উপন্যাস – “মেঘফুল”
পরিচ্ছেদ – ০৫
লেখক- মিশু মনি
‘আপনার গলার স্বর আমার ভীষণ পরিচিত। যেন বহুবার কোথাও শুনেছি এই কণ্ঠ।’ বেশ আবেগ ফুটে উঠলো ফোনের ওপাশের মানুষটার কথায়।
জাহ্নবী শিহরিত হলো। সামার কী তবে সারাক্ষণ এমন মিষ্টি কথায় মুখর হয়ে থাকে! ওর হৃদয় আন্দোলিত হলো। কাঁপা কাঁপা গলায় জাহ্নবী বলল, ‘আপনি এত রাতে কেন ফোন করেছেন?’
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই জাহ্নবীর বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল। একইসাথে সেই তীক্ষ্ম ব্যথার বীণ বাজতে লাগল। জাহ্নবী বারান্দার রেলিংয়ে হাতের মুঠো রেখে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে।
লোকটা বলল, ‘আমি আপনাকে সরি বলার তাগিদ অনুভব করছি। আপনাকে বারবার বিরক্ত করাটা আমার উচিৎ হয় নি।’
‘আচ্ছা। ‘
‘আর ‘হ্যা, আপনাকে ফোন দেয়ার আরও একটা কারণ হচ্ছে ধন্যবাদ জানানো। আপনি আজ ওভাবে না রিয়েক্ট না করলে এই বিষয়টা আমার কখনোই শেখা হতো না। থ্যাংকস ম্যাডাম।’
‘আচ্ছা? তাই?’
জাহ্নবী জানেনা এই আগন্তুকের সঙ্গে ভায়োলেটের ঠিক কী বিষয়ে কথা হয়েছে। নিতান্তই না জানার কারণে ‘আচ্ছা’ আর ‘তাই’ শব্দ দিয়ে কথা চালিয়ে যেতে হল ওকে।
লোকটা বলল, ‘আমাদের কম্পিউটারে সবার ডাটা থাকে সেটা তো জানেনই। সেখান থেকেই নাম্বার নিয়ে কল দিয়েছি। কিছু মনে করেননি তো?’
‘মনে করাটাই কী স্বাভাবিক নয়?’
উত্তরটা দিতেই জাহ্নবী টের পেলো ওর গলা কাঁপছে। বলল,’ কেউ সেচ্ছায় ফোন নাম্বার না দিলে তাকে কোনোভাবেই ফোন করা উচিত না।’
‘ইস, তাহলে আরেকটা ভুল করে ফেললাম। এই ভুলের জন্য কী ক্ষমা করা যাবে?’
জাহ্নবীর মনে অন্যরকম একটা সুখের দোলা লাগল। মৃদু হেসে বলল, ‘না যাবে না।’
‘তাহলে কী শাস্তি দেবেন আমায়?’
জাহ্নবী চুপ করে রইল। শাস্তি? সে ওই লোকটাকে কীভাবে শাস্তি দেবে? যাকে চেনেই না সে। ভায়োলেটের সঙ্গে কোন ঘটনার মধ্য দিয়ে পরিচয় হয়েছে সেটাও ওর অজানা।
লোকটা বলল, ‘আপনি কি লাইব্রেরিতে আসা বন্ধ করে দেবেন?’
জাহ্নবী কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে বলল, ‘ হ্যাঁ। আমি লাইব্রেরিতে যাওয়া বন্ধ করে দেবো।’
‘এটাই কি আমার শাস্তি?’
‘জি। বুঝতে পেরেছেন নাকি আরও বুঝিয়ে বলবো?’
জাহ্নবী মধুর সুরে শেষ কথাটা বললো ঠিকই কিন্তু নিজের মাঝেও মধুপানের স্বাদটুকু উপভোগ করলো। কারও সাথে কথা বলতে বুঝি এতটাই ভালো লাগে! এই আস্বাদন আরও পেতে চায় জাহ্নবী।
লোকটা বলল, ‘আপনার নামটা খুব সুন্দর, ভায়োলেট। আমার মনেহয় বাংলাদেশে এই নাম আর কারও নেই।’
জাহ্নবীর বলতে ইচ্ছে করলো, ‘আমার নাম ভায়োলেট নয়।’ কিন্তু বলতে পারলো না। ওর মন খারাপ হয়ে গেল। মনের ভাটায় টান পড়ে তা যেন শুকিয়ে আরও খরায় রূপ নিলো।
জাহ্নবী নিঃশব্দে ফোন কানে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওপাশের ছেলেটার গলায় তখন মাখো মাখো উদ্বেগ, , ‘আপনি কথা বলছেন না কেন? বিরক্ত হচ্ছেন?’
