মেঘফুল পর্ব-৭+৮

0
484

উপন্যাসঃ মেঘফুল
পরিচ্ছেদঃ ০৭
লেখক- মিশু মনি

রাত সাড়ে এগারো টা।
জাহ্নবী বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে বই পড়ছে। বারবার চোখ বুজে আসছে ঘুমে। ভায়োলেট দরজায় ঠকঠক শব্দ করে বলল, ‘আসবো আপু?’

জাহ্নবী দরজা খুলে দেখল ভায়োলেট বালিশ নিয়ে এসেছে। আজকেও ভায়োলেট ওর সঙ্গে ঘুমাবে। জাহ্নবী বলল, ‘এসেছিস ভালো হয়েছে। আমার খুব ঘুম পাচ্ছিল।’
ভায়োলেট ঝলমলে গলায় বলল, ‘তাহলে এক কাজ করি চলো। গল্প করি। ঘুম পালিয়ে গেলে আবার পড়তে বসবে।’
জাহ্নবী হাসল। তখন চোখ গেল ভায়োলেটের হাতে থাকা মোবাইলটার দিকে। অর্জন নামের ছেলেটার সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারটা ভাবতেই ওর গা ঝমঝম করে উঠল।
ভায়োলেট শুয়ে পড়ল। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে হাস্যজ্জ্বল মুখে বলতে লাগল, ‘মেজোপু কাল বেড়াতে যাবে।’
‘বেড়াতে যাবে? কোথায়?’
‘জানিনা। চট্টগ্রাম বা ওদিকে কোথাও। আমি ভালো করে শুনিনি।’
‘ একা যাচ্ছে?’
‘না। ওরা বন্ধুবান্ধব মিলে।’

জাহ্নবী ভায়োলেটের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দুজনেই চোখে চোখে কিছু একটা বলতে পেরে হেসে উঠল একইসঙ্গে। সামারের প্রেমিকও নিশ্চয়ই সঙ্গে যাবে। সামারের সৌভাগ্যবান প্রেমিক পুরুষটি কে, সেটা আজও জানা হয়নি জাহ্নবীর।
জাহ্নবী ভায়োলেটকে স্পর্শ করে ফিসফিস স্বরে বলল, ‘আচ্ছা, ও কার সঙ্গে প্রেম করে রে?’
‘একটা ছেলের সঙ্গে। এখনো প্রেম হয় নি সেভাবে।’
‘সেভাবে মানে? প্রেমের আবার সেভাবে এভাবে আছে নাকি?’
‘আছে না আবার? সবেমাত্র ফোনে কথা বলছে, মাঝেমাঝে দেখাসাক্ষাৎ হয়। এরপর প্রেম হতেও পারে, নাও হতে পারে।’

জাহ্নবী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দিলো, ‘প্রেম হলে ওরা বিয়ে করে ফেলবে তাই না?’

ভায়োলেট নিঃশব্দে জাহ্নবীর চোখের দিকে তাকালো। অনেক্ষণ কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। জাহ্নবী বই খুলে পড়তে আরম্ভ করলো।
রাত বেড়ে গেল অনেক। জাহ্নবী বেশ কয়েকবার ভায়োলেটকে ডেকে কোনো সাড়া পেলো না। খানিক্ষণ পর ভায়োলেটের মোবাইলটা হাতে তুলে নিলো জাহ্নবী। ডায়াল লিস্টে ঢুকে দেখল অর্জন আরও ফোন করেছিল কী না। অর্জনের নাম্বার থেকে কোনো কল কিংবা মেসেজ আসে নি। স্বস্তিবোধ করল জাহ্নবী। ইচ্ছে করছিল একবার কল আসুক, সে কল কেটে দেবে। কিংবা রিসিভ করে খুব করে বকা দিয়ে দেবে। পরক্ষণেই ভায়োলেটের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবল, ‘ও অনেক নিষ্পাপ। আমার ওর সঙ্গে সৎ থাকা উচিৎ।
কথাটা ভাবামাত্রই ভায়োলেটের মোবাইল রেখে দিলো জাহ্নবী। এক ধরণের শান্তি অনুভব করল মনে।

