মেঘফুল পর্ব-২০+২১+২২

0
325

উপন্যাসঃ মেঘফুল
পরিচ্ছেদঃ ২০
লেখকঃ মিশু মনি

জাহ্নবীর ঘুম ভাংলো সকাল আট টায়। আজকে শনিবার, অফিস ছুটি। আজ কোনো তাড়া নেই বলেই অনেক্ষণ আয়েশ করে ঘুমিয়েছে সে। পুরো ঘর সকালের স্নিগ্ধ আলোয় ভরপুর। জাহ্নবী বিছানা ছেড়ে উঠে খালি পায়ে জানালার কাছে এলো। সাদা রঙের জানালার পর্দাটা সরাতেই এক রাশি সূর্যকিরণ ঝিকমিক করতে করতে ঢুকে পড়ল ওর ঘরে। জাহ্নবী চমকালো। মনে হলো সকালের সূর্য স্বাগত জানাচ্ছে তাকে। জাহ্নবী বিছানার ওপর এসে বসলো। সাদা টাইলসের মেঝেতে সূর্যরশ্মি খেলা করছে। বাড়িতে ওর ঘরে রোদ আসতো না কখনোই। আজ মনটাই ভালো হয়ে গেল।

জাহ্নবী দরজা খুলে বেলকনিতে এসে দাঁড়াল। পাশের বিল্ডিংগুলোর গায়ে রোদ ঝিকমিক করছে। এখনো শহরে কোলাহল নামেনি। সবাই ঘরে ঘুমাচ্ছে। কর্মব্যস্ত মানুষেরা কেউ কেউ বেরিয়েছে কাজে। বেলকনিতে দাঁড়ালে বাসার পাশের রাস্তা দেখা যায়। রাস্তার ওপাশে আরও কতগুলো বাসা। ওই বাসাগুলোর বারান্দায় অসংখ্য গাছ সবুজে ঢাকা। জাহ্নবীর ইচ্ছে করছে ওর নিজের বারান্দাটাও ছোট ছোট গাছ ও লতাপাতায় ঝলমল করুক। বেশ বড় পরিসরের বেলকনি। এখানে বসার জন্য একটা চেয়ার কিনে আনতে হবে।

জাহ্নবীর সকালটা আজ দারুণভাবে শুরু হয়েছে। ঘুম থেকে উঠেই বাড়ির কাজকর্ম কিংবা রান্নাবান্না নিয়ে ভাবতে হচ্ছে না, এটা মজার ব্যাপার। জাহ্নবী বেসিনে এসে দাঁত ব্রাশ করতে করতে নিজেকে দেখছিল। আব্বু একটা নতুন ব্রাশও কিনে এনেছে তার জন্য। আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে দেখছিল জাহ্নবী। মুচকি হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটে। ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ঘষে শীতল পানি দুহাতে ভরে মুখে ছিটিয়ে দিতেই জাহ্নবীর মনটা সতেজতায় ভরে উঠল। মনে হতে লাগল, জীবনটা মন্দ না। অসাধারণ সব ব্যাপার স্যাপার চারদিকে।

এই বাসায় মোট চারটা রুম। লিভিংরুমে পার্টিশন দিয়ে আরও একটা রুম বানানো হয়েছে। সেখানেও কেউ থাকে নিশ্চয়ই। এখনো কারও সঙ্গে পরিচয় হয়নি জাহ্নবীর। গত রাতে চার্লি নামে একটা মেয়ে শুধু জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি কোন রুমে উঠেছেন আপু?
জাহ্নবী উত্তরে বলেছে, আমি সিঙেল রুমে উঠেছি।
এর বাইরে আর কথা হয় নি। আজ জাহ্নবী সবার সঙ্গে পরিচিত হবে। কিন্তু জড়তা ওকে জড়িয়ে রেখেছে। হুট করে কারও সাথে মেশার অভ্যাস নেই ওর।

ঘরে এসে ছোট পাতিল ও চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে রান্নাঘরে এলো সে। পাতিলে কিছু পানি দিয়ে চুলার বার্নার জ্বালিয়ে দিলো। রান্নাঘরের জানালার পাশে বড়সড় একটা আম গাছে বসে পাখি ডাকছে। এত বেলা করেও পাখি ডাকে নাকি!
এক কাপ দুধ চা বানিয়ে বেলকনিতে এসে দাঁড়াল জাহ্নবী। বাইরের পরিবেশ দেখতে দেখতে চায়ে চুমুক দিলো। ওর হঠাৎ করেই ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। ভায়োলেটকে ধন্যবাদ জানালেও কম হবে। এত চমৎকার বাসা, আশেপাশের পরিবেশ এত সুন্দর, ইচ্ছে করছে আনন্দে নাচি। জাহ্নবীর এতটা আনন্দ বোধহয় কখনো হয়নি। একা থাকতে তো অন্যরকম মজা। কী দারুণ!

জাহ্নবী ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। এইমুহুর্তে কোনো কাজ নেই। কাজ না থেকে ভালোই হয়েছে। এত সুন্দর সকালটাকে উপভোগ করতে পারছে সে। কিন্তু খিদে পেয়ে যাচ্ছে তো। বাবা গতকাল পাউরুটি ও ডিম কিনে দিয়েছেন। একটা ডিমের ওমলেট করে রুটি দিয়ে খাওয়া যেতে পারে।
জাহ্নবী ফোন হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ইউটিউবে ঢুকে বসে রইল। তারপর নাস্তা বানিয়ে খেয়ে দেয়ে আবারও শুয়ে পড়ল। কাজ না থাকলে এতটা শূন্য শূন্য কখনো লাগেনি। এখন মনে হচ্ছে অফিস থাকলেই ভালো হতো।

জাহ্নবী একটা গল্পের বই নিয়ে বসল। কয়েক পাতা বই পড়ার পর মাত্রই বইটা রেখেছে, এমন সময় বাবার নাম্বার থেকে কল।
জাহ্নবী রিসিভ করে খুশি খুশি গলায় বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম আব্বু। কেমন আছো?’
জাভেদ আলী সালামের উত্তর জানিয়ে বললেন, ‘ভাল আছি মা। তুমি কেমন আছো?’
‘খুব ভালো আছি আব্বু।’
‘তাই? আমার মা খুব ভালো আছে? হা হা। এত আনন্দ কিসের আম্মু?’
‘ওহ আব্বু আমি খুশিতে পাগল হয়ে যাচ্ছি। আজকের সকালটা এত্ত সুন্দর।’
‘তাই নাকি? আমার মা খুশি থাকুক সেটাই তো চাই। কিন্তু মা, পাগল তো হওয়া যাবে না।’
‘হা হা হা। ঠিক আছে আব্বু। পাগল হওয়া যাবে না। পাগল হবো না। মা কই? মা ভালো আছে?’
‘আছে। সে সবসময় যেমন থাকে। রেগে আছে।’
‘মাকে দাও তো।’
‘রান্নাঘরে কাজ করছে। ফ্রি হলে কল দেবো।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। ভায়োলেটকে ডেকে দিবে?’