‘যদি বলি হচ্ছি?’ মুখ টিপে হেসে উত্তর দিলো জাহ্নবী।
‘তাহলে বিরক্ত করার দায়ে এই অধমের গর্দান কাটা যাবে।’
‘ তাই? এত সহজেই বুঝি গর্দান দিয়ে দেবেন?’
‘ আপনি চাইলে তো দিয়ে দেবো-ই।’
‘ কেন? আমি চাইলে কেন দিয়ে দিবেন?’
‘কারণ ভায়োলেট নামে বাংলাদেশে আর কেউ নেই। তাই।’
‘হা হা হা।’
জাহ্নবী হাসছে। ওর মজা লাগছে কথা বলতে। একইসাথে খারাপ লাগছে এই ভেবে যে, কেন ওর নাম ভায়োলেট হলো না?
জাহ্নবী বাচ্চাদের মতো হঠাৎ জানতে চাইলো, ‘ আচ্ছা, আপনার নাম কি?’
‘ অর্জন।’
‘ স্বাধীনতা অর্জন?’
‘ হা হা হা।’ হাসতে লাগল অর্জন। আর জাহ্নবী মনেমনে ভাবতে লাগল, কী বলে ছেলেটাকে মুগ্ধ করা যায়। যেভাবে ছেলেটা কিছুক্ষণ আগে ওকে মুগ্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু তেমন কিছু তো ওর মাথায় আসে না। ও একটা গবেট।
মুখ টিপে হাসলো জাহ্নবী।
অর্জন বলল, ‘আপনি কী ভাবছেন আমি জানি।’
জাহ্নবী চমকে উঠলো, ‘কী ভাবছি?’
‘ভাবছেন অর্জন নামেও বাংলাদেশে আর কেউ নেই।’
জাহ্নবী হেসে উঠলো। লোকটা চমৎকার কথা জানে। পরক্ষণেই হাসি মিলিয়ে গেল ওর। আচ্ছা, সে কি আদৌ কোনো লোক? নাকি ছেলে? বয়স কত হবে তার? প্রশ্নগুলো মনের কোণে উঁকি দেয়ামাত্রই জাহ্নবীর শরীরে কাটা দিতে লাগল।
জাহ্নবী হঠাৎ কিছু না বলেই কল কেটে দিলো। নিজের ভেতর এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করেছে। ফোনটা সে না ধরলেও পারতো। এই অপরাধবোধে আজ সারা রাত ঘুমাতে পারবে না সে।
অপরিচিত নাম্বারটা থেকে আবারও এলো কল। জাহ্নবী ফোনটা সাইলেন্ট করে ভায়োলেটের বালিশের কাছে রেখে দিলো। মানুষের যখন কেউ থাকে না, তখন একাকীত্ব তাকে এমনভাবে চেপে ধরে যে, একটা মানুষ পাবার জন্য পাগল হয়ে ওঠে সে। মন হয় প্রচণ্ড ব্যকুল। এই ব্যকুলতাই এই অপরাধ করতে উৎসাহিত করেছে ওকে।
জাহ্নবী শুয়ে পড়ল ভায়োলেটের পাশে। ভায়োলেটের গা থেকে একটা মিহি সুবাস ভেসে আসছে। জাহ্নবীর ইচ্ছে করছে ঘর থেকে বের হয়ে পাগলের মতো কোনো একদিকে চলে যেতে। মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাগুলোকে অশান্তির সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দিচ্ছে ওকে।
কয়েক মিনিট বাদে জাহ্নবী আবারও ভায়োলেটের ফোনটা হাতে তুলে নিলো। অর্জন একবার কল দিয়েছে মাত্র। জাহ্নবীর আশা ছিল আরও কয়েকবার কল আসবে। হতে পারে অর্জন নিতান্তই ভদ্রলোক। ভায়োলেট কোনো সমস্যায় পড়তে পারে, সেই ভেবে আর কল দেয় নি।
