#মেঘভেজা_দুপুরের_নিমন্ত্রণে_ফিরে_এসো
#পর্ব-১৬
★দুপুর
চিঠি পেয়ে অবাক হয়েছিস জানি। এটাও জানি আরও অবাক হয়েছিস আমার চলে যাওয়ার খবর পেয়ে। তুই একদিন সারোয়ারকে না জানিয়ে পালিয়ে এসেছিলি। জানতাম না এমন দিন আমার জীবনেও আসবে। জানিস, কাজটা করতে আমার মোটেও ভালো লাগেনি। ভীষণ বাধ্য হয়ে কাজটা করেছি। আর পারছিলাম না রে। নতুন করে তোর সাথে সারোয়ারকে মেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। আমি জানি তোর কোন দোষ নেই। কিবা করতি তুই? সারোয়ারকে ডিভোর্স দিতি? তারপর তিতুন যখন বড় হয়ে প্রশ্ন করবে তখন কি জবাব দিবি? তাছাড়া খালা এখন মৃত্যুশয্যায়। নির্দয়ের মতো তাদের ছেড়ে দেওয়া কোন মানবিকতার কাজ হতো না। তুই ভালো সিদ্ধান্তই নিয়েছিস। সব ঠিক আছে। দোষ আসলে আমারই। নতুন করে ঠকে যেতে ভীষণ আপত্তি আমার। তাই আগে থেকেই পালিয়ে গেলাম।
তোর মনে আছে আমাদের প্রথম পরিচয়ের দিনের কথা? তুই কি জানিস প্রথমদিন তুই আমাকে যে কলমটা দিয়েছিলি সেটা আজও স্বযত্নে রক্ষিত আছে আমার কাছে? আমি মাকে বলেছিলাম তোর কথা। মা নিজেও মনে মনে তোকেই বউমা ভেবে কত স্বপ্ন সাজিয়েছিল। আফসোস সেসব স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেলো।
সারোয়ারের বাবা মারা যাওয়ার পর মা কেন যেন ওর প্রতি বেশ নরম ছিলেন। ও কিছু চাইলে সেটা আমার জিনিস হলেও আমি মন খারাপ করলেও মা দিয়ে দিতেন। সত্যি বলতে মায়ের সাথে এসব নিয়ে অনেকবার ঝামেলা হয়েছে আমার। মায়ের একটাই কথা বাবা হারা ছেলে, ওকে মায়া কর। ওকে মায়া করতে করতে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে কাঙ্খিত জিনিস হারিয়ে ফেললাম দুপুর। সেদিন যদি ঘুনাক্ষরেও সারোয়ারের অভিসন্ধি টের পেতাম তাহলে কখনোই ওর সাথে তোর পরিচয় করিয়ে দিতাম না।
তোর সাথে সম্পর্ক করা তোকে বিয়ে করা সারোয়ারের জেদ ছিলো। শুধু আমাকে হারিয়ে দেওয়াই যেন ওর একমাত্র উদ্দেশ্য। কেন এমন করতো ও আজ পর্যন্ত ভেবে পাইনি। শেষ দিনগুলোতে মা খুব অপরাধবোধে ভুগতেন। ভাবতেন আমার তোকে না পাওয়াতে সে দায়ী। আমি নিজেও অবশ্য তাই ভাবতাম। তখন কিভাবে নিজেকে সামলে নিয়েছি আমি জানি না। ভেবেছিলাম জীবনে কোনদিন তোর পথ মাড়াবো না। কিন্তু দ্বিতীয় বার তুই যখন আমাকে ডাকলি সব প্রতিজ্ঞা ভুলে গেলাম। আর ভুলবোই না কেন? তোর বাস তো আমার মনে। তোকে ভেবে ঠোঁটের কোনে হাসি ফোটে। পুনরায় তোকে পেয়ে বরং এভাবে ভাবতে লাগলাম, তুই আবার আমার জীবনে এসেছিস মানে এবার আমার হয়েই যাবি।
কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে যা হচ্ছে তাতে নিজেকে বুঝ দেওয়া ইম্পসিবল মনে হচ্ছে। নিজেকে সামলাতে না পেরে যদি উল্টো পাল্টা কিছু করে বসি সেই ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছি। আমি চাই না আমার কারনে তোর জীবনে বিন্দুমাত্র কোন সমস্যা হোক। তুই যেখানে যার সাথে থাকিস না কেন তুই ভালো থাকলেই আমি খুশি। আমার হয়তো আর ফেরা হবে না। হাসপাতালের শেয়ারটা ধীরে ধীরে তুলে নেব। অনেকদিন ধরে অফার পাচ্ছিলাম। তোর নিরাপদ জীবনের স্বার্থে তোর থেকে দূরে সরে আসার অফারটা লুফে নিলাম। তুই অনেক ভালো থাকিস দুপুর।
রঙ্গন।★
আমি চিঠি বন্ধ করে হাউমাউ করে কাঁদছি। রঙ্গন কিভাবে পারলো এমনটা করতে। এতোদিন একসাথে থেকে কি একটুও বোঝেনি আমাকে? এই দুপুরের কাছে কি একবারও জানতে চাওয়া যেত না সে কি চায়?