সামার আজ ঘুরতে যাচ্ছে বন্ধুদের সঙ্গে। সকাল সকাল বাবার কাছে টাকা নিয়ে তৈরি হচ্ছে কেনাকাটা করতে যাওয়ার জন্য। জাহ্নবী ওর রুমে চা দিতে এলে সামার জিজ্ঞেস করল, ‘আপু, যাবি?’
জাহ্নবীর ইচ্ছে করছিল সামারের সঙ্গে মার্কেটে যেতে। গত দু বছরে ওর মার্কেটে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করা হয়নি। দুই ঈদে জামাকাপড় কেনার সময় সামার ও ভায়োলেট ওর জামা কিনে এনেছে। নিজের জন্য কখনো শপিংয়ে যাওয়ার ইচ্ছে বা সুযোগ কোনোটাই হয়নি জাহ্নবীর। কয়েকদিন ধরে দুই বোনের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছে সে। বিশেষ করে ভায়োলেটের সঙ্গে দারুণ গল্প হয়, ভায়োলেট ওর রুমেই শুতে আসে রোজ। জীবনটাকে আজকাল অতটাও খারাপ লাগছে না। সামারের সঙ্গে শপিংয়ে যাওয়ার সুযোগটাকে একদমই মিস করতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু আসল ব্যাপার হচ্ছে জাহ্নবীর হাত ফাঁকা। ছোটবোন নিজের টাকায় কেনাকাটা করবে আর সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে, বিষয়টা লজ্জাজনক দেখাবে। নিজে থেকে ‘আমি পেমেন্ট করে দিচ্ছি’ বলতে না পারলেও অন্তত ‘এটা আমার পক্ষ থেকে তোর জন্য’ বলার মাঝেও একটা শান্তি শান্তি ব্যাপার আছে।
জাহ্নবী বলল, ‘ না রে যাবো না। তুই ভায়োলেটকে নিয়ে যা।’
‘ ও কোথায় যেন আটকে গেছে। আর ও বড্ড তারাহুরো করে। ওর সঙ্গে শপিংয়ে গিয়ে মজা নেই। শপিং মানেই তো সব মার্কেট ঘুরবো, রং বেরঙেত জিনিস দেখবো, দামাদামি করবো। সময় লাগে না বলো?’

জাহ্নবী মুচকি হেসে বলল, ‘তাহলে একাই যা।’
‘আপু, কথা না বাড়িয়ে রেডি হয়ে নাও। আজকে আমরা একসঙ্গে শপিংয়ে যাবো।’

জাহ্নবী চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। রীতিমতো ধমকের সুরে সামার ওকে প্রস্তুত হতে বললে দ্রুত তৈরি হয়ে নিলো জাহ্নবী। বের হওয়ার পূর্বে জাহ্নবী বাবার কাছে বিদায় নেয়ার কালে তিনি জাহ্নবীকে কাছে নিয়ে বললেন, ‘মা, এই টাকাটা রাখ।’
জাহ্নবী অনেক্ষণ অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর জমে থাকা শূন্যতা ভরাট হতে শুরু করেছে। মাথার ওপর বাবা থাকা মানেই যেন একটা ছাদ। রোদ হোক, বৃষ্টি হোক, বাবা আছে মানে আমি ভিজবো না। জাহ্নবী বাবাকে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছেটাকে সামলে নিয়ে প্রফুল্ল মুখে শুধু বলল, ‘ধন্যবাদ বাবা।’

রিকশায় উঠে জাহ্নবীর দারুণ ফুরফুরে লাগতে শুরু করেছে। বাতাসে চুল উড়ছে, সামারের গা থেকে ভেসে আসা সুগন্ধে ওর সবকিছুই অন্যরকম লাগছে। সামার এরই ফাঁকে দুজন বান্ধবীর সঙ্গে ফোনে কথা বলে ট্যুরের ব্যাপারে আলাপ করল। জাহ্নবী জিজ্ঞেস করলো, ‘ কোথায় যাচ্ছিস ঘুরতে?’
‘বান্দরবান। আজকে রাতে বাস। অথচ এখনো ওরা ব্যাগ গোছায় নাই। পরে এটা ওটা ফেলে রেখে যাবে আর আমাকেই গুতাবে, সামার তোর এইটা দে না, সামার তোর ওইটা দে না।’

জাহ্নবী শব্দ করে হেসে বলল, ‘তোরা অনেক মজা করিস তাই না?’
‘তা তো করি ই। আমার ফ্রেন্ডস রা সবাই অনেক জোস। আজকে দুইজন আসবে, পরিচয় হলে দেখো।’