জাভেদ আলী ঘর থেকে বের হয়ে ভায়োলেটকে ডাকলেন। ছুটে এসে ফোন ধরল ভায়োলেট, ‘হ্যালো বড় আপু..’
‘ভায়োলেট, থ্যাংক ইউ রে। থ্যাংক ইউ সো মাচ।’
‘হা হা। কী ব্যাপার আপু? আজকে এত খুশি?’
‘খুশি মানে তুই জানিস আমার বাসাটা এত্ত সুন্দর! এত সুন্দর একটা সকাল। আমার খুব আনন্দ হচ্ছে রে ভায়োলেট।’
ভায়োলেট হেসে ফেলল। জাহ্নবীর আনন্দের জন্যই তো সে এত খুঁজে খুঁজে বাসাটা পছন্দ করেছে। যেখান থেকে চমৎকার সব সকাল দেখে দিনটা দারুণভাবে শুরু হবে।
ভায়োলেট বলল, ‘আপু আজ তো তোমার ছুটি। বাসায় আসো। দুপুরে এখানে খেয়ে তুমি আর আমি বের হবো। তারপর তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসবো।’
‘সত্যি! আচ্ছা ঠিক আছে। আমি এক্ষুনি রওনা দিচ্ছি তাহলে।’

জাহ্নবীর গলায় খুশি ঝলমল করছে। ভায়োলেটও ভীষণ খুশি হল ওর সঙ্গে কথা বলে। নিজের ঘরে চলে এলো ভায়োলেট। জাভেদ আলীর মুখে প্রসন্ন হাসি।
পারভীন রান্নাঘর থেকে জাভেদ আলীর কথা শুনতে পেয়েছেন। রাগটা কমে গেল ওনার। স্বাভাবিকভাবে রাগ আরও বেড়ে যাওয়ার কথা। পারভীন বুঝতে পারলেন, তিনি জাহ্নবীকে সত্যিই অনেক ভালবাসেন। জাহ্নবী যাতে ভালো থাকে, তাতেই ওনার আনন্দ। তিনি মনেমনে খুশি হলেন। যদিও মেয়েটা বাসায় নেই, ওর শূন্যতা অনুভব করছেন তিনি। বলতে গেলে সবার চাইতে তিনিই জাহ্নবীকে বারবার স্মরণ করছেন।
জাহ্নবী আসবে শুনে তিনি জাভেদ আলীকে বললেন, ‘বাজারে যাও। ইলিশ মাছ পাও কিনা দেখো।’
‘তুমি নাকি আজ মসুর ডাল আর ভাজি রান্না করবে?’
‘না, মাছ আনো। জাহ্নবী ইলিশ মাছ খেতে পছন্দ করে।’

জাভেদ আলী হাসলেন। পারভীন জাহ্নবীর জন্য ইলিশ মাছ আনতে পাঠাচ্ছে। ভালো লাগল ওনার। তিনি তড়িঘড়ি করে বাজারের জন্য তৈরি হলেন। বের হওয়ার সময় পারভীনকে বললেন, ‘এই শোনো না। অর্ণবকে আসতে বলি? ছেলেটার তো বাবা মা কাছে নেই, বোঝো না? আমরাই তো ওর বাবা মা।’
পারভীন নিস্তব্ধ রইলেন কিছুক্ষণ। মনে হলো তিনি চান না জাহ্নবী ও অর্ণবের দেখা হোক। দেখা হলে জাহ্নবী ভাববে সে বাসা বদলানোর পরও মা অর্ণবের সঙ্গে তাকে বিয়ে দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু এইমুহুর্তে তিনি সেটা চাচ্ছেন না। জাহ্নবী একা থাকুক। আগে ওর জীবনকে দেখা উচিৎ। পরে বিয়ে নিয়ে ভাবা যাবে।
পারভীন একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আচ্ছা।’

জাহ্নবী ‘পাঠাও’ থেকে একটা গাড়ি নিয়ে দ্রুত বাসায় চলে এলো। দরজা খুলে দিলো ভায়োলেট। জাহ্নবীকে জড়িয়ে ধরে আনন্দিত গলায় বলল, ‘আপুউউউ! তুমি এসেছ কী যে খুশি হয়েছি।’
‘আমিও খুশি হয়েছি। মা কই?’

রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল জাহ্নবী। পারভীন কাজ করছেন। কোনো এক অজানা কারণে জাহ্নবীর চোখ ভিজে উঠল। রান্নাঘরে ঢুকে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে রইল ও। খুব ইচ্ছে করছিল মাকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু জড়তার পৃষ্ঠতায় পারল না সেটা করতে।

পারভীন বললেন, ‘বাসা কেমন?’
‘ভালো।’
‘কয়জন থাকে?’
‘এখনও জানিনা। আমার রুমে আমি একা থাকি।’
‘একা? ভাড়া বেশি পড়বে না?’
‘হুম। আমার রুমের ভাড়া ১২ হাজার টাকা।’

পারভীন অবাক হয়ে জাহ্নবীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। চমকে উঠেছেন তিনি। তিনি বিয়ের পর থেকেই যেসব বাসায় ভাড়া থেকেছেন, সব বাসার ভাড়া পনেরো হাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ভাড়া কমানোর জন্য তিনি কখনো ভালো এলাকায় থাকেননি। এখন যে ফ্ল্যাটে থাকেন, এটার ভাড়া তেরো হাজার টাকা। অথচ জাহ্নবী একাই কিনা এক রুমে বারো হাজার টাকা ভাড়ায় উঠেছে! তিনি সত্যিই বিস্মিত হলেন।

জাহ্নবী বলল, ‘বাসাটা খুব সুন্দর মা। আর আমার এলাকায় বাসার ভাড়াগুলো বেশি। ত্রিশ হাজারের নিচে ফ্ল্যাটই পাওয়া যায় না ওই এলাকায়।’
‘বুঝেছি। দ্যাখ গিয়ে তোর বাসার মেয়েরা একরুমে তিন চারজন করে থাকে। ওরা তিন/চার হাজার টাকা ভাড়া দেয়। তিনজন মিলে বারো হাজার। আর তুই একাই বারো হাজার। দুই সিটের রুমেও ওঠা যেতো।’
জাহ্নবী চুপ করে রইল। প্রসঙ্গ এড়ানোর জন্য বলল, ‘আব্বু কোথায়?’
‘বাজারে গেছে।’
‘আমি সবজি কুটে দেই?’
‘না। তুই ঘরে যা। এখানে গরম অনেক।’

জাহ্নবী আর কথা বাড়াল না। সামারের ঘরে এসে দেখল ভায়োলেট পড়াশোনা করছে আর সামার ঘুমাচ্ছে। জাহ্নবী বলল, ‘ভায়োলেট, তুই এখন আমার রুমে থাকতে পারবি।’
‘তুমি ছাড়া একা আমি তোমার রুমে থাকবো? আমার খারাপ লাগবে তো। অবশ্য আমিও চাই তোমার রুমে শিফট হতে। মেজোপুর নতুন নতুন প্রেম হয়েছে। তাকে এখন প্রাইভেসি দেয়া দরকার।’

মুখ টিপে হাসল ভায়োলেট। জাহ্নবী জানতে চাইলো, ‘আচ্ছা ভায়োলেট, তুই প্রেম করিস না কেন?’

ভায়োলেট চমকে উঠল। চোখ তুলে এমনভাবে তাকালো যেন জাহ্নবী অদ্ভুত কিছু জানতে চেয়েছে। এর কারণ বুঝতে পারল না জাহ্নবী। ভায়োলেট শুকনো হাসি দিয়ে বলল, ‘প্রেম করতেই হবে নাকি সবার?’
‘সবাই তো করে। তুই বড় হয়েছিস। জানি এটা জিজ্ঞেস করা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু তারপরও জানতে ইচ্ছে হল। তুই কারও প্রেমে পড়িস নি?’