*****
আমার দিন যায় রাত যায় কোনদিক দিয়ে আমি টের পাই না। ক্লান্তিতে চোখ বুঁজে আসে অথচ ঘুমাতে পারি না। দিনে রাতে অসংখ্যবার রঙ্গনকে ম্যাসেজ করি, ফোন দেই। কোথাও থেকে কোন সাড়া পাই না। রঙ্গনের এমন কঠিন আচরণ আমাকে দংশিত করে সর্বদা। বুকের মধ্যে চাপ ধরা ব্যাথা আমাকে দিনকে দিন রোবটে পরিনত করছে। সেদিন গভীর রাতে দরজায় ঠকঠক শুনে সজাগ হলাম। সারোয়ার মৃদুস্বরে ডাকছে আমাকে-“দুপুর, দরজাটা খোলো না। আর কতদিন এরকম চলবে?”
আমি ভয়ে গুটিসুটি মেরে তিতুনকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরি। আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। সারোয়ার ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে একসময় চলে যায়। ভাবছি কালই এক একটা বিহিত করতে হবে না হলে একসময় আমার পরাজয় অনিবার্য।
সকালে অফিসে যাওয়ার আগে সারোয়ারকে বললাম-“কাল রাতে যা হয়েছে তা দ্বিতীয় বার হলে তোমাকে রাফির হাতে তুলে দেব। ওনাকে মনেহয় তুমি ঠিকঠাক চেননি। উনি একজন গুন্ডা শ্রেনির মানুষ, আশেপাশে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই টের পাবে কত ভালো মানুষ উনি। আমার কোন উপকার করতে পারলে সে নিজেকে ধন্য মনে করবে। এটা লাস্ট ওয়ার্নিং ধরে নাও। আশাকরি তুমি বুঝতে পারছ কি বলতে চাইছি।”
সারোয়ার কিছু বললো না। চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। আমি না খেয়েই বেরিয়ে এলাম। গাড়িতে বসে প্রতিদিনের মতো রঙ্গনের ম্যাসেন্জারে কল করি। বরাবরের মতো আনরিচেবল। রঙ্গন সব জায়গায় থেকে আমাকে ব্লক দিয়েছে। যোগাযোগের কোন উপায় রাখেনি। অন্য কারো কাছে রঙ্গনের কথা জিজ্ঞেস করতে বড্ড লজ্জা করে। রঙ্গন আমার কতটা ক্লোজ এটা এখানকার সবাই জানে। অথচ সেই রঙ্গনের সাথে আমার যোগাযোগ নাই এটা লোককে জানতে দিতে চাই না।
দুপুর বেলা হঠাৎ সারোয়ারের ফোন-“দুপুর, মা যেন কেমন করছে। তুমি কি আসবে একবার?”