জাহ্নবী ইতস্তত বোধ করল। সে কারও সঙ্গে অত সহজে মিশে যেতে পারে না। অপরিচিত কারও সাথে কথা বলতে সংকোচ বোধ করে। চুপচাপ বসে থাকতে খুবই লজ্জা লাগে ওর। সামার ও ভায়োলেটের বান্ধবীরা প্রায়ই বাসায় আসে। জাহ্নবী প্রয়োজন ছাড়া তাদের সামনে যেতেও দ্বিধাবোধ করে। আজ ওদের সঙ্গে কীভাবে আলাপ করবে সেটা ভেবেই মনেমনে প্রস্তুতি নিতে লাগল।
‘হ্যালো আপু, কেমন আছেন আপনি?’
‘আমি ভালো আছি। তোমরা কেমন আছো?’
‘ভাল।’
‘আজকে তো ঘুরতে যাবে। কেমন লাগছে তোমাদের?’
‘অনেক আনন্দ হচ্ছে আপি। আমরা তো খুবই এক্সাইটেড। অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা দেখব, বন্ধুরা মিলে হৈ চৈ করবো। খুব মজা হবে।’
‘ বাহ। বেশ ভাল। সামারের দিকে খেয়াল রেখো কিন্তু। ও একটু উদাসীন নিজের ব্যাপারে।’
‘আমাদের খেয়াল রাখতে হবে না আপু। ওর খেয়াল রাখার জন্য লোক আছে।’
জাহ্নবী কথাগুলো ভেবেই ফিক করে হেসে উঠল। ওদের সঙ্গে এভাবেই আলাপ করবে সে। একটু দ্বিধা কিংবা সংকোচ করবে না। আজ সে অনেক আত্মবিশ্বাস ধরে রাখবে। হাসিমুখে কথা বলার চেষ্টা করবে।
সামার জানতে চাইল, ‘কি দেখে হাসছো?’
‘কিছু না।’
‘কার কথা মনে হয়েছে?’
জাহ্নবী মনেমনে বলল, ‘তোর প্রেমিকের কথা।’ কিন্তু এক কথা কখনোই সে মুখে বলতে পারবে না। সামার ও ভায়োলেট যতটা ফ্রি, তার পক্ষে এমন হওয়া সম্ভব হবেনা কখনো। একটা নিশ্বাস ফেলল জাহ্নবী।

নিউমার্কেট ও চাঁদনী চক ঘুরেঘুরে জিন্স, টপস কিনল সামার। প্রচণ্ড ভীড় ঠেলে দিব্যি হেঁটে হেঁটে কেনাকাটা করছে সে। এদিকে জাহ্নবীর অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি। ভীড়ের ভেতর মানুষ তাকে ঠেলে ফেলে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে অথচ সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বারবার হাসিতে ফেটে পড়ছে সামার।
জাহ্নবী বলল, ‘এই মিছিলের ভেতর মানুষ কেনাকাটা করে কীভাবে?’
‘এভাবেই করতে হয় আপু।’
‘আমি অনেক আগে একবার এসেছিলাম। তখন এত ভীড় ছিল না।’
‘নিউমার্কেটে ভীড় ছিল না? বিশ্বাস হল না কথাটা।’

সামার জাহ্নবীর হাত ধরে ভীড়ের মধ্য থেকে বেরিয়ে এলো। জাহ্নবীর ধারণা ছিল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় শপিংমল গুলোতে যাবে সামার। যেখানে কাঁচের ভেতর ম্যানিকুইনগুলো চমৎকার জামাকাপড় পরে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু হাজার হাজার লোকের ভীড় ঠেলে কেনাকাটা করতে হবে এমনটা ভাবেনি সে।
সামার আবারও রিকশা নিলো। জাহ্নবীর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল ‘আমরা কী বাসায় যাচ্ছি? তোর বান্ধবীরা কি আসবে না?’
কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারল না। রিকশা থেকে নেমে ওরা দোতলায় উঠতে লাগল। জাহ্নবী অবাক হয়ে দেখল, সে এতক্ষণ যেমন শপিংমলের কথা ভাবছিল, এবার তেমনই একটা মলে এসেছে ওরা। দারুণ দারুণ জামাকাপড় চারপাশে।
সামার জাহ্নবীকে নিয়ে হাঁটতে লাগল। জাহ্নবী চোখ ঘুরিয়ে জামাকাপড় দেখছে। সামার একটা ছেলেকে দেখে রীতিমতো ধমকের সুরে বলল, ‘আমাকে এতক্ষণ অপেক্ষা করাইছস ক্যান?’
‘সরি দোস্ত। রাস্তায় জ্যাম ছিল।’
‘রাস্তায় জ্যাম ছিল নাকি তোর সুন্দরী স্নিগ্ধা ছিল?’
‘স্নিগ্ধা এত সকালে ঘুম থেকে উঠে না।’
‘তুইও কি ওর সঙ্গে ঘুমাচ্ছিলি নাকি?’
‘ঘুমাতে পারলে তো ভালোই হইতো। ঘুমাতে দেয় আর কই?’