ভায়োলেট অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে চিন্তায় ডুবে গেল সে। প্রেম! সে তো একটা কঠিন দাবদাহের মতো। তার জীবনে এসেছিল এন্টার্কটিকার শীতল বরফজলের মতো। অথচ বরফ গলে মরুভূমির তীব্র খরায় রূপান্তরিত করে দিয়ে গেছে!

পারভীন প্লেটে করে পাটিসাপটা পিঠা নিয়ে ঘরে এলেন। মেয়েদের সামনে রেখে বললেন, ‘তোর আব্বু খেতে চাইলো তাই বানালাম। লোকটা এখনও বাজার থেকে আসতেছে না। তোরা খেয়ে দ্যাখ তো কেমন হয়েছে।’
পারভীন পিঠা রেখে বেরিয়ে গেলেন। জাহ্নবী বলল, ‘আম্মুর রাগ কমেছে মনে হচ্ছে। আমি তো টেনশনে ছিলাম আমার সঙ্গে কথাই বলবে না।’
‘আম্মুর মনটা খুব নরম। সারাক্ষণ রেগে কথা বললেও মানুষটা খুব ভালো।’

জাহ্নবী একটা পিঠা তুলে নিলো। ইচ্ছেকৃত ভাবেই ভায়োলেটের প্রেমের প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেল সে। তার মনে হচ্ছে ভায়োলেটের জীবনে কোনো গল্প আছে। কিন্তু সেই গল্পটা এখন জানতে চাওয়ার মতো সময় নয়। তাছাড়া ব্যক্তিগত কোনোকিছু জিজ্ঞেস করতেও পারবে না জাহ্নবী। সংকোচ করবে তার।

পিঠা খেতে খেতে জাহ্নবী এমনভাবে অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলতে লাগল যেন বিষয়টা ভুলেই গিয়েছে সে। এতে করে ভালোই হয়েছে। ভায়োলেট স্বস্তি অনুভব করল।

জাভেদ আলী বাসায় ফিরলেন দুই কেজি ইলিশ মাছ নিয়ে। মাছ কাটতে বসে গেলেন পারভীন। ভায়োলেট মাকে বলল, ‘কী গো আব্বুর জন্য পাটিসাপটা পিঠা বানিয়েছো না? আব্বুকে পিঠা দিলে না যে?’
পারভীন বললেন, ‘আমার হাতে মাছ। তুই দে তো।’

ভায়োলেট পিঠা নিয়ে বাবার সামনে গেল। জাভেদ আলী ভায়োলেটের কথাটা শুনতে পেয়েছেন। তিনি বললেন, ‘আমার জন্য তোর মা পিঠা বানিয়েছে বললি?’
‘হ্যাঁ আব্বু। তুমি নাকি খেতে চেয়েছো?’
‘আমি! আমি আবার কখন পিঠা খেতে চাইলাম। সে নিজেই তো আমার হাতে ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বলল বাজার থেকে ইলিশ মাছ কিনে আনো। আমি তো কোনো পিঠা খেতে চাই নি।’

মুচকি হাসল ভায়োলেট। হো হো শব্দ করে হেসে উঠলেন জাভেদ আলী। ভায়োলেট ইশারায় বলল, ‘চুপ। আস্তে হাসো। আম্মু শুনলে রাগে কান্নাকাটি শুরু করবে।’
জাভেদ আলী খুশি হলেন। পারভীন জাহ্নবীর জন্য পিঠা বানিয়েছে। ইলিশ মাছ কিনে আনতে বলেছে। মেয়েকে বড্ড ভালবাসে সে, এটা স্বীকার করতেই চায় না। তার আজ মনে অনেক আনন্দ।

ভায়োলেট রুমে এসে জাহ্নবীকে বলল, ‘আপু, আম্মু মিথ্যে বলেছে।’
‘কী মিথ্যে?’
‘সে আব্বুর জন্য পিঠা বানায় নি।’
‘তাহলে? আজকেও অর্ণব আসবে নাকি?’
‘তা জানিনা। তবে পিঠা বানিয়েছে তোমার জন্য। কারণ তুমি এই পিঠা পছন্দ করো। ইলিশ মাছও আনিয়েছে। তুমি খেতে ভালবাসো তাই।’

জাহ্নবীর চোখে পানি চলে এলো। অন্যদিকে তাকিয়ে চোখের পানি আড়াল করল সে। ভায়োলেটকে বলল, ‘ভালো হয়েছে। আম্মু আমাদের জন্য বানাবে না কার জন্য বানাবে?’
কথাটা স্বাভাবিকভাবে বললেও জাহ্নবীর কণ্ঠ শুনে বোঝা গেল সে কাঁদছে। ভায়োলেট জাহ্নবীকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আপু। আম্মু অনেক ভালো। আম্মুর ওপর রেগে থেকো না।’
‘হুম।’

ঘুম ভেঙে গেল সামারের। ঘুম থেকে উঠে দুই বোনকে জড়াজড়ি করে বসে থাকতে দেখে সে জানতে চাইলো, ‘আপু কখন এলে?’
‘এক্ষুণি।’
‘আর যাবা না?’
ভায়োলেট দুষ্টুমি করে বলল, ‘না। আর যাবে না।’
আঁৎকে উঠল সামার। বিছানার ওপর লাফ দিয়ে বসল সে। ‘মানে কী! আমি তো আরও ভাবলাম এখন থেকে এক রুমে একা ঘুমাবো।’

শব্দ করে হেসে উঠল জাহ্নবী ও ভায়োলেট। তাদের হাসির শব্দ পৌঁছে গেল রান্নাঘর অব্দি। ভীষণ ভালো লাগছে পারভীনের। মাছ কুটতে আনন্দ পাচ্ছেন তিনি। ইলিশ মাছের আঁশটের গন্ধটা তার ভালো লাগছে। এমন সময় দরজার কলিং বেল বেজে উঠল। নিশ্চয়ই অর্ণব এসেছে।
জাভেদ আলী দরজা খুলে দিলেন। অর্ণব আসে নি। একটা ছেলে এসেছে ভায়োলেটের খোঁজে!

চলবে..

উপন্যাসঃ মেঘফুল
পরিচ্ছেদঃ ২১
লেখকঃ মিশু মনি

উদভ্রান্ত দেখতে একটা ছেলে ভায়োলেটের খোঁজে এসেছে এটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না জাভেদ আলী’র। গালে ব্রণের দাগ, উশকো খুশকো চুল। দেখলেই মনে হয় এক্ষুণি মারিজুয়ানা টেনে উঠে এসেছে। প্রত্যেক বাবা যে ধরনের ছেলেকে অপছন্দ করেন, একদম সেরকম একটা ছেলে। ওর বাবা কিছু বলে না?
জাভেদ আলী কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ভায়োলেটকে ডাকতে এলেন। জাহ্নবীর সঙ্গে গল্প করছিল ভায়োলেট। ওর খোঁজে কেউ বাসায় এসেছে এটা শুনেই চমকে উঠল সে। তাও আবার নাকি একটা উদভ্রান্ত ছেলে! ভায়োলেট নিশ্চিত ওটা শামীম।

লিভিংরুমে সোফায় বসে আছে। ভায়োলেট এসে বলল, ‘কী ব্যাপার শামীম? আমার বাসায় এসেছিস, আসার আগে আমাকে একবার জানাবি না?’
‘তো কি হইসে? তোকে আমি জানাই নাই? মেসেজ চেক কর। অনেক ইমার্জেন্সি তাই আসছি।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। ইমার্জেন্সি বলতে কী বুঝাচ্ছিস?’
‘তুই বুঝিস নাই আমি কী বোঝাচ্ছি? আংকেল এদিকে আসতেছে ক্যান? উনি তোর পারসোনাল কথার ভেতর আঙুল চালায়?’