জাহ্নবী কয়েকবার এপাশ ওপাশ করল। ভায়োলেটের মোবাইল নিজের বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখল। ওর ভীষণ অস্থির লাগছে। শরীরে এক ধরণের আবেদন অনুভব করছে সে। একইসাথে অপরাধবোধের প্রবল যন্ত্রণা ওকে গ্রাস করতে লাগল। এই দু’য়ের মাঝে দুলতে দুলতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল জাহ্নবী।
পারভীনের চেঁচামেচিতে ঘুম ভাংলো যথারীতি। ভায়োলেট এখনও ঘুমে। জাহ্নবী ভায়োলেটের মোবাইল বের করে একবার দেখেই রেখে দিলো। অর্জন কোনো মেসেজ দিয়েছে কিনা সেটা দেখাই ছিল ওর উদ্দেশ্য।
সবার নাস্তা যখন প্রায় শেষ, ভায়োলেট তখন উঠে এলো ঘুম থেকে। জাহ্নবী থালাবাসন ধুচ্ছে। ভায়োলেট এক কাপ চা নিয়ে খাবার টেবিলে বসল।
জাহ্নবী ছুটে এসে বলল, ‘ পরোটা দেই তোকে?’
‘ পরে খাবো৷’
‘ ডিম ভাজি করেছি। ধনেপাতা কুচি দিয়ে, তোর তো খুব প্রিয়?’
ভায়োলেট একপলক জাহ্নবীর দিকে তাকিয়ে মুহুর্তেই চোখ নামিয়ে নিলো। জাহ্নবী চমকে উঠলো। আবারও থালাবাসন ধুতে চলে এলো সে। মানুষ যখন কোনো অন্যায় করে, সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকে সে। জাহ্নবীর এখন সেই দশা চলছে।
ভায়োলেট বলল, ‘বাবা কোথায়? নাস্তা খেয়েছে সবাই?’
জাহ্নবী রান্নাঘর হতে উত্তর দিলো, ‘ খেয়েছে। আব্বু নিচে গেছে।’
‘ মেজো আপু খেয়েছে?’
‘ ও এখনও ঘুমে।’
‘ মেজোপুর এখন সুখের সময়। ওর সুখ দেখলে হিংসে হয় না তোমার?’
জাহ্নবী থালাবাসন ধোয়া বন্ধ করে উত্তর দিলো, ‘আমার তো তোর সুখ দেখলে হিংসে হয়।’
ভায়োলেট হাসতে হাসতে বললো, ‘ ভালো বলেছো। আমি আসলেই সুখী।’
‘তোর মতো সুখী যদি হতে পারতাম!’
ভায়োলেট চায়ের কাপ রান্নাঘরে রেখে বলল, ‘সুখী হতে চাইলে এই বাড়ি ছেড়ে বের হও আপা। অনেক সুখী হবা।’
জাহ্নবী বিস্ময়ে হা করে ভায়োলেটের দিকে তাকিয়ে রইল। ভায়োলেট বেরিয়ে গেছে। কিন্তু ওর কথার রেশ জাহ্নবীর গায়ে বাতাসের মতো লেপ্টে আছে এখনও।
জাহ্নবী কাজ শেষ করে ভায়োলেটের ঘরের দরজায় এসে বলল, ‘আসবো?’
সামার শুয়ে শুয়ে মোবাইলে চোখ বুলাচ্ছে। রীতিমতো অবাক হয়ে বলল, ‘আসেন ম্যাডাম। আমাদের রুমে ঢোকার আগে পারমিশন নিতে হবে বুঝি?’
‘হ্যাঁ নিতে হবে না? তোরা বড় হয়েছিস তো।’
‘বারে, বড় হয়েছি তো কী হয়েছে? আমরা কি সাতসকালে বড়দের মতো কাজ করবো নাকি?’
কথাটা বলেই হেসে উঠলো সামার। হাসলো ভায়োলেটও। জাহ্নবী ইতস্তত বোধ করল। সামার বলল, ‘বড়দের কাজকারবার রাতেই শেষ। এখন শুধু রেস্টের সময়। বলো কী বলবা?’