ছেলেটা দাঁত বের করে হাসছে। সামার একটা মাইর দিল ওর বন্ধুর কাঁধে। জাহ্নবী লজ্জা পাচ্ছে। বড়বোনের সামনে এভাবে দুষ্টুমি করছে ওরা। এত ফ্রি কীভাবে হয় মানুষ!
ছেলেটা জাহ্নবীকে বলল, ‘হ্যালো। আমি সোহান।’
জাহ্নবী বলল, ‘আমি জাহ্নবী।’
‘মাই গড! আপনি বড় আপু? সামার তুই আগে বলবি না উনি তোর বড় আপু? আপু আসসালামু আলাইকুম। বেয়াদবি মাফ করবেন।’
আবারও হাসল ছেলেটা। জাহ্নবী মুচকি হেসে বলল, ‘ইটস ওকে।’
সোহান বলল, ‘আমি ভেবেছিলাম আপনি ওর জুনিয়র মানে ছোটবোন। নিজের বোন না, ওর আবার বোনের অভাব নাই। প্রত্যেকদিন নতুন নতুন বোন নিয়ে আসে।’
জাহ্নবী মনেমনে খুশি হল। হঠাৎ মনে হল, ‘আমাকে দেখেই তো মানুষ ভাবে আমার বয়স চল্লিশ। আমাকে দেখতে কী আজকে ছোটবোনের মতো লাগছে? নাকি ছেলেটা কথার কথা বলল?’
জাহ্নবী উৎসুক চোখে ভাবতে লাগল কথাগুলো। সোহান বলল, ‘কি কিনছোস?’
‘তেমন কিছু না। তোর শার্ট দেখছোস? রুবাইয়া কতদূর? ওরে ফোন দে তো ‘
‘রুবাইয়া বলসে সামারের টাকায় যা যা কেনার কিইনা ল। আমি সামারের কাছে টাকা পাই ‘
‘টাকা পায় মানে? কিসের টাকা?’
‘আরে আমি কি জানি? ও বলসে।’
‘ঢপ মারাস না? আমি কোনোদিনও ওর কাছে টাকা নেই নাই। তুই বানাই বানাই বলছস।’

সামার আবারও মাইর দিল সোহানকে। জাহ্নবী দাঁড়িয়ে রদাঁড়িয়ে ওদের খুনসুটি দেখতে লাগল। সোহানের চোখে চশমা, গালে ছোট ছোট দাড়ি। হলুদ কালো ডোরাকাটা টি শার্টে ভীষণ ভদ্র দেখাচ্ছে সোহানকে। ওরা দুজন কথা বলতে বলতেই জামাকাপড় দেখতে লাগল। জাহ্নবী দাঁড়িয়ে রইলো একদিকে। দোতলার কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির পূর্বে আবহাওয়া যেমন মেঘাচ্ছন্ন অন্ধকারে ছেয়ে যায়। হঠাৎ করেই সবকিছু ভালো লাগছে জাহ্নবীর, ভীষণ ভালো লাগছে।

সামার এসে বলল, ‘আপু এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? আসো। আমাদের হয়ে গেছে।’
মার্কেটের অন্য এক দিকে একটা কফিশপে এসে বসল ওরা। রুবাইয়া নামের মেয়েটা এসে পড়ল। জাহ্নবীকে আগেই দেখেছে রুবাইয়া। এসেই আগে জাহ্নবীকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘হাই আপু। কেমন আছো?’
জাহ্নবী মনেমনে খুব অবাক হল। ও যা ভেবে রেখেছিল, সেটাকে এখন একেবারেই সেকেলে মনে হচ্ছে ওর। সামার ও তার বন্ধুরা ওর ভাবনার চাইতেও অনেক গুণ এগিয়ে। রুবাইয়ার গা থেকে আসা সুবাসে জাহ্নবীর মনে হল, রুবাইয়া যেন ওরই বন্ধু।
কফি খেতে খেতে ওরা বিভিন্ন প্লান নিয়ে কথা বলছিল। জাহ্নবী বুঝতে পারল না সেসব। তবে মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। রুবাইয়া গাড়ির টিকেট বের করে টেবিলে রাখল, নোটপ্যাডে ট্যুরের যাবতীয় হিসাব নিকাশ দেখাতে লাগল ওদেরকে। সোহান মাঝেমাঝে হাস্যকর কথা বলে সবাইকে হাসাচ্ছিল। বাস ছাড়বে রাত এগারোটায়। সবার সিট সামনে পড়েছে, কেবল একটা সিট পিছনের দিকে। সেখানে কাকে বসতে হবে এটা নিয়েও তিনজনের এক পশলা তর্ক হয়ে গেল। গাড়ি থেকে নেমে তারা আগে নাস্তা করবে তারপর অন্য একটা গাড়ি তাদের নিয়ে যাবে। পথে বিভিন্ন জায়গায় সাইটসিয়িং করানো হবে। সবকিছু শুনতে শুনতে জাহ্নবীর মনে হচ্ছিল সে একটা স্বপ্নের জগতে আছে। সামার এজন্যই হয়তো বলেছিল, সে যেমন লাইফ চায় ; এখন সেই লাইফটাই এনজয় করছে। এরচেয়ে বেশী কিছু চাইনা তার।

এক পর্যায়ে রুবাইয়া জাহ্নবীকে বলল, ‘আপু, সরি আমরা আসলে ট্যুর নিয়ে আলাপ করছিলাম। আপনাকে বিরক্ত হতে হচ্ছে তাইনা?’
‘আরে না না, আমি ভালোই মজা পাচ্ছি। সমস্যা নেই।’
‘আপু, আপনিও চলুন না আমাদের সঙ্গে। অনেক মজা হবে।’