ভায়োলেট রাগ সংযত করে নিয়ে বলল, ‘তুই মুখ সামনে আমার সঙ্গে কথা বলবি। এটা আমার বাসা। তুই কী জন্য এসেছিস আমি বুঝেছি। আমি ব্যাপারটা দেখবো। এখন চা খেয়ে বিদায় হ। প্লিজ।’
‘তোর বাসা থেকে আমাকে বের করে দিচ্ছিস? আংকেল, দেখেন না আপনার মেয়ে আমাকে বের করে দিচ্ছে। আমি ওর ফ্রেন্ড।’

জাভেদ আলী ভায়োলেটের দিকে কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকালেন। ভায়োলেটকে চিন্তাগ্রস্ত দেখাচ্ছে। সে তবুও মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘আব্বু, ও মজা করছে। ও আমার ফ্রেন্ড, শামীম।’

জাভেদ আলী ভায়োলেটের পাশে বসলেন। এরকম একটা ছেলে ভায়োলেটের বন্ধু! অবিশ্বাস্য ব্যাপার স্যাপার। এমন সময় পারভীন হাত মুছতে মুছতে এলেন, ‘এই কে এসেছে?’
শামীমকে দেখে থমকে গেলেন তিনি নিজেও। এ আবার কে? ভায়োলেট তার সামনে বসে কথা বলছে!
শামীম বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম আন্টি।’
‘ওয়ালাইকুম সালাম। কে উনি?’
জাভেদ আলী উত্তর দিলেন, ‘ভায়োলেটের বন্ধু।’
‘বন্ধু, না? আচ্ছা আমি চা আনছি।’

পারভীন সামারের ঘরে এসে রীতিমতো চেচামেচি শুরু করে দিলেন, ‘সামার, বাসায় এটা কে এসেছে? বিশ্রী চুলের কালার, উশকো খুশকো। এই বদমাইশ ছেলে নাকি ভায়োলেটের ফ্রেন্ড? ও বাসায় ক্যান আসছে?’

সামার অবাক হওয়া গলায় বলল, ‘মা, আমি জানি না। সত্যি জানিনা।’
‘সব জানিস তুই। সারাদিন সারা রাত ফোনে পটর পটর। আমার ভালো মেয়েটাকে তুই খারাপ বানাইছিস।’

অবাক হল সামার। মা রেগে গেলে মাঝেমাঝে উদ্ভট সব কথাবার্তা বলেন। একটা উশকো খুশকো চুলের ছেলে ভায়োলেটের খোঁজে আসতেই পারে। এতে কী এমন অপরাধ হয়ে গেল?
জাহ্নবী বলল, ‘মা, তুমি থামো তো। আমি দেখছি। শান্ত হও। নিশ্চয়ই ছেলেটা সামান্য পরিচিত। স্কুল কলেজে হয়তো একসঙ্গে পড়েছে।’
‘বাসায় আসবে কেন? বাসার ঠিকানাও জানে। কী অদ্ভুত। মেয়েগুলো সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’

সামার জাহ্নবীকে বলল, ‘আপু, মা’র কথা শুনেছো? সে মাঝেমাঝে এমন সব কথা বলে। রাগে গায়ে আগুন ধরে যায়।’
পারভীন মেয়েদের ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। এই কুৎসিত ছেলেটা ভায়োলেটকে কী বলতে এসেছে সেটা শুনতে চান তিনি।

শামীম বলল, ‘দোস্ত, আমার আজ একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে৷ আমি চলে যাবো৷ তুই কিন্তু ব্যাপারটা দেখবি। যত দ্রুত সম্ভব। দেরী হলে কিন্তু…’

শামীম এমনভাবে তাকালো যে ভয় পেয়ে গেল ভায়োলেট। বাবা মা কী ভাব্বেন কে জানে!

শামীম বলল, ‘বন্ধু আজ যাই। তুই একটু বিষয়টা দ্যাখ।’

শামীম উঠে দাঁড়াল। ভায়োলেট ভদ্রতার খাতিরে চা খাওয়ার কথা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু পারভীনের রাগত দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে সেটা বলতে পারল না। শামীম দরজায় গিয়ে ইশারায় ভায়োলেটকে ডাকল।
ভায়োলেট ধীরপায়ে এগিয়ে এলো দরজার দিকে। দরজার ওপাশে দাঁড়ানো শামীম কিছুটা ঝুঁকে এলো ভায়োলেটের দিকে। মৃদু স্বরে বলল, ‘তোকে একটা চুমু খেতে ইচ্ছে করছে দোস্ত।’

ভায়োলেটের শরীর রাগে ঝনঝন করে উঠল। বাবা মা না থাকলে মারাত্মক রেগে যেত সে। নিজেকে সংযত রেখে ফিসফিস করে উত্তর দিলো, ‘তুই মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস শামীম। আমার বাসায় এসে আমাকে অপমান করছিস তুই।’
‘অপমান করলাম কোথায় দোস্ত? আমি তোর বন্ধু না? বন্ধু বন্ধুকে অপমান করে? আমি তো সত্যি বলছি। তোর প্রতি আমার একটা দুর্বলতা আছে। আজকে তোর ঠোঁট দুইটা বেশি জোস লাগতেছে সেজন্য ইচ্ছে হল। তোর ইচ্ছে না হইলে আমি জোর করবো না। আমি খারাপ ছেলে না মোটেও। তবে বিষয়টা একটু তারাতাড়ি সলভ করিস কেমন? না হলে কিন্তু জোর করাই লাগবে। আরে, মজা করতেছি, রাগিস না।’

ভায়োলেট পারল না মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিতে। আজকে উদ্ধত আচরণ করলে বাবা মায়ের কাছে তাকেই কৈফিয়ত দিতে হবে। তাই চুপচাপ সহ্য করল। শামীম চলে গেলে দরজা বন্ধ করে স্বাভাবিক ভঙ্গীতে ঘরের দিকে এগিয়ে গেল ভায়োলেট। জাভেদ আলী ও পারভীন ভায়োলেটের চলে যাওয়া দেখলেন। কেউই কোনো কথা বললেন না। এইমুহুর্তে পারভীন রেগে আছে। ঝড় আসতে পারে। তাই মাথা ঠান্ডা হলে জাভেদ আলী এই বিষয়ে মেয়ের সঙ্গে কথা বলবেন।
ঘরে আসার কিছুক্ষণ পরে পারভীনের চেচামেচি শুনতে পেলো তিন বোন। কিন্তু সামার ও জাহ্নবী শামীমের ব্যাপারে কোনো প্রশ্নই করল না। তারা যথারীতি তাদের মতো আড্ডা দিতে লাগল।

দুপুরে একসঙ্গে খাবার খেলো ওরা। জাহ্নবী বাবা মা ও সামারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ভায়োলেটকে সঙ্গে করে। গেটে দেখা হল অর্ণবের সঙ্গে। খুব একটা কথা হল না, একে অপরের দিকে তাকিয়ে শুধু হাসল।