আমার ভ্রু কুঁচকে গেলো। সারোয়ারকে বিশ্বাস করি না মোটেও। আমি বললাম-“এ্যাম্বুলেন্স পাঠাচ্ছি, হাসপাতালে নিয়ে এসো।”
“যেতে চাচ্ছে না। প্লিজ কষ্ট করে এসে একবার।”
আমি ফোন কেটে দিয়ে মোমেনা খালাকে ফোন করি। সত্যিই শাশুড়ীর শরীর খারাপ কিনা জানতে চাই। সত্যতা যাচাইয়ের পর আমি বাসায় ফিরি। উনার ঘর জুড়ে বমির গন্ধ। সারোয়ার জানালো প্রচুর বমি করেছেন। বসলেই নাক দিয়ে রক্ত আসছে। সারোয়ারের চেহারা রক্তশুন্য। আমাকে দেখা মাত্রই উনি আমাকে কাছে ডাকলো-“আমি তো থাকবো না। ছেলেটাকে একা ছেড়ে দিয় না। ওর একা থাকার ক্ষমতা নেই রে মা।”
আমি কঠিন গলায় বলি-“অসুস্থ অবস্থায় এসব চিন্তা বাদ দিন। আমি আপনার কোন আবদার আমলে নিচ্ছি না। আমাকে মাফ করবেন। রক্ত বন্ধের ইনজেকশন দিচ্ছি। প্লিজ ঘুমানোর চেষ্টা করুন।”
উনি আর একটা কথাও বলেনি। চুপচাপ শুয়ে পড়লো। রাতে তিতুনকে নিয়ে খেতে বসেছিলাম, সারোয়ারও এলো খেতে। কিছুক্ষন পরে উনিও এলেন। সে রাতে প্রথমবারের মতো উনি আমাদের সাথে খাবার টেবিলে এসে বসলেন। তিতুনের সাথে টুকটাক হাসাহাসি খুনসুটি করলেন। উনি খাবার খেলেন খুব সামান্য। তবে চেহারায় পরিতৃপ্তির ছাপ। ঘুমাতে যাওয়ার হঠাৎ আমাকে বললেন-“দুপুর, তুমি অনেক ভালো একটা মেয়ে। আমরাই তোমাকে চিনতে পারিনি। তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি গত কিছুদিন। আমাকে মাফ করে দিয় মেয়ে।”
আমি অবাক হলাম ওনার কথায়। উনি মুখে হাসি নিয়েই নিজের রুমে ঢুকলেন। কিছুটা অস্বাভাবিক ঠেকলো ওনার আচরণ। পাত্তা না দিয়ে ঘুমাতে গেলাম।
সকালে ঘুম ভাঙলো সারোয়ারের চিৎকারে। ছুটে গেলাম ওনার রুমটাতে। সারোয়ার তার মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে বাচ্চা ছেলের মতো। আমি অবাক হলাম না। এমনটা হওয়ারই ছিলো। তিতুনও পায়ে পায়ে এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। বাবাকে কাঁদতে দেখে তিতুন ভয় পেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বারবার জানতে চাইছে, বাবা কেন কাঁদছে? দিদুনের কি হয়েছে? দিদুন কথা বলছে না কেন? আমি জবাব দিতে পারি না। মোমেনা খালাকে ইশারা করি তিতুনকে সরিয়ে নিতে। ওনার কাছে এগিয়ে গেলাম। চোখ দুটো আঁধবোজা হয়ে আছে, মুখটা কি খানিকটা হাসি হাসি। আমি আলতো করে হাত ছুঁয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে দিলাম। গা ঠান্ডা, মানে বেশ অনেকক্ষণ হলো গত হয়েছেন। ভালোমতো তাকিয়ে দেখলাম ওনাকে। নাহ, কষ্টের কোন ছাপ নেই। চেহারায় শান্তি শান্তি ভাব। মানুষটা হয়তো এটাই চাইছিলেন। আমার কাছে এসে অন্তীম শ্বাস নেওয়া। ওনার ইচ্ছেপূরন হয়েছে। কিন্তু কেন চেয়েছিলেন এমনটা? উত্তরটা কখনো জানা হয়ে উঠবে না। তবে কেন যেন ঠিক ওই মুহূর্তে ওনার প্রতি আমার সমস্ত অভিমান অভিযোগ গায়েব হয়ে গেলো। যা অনুভব করলাম তা হলো মায়া, প্রগাঢ় মায়া।
চলবে—
©Farhana_Yesmin