উপন্যাস – “মেঘফুল”
পরিচ্ছেদ – ০৩
লেখক- মিশু মনি
রৌদ্রজ্জল সোনালী দিন ভালো লাগে ভায়োলেটের। সারা রাত মুষলধারে ঝড় বৃষ্টির পর চারদিক সোনালী আলোয় ঝলমল করছে। ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে ভায়োলেট বেরিয়ে পড়ল। বাইরে ওর বিশেষ কোনো কাজ নেই। বাসাতেও কোনো কাজ ছিল না। মিছেমিছি ঘরে বসে থাকার চাইতে লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ে সময় কাটাতে ওর বেশী ভালো লাগে।
লাইব্রেরি পুরোটাই ফাঁকা আজ। দু একজন লাল শার্ট পরিহিত কর্মচারী দাঁড়িয়ে তাদের ডিউটি করছে। ভায়োলেট একটা টেবিলের এক কোণায় গিয়ে বসলো। পাশেই কাঁচের বিশাল স্বচ্ছ জানালা। ইচ্ছে করলেই বই থেকে মাথা তুলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকানো যায়। তিনতলা কফিশপের দোতলা জুরে পুরোটাই লাইব্রেরি। এখানে বসে নিচে তাকিয়ে থাকতেও ভালো লাগে ওর।
লাল শার্ট পরা একজন কর্মচারী এসে ভায়োলেটকে বলল, ‘গুড মর্নিং ম্যাম।’
ভায়োলেট হেসে বলল, ‘গুড মর্নিং।’
‘ম্যাম কফি দেবো আপনাকে?’
‘না, ধন্যবাদ।’
ভায়োলেট মাথা ঘুরিয়ে ছেলেটাকে দেখলো। ছেলেটা নিশ্চয়ই নতুন জয়েন করেছে। পুরনো প্রত্যেকটা কর্মচারী ভায়োলেটকে চেনে। আর ভায়োলেটও কমবেশী পরিচিত সবার সঙ্গে।
শেলফ থেকে বই খোঁজার সময় ছেলেটা আবারও এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘ম্যাম কোন বইটি খুঁজছেন? আমি কি আপনাকে হেল্প করতে পারি?’
‘না, ধন্যবাদ। আমি নিজে পছন্দ করে একটা বই নিয়ে বসবো।’
‘শিওর। ম্যাম, কোনো প্রয়োজন হলে আমাদেরকে জানাবেন।’
‘ধন্যবাদ।’
“দ্য গডফাদার” বই নিয়ে বসলো ভায়োলেট। আশেপাশেই ঘুরঘুর করছে ছেলেটা। যদিও ওর দিকে তাকাচ্ছে না একবারও। তবুও বিরক্ত লাগছে ওর। এর আগে কোনো কর্মচারী এমন ছিল না। স্বাধীনভাবে বই পড়ার জন্যই এখানে আসা, অথচ ওর পছন্দের এই লাইব্রেরিটাও প্রফেশনাল হয়ে যাচ্ছে।
প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে ভায়োলেট মাথা তুলে বাইরে তাকালো। রাস্তায় গাড়ি নেই তেমন একটা। মানুষজন হাঁটাচলা করছে। মনে হচ্ছে এই শহরে ব্যস্ততা বলে কিছু নেই। এএয়ারকন্ডিশনের শীতলতায় বইয়ে চোখ রাখতে রাখতে ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে।
ভায়োলেট আরও কয়েক পৃষ্ঠা পড়ল। ধীরেধীরে লাইব্রেরিতে মানুষজন বাড়ছে। কড়া কফির সুঘ্রাণ ভেসে আসছে নাকে। সেই ছেলেটা একে একে সবার সঙ্গেই আলাপ বিনিময় করছে। ভায়োলেট বেশ কিছু পৃষ্ঠা পড়ার পর উঠে এলো।
ছেলেটা এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘ম্যাম, বইটা কেমন লেগেছে?’
‘ভালো।’
‘আপনাকে দিয়ে দেবো ম্যাম?’
অবাক হলো ভায়োলেট। বিস্ময়ের সঙ্গে অন্য একজন কর্মচারীর দিকে তাকালো। সেই লোকটা নিরীহ ভঙ্গীতে ভায়োলেটকে দেখছে।
ছেলেটা বলল, ‘ম্যাম, চা বা কফি কিছুই খাবেন না?’
‘না। ধন্যবাদ।’
‘ম্যাম, এ নিয়ে অনেকবার আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমাকেও ধন্যবাদ জানানোর সুযোগ দিন।’
ভায়োলেট খানিকটা জোরগলায় বলল, ‘আচ্ছা, সমস্যা কী আপনাদের? এটা তো আপনারা পাবলিকদের জন্যই খুলে দিয়েছেন তাইনা? আমি এখানে বই পড়তে এসেছি। কফি খাবো কি না খাবো সেটা আমার ব্যাপার। আমি খেলে নিশ্চয়ই আপনাকে বলতাম? বা সরাসরি তিনতলায় কফিশপে গিয়ে বসতাম। আপনি আমাকে বিরক্ত করছেন কেন বারবার?’
ছেলেটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে রইল। আমতা আমতা করতে লাগল, যেন বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।
ভায়োলেট বলল, ‘আপনাদের এটা কফিশপ বুঝতে পারছি। কিন্তু এটা তো লাইব্রেরি এবং কফিশপ তাইনা? লাইব্রেরি পাবলিকদের জন্য। কারও মন চাইলে তারা কফি খাবে, মন চাইলে বই কিনবে। মন না চাইলে তো কোনো বাধ্য বাধ্যকতা নেই। আপনি আমাকে বারবার প্রশ্ন করে বিব্রত করছেন কেন? আমি তো আজকে টাকা নিয়ে আসিনি। আপনি যখন বই কিনতে বা কফি খেতে বলছেন, আমি কি লজ্জাবোধ করছি না? এই আপনাদের সেবা?’
বাকি দু তিনজন কর্মচারী ছুটে এসে বলল, ‘ম্যাম, সরি ম্যাম। আপনি প্লিজ কিছু মনে করবেন না।’
ছেলেটা এখনো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ভায়োলেটের দিকে চেয়ে আছে। বাকিরা চেয়ে আছে ছেলেটার দিকে। ভায়োলেট আর কথা না বাড়িয়ে সোজা বেরিয়ে এলো সেখানে থেকে। দরজার কাছে আসতেই ভায়োলেটের পরিচিত একজন কর্মচারী এসে বলল, ‘আসলে উনি নতুন এসেছেন, তেমন কিছু জানেন না। তাছাড়া উনি আমাদের কোম্পানি মালিকের ছেলে।’
ভায়োলেট খানিকটা বিস্মিত হলেও কোনো উত্তর দিলো না। মালিকের ছেলে হোক বা সাধারণ কোনো কর্মচারী, নিয়ম সবার জন্যই এক হওয়া দরকার। ভায়োলেট বলল, ‘ওকে। তবে উনি যেহেতু ডিউটি করছেন, ওনারও উচিৎ সবকিছু সেভাবেই দেখাশোনা করা।’
‘উনি আজকেই ডিউটিতে এসেছেন। গতকাল আমাদের কোম্পানি ওনার স্যার নিজে এসে ওনার সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেন। আমরা জানিনা উনি কেন এই কাজ করছেন। হয়তো শখের বসে। বড়লোকদের অনেক রকমের শখ থাকে।’
‘তাই তো দেখছি। ওনার শখের আনন্দ আমি মাটি করে দিলাম না তো?’
হাসলো কর্মচারী ছেলেটা। ভায়োলেটও হেসে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এলো। রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে, সেইসাথে বেড়েছে মানুষের চলাফেরাও। এখন এই শহরকে বেশ ব্যস্ত নগরী বলে মনে হচ্ছে। শহরের পরিচিত রূপ কখনো বদলে গেলে ভালো লাগে না।
ফুটপাত ধরে হাঁটার সময় একটা নয় বছর বয়সী মেয়ে ভায়োলেটকে লক্ষ করে এগোচ্ছিল। ভায়োলেট মিষ্টি হেসে মেয়েটাকে কাছে ডেকে জানতে চাইলো, ‘কি গো তোমার নাম কি?’
মেয়েটা মুচকি হেসে উত্তর দিলো, ‘আইরা।’
‘আইরা? বাহ সুন্দর নাম তো। আমার দিকে কি দেখছো?’
‘আপনি অনেক সুন্দর।’
‘তাই?’
হেসে ফেললো ভায়োলেট। আইরা বলল, ‘হ আপা। আপনি অনেক সুন্দর। আমার সুন্দর মাইয়া দেখলে ভাল্লাগে।’
ভায়োলেট আইরার হাত ধরে ফুটপাতের পাশে একটা গাছের নিচে এসে বসল। আইরা পাশে দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ভায়োলেট জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি থাকো কই?’
‘চানকারপুল।’
‘এখানে কি করছিলে?’
‘এমনি হাঁটি।’
‘তুমি স্কুলে যাও না?’
‘যাই। মাজেমইদ্যে।’
‘সবসময় যাও না কেন?’
‘কাম করোন লাগে, হেরলাইগা।’
ভায়োলেট কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। আইরা অসহায় ভঙ্গীতে ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আপা, বিশটা টাকা দিবেন?’
‘কি করবা বিশ টাকা?’
‘ভাত খামু।’
ভায়োলেট খানিক্ষন আইরার দিকে তাকিয়ে থেকে ফ্যাকাশে হাসি দিয়ে বলল, ‘আমি আজকে টাকা নিয়ে বের হই নাই। বের হবো কোথ থেকে? আমার কাছে নিয়ে আসার মতো টাকাও ছিল না। আমি একটা গরীব বুঝছো?’