আজ খুব চেনা একটা বিকেল কিন্তু সুন্দর। রিকশায় করে দুইবোন ধানমন্ডি লেকে এসে বসল। লেকের পানির দিকে তাকিয়ে ঝালমুড়ি খেলো, আমড়া, পেয়ারা খেলো। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আড্ডা দিলো ওরা। সন্ধ্যে নামার আগে ফুটপাত থেকে কয়েকটা গাছের চারা কিনলো জাহ্নবী। রিকশায় করে জাহ্নবীর বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো ওরা।
বাসার কাছে চলে এলে ভায়োলেট বলল, ‘আপু, আজকের বিকেলটা অনেক সুন্দর ছিল তাই না?’
‘হুম। এই এরিয়ায় অনেক রেস্টুরেন্ট। বসবি কোথাও? আজকে তোকে কিছুই খাওয়ালাম না।’
‘আজকে না আপু।’
‘চল আজকেই বসি। আবার কবে এভাবে বাইরে ঘুরতে পারবো তার ঠিক আছে?’

সন্ধ্যে নেমেছে। জাহ্নবীর বাসার কাছাকাছি রাস্তার দুপাশে বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট। একটা রেস্টুরেন্টের নাম দেখে চোখ আটকে গেল ভায়োলেটের। হলুদাভ রঙের ওপর কালো রঙে মোটা অক্ষরে নামটা লেখা। পাশেই একটা চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। ভায়োলেট জাহ্নবীকে বলল, ‘দ্যাখো আপু? নামটা সুন্দর না! চলো এখানেই বসি।
জাহ্নবী নামের দিকে তাকালো। “when tea meet toast”. চমৎকার তো! নিশ্চয়ই চায়ের দোকান।

জাহ্নবী রিকশা থামাতে বলল। তার বাসার ঠিক বিপরীত দিকে রাস্তার অন্যপাশে এই ছোট্ট রেস্টুরেন্টটি। জাহ্নবীর দুহাতে গাছের চারা। সে দৌড়ে গিয়ে গাছগুলোকে বাসার গেটের ভেতরে রেখে আসলো। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে ভায়োলেট। জাহ্নবী দ্রুতপদে এসে বলল, ‘চল যাই।’

কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে মুগ্ধ হলো ওরা। খুবই নান্দনিক সাজসজ্জা। তেমন কিছু নেই অথচ যেটুকু আছে, তাই শৈল্পিক। ভিন্টেজ আলোয় মাখামাখি চারপাশ। সরু টেবিলের দুপাশে লম্বা বেঞ্চ পাতা। একটা বেঞ্চে মুখোমুখি বসল জাহ্নবী ও ভায়োলেট। মৃদু আলোয় এই রেস্তোরাঁটিকে ওদের আরও বেশি মনোমুগ্ধকর লাগছে কারণ মাথার ওপর গান বাজছে।
” তোমাকে বুঝি না প্রিয়, বোঝো না তুমি আমায়..
দুরত্ব বাড়ে যোগাযোগ নিভে যায়।”

গানের সুর ও কথা মনে ধরল জাহ্নবীর। সে গানের দিকে মনোযোগ দিলো। এই দোকানে আটচল্লিশ প্রকারের চা পাওয়া যায়। সঙ্গে সাত ধরনের টোস্ট। এ কারণেই নাম দিয়েছে, “when tea meet toast”. বিষয়টা খুবই চমৎকার লাগল জাহ্নবীর। সে তিন ধরনের টোস্ট ও দুই কাপ চা অর্ডার করল।
হলুদাভ আলোয় জাহ্নবীর সবকিছু স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে। তখন মাথার ওপর গানের লিরিকে বলছে,
“গরাদ শোঁকে সূর্যমুখী
গরাদ শোঁকে সূর্যমুখী..
খয়েরী কুঁড়ির ফুল
সূর্য খুঁজে বেড়ায়”

এরপরের সুরটুকু খুবই মায়াবী। জাহ্নবী’র মন সূর্যরশ্মির মতোই ঝলমলে হয়ে উঠল। মনেমনে ঠিক করে ফেলল, এখানে প্রতিদিন এসে বসবে সে। ফুরফুরে মেজাজে যেন প্রজাপতি উড়ছে। ঠিক এমন সময় একটা দৃশ্য দেখে জাহ্নবী নিশ্বাস নিতে ভুলে গেল। হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলো সে। কয়েক মুহুর্ত চোখ নিচুতে রেখে আরও একবার তাকালো সে।

সবচেয়ে কোণার দিকের একটা টেবিলের দুপাশে বেঞ্চিতে বসে আছে চারজন ছেলে। তাদের মধ্যে একজন পুরষই জাহ্নবীর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার কারণ। সাদামাটা নাদুসনুদুস একটা লোক। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। গায়ে হালকা বাদামী রঙের পাঞ্জাবি। ভিন্টেজ আলোয় পাঞ্জাবিটাকেও হলুদাভ লাগছে। স্বাস্থ্যবান সুপুরুষ ধরনের একটা মানুষ! মৃদু হাসি লেগে আছে ঠোঁটে। যেই হাসির চেয়ে বিশুদ্ধ কোনোকিছুই এই পৃথিবীতে নেই, এইমুহুর্তে এটাই মনে হচ্ছে জাহ্নবীর। ওর চোখ ছলছল করছে। হলুদ আলো লোকটার মাঝেও হলুদাভ আভা ছড়িয়েছে। মনে হচ্ছে পুরো রেস্তোরাঁ তার আলোতেই আলোকিত। মোমের মতো জ্বলজ্বল করছে সে। চারপাশকে করছে আলোকিত।

জাহ্নবী দম বন্ধ করে বসে রইল। চা এসে গেল সামনে। সে ভুলে গেল চায়ের কাপ হাতে নিতে। মনে হচ্ছে কাপ ধরতে গেলেই হাত অবশ হয়ে আসবে। এমন কেন হচ্ছে তার!

জাহ্নবী ক্রমশই অস্থির হয়ে উঠল। তৃতীয়বার সে আর ওই লোকটার দিকে তাকালো না। মনেমনে ভাবতে লাগল, বয়স কত হবে ওনার? পঁয়ত্রিশ, ছত্রিশ? যাই হোক, তাতে কী আসে যায়। লোকটাকে দেখে এমন কেন অনুভূত হচ্ছে তার!
ভায়োলেট বলল, ‘উম, আপু টোস্ট টা এত্ত অসাধারণ। নামকরণের সার্থকতা হয়েছে। খেয়ে দেখো।’

জাহ্নবী দুইহাত বাড়িয়ে ভায়োলেটের হাত ধরে বলল, ‘আচ্ছা, একটা মানুষকে দেখার পর যদি তোর মনে হয় তুই মানুষটাকে স্বপ্নে দেখেছিস। মানে তাকে কখনো দেখিস নি, কিন্তু দেখার পর তোর মনে হলো তুই মানুষটাকে আগেও অনেকবার দেখেছিস। মনে হচ্ছে স্বপ্নে দেখেছিস। এটা কী সম্ভব?’
ভায়োলেট চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, ‘আমি একবার একটা জায়গায় যাওয়ার পর আমার মনে হয়েছে জায়গাটা আমি স্বপ্নে দেখেছি। আমি ওই জায়গায় কখনো যাইনি, তবুও মনে হয়েছে এখানে আগেও এসেছি। আমার মনে হয় এটা মানুষের ক্ষেত্রেও হওয়া সম্ভব।’
‘সত্যি?’
‘জানিনা। হতে পারে। জায়গার ক্ষেত্রে হলে মানুষের ক্ষেত্রেও হতে পারে। তবে একটা বিষয় সম্পর্কে জানি।’
‘কী বিষয়?’

