#মেঘভেজা_দুপুরের_নিমন্ত্রণে_ফিরে_এসো
#পর্ব-১৫
“তুমি তোমার মাকে নিয়ে চলে যাও সারোয়ার। তোমাকে ছাড়া আমি ভালো আছি এটা তো দেখছেই। তিতুনকে এতোদিন একাই সামলেছি এখনও পারবো।”
সারোয়ার এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো-“আরে তুমি এতো রাগ করো কেন দুপুর? আমি তো তোমাকে পরীক্ষা করে দেখছিলাম। সামান্য দুষ্টামো করেছি।আমি জানি তুমি কখনোই অমন মেয়ে না যে অন্য কারো সাথে জীবন জড়াবে। প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও। আর কখনো এমন দুষ্টামি করবো না।”
দীর্ঘদিন পরে সারোয়ারের সান্নিধ্য বিচলিত করলো আমাকে। ভীষণ বিচ্ছিরী অনুভূতি। দেখবেন মন থেকে কাউকে ভালো না লাগলে তার ছোঁয়াকে কাঁটার মতো লাগবে। আমারও সেরকম লাগছিল। আমি সারোয়ারের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাই সারোয়ার বুঝতে পেরে আরও আঁকড়ে ধরলো আমাকে। আমি কঠোর স্বরে বলি-“দুষ্টামি করো বা না করো ভদ্র ভাষায় চলে যেতে বলছি চলে যাবে। আর আমি আমার কথা ফিরিয়ে নেব না। এবার দয়া করে আমাকে ছাড়ো। বেশি বাড়াবাড়ির ফল ভালো হবে না সারোয়ার।”
সারোয়ার আমাকে ছেড়ে দিয়ে সামনে দাঁড়ায়-“এমন করছো কেন দুপুর? বললাম তো সরি। আচ্ছা, কান ধরে ভুল স্বীকার করলে মাফ করবে? তাইলে তাই করছি।”
আমি কিছু বলবো তার আগেই সারোয়ার কান ধরে দাঁড়ায়-“প্লিজ মাফ করে দাও।”
আমি অনড়ভাবে মাথা দুলাই-“মাফ করলাম। কিন্তু তোমরা চলে যাবে এ কথার নড়চড় হবে না সারোয়ার। আমি জীবনে আর কোন জটিলতা চাই না।”
সারোয়ার এবার রেগে গেলো-“বাড়াবাড়ি করছো দুপুর। সবকিছু তুমি ডিসাইড করার কে? তোমার একার জীবন হলে কোন কথা ছিলো না। এখন তিতুন আছে। ও যেমন তোমার মেয়ে তেমনি আমারও মেয়ে। মানলাম তুমি এ যাবত একাই ওর দেখা শোনা করেছ। কিন্তু আমি তো ওর কথা জানতাম না। জানলে নিশ্চয়ই ওকে ফেলে দিতাম না? হতে পারতো ওর কথা জানলে আমিও পাল্টে যেতাম। এরকম পরিস্থিতিতে পড়তেই হতো না আমাদের। তবুও যখন বলছো, ঠিক আছে চলে যাব আমরা। তার আগে তিতুনের কাছে জানতে চাইবো ও কি চায়। ও যদি বলে বাবাকে ওর লাগবে না তাহলে চলে যাব আমরা। বলে এবার ঠিক আছে?”
আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। তিতুন কখনো তা বলবে না আমি জানি। এই ক’দিনে সারোয়ার বেশ ভালো বন্ধুত্ব করে ফেলেছে তিতুনের সাথে। কড়া কথা বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। তিতুন একা থাকে। সারোয়ার যেরকম মানুষ তাতে ওকে ভরসা করা যায় না। আমি চুপ করে গেলাম। বুঝতে পারছি এভাবে হবে না। অন্য কোন পন্থা অবলম্বন করতে হবে। সারোয়ার এতো সহজে ছাড়বে না আমাদের। আমার দূর্বলতা বুঝেই সারোয়ার লক্ষী ছেলের মতো হাসলো-“তুমি খামোখাই রাগ করছো দুপুর। বলছি তো ভুল করে ফেলেছি। আমি অনুতপ্ত। আমি খেয়াল রাখবো। আর হবেনা এমন কিছু।”
আমি জবাব না দিয়ে নিজের রুমে ফিরে এলাম। মনেহচ্ছে দ্বিতীয় বারের মতো ফেঁসে গেছি সারোয়ারের সাথে। গতবার কোনভাবে পালিয়ে এলেও এবার সেই পথটাও নেই। আর পালিয়ে যাবই বা কোথায়? প্রতিবার নিজেকে ভেঙে নতুন করে শুরু করা সম্ভব না। এবার তাহলে কি করবো? কিভাবে মুক্তি মিলবে সারোয়ারের হাত থেকে?