হা হা করে হেসে আইরা বলল, ‘আপনাকে দেখলে তো বড়লোক মনে হয়।’
‘তাই নাকি?’ হাসলো ভায়োলেট। একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘আমি অনেক বড় হয়ে গেছি। এখন আব্বুর কাছে টাকা চাইতে আমার খুব লজ্জা লাগে। তাই খুব বেশী প্রয়োজন না হলে টাকা চাই না।’
আইরা চুপ করে রইল। ভায়োলেট বলল, ‘আমার বাড়ি কাছেই। হচলো হাঁটতে হাঁটতে যাই। তোমাকে ভাত খাওয়াবো।’
আইরাকে সাথে নিয়ে হেঁটে বাসায় ফিরলো ভায়োলেট। পারভীন রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছেন। তরকারি কুটছে জাহ্নবী। ভায়োলেট আইরাকে বলল, ‘তুমি এখানে বসো। রান্না হতে আর কিছুক্ষণ লাগবে।’
পারভীন আইরার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেললেন। আইরার জামাকাপড় দেখে তিনি বুঝতে পেরেছেন আইরা পথশিশু। নিষ্পাপ চাহনিতে আইরা পারভীনকে দেখছেন।
ভায়োলেট হাতমুখ ধুয়ে এসে আইরাকে সোফায় বসতে বলল। ইতস্তত করতে করতে বসে পড়ল আইরা। ভায়োলেট বলল, ‘টিভি দেখবে?’
আইরা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বোঝালো। ভায়োলেট তবুও রিমোট নিয়ে টেলিভিশন চালু করে দিলো। জাহ্নবী রান্না তুলে দিয়েছে। পারভীন খানিক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে বললেন, ‘ওকে আনছো কি জন্য?’
ভায়োলেট নরম গলায় উত্তর দিলো, ‘একটা কাজের জন্য আম্মু।’
‘কি কাজ বুঝিনা আমি? ভাত খাওয়াইতে আনছো। বাপটার মতোই হইছো, তাইনা? অভাবের সংসারে নিজেরাই খাইতে পারিনা, রাস্তা থেকে মানুষ ধরে ধরে আনতেছে ভাত খাওয়ানোর জন্য। তোমার বাপ নিয়ে আসছে মঝরাতে, আর দিনের বেলা তোমরা।’
ভায়োলেট লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়ে গেল। আইরা হা করে পারভীনের দিকে তাকিয়ে আছে। ভায়োলেট বিব্রতকর ভঙ্গীতেই বলল, ‘মা, আমরা যথেষ্ট ভালো আছি। জোর করে নিজেদেরকে অভাবী বলছো কেন?’
‘তা তোমরা কি বুঝবা? আমার স্বামী রিটায়ার্ড, তিন তিনটা মেয়ে বেকার বসে আছে ঘরে। আমি কিভাবে সংসার চালাই সেটা আমি বুঝি।’
পারভীন নিজের ঘরে চলে গেলেন। ভায়োলেট লজ্জায় মুখ তুলতে পারছিল না। এই পরিস্থিতি এড়াতে ফিসফিস করে আইরাকে বলল, ‘তুমি কিছু মনে কোরো না। আম্মুর জ্বর বুঝছো? জ্বর হলে আম্মু একটু রেগে থাকে।’
আইরা হা করে তাকিয়ে রইল। কোনো ভাবান্তর এলো না এর চেহারায়। ভায়োলেট জাহ্নবীর কাছে এসে বলল, ‘আপু, তুমি কষ্ট পাচ্ছো জানি। মন খারাপ কোরো না প্লিজ। সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন।’
‘আমাদের বিয়ে না হলে মা ঠিক হবে না রে।’
ভায়োলেট কী বলবে বুঝতেই পারলো না। স্থির ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে রইলো ভায়োলেট। আইরা এখনও বিমূঢ়ভাবে বসে আছে। ভায়োলেট বসার ঘরে আসতেই আইরা বলল, ‘আপা আমি চইলা যাই?’
‘আরে না। আর কিছুক্ষণ লাগবে, বসো।’
‘না আপা, আমার আসলে একটা কাম আছে। আমি যাই?’
‘প্লিজ ভাত খেয়ে যাও। নয়তো আমি খুব কষ্ট পাবো।’
আইরা কান্নাভেজা গলায় বলল, ‘আপনি অনেক নরম। আপা আমাকে মাফ কইরা দেন, একটা মিথ্যা কথা বলসি আপনাকে।’
‘কি!’
‘আমার নাম আইরা না। আমার নাম রিক্তা আক্তার। এই নামটা আমার পছন্দ না। আপনাদের নামগুলো অনেক সুন্দর হয় সেইজন্য আমি নিজের নাম রাখছি আইরা।’
হেসে ফেলল ভায়োলেট। হাসতে হাসতে বলল, ‘রিক্তা আক্তার নামটাও তো চমৎকার। তোমার যদি ভালো না লাগে তুমি তোমার বাবা মাকে বলবে তারা যেন তোমাকে আইরা বলে ডাকে। তাহলেই আর মিথ্যা বলতে হবেনা।’
আইরা হাসছে। ভায়োলেট বিব্রতকর চাহনিতে এদিক সেদিক তাকাতে লাগল। গরমে রান্নাঘরে ঘামছে জাহ্নবী। জাহ্নবী এতটাই মেধাবী মেয়ে ছিল যে, সবাই ভাবতো জাহ্নবী একদিন অনেক বড় কিছু হবে। অথচ এখন হতাশায় গুমরে মরে মেয়েটা। ভাবলেই ভীষণ কষ্ট হয় ভায়োলেটের।
এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠলো। সামার এসেছে। বেশ ফুরফুরে মেজাজে নিজের ঘরে যাচ্ছিল সে। বসার ঘরে আইরাকে দেখে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘হেই লিটল প্রিন্সেস, হোয়াটস ইয়োর নেইম?’