জাহ্নবী লজ্জায় তাকাতে পারছে না। সামার দ্বিধাহীনভাবে সব ধরনের মজা করতে পারলেও সে পারে না।
ভায়োলেট বলল, ‘আমি জানি বড় আপু কি বলতে চায়?’
জাহ্নবী শিউরে উঠল। বুক ধক করে উঠলো তার। ভায়োলেটের দিকে অবাক হয়ে তাকাল সে। ভায়োলেট হাসতে হাসতে বলল, ‘আরে আপু, আমাদের সঙ্গে একটু সহজ হও না।’
জাহ্নবী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভায়োলেট কী তাহলে মোবাইল দেখে ফেলেছে? নাকি শুনে ফেলেছে সব কথা!
ভায়োলেট বলল, ‘আপুকে একটু আগে বলেছি সুখী হতে চাইলে বাড়ি থেকে বের হও। নিশ্চয় এটা নিয়ে টেনশান করছে। তাইনা আপু?’
নিশ্চিত হলো জাহ্নবী। স্বস্তির সঙ্গে তাকালো ভায়োলেটের দিকে। এদেশে যদি কারও মোবাইল ফোনের দিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ না থাকে, তবে সে হচ্ছে ভায়োলেট। প্রতিটা মানুষই বোধহয় ঘুম থেকে উঠেই আগে মোবাইল নিয়ে একবার চেক করার অভ্যাস আছে। ভায়োলেট সেখানে সবার চাইতে আলাদা।
জাহ্নবী ভায়োলেটকে বলল, ‘আমার রুমে আয় তো।’
ভায়োলেট হেসে বলল, ‘চলো।’
চলবে..
উপন্যাসঃ মেঘফুল
পরিচ্ছেদঃ ০৬
লেখক- মিশু মনি
ভায়োলেট একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে জাহ্নবীর দিকে। অপ্রস্তুত ভঙ্গীতে জাহ্নবী পায়চারি করছে। কিছু একটা বলবে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু কীভাবে বলবে সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে না। ভায়োলেট বিষয়টাকে সহজ করার জন্য নিজে থেকেই বলল, ‘আপু, কী হয়েছে?’
জাহ্নবী মুখ কাচুমাচু করে বলল, ‘তেমন কিছু না। তুই মোবাইল দেখেছিস?’
‘না তো। কেন? কী হয়েছে?’
‘শোন, তুই আর লাইব্রেরিতে যাবি না।’
‘আমি নিজেও ভেবেছি অনেকদিন আর যাবো না। কেন বলোতো আপু?’
জাহ্নবী মনেমনে স্বস্তিবোধ করল। ওর এখনো সংকোচ লাগছে কথাটা বলতে। ভায়োলেটের উত্তর শুনে হঠাৎ কথার মোড় ঘুরিয়ে ফেলল জাহ্নবী। বলল, ‘ কাল রাতে একজন কল দিয়েছিল। যার সাথে তোর লাইব্রেরিতে দেখা হয়েছে।’
‘মানে! সে আমার নাম্বার কোথ থেকে পেলো?’ অবাক হয়ে জানতে চাইলো ভায়োলেট।
জাহ্নবী উত্তর দিলো, ‘ছেলেটাকে তুই নাকি কী বলেছিস? কম্পিউটারে সবার তথ্য ছিল। সেখান থেকে জোগাড় করে ফোন দিয়েছে।’
‘অদ্ভুত ব্যাপার। ওখানকার সবাই আমাকে চেনে। ছেলেটা বলতেই তারা আমার নাম্বার দিয়ে দিলো? ইচ্ছে করছে গিয়ে সবগুলোকে ঝাড়ি দিয়ে আসি।’
জাহ্নবী খানিকটা চমকালেও সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘না না। তোর আর ওখানে যাওয়ার দরকার নেই। ছেলেটা সরি বলতে ফোন করেছে। কিন্তু ওর কথাবার্তার ধরণ আমার ভালো লাগে নি। মনে হচ্ছে লোকটা তোকে বিরক্ত করবে।’
‘আমারও ওনার চাহনি ভালো লাগে নি। আমার নাম্বার সংগ্রহ করে ফেলেছে, ছি ছি।’
জাহ্নবী বলল, ‘হুম। ছেলেটার মতলব ভালো না। তোকে বিরক্ত করতে বারবার ফোন করবে। আমার মোটেও ভালো লাগে নি কথা বলে।’
‘আচ্ছা আপু। আমি ওর নাম্বারটা ব্লক করে দিচ্ছি। তুমি এটা নিয়েই টেনশন করছো? আহারে আমার আপুরে, এসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে এত ভাবতে হবেনা।’
জাহ্নবী চুপ করে রইল। ভায়োলেট জড়িয়ে ধরে রইল ওকে৷ খানিকটা সময় এভাবেই কেটে যায়। সামার দরজা খুলে উঁকি দিয়ে বলল, ‘এখানে কী হচ্ছে? আমার হিংসে হচ্ছে কিন্তু।’
জাহ্নবী হেসে বলল, ‘আয়, তুইও এসে আমাকে ধর। এমনভাবে বলছিস যেন আমরা হাতিঘোড়া খাচ্ছি?’