ভায়োলেট খুবই আয়েশ করে চায়ের মগে টোস্ট ভিজিয়ে খাচ্ছে। যখন চায়ের সঙ্গে টোস্টের দেখা হয়, কী অসাধারণ নাম, কী অসাধারণ মুহুর্ত। কৌতুহলী হয়ে তাকিয়ে আছে জাহ্নবী।

ভায়োলেট বলল, ‘সায়েন্সে একটা বিষয় আছে। ধরো তুমি ক্লাস করছ। হঠাৎ ম্যাম তোমাকে দাঁড়াতে বলল। তুমি দাঁড়ালে, এরপর তোমার সামনে একজন দাঁড়াল, পাশ থেকে একজন দাঁড়াল। তোমার মনে হচ্ছে এই ঘটনা এর আগেও একইভাবে তোমার সঙ্গে ঘটেছে। ঠিক একইভাবে। এই মনে হওয়াটাকে বলে দেজা ভ্যু। তবে কাউকে দেখে বা কোনো জায়গায় গিয়ে স্বপ্নে দেখেছি মনে হওয়াটাকে কী বলে আমার জানা নেই। রিসার্চ করে দেখতে হবে।’

জাহ্নবী একটা নিশ্বাস ফেলল। সে এরকম উত্তর শুনতে চেয়েছিল কিনা বুঝতে পারছে না। তার কাছে পুরো ব্যাপারটাই অলৌকিক মনে হচ্ছে। স্বপ্নে দেখা কিছু নয়, বরং এটাই যেন একটা স্বপ্ন। এই হলুদ আলো, এই চা, এই টোস্ট, সবকিছু।
চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। জাহ্নবী একটা টোস্ট নিয়ে চায়ের মগে ভিজিয়ে কামড় দিলো। অসাধারণ! এত সুন্দর টোস্ট কিংবা চা বোধহয় সে কখনো খায় নি। যেমন চা, তেমন টোস্ট। “যখন চায়ের সঙ্গে টোস্টের দেখা হয়”, when tea meet toast, এই অসাধারণ নামটা এরা পেলো কোথায়!

জাহ্নবীর বুকে কম্পন অনুভূত হচ্ছে। নিঃসন্দেহে ইনিই সেই মেঘের মানুষটা। জাহ্নবী আর চোখ তুলে তার দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। এভাবে প্রেমে পড়তে চায় না জাহ্নবী। তবে জাহ্নবীর মনে হচ্ছে প্রেমে পড়ার জন্য এরচেয়ে সুন্দর মুহুর্ত তার জীবনে আর কক্ষনো আসবে না।

ভায়োলেট বেয়ারাকে ডেকে বলল, ‘বাসার জন্য টোস্ট কিনে নেয়া যাবে?’
‘জি যাবে।’
‘আমাকে দুই প্যাকেট টোস্ট দিন তাহলে।’

‘তোমাকে বুঝিনা প্রিয়’ গানটা শেষ হয়ে গেছে। এখন অন্য একটা গান বাজছে। তবুও জাহ্নবীর মাথায় সেই গানটিই ঘুরপাক খাচ্ছে। দুচোখে তার পান্নাবাহার – লাইনটি বারবার মনে আসছে। জাহ্নবী বলল, ‘এত সুন্দর সন্ধ্যা আমার জীবনে কখনো আসে নি ভায়োলেট।’
‘তাহলে আর কিছুক্ষণ বসে থাকি।’
‘ ঠিক আছে। বসে থাকি।’

জাহ্নবী চা শেষ করে অন্য স্বাদের এক কাপ চা দিতে বলল। এরা কাপে চা দেয় না, মগ ভর্তি চা দেয়। যাতে টোস্ট ভিজিয়ে চা খেতে সুবিধা হয়। জাহ্নবী রোজ এখানে আসবে, রোজ! সবকিছু এত সুন্দর কেন হতে হবে?
দ্বিতীয় চায়ের স্বাদ গতবারের চায়ের তুলনায় কিঞ্চিৎ খারাপ। ঠিক খারাপ বলা যায় না। তবে আগের চায়ের স্বাদ বেশী মজার ছিল। জাহ্নবী চায়ের মগে আঙুল ছোঁয়াতে লাগল। অজান্তেই আরও একবার চোখ গেল সেই সুপুরুষের দিকে। জাহ্নবী লোকটার নাম দিলো, “পান্নাবাহার।”

লোকটা দুহাতের ওপর থুতনি ভর দিয়ে হাসছে। মায়াবী হাসি। পেছন ফিরে একবার বেয়ারার সঙ্গে কথাও বলল সে। জাহ্নবী দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। খানিক বাদেই ছেলে চারজন উঠে বেরিয়ে গেল। জাহ্নবী একটা নিশ্বাস ফেলল। এতক্ষণ ওর দম আটকে ছিল মনে হচ্ছে। এখন স্বস্তিতে নিশ্বাস নেয়া যাবে।
তবে এই ধারণা ভুল ছিল। যতই সময় গড়াতে লাগল, অস্বস্তি বেড়ে গেল জাহ্নবীর। ভায়োলেট বিদায় নিয়ে বাড়ি চলে গেল। জাহ্নবী গেটের সামনে থেকে গাছের চারা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে বারবার হোঁচট খাচ্ছে। ওর উঠতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে করছে সেই অপূর্ব চায়ের দোকানে গিয়ে বসে থাকতে। আর সেই মানুষটাকে লুকিয়ে কয়েকবার দেখতে। মাথার ওপর গান বাজবে, দুচোখে তার পান্নাবাহার। হয়তো আর কখনোই এই পান্নাবাহারের সঙ্গে তার দেখা হবে না। তবুও কেন আজ দেখা হল!

ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে জাহ্নবীর হঠাৎ ভীষণ কান্না পেলো। সে জানেনা এই কান্না কীসের! তার গাছগুলো পড়ে রইল অনাদরে। জাহ্নবীর আজ বড্ড অস্থির লাগছে। অস্থিরতায় ছটফট করছে সে। “দুচোখে তার পান্নাবাহার” লাইনটি এখনও বাজছে মাথার ভেতর।

চলবে..