বুকটা ধক করে উঠলো জাহ্নবীর। সত্যিই কী তা কখনো সম্ভব! সে যাবে ওদের সঙ্গে? এটা তো স্বপ্ন স্বপ্ন ব্যাপার। কিন্তু আগামীকাল ওর ইন্টারভিউ আছে। যেটা সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ এই মুহুর্তে।
সোহান ও সামার জাহ্নবীকে যেতে অনুরোধ করল। জাহ্নবী বলল, ‘অন্য একদিন যাবো। এবার তোমরা ঘুরে আসো।’
তিন বন্ধু আবারও মেতে উঠল আড্ডায়। কফির কড়া সুঘ্রাণে জাহ্নবী ওদের খুনসুটি শুনতে শুনতে বাইরে তাকিয়ে রইল। তার যদি চাকরিটা হয়ে যায়, পরের বার সে-ও যাবে সামারের সঙ্গে। নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে ঘুরতে যাবে সে। ভাবতেই প্রশান্তিতে বুক ভরে গেল। জীবনটা হঠাৎ ই দারুণ ভালো লাগছে জাহ্নবীর।

হঠাৎ জাহ্নবী বলল, ‘আমি একটু আসছি।’
বন্ধুদের মাঝে এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। ওদের মাঝখান থেকে উঠে এসে রেস্টুরেন্টের বিল পরিশোধ করে দিলো জাহ্নবী। বড় বোন হিসেবে এটা করাটা আনন্দের ব্যাপার। জাহ্নবী আরও কিছু খাবার অর্ডার দিয়ে বলল ওদের টেবিলে দিয়ে আসতে। খাবার দেখে অবাক হয়ে গেল ওরা। জাহ্নবী মনেমনে হাসলো। জাহ্নবীর মনে হচ্ছে, ধীরেধীরে ঘুম ভাংছে ওর। এত বছরের জটিল ঘুম শেষে মুক্তির স্বাদ পেতে শুরু করেছে জাহ্নবী।

চলবে..

উপন্যাসঃ মেঘফুল
পরিচ্ছেদঃ ০৮
লেখক- মিশু মনি

জাহ্নবী চাকরির ইন্টারভিউতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভালো করেছে। ফলাফল কী আসে এখন সেই অপেক্ষার প্রহর গুণতে হবে। জাহ্নবী ইতিমধ্যেই সেই প্রহর গুণতে আরম্ভ করে দিয়েছে। কলিংবেলের আওয়াজ শুনে তার ভ্রম ভাঙলো।
লুকিং গ্লাসে চোখ রেখে রীতিমতো চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল তার। সেদিনের ওই লোকটা এসেছে, কী যেন নাম? অর্ণব! জাহ্নবী দরজা খুলে খানিক্ষণ তাকিয়ে রইল অর্ণবের দিকে। হাতে ব্যাগ, চোখে সানগ্লাস আর ঘর্মাক্ত শার্টে কিম্ভূতকিমাকার দেখাচ্ছে তাকে।
অর্ণব বলল, ‘আসতে পারি?’
‘হ্যাঁ আসুন না। বাবা তো বাসায় নেই।’
অর্ণব অস্বস্তিতে পড়ে গেল। আজকে সে শুধু জাভেদ আলীর কাছেই আসে নি, আজ সে সুখবর জানাতে এসেছে। সুখবরের সঙ্গে এনেছে কুমিল্লার মাতৃভাণ্ডারের রসমালাই। সবাইকে মিষ্টিমুখ করানোই তার নৈতিক ইচ্ছা।
জাহ্নবী অর্ণবকে বসতে বলে পারভীনকে খবরটা দিয়ে এলো। অর্ণবের আবারও আসার পেছনের কারণ জানতে না পারলেও বিরক্ত হয়েছেন তিনি। বিরসমুখে জাহ্নবীকে বলে দিলেন, ‘ তোর বাপকে কল দিয়ে বল। ছেলেটাকে চা নাস্তা খাওয়া। বাপের সমাজসেবার ষোলকলা পূর্ণ কর বাপ মেয়ে মিলে।’

জাহ্নবী অর্ণবের সামনে সোফায় বসল। এদিক সেদিক তাকিয়ে আমতা আমতা করতে লাগল জাহ্নবী। অর্ণব রসমালাইয়ের প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এটা রাখুন।’
জাহ্নবী বলল, ‘এটার কী দরকার ছিল বলুন তো?’
‘দরকার তো অবশ্যই ছিল। একটা সুখবর আছে।’
‘কী! ‘
‘আমার চাকরি হয়েছে।’
‘বাহ, খুব ভালো সংবাদ।’