‘মাই নেইম ইজ রিক্তা আক্তার। এন্ড ইউ?’
‘সামার।’
নিজের ঘরে চলে গেল সামার। একটা পথশিশু ইংরেজিতে ওর প্রশ্নের উত্তর দিলো সেটা যেন খুবই স্বাভাবিক বিষয়। সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ কিংবা বিস্ময় কোনোটাই নেই সামারের। ভায়োলেট অবাক হয়ে আইরাকে বলল, ‘তুমি ইংরেজি জানো!’
আইরা লজ্জা পেয়ে হেসে বলল’আমার স্কুলের বইতে এইগুলা পড়ছি তো।’
‘বাহ!’
ভায়োলেটের বিস্ময় কাটছে না। সামার হাতমুখ ধুয়ে ফোনে কথা বলতে বলতে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপু রান্না কতদূর? প্রচণ্ড খিদা লাগছে।’
‘এইতো প্রায় হয়ে গেছে। মাছ রান্না বাকি।’
সামার সোফায় এসে বসলো। কল কেটে দিয়ে ফোনে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে আইরাকে বলল, ‘হ্যালো রিক্তা।’
আইরা লজ্জা পেয়ে হাসল। ভায়োলেট উঠে গেল জাহ্নবীকে সহায়তা করতে। অনেক্ষণ ধরেই ওর ইচ্ছে করছিল জাহ্নবীর সঙ্গে রান্নাবান্নার কাজে সহায়তা করতে। ঘরে আইরাকে একা রেখে যাওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছিল না সে। এখন সামার এসেছে, তাই নিশ্চিত হয়ে রান্নাঘরে এলো ভায়োলেট। জাহ্নবীকে বলল, ‘আপু, আমি মাছটা রাঁধছি। তুমি কিছুক্ষণ ফ্যানের নিচে গিয়ে বসো।’
জাহ্নবী কোনো উত্তর দিলো না। ওর হাত থেকে চামচ নিজের হাতে তুলে নিলো ভায়োলেট। জাহ্নবী একটা বাক্যও উচ্চারণ করলো না। চুপচাপ রান্নাঘর হতে বেরিয়ে এলো। আইরা জাহ্নবীকে দেখেই বলে উঠলো, ‘আরে জান্না আপু! আপনি এইখানে!’
চলবে..
উপন্যাস – “মেঘফুল”
পরিচ্ছেদ – ০৪
লেখক- মিশু মনি
জাহ্নবী আইরাকে অনেকদিন ধরেই চেনে। শুধু আইরা নয়, অসংখ্য পথশিশুর সঙ্গে ওর বেশ ভাব। আইরা জাহ্নবীকে ভীষণ পছন্দ করে। জাহ্নবী শুকনো হাসি দিয়ে বলল, ‘ভালো আছিস?’
‘হ আপা। আপনাকে অনেক দিন দেখিনাই।’
জাহ্নবী আইরার পাশে গিয়ে বসলো। একটা পথশিশুকে নিয়ে এরকম আধিখ্যেতা মোটেও ভালো লাগছে না পারভীনের। তিনি নিজের ঘরে শুয়ে বিরক্ত হয়ে উঠছেন। কীসে ওনার শান্তি হবে সেটাও জানেন না তিনি। বোধহয় মরণেই একমাত্র শান্তি!
জাভেদ সাহেব অর্ণবকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় ফিরলেন। একই টেবিলে বসে তিন কন্যা ভাত খাচ্ছিল। সঙ্গে আইরা নামের শিশুটি। অর্ণবকে দেখে সবাই একপলক তাকিয়েই আবারও খাওয়ায় মন দিলো। তাদের মনে একটাই প্রশ্ন, ‘এই ছেলেটা আবার কেন এসেছে?’
জাভেদ আলী বললেন, ‘বাবা তুমি রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও।’
অর্ণব কারও দিকে না তাকিয়েই জাহ্নবীর ঘরের দিকে পা বাড়াল। বিব্রতবোধ করলো জাহ্নবী। বিছানার ওপর ওর বইপত্র এলোমেলো হয়ে আছে। ইন্টারভিউয়ের মেইল পেয়ে সব বই নামিয়ে ফেলেছে সে। তাছাড়া ওর স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেট টা বিছানার ওপর রাখা আছে। ছি ছি, কী লজ্জাজনক ব্যাপার!
জাহ্নবী বলল, ‘শুনুন। আপনি এখানেই বসুন। এখন রুমে যাওয়া যাবে না।’
দাঁড়িয়ে পড়ল অর্ণব। জাভেদ আলী জানতে চাইলেন, ‘যাওয়া যাবে না কেন?’