উপন্যাসঃ মেঘফুল
পরিচ্ছেদঃ ২২
লেখকঃ মিশু মনি

আজ রবিবার।
লাইব্রেরি উঠোনে একাই একটা টেবিলে গালে হাত দিয়ে বসে আছে সামার। কালো রঙের শাড়িতে তাকে অপূর্ব সুন্দর লাগছে। মনটা ভার কারণ এখনও অর্ণব আসেনি। প্রায় এক ঘন্টা ধরে বসিয়ে রেখেছে অর্ণব। সে এমন একটা মানুষ যে খুব কাছের কেউও নয়, আবার ঠিক সামান্যতম পরিচয়ও নয়। তাই রাগ করাও যাচ্ছে না, আবার অপেক্ষা করাও আনন্দদায়ক হয়ে উঠছে না।
সামার কারও জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করার মানুষ নয়। আজকে একটা বিশেষ দিন বলেই সে অপেক্ষা করে আছে। কারণ আজ অর্ণবের সঙ্গে সে আরজুর পরিচয় করিয়ে দেবে। সামারের বাবা জাভেদ আলী অর্ণবকে অত্যধিক স্নেহ করেন। অর্ণব যদি আরজুর কথাটা বাবাকে বলে, তাহলে তিনি চোখ বন্ধ করে আরজুর সঙ্গে সামারের বিয়ে দিতে সম্মত হবেন, সামারের এটাই বিশ্বাস। বাবার সঙ্গে সে সব ধরনের কথাই মন খুলে বলতে পারে। কিন্তু তাই বলে নিজের প্রেমিকের কথা নিজে বলতে তার বড্ড লজ্জা লাগবে। একারণেই অর্ণব ভাইয়ার কাঁধে দায়িত্বটা দিয়ে দেবে সে। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, অর্ণব এখনও এসে পৌঁছতে পারে নি।

সোনালী বিকেলবেলা কালো রঙের শাড়ি পরে ‘বেঙ্গল বই’ নামের লাইব্রেরির উঠোনে এসে বসেছে সামার। আরজু চলে এসেছে কিছুক্ষণের মধ্যেই। দুজনে মুখোমুখি বসে কফি পান করতে করতে অনেক গল্পগুজব হয়েছে। একে অপরের সঙ্গে কাটানো সুন্দর মুহুর্তের এক ফাঁকে আরজু জানতে চাইলো, ‘তোমার ভাইয়া নাকি আসবে? কোথায় সে?’

সামার অর্ণবের নাম্বারে কল দিলো। ফোন রিসিভ করে হতাশা মেশানো গলায় অর্ণব বলল, ‘সরি সামার। আজকেই তুমি অপেক্ষা করছ আর আজকেই আমার একটা জরুরি কাজের দায়িত্ব দিয়েছে।’
‘সমস্যা নেই। আপনি কাজ শেষ করেই আসুন।’
‘তুমি এতক্ষণ অপেক্ষা করবে?’
‘আমার সঙ্গে একজন আছে। তার সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দেবো। আপনি তারাতাড়ি চলে আসুন।’
‘ওকে। তারাতাড়ি আসছি।’

তারাতাড়ি আসার প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরও অর্ণবের তারাতাড়ি আসা হলো না। এদিকে আরজুকে অফিসিয়াল কাজের জন্য এক ভাইয়ের সঙ্গে আজ মিটিং করতে হবে। আরজু সামারকে বলল, ‘তুমি বরং অপেক্ষা করো। আমি মিটিংটা শেষ করেই চলে আসবো। ওনার আসতে কতক্ষণ লাগবে?’
‘ভাইয়া তো বলেছে আর আধা ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবে।’
‘কিন্তু লক্ষিটি আমাকে যেতে হবে যে! তুমি ওনার সঙ্গে বসে চা খাও। আমি এক ঘন্টার মধ্যেই মিটিং শেষ করে চলে আসবো।’

আরজুও বিদায় নিয়ে নিজ কাজে চলে গেল। সামার বসে রইল একা একা। তার অপেক্ষা আর ফুরালো না। সেই থেকেই গালে হাত দিয়ে থাকতে থাকতে সামারের গাল চুপসে যাওয়ার জোগাড়।

এমন সময় অর্ণব ছুটে এসে বলল, ‘আই এম সরি
সামার। আমার আজকে অনেক প্রেশার ছিল। আজকেই এমন হবে এটা আমি জানতাম না। সরি।’

সামার একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘ইটস ওকে। খারাপ লেগেছে অপেক্ষা করতে। তবে সমস্যা নেই।’
‘সমস্যা নেই কেন?’
‘এতক্ষণ অপেক্ষা করিয়ে রেখে আবার জিজ্ঞেস করছেন সমস্যা নেই কেন?’
‘সমস্যা থাকাটাই স্বাভাবিক। আর তুমি বলছ সমস্যা নেই। তাই জিজ্ঞেস করছি।’
‘আপনি বসুন। মনে হচ্ছে অফিস থেকে সোজা এখানে চলে এসেছেন?’
‘হ্যাঁ। বাসাতেও যাইনি। পায়খানা প্রস্রাব কিচ্ছু না করেই চলে এসেছি।’ জোকসের সুরে বলল অর্ণব।

‘কেন? এত জরুরি কাজগুলো আপনার করা দরকার ছিল।’
বলেই শব্দ করে হেসে উঠল সামার।তার সঙ্গে হাসল অর্ণবও।

চারপাশে চোখ বুলালো অর্ণব। জায়গাটা তার বেশ পছন্দ হয়েছে। চারপাশে অনেক গুলো ছোট ছোট গোল টেবিল। কোথাও দুজন, আবার কোথাও তিনজন। সবাই গল্প করছে। মুখরিত হয়ে আছে আজকের সুবর্ণ সন্ধ্যা।

অর্ণব বলল, ‘তোমাকে কলিজা সিঙারা খাওয়ানোর কথা আমার। আমি একদিন এসে দেখে গিয়েছি কোথায় এই সিঙারা পাওয়া যায়। তুমি বসো। আমি নিয়ে আসি।’
‘সিঙারা খাওয়াটা কী এইমুহুর্তে বেশী জরুরি?’ জানতে চাইল সামার।

অর্ণব মুচকি হেসে শার্টের গুটানো হাতা মেলে দিতে দিতে বলল, ‘হ্যাঁ জরুরি। তুমি সিঙারা খেতে এসেছো।’
‘আপনাকে কে বলেছে আমি সিঙারা খেতে এসেছি? আমার কি জরুরি কাজ থাকতে পারে না?’

অর্ণব হেসে বলল, ‘তা তো পারেই। আমার সঙ্গে বসে বসে সিঙারা খাওয়াটাও জরুরি কাজ।’
সামার ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো, ‘আপনি সবসময় কথা কম বলেন। আজ এত খই ফুটাচ্ছেন মুখে। কাহিনী কী?’
অর্ণব লাজুক হেসে উত্তর দিলো, ‘ মাঝেমাঝে অকারণে দিনটা ভালো যায়।’
‘আপনি কিন্তু একটু আগেই বললেন আজকের দিনটা খারাপ। আপনার কাজের প্রেশার ছিল।’
‘কাজের প্রেশারের মধ্যেও মাঝেমাঝে আনন্দ থাকে।আনন্দের ব্যাপার মাথায় থাকলেই কাজ করে আনন্দ পাওয়া যায়।’
‘আনন্দের ব্যাপার আছে নাকি? শুনি?’
অর্ণব মুচকি হেসে বলল, ‘আছে আছে। বলা যাবে না। তারপর বলো, কেমন আছ?’
‘ভালোই। আপনি আমাকে তুমি বলা শুরু করেছেন কবে?’