মিষ্টি করে হাসল জাহ্নবী। অর্ণব বসে রইল শান্ত হয়ে। জাহ্নবীর হঠাৎ মনে হল, আজকে অর্ণবকে অনেক আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে। গতদিনের তুলনায় সে খুবই স্মার্ট এবং শান্ত। চাকরি হওয়াটাই নিশ্চয়ই এর কারণ! মানুষের মাঝে যখন স্বনির্ভরতা আসে, নিজেও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
জাহ্নবী বাটিতে করে রসমালাই ও নাস্তা এনে দিলো অর্ণবের জন্য। অর্ণবকে বলল, ‘আপনি হাতমুখ ধুয়ে আসুন।’
‘ কিছু মনে না করলে আমি একবার ওয়াশরুমে যেতাম। চট্টগ্রাম থেকে এসেছি তো।’
‘ ওহ! সরি। আমারই বলা উচিৎ ছিল।’

অর্ণবকে বাথরুম দেখিয়ে দিলো জাহ্নবী। হাতমুখ ধুয়ে এসে বসল অর্ণব। জাহ্নবী চা নিয়ে বসে আছে। অর্ণব বিভ্রান্তিতে পড়ে গেল, আগে নাস্তা খাবে নাকি চা? চা তো ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
জাহ্নবী হেসে বলল, ‘ চা খেয়ে নিন আগে।’
অর্ণব হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে চায়ের কাপ তুলে নিলো। ধন্যবাদ জানালো চায়ের জন্য। চা খাওয়া শেষ করে নাস্তা খেলো অর্ণব। জাহ্নবী বাবার জন্য অপেক্ষা করছে। অর্ণবকে একাকী বসিয়ে রেখে ভেতরে যেতেও পারছে না সে।

কিছুক্ষণ পর জাহ্নবী বলল, ‘আপনি আমার রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিন। আব্বু চলে এলে আসবে একটু পরেই।’
অর্ণব ইতস্তত করতে করতেই ব্যাগ নিয়ে জাহ্নবীর ঘরে চলে গেল। জাহ্নবী বসে রইল শান্ত ভঙ্গীতে। অদ্ভুত ব্যাপার, গত বারের মতো আজ ওর বিরক্ত লাগছে না, অস্বস্তি হচ্ছে না, এমনকি মুহুর্তের জন্যও মনে হচ্ছে না, মেহমান কেন তার রুমে গেল? বরং মেহমানকে আপ্যায়ন করতে পেরে খুশি খুশি লাগছে। নিজের মাঝে আসা অদ্ভুত পরিবর্তন টের পেয়ে ভালো লাগায় ভেতরটা ছেঁয়ে গেল জাহ্নবীর।

অর্ণব দরজায় দাঁড়িয়ে গলা খাকাড়ি দিয়ে জাহ্নবীকে ইশারা করল। জাহ্নবী জানতে চাইল, ‘বলুন?’
‘ফোনের চার্জার হবে? আমার চার্জারটা এখানে লাগছে না। মাল্টিপ্লাগ হলেও হবে।’
জাহ্নবী ঘরে প্রবেশ করল। দরজায় দাঁড়িয়ে রইল অর্ণব। জাহ্নবীর বেশ লজ্জা লজ্জা লাগছে। ড্রয়ার হতে চার্জার বের করে টেবিলে রাখল সে। বের হওয়ার সময় অর্ণব বলল, ‘ থ্যাংকস আপু।’
জাহ্নবী অর্ণবের দিকে এক পলক তাকালো। কোনো উত্তর দিতে পারলো না। অর্ণব চার্জার হাতে নিয়ে দেখল এই চার্জারের পিন দিয়ে তার ফোনে চার্জ দেয়া সম্ভব না। অর্ণব আবারও জাহ্নবীকে বিরক্ত করতে চাইলো না। তাই চুপচাপ বসে রইল জাহ্নবীর বিছানায়। মেয়েদের অসাধারণ করে ঘর গোছানোর ব্যাপারটা ওকে মুগ্ধ করে। চারপাশে চোখ বুলিয়ে সব মেয়েলি জিনিস দেখতে পাচ্ছে সে। অর্ণব চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল।

ভায়োলেট বাসায় ফিরে জাহ্নবীকে জিজ্ঞেস করল, ‘অর্ণব সাহেব এসেছে নাকি?’
জাহ্নবী অবাক হলো, ‘হ্যাঁ। তুই কিভাবে জানলি?’
‘ ওনার জুতা দেখলাম দরজার সামনে।’
‘বাপরে, তুই মানুষের জুতাও মনে রাখিস?’
‘এটা একটা সাধারণ ব্যাপার আপু। মনে রাখার মতো কিছু না।’
ভায়োলেটকে আজ অনেক বিক্ষিপ্ত দেখাচ্ছে। জাহ্নবী ভায়োলেটের ঘরে বসে আছে। ভায়োলেট গোসল করতে ঢুকে অনেক্ষণ সময় কাটালো। নিশ্চয়ই ওর কিছু হয়েছে। জাহ্নবী অনেক কষ্টে দমিয়ে রাখলো কৌতুহল।

ভায়োলেট ভেজা চুল পিঠের ওপর এলিয়ে দিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসল। খাতায় কী যেন লিখল অনেক্ষণ ধরে। জাহ্নবী বসে রইল দূরে। জাভেদ আলী এখনো বাসায় ফেরেননি।