সামার হাসতে হাসতে বলল, ‘হাতিঘোড়া খায় নাকি মানুষ? তোমরা কী নিয়ে শলাপরামর্শ করছো আমাকেও বলো?’
ভায়োলেট বলল, ‘খুবই সিরিয়াস বিষয়। আপুকে বুদ্ধি দিচ্ছিলাম দ্রুত একটা চাকরি জোগাড় করে এই বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য।’
‘কেন?’
ভায়োলেট বিছানার ওপর শুয়ে পড়ল। এক হাত মাথায় হেলান দিয়ে বলল, ‘আমি জানি কীভাবে সুখী হতে হয়।’
ভায়োলেট অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। জাহ্নবী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। সামারও ভায়োলেটের পাশে শুয়ে পড়ল। বলল, ‘কীভাবে সুখী হতে হয়? বল না আমাকে?’
‘নিজেকে ভাবতে হবে অনেক সুখী। সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। তারপর চোখ বন্ধ করে একটা সুন্দর কল্পনায় হারিয়ে যেতে হবে। যেমন জীবন তুমি চাও, সেরকম জীবন কল্পনা করবে। অনেক্ষণ পর চোখ খুলে বাস্তবে ফিরে আসবে। এরপর দেখবে বাস্তব তোমার স্বপ্নের জীবনের মতো নয়। কিন্তু কেন নয়? কারণ স্বপ্নের জীবনটা পাওয়ার জন্য আমাকে অভাবনীয় কিছু কাজ করতে হবে, যেটা আমি করিনি। তাই আমি এই জীবনে আছি। তখন তুমি বুঝতে পারবে, আসলেই তোমার কী করা উচিৎ। যেটা করলে তুমি ওই স্বপ্নের মতো জীবন পাবে।’
ভায়োলেট সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে গেল। জাহ্নবী মুগ্ধ হয়ে ওর কথা শুনছিল। সামারের পলক পড়ছে না। ভায়োলেট মাঝেমাঝে কী সব কঠিন কঠিন কথা বলে, ওর মাথাতেই ঢোকে না।
সামার বলল, ‘আমি তো অনেক সুখী। আমার তো মনেহয় যেমন জীবন আমি চেয়েছিলাম, আমি ঠিক তেমন একটা জীবনই পেয়েছি।’
ভায়োলেট এই কথার উত্তরে কোনো জবাব দিলো না। সে এখনো সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। জাহ্নবী লক্ষ করছে ভায়োলেটকে।
সামার বলল, ‘আমি এরচেয়ে সুখী হতে চাই না। একটা ভালো চাকরি করবো, তারপর পাখির মতো স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াবো। যখন যা মন চায়, তাই করবো। যা পরতে ইচ্ছে করবে, পরবো। যা খেতে ইচ্ছে করবে, খাবো। উড়ে বেড়াবো, আজ এখানে, কাল ওখানে। আজ এর বাসায় পার্টি হবে, কাল ওর বাসায় পার্টি হবে। তারপর দু চার বছর এভাবে এনজয় করার পর আমার মতো স্বাধীনচেতা একটা ছেলেকে বিয়ে করবো। দুজন মিলে রাত বিরেতে চা খেতে বের হবো। মুভি দেখতে সিনেমাহলে যাবো, বন্ধুবান্ধব নিয়ে হৈ চৈ করবো। ব্যস, বিন্দাস লাইফ। এরচেয়ে সুন্দর জীবন কে কখন কল্পনা করেছে? হা হা হা।’
জাহ্নবীও হেসে উঠলো। ভায়োলেটের মুখে মুচকি হাসি। সামার জাহ্নবীকে বলল, ‘এই আপু, তুমি কেমন লাইফ চাও?’