সামার তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলো, ‘আব্বু তোমার সবকিছু জানতে হবেনা। যাওয়া যাবেনা মানে যাওয়া যাবে না। তোমরা থানায় গিয়েছিলে?’
জাভেদ আলী অর্ণবকে সোফায় বসার ইশারা করে উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ গিয়েছিলাম। ওই ছেলেটার একটা ছবি ম্যানেজ করে দিয়ে আসতে হবে। অর্ণব কোথায় যাবে না যাবে তাই ওকে বাসায় নিয়ে আসলাম। তোর মা কই?’
‘মা শুয়ে আছে।’
অর্ণব সোফায় বসে অস্বস্তিতে ভুগছে। টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছে তিন বোন। সে তাদের বিব্রতবোধের কারণ হচ্ছে কী না ভেবেই ওর অস্বস্তি বাড়ছে। ময়লা জামাকাপড় পরা ছোট্ট মেয়েটি বারবার চোখ তুলে তাকাচ্ছে অর্ণবের দিকে। তার চোখেমুখে কৌতুহল। অর্ণবের সঙ্গে বেশ কয়েকবার চোখাচোখি হলো আইরার।
দ্রুত খাওয়া শেষ করে ঘরে চলে এলো জাহ্নবী। পুরো ঘর সুন্দরভাবে গুছিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচল। পরক্ষণেই মনের ভেতর শুরু হলো খচখচানি। ছেলেটা আজ চলে যাবে কী না, এ ব্যাপারে বিস্তর সন্দেহ আছে। সারাদিন তাকে ছোটবোনদের রুমেই কাটাতে হবে মনে হচ্ছে।
জাহ্নবী বসার ঘরে এসে অর্ণবকে বলল, ‘প্লিজ এখন ঘরে যেতে পারেন।’
কথাটা বলেই জাহ্নবীর কেমন যেন লাগল। প্রসঙ্গ এড়াতে জাহ্নবী জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি তেলাপিয়া মাছ খান তো?’
অর্ণব একদিকে মাথা হেলিয়ে উত্তর দিলো, ‘হুম। খাই তো।’
‘অনেকে আবার খায় না তো। এজন্য জিজ্ঞেস করলাম।’
জাহ্নবী আবারও অস্বস্তিতে পড়ল। বসার ঘরে অর্ণব আর সে ছাড়া আর কেউ নেই। ভায়োলেট আইরাকে নিচে নামিয়ে দিতে গেছে, সামার ও বাবা নিজেদের ঘরে। অর্ণব বলল, ‘আপনাদেরকে অনেক বিরক্ত করছি। আসলে আমি একটা বিপদে পড়েছি তাই..। আমার ঢাকা শহরে আত্মীয় স্বজন কেউ নেই।’
‘ওহ। কী বিপদ জানতে পারি? তখন সামার বলছিল থানায় যাওয়ার ব্যাপারে। আমি জানিনা এ ব্যাপারে।’
‘আমার ফোন হারিয়ে গেছে। তো, ওই ছেলের একটা ছবি দিতে হবে।’
‘বুঝলাম না। কার ছবি?’
‘যে আমার ফোনটা নিয়ে গেছে।’
‘মানে কি! চোরের ছবি আপনি কোথায় পাবেন?’
জাহ্নবীর চেহারায় হাস্যকর একটা ভাব ফুটে উঠলো। অর্ণবের সঙ্গে চোখাচোখি হলো তখন। অর্ণব বলল, ‘মানে আমার এক বন্ধুর কাছে মোবাইল আর ব্যাগ রেখে পরীক্ষা দিতে ঢুকেছিলাম। বের হয়ে দেখি ও নেই।’
‘আহারে! আপনার বন্ধুটিকে ভালোমতো চেনেন না?’
‘চিনি। আমাদের এলাকার ছেলে। আব্বুকে ফোন করে জানালাম কিছুক্ষণ আগে। আব্বু ওর ছবি ম্যানেজ করে পাঠাবে।’
জাহ্নবী কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, ‘আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমি খাবার দিচ্ছি।’
‘অনেক কষ্ট দিচ্ছি আপনাদের।’
‘আরে না না, এরকম ভাববেন না তো। তারাতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আসুন। নিশ্চয়ই অনেক খিদে পেয়েছে।’
অর্ণব ধীরপায়ে জাহ্নবীর ঘরে চলে গেল। সোফায় বসে রইল জাহ্নবী। অর্ণবের ফোন হারানোর ঘটনাটা বেশ মজা লেগেছে ওর। এভাবেও কারও ফোন হারিয়ে যেতে পারে সেটা কে কবে ভেবেছে!
ভায়োলেট এসে বলল, ‘আপু, তোমার রুম তো দখল হয়ে গেলো। এবার কী করবে?’
‘আস্তে বল। লোকটা শুনলে কী ভাব্বে?’
‘ওহ আচ্ছা। লোকটা?’