*****
দিনগুলো একভাবে কেটে যাচ্ছে। সারোয়ারের সাথে কথা বলছি না পারতপক্ষে। তিতুন সারাদিন কি করছে সেসব ক্ষনে ক্ষনে সিসিটিভিতে দেখে নিচ্ছি। মেয়ে তার বাবা আর দাদীর সাথে বেশ ভালো সময় কাটাচ্ছে। এর মাঝে শাশুড়ীর শরীর বেশ খারাপ হলো। ওনার অনিচ্ছা স্বত্বেও কয়দিন হাসপাতালে থাকতে হলো।
আমাদের এই হাসপাতালে মাঝে মাঝে দেশের বাইরে থেকে ডাক্তাররা আসে। ফ্রিতে রোগী দেখে। হতদরিদ্র চারপাঁচ জনের অপারেশনও করে দেয় ফ্রিতে। শাশুড়ীর কপাল ভালো এবার একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ এসেছেন। ওনার নাম ড্যানিয়েল লুইস।
আমি লুইসের কাছে শাশুড়ীর ফাইল দিয়ে অনুরোধ করলাম ওনার ট্রিটমেন্ট করতে। লুইস বেশ আন্তরিকতার সাথে ওনার সমস্ত রিপোর্ট দেখলো। বর্তমান শারীরিক অবস্থা দেখলো। জানালো ওনার অবস্থা খুব একটা ভালো না। দ্বিতীয়বার ক্যান্সার ফিরে আসা মানে সেটা আগের তুলনায় বেশি শক্তি নিয়ে আক্রমন করে। শরীর ওষুধ চিনে ফেলে বলে ওষুধ কাজ কম করে আর রোগ দ্রুত ছড়ায়। অল্প কিছুদিন ওনার হাতে আছে। পারলে ওনাকে মানসিক শান্তি দাও। তাতে করে মৃত্যুটা সহনীয় হবে তার জন্য। ডাক্তার হিসেবে রোগীর জন্য স্বাভাবিক সহানুভূতি মনে এলো। যত যাই হোক কারো মৃত্যু কখনো আনন্দদায়ক কিছু নয়।
শাশুড়ীর অসুস্থতার ফায়দা লুটলো সারোয়ার। সে তার
মাকে দেখতে কয়েকদফা হাসপাতালে এলো গেলো। লোকে জেনে গেলো সে আমার স্বামী। সেও তার মতো করে গল্প বানিয়ে সকলকে বলে গেলো। হাসপাতালে আমাকে নিয়ে জোর গুন্জন চলছে বেশ বুঝতে পারি। ইচ্ছে করেও না শোনার ভান করি। কিন্তু দিনশেষে যখন ঘুমাতে যাই মনটা খচখচ করে। বুঝতে পারছি না চাইতেও আবার এই সম্পর্কের জালে জড়িয়ে যাচ্ছি আমি। জাল এমনভাবে জড়িয়ে ধরছে আমাকে আমি চাইলেও ফট করে জাল কেটে বেরুতে পারবোনা।
অনিচ্ছায় আমরা সুখী পরিবার সেজে দিন কাটাচ্ছি। কিভাবে কাটাচ্ছি, কেন কাটাচ্ছি এসব ভাবনা প্রতিনিয়ত আমাকে ক্ষতবিক্ষত করছে। তার উপর রঙ্গন ক’দিন ধরে হাসপাতালে আসছে না।কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে কোন সদুত্তর পেলাম না। আমি ফোন দিয়েছি অগনিতবার কিন্তু ফোন ধরেনি ও। গত পাঁচ বছরে রঙ্গন আমার একমাত্র ভরসার জায়গা আর কথা জমা রাখার বাক্স হয়ে গেছিল। হুট করে দূরে সরে যাওয়ার ভীষণ অসহায় লাগছে নিজেকে। সে আমাকে ত্যাগ করেছে কিন্তু আমি বুঝলাম না আমার দোষটা কি? আমি সারোয়ার আর ওর মাকে আশ্রয় দিয়েছি এটাই কি আমার দোষ? কিন্তু ওর তো জানার কথা কোন কিছু আমার ইচ্ছে অনুযায়ী হচ্ছে না। পরিস্থিতি আমার অনুকূলে নেই। মেয়েরা চাইলেও অনেক কিছু করতে পারে না। তাদের সমাজ, সংসার নিয়ে বড্ড বেশিই ভাবতে হয়। মেয়েদের দায়বদ্ধতা আর জবাবদিহুতা অনেক বেশি সমাজের কাছে। আমি ছটফট করি অক্ষম আক্রোশ নিয়ে। কারো সাথে কথা শেয়ার করতে না পেরে নিজেকে ভীষণ একলা আর অসহায় আবিস্কার করলাম। কার কাছে অভিযোগ করবো কার কাছে বিচার চাইবো?
সেদিন চেম্বার শেষ হওয়ার পরও বসেছিলাম। বাসায় ফিরতে মন চায় না। সারোয়ার ইদানীং অন্য কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্বামীর অধিকার চায় সে। আমার বেডরুমে ঢুকতে চায়। আমি ওর স্পর্ধা দেখে অবাক হই না আর। ও ধরেই নিয়েছে আমি ওকে মেনে নিয়েছি তিতুনের কারনে। তিতুন আমার দূর্বল জায়গা তাই তিতুনের কথা বলে আমাকে ব্লাকমেল করার চেষ্টা করছে। একটু একটু করে নিজেকে আমাদের জীবনে ফিট করার আপ্রান চেষ্টা করছে। সব বুঝছি আমি কিন্তু চুপ করে আছি। আমার চুপ থাকা দেখে ও আরও সাহসী হচ্ছে। খুব করে বুঝতে পারছি সারোয়ারকে অতিশীঘ্রই থামাতে হবে। না হলে আমার জীবন আবারও অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। কিছু করা দরকার কিন্তু কি করবো? একা চেম্বারে বসে বসে ভাবছিলাম। এরমধ্যে জান্নাত এলো-“ম্যাম, আপনার জন্য একটা চিঠি আছে।”
মাথা তুলে অবাক কন্ঠে জানতে চাইলাম-“চিঠি! কার চিঠি?”
“রঙ্গন স্যার দিয়েছিলেন।”
“রঙ্গন!”
জান্নাত মাথা দুলায়-“স্যার আজকে দুপুরের ফ্লাইটে চলে গেলেন আমেরিকায়। আর মনেহয় ফিরবে না। বিদায় নিতে এসেছিলেন। যাওয়ার আগে চিঠিটা আমায় দিয়ে বলেছেন আপনাকে দিতে।”
শুনে বিস্মিত হওয়া উচিত আমার কিন্তু কোন অনুভুতি জাগলো না। আমার বোধশক্তি মনেহয় নাই হয়ে গেছে। কথাগুলো কানে ঢুকলেও যেন মনে গাঁথলো না। আমি হতবিহ্বল হয়ে এদিক সেদিক দৃষ্টিপাত করি। মনটা চঞ্চল হরিনীর মতো ছটফট করছে। অস্থির মনে বারবার ঘুরেফিরে একটা কথাই আসছে, রঙ্গন চলে গেছে! আমাকে ছেড়ে চলে গেছে রঙ্গন! আমার একমাত্র বন্ধু আমাকে একাকিত্বের মাঝে ডুবিয়ে দিয়ে পালিয়ে গেছে!
চলবে—
©Farhana_Yesmin