জাহ্নবী অর্ণবের দরজায় শব্দ করে বলল, ‘আপনি খেতে আসুন।’
অর্ণব খাবার টেবিলে এসে জানতে চাইল, ‘আংকেল এসেছেন?’
‘না।’
‘আন্টি কোথায়?’
‘মা ঘুমাচ্ছেন।’
‘আপনাদেরকে আবারও কষ্ট দিচ্ছি। কিছু মনে করবেন না প্লিজ।’
‘ আরে না না, আপনি নির্দ্বিধায় খান।’

অর্ণব জাহ্নবীর দিকে এক পলক তাকিয়ে খাবার খেতে শুরু করল। জাহ্নবী ভায়োলেটকে খাবার খেতে অনুরোধ করলে সে জানালো, ‘পরে খাবো।’
ভায়োলেটকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখাচ্ছে। জাহ্নবীর ভালো লাগছে না কিছুই। খাবার খাওয়ার এক পর্যায়ে অর্ণব বলল, ‘ আপনাকে একটা কথা বলি, কিছু মনে করবেন না তো?’
‘না। বলুন?’
‘ ওই চার্জার দিয়ে ফোনটা চার্জ হয় নি। আমি কী এখানে আমার ফোনটা চার্জে দিতে পারি?’

জাহ্নবী চোখ তুলে তাকালো অর্ণবের দিকে। আচমকা বিদ্যুৎ শক খাওয়ার মতো শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠলো জাহ্নবীর। অর্ণবের সঙ্গে এই চোখাচোখি ওর সত্তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। জাহ্নবী বেশ অনুভব করল কত দ্রুত হৃদস্পন্দিত হচ্ছে তার।
অর্ণব খাবার টেবিলের পাশে চার্জে লাগিয়ে দিলো ফোনটা। জাহ্নবী দ্রুতপদে চলে এলো সেখান থেকে। কখনো কোনো পুরুষের সঙ্গে এত কাছাকাছি থেকে চোখাচোখি হয় নি তার। খুব অন্যরকম লাগছে ওর। একটা আবছা অস্থিরতা ওকে ক্রমশ ভারী করে তুললো।
অর্ণব খাওয়া শেষ করে টেবিলের পাশেই বসে রইল অনেক্ষণ। জাহ্নবী ভায়োলেটের ঘরে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। সে আর একটিবারও অর্ণবের সামনে যায় নি।

জাভেদ আলী বাসায় এলেন সন্ধ্যাবেলা। অর্ণবের চাকরি প্রাপ্তির খবরটা শুনে সবচেয়ে বেশী খুশি হলেন তিনি। সবার আগে পারভীনকে মিষ্টি খাওয়াতে গেলেন। পারভীন চোখ বুজে গম্ভীর মুখে শুয়ে আছেন। জাভেদ আলীর এইসব আধিখ্যেতা ওনার একেবারেই অপছন্দ।

জাভেদ আলী যখন বললেন, ‘ ছেলেটার কষ্ট দূর হলো অবশেষে। বেচারা ঢাকা শহরে এসে থাকার জায়গা পায়নি, বন্ধু মোবাইল নিয়ে সরে পড়েছে। এখন সে নিজের টাকায় বাসা নিয়ে থাকতে পারবে। হা হা হা।’
‘এত খুশির কী আছে? যেন তোমার ছেলে চাকরি পেয়েছে?’
‘ ছেলের মতো তো।’
‘যাও কোলে নিয়ে নাচো।’
‘হা হা হা। ছেলেটা চাকরি পেয়ে আমার জন্য মিষ্টি নিয়ে এসেছে পারভীন। এর চাইতে বড় কৃতজ্ঞতা আর কীভাবে প্রকাশ করে মানুষ?’

পারভীন উত্তর দিলেন না। জাভেদ আলী বললেন, ‘ওর বাবার অনেক টাকা পয়সা। কিন্তু ছেলে ভালো, বাবার টাকায় চলে না। সে নিজে ইনকাম করে নিজের খরচ চালায়। নতুন চাকরি পেয়েছে, বড় কোম্পানিতে বড় পোস্ট। সত্তর হাজার টাকা বেতন।’
পারভীন এখনো অন্যদিকে তাকিয়ে আছেন। যেন এই বেতনের কথা শুনেও তিনি খুশি হতে পারেননি। বিছানা থেকে নামলেন তিনি। জাভেদ আলীর সঙ্গে আর কথা বাড়ালেন না। মিষ্টিও খেলেন না। জাভেদ আলী একাই মিষ্টি মুখে দিয়ে বসে রইলেন।