অর্ণব লজ্জা পেয়ে মাথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে না সে। সামার এমন প্রশ্নই বা করবে কেন! লজ্জায় লাল হয়ে উঠল অর্ণবের মুখ। কিছুক্ষণ আগেও মুখে খই ফুটলেও এখন সেটা ভাতের মতো গম্ভীর হয়ে উঠেছে।
সামার বলল, ‘কী ভাবছেন?’
‘তুমি না আজকে কার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিবা?’
‘হুম। সেও কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে।’
‘তাহলে আমরা কি সিঙারা পরে খাবো নাকি সে এলে খাবো?’
‘আপনি তো দেখি সিঙারা খাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে আছেন! ঠিক আছে যান, নিয়ে আসুন।’

সামার হাসতে হাসতে বলল কথাটা। অর্ণব উঠে দাঁড়াল। শার্টের গুটানো হাতা আবারও নামাতে শুরু করল। ধীরেধীরে এগিয়ে গেল সিঙারা আনতে। সিঙারার জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। লাইনে দাঁড়িয়ে অর্ণব সামারকে দেখতে লাগল। সন্ধ্যার সুন্দর শহুরে আবহাওয়ায় কালো শাড়িতে কী মোহময়ীই না লাগছে সামারকে! অর্ণবের মুহুর্তের জন্যও দৃষ্টি সরাতে ইচ্ছে করল না।

সিঙারা ও কফি নিয়ে এলো অর্ণব। সামার ভীষণ আদুরে ভঙ্গীতে ফোনে কথা বলছে। এতটা কোমল ও লাস্যময়ী কখনোই লাগেনি তাকে। অর্ণব কাছাকাছি এলে সামার ফোন নামিয়ে রেখে বলল, ‘এতগুলো সিঙারা কেন এনেছেন?’
‘খাবো ‘
‘একটা খারাপ খবর আছে।’
‘কী খবর?’
‘যার সঙ্গে আজ আপনার দেখা করিয়ে দেবার কথা ছিল, সে আসতে পারছে না।’

অর্ণবকে এতে আরও আনন্দিত মনে হল। এটাকে খারাপ খবর বলার মানেই হয় না। সামার আর তার মাঝে অন্যকেউ কথা বললেও আজ ভালো লাগবে না অর্ণবের।
অর্ণব বলল, ‘তোমার বান্ধবী নাকি? দেখো আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েও লাভ নাই। আমি কিন্তু প্রেম টেম করতে পারবো না।’

বলেই হাসল অর্ণব। সামার একটা নিশ্বাস ফেলল। আরজু বান্ধবী নয়, বন্ধু। তার একমাত্র ভালবাসার মানুষ। কিন্তু কথাটা না বলে আবারও নিশ্বাস ফেলল সামার। যে আসবেই না, তার ব্যাপারে কথা বলতেও ইচ্ছে করছে না। সামার চেয়েছিল আজকে আরজুর সঙ্গে এত চমৎকার একটা বিকেল কাটানোর পর অর্ণবের সাথে তার পরিচয় করিয়ে দেবে। অর্ণব বাবাকে আরজুর কথা বলে তাকে রাজি করাবে। সবকিছু কত স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হচ্ছিল। একদিকে অর্ণব দেরীতে এলো। অন্যদিকে আজকেই আরজুর মিটিং। তার আবার মিটিং শেষ হয়নি। এখন নাকি বড্ড মাথাব্যথাও করছে। এরপরেও তাকে কষ্ট দেয়ার ইচ্ছে নেই সামারের। তাই আরজুকে আসতে বারণ করে দিলো সামার।

অর্ণব বলল, ‘তোমার অনেক বান্ধবী বাকি?’
‘হুম।’
‘ভালো। আমি তোমাকে তুমি করে বলাতে কিছু মনে করো নি তো?’
‘না।’

সামার সিঙারা খাচ্ছে। আরজুকে ছাড়া সে কত কিছুই তো খায়। কই কখনো তো এত খারাপ লাগেনি! আজ মনে হচ্ছে এখানে আরজুকে ছাড়া তার বসে থাকাটা বৃথা। অপেক্ষাও তো ছিল তারই জন্য। আর ভালো লাগছে না সামারের।
সামার সিঙারা শেষ করল। অর্ণব একটা খাওয়া শেষে আবার আরেকটা নিয়ে খাচ্ছে। মনে হচ্ছে সিঙারা খেয়ে সে কতই না আনন্দ পাচ্ছে। সামার ওর আনন্দটাকে নষ্ট করে দিতে চাইলো না। বসে রইল শান্ত ভঙ্গীতে।

অর্ণবের কাছে সিঙারার স্বাদ অমৃতের মতো লাগছে। তার সামনে বসে আছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে স্নিগ্ধ মেয়েটি। কালো শাড়িতে তাকে অপ্সরীর চেয়েও সুন্দর লাগছে। আচ্ছা, সে কী আজ আমার জন্যই শাড়ি পরেছে! মনেমনে ভাবল অর্ণব। এই ভাবনাও ওকে আনন্দিত করে তুলল।

সামার বলল, ‘আমি বাসায় যাবো অর্ণব ভাই। আপনিও অনেক টায়ার্ড। বাসায় গিয়ে রেস্ট নেন।’
‘আরে না না। আমি মোটেও টায়ার্ড নই।’
‘অন্য একদিন বসা যাবে। আজকে আমি যাই। আমার মাথা ধরেছে।’
‘চলে যাবা?’ ঠিক আছে। আরেকটা সিঙারা খাও?’
‘না ভাই। আজকে আর খাবো না। আপনি খাচ্ছেন দেখতে ভালো লাগছে। আপনার খাওয়া শেষ হলে আমি উঠবো।’

অর্ণব দ্রুত খাওয়া শেষ করল। একটা সিঙারা অনাদরে পড়ে রইল পিরিচে। সামার নিশ্চয়ই অনেক ক্লান্ত। ঘন্টাখানেকের বেশী সময় অপেক্ষায় বসে ছিল সে। অর্ণবের অপেক্ষা! এই ভাবনাও অর্ণবকে আনন্দ দিচ্ছে। তার জন্য কেউ এক ঘন্টা ধরে বসে অপেক্ষা করবে, এ তো তার কল্পনারও অনেক উর্ধ্বে। সেই অপেক্ষারত রমণী আজ আবার শাড়ি পরেছে!

সামারকে বিদায় দেয়ার সময় অর্ণব বারবার বলল, ‘আমি তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি?’
‘এখন রাস্তায় অনেক জ্যাম হবে। আপনার কষ্ট করে যেতে হবে না। রাতে ফিরতেও কষ্ট হবে।’

অর্ণব আর কথা বাড়াল না। যদিও তার বলতে ইচ্ছে করছিল, ‘কষ্ট হলে হোক।’ কিন্তু সে বলতে পারেনি কথাটা। এত সহজে সবকিছু বলে দেয়া যায় নাকি! যদিও আজ সামারের শাড়ি পরার কারণ্টা ভাবতে গেলেই অর্ণবের মনে হচ্ছে সামারও নিশ্চয়ই চায় অর্ণব তাকে ভালবাসুক। কিংবা সেও অর্ণবের প্রতি দুর্বল হতে শুরু করেছে। এইসব রঙিন ভাবনায় মুখরিত হয়ে রইল অর্ণব। জীবনটা এত সুন্দর করে তার কাছে কখনোই ধরা দেয়নি আগে।

সামার বাসায় ফিরে শুনলো মোস্তফা কামাল লোকটা জাহ্নবীকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। জাভেদ আলী অনুমতি দিলেই তিনি স্বপরিবারে জাহ্নবীকে দেখতে আসবেন। পারভীন ইতিমধ্যেই জাহ্নবীকে ফোন করে কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি চান যেভাবেই হোক, মেয়েটার বিয়েটা যেন এবার হয়ে যায়।

চলবে..