চমকে উঠলো জাহ্নবী। একটা গভীর নিশ্বাস নিয়ে উত্তর দিলো, ‘আমি এমন একটা জীবন চাই, যেখানে…’ আর কিছু বলতে পারল না জাহ্নবী। কারণ সে কেমন জীবন চায়, জানে না। সে শুধু জানে, তার জীবন থেকে যেন দুঃখ আর একাকীত্ব চিরতরে ঘুচে যায়। যেন কেউ একজন তার জীবনে আসে, তাকে ভালবেসে অনেক সুখী রাখে। তার জীবনে খুব বেশী চাওয়া পাওয়া নেই। একটা মানুষই তো। তারা এমন একটা বাড়িতে থাকবে, যেই বাড়ির দোতলায় খুব সুন্দর একটা খোলা বারান্দা থাকবে। বারান্দায় একটা ইজি চেয়ার, যার হাতলে রাখা থাকবে এক কাপ চা। পাঞ্জাবী পরা প্রিয় মানুষটাকে নিয়ে জাহ্নবী ওই বারান্দায় বসে চা খাবে। ঝুম বৃষ্টি নামলে দুহাত মেলে বৃষ্টিতে ভিজবে। জীবনে এতটুকুই তো ওর স্বপ্ন। এর বাইরে আর কোনো স্বপ্ন আছে কীনা, জানেনা জাহ্নবী।
সামার বলল, ‘কী ভাবছো আপু? কেমন জীবন চাও?’
‘জানিনা।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল জাহ্নবী।
সামার বলল, ‘ধুর। এজন্যই তোমার ওপর রাগ লাগে জানো? বেঁচে আছো কেন তুমি? কীভাবে বাঁচতে চাও সেটাই যদি না জানো তাহলে মরে যাওয়াই ভালো না?’
ভায়োলেট সামারের হাত চেপে ধরল। চোখ ভিজে উঠলো জাহ্নবীর। বলল, ‘মরেই তো গেছি। আমি বেঁচে আছি কে বললো তোদের।’
অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো জাহ্নবী। সামার জাহ্নবীর হাত ধরে বলল, ‘আমার লক্ষী আপু, রাগ কোরো না প্লিজ। আমি তোমাকে হার্ট করতে চাইনি। সরি আপু। আসলে আমি জাস্ট বলতে চাইছি, তুমি একটু জেগে ওঠো। এভাবে আর কতদিন?’
জাহ্নবী চোখ মুছল। ভায়োলেট বলল, ‘আপু, আমি তোমাকে বলেছিলাম একটা চাকরি নাও তারপর এই বাসা থেকে বের হও। তুমি কি ভাবছো বিয়ে করতে বলেছি?’
জাহ্নবী ভায়োলেটের দিকে তাকাল। ভায়োলেট বলল, ‘শোনো আপু। আমি ও মেজোপু তোমার ভালোর জন্যই এগুলো বলছি। মন খারাপ কোরো না। আমরা বুঝতে শেখার পর থেকেই দেখছি তুমি একা সব কাজ করো। কখনো আমাদেরকেও কাজে হাত লাগাতে দাওনি। এমনভাবে সবকিছু সামলাও যেন এই সংসারটা তোমার। মা এজন্যই তোমাকে পছন্দ করে না। তুমি কী সেটা জানো?’
জাহ্নবী মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ। আমি জানি। মা আমাকে একটু পছন্দ করে না।’
সামার বলল, ‘মা আসলে রেগে গেছে। আমরা পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবো বলে কখনো আমাদের ওপর বিয়ের চাপ দেয়নি। কিন্তু তাই বলে এই না যে, তুমি বিয়ে করবে না অথচ মা সেটা সহ্য করতে পারবে।’
জাহ্নবী বলল, ‘আমি কী করবো বল? আমার বিয়ে না হলে আমার কি করার আছে?’