জাহ্নবী ভায়োলেটকে বলল, ‘ সামারকে ফোন দিয়েছিলি?’
‘না। একটা টেক্সট দিয়েছিলাম সকালে। ওর ওখানে নেটওয়ার্ক নেই সম্ভবত। রিপ্লাই পাইনি।’
‘ওহ আচ্ছা। ভায়োলেট, আমার চাকরিটা হবে তো?’
‘টেনশন কোরো না আপু। বি কনফিডেন্ট। চাকরি না হলে অন্য আরেকটা হবে। হাসিখুশি থাকো।’
জাহ্নবী উদাস গলায় বলল, ‘চাকরি পাওয়ার আনন্দ অনেক জানিস? অর্ণব চাকরি পেয়েছে। ওর চোখেমুখে কী যে আনন্দের ঝিলিক! চেহারাটাই পালটে গেছে বেচারার। আগে ছিল অস্থির প্রকৃতির, পাগল পাগল। অথচ আজকে স্মার্ট, শান্ত শিষ্ট। ভেতর থেকে চেঞ্জ এসে গেছে ওর।’
ভায়োলেট হেসে বলল, ‘তোমারও আসবে আপু। পুরো জীবনটাই চেঞ্জ হয়ে যাবে তোমার।’
‘ দোয়া করিস আমার জন্য। যদিও জীবনটা এখনই চেঞ্জ হতে শুরু করেছে।’
‘কী বলো আপু! প্রেমে পড়েছ নাকি?’
‘আরে ধুর। ওসব না। আমি আর আগের আমি নেই, সেটাই বুঝিয়েছি।’
ভায়োলেট হেসে বলল, ‘ মজা করছিলাম। তোমাকে যেন সবসময় এমনই দেখি আপু। আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে, বোঝাতে পারবো না তোমায়।’

এমন সময় পারভীন এসে জাহ্নবীকে ডাকলেন। জাহ্নবী জবাব দিয়ে বলল, ‘বলো আম্মু।’
‘ বাসায় চিনিগুড়া চাল ছিল না? পাচ্ছি না কেন?’
‘ চাল নেই আম্মু। সেদিন খিচুড়ি রান্না করে খেয়ে ফেলেছি।’
পারভীনের আর কোনো কথা শোনা গেল না। জাহ্নবী জানতে চাইল, ‘চিনিগুড়া চাল দিয়ে কী করবা?’
‘ পায়েস রান্না করতাম একটু। দুইবোন নিচে যা না, মিনাবাজার থেকে কিছু বাজার টাজার করে নিয়ে আয়। পোলাও রান্না করি না অনেকদিন।’

জাহ্নবী ও ভায়োলেট একে অপরের দিকে তাকালো। পায়েস, পোলাও, শব্দ দুটো চমকে দিয়েছে ওদেরকে। চোখ বড়বড় করে ওরা একে অপরের দিকে চেয়ে রইল। ভায়োলেট মুচকি হেসে বলল, ‘আম্মু, আমরা নিচে যাচ্ছি একটু পর। আর কি কি লাগবে বলো?’
পারভীন মেয়েদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ওনাকে অনেক উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। রোগা রোগা ভাবটা আর নেই। চিন্তা করে বললেন, ‘গরুর গোশত খাবি? না মুরগী?’
‘ তুমি যা রাঁধবা আমরা তাই খাবো আম্মু।’
‘ তাহলে গরুর গোশতই ভালো হবে। দুধ আনবি এক কেজি। কিসমিস, বাদামও নেই বাসায়।’

পারভীন বাজারের লিস্ট বলে যাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে ভায়োলেট বলল, ‘আম্মু কী অর্ণব সাহেবকে জামাই বানানোর চিন্তা করছো নাকি?’

কথাটা বলেই দুষ্টুমিভরা হাসি দিলো ভায়োলেট। জাহ্নবী চমকে উঠলো। পারভীনের মুখখানা কালো হয়ে উঠল মুহুর্তেই। রেগে বললেন, ‘লাগবে না তোদের বাজারে যাওয়া। রান্নাই করবো না কিছু।’
রাগে আগুন হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন পারভীন। ভায়োলেট মুখ টিপে হাসতে হাসতে বিছানায় শুয়ে পড়ল। হাসি আটকে রাখতে পারছে না সে। এই বয়সেও আম্মুর এমন অভিমানী স্বভাব খুবই আনন্দদায়ক লাগে ওর কাছে। জাহ্নবী বলল, ‘কাজটা ঠিক করলি তুই? মা রেগে গেছে।’
‘আমি মজা করে বলেছি।’
‘মা মজা বোঝে বলে তোর মনে হয়?’
‘ওহ নো। মা এখন ডিপ্রেশনে চলে যাবে। যাই, শান্ত করি গিয়ে।’

ভায়োলেট মাকে ডাকতে ডাকতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। জাহ্নবী বসে রইল স্থবির হয়ে। ওর বুক ধরফর করছে। কোনো এক অজানা কারণে ভায়োলেটের বলা কথাটা ওর দেহে শিরশিরে এক অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। শিউরে উঠছে গা। জাহ্নবী চোখ মেলে রাখতে পারল না। আজ এত ছটফট লাগছে কেন!

চলবে..