। বুঝতে পারছি না আমার কী করা উচিত।’
‘তুমি যাও। কিছুদিন থেকে দেখো ভালো লাগে কী না। এতদূর থেকে অফিসে যাওয়াটাও তোমার জন্য কষ্টকর।’
‘হুম, এটা ঠিক বলেছিস। আজকে বুঝেছি সেটা। এই গরমে অফিসে যেতে জান বের হয়ে যায়। রিকশা ভাড়া এত বেশী চায়, আমি দামাদামি করতে পারিনা। সবসময় ঠকি। হা হা।’

জাহ্নবীর হাসি দেখে হেসে ফেলল ভায়োলেট। বড় আপু এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে সেটা মেনে নিতে আজকে ওর কষ্ট হচ্ছে। অথচ এতটা আবেগ কখনও বড় আপুর জন্য ছিল না। আজকে ভায়োলেটের মনে হচ্ছে, আপুর মতো এতটা সাদামাটা, এত পরিষ্কার মনের মানুষ খুব কমই হয়। আপুকে সত্যিই অনেক ভালবাসে সে।

জাহ্নবী চা শেষ করে শুয়ে পড়ল। ভায়োলেট নিজেও শুয়ে পড়ল বোনের পাশে। মুখোমুখি শুয়ে দুজনে তাকিয়ে রইল একে অপরের দিকে। জাহ্নবী বলল, ‘জানিস আজকে কী হয়েছে? নাদিস স্যার একটা কালো ব্লেজার পরে এসেছে আজকে। ওনার ব্লেজারের ঠিক এই জায়গাটায় সাদা রঙের ময়লা। অনেকটা পাখির গু’য়ের মতো। স্যার হয়তো জানতেন না। সবাই ওনাকে দেখে মুখ টিপে হাসছে। এমন প্রফেশনাল আর সিরিয়াস একটা মানুষের এই দশা। হাসবে না? আমারও হাসি এসেছিল। আগে আমি হেসেছি। পরে আমি স্যারের রুমে গিয়ে ওনাকে বলে এসেছি।’
ভায়োলেট জানতে চাইল, ‘কীভাবে বললে?’
জাহ্নবী হেসে ফেলল, ‘আমি ওনার দরজায় গিয়ে বললাম, স্যার আসবো? তিনি সিরিয়াস ভঙ্গীতে তাকালেন, আসুন। বসুন। কী হয়েছে? আমি তো লজ্জায় মরে যাই। বললাম, স্যার আপনার কোটটার দিকে একবার খেয়াল করতে হবে। মনে হচ্ছে সেখানে কিছু আছে। স্যার বললেন, কী আছে? আমি বললাম, আপনি দেখুন স্যার।’
জাহ্নবী হেসে উঠল। ভায়োলেট ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আপুরে, তুমি চলে যাবে কাল?’
‘হুম।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল জাহ্নবী।
‘তোমাকে অনেক মিস করবো আপু।’

ভায়োলেট জাহ্নবীকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরে রইল। অনেক রাত অব্দি আজ গল্প করল ওরা। জাহ্নবী শুধু বলেই গেল। আজ যেন কথার ফুলঝুরি মেলে দিয়েছে সে। ভায়োলেট আজ শুধু শুনলো। বড় আপুর মতো গম্ভীর একজন মানুষ এত কথা বলছে, শুনতে ভালো লাগছিল তার। রাতের খাবার খাওয়ার পর আবারও গল্পে মেতে উঠল ওরা। চলল রাত দুইটা পর্যন্ত। আজকে ভায়োলেটের একটুও ঘুম পায় নি। বড় আপুর সব কথা শুনতে তীব্র আগ্রহ জাগছিল তার।

পরদিন সকাল দশটায় জাভেদ আলী নিজেই জাহ্নবীকে নিয়ে নতুন বাসায় এলেন। সঙ্গে এলো ভায়োলেট। দুই বোন মিলে ঘর পরিষ্কার করে ফেলল। জাভেদ আলী কিনে নিয়ে এলেন একটা ছোটখাটো আকারের খাট। ব্যাচেলর মেয়েদের বাসা। জাহ্নবীর একার জন্য একটা রুম। রুমের একদিকে বিশাল জানালা। সোনালী রোদ জানালা ফুরে ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। জানালার পাশে দাঁড়াল জাহ্নবী। ভায়োলেট তার কথা রেখেছে।

বিছানা পেতে একটা ওয়ারড্রবে সমস্ত জামাকাপড় ও জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলো জাহ্নবী। প্লাস্টিকের র‍্যাকে তার থালাবাসন সাজানো হল৷ বাবা একটা আয়নাও কিনে এনেছেন। সঙ্গে বাইরে থেকে দুপুরের খাবার। তিনজন একসঙ্গে খাবার খেয়ে রওনা দিলেন জাভেদ আলী ও ভায়োলেট।

জাহ্নবী নিজের এই নতুন ঘরের চারপাশে তাকাল। বেশ বড় ঘর বলা চলে। ঘরের একদিকে বারান্দা। বেশ বড় পরিসর। বারান্দার সামনে খানিকটা খোলা জায়গা। সম্ভবত এটা দক্ষিণ দিক। অনেক বাতাস আসবে। ভায়োলেটের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে উঠল। অন্য জানালাটির পাশে দাঁড়ালে বাইরের শহর দেখা যায়। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য বিল্ডিং। জাহ্নবীর নিজেরও ওরকম মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।

চলবে..