হাসল ভায়োলেট। ভায়োলেটের মুখে হাসি দেখে হাসি পেয়ে গেলো জাহ্নবীরও। তবে রুম দখল হওয়াটা আসলেই দুঃখজনক, সেটা ভেবে ফ্যাকাশে হয়ে গেল হাসির শেষাংশটুকু।
জাভেদ আলী অর্ণবকে সঙ্গে নিয়ে খেতে বসলেন। জাহ্নবী খাবার পরিবেশন করছে। খাবারের চাইতে জাভেদ আলীর গল্পই বেশী গিলতে হচ্ছে অর্ণবকে। সারাজীবন তিনি কাটিয়েছেন বিমান বাহিনীর শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশে। সবসময় নিয়মের মধ্যে থেকে জীবনযাপন করতে গিয়ে ভীষণ একাকী হয়ে পড়েছেন। শেষ বয়সে তার নেই কোনো বন্ধু, কিংবা কাছের কোনো মানুষ। কথা বলার মতো কাউকে পেলেই মন খুলে গল্প জুরে দেন জাভেদ আলী।
জাহ্নবী বলল, ‘আমাদের রান্না খেতে অসুবিধা হচ্ছে না তো আপনার?’
অর্ণব উত্তরে বলল, ‘রান্না তো বেশ মজা হয়েছে।’
কথাটা শেষ হতেই জাহ্নবীর সঙ্গে চোখাচোখি হলো অর্ণবের। জাহ্নবী লজ্জা পেয়ে হাসল।
জাভেদ আলী বললেন, ‘তোমাদের ওখানে তরকারীতে লবণ কম খায় তাইনা?’
‘আমি এসব বুঝিনা আংকেল। আপনি একদিন আসুন না আমাদের ওদিকে। এখন তো আপনার অফিস নেই। কয়েকটা দিন ঘুরে আসবেন।’
‘হা হা। ঠিক আছে। যাবো একদিন।’
অর্ণব জাহ্নবীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনিও আসবেন। আপনারা সবাই আমাদের বাড়িতে যাবেন। দাওয়াত রইল। দেখে আসুন আমাদের এলাকাটা কেমন।’
জাভেদ আলী বললেন, ‘জাহ্নবী গিয়েছিল তো চট্টগ্রামে।’
অর্ণব জাহ্নবীকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তাই নাকি?’
জাহ্নবী লাজুক হেসে বলল, ‘অনেক ছোটবেলায় গিয়েছিলাম। আমার মনেই নেই।’
‘তাহলে সবাই মিলে একদিন আসুন আমাদের বাসায়। অনেক খুশি হবো।’
জাভেদ আলী অর্ণবের পিঠে ভালবাসার সঙ্গে হাত বুলিয়ে দিলেন। জাহ্নবী একটা চেয়ারে বসে পড়ল। জাভেদ আলী’র মুখ থেকে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার গল্প শুনতে ওনার ভীষণ ভালো লাগে।
সামার বিছানায় শুয়ে জানালার রেলিংয়ে পা তুলে দিয়ে মোবাইল টিপছে। মেসেঞ্জার চ্যাটিংয়ে ব্যস্ত সে। হঠাৎ করে ভিডিও কল এলো ফোনে। সামার এক লাফে কলটা রিসিভ করে হাসতে হাসতে বলল, ‘কারও পারমিশন না নিয়ে কল করাটা ভারী অন্যায় মিস্টার টুইস্ট।’
কথা বলতে বলতে হা হা করে হাসল সামার। ভায়োলেট কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আপু একটু আস্তে। আমি বই পড়ছি।’
সামার বলল, ‘গল্পের বই সারাদিন পড়তে হবেনা তো। যা ওই চাটগাঁইয়া ব্যাটার সঙ্গে গল্প কর গিয়ে।’
‘আপু!’
ভায়োলেট বইতে মুখ গুঁজে দিলো। সামার ফোনে বলতে লাগল, ‘আর বলো না, বাসায় একটা চাটগাঁইয়া পোলা আসছে। চাট টটট গাঁইয়া। হা হা হা।’
সামার জোরে জোরে হাসতে লাগল। অবাক হয়ে সামারের দিকে তাকালো ভায়োলেট। বড় আপু জাহ্নবী যেমন শান্ত ও মার্জিত, ছোট আপু সামার ঠিক ততটাই চঞ্চল ও দুষ্টু। দুজন পুরোপুরি দুই মেরুর মতো। ভায়োলেট মনেমনে ভাবলো, ‘আচ্ছা আমি কিরকম? আমি তো চঞ্চল নই, আবার শান্তও নই। আমি তো খুব বেশী ভদ্রও নই আবার দুষ্টুও নই। আমি কী তাহলে?’