‘অনেক কিছুই করার ছিল আপু। তুমি কখনো কোনো ছেলেকে তোমার কাছে ঘেঁষতে দাও নি। কখনো কোনো বিয়ের প্রস্তাব এলে সোজা না করে দিয়েছ, তোমার নাকি বিয়েশাদির ব্যাপারে আগ্রহ নেই। এখন যখন বয়স অনেক হয়ে গেছে, নিঃসঙ্গ জীবন ভালো লাগছে না, নিশ্চয় তুমিও চাও তোমার বিয়ে হোক?’
ভায়োলেট রেগে বলল, ‘তুই বড্ড বেশি কথা বলিস মেজোপু। একটা মানুষের জীবনে বিয়েটাই সবকিছু না। বিয়ে করে আজীবন গাধার মতো খাটবে, নিজের শখ কিংবা ইচ্ছে কোনোটাই পূরণ করবে না, সেটাও তো জীবনে আসল সুখ নয়। আপু যেটাতে সুখী হবে, সেটাই করুক না।’
সামার নিজেও পালটা জবাব দিলো, ‘আপু কী চায় সেটা তো নিজেই জানেনা। বিয়ে ভালো না লাগলে লাইফে অন্যকিছু থাকুক ভাললাগার মতো। আপু তো সারাক্ষণ রান্নাঘর, রুটি, ভাত, তরকারি, থালাবাসন নিয়েই পড়ে থাকে। সে অনেক ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল। একটা ভালো ক্যারিয়ার বেছে নিয়ে নিজের খেয়াল খুশিমত জীবনযাপন করতে পারতো। যা যা করতে ইচ্ছে করতো, সেটাই করে নিজের মতো লাইফ লিড করতে পারতো। সে বিয়েও করলো না, কোনো ক্যারিয়ারও বেছে নিলো না। এভাবে ঘরে বসে বসে ডিপ্রেসড থাকার কোনো মানে হয়?’
জাহ্নবী মাথা নিচু করে আছে। ভীষণ মন খারাপ হয়েছে ওর। ছোট বোনদের সঙ্গে কখনো হাসি আড্ডায় যোগ দেয়নি সে। কারণ কীভাবে আড্ডা দিতে হয়, জাহ্নবী সেটাই জানেনা। সে সবসময় এ বাড়িতে থেকেছে ঠিকই, কিন্তু সবার থেকে দূরে, সবার থেকে আলাদা হয়ে। আজ যখন তিনবোন মিলে একসঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে, তখন তার দোষ ত্রুটি গুলোই যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হচ্ছে।
ভায়োলেট জাহ্নবীকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আপু তুমি কষ্ট পেও না। মেজোপুর মাথা গরম, উলটা পালটা কথা বলে। মেজোপু, তুমি না বাইরে যাবে? এখন যাও তো। আমি আপুর সঙ্গে কথা বলি।’
জাহ্নবী বলল, ‘না, তোরা থাক। আমি যাই, রান্না বসাতে হবে।’
ভায়োলেট জাহ্নবীর হাত টেনে ধরে বলল, ‘কোথাও যাবে না তুমি। এখানে বসো। আমরা তোমার সাথে বড় হওয়ার সুযোগ পাইনি ঠিকই কিন্তু তোমাকে অনেক ভালবাসি আপু।’
জাহ্নবী কেঁদে ফেলল। মুখ তুলে তাকাতে পারল না সে। ভায়োলেট বলল, ‘আপু, আমাদের জীবনটা ছোট এটা সবাই বলে। কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই জানো, এই জীবনটা আসলে ছোট না। ৩৬৫ দিনের একেকটা বছর মোটেও কম নয়। আমরা চাইলেই জীবনকে খেয়াল খুশিমতো ছেড়ে দিতে পারিনা আপু। আমাদের এটাকে গুছিয়ে নেয়া উচিত।’
জাহ্নবীর চোখ মুছে দিয়ে সামার বলল, ‘সে এখন মোটিভেশন দিবে। আমি যাই, বের হবো। থাকো আপু, রাগ করে থেকো না।’
জাহ্নবীর গালে একটা চুমু দিয়ে সামার বেরিয়ে গেল। ভায়োলেট জাহ্নবীর মুখখানা ধরে বলল, ‘আপু। দেখি আমার দিকে তাকাও। মন খারাপ করছো কেন? হাসো তো দেখি। আমার সুন্দর আপু।’