সামারের হাসি ও কথার শব্দে রুমে থাকাই মুশকিল হয়ে উঠলো। ভায়োলেট কী করবে বুঝতে পারছে না। লাইব্রেরিতে গিয়ে আরাম করে বই পড়া যেতো। কিন্তু আজ সকালেই সেখানে একটা নতুন কর্মচারীর সঙ্গে রীতিমতো রাগারাগি করে এসেছে সে, এখন আবার কীভাবে যাবে সেখানে! অন্তত আগামী দশ পনেরো দিন ওই লাইব্রেরিতে যাওয়াই উচিৎ হবে না। আগে বেচারা ভায়োলেটের মুখচ্ছবি ভুলে যাক, তারপর ভাবা যাবে।
ভায়োলেট বারান্দায় এসে দাঁড়াল। রাস্তায় ভ্যানগাড়িতে করে সবজি বিক্রি করছে একজন। এক মহিলা সবজি টিপে টিপে পরীক্ষা করে তারপর সেটা নিচ্ছেন। ব্যাপারটা মজার তো! ভায়োলেট চোখ বড়বড় করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
মহিলাটি প্রত্যেকটা টমেটো টিপে টিপে তারপর কিনলেন, একইভাবে বেগুন, আলু, পটল সবকিছু ভালোমতো পরখ করে কিনলেন। ভায়োলেট জানতো না এভাবে সবজি কিনতে হয়। অবাক লাগছে ওর। এই পৃথিবীতে বিস্মিত হওয়ার মতো কত কত বিষয়!
রাত সারে দশটায় একবারে বিদায় নিলো অর্ণব। যাওয়ার সময় জাহ্নবীকে বলল, ‘অনেক কষ্ট দিয়েছি আপনাদের। ক্ষমা করে দেবেন।’
‘কী যে বলছেন! আমরা মোটেও কষ্ট পাই নি।’
অর্ণব হাসিমুখে বেরিয়ে গেল। এবারও জাভেদ আলী ওকে রিকশায় তুলে দিতে গেলেন। জাহ্নবী দরজা আটকে দিয়ে মনেমনে ভাবল, ‘গেস্ট চলে গেছে। এখন আমাকে মন দিয়ে পড়তে হবে, ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। একটা চাকরি পেতেই হবে আমার।’
জাহ্নবী সবেমাত্র পড়তে বসেছে। ভায়োলেট দরজায় শব্দ করে বলল, ‘আপু আসবো?’
‘হুম আয়।’
ভায়োলেটের এক হাতে বালিশ আর অন্যহাতে কোলবালিশ। জাহ্নবী কৌতুহলী হয়ে তাকিয়ে রইল। ভায়োলেট বলল, ‘আমি আজকে তোমার সঙ্গে ঘুমাবো। অসুবিধা হবে?’
জাহ্নবী হেসে বলল, ‘না।’
‘ছোট আপু আমাকে বের করে দিলো। আকাশে মেঘ করেছে। বলছে বৃষ্টি হবে নাকি। সারা রাত সে একাকী ফোনে কথা বলবে।’
জাহ্নবীর বুকে এক ধরণের শিহরণ বয়ে গেল। হঠাৎ ওর ইচ্ছে করল জিজ্ঞেস করতে, সামার সারা রাত কী কথা বলে ফোনে? কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে জাহ্নবী তা জিজ্ঞেস করতে পারল না।
ভায়োলেট বালিশে শুয়ে কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে বলক, ‘গুড নাইট আপু। আমি চোখ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়বো। তুমি দেখতে চাও?’
জাহ্নবী হেসে বলল, ‘হ্যাঁ চাই।’
ভায়োলেট চোখ বন্ধ করে ফেলল। জাহ্নবী আবারও হাসল। বইয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকালো জাহ্নবী। ওর বুকের ভেতর কেমন যেন হচ্ছে। ফোনে কথা বলতে কেমন লাগে, কে জানে! খুব মজা নিশ্চয়ই। প্রিয় মানুষ, সারা রাত ফোন কানে ধরে শত সহস্র কথা হৃদয় ফুড়ে বেরিয়ে আসে। সেখানে মিশে থাকে প্রেম, মান, অভিমান, সোহা, আরও কত কী! জাহ্নবীর হৃদয়ে ব্যথার তীক্ষ্ম সূচ ফুটতে আরম্ভ করল।
ব্যথাকে হালকা করতে জাহ্নবী ভায়োলেটকে বলল, ‘আচ্ছা তোর একটা বান্ধবী ছিল না গুলশানে?’
ভায়োলেটের কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। জাহ্নবী হেসে ফেলল। এত দ্রুত ভায়োলেট ঘুমিয়ে পড়তে পারে, ভেবেই হাসি পাচ্ছে। ভায়োলেটকে দেখলেই মনে হয়, ভীষণ লক্ষী ও সুখী সুখী একটা মেয়ে। এক ধরনের শান্তি অনুভূত হয় ওর দিকে তাকালে।
রাত এগারোটা। সামার জাহ্নবীর দরজায় শব্দ করে বলল, ‘আপু, ভায়োলেট কি ঘুম?’
‘হ্যাঁ, কেন?’
‘ওর ফোন এসেছে। ফোনটা তো আমার রুমেই রেখে এসেছে ও। বুঝিনা ফোন ছাড়া মানুষ থাকে কীভাবে?’
সামারের কানে ফোন, কথা বলছে সে। বাম হাতে ভায়োলেটের মোবাইল এগিয়ে দিলো জাহ্নবীর দিকে। জাহ্নবী ভায়োলেটের ফোনটা নিয়ে রেখে দিলো। আর দুই পৃষ্ঠা পড়ে শুয়ে পড়বে ভাবছে।
এমন সময় আবারও ভায়োলেটের ফোন কাঁপতে লাগল। জাহ্নবী ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখল। নাম্বার সেইভ করা নেই। ভায়োলেট সাধারণ কখনো ই ফোন সাইলেন্ট করে রাখে না। আজ নিশ্চয়ই সামার ওর ফোনে বিরক্ত হয়ে সাইলেন্ট করে দিয়েছে। কিন্তু এত রাতে ভায়োলেটকে কে কল দেবে? ওর ফোনে তো কল আসে না বললেই চলে।
জাহ্নবীর বুকে ধক ধক আওয়াজ হতে লাগল। দ্রুত হার্টবিট বাড়ছে ওর। ‘কে ফোন করলো’, এত রাতে কী কথা বলতে চায়? প্রশ্ন দুটো মনে যতই ঘুরতে লাগল, জাহ্নবীর হৃদস্পন্দন তত বেশী বেড়ে গেল। ভায়োলেট রোজ এগারোটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে। আর ওর ঘুম ভীষণ গাঢ়। জাহ্নবীর পুরো শরীর এবার কাঁপতে লাগল। কে ফোন দিয়েছে ভায়োলেটকে!
তুমুল হৃদস্পন্দন নিয়েই ভায়োলেটের মোবাইল তুলে নিলো জাহ্নবী। ফোনে কোনো পাসওয়ার্ড কিংবা লকও নেই। ডায়ালে একটা অপরিচিত নাম্বার। মাত্র দু’বার কল এসেছে সেই নাম্বার থেকে। একটা কল এসেছে দশ মিনিট আগে, আর একটা কল এইমাত্র। এছাড়া বাকি সব নাম্বার খুব পরিচিত। আব্বু, বড় আপু, ছোট আপু, নন্দিনী ফ্রেন্ড, ছোটমামা এসব। তাহলে এই নাম্বারটা কার!
জাহ্নবীর শরীর জুরে কেমন যেন আন্দোলন চলতে লাগল। ওর খুব জানতে ইচ্ছে করে, কেমন লাগে ফোনে কথা বলতে! মন বলছে, কাজটা ঠিক হচ্ছে না। হৃদয় বলছে, হ্যাঁ তুমি কাজটা করো। এক দোটানায় জাহ্নবী দুলছে। কাঁপছে রীতিমতো। সে অবশেষে কল দিয়েই ফেলল অপরিচিত নাম্বারটাতে।
রিং হতেই ওপাশ থেকে একজন ভরাট গলার পুরুষ রিসিভ করে বলল, ‘যাক আমি সৌভাগ্যবান। আপনি তাহলে ঘুমান নি। কল রিসিভ হলো না বলে ভেবেছিলাম আপনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমার পরিচয়টা দিয়ে নেই। আজকে লাইব্রেরিতে যেই মানুষটাকে আপনি অনেকগুলো কথা শুনিয়েছেন আমিই সেই ব্যক্তি। প্লিজ আগেই রেগে যাবেন না। আমার সব কথা শুনুন। আপনার নাম্বার জোগাড় করে কল দেয়াটা নিতান্তই অনুচিত হয়েছে। তার ওপর আপনার সঙ্গে আমার আজকেই প্রথম দেখা। প্লিজ, রেগে যাবেন না। আমার কথা শুনুন। হ্যালো, আপনি কী শুনতে পাচ্ছেন?’
জাহ্নবীর সমস্ত শিরা উপশিরায় এক ধরণের অচেনা সুর বয়ে গেল। এই সুরের তাল, লয় এতটাই সুমধুর যে, মনে হলো সে স্বপ্নীল এক রাজ্যে প্রবেশ করেছে। জাহ্নবী আর স্থির হয়ে থাকতে পারছিল না। ওর দেহ কাঁপছে। দ্রুতপদে বারান্দায় চলে এলো জাহ্নবী।
ওপাশের সেই সুমধুর কণ্ঠের পুরুষটি বলল, ‘আপনি শুনতে পাচ্ছেন? হ্যালো…’
জাহ্নবীর বুক কেঁপে উঠল। কাঁপা গলায় ভেতর থেকে আওয়াজ এলো জাহ্নবীর, ‘হ্যালো..’
ওপাশের সেই পুরুষ বলল, ‘রাগ করলেন?’
‘না।’
‘ওকে ওকে। আমি কল ব্যাক দিচ্ছি।’
কল কেটে গেল। জাহ্নবীর গা ঝনঝন করে উঠল। দুই সেকেন্ড পরেই কল এলো আবারও। জাহ্নবী ফোন হাতে নিয়ে বারান্দার দরজায় দাঁড়িয়ে বিছানার দিকে তাকাল। ল্যাম্পশেডের হলুদাভ আলোয় ঘুমন্ত ভায়োলেটের মুখটা দেখা যাচ্ছে। কী নিষ্পাপ মায়াবী সেই মুখ! ভায়োলেটের অজান্তেই আজ প্রথমবার একটি অপরাধ করতে যাচ্ছে জাহ্নবী। হোক না অপরাধ, কিছু অপরাধ সুখের হয়।
জাহ্নবী ফোন রিসিভ করে কাঁপা গলায় বলল, ‘হ্যালো…’
চলবে..