জাহ্নবী মাথা তুলে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। ভায়োলেট বলল, ‘তুমি তোমার জগতটাকে অনেক ছোট করে ফেলেছ আপু। এই ছোট্ট গণ্ডি থেকে বের হও। একটা চাকরি হলে আলাদা বাসা নিয়ে থাকো। জীবনকে দেখো, একটা অন্যরকম জীবন উপভোগ করো। মা’র চিল্লাচিল্লি নেই, সবার জন্য রান্না করার প্রেশার নেই, থালাবাসন ধোয়ার পেরেশানি নেই। শুধু খাবে, ঘুমাবে, বই পড়বে, অফিস করবে আর নিজের মতো জীবনকে উপভোগ করবে। বিশ্বাস করো, তুমি এই হতাশার জীবন থেকে বের হয়ে আসতে পারবে। আমার কথাটা একবার শুনে দেখো।’
জাহ্নবী ভায়োলেটের হাত মুঠো করে ধরে বলল, ‘হুম। দোয়া কর যেন একটা চাকরি পেয়ে যাই।’
‘অবশ্যই। তুমি অনেক মেধাবী। প্রস্তুতি নাও শুধু।’
‘হ্যাঁ, আজ থেকে প্রস্তুতি নিবো। আমি যাই, কাজগুলো শেষ করে আসি।’
ভায়োলেট বলল, ‘উহু, তুমি এখানেই থাকো। কাজের জন্য আমি আছি, মা আছে, বুয়া আসবে। তোমার এত মাথাব্যথা নিতে হবে না। তুমি পড়াশোনা করো আর সুন্দর একটা চাকরি পেয়ে আমাকে ভালো একটা রেস্টুরেন্টে খাওয়াও ‘
জাহ্নবীর বুক ফেটে কান্না আসতে চাইছে। ভায়োলেটকে জড়িয়ে ধরল জাহ্নবী। ওর হঠাৎ মুক্তির স্বাদ অনুভূত হচ্ছে। যেন এত বছর ধরে নিজেই নিজের তৈরিকৃত খাঁচায় আবদ্ধ ছিল সে। আজ যেন তার ঘুম ভেঙেছে। উত্তেজনায় কাঁপছে পুরো শরীর।
ভায়োলেট যখন ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো, জাহ্নবী ভায়োলেটের ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ওই নাম্বারটা ব্লক করে দিস। আমি সরি যে, তোর কলটা আমি রিসিভ করেছিলাম।
ভায়োলেট মুচকি হেসে বলল, ‘কোনো সমস্যা নেই আপু। আমি নাম্বারটা এক্ষুণি ব্লক করে দিবো।’
ভায়োলেট ঘর হতে বের হওয়ামাত্রই দেখল পারভীন খাবার টেবিলে গম্ভীরমুখে বসে আছেন। ভায়োলেট বলল, ‘মা, কী হয়েছে?’
‘কিছু না। জাহ্নবীকে বলতো মাছটা কেটে ধুয়ে নিতে। ইলিশ মাছ আনছে। তোর বাপকে জিজ্ঞেস কর ইলিশ পোলাও খাবে নাকি সরষে ইলিশ করতে বলে।’
ভায়োলেট বলল, ‘কোনোটাই না। সাদা ভাত দিয়ে মচমচে মাছ ভাজি, আর বেগুন দিয়ে ইলিশ মাছের তরকারি। তুমি খুব সুন্দর করে এটা রান্না করতে। অনেকদিন খাইনা। আজকে তুমি রান্না করো মা।’
পারভীন নিরুত্তর মুখে ভায়োলেটের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এমন সময় ঘর থেকে বের হল জাহ্নবী। ভায়োলেটের কাছে এসে দাঁড়াতেই ভায়োলেট বলল, ‘আপু, তোমাকে কী বলেছি?’
জাহ্নবী মৃদু স্বরে বলল, ‘আমি রান্নাঘরে যাবো না। তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছি।’
‘কী কথা বলো?’
জাহ্নবী গলার স্বর আরও নীচু করে বলল, ‘তুই কেমন জীবন চাস এটা শোনা হয় নি।’
ভায়োলেট মুচকি হেসে বলল, ‘পরে বলবো।’
চলবে..